📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 জীবজন্তুর ভাষা সম্পর্কে হযরত সুলায়মান-এর প্রজ্ঞা

📄 জীবজন্তুর ভাষা সম্পর্কে হযরত সুলায়মান-এর প্রজ্ঞা


(ছ) জীবজন্তুর ভাষা সম্পর্ক হযরত সুলায়মান (আ)-এর প্রজ্ঞা : প্রত্যেক নবীকেই আল্লাহ তাআলা মু'জিযাস্বরূপ কিছু ব্যতিক্রমধর্মী যোগ্যতা দান করিয়া থাকেন। তদনুযায়ী তিনি হযরত সুলায়মান (আ)-কেও মু'জিযাস্বরূপ কতিপয় ব্যতিক্রমধর্মী যোগ্যতা দান করিয়াছিলেন। আল্লাহ্ অসীম দয়ায় তিনি জীব জগতের ভাষা বুঝিতে পারিতেন। হুদহুদ পাখির সহিত তাঁহার কথোপকথন (দ্র. ২৭ঃ ২২-২৮) এবং পিপিলিকার কথা বুঝিতে পারা (দ্র. ২৭: ১৮-১৯) ইহার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। কুরআন মজীদের ভাষায়:
وَقَالَ يَأَيُّهَا النَّاسُ عُلِّمْنَا مَنْطِقَ الطَّيْرِ وَأُوتِيْنَا مِنْ كُلِّ شَيْءٍ إِنْ هَذَا لَهُوَ الْفَضْلُ الْمُبِينُ .
“এবং সে (সুলায়মান) বলিয়াছিল, হে মানুষ! আমাকে বিহঙ্গকূলের ভাষা শিক্ষা দেওয়া হইয়াছে এবং আমাকে সকল কিছু দেওয়া হইয়াছে; ইহা অবশ্যই সুস্পষ্ট অনুগ্রহ” (২৭ঃ ১৬)।
আল্লামা ইব্‌ন কাছীর (র) বলেন যে, হযরত সুলায়মান (আ) পাখির ভাষা বুঝিতেন এবং নিজ ভাষায় উহার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য মানুষের নিকট ব্যক্ত করিতেন। একদা হযরত সুলায়মান (আ) এক জোড়া চড়ুই পাখির নিকট দিয়া অতিক্রমকালে লক্ষ্য করিলেন যে, নর পাখিটি মাদী পাখিটির চতুষ্পার্শ্বে চক্কর দিতেছে। সুলায়মান (আ) তাঁহার সঙ্গীদেরকে বলিলেন, তোমরা কি জান, নর পাখিটি কি বলিতেছে? সে মাদী পাখিটির নিকট বিবাহের প্রস্তাব দিয়া বলিতেছে, তুমি আমাকে বিবাহ কর। আমি তোমার ইচ্ছানুসারে দামিশকের যে কোন প্রাসাদে তোমার বসবাসের ব্যবস্থা করিয়া দিব। সুলায়মান (আ) বলেন, দামিশকের প্রাসাদসমূহ পাথর দ্বারা নির্মিত হওয়ায় তাহা কাহারো বাসযোগ্য নহে। প্রত্যেক প্রেমিকই মিথ্যা প্রলোভন দেয় (বিদায়া, ২খ, পৃ. ১৮-১৯; তাহযীব তারীখ দিমাশক, ৬খ, পৃ. ২৫৩)। ছা'আলিবী বহু পক্ষীর সহিত হযরত সুলায়মান (আ)-এর কথোপকথনের ঘটনা বর্ণনা করিয়াছেন। একটি কপোত সুলায়মান (আ)-এর নিকট চীৎকার করিলে তিনি জিজ্ঞাসা করেন, তোমরা কি জানো ইহা কী বলিতেছে? ইহা বলিতেছে, যেমন কর্ম তেমন ফল। একটি হুদহুদ পাখির ডাক শুনিয়া তিনি বলিলেন যে, সে বলিতেছে, হে পাপিষ্ঠরা! আল্লাহকে ভয় কর। এই কারণে রাসূলুল্লাহ্ (স) হুদহুদ পাখি বধ করিতে নিষেধ করিয়াছেন। একটি চিলের ডাক শুনিয়া তিনি বলিলেন যে, ইহা বলিতেছে, "তাঁহার সত্তা ব্যতীত সমস্ত কিছুই ধ্বংসশীল" (২৮: ৮৮ দ্র.)। আনকা বলে, পার্থিব স্বার্থলাভই যাহার চিন্তা, সে ধ্বংস হউক। মহানবী (স) বলেন, মোরগ ডাকিয়া বলে, হে অলসেরা! আল্লাহকে স্মরণ কর। অনুরূপ আরও কতক প্রাণীর কথা উক্ত আছে (দ্র. আরাইস, পৃ. ৩১৭)। হুদহুদ পাখি তো এক নূতন সাম্রাজ্যের খবরসহ নবী সুলায়মান (আ)-এর নিকট আসিয়া উপস্থিত হয় (দ্র. ২৭: ২০-২৮)। ইহা ছিল আল্লাহ্র পক্ষ হইতে সুলায়মান (আ)-কে প্রদত্ত মু'জিযা।
“এবং আমাকে সকল কিছু দেওয়া হইয়াছে” (২৭: ১৬) আয়তাংশের ব্যাখ্যায় আল্লামা ইব্‌ন কাছীর বলেন, অর্থাৎ একজন বীর্যবান ন্যায়পরায়ণ শাসকের যাহা কিছু প্রয়োজন তাহা সবই সুলায়মান (আ)-কে দান করা হইয়াছিল। জনবল, সামরিক শক্তি ও সরঞ্জাম, জিন্ন ও মানবদল, পক্ষীকুল, জীবজন্তু, জ্ঞান, প্রজ্ঞা এবং বাকশক্তিসম্পন্ন ও বাকশক্তিহীন প্রাণীর উদ্দেশ্য অনুধাবন শক্তি ইত্যাদি তাঁহাকে দান করা হইয়াছিল। আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর স্রষ্টা মহান আল্লাহ্র পক্ষ হইতে "ইহা অবশ্যই সুস্পষ্ট অনুগ্রহ” (২৭: ১৬) ছিল নবী সুলায়মান (আ)-এর জন্য (বিদয়া, ২খ, পৃ. ১৯)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 পিপীলিকার পল্লীতে হযরত সুলঅয়মান (আ)

📄 পিপীলিকার পল্লীতে হযরত সুলঅয়মান (আ)


একদা হযরত সুলায়মান (আ) তাঁহার মানব, জিন্ন ও পক্ষীবাহিনীসহ অভিযানে রওয়ানা হইলেন। মানব ও জিন্ন বাহিনীদ্বয় তাঁহার সহিত সুশৃঙ্খলভাবে অগ্রসর হইতে থাকে এবং পক্ষীবাহিনীও সুশৃঙ্খলভাবে সমগ্র বাহিনীর উপর তাহাদের পাখা বিস্তার করিয়া উহাদেরকে ছায়া দান করিতে থাকে। এইভাবে তাহারা পিপীলিকাদের এক পল্লীতে গিয়া উপস্থিত হইলেন।
পিপীলিকা-সরদার তাহার জাতিকে সুলায়মান (আ)-এর আগমন সম্পর্কে সতর্ক করিয়া দিয়া নিজ নিজ আশ্রয়স্থলে ঢুকিয়া যাওয়ার নির্দেশ দেয়। আল্লাহ্ নবী সুলায়মান (আ) পিপীলিকার নীরব বক্তব্য বুঝিয়া ফেলিলেন এবং আনন্দিত হৃদয়ে আল্লাহ্র কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিলেন (বিদায়া, ২খ, পৃ. ১৯; আম্বিয়া-ই কুরআন, ৩খ, পৃ. ১১৬-১১৭)। কুরআন মজীদে ঘটনাটি এভাবে উক্ত হইয়াছে:
وَحُشِرَ لِسُلَيْمَنَ جُنُودُهُ مِنَ الْجِنَّ وَالْإِنْسِ وَالطَّيْرِ فَهُمْ يُوزَعُونَ . حَتَّى إِذَا أَتَوا عَلَى وَادِ النَّمْلِ قَالَتْ نَمْلَةٌ يَأَيُّهَا النَّمْلُ ادْخُلُوا مَسْكِنَكُمْ لا يَحْطِمَنَّكُمْ سُلَيْمَانُ وَجُنُودُهُ وَهُمْ لَا يَشْعُرُونَ . فَتَبَسَّمَ ضَاحِكًا مِّنْ قَوْلُهَا وَقَالَ رَبِّ أَوْزِعْنِي أَنْ أَشْكُرَ نِعْمَتَكَ الَّتِي أَنْعَمْتَ عَلَيَّ وَعَلَى وَالِدَى وَأَنْ أَعْمَلَ صَالِحًا تَرْضُهُ وَأَدْخِلْنِي بِرَحْمَتِكَ فِي عِبَادِكَ الصَّالِحِينَ .
"সুলায়মানের সম্মুখে সমবেত করা হইল তাহার বাহিনীকে- জিন্ন, মানুষ ও বিহঙ্গকুলকে এবং উহাদেরকে বিন্যস্ত করা হইল বিভিন্ন ব্যুহে। যখন তাহারা পিপীলিকা অধ্যুষিত উপত্যকায় পৌঁছিল তখন এক পিপীলিকা বলিল, হে পিপীলিকা বাহিনী! তোমরা তোমাদের গৃহে প্রবেশ কর, যেন সুলায়মান ও তাহার বাহিনী তাহাদের অজ্ঞাতসারে তোমাদেরকে পদতলে পিষিয়া না ফেলে। সুলায়মান উহার উক্তিতে মৃদু হাসিল এবং বলিল, হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমাকে সামর্থ্য দাও যাহাতে আমি তোমার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিতে পারি, আমার প্রতি ও আমার পিতা-মাতার প্রতি তুমি যে অনুগ্রহ করিয়াছ তাহার জন্য এবং যাহাতে আমি সৎকার্য করিতে পারি, যাহা তুমি পছন্দ কর এবং তোমার অনুগ্রহে আমাকে তোমার সৎকর্মপরায়ণ বান্দাদের শামিল কর” (২৭ : ১৬-১৯)।
জীবতত্ত্ববিদগণের দীর্ঘকালের অভিজ্ঞতার প্রতিভাত হইয়াছে যে, এই ক্ষুদ্রতর প্রাণীটির সংঘবদ্ধ জীবন বড়ই অদ্ভূত। মানুষের মত পিপীলিকাদেরও বংশ ও গোত্র আছে। ইহাদের মধ্যকার পারস্পরিক সহযোগিতার মনোভাব, শ্রম বিভাজনের নীতিমালা এবং জীবনযাপন পদ্ধতি কতকাংশে মানবজাতির সহিত সাদৃশ্যপূর্ণ। পাশ্চাত্য পণ্ডিতগণের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় প্রমাণিত হইয়াছে যে, ইহাদের মধ্যে একটি রাণী পিপীলিকা থাকে, সে ডিম ও বাচ্চা দেয়, একদল শক্তিমান যুবা পিপীলিকা সদা গর্তে অবস্থান করিয়া এইগুলির রক্ষণাবেক্ষণ করে এবং গর্তে কোন বিপদাশঙ্কা হইলে অতি দ্রুত ডিম বা বাচ্চাগুলিকে নিরাপদ স্থানে সরাইয়া নেয়। অপর একদল পিপীলিকা খাদ্য সংস্থানে নিয়োজিত থাকে। অন্যান্য প্রাণী যেমন খাদ্য পাওয়ামাত্র আহার শুরু করিয়া দেয়, ইহারা তাহা করে না। সংরক্ষণযোগ্য খাদ্য ইহারা সংগ্রহ করিয়া গর্তে নিয়া জমা করে, অতঃপর সকলে মিলিয়া আহার করে। ইহাদের অপর একটি দল নিরাপত্তামূলক পাহারায় নিয়োজিত থাকে। আরও লক্ষ্য করা গিয়াছে যে, কোন বিপদের পূর্বাভাষ পাওয়া গেলে প্রথমে একটি পিঁপড়া গর্তের বাহিরে আসিয়া পরিস্থিতি যাচাইপূর্বক গর্তে প্রত্যাবর্তন করিয়া বিপদ সম্পর্কে সকলকে অবহিত করে। হযরত সুলায়মান (আ)-এর সামরিক বাহিনী আগমনে বিপদাশঙ্কা করিয়া হয়তো একটি পিঁপড়া গর্তের বাহিরে আসিয়া পরিস্থিতি মূল্যায়নপূর্বক অন্যদের সতর্ক করিয়াছিল এবং সুলায়মান (আ) তাহা বুঝিতে সক্ষম হইয়াছিলেন (আম্বিয়া-ই কুরআন, ৩খ, পৃ. ১১৮-৯)।
কোন কোন ঐতিহাসিকের মতে হযরত সুলায়মান (আ) এই ভ্রমণে বায়তুল্লাহ শরীফে পৌছিয়া তথায় নামায পড়েন এবং কুরবানী করেন, অতঃপর তায়েফে পৌছিয়া পিঁপড়ার দলের সাক্ষাত পান (আরাইস, পৃ. ৩১৯; বিদায়া, ২খ, পৃ. ১৯)। কতকের মতে পিপীলিকার উপত্যকা ছিল সিরিয়ায় (তাফসীরে কবীর, ২৪ খ, পৃ. ১৮৭)। হযরত সুলায়মান (আ) তিন মাইল দূর হইতে পিপীলিকার সতর্কবাণী শুনিতে পান। বায়ু এই জাতীয় যে কোন খবর তাঁহার নিকট বহন করিয়া আনিত (আরাইস, পৃ. ৩১৯)।
কেবল তিনিই বিষয়টি অবহিত হইয়াছিলেন। আল্লাহ তাআলা তাঁহাকে পিঁপড়ার সঠিক সিদ্ধান্ত ও প্রশংসনীয় পদক্ষেপ অবহিত করার আনন্দে তিনি হাসেন এবং তাঁহার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন : “হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমাকে সামর্থ্য দাও যাহাতে আমি তোমার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিতে পারি, আমার প্রতি ও আমার পিতা-মাতার প্রতি তুমি যে অনুগ্রহ করিয়াছ তাহার জন্য..." (২৭: ১৬-১৯)। আল্লাহ তাঁহার এই দু'আ কবুল করেন। আয়াতে "আবাওয়ায়হ" বলিতে তাঁহার পিতা-মাতাকে বুঝানো হইয়াছে। তাঁহার মাতাও ছিলেন দীনদার, সৎকর্মপরায়ণ ও ইবাদতগুযার মহিলা (বিদায়া, ২খ, পৃ. ২০)। মহানবী (স) বলেনঃ
قَالَتْ أُمُّ سُلَيْمَانَ بْنِ دَاوُدَ يَا بُنَيَّ لَا تُكْثِرِ النُّوْمَ بِاللَّيْلِ فَإِنْ كَشْرَةَ النَّوْمِ بِاللَّيْلِ تَتْرُكُ الرَّجُلَ فَقِيرًا يَوْمَ القيامة .
"সুলায়মান (আ)-এর মাতা বলিলেন, হে বৎস! রাত্রিবেলা দীর্ঘক্ষণ নিদ্রা যাইও না। কারণ রাত্রিবেলার দীর্ঘনিদ্রা কিয়ামতের দিন বান্দাকে নিঃস্ব অবস্থায় ত্যাগ করিবে" (ইবন মাজা, কিতাবুল ইকামাত, বাব (৭৪) মা জাআ ফী কিয়ামিল লায়ল, ১খ, পৃ. ৯৪, নং ১৩৩২; বিদায়া, ২খ, পৃ. ২০; তাহযীব তারীখ দিমাশক, ৬খ, পৃ. ২৭০)।
আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিতে শুনিয়াছি: নবীগণের অন্তর্ভুক্ত একজন নবী লোকজনসহ আল্লাহ্র নিকট পানি প্রার্থনার জন্য রওয়ানা হইলেন। তাহারা দেখিতে পাইলেন যে, একটি পিপীলিকা উহার কতক পা আকাশের দিকে তুলিয়া পানি প্রার্থনা করিতেছে। তখন সেই নবী বলিলেন, তোমরা প্রত্যাবর্তন কর, এই পিপীলিকার উসীলায় তোমাদের দু'আ কবুল হইয়াছে (বিদায়া, ২খ, পৃ. ২০; তাহযীব তারীখ দিমাল্ক, ৬খ, পৃ. ২৭১। অনুরূপ বক্তব্য সম্বলিত আরও কতক হাদীছের জন্য দ্র. আরাইস, পৃ. ৩১৮; বিদায়া, ২খ, পৃ. ২০)। বর্ণিত আছে যে, হযরত সুলায়মান (আ) তাঁহার বাহিনীসহ একটি পিঁপড়ার নিকট দিয়া গমনকালে উহা বলিল, সুবহানাল্লাহিল আজীম! দাউদ (আ) পরিবারকে কত শান-শওকত দান করা হইয়াছে। ইহার কথায় সুলায়মান (আ) হাসিয়া দিলেন এবং তাঁহার সঙ্গীগণকে ইহা অবহিত করিলেন। তিনি আরও বলিলেন, এই পিঁপড়ার কথার চাইতেও অধিক উত্তম কথা কি আমি তোমাদেরকে বলিব না? তাহারা বলিল, হাঁ। তিনি বলিলেন, "প্রকাশ্য ও গোপন সর্বাবস্থায় আল্লাহকে ভয় কর, প্রাচুর্যে ও দরিদ্রতায় মধ্যম পন্থা অবলম্বন কর এবং সন্তোষ ও অসন্তোষ উভয় অবস্থায় ইনসাফের নীতি অবলম্বন কর" (আরাইস, পৃ. ৩১৮)। মহানবী (স) পিপীলিকা নিধন করিতে বারণ করিয়াছেন।
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ قَتْلِ الصَّرْدِ وَالضَّفْدَعِ وَالنَّمْلَةِ وَالْهُدْهُدِ .
আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, "রাসূলুল্লাহ (স) সুরাদ, ব্যাং, পিঁপড়া ও হুদহুদ পাখি বধ করিতে নিষেধ করিয়াছেন” (ইবন মাজা, কিতাবুস সায়দ, বাব মা ইয়ুনহা আন কাতলিহা, ২খ, পৃ. ২৩২; আবূ দাউদ, কিতাবুস সালাম, বাব ফী কাতালিয যাররি; দারিমী, আদাহী, বাব ২৬)।
হযরত সুলায়মান (আ) যে পক্ষীকুল ও জীব-জন্তুর ভাষা বুঝিতেন সেই সম্পর্কে বাইবেলে কোন উল্লেখ নাই। তবে ইয়াহুদীদের প্রচলিত বর্ণনায় উহার উল্লেখ পাওয়া যায় (জিউইশ ইনসাইক্লোপেডিয়া, ১১খ, পৃ. ৪৩৯-এর বরাতে তাফহীমুল কুরআন, ৩খ, পৃ. ৫৬২, টীকা ২১)। ইসরাঈলী বর্ণনায় পিপীলিকার ঘটনা এভাবে বর্ণিত হইয়াছে যে, হযরত সুলায়মান (আ) যখন বহু পিপীলিকা অধ্যুষিত একটি প্রান্তর অতিক্রম করিয়া যাইতেছিলেন, তখন তিনি শুনিতে পাইলেন যে, একটি পিপীলিকা চীৎকার করিয়া অপর পিপীলিকাগুলিকে বলিতেছে, তোমরা তোমাদের গৃহে প্রবেশ কর, অন্যথায় সুলায়মানের সৈন্যবাহিনী তোমাদেরকে পিষিয়া মারিবে। এই কথা শুনিয়া হযরত সুলায়মান (আ) সেই পিপীলিকাটির সামনে বড়ই অহঙ্কার প্রকাশ করিলেন। উত্তরে পিপীলিকাটি তাঁহাকে বলিল, তোমার আর মূল্য কি, নিকৃষ্ট এক ফোটা পানি হইতে তোমাকে সৃজন করা হইয়াছে। এই কথা শুনিয়া সুলায়মান (আ) লজ্জিত হইলেন (জিউইশ ইনসাইক্লোপেডিয়া, ১১খ, পৃ. ৪৪০-এর বরাতে তাফহীমুল কুরআন, ৩খ, পৃ. ৫৬৪, টীকা, ২৪)।
এক শ্রেণীর লোক ২৭: ১৮-১৯ আয়াতের মনগড়া ব্যাখ্যা প্রদানের প্রয়াস পাইয়াছে। তাহারা বলে যে, "পিপীলিকা অধ্যুষিত উপত্যকা" অর্থাৎ "ওয়াদী নামল" সিরিয়ায় অবস্থিত একটি প্রান্তরের নাম। তাহারা উক্ত আয়াতের এইরূপ অর্থ করে: "সুলায়মান 'নামল' নামক গোত্রের প্রান্তরে পৌছিলে সেই গোত্রের এক লোক বলিল, হে নামল গোত্রের লোকেরা..."। ইহা এমন এক মনগড়া ব্যাখ্যা, কুরআন মজীদের শব্দাবলীর সহিত যাহার কোন সম্পর্ক নাই। জীব-জন্তুর নামে আরবদের বহু গোত্রের নাম আছে ঠিকই, যেমন কাল্ব (কুকুর), আসাদ (সিংহ) ইত্যাদি, কিন্তু কোন আরববাসীই কালব গোত্রের কোন ব্যক্তি সম্পর্কে এইভাবে বলে না, "কালা কালবুন" (একটি কুকুর বলিল), "কালা আসাদুন" (একটি বাঘ বলিল)। তাই "কালা নামলাতুন (নামল গোত্রের একটি পিঁপড়া বলিল) এইরূপ বলা আরবী ভাষার ব্যবহারের সম্পূর্ণ বিপরীত।
দ্বিতীয়ত, “হে নামলীরা! তোমরা তোমাদের গৃহে প্রবেশ কর, অন্যথায় সুলায়মানের সৈন্যবাহিনী অজ্ঞাতসারে তোমাদেরকে নিষ্পেষিত করিয়া ফেলিতে পারে", এইরূপ অর্থ করা তো সম্পূর্ণ তাৎপর্যহীন। কারণ মানবগোষ্ঠীর একটি সামরিক বাহিনী মার্চ করিয়া যাইবারকালে মানবগোষ্ঠীর অপর একটি দলকে অজ্ঞাতসারে পদতলে পিষ্ট করিয়া ফেলিবে, অথচ তাহা টেরই পাইবে না, এইরূপ হইতেই পারে না। আর যদি তাহারা আক্রমণের উদ্দেশ্যেই আসিয়া থাকিত তবে নামলীদের গৃহে আশ্রয় গ্রহণও হইত অর্থহীন। কারণ এইরূপ অবস্থায় বিনা বাধায় আরও সহজে ও নির্মমভাবে তাহাদের নিহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অতএব নামলীরা মানুষ নয়, পিপীলিকার জাতিই।
তৃতীয়ত, ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক, প্রত্নতাত্ত্বিক ও নৃতাত্ত্বিক অনুসন্ধানেও 'নামল প্রান্তর' বা 'বান্ নামল' নামে কোন মানবগোত্রের অস্তিত্ব খুঁজিয়া পাওয়া যায় না। ইহা সম্পূর্ণ কাল্পনিক। যাহারা ইহাকে 'ওয়াদিন নামল' নামকরণ করিয়াছেন, তাহারা সেই এলাকায় পিঁপড়ার আধিক্যের কারণেই তাহা করিয়াছেন। কাতাদা ও মুকাতিল (র) বলেন, (واد بارض الشام كثير النمل) সিরিয়ার একটি প্রান্তর যেখানে পিঁপড়ার আধিক্য ছিল)।
চতুর্থত, নামল মানবগোষ্ঠী হইলে, "হে মানুষ! আমাকে বিহঙ্গকূলের ভাষা শিক্ষা দেওয়া হইয়াছে এবং আমাকে সকল কিছু দেওয়া হইয়াছে, ইহা অবশ্যই সুস্পষ্ট অনুগ্রহ" (২৭:১৬) আয়াতে যাহা বলা হইয়াছে তাহা সম্পূর্ণ তাৎপর্যহীন হইয়া পড়ে। কারণ তাহাতে না কোন মু'জিযা আছে, না বিস্মিত হওয়ার কিছু আছে, না হাসির কিছু আছে, আর না আল্লাহ্র নিকট আরাধনা করিয়া কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার কিছু আছে।
অতএব যাহারা নামলের মানবরূপী ব্যাখ্যা করিতে প্রয়াস পাইয়াছে তাহারা মূলত কুরআন মজীদের তাৎপর্যগত অর্থের তাহ্রীফ (বিকৃতি) করিতে উদ্যত হইয়াছে। বস্তুত একটি পিপীলিকার কাহারও আগমন সম্পর্কে অপর পিপীলিকাদিগকে সাবধান করা এবং গর্তে প্রবেশ করিতে বলা- জ্ঞান-বুদ্ধি ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে মোটেই অসম্ভব নয় এবং সুলায়মান (আ)-এর তাহা শ্রবণ করাও অসম্ভব নয়। কারণ যাঁহার ইন্দ্রিয় শক্তি ওহীর ন্যায় সূক্ষ্ম কথাও ধরিয়া লইতে পারে, তাঁহার পক্ষে পিঁপড়ার কথার ন্যায় স্কুল বাস্তব জ্ঞান লাভ মোটেই কঠিন নয় (তাফহীমুল কুরআন, ৩খ, পৃ. ৫৬৩-৫, টীকা ২৪; পৃ. ৫৬৬, টীকা ২৬-এর শেষ প্যারা; কাসাসুল কুরআন, ২খ, পৃ. ১২৭-৮)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হুদহুদ পাখির সহিত কথোপকথন

📄 হুদহুদ পাখির সহিত কথোপকথন


হযরত সুলায়মান (আ) তাঁহার সেনাবাহিনীসহ পিঁপড়া অধ্যুষিত এলাকা অতিক্রম করার পর নিজ সৈন্যগণের হিসাব নিলেন এবং পক্ষীবাহিনীর মধ্যে হুদহুদ পাখিকে উপস্থিত না পাইয়া অসন্তুষ্ট হইলেন। অবিলম্বে হুদহুদ আসিয়া উপস্থিত হইল এবং সুলায়মান (আ)-কে সাবা রাজ্যের রাণী ও সাবা জাতির ধর্ম সম্পর্কে অবহিত করিল। কুরআন মজীদে মহান নবী সুলায়মান (আ) ও হুদহুদের মধ্যকার মতবিনিময় নিম্নোক্তভাবে উক্ত হইয়াছে:
وَتَفَقَّدَ الطَّيْرَ فَقَالَ مَالِي لَا أَرَى الْهُدْهُدَ أَمْ كَانَ مِنَ الْغَائِبِينَ . لَأُعَذِّبَنَّهُ عَذَابًا شَدِيدًا أَوْ لَأَذْبَحَنَّهُ أَوْ ليَأْتِيَنَّى بِسُلْطَنٍ مُّبِينٍ ، فَمَكَثَ غَيْرَ بَعِيدٍ فَقَالَ أَحَطُّ بِمَا لَمْ تُحِطْ بِهِ وَجِئْتُكَ مِنْ سَبَا بِنَبَا يَقِينِ . إِنِّي وَجَدْتُ امْرَأَةً تَمْلِكُهُمْ وَأُوتِيَتْ مِنْ كُلِّ شَيْءٍ وَلَهَا عَرْشَ عَظِيمٌ . وَجَدتُهَا وَقَوْمَهَا يَسْجُدُونَ لِلشَّمْسِ مِنْ دُونِ اللَّهِ وَزَيَّنَ لَهُمُ الشَّيْطَنُ أَعْمَالَهُمْ فَصَدَّهُمْ عَنِ السَّبِيلِ فَهُمْ لَا يَهْتَدُونَ ..... قَالَ سَنَنْظُرُ أَصَدِّقْتَ أَمْ كُنْتَ مِنَ الْكَذِبِينَ ، إِذْهَبْ بِكِتَبِى هُذَا فَالْقِهُ إِلَيْهِمْ ثُمَّ تَوَلَّ عَنْهُمْ فَانْظُرْ مَا ذَا يَرْجِعُونَ . قَالَتْ يَأَيُّهَا الْمَلَأُ إِنِّي أُلْقِيَ إلى كتب كريم .
"সুলায়মান বিহঙ্গদলের সন্ধান লইল এবং বলিল, ব্যাপার কি, আমি হুদহুদকে দেখিতেছি না যে! সে অনুপস্থিত না কি? সে উপযুক্ত কারণ দর্শাইতে না পারিলে আমি অবশ্যই উহাকে কঠিন শাস্তি দিব অথবা যবাহ করিব। অনতিবিলম্বে হুদহুদ আসিয়া পড়িল এবং বলিল, আপনি যাহা অবগত নহেন আমি তাহা অবগত হইয়াছি এবং সাবা হইতে সুনিশ্চিত সংবাদ লইয়া আসিয়াছি। আমি তো এক নারীকে দেখিলাম উহাদের উপর রাজত্ব করিতেছে। তাহাকে দেওয়া হইয়াছে সকল কিছু হইতেই এবং তাহার আছে এক বিরাট সিংহাসন। আমি তাহাকে ও তাহার সম্প্রদায়কে দেখিলাম যে, তাহারা আল্লাহ্র পরিবর্তে সূর্যকে সিজদা করিতেছে। শয়তান উহাদের কার্যাবলী উহাদের নিকট শোভন করিয়াছে এবং উহাদেরকে সৎপথ হইতে নিবৃত্ত করিয়াছে, ফলে উহারা সৎপথ পায় না; নিবৃত্ত করিয়াছে এইজন্য যে, উহারা যেন আল্লাহকে সিজদা না করে যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর লুক্কায়িত বস্তুকে প্রকাশ করেন, যিনি জানেন- যাহা তোমরা গোপন কর এবং যাহা তোমরা ব্যক্ত কর। আল্লাহ, তিনি ব্যতীত কোন ইলাহ নাই, তিনি মহাআরশের অধিপতি। সুলায়মান বলিল, আমি দেখিব তুমি কি সত্য বলিয়াছ, না তুমি মিথ্যাবাদী? তুমি আমার এই পত্র লইয়া যাও এবং ইহা তাহাদের নিকট অর্পণ কর; অতঃপর তাহাদের নিকট হইতে সরিয়া থাকিও এবং লক্ষ্য করিও তাহাদের প্রতিক্রিয়া কী? সেই নারী বলিল, হে পারিষদবর্গ! আমায় এক সম্মানিত পত্র দেওয়া হইয়াছে। ইহা সুলায়মানের নিকট হইতে" (২৭: ২০-৩০)।
পত্রাবলী প্রেরণের জন্য ইহা ছিল সর্বপ্রাচীন মাধ্যম। তৎকালে কবুতর ইত্যাদির সাহায্যে পত্রের আদান-প্রদান করা হইত। হযরত সুলায়মান (আ) কবুতরের পরিবর্তে হুদহুদ পাখিকে পত্র বিনিময় ও তথ্য সংগ্রহের কাজে ব্যবহার করিয়াছিলেন। হুদহুদ সাবা রাজ্যে পৌছিয়া উহার রাণী ও জনগণ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করিয়া আনিয়াছিল। অতঃপর সুলায়মান (আ) তাঁহার পত্রসহ উহাকে সাবার রাণীর নিকট প্রেরণ করিয়াছিলেন। সে তথায় পৌঁছিয়া রাণীর ক্রোড়ে পত্রটি ফেলিয়া দিয়া ফিরিয়া আসে। রাণী সুলায়মান (আ)-এর নাম ও তাঁহার প্রতিপত্তি সম্পর্কে জ্ঞাত ছিলেন। তিনি পত্রখানি পাঠে পরিস্থিতির মূল্যায়ন করিতে পারিয়াছিলেন এবং তাই উহা সম্পর্কে আলোচনার জন্য শাসক পরিষদের পরামর্শ সভা ডাকাইয়াছিলেন (আম্বিয়া-ই-কুরআন, ৩খ, পৃ. ১২৪; আনওয়ারে আম্বিয়া, পৃ. ১২০-২১; বিদায়া, ২খ, পৃ. ২০; আল-কামিল, ১খ, পৃ. ১৭৯)।
সাবার রাণী ও তাঁহার রাজত্ব সম্পর্কে হুদহুদ পাখির তথ্য অবগত হওয়া সম্পর্কে কোন কোন ইতিহাসবিদ বলিয়াছেন যে, সুলায়মান (আ)-এর হুদহুদ পাখি সাবার রাণীর উদ্যানে প্রবেশ করিয়া তথাকার একটি হুদহুদের সাক্ষাত পায়। সেই পাখিটি সুলায়মান (আ)-এর হুদহুদের নিকট রাণীর রাজত্ব, তাঁহার জৌলুসময় সিংহাসন, তাঁহার প্রভাব-প্রতিপত্তি এবং এখানকার জনগণের ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে বর্ণনা করে। হুদহুদ ফিরিয়া আসিয়া তাহাই নবী সুলায়মান (আ)-এর নিকট বর্ণনা করে (আল-কামিল, ১খ, পৃ. ১৭৯; আরাইস, পৃ. ৩৩৫-৬)। কোন কোন তাফসীরকার ও ঐতিহাসিক বলিয়াছেন যে, মরুভূমিতে ভূতলে পানির অনুসন্ধানই ছিল হুদহুদের প্রধান দায়িত্ব (বিদায়া, ২খ, পৃ. ২১; আল-কামিল, ১খ, পৃ. ১৭৯; আরাইস, পৃ. ৩৩৫)। হযরত সুলায়মান (আ) নামাযের উযূ করার জন্য পানি না পাইয়া হুদহুদের অনুসন্ধান করিলেন এবং উহাকে অনুপস্থিত পাইলেন। হুদহুদকে অনুসন্ধানের নানারূপ কারণ উল্লিখিত আছে (আরাইস, পৃ. ৩৩৫; আল-কামিল, ১খ, পৃ. ১৭৯)।
কুরআন মজীদে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে, হযরত সুলায়মান (আ)-এর পত্রবাহক 'হুদহুদ' ছিল একটি পাখি। মহানবী (স)-এর বাণীতেও হুদহুদ পাখি হিসাবে আখ্যায়িত (উদাহরণস্বরূপ দ্র. ইবন মাজা, কিতাবুস সায়দ, বাব মা ইয়ুনহা আন কাতলিহা; ২খ., পৃ. ২৩২; আবূ দাউদ, কিতাবুস সালাম, বাব ফী কাতলিয যাররি; দারিমী, কিতাবুল আদাহী, বাবুন নাহয়ি আন কাতলিদ দাফাদিই ওয়ান-নাহ্লাহ্; মুসনাদে আহমাদ, ১খ, পৃ. ৩৩২, ৩৪৮)। কিন্তু একদল লোক হুদহুদ একটি মানুষের নাম হিসাবে আখ্যায়িত করিতে চাহে। কারণ পাখি যে ঐভাবে তথ্য সংগ্রহ করিয়া 'আসিয়া' মানুষের নিকট বর্ণনা করিতে পারে এবং তাহা মানুষ বুঝিতে পারে, ইহা তাহাদের বোধগম্যের অতীত। তাহারা বলে যে, হুদহুদ নামে একটি মানুষ সুলায়মান (আ)-এর সোনাবাহিনীর সদস্য ছিল। সে-ই সাবার রাণীর তথ্য সংগ্রহ করিয়া আনে।
কিন্তু ইহা একটি মনগড়া ব্যাখ্যা এবং কুরআন মজীদের তাৎপর্যগত বিকৃতি। কারণ আয়াতের শুরুই হইয়াছে 'পাখির উল্লেখ করিয়া: "ওয়া তাফাক্কাদাত তায়র" (তিনি বিহঙ্গকুলের সন্ধান লইলেন), পরেই বলা হইয়াছে হুদহুদের কথা। ইহার একটু আগে বলা হইয়াছে : "সুলায়মানের সম্মুখে সমবেত করা হইল তাহার বাহিনীকে, জিন্ন, মানুষ ও বিহঙ্গকূলকে" (২৭: ১৭)। আরবী ভাষায় ঐ তিন জাতির যে প্রতিশব্দ (জিন্ন, ইন্‌স, তায়র) আছে, এখানে তাহাই ব্যবহার করা হইয়াছে। ইহা রূপক অর্থে ব্যবহৃত হওয়ার কোন লক্ষণও এখানে বিদ্যমান নাই। তাই শব্দত্রয়ের কল্পিত অর্থ গ্রহণের কোন অবকাশ নাই। অনন্তর জিন্ন জাতি যে হযরত সুলায়মান (আ)-এর সৈন্যবাহিনীর অন্তর্ভুক্ত ছিল তাহা বাইবেলে উল্লেখ না থাকিলেও, ইয়াহুদীদের তালমূদ গ্রন্থে এবং তাহাদের রিব্বীদের বর্ণনায় উহার বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায় (জিউইশ ইনসাইক্লোপেডিয়া, ১১খ, পৃ. ৪৪০-এর বরাতে তাফহীমুল কুরআন, ৩খ, পৃ. ৫৬২, টীকা ২৩; উক্ত বিষয়ের আলোচনার জন্য দ্র. পৃ. ৫৬৬-৮, টীকা ২৮; কাসাসুল কুরআন, ২খ, পৃ. ১৪০-৪৩)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 তিনটি বিষয়ের ব্যাখ্যা

📄 তিনটি বিষয়ের ব্যাখ্যা


(১) হুদহুদ পাখি সাবা হইতে ফিরিয়া আসিয়া সুলায়মান (আ)-কে বলিল, "আপনি যাহা অবগত নহেন আমি তাহা অবগত হইয়াছি" (২৭ঃ ২২)। এখানে লক্ষ্য করা যায় যে, সুলায়মান (আ) যে সম্পর্কে অবগত নহেন সেই সম্পর্কে একটি পাখি অবগত হইয়াছে। ইহার উত্তরে বলা যায়, সারা পৃথিবী সম্পর্কে সুলায়মান (আ)-এর জ্ঞান থাকা জরুরী ছিল না, তাঁহার যতটুকু জ্ঞানের প্রয়োজন, আল্লাহ তাঁহাকে ততটুকুই দান করিয়াছিলেন। এখানে বিষয়টি হযরত মূসা (আ) ও খিযির (আ)-এর সহিত তুলনীয় (তাফসীরে কবীর। পৃ.)।
সুলায়মান (আ) সম্পর্কে বলা হইয়াছেঃ "আমাকে সকল কিছু দেওয়া হইয়াছে" (২৭:১৬)। আবার হুদহুদ পাখি সাবার রাণী সম্পর্কে বলিল, "তাহাকে সকল কিছু দেওয়া হইয়াছে" (২৭ঃ ২৩)। একদিকে একজন মহান নবী ও পরাক্রমশালী শাসক এবং অপরদিকে একজন মুশরিক শাসক সম্পর্কে একই কথা বলা হইয়াছে। এই সম্পর্কে ইমাম রাযী (র) বলেন, সুলায়মান (আ)-কে নবুওয়াত, নবুওয়াতী প্রজ্ঞা এবং রাজকার্য পরিচালনার পার্থিব শক্তি দান করা হইয়াছে। অপরদিকে সাবার রাণীকে শুধু পার্থিব শক্তি দান করা হইয়াছে। একজনকে ইহ-জাগতিক ও অতি-প্রাকৃতিক উভয় শক্তি দান করা হইয়াছে এবং অপরজনকে শুধু ইহ-জাগতিক শক্তি দান করা হইয়াছে।
(৩) হুদহুদ সাবার রাণীর সিংহাসন সম্পর্কে বলিল, وَلَهَا عَرْسٌ عَظِيمٌ "তাহার আছে এক বিরাট সিংহাসন" (২৭ঃ ২৩)। অপরদিকে আল্লাহ তাআলার আরশ সম্পর্কে বলা হইয়াছে: وَهُوَ رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ “এবং তিনি মহান আরশের অধিপতি” (৪০: ১৫; আরও দ্র. ২০:৮৬; ২৭ : ২৬)। দুই স্থানেই "আরশ আজীম" ব্যবহৃত হইয়াছে। ইমাম রাযী বলেন, আল্লাহ্র আরশ যদি শাব্দিক অর্থে তাঁহার সিংহাসন হইয়া থাকে, তবে বলা যায় যে, সমকালীন পার্থিব রাজা- বাদশাহগণের সিংহাসনের তুলনায় সাবার রাণীর সিংহাসন ছিল অতুলনীয়। কিন্তু তাহা আল্লাহ্ত্র সিংহাসনের তুলনায় কিছুই নহে। তিনি যেন গোটা বিশ্বলোকের মহান স্রষ্টা, তাঁহার সিংহাসনও অদ্রুপ মহান ও গৌরবময় (তাফসীরে কবীর)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00