📘 সীরাত বিশ্বকোষ 📄 বাল্যকাল

📄 বাল্যকাল


(ঘ) বাল্যকাল: হযরত সুলায়মান (আ)-এর বাল্যকাল সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানা যায় না। তবে তিনি যে বাল্যকাল হইতেই বুদ্ধিমান ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ছিলেন, ইহার প্রমাণ পাওয়া যায় (তাফসীরে উছমানী, পৃ. ৪৩৭, টীকা ৮)। দাউদ (আ) ইহা লক্ষ্য করিয়া তাঁহার প্রতি বিশেষ যত্নবান হইলেন এবং রাজকার্যে বিভিন্ন বিষয়ে তাঁহার সহিত পরামর্শ করিতেন, এমনকি কোন কোন ব্যাপারে তাঁহার মতই গ্রহণ করিতেন (আনওয়ারে আম্বিয়া, পৃ. ১১২)। বিচার সংক্রান্ত এইরূপ একাধিক ঘটনা কুরআন মজীদে ও হাদীছ শরীফে উল্লিখিত হইয়াছে।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ 📄 নবুওয়াত প্রাপ্তি ও দাওয়াতী কার্যক্রম

📄 নবুওয়াত প্রাপ্তি ও দাওয়াতী কার্যক্রম


(ঙ) নবুওয়াত প্রাপ্তি ও দাওয়াতী কার্যক্রম: হযরত সুলায়মান (আ) কখন নবুওয়াতপ্রাপ্ত হইয়াছিলেন তাহা স্পষ্টরূপে জানা যায় না। তবে কোন কোন ঐতিহাসিকের মতে তিনি হযরত দাউদ (আ)-এর ইনতিকালের পর সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং একই সময় নবুয়াতপ্রাপ্ত হন। কুরআন মজীদে বলা হইয়াছে:
وَوَرِثَ سُلَيْمَنُ دَاوُدَ .
"সুলায়মান হইয়াছিল দাউদের উত্তরাধিকারী" (২৭: ১৬)।
বিশেষজ্ঞ আলিমগণের মতে হযরত সুলায়মান ('আ) তাঁহার পিতার নবুওয়াত ও রাজত্বের উত্তরাধিকারী হইয়াছিলেন, পিতার ব্যক্তিগত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির নয়। কারণ দাউদ (আ)-এর আরো সন্তান ছিল এবং তাহাদেরকে ওয়ারিসী স্বত্ব হইতে বঞ্চিত করার কোন কারণ নাই (বিদায়া, ২খ, পৃ. ১৮; ছা'আলিবীর আরাইস, পৃ. ৩১৫; তাফসীরে ইব্‌ন আব্বাস, পৃ. ৩১৬; তাফসীরে উছমানী, পৃ. ৫০৩, টীকা ১১; তাফসীরে কবীর, ২৪ খ, পৃ. ১৮৬; রূহুল মা'আনী, পৃ. ১৭১-১; মা'আরিফুল কুরআন, ৬খ, পৃ. ৬২৩; তাফহীমুল কুরআন, ৩খ, পৃ. ৫৬১-২, টীকা ২০)। এই পর্যায়ে মহানবী (স)-এর বাণী প্রণিধানযোগ্য।
نَحْنُ مَعَاشَرَ الْأَنبِيَاء لَا نُورَثُ .
"আমাদের নবীগণের (পরিত্যক্ত সম্পত্তির) কোন ওয়ারিছ নাই" (আল-বিদায়া, ২খ, পৃ. ১৮ হইতে উদ্ধৃত)।'
অপর হাদীছে বলা হইয়াছে :
لا نُورَتْ مَا تَرَكْنَا هُ صَدَقَةٌ
"আমাদের কোন ওয়ারিছ নাই। আমরা যাহা ত্যাগ করিয়া যাই তাহা সাদাকারূপে গণ্য" (বুখারী, নাফাকাত, বাব হাবসি'র রাজুল কৃতা সানাতিন, ২খ, পৃ. ৮০৬; মুসলিম, ২খ, পৃ. ৯০-৯১; কিতাবুল জিহাদ; তিরমিযী, সিয়ার, ১খ, পৃ. ১৯৪)। অপর এক আয়াতে বলা হইয়াছে: إِنَّا أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ كَمَا أَوْحَيْنَا إِلَى نُوحٍ وَالنَّبِيِّينَ مِنْ بَعْدِهِ وَأَوْحَيْنَا إِلَى إِبْرَاهِيمَ........ وَسُلَيْمَنَ .
"আমি তো তোমার নিকট ওহী প্রেরণ করিয়াছি যেমন নূহ ও তাহার পরবর্তী নবীগণের নিকট ওহী প্রেরণ করিয়াছিলম। আমি আরও ওহী প্রেরণ করিয়াছিলাম ইবরাহীম... ও সুলায়মানের নিকট" (৪: ১৬৩)।
৮: ৮৩-৮৮ আয়াতসমূহে হযরত সুলায়মান (আ)-সহ ১৮জন নবী এবং তাঁহাদেরকে হেদায়াতদানের কথা উল্লেখের পর ৬:৮৯ আয়াতে বলা হইয়াছে :
أُولئِكَ الَّذِينَ أَتَيْنَهُمُ الكُتِبَ وَالْحُكْمَ وَالنُّبُوَّةَ :
"আমি তাহাদেরকে কিতাব, কর্তৃত্ব ও নবুওয়াত দান করিয়াছি"।
উক্ত আয়াতদ্বয় স্পষ্টরূপে হযরত সুলায়মান (আ)-এর নবুওয়াত ও রিসালাতের প্রমাণ বহন করে। কুরআন মজীদে আরও বলা হইয়াছে :
وَلَقَدْ أَتَيْنَا دَاوُدَ وَسُلَيْمَانَ عِلْمًا.
"আমি অবশ্যই দাউদ ও সুলায়মানকে জ্ঞান দান করিয়াছিলাম" (২৭: ১৫)। وَكُلًّا أَتَيْنَا حُكْمًا وَعِلْمًا
"এবং আমি তাহাদের (দাউদ ও সুলায়মান) প্রত্যেককে দিয়াছিলাম প্রজ্ঞা ও জ্ঞান" (২১: ৭৯)।
উক্ত আয়াতদ্বয়ে "জ্ঞান" দ্বারা নবুওয়াত বুঝানো হইয়াছে (দ্র. তাফসীরে ইব্‌ন আব্বাস, পৃ. ২৭৪ ও ৩১৬)।
কুরআন মজীদে স্পষ্টরূপে দ্ব্যর্থহীন বাক্যে হযরত সুলায়মান (আ)-এর নবুওয়াত প্রাপ্তির কথা ব্যক্ত হইয়াছে। কুরআন মজীদ তাঁহাকে যুগপৎ একজন প্রতিপত্তিশালী ন্যায়পরায়ণ শাসক ও মহাসম্মানিত নবী হিসাবে মর্যাদা দান করিয়াছে। কিন্তু তথাকথিত তাওরাত (বাইবেল) হযরত দাউদ ('আ)-এর ন্যায় হযরত সুলায়মান (আ)-কেও শুধুমাত্র একজন শাসক হিসাবে বর্ণনা করিয়াছে এবং তাঁহার নবুওয়াত অস্বীকার করিয়াছে। ইহা শীলোনীয় "অহিয়"-কে তাঁহার সমকালীন নবী হিসাবে উল্লেখ করিয়াছে (দ্র. ১ম রাজাবলী ১১ঃ ৪-৫, ৭ ও ২৯)। শুধু তাহাই নহে, বর্তমান বাইবেল জঘন্য ভাষায় তাঁহার প্রতি যাদুটোনা, কুফরী ও মূর্তি পূজায় লিপ্ত হওয়ার অভিযোগ আরোপ করিয়াছে যাহা উদ্ধৃত করার যোগ্য নহে (দ্র. ১ম রাজাবলী, ১১: ৩৩)। কুরআন মজীদ বিভিন্ন স্থানে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বাইবেলের এই অপবাদ খণ্ডন করিয়াছে।
"সুলায়মান কুফরী করে নাই, বরং শয়তানরাই কুফরী করিয়াছিল" (২ঃ ১০২)। وَمَا كَفَرَ سُلَيْمَنُ وَلَكِنَّ الشَّيْطَينَ كَفَرُوا
نِعْمَ الْعَبْدُ إِنَّهُ أَوَّابٌ . وَإِنَّ لَهُ عِنْدَنَا لَزُلْفَى وَحُسْنَ مَابٍ .
"সে ছিল উত্তম বান্দা এবং সে ছিল অতিশয় আল্লাহ অভিমুখী" (৩৮: ৩০)।
"এবং আমার নিকট তাহার জন্য রহিয়াছে নৈকট্যের মর্যাদা ও শুভ পরিণাম" (৩৮:৪০)।
হযরত সুলায়মান (আ)-এর দাওয়াতী কার্যক্রম সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায় না। তবে সাবার রাণীর আত্মসমর্পণ ও ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কিত কুরআন মজীদের বক্তব্য হইতে স্পষ্টরূপে ধারণা করা যায় যে, হযরত সুলায়মান (আ) তাঁহার নবুওয়াতী ও রাষ্ট্রীয় শক্তি সর্বতোভাবে আল্লাহ্ দীন প্রচারের জন্য নিয়োজিত করিয়াছিলেন। তিনি সাবার রাণীকে যে পত্র প্রেরণ করিয়াছিলেন তাহার দ্বারাও তিনি রাণী ও তাহার সম্প্রদায়কে ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানাইয়াছিলেন (বিদায়া, ২খ, পৃ. ২১)। কুরআন মজীদের বক্তব্য এই ব্যাপারে স্পষ্ট যে, রাণী ও তাঁহার সভাসদ ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তাহার দেশবাসীও যে ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিল তাহাও কুরআন মজীদের বক্তব্য হইতে ধারণা করা যায় (বিস্তারিত আলোচনা যথাস্থানে করা হইবে)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ 📄 বিচারকার্য

📄 বিচারকার্য


(চ) বিচারকার্য: আল্লাহ তা'আলা হযরত সুলায়মান (আ)-কে তাঁহার যুবা বয়সেই গভীর প্রজ্ঞা ও সূক্ষ্ম ন্যায়বিচার ক্ষমতা দান করিয়াছিলেন। কুরআন মজীদে যেমন, অদ্রূপ তাওরাতেও তাঁহার বিচক্ষণতার কথা উল্লেখ আছে: "আর সদাপ্রভু শলোমনকে বিপুল জ্ঞান ও সূক্ষ্মবুদ্ধি এবং সমুদ্রতীরস্থ বালুকার ন্যায় চিত্তের বিস্তীর্ণতা দিলেন। তাহাতে পূর্বদেশের সমস্ত লোকের জ্ঞান ও মিশ্রীয়দের যাবতীয় জ্ঞান হইতে শলোমনের অধিক জ্ঞান হইল...." (দ্র. ১ম রাজাবলী, ৪: ২৯-৩৪)।
পিতা হযরত দাউদ (আ) তাঁহার জ্ঞানের কদর করিতেন এবং কোন কোন সূক্ষ্ম ও জটিল বিষয়ে সন্তানের মতামতকে নিজের মতামতের উপর অগ্রাধিকার দিতেন। বিচার মীমাংসার এইরূপ একটি ঘটনা কুরআন মজীদেও উক্ত হইয়াছে।
وَدَاوُدَ وَسُلَيْمَنَ إِذْ يَحْكُمُنِ فِي الْحَرْثِ إِذْ نَفَشَتْ فِيْهِ غَنَمُ الْقَوْمِ وَكُنَّا لِحُكْمِهِمْ شُهِدِينَ . فَفَهُمْتُهَا سُلَيْمَنَ وَكُلًّا أَتَيْنَا حُكْمًا وَعِلْمًا
“এবং স্মরণ কর দাউদ ও সুলায়মানের কথা, যখন তাহারা বিচার মীমাংসা করিতেছিল শস্যক্ষেত্র সম্পর্কে। উহাতে রাত্রিকালে কোন সম্প্রদায়ের মেষ প্রবেশ করিয়াছিল। আমি প্রত্যক্ষ করিতেছিলাম তাহাদের বিচারকার্য। আর আমি সুলায়মানকে এই বিষয়ের মীমাংসা বুঝাইয়া দিয়াছিলাম এবং আমি তাহাদের প্রত্যেককে দিয়াছিলাম প্রজ্ঞা ও জ্ঞান" (২১: ৭৮-৭৮)।
বাইবেলে অথবা ইয়াহুদী ধর্মীয় সাহিত্যে বিচার সংক্রান্ত উক্ত ঘটনার কোন উল্লেখ নাই।
তাফসীরের গ্রন্থাবলী ও ইসলামের ইতিহাসে ঘটনার বিবরণ মোটামুটি নিম্নরূপ: এক ব্যক্তির শস্যক্ষেত্রে রাত্রিকালে অপর এক ব্যক্তির মেষপাল ঢুকিয়া উহার ফসল নষ্ট করিয়া ফেলে। অধিকাংশ বিশেষজ্ঞের মতে ইহা ছিল কৃষিক্ষেত্র (তাফসীরে কবীর, ২১খ, পৃ. ১৯৫; রূহুল মা'আনী, ১৭খ, পৃ. ৭৩) এবং আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা), শুরায়হ ও মুকাতিল (র)-এর মতে আঙ্গুর ক্ষেত (কবীর, ২১খ, পৃ. ১৯৫; রূহুল মা'আনী, ১৭খ, পৃ. ৭৪; তাফসীরে ইবন কাছীর, ২খ, পৃ. ৫১৬)। উভয় পক্ষ হযরত দাউদ (আ)-এর নিকট উপস্থিত হইয়া তাঁহার নিকট বিচার প্রার্থনা করিল। তিনি পক্ষদ্বয়ের শুনানী গ্রহণ করার পর ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষকে মেষপাল প্রদানের রায় দিলেন। পক্ষবৃন্দ হযরত সুলায়মান (আ)-এর নিকট দিয়া প্রত্যাবর্তন করাকালে তিনি তাহাদের নিকট মোকদ্দমার রায় জানিতে চাহিলেন। তিনি তাহা অবহিত হইয়া পক্ষদ্বয়কে অপেক্ষা করিতে বলিয়া পিতার নিকট গমন করিলেন। তিনি তাঁহার রায় সম্পর্কে ভিন্নমত পোষণ করিয়া বলিলেন, রায় এইভাবেও হইতে পারে যে, মেষপাল ক্ষেতের মালিকের নিকট সোপর্দ করা হইবে এবং সে ইহার দ্বারা উপকৃত হইতে থাকিবে। অপরদিকে ক্ষতিগ্রস্ত শস্যক্ষেত্র মেষপালের মালিকের নিকট সোপর্দ করা হইবে এবং সে ইহা পূর্বাবস্থাপ্রাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত ইহার পরিচর্যা করিতে থাকিবে, অতঃপর ইহাকে ইহার মালিকের নিকট অর্পণ করিয়া তাহার নিকট হইতে নিজের মেষপাল ফিরাইয়া লইবে (তাফসীরে কবীর, ২১খ, পৃ. ১৯৫; তাফহীমুল কুরআন, ৩খ, পৃ. ১৭৩, টীকা ৭০; তাফসীরে উছমানী, পৃ. ৪৩৭, টীকা ৮; কাসাসুল কুরআন, ২খ, পৃ. ২৮৭; তাহযীব তারীখ দিমাশক, ৬খ, পৃ. ২৫৪; আল-কামিল, ১খ, পৃ. ১৭৫)। ইব্‌ন আব্বাস (রা)-র মতে হযরত সুলায়মান (আ) তখন এগার বৎসরের বালক (তাফসীরে কবীর, ২১খ, পৃ. ১৯৫)। পিতা-পুত্র উভয়ের এই রায় ছিল ইজতিহাদ ভিত্তিক। আল্লাহ তাআলা হযরত সুলায়মান (আ)-কে ইলহামের মাধ্যমে এই মোকদ্দমার যথার্থ ইনসাফের নিকটতর ফয়সালা জ্ঞাত করিলেন, যদিও উভয়ের রায়ই ছিল যথার্থ। হযরত দাউদ (আ) কেবল কৃষকের ক্ষতিপূরণের দিকটি বিবেচনা করেন এবং হযরত সুলায়মান (আ) উভয় পক্ষের জন্য অধিকতর লাভজনক দিকটি বিবেচনা করেন (কাসাসুল কুরআন, ২খ, পৃ. ২৮৭; তাফসীরে উছমানী, পৃ. ৪৩৭, টীকা ৮)। অতঃপর মহান নবীদ্বয় সম্পর্কে বলা হইয়াছে, "এবং তাহাদের প্রত্যেককে আমি প্রজ্ঞা ও জ্ঞান দান করিয়াছিলাম” (২১: ৭৯)। অর্থাৎ তাহাদের এই যোগ্যতা ছিল আল্লাহ প্রদত্ত (তাফহীমুল কুরআন, ৩খ, পৃ. ১৭৩, টীকা ৭০)।
তৎকালের আরও একটি মোকদ্দমার কথা সহীহ হাদীছে উদ্ধৃত হইয়াছে। দুই নারী একটি শিশু সন্তানের মালিকানার দাবি লইয়া হযরত দাউদ (আ)-এর নিকট উপস্থিত হইয়াছিল। বাইবেলে ঘটনার বিবরণ নিম্নরূপ: "সেই সময়ে দুইটি স্ত্রীলোক-তাহারা বেশ্যা-রাজার নিকটে আসিয়া তাঁহার সম্মুখে দাঁড়াইল। একটি স্ত্রীলোক কহিল, হে আমার প্রভু! আমি ও এই স্ত্রীলোকটি উভয়ে এক ঘরে থাকি এবং আমি উহার কাছে ঘরে থাকিয়া প্রসব করি। আমার প্রসবের পর তিন দিনের দিন এই স্ত্রীলোকটি প্রসব করিল। তখন আমরা একত্র ছিলাম, ঘরে আমাদের সঙ্গে অন্য কোন লোক ছিল না, কেবল আমরা দুইজন ঘরে ছিলাম। আর রাত্রিতে এই স্ত্রীলোকটির সন্তানটি মরিয়া গেল, কারণ এ তাহার উপরে শয়ন করিয়াছিল। তাহাতে এ মধ্যরাত্রে উঠিয়া, যখন আপনার দাসী আমি নিদ্রিতা ছিলাম, তখন আমার পার্শ্ব হইতে আমার সন্তানটিকে লইয়া নিজের কোলে শোয়াইয়া রাখিল এবং নিজের মরা সন্তানটিকে আমার কোলে শোয়াইয়া রাখিল। প্রাতঃকালে আমি আপনার সন্তানটিকে দুধ দিতে উঠিলাম, আর দেখ, মরা ছেলে; কিন্তু সকালে তাহার প্রতি ভাল করিয়া দৃষ্টিপাত করিলাম, আর দেখ, সে আমার প্রসূত সন্তান নয়। অন্য স্ত্রীলোকটি কহিল, না, জীবিত সন্তান আমার, মৃত সন্তান তোমার। প্রথম স্ত্রী কহিল, না, না, মৃত সন্তান তোমার, জীবিত সন্তান আমার। এইরূপে তাহারা দুইজনে রাজার সম্মুখে বলাবলি করিল। তখন রাজা কহিলেন, একজন বলিতেছে, এই জীবিত সন্তান আমার, মৃত সন্তান তোমার; অন্যজন বলিতেছে, না, মৃত সন্তান তোমার, জীবিত সন্তান আমার। পরে রাজা বলিলেন, আমার কাছে একখানা খড়গ আন। তাহাতে রাজার কাছে খড়গ আনা হইল। রাজা বলিলেন, এই জীবিত ছেলেটিকে দুই খণ্ড করিয়া ফেল, আর একজনকে অর্ধেক এবং অন্যজনকে অর্ধেক দাও। তখন জীবিত ছেলেটি যাহার সন্তান, সেই স্ত্রী রাজাকে বলিল, হে আমার প্রভু! বিনয় করি, জীবিত ছেলেটি উহাকে দিন, ছেলেটিকে কোন মতে বধ করিবেন না। কিন্তু অপরজন কহিল, সে আমারও না হউক, তোমারও না হউক, দুই খণ্ড কর। তখন রাজা উত্তর করিয়া কহিলেন, জীবিত ছেলেটি উহাকে দাও, কোন মতে বধ করিও না; ঐ উহার মাতা। রাজা বিচারের এই নিষ্পত্তি করিলেন, তাহা শুনিয়া সমস্ত ইস্রায়েল রাজা হইতে ভীত হইল; কেননা তাহারা দেখিতে পাইল, বিচার করণার্থে তাঁহার অন্তরে সদাপ্রভু প্রদত্ত জ্ঞান আছে" (১ম রাজাবলী, ৩: ১৬-২৮)।
হাদীছ শরীফে ঘটনাটি নিম্নোক্তভাবে বর্ণিত হইয়াছে:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ كَانَتْ امْرَأَتَانِ مَعَهُمَا ابْنَهُمَا جَاءَ الذِّئْبُ فَذَهَبَ بِابْنِ إِحْدَاهُمَا فَقَالَتْ صَاحِبَتُهَا إِنَّمَا ذَهَبَ بِابْنِكِ وَقَالَتِ الْأُخْرَى إِنَّمَا ذَهَبَ بِابْنِكِ فَتَحَاكَمَنَا إِلَى دَاوُدَ فَقَضَى بِهِ لِلصُّغْرَى .
আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন: দুইটি স্ত্রীলোকের সহিত তাহাদের নিজ নিজ পুত্রসন্তানও ছিল। একটি নেকড়ে বাঘ আসিয়া তাহাদের একজনের সন্তানকে ছিনাইয়া লইয়া গেল। তাহার সঙ্গিনী বলিল, সে তোমার পুত্রকে লইয়া গিয়াছে। অপরজন বলিল, না, সে তোমার পুত্রকেই লইয়া গিয়াছে। তাহারা উভয়ে হযরত দাউদ (আ)-এর নিকট বিচারপ্রার্থী হইল। তিনি ছেলেটির ব্যাপারে অধিক বয়স্কা স্ত্রীলোকটির পক্ষে রায় দিলেন। অতঃপর নারীদ্বয় প্রস্থান করিয়া দাউদ (আ)-এর পুত্র সুলায়মান (আ)-এর সম্মুখ দিয়া অতিক্রম করাকালে তাঁহাকে মোকদ্দমার বিবরণ শুনাইল। তিনি (লোকদেরকে) বলিলেন, তোমরা আমার জন্য একটি ছুরি আনো, আমি ইহাকে দ্বিখণ্ডিত করিয়া তাহাদের দুইজনের মধ্যে বণ্টন করিব। স্বল্পবয়সী স্ত্রীলোকটি বলিল, আপনি ইহা করিবেন না, আল্লাহ আপনার প্রতি দয়াপরবশ হউন। (আমি মানিয়া লইয়াছি যে,) শিশুটি তাহারই। অতঃপর তিনি শিশুটির ব্যাপারে স্বল্প বয়স্কা স্ত্রীলোকটির পক্ষে রায় দিলেন” (বুখারী, কিতাবুল আম্বিয়া, বাব ৪০, ১খ, পৃ. ৪৮৭; মুসলিম, কিতাবুল আকদিয়া, বাব বায়ানি ইখতিলাফিল মুজতাহিদায়ন, ২খ, পৃ. ৭৭; তাফসীর ইব্‌ন কাছীর, ২খ, পৃ. ৫১৬; তাহযীব তারীখ দিমাশক, ৬খ, পৃ. ২৭০)।
হাদীছের বক্তব্য ও বাইবেলের বিবরণের মধ্যে নিম্নরূপ পার্থক্য বিদ্যমান: (১) হাদীছে ইহা হযরত দাউদ (আ)-এর রাজত্বকালের ঘটনা এবং বাইবেলে হযরত সুলায়মান (আ)-এর রাজত্বকালের ঘটনা বলিয়া উদ্ধৃত হইয়াছে। (২) বাইবেলে নারীদ্বয়কে বারাঙ্গনা হিসাবে চিত্রিত করা হইয়াছে, পক্ষান্তরে হাদীছে তাহারা দুইজন সাধারণ নারী হিসাবে উক্ত হইয়াছে এবং তাহাদের প্রতি চারিত্রিক কলঙ্ক আরোপ করা হয় নাই। (৩) বাইবেলে বলা হইয়াছে যে, শিশুটি মাতৃপৃষ্ঠে পিষ্ট হইয়া মারা গিয়াছিল, পক্ষান্তরে হাদীছে বলা হইয়াছে যে, নেকড়ে বাঘ শিশুটিকে ছিনাইয়া লইয়া গিয়াছিল। সার্বিক বিবেচনায় হাদীছের বিবরণই যথার্থ। কারণ বাইবেল যুগযুগান্তরের অব্যাহত বিকৃতিসহ বর্তমান রূপ ধারণ করিয়াছে। তাই একটি অনির্ভরযোগ্য গ্রন্থের বর্ণনা একজন সত্যবাদী ও সত্যবাদী বলিয়া স্বীকৃত নবীর বর্ণনার সমতুল্য হইতে পারে না, উহার সমর্থক হইতে পারে মাত্র।
উল্লিখিত দুইটি মোকদ্দমা ব্যতীত সুলায়মান (আ) কর্তৃক মীমাংসিত আর কোন ঘটনা নির্ভরযোগ্য সূত্রে বর্ণিত হয় নাই। অবশ্য ইতিহাস ও কাসাসুল আম্বিয়া জাতীয় গ্রন্থাবলীতে এই জাতীয় কতক ঘটনার উল্লেখ আছে। এক ব্যক্তি হযরত সুলায়মান (আ)-এর নিকট উপস্থিত হইয়া বলিল, আমার প্রতিবেশী আমার রাজহাঁস চুরি করিয়াছে। তিনি নামাযের জন্য সমবেত হওয়ার আহ্বান জানাইলেন, অতঃপর তাহাদের উদ্দেশে প্রদত্ত ভাষণে বলিলেন, তোমাদের মধ্যকার একজন তাহার প্রতিবেশীর রাজহাঁস চুরি করিয়াছে, অতঃপর মসজিদে প্রবেশ করিয়াছে এবং হাঁসের পালক তাহার মাথায় লাগিয়া আছে। একটি লোক তাহার মাথায় হাত তুলিয়া তাহা মর্দন করিলে হযরত সুলায়মান (আ) বলিলেন, ইহাকে গ্রেফতার কর, সে-ই চোর (তাহযীব তারীখ দিমাশক, ৬খ, পৃ. ২৭০)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ 📄 জীবজন্তুর ভাষা সম্পর্কে হযরত সুলায়মান-এর প্রজ্ঞা

📄 জীবজন্তুর ভাষা সম্পর্কে হযরত সুলায়মান-এর প্রজ্ঞা


(ছ) জীবজন্তুর ভাষা সম্পর্ক হযরত সুলায়মান (আ)-এর প্রজ্ঞা : প্রত্যেক নবীকেই আল্লাহ তাআলা মু'জিযাস্বরূপ কিছু ব্যতিক্রমধর্মী যোগ্যতা দান করিয়া থাকেন। তদনুযায়ী তিনি হযরত সুলায়মান (আ)-কেও মু'জিযাস্বরূপ কতিপয় ব্যতিক্রমধর্মী যোগ্যতা দান করিয়াছিলেন। আল্লাহ্ অসীম দয়ায় তিনি জীব জগতের ভাষা বুঝিতে পারিতেন। হুদহুদ পাখির সহিত তাঁহার কথোপকথন (দ্র. ২৭ঃ ২২-২৮) এবং পিপিলিকার কথা বুঝিতে পারা (দ্র. ২৭: ১৮-১৯) ইহার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। কুরআন মজীদের ভাষায়:
وَقَالَ يَأَيُّهَا النَّاسُ عُلِّمْنَا مَنْطِقَ الطَّيْرِ وَأُوتِيْنَا مِنْ كُلِّ شَيْءٍ إِنْ هَذَا لَهُوَ الْفَضْلُ الْمُبِينُ .
“এবং সে (সুলায়মান) বলিয়াছিল, হে মানুষ! আমাকে বিহঙ্গকূলের ভাষা শিক্ষা দেওয়া হইয়াছে এবং আমাকে সকল কিছু দেওয়া হইয়াছে; ইহা অবশ্যই সুস্পষ্ট অনুগ্রহ” (২৭ঃ ১৬)।
আল্লামা ইব্‌ন কাছীর (র) বলেন যে, হযরত সুলায়মান (আ) পাখির ভাষা বুঝিতেন এবং নিজ ভাষায় উহার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য মানুষের নিকট ব্যক্ত করিতেন। একদা হযরত সুলায়মান (আ) এক জোড়া চড়ুই পাখির নিকট দিয়া অতিক্রমকালে লক্ষ্য করিলেন যে, নর পাখিটি মাদী পাখিটির চতুষ্পার্শ্বে চক্কর দিতেছে। সুলায়মান (আ) তাঁহার সঙ্গীদেরকে বলিলেন, তোমরা কি জান, নর পাখিটি কি বলিতেছে? সে মাদী পাখিটির নিকট বিবাহের প্রস্তাব দিয়া বলিতেছে, তুমি আমাকে বিবাহ কর। আমি তোমার ইচ্ছানুসারে দামিশকের যে কোন প্রাসাদে তোমার বসবাসের ব্যবস্থা করিয়া দিব। সুলায়মান (আ) বলেন, দামিশকের প্রাসাদসমূহ পাথর দ্বারা নির্মিত হওয়ায় তাহা কাহারো বাসযোগ্য নহে। প্রত্যেক প্রেমিকই মিথ্যা প্রলোভন দেয় (বিদায়া, ২খ, পৃ. ১৮-১৯; তাহযীব তারীখ দিমাশক, ৬খ, পৃ. ২৫৩)। ছা'আলিবী বহু পক্ষীর সহিত হযরত সুলায়মান (আ)-এর কথোপকথনের ঘটনা বর্ণনা করিয়াছেন। একটি কপোত সুলায়মান (আ)-এর নিকট চীৎকার করিলে তিনি জিজ্ঞাসা করেন, তোমরা কি জানো ইহা কী বলিতেছে? ইহা বলিতেছে, যেমন কর্ম তেমন ফল। একটি হুদহুদ পাখির ডাক শুনিয়া তিনি বলিলেন যে, সে বলিতেছে, হে পাপিষ্ঠরা! আল্লাহকে ভয় কর। এই কারণে রাসূলুল্লাহ্ (স) হুদহুদ পাখি বধ করিতে নিষেধ করিয়াছেন। একটি চিলের ডাক শুনিয়া তিনি বলিলেন যে, ইহা বলিতেছে, "তাঁহার সত্তা ব্যতীত সমস্ত কিছুই ধ্বংসশীল" (২৮: ৮৮ দ্র.)। আনকা বলে, পার্থিব স্বার্থলাভই যাহার চিন্তা, সে ধ্বংস হউক। মহানবী (স) বলেন, মোরগ ডাকিয়া বলে, হে অলসেরা! আল্লাহকে স্মরণ কর। অনুরূপ আরও কতক প্রাণীর কথা উক্ত আছে (দ্র. আরাইস, পৃ. ৩১৭)। হুদহুদ পাখি তো এক নূতন সাম্রাজ্যের খবরসহ নবী সুলায়মান (আ)-এর নিকট আসিয়া উপস্থিত হয় (দ্র. ২৭: ২০-২৮)। ইহা ছিল আল্লাহ্র পক্ষ হইতে সুলায়মান (আ)-কে প্রদত্ত মু'জিযা।
“এবং আমাকে সকল কিছু দেওয়া হইয়াছে” (২৭: ১৬) আয়তাংশের ব্যাখ্যায় আল্লামা ইব্‌ন কাছীর বলেন, অর্থাৎ একজন বীর্যবান ন্যায়পরায়ণ শাসকের যাহা কিছু প্রয়োজন তাহা সবই সুলায়মান (আ)-কে দান করা হইয়াছিল। জনবল, সামরিক শক্তি ও সরঞ্জাম, জিন্ন ও মানবদল, পক্ষীকুল, জীবজন্তু, জ্ঞান, প্রজ্ঞা এবং বাকশক্তিসম্পন্ন ও বাকশক্তিহীন প্রাণীর উদ্দেশ্য অনুধাবন শক্তি ইত্যাদি তাঁহাকে দান করা হইয়াছিল। আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর স্রষ্টা মহান আল্লাহ্র পক্ষ হইতে "ইহা অবশ্যই সুস্পষ্ট অনুগ্রহ” (২৭: ১৬) ছিল নবী সুলায়মান (আ)-এর জন্য (বিদয়া, ২খ, পৃ. ১৯)।

ফন্ট সাইজ
15px
17px
🎤 ভাষা বেছে নিন
🇧🇩
বাংলা
Bengali
🕌
আরবি
العربية