📄 তামার প্রস্রবণ
হযরত দাউদ (আ)-এর জন্য যেমন লৌহকে মোলায়েম ও নমনীয় করিয়া দেওয়া হইয়াছিল (দ্র. ৩৪ : ১০), অদ্রূপ হযরত সুলায়মান (আ)-এর জন্য তাম্রের প্রস্রবণ প্রবাহিত করা হইয়াছিল। তিনি প্রয়োজনমত ইহা দালান-কোঠা, দুর্গাদি, নৌযান ইত্যাদি নির্মাণ কাজে ব্যবহার করিতেন। এই সম্পর্কে কুরআন মজীদে বলা হইয়াছে:
وَأَسَلْنَا لَهُ عَيْنَ القطر . "আমি তাহার জন্য গলিত তামের এক প্রস্রবণ প্রবাহিত করিয়াছিলাম” (৩৪ : ১২)।
কতক তাফসীরকার বলেন যে, আল্লাহ তাআলা ইয়ামানে গলিত তামার একটি প্রস্রবণ প্রবাহিত করিয়া উহা হযরত সুলায়মান (আ)-এর নিয়ন্ত্রণাধীন করিয়া দিয়াছিলেন (মাওদিহুল কুরআন-এর বরাতে আম্বিয়া-ই কুরআন, ৩খ, পৃ. ১০৫)। কতক মুফাসসির বলেন যে, আল্লাহ তাআলা হযরত সুলায়মান (আ)-এর প্রয়োজন মাফিক তাম্রকে গলাইয়া দিতেন এবং ইহা ছিল আল্লাহ প্রদত্ত তাঁহার এক মু'জিযা (কাসাসুল কুরআন, ২খ, পৃ. ১১১)। আবদুল ওয়াহ্হাব আন-নাজ্জার বলেন, ভূগর্ভস্থ উত্তপ্ত উপাদানের কারণে যে স্তরে তাম্র বিগলিত অবস্থায় থাকে, আল্লাহ তাআলা হযরত সুলায়মান (আ)-কে উহার সন্ধান দিয়াছিলেন। তৎপূর্বে কেহই এই সম্পর্কে অবহিত ছিল না (কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৩৯৩)। ইন্ন কাছীর (র) হযরত কাতাদা (র)-এর বরাতে বলেন যে, গলিত তাম্রের এই প্রস্রবণ ইয়ামানে অবস্থিত ছিল, যাহা আল্লাহ তাআলা হযরত সুলায়মান (আ)-এর জন্য উন্মুক্ত করিয়াছিলেন (বিদায়া, ২খ, পৃ. ২৮)। সুদ্দী (র) বলেন, তিনি ইহা নির্মাণ ইত্যাদি কর্মে ব্যবহার করিতেন (ঐ, পৃ. ২৮)। প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্যের ফলে আকাবা উপসাগরের তীরে ঈলাত (বর্তমান আকাবা)-এর পশ্চিমে প্রায় পঁচিশ বর্গমাইল এলাকা জুড়িয়া তাম্র খনির প্রাচীন নিদর্শন আবিস্কৃত হইয়াছে, যাহা হইতে সুলায়মান (আ)-এর যুগে তাম্র উত্তোলন করা হইতে (আম্বিয়া-ই কুরআন, ৩খ, পৃ. ১০৬, টীকা ১)।
📄 সামুদ্রিক নৌবহর
হযরত সুলায়মান (আ)-ই প্রথম ইসরাঈলী শাসক যিনি সামুদ্রিক নৌবহর গঠনের বিষয়ে চিন্তাভাবনা করিয়াছিলেন। তিনি ইসিয়ূন জাবির নামক স্থানে এক বিরাট নৌবহর গঠন করেন। সূর (লেবানন)-এর শাসক ১ম হীরাম (দাউদ ও সুলায়মান (আ)-এর মিত্র)-এর অভিজ্ঞ ও সচেতন নাবিকগণ ঐ নৌবহরের পরিচালক ছিল। এই সম্পর্কে বাইবেলে বিবৃত আছে: "আর শলোমন রাজা ইদোম দেশে সূফসাগরের তীরস্থ এলতের নিকটবর্তী ইৎসিয়োন-গেবরে কতকগুলি জাহাজ নির্মাণ করিলেন। পরে হীরম শলোমনের দাসদের সহিত সামুদ্রিক কার্যে নিপুণ আপন দাসদিগকে সেই সকল জাহাজে প্রেরণ করিলেন। তাহা ও ফীরে গিয়া তথা হইতে চারি শত বিশ তালন্ত স্বর্ণ লইয়া শলোমন রাজার নিকটে আনিল" ১ম রাজাবলী, ৯: ২৬-২৮)। হযরত সুলায়মান (আ) তাঁহার শাসনামলে ব্যাপক আকারে সমুদ্রপথে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করেন। তাঁহার নৌবহর একদিকে ইসিয়ূন জাবির হইতে লোহিত সাগরস্থ ইয়ামানে এবং দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলীয় দেশসমূহে যাতায়াত করিত, অপরদিকে রোম সাগরস্থ বন্দর হইতে পশ্চিম অঞ্চলের দেশসমূহে যাতায়াত করিত (তাফহীমুল কুরআন, ৩য় খণ্ড, পৃ. ১৭৬, টীকা ৭৪)।
📄 সামরিক বাহিনী
আল্লাহ তাআলা হযরত সুলায়মান (আ)-কে মানবজাতি, জিন্ন জাতি ও বিহঙ্গকূলের সমন্বয়ে গঠিত একটি অত্যন্ত শক্তিশালী, দক্ষ ও প্রভাব-প্রতিপত্তিশালী সামরিক বাহিনী দান করিয়াছিলেন। কুরআন মজীদে বলা হইয়াছে:
وَحُشِرَ لِسُلَيْمَنَ جُنُودُهُ مِنَ الْجِنَّ وَالْإِنْسِ وَالطَّيْرِ فَهُمْ يُوزَعُونَ .
"সুলায়মানের সম্মুখে সমবেত করা হইল তাহার বাহিনীকে- জিন্ন, মানুষ ও বিহঙ্গকুলকে এবং উহাদিগকে বিন্যস্ত করা হইল বিভিন্ন ব্যুহে” (২৭:১৭)।
হযরত সুলায়মান (আ) যখন কোন অভিযানে যাত্রা করিতেন, তখন জিন্ন, মানুষ ও বিহঙ্গকুল, এই তিন বাহিনী হইতে প্রয়োজন মাফিক সৈন্য সঙ্গে লইতেন (তাফসীরে উছমানী, পৃ. ৫০৪, টীকা ১)। ইহাদের মধ্যে বিহঙ্গকুল পাখা বিস্তার করিয়া মনুষ্য বাহিনীকে ছায়া দান করিত (বিদায়া, ২খ, পৃ. ১৯) এবং জিন্ন বাহিনীকে বিভিন্ন ধরনের শ্রমসাধ্য কর্মে নিয়োগ করা হইত, যাহা কুরআন মজীদের বিভিন্ন আয়াত দ্বারা প্রমাণিত। কতক ডুবুরির কাজ করিত (২১: ৮২); কতক অন্যান্য কাজ করিত (৩৪: ১২), কতক প্রাসাদ, ভাস্কর্য ও চৌবাচ্চা সদৃশ্য রন্ধনপাত্র নির্মাণ করিত।
وَمِنَ الْجِنَّ مَنْ يَعْمَلُ بَيْنَ يَدَيْهِ بِاذْنِ رَبِّهِ وَمَنْ يُزِغْ مِنْهُمْ عَنْ أَمْرِنَا نُذِقْهُ مِنْ عَذَابِ السَّعِيرِ . يَعْمَلُونَ لَهُ مَا يَشَاءُ مِنْ مَحَارِيْبَ وَتَمَاثِيلَ وَجِفَانٍ كَالْجَوَابِ وَقُدُورٍ رَسِيت .
"তাহার প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে জিন্নদের কতক তাহার সম্মুখে কাজ করিত। উহাদের মধ্যে যে আমার নির্দেশ অমান্য করে তাহাকে আমি অগ্নি-শাস্তি আস্বাদন করাইব। উহারা সুলায়মানের ইচ্ছানুযায়ী প্রাসাদ, ভাস্কর্য, হাওয সদৃশ বৃহদাকার পাত্র এবং সুদৃঢ়ভাবে স্থাপিত ডেগ নির্মাণ করিত" (৩৪: ১২-১৩)।
والشَّيْطَينَ كُلِّ بَنَّا ، وَغَواصِ وَآخَرِيْنَ مُقَرَّنِينَ فِي الْأَصْفَادِ .
“এবং শয়তানদিগকেও (তাহার অধীন করিয়াছিলাম), যাহারা সকলেই ছিল প্রাসাদ নির্মাণকারী ও ডুবুরী এবং শৃঙ্খলে আবদ্ধ আরও অনেককে” (৩৮: ৩৭-৩৮; আরও দ্র. বিদায়া, ২খ, পৃ. ২৮)।
কোন কোন তাফসীরকার ও ঐতিহাসিক হযরত সুলায়মান (আ)-এর সৈন্যসংখ্যার কল্পনাতীত প্রাচুর্য প্রদর্শন করিয়াছেন, যাহার কোন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নাই। বাইবেলে তাঁহার সেনাবাহিনীর একটি পরিসংখ্যান বিদ্যমান। "শলোমনের রথের নিমিত্ত চল্লিশ সহস্র অশ্বশালা ও বারো সহস্র অশ্বরোহী ছিল” (১ম রাজাবলী, ৪: ২৬-২৭)। "আর শলোমন অনেক রথ ও অশ্বারোহী সংগ্রহ করিলেন; তাঁহার এক সহস্র চারি শত রথ ও বারো সহস্র অশ্বারোহী ছিল” (১ম রাজাবলী, ১০ঃ ২৬)।
📄 সুলায়মান (আ) সম্পর্কে অলীক কাহিনী
আল্লাহ তাআলা হযরত সুলায়মান (আ)-কে মু'জিযাস্বরূপ বেশ কিছু অতি প্রাকৃতিক ক্ষমতা দান করিয়াছিলেন। যেমন অজড়দেহী জিন্ন জাতির উপর তাঁহার কর্তৃত্ব, পিপীলিকা ও পশু-পাখির ভাষা অনুধাবনশক্তি, বায়ুর উপর নিয়ন্ত্রণলাভ, মুহূর্তকালের মধ্যে সাবার রাণীর সিংহাসন আনয়ন ইত্যাদি, যে সম্পর্কে কুরআন মজীদেই প্রমাণ বিদ্যমান। তাঁহার সম্পর্কে প্রসিদ্ধ একটি রূপকথা এই যে, তাঁহার একটি অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন আংটি ছিল যাহা তাঁহাকে ঊর্ধ্ব জগত হইতে প্রদান করা হইয়াছিল। চারি কোণবিশিষ্ট উক্ত আংটির এক কোণে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু, মুহাম্মাদ আবদুহু ওয়া রাসূলুহু", দ্বিতীয় কোণে
اللهم مالك الملك تؤتى الملك من تشاء وتنزع الملك ممن تشاء وتعز من تشاء وتذل من تشاء تباركت .
تباركت الهى لا شريك لك كل شيئ هالك الا وجهه দ্বিতীয় কোণে বর্ণিত ছিল। তিনি উহা পরিধান করামাত্র তাঁহার নিকট মানব, দানব (জিন্ন), খেচর, শয়তান, বায়ু, মেঘমালা ইত্যাদি আসিয়া সমবেত হইত এবং তিনি ইহার সাহায্যে শাসনকার্য চালাইতেন (তাহযীব তারীখ দিমাশক্, ৬খ, পৃ. ২৬৫; আরও দ্র. আরাইস, পৃ. ৩৪৮)। হাদীছ শরীফে তাঁহার আংটির উল্লেখ থাকিলেও উহার কোন অলৌকিক শক্তির উল্লেখ নাই। মহানবী (স) বলেন:
تَخْرُجُ الدَّابَّةٌ وَمَعَهَا خَاتِمُ سُلَيْمَانَ بْنِ دَاوُدَ .... وَتَخْتِمُ أَنْفَ الْكَافِرِ بِالْخَاتِمِ..
"একটি পশু ভূগর্ভ থেকে আবির্ভূত হইবে এবং উহার সহিত থাকিবে দাউদ (আ)-এর পুত্র সুলায়মান (আ)-এর আংটি... পশুটি উহা দ্বারা কাফের ব্যক্তির নাকে চিহ্ন অংকন করিবে... (ইবন মাজা, ফিতান, বাব দাব্বাতুল আরদ, ২খ, পৃ. ২৯৫)।
তাঁহার সম্পর্কে এই জাতীয় অলীক কাহিনীর প্রমাণ হাদীছ শরীফ হইতেও পাওয়া যায়। উম্মুল মু'মিনীন হযরত আইশা (রা) বলেন:
قَدِمَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ غَزْوَةِ تَبُوكَ أَوْ خَيْبَرَ وَفِي سَهْوَتِهَا سِتْرٌ فَهَبَّتِ الرِّيحُ فَكَشَفَتْ نَاحِيَةَ السَّتْرِ عَنْ بَنَاتِ لِعَائِشَةَ لُعْبٌ فَقَالَ مَا هَذَا يَا عَائِشَةُ قَالَتْ بَنَاتِي وَرَأَى بَيْنَهُنَّ فَرَسًا لَهُ جَنَحَانِ مِنْ رِقَاعِ فَقَالَ مَا هَذَا الَّذِي أَرَى وَسَطَهُنَّ قَالَتْ فَرَسٌ قَالَ وَمَا هَذَا الَّذِي عَلَيْهِ قُلْتُ جَنَاحَانِ قَالَ فَرَسٌ لَهُ جَنَاحَانِ قَالَتْ أَمَا سَمِعْتَ أَنَّ لِسُلَيْمَانَ خَيْلًا لَهَا أَجْنِحَةٌ قَالَتْ فَضَحِكَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حَتَّى رَأَيْتُ نَوَاجِذَهُ .
"রাসূলুল্লাহ (স) তাবুক অথবা খায়বার-এর যুদ্ধ শেষে ফিরিয়া আসিলেন। আমার হুজরার তাকে (বা দেয়ালের গর্তে) পর্দা ঝুলান ছিল। বায়ু প্রবাহিত হইলে কাপড়ের তৈরী আমার খেলনা পুতুলগুলি হইতে পর্দা অপসারিত হইয়া গেল। তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, আইশা! ইহা কি? তিনি বলেন, আমার পুতুল। তিনি ঐগুলির মধ্যখানে কাপড়ের দুই পাখাবিশিষ্ট একটি ঘোড়ার পুতুল দেখিতে পাইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, এইগুলির মধ্যখানে যাহা দেখিতেছি তাহা কি? তিনি বলেন, একটি ঘোড়া। তিনি পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলেন, উহার উপর ইহা কি? আমি বলিলাম, দুইটি পাখা। তিনি বলিলেন, দুই পাখাবিশিষ্ট ঘোড়া! আমি বলিলাম, আপনি কি শুনেন নাই যে, সুলায়মান (আ)-এর কয়েকটি পক্ষবিশিষ্ট একটি ঘোড়া ছিল? আইশা (রা) বলেন, (আমার কথায়) রাসূলুল্লাহ (স) এমন হাসি দিলেন যে, আমি তাঁহার সামনের পাটির দাঁত দেখিতে পাইলাম” (আবূ দাউদ, কিতাবুল আদাব, বাব ফিল-লাআব বিল-বানাত, ২খ.)।
তাঁহার সম্পর্কে যুগ যুগ ধরিয়া যে অযাচিত পরিমাণ রূপকথা ও উপাখ্যান রচিত হইয়াছে বা প্রচলিত আছে, মনে হয় পৃথিবীর আর কোনও ব্যক্তি সম্পর্কে, বিশেষত কোনও নবী সম্পর্কে, এত অধিক উপাখ্যান রচিত হয় নাই।