📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হুদহুদ পাখির সহিত কথোপকথন

📄 হুদহুদ পাখির সহিত কথোপকথন


হযরত সুলায়মান (আ) তাঁহার সেনাবাহিনীসহ পিঁপড়া অধ্যুষিত এলাকা অতিক্রম করার পর নিজ সৈন্যগণের হিসাব নিলেন এবং পক্ষীবাহিনীর মধ্যে হুদহুদ পাখিকে উপস্থিত না পাইয়া অসন্তুষ্ট হইলেন। অবিলম্বে হুদহুদ আসিয়া উপস্থিত হইল এবং সুলায়মান (আ)-কে সাবা রাজ্যের রাণী ও সাবা জাতির ধর্ম সম্পর্কে অবহিত করিল। কুরআন মজীদে মহান নবী সুলায়মান (আ) ও হুদহুদের মধ্যকার মতবিনিময় নিম্নোক্তভাবে উক্ত হইয়াছে:
وَتَفَقَّدَ الطَّيْرَ فَقَالَ مَالِي لَا أَرَى الْهُدْهُدَ أَمْ كَانَ مِنَ الْغَائِبِينَ . لَأُعَذِّبَنَّهُ عَذَابًا شَدِيدًا أَوْ لَأَذْبَحَنَّهُ أَوْ ليَأْتِيَنَّى بِسُلْطَنٍ مُّبِينٍ ، فَمَكَثَ غَيْرَ بَعِيدٍ فَقَالَ أَحَطُّ بِمَا لَمْ تُحِطْ بِهِ وَجِئْتُكَ مِنْ سَبَا بِنَبَا يَقِينِ . إِنِّي وَجَدْتُ امْرَأَةً تَمْلِكُهُمْ وَأُوتِيَتْ مِنْ كُلِّ شَيْءٍ وَلَهَا عَرْشَ عَظِيمٌ . وَجَدتُهَا وَقَوْمَهَا يَسْجُدُونَ لِلشَّمْسِ مِنْ دُونِ اللَّهِ وَزَيَّنَ لَهُمُ الشَّيْطَنُ أَعْمَالَهُمْ فَصَدَّهُمْ عَنِ السَّبِيلِ فَهُمْ لَا يَهْتَدُونَ ..... قَالَ سَنَنْظُرُ أَصَدِّقْتَ أَمْ كُنْتَ مِنَ الْكَذِبِينَ ، إِذْهَبْ بِكِتَبِى هُذَا فَالْقِهُ إِلَيْهِمْ ثُمَّ تَوَلَّ عَنْهُمْ فَانْظُرْ مَا ذَا يَرْجِعُونَ . قَالَتْ يَأَيُّهَا الْمَلَأُ إِنِّي أُلْقِيَ إلى كتب كريم .
"সুলায়মান বিহঙ্গদলের সন্ধান লইল এবং বলিল, ব্যাপার কি, আমি হুদহুদকে দেখিতেছি না যে! সে অনুপস্থিত না কি? সে উপযুক্ত কারণ দর্শাইতে না পারিলে আমি অবশ্যই উহাকে কঠিন শাস্তি দিব অথবা যবাহ করিব। অনতিবিলম্বে হুদহুদ আসিয়া পড়িল এবং বলিল, আপনি যাহা অবগত নহেন আমি তাহা অবগত হইয়াছি এবং সাবা হইতে সুনিশ্চিত সংবাদ লইয়া আসিয়াছি। আমি তো এক নারীকে দেখিলাম উহাদের উপর রাজত্ব করিতেছে। তাহাকে দেওয়া হইয়াছে সকল কিছু হইতেই এবং তাহার আছে এক বিরাট সিংহাসন। আমি তাহাকে ও তাহার সম্প্রদায়কে দেখিলাম যে, তাহারা আল্লাহ্র পরিবর্তে সূর্যকে সিজদা করিতেছে। শয়তান উহাদের কার্যাবলী উহাদের নিকট শোভন করিয়াছে এবং উহাদেরকে সৎপথ হইতে নিবৃত্ত করিয়াছে, ফলে উহারা সৎপথ পায় না; নিবৃত্ত করিয়াছে এইজন্য যে, উহারা যেন আল্লাহকে সিজদা না করে যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর লুক্কায়িত বস্তুকে প্রকাশ করেন, যিনি জানেন- যাহা তোমরা গোপন কর এবং যাহা তোমরা ব্যক্ত কর। আল্লাহ, তিনি ব্যতীত কোন ইলাহ নাই, তিনি মহাআরশের অধিপতি। সুলায়মান বলিল, আমি দেখিব তুমি কি সত্য বলিয়াছ, না তুমি মিথ্যাবাদী? তুমি আমার এই পত্র লইয়া যাও এবং ইহা তাহাদের নিকট অর্পণ কর; অতঃপর তাহাদের নিকট হইতে সরিয়া থাকিও এবং লক্ষ্য করিও তাহাদের প্রতিক্রিয়া কী? সেই নারী বলিল, হে পারিষদবর্গ! আমায় এক সম্মানিত পত্র দেওয়া হইয়াছে। ইহা সুলায়মানের নিকট হইতে" (২৭: ২০-৩০)।
পত্রাবলী প্রেরণের জন্য ইহা ছিল সর্বপ্রাচীন মাধ্যম। তৎকালে কবুতর ইত্যাদির সাহায্যে পত্রের আদান-প্রদান করা হইত। হযরত সুলায়মান (আ) কবুতরের পরিবর্তে হুদহুদ পাখিকে পত্র বিনিময় ও তথ্য সংগ্রহের কাজে ব্যবহার করিয়াছিলেন। হুদহুদ সাবা রাজ্যে পৌছিয়া উহার রাণী ও জনগণ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করিয়া আনিয়াছিল। অতঃপর সুলায়মান (আ) তাঁহার পত্রসহ উহাকে সাবার রাণীর নিকট প্রেরণ করিয়াছিলেন। সে তথায় পৌঁছিয়া রাণীর ক্রোড়ে পত্রটি ফেলিয়া দিয়া ফিরিয়া আসে। রাণী সুলায়মান (আ)-এর নাম ও তাঁহার প্রতিপত্তি সম্পর্কে জ্ঞাত ছিলেন। তিনি পত্রখানি পাঠে পরিস্থিতির মূল্যায়ন করিতে পারিয়াছিলেন এবং তাই উহা সম্পর্কে আলোচনার জন্য শাসক পরিষদের পরামর্শ সভা ডাকাইয়াছিলেন (আম্বিয়া-ই-কুরআন, ৩খ, পৃ. ১২৪; আনওয়ারে আম্বিয়া, পৃ. ১২০-২১; বিদায়া, ২খ, পৃ. ২০; আল-কামিল, ১খ, পৃ. ১৭৯)।
সাবার রাণী ও তাঁহার রাজত্ব সম্পর্কে হুদহুদ পাখির তথ্য অবগত হওয়া সম্পর্কে কোন কোন ইতিহাসবিদ বলিয়াছেন যে, সুলায়মান (আ)-এর হুদহুদ পাখি সাবার রাণীর উদ্যানে প্রবেশ করিয়া তথাকার একটি হুদহুদের সাক্ষাত পায়। সেই পাখিটি সুলায়মান (আ)-এর হুদহুদের নিকট রাণীর রাজত্ব, তাঁহার জৌলুসময় সিংহাসন, তাঁহার প্রভাব-প্রতিপত্তি এবং এখানকার জনগণের ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে বর্ণনা করে। হুদহুদ ফিরিয়া আসিয়া তাহাই নবী সুলায়মান (আ)-এর নিকট বর্ণনা করে (আল-কামিল, ১খ, পৃ. ১৭৯; আরাইস, পৃ. ৩৩৫-৬)। কোন কোন তাফসীরকার ও ঐতিহাসিক বলিয়াছেন যে, মরুভূমিতে ভূতলে পানির অনুসন্ধানই ছিল হুদহুদের প্রধান দায়িত্ব (বিদায়া, ২খ, পৃ. ২১; আল-কামিল, ১খ, পৃ. ১৭৯; আরাইস, পৃ. ৩৩৫)। হযরত সুলায়মান (আ) নামাযের উযূ করার জন্য পানি না পাইয়া হুদহুদের অনুসন্ধান করিলেন এবং উহাকে অনুপস্থিত পাইলেন। হুদহুদকে অনুসন্ধানের নানারূপ কারণ উল্লিখিত আছে (আরাইস, পৃ. ৩৩৫; আল-কামিল, ১খ, পৃ. ১৭৯)।
কুরআন মজীদে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে, হযরত সুলায়মান (আ)-এর পত্রবাহক 'হুদহুদ' ছিল একটি পাখি। মহানবী (স)-এর বাণীতেও হুদহুদ পাখি হিসাবে আখ্যায়িত (উদাহরণস্বরূপ দ্র. ইবন মাজা, কিতাবুস সায়দ, বাব মা ইয়ুনহা আন কাতলিহা; ২খ., পৃ. ২৩২; আবূ দাউদ, কিতাবুস সালাম, বাব ফী কাতলিয যাররি; দারিমী, কিতাবুল আদাহী, বাবুন নাহয়ি আন কাতলিদ দাফাদিই ওয়ান-নাহ্লাহ্; মুসনাদে আহমাদ, ১খ, পৃ. ৩৩২, ৩৪৮)। কিন্তু একদল লোক হুদহুদ একটি মানুষের নাম হিসাবে আখ্যায়িত করিতে চাহে। কারণ পাখি যে ঐভাবে তথ্য সংগ্রহ করিয়া 'আসিয়া' মানুষের নিকট বর্ণনা করিতে পারে এবং তাহা মানুষ বুঝিতে পারে, ইহা তাহাদের বোধগম্যের অতীত। তাহারা বলে যে, হুদহুদ নামে একটি মানুষ সুলায়মান (আ)-এর সোনাবাহিনীর সদস্য ছিল। সে-ই সাবার রাণীর তথ্য সংগ্রহ করিয়া আনে।
কিন্তু ইহা একটি মনগড়া ব্যাখ্যা এবং কুরআন মজীদের তাৎপর্যগত বিকৃতি। কারণ আয়াতের শুরুই হইয়াছে 'পাখির উল্লেখ করিয়া: "ওয়া তাফাক্কাদাত তায়র" (তিনি বিহঙ্গকুলের সন্ধান লইলেন), পরেই বলা হইয়াছে হুদহুদের কথা। ইহার একটু আগে বলা হইয়াছে : "সুলায়মানের সম্মুখে সমবেত করা হইল তাহার বাহিনীকে, জিন্ন, মানুষ ও বিহঙ্গকূলকে" (২৭: ১৭)। আরবী ভাষায় ঐ তিন জাতির যে প্রতিশব্দ (জিন্ন, ইন্‌স, তায়র) আছে, এখানে তাহাই ব্যবহার করা হইয়াছে। ইহা রূপক অর্থে ব্যবহৃত হওয়ার কোন লক্ষণও এখানে বিদ্যমান নাই। তাই শব্দত্রয়ের কল্পিত অর্থ গ্রহণের কোন অবকাশ নাই। অনন্তর জিন্ন জাতি যে হযরত সুলায়মান (আ)-এর সৈন্যবাহিনীর অন্তর্ভুক্ত ছিল তাহা বাইবেলে উল্লেখ না থাকিলেও, ইয়াহুদীদের তালমূদ গ্রন্থে এবং তাহাদের রিব্বীদের বর্ণনায় উহার বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায় (জিউইশ ইনসাইক্লোপেডিয়া, ১১খ, পৃ. ৪৪০-এর বরাতে তাফহীমুল কুরআন, ৩খ, পৃ. ৫৬২, টীকা ২৩; উক্ত বিষয়ের আলোচনার জন্য দ্র. পৃ. ৫৬৬-৮, টীকা ২৮; কাসাসুল কুরআন, ২খ, পৃ. ১৪০-৪৩)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 তিনটি বিষয়ের ব্যাখ্যা

📄 তিনটি বিষয়ের ব্যাখ্যা


(১) হুদহুদ পাখি সাবা হইতে ফিরিয়া আসিয়া সুলায়মান (আ)-কে বলিল, "আপনি যাহা অবগত নহেন আমি তাহা অবগত হইয়াছি" (২৭ঃ ২২)। এখানে লক্ষ্য করা যায় যে, সুলায়মান (আ) যে সম্পর্কে অবগত নহেন সেই সম্পর্কে একটি পাখি অবগত হইয়াছে। ইহার উত্তরে বলা যায়, সারা পৃথিবী সম্পর্কে সুলায়মান (আ)-এর জ্ঞান থাকা জরুরী ছিল না, তাঁহার যতটুকু জ্ঞানের প্রয়োজন, আল্লাহ তাঁহাকে ততটুকুই দান করিয়াছিলেন। এখানে বিষয়টি হযরত মূসা (আ) ও খিযির (আ)-এর সহিত তুলনীয় (তাফসীরে কবীর। পৃ.)।
সুলায়মান (আ) সম্পর্কে বলা হইয়াছেঃ "আমাকে সকল কিছু দেওয়া হইয়াছে" (২৭:১৬)। আবার হুদহুদ পাখি সাবার রাণী সম্পর্কে বলিল, "তাহাকে সকল কিছু দেওয়া হইয়াছে" (২৭ঃ ২৩)। একদিকে একজন মহান নবী ও পরাক্রমশালী শাসক এবং অপরদিকে একজন মুশরিক শাসক সম্পর্কে একই কথা বলা হইয়াছে। এই সম্পর্কে ইমাম রাযী (র) বলেন, সুলায়মান (আ)-কে নবুওয়াত, নবুওয়াতী প্রজ্ঞা এবং রাজকার্য পরিচালনার পার্থিব শক্তি দান করা হইয়াছে। অপরদিকে সাবার রাণীকে শুধু পার্থিব শক্তি দান করা হইয়াছে। একজনকে ইহ-জাগতিক ও অতি-প্রাকৃতিক উভয় শক্তি দান করা হইয়াছে এবং অপরজনকে শুধু ইহ-জাগতিক শক্তি দান করা হইয়াছে।
(৩) হুদহুদ সাবার রাণীর সিংহাসন সম্পর্কে বলিল, وَلَهَا عَرْسٌ عَظِيمٌ "তাহার আছে এক বিরাট সিংহাসন" (২৭ঃ ২৩)। অপরদিকে আল্লাহ তাআলার আরশ সম্পর্কে বলা হইয়াছে: وَهُوَ رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ “এবং তিনি মহান আরশের অধিপতি” (৪০: ১৫; আরও দ্র. ২০:৮৬; ২৭ : ২৬)। দুই স্থানেই "আরশ আজীম" ব্যবহৃত হইয়াছে। ইমাম রাযী বলেন, আল্লাহ্র আরশ যদি শাব্দিক অর্থে তাঁহার সিংহাসন হইয়া থাকে, তবে বলা যায় যে, সমকালীন পার্থিব রাজা- বাদশাহগণের সিংহাসনের তুলনায় সাবার রাণীর সিংহাসন ছিল অতুলনীয়। কিন্তু তাহা আল্লাহ্ত্র সিংহাসনের তুলনায় কিছুই নহে। তিনি যেন গোটা বিশ্বলোকের মহান স্রষ্টা, তাঁহার সিংহাসনও অদ্রুপ মহান ও গৌরবময় (তাফসীরে কবীর)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বায়ুর উপর কর্তৃত্ব

📄 বায়ুর উপর কর্তৃত্ব


আল্লাহ তাআলা হযরত সুলায়মান (আ)-কে বায়ুকে নিজ প্রয়োজন মাফিক ব্যবহার করার মু'জিযা দান করিয়াছিলেন। তিনি যখনই চাহিতেন বায়ুর সাহায্যে দিনের প্রথম প্রহরে এক মাসের দূরত্ব এবং শেষ প্রহরে এক মাসের দূরত্ব স্বল্প সময়ের মধ্যে অতিক্রম করিতেন। কুরআন মজীদে এই সম্পর্কে তিনটি কথা বলা হইয়াছেঃ (১) বায়ুকে সুলায়মান (আ)-এর নিয়ন্ত্রণাধীন করা হইয়াছিল; (২) বায়ু তাঁহার নির্দেশের এতই অনুগত ছিল যে, উহা বেগবান ও দ্রুত গতিসম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও তাঁহার নির্দেশে মোলায়েম ও মৃদু গতিসম্পন্ন হওয়ায় আরামদায়ক হইত; (৩) মৃদু গতিসম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও হযরত সুলায়মান (আ) দিনের প্রথম প্রহরে ও অপরাহ্নে পৃথকভাবে এক এক মাসের পথ অতিক্রম করিতেন যেন তাহা বর্তমান কালের উড়োজাহাজের মত দ্রুতগতিসম্পন্ন ছিল, অথচ তাহাতে শক্তিউৎপাদক কোন যন্ত্রপাতি ছিল না, আল্লাহ্ হুকুমেই তাহা শূন্যে উড্ডয়ন করিত (কাসাসুল কুরআন, ২খ, পৃ. ১০৪-৫; আম্বিয়া-ই কুরআন, ৩খ, পৃ. ১০৩; আনওয়ারে আম্বিয়া, পৃ. ১১৪-৫)। কুরআন মজীদে বলা হইয়াছে:
وَلِسُلَيْمَنَ الرِّيْحَ عَاصِفَةً تَجْرِي بِأَمْرِهِ إِلَى الْأَرْضِ الَّتِي بَارَكْنَا فِيهَا وَكُنَّا بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِمِينَ .
"এবং সুলায়মানের বশীভূত করিয়া দিয়াছিলাম উদ্দাম বায়ুকে, উহা তাহার আদেশক্রমে প্রবাহিত হইত সেই দেশের দিকে যেখানে আমি কল্যাণ রাখিয়াছি। প্রত্যেক বিষয় সম্পর্কে আমিই সম্যক অবগত” (২১:৮১)।
وَلسُلَيْمَنَ الرِّيحَ غُدُوهَا شَهْرٌ وَرَوَاحُهَا شَهْرٌ .
"আমি সুলায়মানের অধীন করিয়াছিলাম বায়ুকে যাহা প্রভাতে এক মাসের পথ এবং সন্ধ্যায় এক মাসের পথ অতিক্রম করিত” (৩৪: ১২)।
فَسَخَّرْنَا لَهُ الرِّيْحَ تَجْرِي بِأَمْرِهِ رُخَاءً حَيْثُ أَصَابَ .
"অতএব আমি তাহার অধীন করিয়া দিলাম বায়ুকে, যাহা তাহার আদেশে, সে যেখানে ইচ্ছা করিত সেথায় মৃদুমন্দভাবে প্রবাহিত হইত” (৩৮: ৩৬)।
হাসান বসরী (র) বলেন যে, হযরত সুলায়মান (আ) ভোরে দামিশক হইতে যাত্রা করিয়া এক মাসের পথের দূরত্বে ইসতাখর পৌঁছিয়া সকালের নাশতা করিতেন এবং বিকালে ইসতাখর হইতে যাত্রা করিয়া এক মাসের পথের দূরত্বে কাবুল পৌঁছিয়া তথায় রাত্রিযাপন করিতেন (বিদায়া, ২খ, পৃ. ২৭)।
নবী-রাসূলগণকে আল্লাহ তাআলার পক্ষ হইতে প্রদত্ত মু'জিযাসমূহ অতি-প্রাকৃতিক ধরনের, যাহা জড়বুদ্ধির আয়ত্বের বাহিরে। আজকাল বিজ্ঞানের বদৌলতে ইহার কিছু কিছু অনুধাবন করা সহজতর হইতেছে। মানুষ এই বাতাসের শক্তি কাজে লাগাইয়া আকাশযান চালাইতেছে, শীতে ও গরমে বিশেষ যন্ত্রর সাহায্যে প্রয়োজনমত উহা গরম ও ঠাণ্ডা করা হইতেছে, আবার কখনও প্রচণ্ড বেগে তাহা প্রবাহিত করা হইতেছে। নির্দিষ্ট কোন বস্তু বা পাত্রের ভেতর হইতে মানবীয় বুদ্ধিবলে বায়ুকে অপসারণ করা হইতেছে ইত্যাদি। মানবীয় বুদ্ধিই যদি অদৃশ্যমান একটি সৃষ্টিকে এইভাবে ইচ্ছামত ব্যবহার করিতে পারে, তবে আল্লাহ্ কুদরত উহাকে একজন মহান নবীর নিয়ন্ত্রণাধীন করিয়া দিলে তাহাকে অলিক বলিয়া ধারণা করার কোন ভিত্তি নাই।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 জিন্ন জাতির উপর কর্তৃত্ব

📄 জিন্ন জাতির উপর কর্তৃত্ব


অনুরূপভাবে আল্লাহ্ তাআলা হযরত সুলায়মান (আ)-কে একটি অদৃশ্যমান ও অজড় জাতি জিন্নদের উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার ক্ষমতা দান করিয়াছিলেন। হযরত সুলায়মান (আ)-এর রাজত্বের একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য এই যে, মানবজাতিসহ জিন্ন জাতি তাঁহার কর্তৃত্বাধীন ছিল। তিনি ইহাদের উপর যাবতীয় ধরনের নিয়ন্ত্রণ লাভ করিয়াছিলেন। ইহারা সমুদ্রের তলদেশ হইতে তাঁহার জন্য দুর্লভ মুক্তা আহরণ করিত। তিনি ইহাদের দ্বারা নূতন নূতন শহর ও প্রাসাদ নির্মাণ করাইতেন, বৃহদাকারের হাঁড়ি-পাতিল ও পত্রাদি তৈয়ারি করাইতেন। ইহাদের মধ্যে কেহ বিদ্রোহী বা অবাধ্য হইলে তিনি উহাকে জিঞ্জীরাবদ্ধ করিয়া রাখিতেন। মোটকথা, আল্লাহ তাআলা তাঁহাকে জিন্নদের উপর এতখানি নিয়ন্ত্রণক্ষমতা দান করিয়াছিলেন যে, তিনি যথেচ্ছা ইহাদিগকে ব্যবহার করিতে পারিতেন। এই সম্পর্কে কুরআন মজীদে বলা হইয়াছে:
وَمِنَ الشَّيْطِينِ مَنْ يَغُوصُونَ لَهُ وَيَعْمَلُونَ لَهُ عَمَلا دُونَ ذَلِكَ وَكُنَّا لَهُمْ حُفِظِينَ .
“এবং শয়তানদের মধ্যে কতক তাহার জন্য ডুবুরীর কাজ করিত, ইহা ব্যতীত অন্য কাজও করিত; আমি উহাদের রক্ষাকারী ছিলাম" (২১:৮২)।
বাইবেল হইতে এই সম্পর্কে যৎসামান্য ইঙ্গিত পাওয়া যায়ঃ "আর হীরমের যে সকল জাহাজ ওফীর হইতে স্বর্ণ লইয়া আসিত, সেই সকল জাহাজ ওফীর হইতে বিস্তর চন্দনকাঠ ও মনিও আনিত” (১ম রাজাবলী, ১০: ১১)।
وَمِنَ الْجِنَّ مَنْ يُعْمَلُ بَيْنَ يَدَيْهِ بِاذْنِ رَبِّهِ .
"তাহার প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে জিন্নদের কতক তাহার সম্মুখে কাজ করিত" (৩৪: ১২)।
والشَّيْطينَ كُلِّ بَنَّا ، وغَواصِ وَآخَرِينَ مُقَرَّنِينَ فِي الْأَصْفَادِ .
“এবং শয়তানদিগকে (তাহার অধীন করিয়া দিলাম), যাহারা সকলেই ছিল প্রাসাদ নির্মাণকারী ও ডুবুরী এবং শৃঙ্খলে আবদ্ধ আরও অনেককে" (৩৮: ৩৭-৩৮)।
সুলায়মান (আ)-কে ইহাদের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ দান করা হইয়াছিল এবং ইহার জন্য তাঁহাকে কোনরূপ জবাবদিহি করিতে হইত না (বিদায়া, ২খ, পৃ. ৩০)। মহান আল্লাহ বলেন:
هذَا عَطَاؤُنَا فَامْنُنْ أَوْ أَمْسِكْ بِغَيْرِ حِسَابٍ .
“এইসব আমার অনুগ্রহ, ইহা হইতে তুমি অন্যকে দিতে অথবা নিজে রাখিতে পার। ইহার জন্য তোমাকে হিসাব দিতে হইবে না" (৩৮: ৩৯)।
কতক লোক জিন্নের অস্তিত্বকে অস্বীকার করিয়া বলে যে, কুরআন মজীদে জিন্ন দ্বারা তৎকালের অসম শক্তিশালী, বিরাটকায় ও দুর্ধর্ষ একটি জাতিকে বুঝানো হইয়াছে যাহাদেরকে হযরত সুলায়মান (আ) ব্যতীত অপর কেহ নিয়ন্ত্রণে আনিতে পারে নাই (কাসাসুল কুরআন, ২খ, পৃ. ১০৬; নির্বাচিত রচনাবলী, ২খ, পৃ. ৯৩)। যে জিনিসের অস্তিত্ব সম্পর্কে কোনও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায় না, সেই জিনিসকে কেবল ধর্মগ্রন্তের সনদের ভিত্তিতে বাস্তব বলিয়া মানিয়া নিতে ইহারা দ্বিধাবোধ করে। তাই তাহারা কুরআন ব্যাখ্যার নামে উহার বিকৃতি সাধনে তৎপর হয়। বস্তুত জিন্ন মানবজাতির মতই একটি অদৃশ্যমান স্বতন্ত্র জাতি। কুরআন মজীদের ১৬টি সূরায় জিন্ন সম্পর্কে বক্তব্য আছে।
উদাহরণস্বরূপ:
৬. আল-আন'আম : ১০০, ১১২, ১২৮, ১৩০
৭. আল-আ'রাফ: ৩৮, ১৯৭
১১. হুদ: ১১৯
১৫. আল-হিজরঃ ২৭
১৭. আল-ইসরা: ৮৮
১৮. আল-কাহফঃ ৫০
২৭. আন-নামল: ১৭, ৩৯
৩২. আস-সাজদা: ১৩
৩৪. সাবা: ১২, ১৪, ৪১
৩৭. আস-সাফ্ফাত: ১৫৮
৪১. হা-মীম-সাজদা: ২৫, ২৬
৪৬. আল-আহকাফ: ১৮, ২৯
৫১. আয-যারিয়াত: ৫৬
৫৫. আর-রহমান: ১৫, ৩৩, ৩৯, ৫৬, ৭৪
৭২. আল-জিন্ন: ১, ৫, ৬
১১৪. আন-নাস: ৬
উপরিউক্ত আয়াতসমূহে ৩২বার জিন্ন, জান্ন, জিন্নাতুন শব্দসমূহ উদ্ধৃত হইয়াছে এবং কোন কোন আয়াতে জিন্ন সম্পর্কে যথেষ্ট তথ্য বিদ্যমান আছে। উদাহরণস্বরূপ:
وَخَلَقَ الْجَانَّ مِنْ مَّارِجٍ مِّنْ نَّارٍ . "এবং তিনি জিন্নকে সৃষ্টি করিয়াছেন নির্ধূম অগ্নিশিখা হইতে” (৫৫: ১৫)।
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلا لِيَعْبُدُونِ . "আমি জিন্ন ও মানুষকে এইজন্য সৃষ্টি করিয়াছি যে, তাহারা আমারই ইবাদত করিবে” (৫১: ৫৬)।
بمَعْشَرَ الْجِنَّ وَالْإِنْسِ إِنِ اسْتَطَعْتُمْ أَنْ تَنْفُذُوا مِنْ أَقْطَارِ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ فَانْفُذُوا لَا تَنْفُذُونَ إِلَّا بِسُلْطَانٍ . "হে জিন্ন ও মনুষ্য সম্প্রদায়! তোমরা যদি আকাশ-মণ্ডলী ও পৃথিবীর সীমা অতিক্রম করিতে পার তবে অতিক্রম কর, কিন্তু তোমরা অতিক্রম করিতে পারিবে না সনদ ব্যতিরেকে" (৫৫: ৩৩)।
وَإِذْ صَرَفْنَا إِلَيْكَ نَفَرًا مِّنَ الْجِنِّ يَسْتَمِعُونَ الْقُرْآنَ . "স্মরণ কর, যখন আমি তোমার প্রতি আকৃষ্ট করিয়াছিলাম একদল জিন্নকে, যাহারা কুরআন পাঠ শুনিতেছিল” (৪৬: ২৯)।
قُلْ أُوحِيَ إِلَى أَنَّهُ اسْتَمَعَ نَفَرٌ مِّنَ الْجِنِّ فَقَالُوا إِنَّا سَمِعْنَا قُرْآنًا عَجَبًا "বল, আমার প্রতি ওহী প্রেরিত হইয়াছে যে, জিন্নদের একটি দল মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করিয়াছে এবং বলিয়াছে, আমরা তো এক বিস্ময়কর কুরআন শ্রবণ করিয়াছি” (৭২ : ১)।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর হাদীছেও জিন্ন একটি স্বতন্ত্র জাতি হিসাবে স্বীকৃত হইয়াছে। মহানবী (স) বলেন:
خُلِقَتِ الْمَلَائِكَةُ مِنْ نُورٍ وَخُلِقَ الْجَانُ مِنْ مَّارِجٍ مِّنْ نَارٍ وَخُلِقَ أَدَمُ مِمَّا وُصِفَ لَكُمْ . "ফেরেশতাগণকে নূর দ্বারা সৃষ্টি করা হইয়াছে; জিন্নকে সৃষ্টি করা হইয়াছে নির্ঘুম অগ্নিশিখা দ্বারা এবং আদম (আ)-কে সৃষ্টি করা হইয়াছে তোমাদের নিকট বর্ণিত বস্তু দ্বারা" (মুসলিম, যুহদ, বাব ফী আহাদীছ মুতাফাররিকা, ২ খ.)।
لا تَسْتَنْجُوا بِالرُّوث ولا بالعظامِ فَإِنَّهُ زَادُ اخْوَانِكُمْ مِّنَ الْجِنَّ . "তোমরা না শুষ্ক গোবর দ্বারা আর না হাড় দ্বারা শৌচকার্য করিবে। কারণ এইগুলি তোমাদের ভ্রাতৃকুল জিন্নদিগের খাদ্য” (তিরমিযী, তাহারাত, বাব কারাহিয়াতি মা ইয়ুসতানজা বিহী, ১খ, আরও দ্র. বুখারী, মানাকিবুল আনসার, বীব মা জাআ মিনাল জিন্ন, নং ৩৫৭৩)।
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ سَجَدَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِالنَّجْمِ وَسَجَدَ مَعَهُ الْمُسْلِمُوْنَ وَالْمُشْرِكُونَ والجن والانس . "ইব্‌ন আব্বাস (রা) বলেন, মহানবী (স) সূরা আন-নাজম-এ সিজদা করিলে তাঁহার সহিত মুসলমান, মুশরিক, জিন্ন ও মানব সকলে সিজদা করে" (বুখারী, তাফসীর সূরা নাজম; আরও দ্র. তিরমিযী, আবওয়াবুস সাফার, বাব মা জাআ ফিস-সাজdaতি ফিন-নাজম, ১ খ.)।
কুরআন মজীদ ও হাদীছ শরীফে জিন্নদিগের সম্পর্কে বহুবিধ তথ্য বিদ্যমান যাহা দ্বারা ইহারা স্বতন্ত্র জাতি প্রমাণিত হয়। সুতরাং মু'মিন মুসলমানদের ঈমান এই যে, ইহারা আল্লাহ পাকের একটি বিশেষ সৃষ্টি।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00