📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সুলায়মান (আ)-এর বৈবাহিক জীবন ও সন্তান-সন্তুতি

📄 সুলায়মান (আ)-এর বৈবাহিক জীবন ও সন্তান-সন্তুতি


সুলায়মান (আ)-এর বৈবাহিক জীবন ও সন্তান-সন্তুতিঃ সুলায়মান (আ) সর্বপ্রথম মিসর-রাজ ফিরআওনের কন্যাকে বিবাহ করেন এবং উপঢৌকনস্বরূপ জিয়ার (Gezer) শহর লাভ করেন। (Colliers Ency., ২১ খ, পৃ. ১৯৩)। ইহা ব্যতীত তিনি মুআবীয়, আম্মোনীয়, ইদোমীয়, সীদোনীয় ও হিত্তীয় সম্প্রদায়ের কন্যাগণকে বিবাহ করেন (দ্র. ১ম রাজাবলী, ১১: ১)। তিনি সাবার রানীকেও বিবাহ করিয়াছিলেন বলিয়া কথিত (বরাত সস্থানে উক্ত হইবে)। কোন কোন বর্ণনায় তাঁহার এক স্ত্রী গোপনে মূর্তি পূজায় লিপ্ত ছিল বলা হইয়াছে এবং তাহার কারণে তিনি কঠিন বিপদে পতিত হইয়াছিলেন (দ্র. আল-কামিল, ১খ, পৃ. ১৮২-৩)। তাঁহার স্ত্রীর সংখ্যাও অতিরঞ্জিত হইয়াছে। কোনও বর্ণনায় তাহাদের সংখ্যা এক হাজার (সাত শত স্ত্রী এবং তিন শত বাঁদী অথবা ইহার বিপরীত), কোন বর্ণনায় এক হাজার এক শত স্ত্রী (৭০০ স্ত্রী এবং ৪০০ বাঁদী; বিদায়া, ২খ, পৃ. ২৯) এবং কোন বর্ণনায় ২০০ স্ত্রী (তাহযীব, ৬খ, পৃ. ২৬৬) উল্লেখ আছে। স্পষ্টরূপেই উপরিউক্ত তথ্য বাইবেল হইতে গৃহীত হইয়াছে (দ্র. ১ম রাজাবলী, ১১: ৩, যেখানে তাঁহার স্ত্রীর সংখ্যা এক হাজার উল্লেখ আছে)। কিন্তু সহীহ হাদীছসমূহে তাঁহার স্ত্রীর সংখ্যা সর্বনিম্ন ষাট এবং সর্বোচ্চ এক শত উল্লেখ আছে। যেমন এক হাদীছে মহানবী (স) বলেনঃ
قَالَ سُلَيْمَانُ بْنُ دَاوُدَ عَلَيْهِمَا السَّلامُ لَاطُوفَنَّ اللَّيْلَةَ عَلَى مِائَةِ امْرَأَةٍ أَوْ تِسْعٍ وَتِسْعِينَ كُلُّهُنَّ يَأْتِي (تَأْتِي) بِفَارِسٍ يُجَاهِدُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَقَالَ لَهُ صَاحِبُهُ إِنْ شَاءَ اللَّهُ فَلَمْ يَقُلْ إِنْ شَاءَ اللَّهُ فَلَمْ يَحْمِلْ (تَحْمِلْ) مِنْهُنَّ إِلَّا امْرَأَةً وَاحِدَةً جَاءَتْ بِشِقِّ رَجُلٍ وَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ لَوْ قَالَ إِنْ شَاءَ اللَّهُ لَجَاهَدُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ فُرْسَانًا أَجْمَعُونَ .
"সুলায়মান ইব্‌ন দাউদ (আ) বলিয়াছিলেন, আজ রাত্রে আমি অবশ্যই এক শত অথবা নিরানব্বইজন স্ত্রীর নিকট গমন করিব এবং তাহাদের প্রত্যেকে আল্লাহ্ পথে জিহাদকারী একজন বীর মুজাহিদ প্রসব করিবে। তাঁহার এক সঙ্গী তাঁহাকে বলিলেন, ইনশাআল্লাহ (আল্লাহ্ মর্জি হইলে), কিন্তু তিনি ইনশাআল্লাহ বলেন নাই। সুতরাং তাঁহার একজন স্ত্রী ব্যতীত অপর কেহই গর্ভধারণ করে নাই এবং সেও একটি অপূর্ণাঙ্গ সন্তান প্রসব করিল। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন: সেই সত্তার শপথ, যাঁহার হস্তে মুহাম্মাদের প্রাণ! তিনি যদি "ইনশাআল্লাহ" বলিতেন তাহা হইলে (তাঁহার সকল স্ত্রীই গর্ভধারণ করিত এবং এমন সন্তান প্রসব করিত) যাহারা সকলে অবশ্যই অশ্বারোহী মুজাহিদরূপে আল্লাহ্র পথে জিহাদ করিত" (বুখারী, কিতাবুল জিহাদ, বাব মান তালাবাল ওয়ালাদ লিল-জিহাদ, ১খ, পৃ. ৩৯৫)।
একই হাদীছ গ্রন্থের কিতাবুল আম্বিয়ায় ৭০ ও ৯০জন (বাব ওয়া ওয়াহাবনা লি-দাউদা সুলায়মান, ১খ, পৃ. ১৮৭); কিতাবুন নিকাহ-এ ১০০জন (বাব কাওলির রাজুল লাআতৃষ্ণান্নাল লায়লাতা...., ২খ, পৃ. ৭৮৮); কিতাবুল আয়মান (বাব কায়ফা কানা ইয়ামীনুন নাবিয়্যী, ২খ, পৃ. ৯৮২) ও কিতাবুল কাফফারাত (বাবুল ইসতিছনা ফিল আয়মান, ২খ, পৃ. ৯৯৪)-এ ৯৯ জন এবং কিতাবুত তাওহীদ (বাব ফিল মাশয়াতি ওয়াল ইরাদাহ, ২খ, পৃ. ১১১৩)-এ ৬০জন স্ত্রীর উল্লেখ আছে। সহীহ মুসলিমের কিতাবুল আয়মানে (বাবুল ইসতিছনা, ২খ, পৃ. ৪৯) চারটি রিওয়ায়াতে ৭০জন ও ৯০জন স্ত্রীর উল্লেখ আছে। জামে আত-তিরমিযীর আবওয়াবুল আয়মান (বাব মা জাআ ফী ইনশাআল্লাহ, ১খ, পৃ. ১৮৫)-এ ৭০ ও ১০০ জন স্ত্রীর উল্লেখ আছে।
উক্ত হাদীছের সবকয়টি সনদসূত্র অত্যন্ত মজবুত এবং ইহার বিশুদ্ধতা সম্পর্কেও আপত্তি উত্থাপনের কোন কারণ বিদ্যমান নাই। তবে দিরায়াতের (যুক্তি) দিক বিবেচনা করিয়া বলা যাইতে পারে যে, মহানবী (স) হয়তো ইয়াহুদীদের আজেবাজে কথাবার্তার উল্লেখ করিতে গিয়া উপমাস্বরূপ উক্ত সংখ্যা উল্লেখ করিয়াছেন, কিন্তু রাবী উক্ত সংখ্যাকে তাঁহার নিজের বক্তব্য মনে করিয়া তাহাই বর্ণনা করিয়াছেন। অন্যথায় একজন মহান নবীর এইরূপ পত্নীবাহুল্য তাঁহার মর্যাদার পরিপন্থী মনে হয়। তাহা ছাড়া ১০-১২ ঘণ্টার এক রাত্রে ৬০ হইতে ১০০জন স্ত্রীর সহিত মিলিত হওয়া যে কোনও বীর্যবান সুস্থদেহী পুরুষের পক্ষে অসম্ভব। অতএব স্ত্রীর আধিক্যও একটি কল্পকাহিনী হইয়া থাকিবে।
হযরত সুলায়মান (আ)-এর সন্তানদের সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায় না। তাঁহার পুত্র-কন্যার মধ্যে এক পুত্র ও দুই কন্যার নাম বাইবেলে উক্ত আছে: পুত্র রহবিয়াম (১ম বংশাবলী, ৩ঃ ১০), পিতার ইনতিকালের পর যিনি রাজপদে অভিষিক্ত হইয়াছিলেন (১ম রাজাবলী, ১২:১)। দুই কন্যা-টাফত যিনি দোর এলাকার উচ্চভূমির সরদার বিন-অবিনাদরে স্ত্রী ছিলেন (১ম রাজাবলী, ৪: ১, ১১, ১৫) এবং বাসমাত, যিনি নপ্তালী এলাকার বাসিন্দা অহীমাস-এর স্ত্রী ছিলেন (১ম রাজাবলী, ৪: ১৫)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সুলায়মান (আ)-এর অশ্বপাল

📄 সুলায়মান (আ)-এর অশ্বপাল


হযরত সুলায়মান (আ)-এর আলোচনায় কুরআন মজীদে অতি সংক্ষেপে অশ্বপাল সম্পর্কিত একটি ঘটনার উল্লেখ আছে।
وَوَهَبْنَا لِدَاوُدَ سُلَيْمَانَ نِعْمَ الْعَبْدُ إِنَّهُ أَوَّابٌ . اذ عُرضَ عَلَيْهِ بالعشى الصُّفْنَتُ الْجِيَادُ. فَقَالَ إِنِّي أَحْبَبْتُ حُبُّ الْخَيْرِ عَنْ ذِكْرِ رَبِّي حَتَّى تَوَارَتْ بِالْحِجَابِ . رُدُّوهَا عَلَى فَطَفِقَ مَسْحًا بِالسُّوقِ وَالْأَعْنَاقِ .
"আমি দাউদকে দান করিলাম সুলায়মান। সে ছিল উত্তম বান্দা এবং সে ছিল অতিশয় আল্লাহ অভিমুখী। যখন অপরাহ্নে তাহার সম্মুখে ধাবনোদ্যত উৎকৃষ্ট অশ্বরাজিকে উপস্থিত করা হইল তখন সে বলিল, আমি তো' আমার প্রতিপালকের স্মরণ হইতে বিমুখ হইয়া ঐশ্বর্যপ্রীতিতে মগ্ন হইয়া পড়িয়াছি, এদিকে সূর্য অস্তমিত হইয়া গিয়াছে। এইগুলিকে পুনরায় আমার নিকট আনয়ন কর। অতঃপর সে উহাদের পদ ও গলদেশ ছেদন করিতে লাগিল" (৩৮: ৩০-৩৩)। উপরিউক্ত আয়াত কয়টিও দ্ব্যর্থবোধক আয়াতসমূহের অন্তর্ভুক্ত। ইহার ব্যাখ্যায় হযরত আলী (রা)-র একটি মত এবং আবদুল্লাহ ইব্‌ন আব্বাস (রা)-র দুইটি মত বিদ্যমান আছে। (১) আলী (রা)-র মতে একদা জিহাদের অশ্বগুলি পরিদর্শনের ব্যস্ততায় হযরত সুলায়মান (আ)-এর আসরের নামায ছুটিয়া যায়, এমনকি সূর্য অস্তাচলে চলিয়া গেল, যেমন খন্দকের যুদ্ধ চলাকালে অনিবার্য কারণে মহানবী (স)-এর আসরের নামায কাযা হইয়াছিল। তিনি সম্বিত ফিরিয়া পাইয়া অশ্বগুলিকে ডাকাইয়া আনাইয়া উহাদিগকে যবাহ করিয়া ফেলিলেন, যেন সম্পদের ভালোবাসাকে আল্লাহ্ ভালোবাসায় কুরবানী করিলেন (তাফসীরে তাবারী, ১০ম বালাম, ২খ, পৃ. ৯৯; তাহযীব তারীখ দিমাস্ক, ৬খ, পৃ. ২৫৮-৯; কাসাসুল কুরআন ২খ, পৃ. ১১২-৩) এবং ইহাই কিঞ্চিত পার্থক্যসহ হাসান বসরী (র)-এর সূত্রে বর্ণিত ইব্‌ন আব্বাস (রা)-মত। আল্লামা আলুসী ও ইব্‌ন কাছীর প্রমুখ এই মত গ্রহণ করিয়া বলেন যে, আগেকার (সালাফ) অধিকাংশ আলেমের এই মত (বিদায়া, ২খ, পৃ. ২৫)। তিনি আরও বলেন, নামায কাযা হওয়ার ব্যাপারটি ছিল সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত।
তিনি আল্লাহ্ মহব্বতে তাঁহার ব্যক্তিগত মালিকানাধীন সর্বোত্তম অশ্বগুলিকে কুরবানী করিলে আল্লাহ তাআলা তাঁহার প্রতি সন্তুষ্ট হইয়া পুরস্কারস্বরূপ বায়ুকে তাঁহার নিয়ন্ত্রণাধীন করিয়া দিলেন (রূহুল মা'আনী, ২খ, পৃ. ১৯৩; বিদায়া, ২খ, পৃ. ২৫)। তাঁহারা নিজেদের ব্যাখ্যার সমর্থনে একটি হাদীছ উদ্ধৃত করিয়াছেন:
عَنْ أَبَيِّ بْنِ كَعْبٍ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي قَوْلِهِ فَطَفِقَ مَسْحًا بِالسُّوقِ وَالْأَعْنَاقِ قَالَ قَطَعَ سُوقَهَا وَأَعْنَاقَهَا بِالسَّيْفِ .
"উবায়্যি ইব্‌ন কাব (রা) হইতে বর্ণিত। মহানবী (স) আল্লাহ তাআলার বাণী "অতঃপর সে উহাদের পদ ও গলদেশ ছেদন করিতে লাগিল" (৩৮: ৩৩) সম্পর্কে বলেন: সুলায়মান (আ) তরবারির আঘাতে উহাদের পদযুগল ও গলদেশ কর্তন করিলেন" (রূহুল মা'আনী, ২৩খ, পৃ. ১৯৩; দুররে মানছুর, ৫খ, পৃ. ৩০৯)।
আল্লামা হায়ছামী (র) ইমাম তাবারানীর আল-আওসাত গ্রন্থের বরাতে তাঁহার মাজমাউয যাওয়াইদ গ্রন্থের কিতাবুত তাফসীরে (৭খ, পৃ. ৯৯) হাদীছটি সংকলন করিয়াছেন এবং বলিয়াছেন যে, উক্ত হাদীছের এক রাবী সাঈদ ইব্‌ন বশীরকে শো'বা (র) প্রমুখ নির্ভরযোগ্য বলিয়াছেন এবং ইব্‌ন মাঈন প্রমুখ দুর্বল বলিয়াছেন। হাদীছের অবশিষ্ট সকল রাবী নির্ভরযোগ্য (মাজমাউয যাওয়াইদ, ৭খ, ৯৯-এর বরাতে মাআরিফুল কুরআন, ৭খ, পৃ. ৫১২-৩)। এই হাদীছের ভিত্তিতে পূর্বোক্ত মুফাসসিরগণের মত শক্তিশালী হয়।
তবে এই ব্যাখ্যা গ্রহণ করিলে কুরআনের বাহিরের তিনটি কথা কল্পনা করিতে হয়: (ক) প্রথমে কল্পনা করিতে হয় যে, হযরত সুলায়মান (আ)-এর আসরের নামায (মতান্তরে ঐ সময়ে তাঁহার বিশেষ ওজীফা) কাযা হইয়া গিয়াছিল; (খ) অতঃপর কল্পনা করিতে হয় যে, সূর্য অস্তাচলে চলিয়া গিয়াছিল; (গ) অতঃপর কল্পনা করিতে হয় যে, সুলায়মান (আ) অশ্বগুলিকে হত্যা করিয়াছেন। এই তিনটি কথা কুরআন মজীদের বক্তব্যের সহিত সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হয় না (তাফহীমুল কুরআন, ৪খ, পৃ. ৩৩৩-৪, টীকা ৩৫; কাসাসুল কুরআন, ২খ, পৃ. ১১৫-৬)।
অপর একদল তাফসীরকারের মতে حَتَّى تَوَارَتْ بِالْحِجَابِ এবং رُدُّوهَا عَلَى উভয় বাক্যাংশের সম্পর্ক সূর্যের সহিত। অর্থাৎ যখন আসরের নামায কাযা হইল এবং সূর্য অস্তগমন করিল তখন হযরত সুলায়মান (আ) ফেরেশতাগণকে বলিলেন, সূর্যকে ফিরাইয়া আন, যেন আসরের ওয়াক্ত ফিরিয়া আসে এবং আমি নামায পড়িতে পারি। তদনুযায়ী সূর্য ফিরিয়াও আসিল এবং তিনি নামাযও পড়িলে। কিন্তু এই তাফসীর পূর্বোক্ত তাফসীরের তুলনায় আরও অধিক অগ্রহণযোগ্য। কারণ কুরআন মজীদের বাচনভঙ্গি হইতে উহার কিঞ্চিৎ সমর্থনও পাওয়া যায় না, যদিও মহান আল্লাহ্ পক্ষে ডুবন্ত সূর্যকে ফিরাইয়া আনা মোটেই অসম্ভব নহে (রূহুল মা'আনী, ২৩ খ, পৃ. ১৯৩)। হযরত সুলায়মান (আ)-এর জন্য এইরূপ বিরাট একটি মু'জিযা সংঘটিত হইয়া থাকিলে এবং সূর্যের পুনরায় ফিরিয়া আসার অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটিয়া থাকিলে পৃথিবীর ইতিহাসে তাহার অবশ্যই উল্লেখ থাকিত।
উপরিউক্ত মতের তাফসীরকারগণ কয়েকটি হাদীছ পেশ করিয়া প্রমাণ করিতে চাহিয়াছেন যে, সূর্যের অস্তাচলে ডুবিয়া যাওয়ার পর উহার পুনরায় ফিরিয়া আসার ঘটনা কয়েকবারই ঘটিয়াছিল।
عَنْ أَسْمَاءَ بِنْتِ عُمَيْسٍ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يُوحَى إِلَيْهِ وَرَاسُهُ فِي حِجْرٍ عَلِيَّ فَلَمْ يُصَلِّ الْعَصْرَ حَتَّى غَرَبَتِ الشَّمْسُ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ صَلَّيْتَ يَا عَلِيُّ قَالَ لَا فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ ، صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اللَّهُمَّ إِنَّهُ كَانَ فِي طَاعَتِكَ وَطَاعَةِ رَسُولِكَ فَارْدُدْ عَلَيْهِ الشَّمْسَ ، قَالَتْ أَسْمَاءُ فَرَأَيْتُهَا غَرَبَتْ ثُمَّ رَأَيْتُهَا طَلَعَتْ بَعْدَ مَا غَرَبَتْ وَوَقَعَتْ عَلَى الْأَرْضِ وَذَلِكَ فِي الصَّهْبَاءِ فِي خَيْبَرَ .
"আসমা বিন্ত উমায়স (রা) হইতে বর্ণিত। মহানবী (স)-এর উপর ওহী নাযিল হইতেছিল। তখন তাঁহার মস্তক আলী (রা)-র কোলে রাখা ছিল। ফলে তিনি সূর্যাস্তের পূর্বে আসরের নামায পড়িতে পারেন নাই। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন হে আলী! নামায পড়িয়াছ? তিনি বলিলেন, না। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেনঃ হে আল্লাহ! সে আপনার আনুগত্যাধীন ও আপনার রাসূলের আনুগত্যাধীন ছিল। অতএব তাহার জন্য সূর্যকে ফিরাইয়া দিন। আসমা (রা) বলেন, আমি সূর্যকে অস্ত যাইতে দেখিয়াছি, পুনরায় অস্ত যাওয়ার পর উহাকে উদিত হইতে এবং ভূ-পৃষ্ঠে উহার আলো পতিত হইতে দেখিয়াছি। ইহা খায়বার এলাকার আস-সাহহ্বা নামক স্থানের ঘটনা" (রূহুল মাআনী, ২৩খ, পৃ. ১৯৩)।
কিন্তু যে ব্যাখ্যার সমর্থনে এই জাতীয় হাদীছ পেশ করা হয় সেই ব্যাখ্যা হইতেও এইগুলি অধিক দুর্বল। হযরত আলী (রা)-র সহিত সংশ্লিষ্ট হাদীছ ইমাম ইব্‌ন তায়মিয়্যা ও ইবনুল জাওযী-এর মতে মওযু' (মনগড়া) এবং ইমাম আহমাদের মতে ইহার কোন ভিত্তি নাই। খন্দকের যুদ্ধকালে সূর্যের ফেরত আসা সংক্রান্ত হাদীছটিও কতক মুহাদ্দিছের মতে দুর্বল এবং কতকের মতে মওযূ' (মনগড়া)। মি'রাজের ঘটনার সহিত সংশ্লিষ্ট হাদীছটি নিম্নরূপ:
لَمَّا أُسْرِيَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَخْبَرَ قَوْمَهُ بِالرِّفْقَةِ وَالْعَلَامَةِ الَّتِي فِي الْعِبْرِ قَالُوا مَتَى يَجِيءُ قَالَ يَوْمِ الْأَرْبِعَاءِ فَلَمَّا كَانَ ذَلِكَ الْيَوْمُ أَشْرَفَتْ قُرَيْشٌ يَنْظُرُونَ وَقَدْ وَلَّى النَّهَارُ وَلَمْ يَجِيءُ فَدَعَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَزِيدَ فِي النَّهَارِ سَاعَةً وَحُبِسَتْ عَلَيْهِ الشَّمْسُ .
"মহানবী (স)-কে মি'রাজে নেওয়া হইলে এবং তিনি তাঁহার কওমকে ব্যবসায়ী কাফেলার সহিত সাক্ষাত এবং উহার লক্ষণ বর্ণনা করিলে তাহারা জিজ্ঞাসা করিল যে, উহা কখন প্রত্যাবর্তন করিবে? তিনি বলিলেন: বুধবার। ঐ দিন আগত হইলে কুরায়শগণ উচ্চস্থানে উঠিয়া কাফেলার প্রতীক্ষা করিতে লাগিল। কিন্তু দিন শেষেও উহা প্রত্যাবর্তন করে নাই। এই অবস্থায় রাসূলুল্লাহ (স) দু'আ করিলে দিনের দৈর্ঘ্য এক ঘণ্টা বাড়াইয়া দেওয়া হয় এবং সূর্যকে আটক করিয়া রাখা হয়" (রূহুল মা'আনী, ২৩খ, পৃ. ১৯৩)।
অপর একটি তাফসীর বর্ণনা করিয়াছেন আবু তালহা (রা)-র পুত্র আলী (র) ইব্‌ন আব্বাস (রা)-র সূত্রে। এক দিন অপরাহ্নে হযরত সুলায়মান (আ) আস্তাবল হইতে অশ্বপাল আনিয়া হাযির করিতে বলিলেন। উহা তাঁহার সামনে উপস্থিত করা হইলে তিনি বলিলেন, এই অশ্বপাল কেবল আমার নিজের শ্রেষ্ঠত্বের জন্য কিংবা ব্যক্তিগত কারণে প্রিয় নহে, বরং এইগুলির সাহায্যে আমি আল্লাহর পথে জিহাদ করিব। অশ্বপাল পুনরায় আস্তাবলে ফিরিয়া গেলে (কাহারও মতে ঘোড়দৌড় অনুষ্ঠানে দৃষ্টিসীমার বাহিরে চলিয়া গেলে) তিনি সেইগুলিকে পুনরায় ফেরত আনার নির্দেশ দিলেন। অশ্বপাল তাঁহার সম্মুখে উপস্থিত করা হইলে তিনি ভালোবাসার আবেগে অশ্বগুলির পদযুগল ও ঘাড় মলিয়া দিতে লাগিলেন (তাফসীরে তাবারী, ১০ম বালাম, ২৩খ, পৃ. ১০০; তাফসীরে কবীর, ২৬খ, পৃ.; মাআরিফুল কুরআন, ৭খ, পৃ. ৫১৩; তাফহীমুল কুরআন, ৪খ, পৃ. ৩৩৫, টীকা ৩৫; কাসাসুল কুরআন, ২খ, পৃ. ১১৪; আম্বিয়া-ই কুরআন, ৩খ, পৃ. ১৩৪-৫; বিদায়া, ২খ, পৃ. ২৫)। এই তাফসীর কুরআন মজীদে ব্যবহৃত শব্দাবলীর সহিত অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং এই ক্ষেত্রে সূর্যকে উহ্য মানার, আসরের নামায কাযা হওয়ার এবং স্পর্শ (মাসহ) অর্থ তরবারির আঘাতে হত্যা করার কল্পনা করার প্রয়োজন হয় না (তাফহীমুল কুরআন, পৃ. স্থা.; কাসাসুল কুরআন, পৃ. স্থা.)।
এই ব্যাখ্যার দৃষ্টিতে إِنِّي أَحْبَبْتُ حُبِّ الْخَيْرِ عَنْ ذِكْر رَبَّی -এর অর্থ হইবে ঃ "নিশ্চয় আমার মালের মহব্বত আমার প্রভুর স্মরণের অন্তর্ভুক্ত"। কারণ এই মাল তো আল্লাহর পথে জিহাদের জন্য প্রতিপালন করা হইতেছে। আর توارت بالحجاب -এর অর্থ হইবে : "এমনকি তাহা (অশ্ব) দৃষ্টিসীমার বাহিরে চলিয়া গেল” এবং وطفق مَسْحًا بالسُّوقَ وَالْأَعْنَاقِ -এর অর্থ হইবে: "অতঃপর সে উহার (অশ্বের) পদযুগল ও ঘাড় মলিয়া দিতে লাগিল"।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সুলায়মান (আ)-এর বিপদ বা পরীক্ষা

📄 সুলায়মান (আ)-এর বিপদ বা পরীক্ষা


কুরআন মজীদে বলা হইয়াছে যে, আল্লাহ্ তাআলা হযরত সুলায়মান (আ)-কে বিপদগ্রস্ত করিয়া পরীক্ষা করিয়াছিলেন। وَلَقَدْ فَتَنَّا سُلَيْمَنَ وَالْقَيْنَا عَلَى كُرْسِيَّهِ جَسَدًا ثُمَّ أَنَابَ .
"আমি তো সুলায়মানকে পরীক্ষা করিলাম এবং তাহার আসনের উপর রাখিলাম একটি ধড়। অতঃপর সে আমার অভিমুখী হইল" (৩৮: ৩৪)।
উক্ত আয়াতে কেবল পরীক্ষার কথা উল্লেখ আছে, কিন্তু কি ধরনের বা কিসের পরীক্ষা ছিল এবং 'জাসাদ' (ধড়) বলিতেই বা কি বুঝানো হইয়াছে তাহার বিস্তারিত ব্যাখ্যা অন্য কোন আয়াতেও উক্ত হয় নাই। হাদীছ শরীফেও ইহার কোন স্পষ্ট ব্যাখ্যা বিদ্যমান নাই। কুরআন মজীদের এই আয়াতটি অত্যন্ত কঠিন ও দুর্বোধ্য অর্থবোধক আয়াতসমূহের একটি। অকাট্যভাবে ইহার তাফসীর করার সন্দেহাতীত কোন উপাত্ত বিদ্যমান নাই। তাফসীরকার ও ইতিহাসবিদগণ ইহার ব্যাখ্যায় বিভিন্ন ধরনের কাহিনী বর্ণনা করিয়াছেন। কাহারও মতে হযরত সুলায়মান (আ)-এর অজ্ঞাতে তাঁহার প্রাসাদে তাঁহার এক স্ত্রী দীর্ঘ চল্লিশ দিন যাবত প্রতীমা পূজায় লিপ্ত ছিল। এ জন্য আল্লাহ্ তাআলা তাঁহার নবীর প্রতি রুষ্ট হইয়াছিলেন (তাফসীরে কবীর, ২৬খ, পৃ. ২০৮; আরও দ্র. আরাইস, পৃ. ৩৫১; কাসাসুল কুরআন, ৩ খ, পৃ. ১২২; বাইবেলেও ইহার সহিত সামঞ্জস্যপূর্ণ বিবৃতি বিদ্যমান আছে, দ্র. ১ম রাজাবলী, ১১ ১-১০)। কিন্তু ইহা আয়াতের কোন যৌক্তিক ব্যাখ্যা নহে। কারণ স্ত্রী একান্ত চুপিসারে মূর্তিপূজা করিয়া থাকিলে সেই পাপ তাহার। আল্লাহ তাআলা তাঁহার নবীকে স্বীয় অজ্ঞাত বিষয়ের জন্য শাস্তি দেন না (পূর্বোক্ত বরাত)।
কতক তাফসীরকার বলিয়াছেন যে, হযরত সুলায়মান (আ) একাধারে কয়েক দিন (বর্ণনান্তরে তিন দিন) অন্দর মহলে অবস্থান করেন এবং শাসক হওয়া সত্ত্বেও তিনি ঐ সময় কোন মজলুমের ফরিয়াদ শ্রবণ, ও উহার প্রতিকারের জন্য বাহিরে আসেন নাই। ইহাতে তাঁহার রাজ্য ক্ষমতা চলিয়া যায় এবং ঐ তিন দিন শয়তান তাঁহার সিংহাসনে উপবিষ্ট হয় এবং 'জাসাদ'-এর অর্থ এই শয়তান (তাফসীরে কবীর, ২৬খ, পৃ. ২০৮; যাদুল মাসীর, ৭খ, পৃ. ১৩৩-৪; তাহযীব তারীখ দিমাল্ক, ৬খ, পৃ. ২৬৪; আরাইস, পৃ. ৩৫১)। আবার কেহ বলিয়াছেন যে, ইহাতে তাঁহার অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন আংটি হারাইয়া যায়। ফলে উহা শয়তানের হস্তগত হয় এবং শয়তান চল্লিশ দিন ধরিয়া সুলায়মান-বেশে রাজত্ব ও অনাচার করিতে থাকে। তাহার কার্যকলাপ দেখিয়া সন্দেহ হইলে পর বানু ইসরাঈলের আলেমগণ তাহার সম্মুখে তাওরাত কিতাব পড়িতে শুরু করিলে সে ভীত-সন্ত্রস্ত হইয়া পলায়ন করিল। পথিমধ্যে আংটিটি সে ফেলিয়া দেয় অথবা তাহার হাত হইতে সমুদ্রে পড়িয়া যায়। একটি মাছ উহা গলাধঃকরণ করে। ঘটনাক্রমে মাছটি হযরত সুলায়মান (আ)-এর হস্তগত হয় এবং তিনি উহা রন্ধনের উদ্দেশ্যে কাটিতে গিয়া আংটি ফেরত পাইলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে রাজ্যও ফেরত পাইলেন (তাফসীরে কবীর, ২৬খ, পৃ. ২০৭-৮; যাদুল মাসীর, ৭খ, পৃ. ১৩৫-৮)। শয়তান কর্তৃক আংটি দখলের ঘটম্রাটি বিভিন্ন গ্রন্থে বিভিন্নরূপে বর্ণিত হইয়াছে (উদাহরণস্বরূপ দ্র. তাহযীব তারীখ দিমাশক, ৬খ, পৃ. ২৬৪-৫; আল-কামিল, ১খ, পৃ. ১৮৪-৫; আরাইস, পৃ. ৩৪৮-৫১)।
কতক তাফসীরকার বলিয়াছেন যে, হযরত সুলায়মান (আ) একটি পুত্র সন্তান লাভ করিলে শয়তানেরা তাহাকে এই ভাবিয়া হত্যা করার ষড়যন্ত্র করে যে, সে জীবিত থাকিলে ইহারা তাহার হাতেও নিগৃহিত হইতে থাকিবে। হযরত সুলায়মান (আ) এই ষড়যন্ত্রের বিষয়টি টের পাইয়া উক্ত সন্তানকে মেঘপুঞ্জের মধ্যে লুকাইয়া রাখিলেন এবং তথায় তাহার লালন-পালনের ব্যবস্থা করিলেন। তিনি এই ফেতনায় পতিত হইলেন যে, তিনি আল্লাহ্র উপর ভরসা করার পরিবর্তে মেঘমালার উপর উহার প্রতিপালনের দায়িত্ব দিলেন। তাঁহাকে ইহার শাস্তি এইভাবে দেওয়া হইল যে, ছেলেটি মৃত্যুমুখে পতিত হইয়া লাশ আকারে পিতার সিংহাসনের উপর পতিত হইল (তাফসীরে কবীর, ২৬খ, পৃ. ২০৮; যাদুল মাসীর, ৭খ, পৃ. ১৩৪-৫; আরাইস, পৃ. ৩৫১)।
• এইসব ঘটনা উল্লেখের পর ইমাম রাযী (র) সেইগুলিকে বাতিল গালগল্প আখ্যা দিয়াছেন। অনুরূপভাবে আল্লামা ইব্‌ন কাছীর (তাফসীর), ইব্‌ন হাযম (আল-ফিসাল), কাজী ইয়াদ (শিফা), বদরুদ্দীন আয়নী (উমদাতুল কারী), ইব্‌ন হিব্বান (তাফসীর) প্রমুখ ইমামগণ নিজ নিজ গ্রন্থে একই মন্তব্য করিয়াছেন (কাসাসুল কুরআন, ৩খ, পৃ. ১২৩)। ইমাম রাযী আরও বলিয়াছেন যে, শয়তানকে নবী-রাসূলগণের অবয়ব ধারণের শক্তি দান করা হয় নাই। উহাকে সেই শক্তি দেওয়া হইলে শরীআতের কোন বিষয়ের উপরই আর আস্থা রাখা যাইত না (তাফসীরে কবীর, ২৬খ, পৃ. ২০৮; আরও দ্র. তাহযীব তারীখ দিমাশক, ৬খ, পৃ. ২৬৫, ওয়া হাযা মিন আবাতীলিহি; আল-কামিল, ১খ, পৃ. ১৮২-৩, টীকা নং ১)।
কতক তাফসীরকার উপরিউক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় হযরত সুলায়মান (আ)-এর স্ত্রীসংখ্যা সংক্রান্ত হাদীছটি পেশ করিয়াছেন। কিন্তু মহানবী (স) উক্ত আয়াতের আলোচনা প্রসঙ্গে হাদীছটি বলিয়াছেন এইরূপ প্রমাণ কোথাও বিদ্যমান নাই এবং হাদীছের মূল পাঠেও এইরূপ কথা উক্ত হয় নাই যে, কুরআন মজীদে হযরত সুলায়মান (আ)-এর আসনের উপর যে “দেহ” নিক্ষিপ্ত হওয়ার কথা বলা হইয়াছে তাহা দ্বারা এই অপূর্ণাঙ্গ শিশুকেই বুঝানো হইয়াছে। তাহা ছাড়া হাদীছবেত্তাগণও তাহাদের গ্রন্থের কিতাবুত তাফসীর-এ সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যায়ও উক্ত হাদীছ উল্লেখ করেন নাই বরং অন্য হাদীছ উল্লেখ করিয়াছেন। অতএব মহানবী (স) এই হাদীছ উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যাস্বরূপ বলিয়াছেন তাহা দাবি করা যায় না (তাফহীমুল কুরআন, ৪খ, পৃ. ৩৩৭, টীকা ৩৬; মাআরিফুল কুরআন, ৭খ, পৃ. ৫১৬-৭; কাসাসুল কুরআন, ৩খ, পৃ. ১২০)।
ইমাম রাযী (র) অপর এক তাফসীরকে অগ্রাধিকার দিয়াছেন। তাহাতে বলা হইয়াছে যে, হযরত সুলায়মান (আ) কোন কঠিন ব্যাধিতে আক্রান্ত হইয়া অথবা কোন বিপদের কারণে এতদূর চিন্তান্বিত হইয়া পড়িলেন যে, তিনি শুকাইতে শুকাইতে একেবারে কংকালসার হইয়া পড়িলেন (তাফসীরে কবীর, ২৬খ, পৃ. ২০৯)। তাঁহাকে সিংহাসনে বসানো হইলে মনে হইতে যেন একটি নিষ্প্রাণ দেহ উহার উপর ফেলিয়া রাখা হইয়াছে। অতঃপর আল্লাহ তাআলা তাঁহাকে সুস্থতা দান করেন এবং তিনি আল্লাহর দিকে রুজু হইয়া তাঁহার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করিলেন ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিলন (মাআরিফুল কুরআন, ৭খ, পৃ. ৫১৭)। কিন্তু এই তাফসীরও অনুমানভিত্তিক, কুরআন মজীদের বক্তব্যের সহিত ইহার তেমন কোন সামঞ্জস্য নাই এবং কোন রিওয়ায়াত হইতেও ইহার সমর্থন পাওয়া যায় না (মাআরিফুল কুরআন, ৭খ, পৃ. ৫১৭; তাফহীমুল কুরআন, ৪খ, পৃ. ৩৩৮, টীকা ৩৬; কাসাসুল কুরআন, ৩খ, পৃ. ১২১)।
বাস্তব কথা এই যে, আলোচ্য আয়াতে যে ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করা হইয়াছে উহার নিশ্চিত বিবরণ জ্ঞাত হওয়ার কোন উপায় আমাদের নিকট নাই। পরীক্ষার কথা উল্লেখ করার আসল উদ্দেশ্য এই যে, মানুষ কোন বিপদ বা পরীক্ষায় নিক্ষিপ্ত হইলে, তাহারা যেন সুলায়মান (আ)-এর মত আল্লাহ্র দিকে আরো অধিক রুজু হয় (মাআরিফুল কুরআন, ৭খ, পৃ. ৫১৭)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সুলায়মান (আ)-এর বিশাল রাজ্য লাভের আকাঙ্খা

📄 সুলায়মান (আ)-এর বিশাল রাজ্য লাভের আকাঙ্খা


হযরত সুলায়মান (আ) আল্লাহ তাআলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করার সংগে সংগে এমন এক বিশাল রাজত্বদানের আবেদন করিয়াছিলেন, যদ্রপ রাজত্ব তাঁহার পরে অপর কেহ যেন লাভ করিতে না পারে। কুরআন মজীদের ভাষায়:
قَالَ رَبِّ اغْفِرْ لِي وَهَبْ لِي مُلْكًا لَا يَنْبَغِي لِأَحَدٍ مِّنْ بَعْدِي إِنَّكَ أَنْتَ الْوَهَّابُ .
"সে বলিল, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে ক্ষমা কর এবং আমাকে দান কর এমন এক রাজ্য যাহার অধিকারী আমি ছাড়া কেহ না হয়। তুমি তো পরম দাতা" (৩৮ : ৩৫)।
উপরিউক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায়ও তাফসীরকারগণের মতবিরোধ লক্ষ্য করা যায়। একদল বলিয়াছেন, সুলায়মান (আ) এমন একটি রাষ্ট্র প্রার্থনা করিয়াছিলেন যাহা কেহ ছিনাইয়া লইতে না পারে, যেমন ইতিপূর্বে ছিনাইয়া লওয়া হইয়াছিল (তাফসীরে তাবারী, ১০ম বালাম, ২৩ খ, পৃ. ১০২; তাফসীরে কবীর, ২৬খ, পৃ. ২১০; যাদুল মাসীর, ৭খ, পৃ. ১৩৯; তাহযীব তারীখ দিমাস্ক, ৬খ, পৃ. ২৬৬)।
কাহারও মতে তিনি একটি বিশালায়তন সাম্রাজ্য প্রার্থনা করিয়াছিলেন এবং এই মতের তাফসীরকারগণ ইহার এক বিস্তৃত এলাকার বর্ণনা দিয়াছেন যাহা ঐতিহাসিক মূল্যায়নে প্রমাণিত হয় না। বাইবেলে সুলায়মান (আ)-এর সাম্রাজ্যের সীমা সম্পর্কে বলা হইয়াছে, "আর (ফরাত) নদী অবধি পলেস্টীয়দের (ফিলিস্তিনী) দেশ ও মিসরের সীমা পর্যন্ত যাবতীয় রাজ্যের উপরে শলোমন কর্তৃত্ব করিতেন” (১ম রাজাবলী, ৪: ২১০)।
অর্থাৎ উত্তর-পূর্বে ফোরাত নদী পর্যন্ত, দক্ষিণ-পূর্বে ইয়ামন পর্যন্ত, পশ্চিমে ফিলিস্তিনীদের দেশ ও রোম সাগর, উত্তর গালীলী পর্যন্ত এবং দক্ষিণে মিসর পর্যন্ত তাঁহার রাজত্ব বিস্তৃত ছিল (আম্বিয়া-ই কুরআন, ৩খ, পৃ. ১১২)। ইব্‌ন আসাকির তাওরাত কিতাবের বরাতে বলেন যে, সুলায়মান (আ)-এর রাজত্ব ফিলিস্তীন, জর্দান ও আল-গাওর-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল এবং রাফাজ, গাযা, আসকালান, সূর, সায়দা, দিমাঙ্ক, আম্মান, বালকা, মুআব ও জাবাল আশ-শারাত কখনও তাঁহার শাসনভুক্ত ছিল না। তিনি তাওরাতের উক্ত বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করিয়া বলেন যে, ইহা তাওরাতের রচয়িতাগণের মিথ্যাচার বৈ কি (তাহযীব তারীখ দিমাল্ক, ৬খ, পৃ. ২৬৭)। উক্ত বক্তব্য বর্তমান বাইবেল হইতে খুঁজিয়া বাহির করা সম্ভব হয় নাই (নিবন্ধকার)।
বর্তমান প্রেক্ষাপটেও বিশালায়তন সাম্রাজ্য সংক্রান্ত মত গ্রহণযোগ্য নহে। কারণ বর্তমান কালেও পৃথিবীতে এমন কয়েকটি বিশালায়তন সাম্রাজ্য আছে যেইগুলির প্রতিটির আয়তন সুলায়মান (আ)-এর সাম্রাজ্যের তুলনায় অনেক বিশাল।
যুক্তিসংগত মত এবং যাহা অধিকাংশ তাফসীরকার গ্রহণ করিয়াছেন তাহা এই যে, আল্লাহ তাআলা হযরত সুলায়মান (আ)-কে মানবজাতি ছাড়াও জিন জাতি, পক্ষীকুল, এমনকি বায়ুর উপর রাজত্ব ও কর্তৃত্ব করিবার (مُلْكًا) এবং নির্বাক প্রাণীর ভাষা বুঝিবার শক্তি (عُلِّمْنَا) দান করিয়াছিলেন, অনুরূপ কর্তৃত্বলাভ আজ পর্যন্ত কাহারও পক্ষে সম্ভব হয় নাই এবং কিয়ামত পর্যন্ত হইবেও না (তাফসীরে কবীর, ২৬খ, পৃ. ২০৯; যাদুল মাসীর, ৭খ, পৃ. ১৩৮; আরাইস, পৃ. ৩১৫; বিদায়া, ২খ, পৃ. ২৮ ও ৩০; তাহযীব তারীখ দিমাশক, ৬খ, পৃ. ২৫৮; আল-কামিল, ১খ, পৃ. ১৭৫; মাআরিফুল কুরআন, ৭খ, পৃ. ৫১৮-৯)। ইমাম রাযী (র) বলেন, "ইন্নাল মুল্কা হুয়াল কুদরাহ" (মুল্ক অর্থাৎ শক্তি)। যেন সুলায়মান (আ) বলিয়াছেন, আমাকে কতগুলি জিনিসের উপর এমন নিয়ন্ত্রণশক্তি দান করুন, অবশ্যই আমি ছাড়া অপর কেহ যেন সেইগুলির উপর নিয়ন্ত্রণশক্তি লাভ করিতে না পারে, যাহাতে উহা আমার নবুওয়াত ও রিসালাতের সত্যতার দলীলস্বরূপ মু'জিযা হইতে পারে। পরবর্তী (৩৮: ৩৬-৩৮) আয়াত ('তখন আমি তাহার অধীন করিয়া দিয়াছিলাম বায়ুকে...) হইতেও উক্ত মতের সমর্থন পাওয়া যায় (তাফসীরে কবীর, ২৬খ, পৃ. ২০৯; যাদুল মাসীর, ৭খ, পৃ. ১৩৮; আরও দ্র. পূর্বোক্ত বরাতসমূহ)। মহানবী (স)-এর হাদীছ হইতেও এই মতের সমর্থন পাওয়া যায়। তিনি বলেন:
إِنَّ عِفْرِيتًا مِّنَ الْجِنِّ تَفَلَّتَ الْبَارِحَةَ لِيَقْطَعَ عَلَيَّ صَلَاتِي فَأَمْكَنَنِي اللَّهُ مِنْهُ فَأَخَذْتُ فَأَرَدْتُ أَنْ أَرْبِطَهُ عَلَى سَارِيَةٍ مِّنْ سَوَارِي الْمَسْجِدِ حَتَّى تَنْظُرُوا إِلَيْهِ كُلُّكُمْ فَذَكَرْتُ دَعْوَةَ أَخِي سُلَيْمَانَ رَبِّ هَبْ لِي مُلْكًا لَا يَنْبَغِي لِأَحَدٍ مِّنْ بَعْدِي فَرَدَدْتُهُ خَاسِئًا عِفْرِيتٌ مُتَمَرِّدٌ مِّنْ إِنْسٍ أَوْ جَانٍّ مِثْلَ زِينَةٍ جَمَاعَتُهَا الزَّبَانِيَةُ .
"একটি অবাধ্য দুষ্ট জিন্ন আমার নামায ভঙ্গ করার জন্য গত রাত্রে হঠাৎ আবির্ভূত হইল। আল্লাহ আমাকে উহাকে পাকড়াও করার ক্ষমতা দান করিলে আমি উহাকে ধরিয়া ফেলিলাম। আমি উহাকে মসজিদের একটি খুঁটির সহিত বাঁধিয়া রাখিতে মনস্থ করিলাম, যাহাতে তোমরা সকলে উহাকে দেখিতে পাও। তৎক্ষণাৎ আমার ভাই সুলায়মান (আ)-এর একটি দু'আ আমার মনে পড়িলঃ "হে আমার প্রতিপালক! আমাকে দান কর এমন এক রাজ্য যাহার অধিকারী আমি ব্যতীত আর কেহ না হয়"। অতঃপর আমি জিন্নটিকে ব্যর্থ ও বিফল করিয়া তাড়াইয়া দিলাম।"
لَمَّا فَرَغَ سُلَيْمَانُ بْنُ دَاوُدَ مِنْ بَنَاءِ بَيْتِ الْمَقْدِسِ سَأَلَ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ خِلَالًا ثَلَاثًا حُكْمًا يُصَادِفُ حُكْمُهُ وَمُلْكًا لَا يَنْبَغِي لِأَحَدٍ مِّنْ بَعْدِهِ وَأَنْ لَا يَأْتِيَ هَذَا الْمَسْجِدَ أَحَدٌ لَا يُرِيدُ إِلَّا الصَّلَاةَ فِيهِ إِلَّا خَرَجَ مِنْ ذُنُوبِهِ كَيَوْمٍ وَلَدَتْهُ أُمُّهُ فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَمَا اثْنَتَانِ فَقَدْ أُعْطِيَهُمَا وَأَرْجُو أَنْ يَكُونَ قَدْ أُعْطِيَ الثَّالِثَةَ .
"সুলায়মান ইব্‌ন দাউদ (আ) বায়তুল মাকদিসের নির্মাণ কাজ সমাপ্ত করিবার পর আল্লাহ্র নিকট তিনটি বিষয়ের দু'আ করেন: আল্লাহ্ হুকুমমত সুবিচার, এমন রাজত্ব যাহা তাঁহার পরে আর কাহাকেও দেওয়া হইবে না এবং যে ব্যক্তি বায়তুল মাকদিসে কেবল নামায পড়ার উদ্দেশ্যে আগমন করিবে তাহার গুনাহ যেন তাহার মধ্য হইতে বাহির হইয়া যায় তাহার মাতা তাহাকে প্রসব করার দিনের মত। মহানবী (স) বলেন: প্রথম দুইটি তাঁহাকে দান করা হইয়াছে এবং আমি আশা করি যে, তৃতীয়টিও তাঁহাকে দান করা হইবে" (ইবন মাজা, ইকামাতুস সালাত, বাব মা জাআ ফিস-সালাত ফী মাসজিদ বায়তিল মাকদিস, ১খ, পৃ. ১০১; নাসাঈ, কিতাবুল মাসাজিদ, বাবুল মাসজিদিল আকসা ওয়াস-সালাত ফীহি, ১খ, পৃ.)। অতএব এই শেষোক্ত ব্যাখ্যাই যুক্তিগ্রাহ্য।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00