📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 কুরআন মজীদে হযরত সুলায়মান (আ)

📄 কুরআন মজীদে হযরত সুলায়মান (আ)


(খ) কুরআন মজীদে হযরত সুলায়মান (আ): কুরআন মজীদের সাতটি সূরায় ১৫টি আয়াতে মোট ১৭ বার হযরত সুলায়মান (আ)-এর নামের উল্লেখ রহিয়াছে। ইহার কোন কোন স্থানে তাঁহার সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা বিদ্যমান।
২ (বাকারা): আয়াত ১০২
৪ (নিসা): আয়াত ১৭
৬ (আন'আম): আয়াত ৮৪
২১ (আম্বিয়া): আয়াত ৭৮, ৭৯, ৮১
২৭ (নামল): আয়াত ১৫ ১৬, ১৭, ১৮, ৩৬, ৪৪
৩ (সাবা): আয়াত ১২
৩৮ (সাদ): আয়াত ৩০-৩৪
উপরিউক্ত আয়াতসমূহে মোট ১৭ বার হযরত সুলায়মান (আ)-এর নামোল্লেখসহ তাঁহার সম্পর্কে আলোচনা বিদ্যমান। নিম্নে আয়াতসমূহ উল্লেখ করা হইল:
وَلَمَّا جَاءَهُمْ رَسُولٌ مِّنْ عِنْدِ اللهِ مُصَدِّقٌ لِمَا مَعَهُمْ نَبَدَ فَرِيقٌ مِّنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَبَ كِتَبَ اللهِ وَرَاءَ ظُهُورِهِمْ كَأَنَّهُمْ لَا يَعْلَمُونَ . وَاتَّبَعُوا مَا تَتْلُوا الشَّيْطَينُ عَلَى مُلْكِ سُلَيْمَنَ وَمَا كَفَرَ سُلَيْمَنُ وَلَكِنَّ الشَّيْطَينَ كَفَرُوا يُعَلِّمُونَ النَّاسَ السَّحْرَ - وَمَا أُنْزِلَ عَلَى المَلَكَيْنِ بِبَابِلَ هَارُوتَ وَمَارُوتَ وَمَا يُعَلِّمُنِ مِنْ أَحَدٍ حَتَّى يَقُولَا إِنَّمَا نَحْنُ فِتْنَةٌ فَلَا تَكْفُرْ - فَيَتَعَلَّمُونَ مِنْهُمَا مَا يُفَرِّقُونَ بِهِ بَيْنَ الْمَرْءِ وَزَوْجِهِ وَمَاهُمْ بِضَارِّينَ بِهِ مِنْ أَحَدٍ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ - وَيَتَعَلَّمُونَ مَا يَضُرُّهُمْ وَلَا يَنْفَعُهُمْ - وَلَقَدْ عَلِمُوا لَمَنِ اشْتَرَاهُ مَا لَهُ فِي الْآخِرَةِ مِنْ خَلَاقٍ وَلَبِئْسَ مَا شَرَوْا بِهِ أَنْفُسَهُمْ لَوْ كَانُوا يَعْلَمُونَ -
"যখন আল্লাহ্ পক্ষ হইতে তাহাদের নিকট রাসূল আসিল, যে তাহাদের নিকট যাহা রহিয়াছে উহার সমর্থক, তখন যাহাদিগকে কিতাব দেওয়া হইয়াছিল তাহাদের একদল আল্লাহ্ কিতাবটিকে পশ্চাতে নিক্ষেপ করিল, যেন তাহারা জানে না। এবং সুলায়মানের রাজত্বে শয়তানরা যাহা আবৃত্তি করিত তাহারা তাহা অনুসরণ করিত। সুলায়মান কুফরী করে নাই বরং শয়তানরাই কুফরী করিয়াছিল। তাহারা মানুষকে যাদু শিক্ষা দিত এবং যাহা বাবিল শহরে হারূত ও মারূত ফেরেশতাদ্বয়ের উপর নাযিল করা হইয়াছিল। তাহারা দুইজনে কাহাকেও শিক্ষা দিত না এই কথা না বলিয়া যে, আমরা পরীক্ষাস্বরূপ; সুতরাং তুমি কুফরী করিও না। তাহারা উভয়ের নিকট হইতে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যাহা বিচ্ছেদ সৃষ্টি করে তাহা শিক্ষা করিত। অথচ আল্লাহ্র নির্দেশ ব্যতীত তাহারা কাহারও কোন ক্ষতি সাধন করিতে পারিত না। তাহারা যাহা শিক্ষা করিত তাহা তাহাদের ক্ষতি সাধন করিত এবং কোন উপকারে আসিত না। আর তাহারা নিশ্চিতভাবে জানিত যে, যে কেহ উহা ক্রয় করে আখেরাতে তাহার কোন অংশ নাই। উহা কত নিকৃষ্ট যাহার বিনিময়ে তাহারা স্বীয় আত্মাকে বিক্রয় করিয়াছে, যদি তাহারা জানিত” (২:১০১-১০২)।
وَدَاوُدَ وَسُلَيْمَنَ إِذْ يَحْكُمُنِ فِي الْحَرْثِ إِذْ نَفَشَتْ فِيهِ غَنَمُ الْقَوْمِ وَكُنَّا لِحُكْمِهِمْ شُهِدِيْنَ فَفَهُمْنْهَا سُلَيْمَنَ وَكُلًّا أَتَيْنَا حُكْمًا وَعِلْمًا .
"এবং স্মরণ কর দাউদ ও সুলায়মানের কথা, যখন তাহারা বিচার করিতেছিল শস্যক্ষেত্র সম্পর্কে। উহাতে রাত্রিকালে কোন সম্প্রদায়ের মেষ প্রবেশ করিয়াছিল। আমি প্রত্যক্ষ করিতেছিলাম তাহাদের বিচারকার্য এবং আমি সুলায়মানকে এই বিষয়ের মীমাংসা বুঝাইয়া দিয়াছিলাম এবং তাহাদের প্রত্যেককে দিয়াছিলাম প্রজ্ঞা ও জ্ঞান" (২১ঃ ৭৮-৭৯)।
وَلِسُلَيْمَنَ الرِّيْحَ عَاصِفَةً تَجْرِي بِأَمْرِهِ إِلَى الْأَرْضِ الَّتِيْ بَرَكْنَا فِيْهَا وَكُنَّا بِكُلِّ شَيْءٍ عَالِمِيْنَ وَمِنَ الشَّيَطِيْنِ مَنْ يُغُوصُونَ لَهُ وَيُعَمَلُوْنَ عَمَلاً دُونَ ذَلِكَ وَكُنَّا لَهُمْ حُفِظِيْنَ .
“এবং সুলায়মানের বশীভূত করিয়া দিয়াছিলাম উদ্দাম বায়ুকে; উহা তাহার আদেশক্রমে প্রবাহিত হইত সেই দেশের দিকে যেখানে আমি কল্যাণ রাখিয়াছি; প্রত্যেক বিষয় সম্পর্কে আমিই সম্যক অবগত। এবং শয়তানদের মধ্যে কতক তাহার জন্য ডুবুরীর কাজ করিত, ইহা ব্যতীত অন্য কাজও করিত; আমি উহাদের রক্ষাকারী ছিলাম” (২১৪ ৮১-৮২)।
وَلَقَدْ أَتَيْنَا دَاوُدَ وَسُلَيْمَنَ عِلْمًا - وَقَالَ الْحَمْدُ للهِ الَّذِيْ فَضَّلَنَا عَلَى كَثِيْرٍ مِّنْ عِبَادِهِ الْمُؤْمِنِيْنَ - وَوَرِثَ سُلَيْمَنُ دَاوُدَ وَقَالَ يُأَيُّهَا النَّاسُ عُلِّمْنَا مَنْطِقَ الطَّيْرِ وَأُوتِيْنَا مِنْ كُلِّ شَيْءٍ إِنَّ هَذَا لَهُوَ الْفَضْلُ الْمُبِينُ . وحُشِرَ لِسُلَيْمَنَ جُنُودُهُ مِنَ الْجِنَّ وَالْإِنْسِ وَالطَّيْرِ فَهُمْ يُوزَعُونَ - حَتَّى إِذَا أَتَوا عَلَى وَادِ النَّمْلِ قَالَتْ نَمْلَةٌ يَأَيُّهَا النَّمْلُ ادْخُلُوا مَسْكِنَكُمْ لَا يَحْطِمَنَّكُمْ سُلَيْمَانُ وَجُنُودُهُ وَهُمْ لَا يَشْعُرُونَ ، فَتَبَسَّمَ ضَاحِكًا مِّنْ قَوْلُهَا وَقَالَ رَبِّ أَوْزِعْنِيْ أَنْ أَشْكُرَ نِعْمَتَكَ الَّتِيْ أَنْعَمْتَ عَلَى وَعَلَى وَالِدَىَّ وَأَنْ أَعْمَلَ صَالِحًا تَرْضُهُ وَأَدْخِلْنِي بِرَحْمَتِكَ فِي عِبَادِكَ الصَّالِحِينَ . وَتَفَقَّدَ الطَّيْرَ فَقَالَ مَا لِي لا أَرَى الْهُدْهُدَ أَمْ كَانَ مِنَ الْغَائِبِينَ . لَأُعَذِّبَنَّهُ عَذَابًا شَدِيدًا أَوْ لَا أَدْبَحَنَّهُ أَوْ لَيَأْتِيَنَّى بِسُلْطَانٍ مُّبِينٍ . فَمَكَثَ غَيْرَ بَعِيدٍ فَقَالَ أَحَطتُ بِمَا لَمْ تُحِطْ بِهِ وَجِئْتُكَ مِنْ سَبَا بِنَبَا يُفْقِيْنِ ، إِلَى وَجَدْتُ امْرَأَةً تَمْلِكُهُمْ وَأُوتِيَتْ مِنْ كُلِّ شَيْءٍ وَلَهَا عَرْشَ عَظِيمٌ ، وَجَدْتُهَا وَقَوْمَهَا يَسْجُدُونَ لِلشَّمْسِ مِنْ دُونِ اللَّهِ وَزَيَّنَ لَهُمُ الشَّيْطَنُ أَعْمَالَهُمْ فَصَدَّهُمْ عَنِ السَّبِيلِ فَهُمْ لَا يَهْتَدُونَ . الا يَسْجُدُوا لِلَّهِ الَّذِي يُخْرِجُ الْخَبْءَ فِي السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ وَيَعْلَمُ مَا تُخْفُونَ وَمَا تُعْلِنُوْنَ . اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ . قَالَ سَنَنْظُرُ أَصَدَقْتَ أَمْ كُنْتَ مِنَ الْكَذِبِينَ . اذْهَبْ بِكُتُبِي هُذَا فَالْقِهُ إِلَيْهِمْ ثُمَّ تَوَلَّ عَنْهُمْ فَانْظُرْ مَاذَا يَرْجِعُونَ . قَالَتْ يَأَيُّهَا الْمَلَؤُ إِنِّي أُلْقِيَ إِلَى كِتَبٌ كَرِيمٌ . إِنَّهُ مِنْ سُلَيْمَنَ وَإِنَّهُ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ. أَلا تَعْلُوا عَلَى وَأتُونِي مُسْلِمِينَ . قَالَتْ يَأَيُّهَا الْمَلَوْا افْتُونِي فِي أَمْرِي مَا كُنْتُ قَاطِعَةٌ أَمْرًا حَتَّى تَشْهَدُونَ . قَالُوا نَحْنُ أُولُوا قُوَّةٍ وَأُولُوا بَأْسٍ شَدِيدٍ وَالْأَمْرُ إِلَيْكِ فَانْظُرِى مَا ذَا تَأْمُرِينَ . قَالَتْ إِنَّ الْمُلُوكَ إِذَا دَخَلُوا قَرْيَةً أَفْسَدُوهَا وَجَعَلُوا أَعِزَّةَ أَهْلِهَا أَذلَّةٌ وَكَذَلِكَ يَفْعَلُونَ . وَإِنِّي مُرْسِلَةٌ إِلَيْهِمْ بِهَدِيَّةٍ فَنَظِرَةٌ بِمَ يَرْجِعُ الْمُرْسَلُوْنَ . فَلَمَّا جَاءَ سُلَيْمَانَ قَالَ أَتُمِدُّونَنِ بِمَالٍ فَمَا آثَنِيَ اللَّهُ خَيْرٌ مِّمَّا أَنَّكُمْ بَلْ أَنْتُم بِهَدِيَّتِكُمْ تَفْرَحُوْنَ . ارْجِعْ إِلَيْهِمْ فَلَنَأْتِيَنَّهُمْ بِجُنُود لا قِبَلَ لَهُمْ بِهَا وَلَنُخْرِجَنَّهُمْ مِنْهَا أَذِلَّةٌ وَهُمْ صُغِرُونَ . قَالَ يَأَيُّهَا الْمَلَؤُا أَيُّكُمْ يَأْتِينِي بِعَرْشِهَا قَبْلَ أَنْ يَأْتُونِي مُسْلِمِينَ . قَالَ عِفْرِيْتٌ مِّنَ الْجِنِّ أَنَا آتِيكَ بِهِ قَبْلَ أَنْ تَقُوْمَ مِنْ مُقَامِكَ وَإِنِّي عَلَيْهِ لَقَوِى آمِينَ . قَالَ الَّذِي عِنْدَهُ عِلْمٌ مِّنَ الكتب أنا أتيكَ بِهِ قَبْلَ أَن يُرْتَدَّ إِلَيْكَ طَرْفُكَ فَلَمَّا رَأَهُ مُسْتَقِرأَ عِنْدَهُ قَالَ هُذَا مِنْ فَضْلِ رَبِّي لِيَبْلُوَنِي أَشْكُرُ أَمْ اكْفُرُ - وَمَنْ شَكَرَ فَإِنَّمَا يَشْكُرُ لِنَفْسِهِ وَمَنْ كَفَرَ فَإِنَّ رَبِّي غَنِيٌّ كَرِيمٌ . قَالَ نَكِرُوا لَهَا عَرْشَهَا نَنْظُرْ أَتَهْتَدِى أَمْ تَكُونُ مِنَ الَّذِينَ لَا يَهْتَدُونَ . فَلَمَّا جَاءَتْ قِيلَ أَهُكَذَا عَرْشُكِ قَالَتْ كَأَنَّهُ هُوَ وَأُوتِينَا الْعِلْمَ مِنْ قَبْلِهَا وَكُنَّا مُسْلِمِينَ . وَصَدَّهَا مَا كَانَتْ تَعْبُدُ مِنْ دُونِ اللَّهِ إِنَّهَا كَانَتْ مِنْ قَوْمٍ كَفِرِينَ ، قِيلَ لَهَا ادْخُلِي الصَّرْحَ - فَلَمَّا رَأَتْهُ حَسِبَتْهُ لُجَّةً وَكَشَفَتْ عَن سَاقَيْهَا قَالَ إِنَّهُ صَرْحٌ مُمَرَّدٌ مِّنْ قَوَارِيرَ . قَالَتْ رَبِّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي وَأَسْلَمْتُ مَعَ سُلَيْمَانَ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ .
"আমি অবশ্যই দাউদ ও সুলায়মানকে জ্ঞান দান করিয়াছিলাম এবং তাহারা উভয়ে বলিয়াছিল, সকল প্রশংসা আল্লাহর যিনি আমাদেরকে তাঁহার বহু মু'মিন বান্দাদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করিয়াছেন। সুলায়মান হইয়াছিল দাউদের উত্তরাধিকারী এবং সে বলিয়াছিল, হে মানুষ! আমাকে বিহঙ্গকূলের ভাষা শিক্ষা দেওয়া ইয়াছে এবং আমাকে সকল কিছু দেওয়া হইয়াছে; ইহা অবশ্যই সুস্পষ্ট অনুগ্রহ। সুলায়মানের সম্মুখে সমবেত করা হইল তাহার বাহিনীকে জিন্ন, মানুষ ও বিহঙ্গকুলকে এবং উহাদিগকে বিন্যস্ত করা হইল বিভিন্ন ব্যুহে। যখন উহারা পিপীলিকা অধ্যুষিত উপত্যকায় পৌঁছিল তখন এক পিপীলিকা বলিল, হে পিপীলিকা বাহিনী! তোমরা তোমাদের গৃহে প্রবেশ কর, যেন সুলায়মান ও তাহার বাহিনী তাহাদের অজ্ঞাতসারে তোমাদেরকে পদতলে পিষিয়া না ফেলে। সুলায়মান উহার উক্তিতে মৃদু হাসিল এবং বলিল, হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমাকে সামর্থ্য দাও যাহাতে আমি তোমার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিতে পারি, আমার প্রতি ও আমার পিতা-মাতার প্রতি তুমি যে অনুগ্রহ করিয়াছ তাহার জন্য এবং যাহাতে আমি সৎকার্য করিতে পারি, যাহা তুমি পছন্দ কর এবং তোমার অনুগ্রহে আমাকে তোমার সৎকর্মপরায়ণ বান্দাদের শামিল কর। সুলায়মান বিহঙ্গদলের সন্ধান লইল এবং বলিল, ব্যাপার কি, আমি হুদহুদকে দেখিতেছি না যে। সে অনুপস্থিত নাকি? সে উপযুক্ত কারণ দর্শাইতে না পারিলে আমি অবশ্যই উহাকে কঠিন শাস্তি দিব অথবা যবাহ করিব।
অনতিবিলম্বে হুদহুদ আসিয়া পড়িল এবং বলিল, আপনি যাহা অবগত নহেন আমি তাহা অবগত হইয়াছি এবং সাবা হইতে সুনিশ্চিত সংবাদ লইয়া আসিয়াছি। আমি তো এক নারীকে দেখিলাম উহাদের উপর রাজত্ব করিতেছে। তাহাকে দেওয়া হইয়াছে সকল কিছু হইতেই এবং তাহার আছে এক বিরাট সিংহাসন। আমি তাহাকে ও তাহার সম্প্রদায়কে দেখিলাম যে, তাহারা আল্লাহ্র পরিবর্তে সূর্যকে সিজদা করিতেছে। শয়তান উহাদের কার্যাবলী উহাদের নিকট শোভন করিয়াছে এবং উহাদেরকে সৎপথ হইতে নিবৃত্ত করিয়াছে, ফলে উহারা সৎপথ পায় না; নিবৃত্ত করিয়াছে এইজন্য যে, উহারা যেন আল্লাহকে সিজদা না করে যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর লুক্কায়িত বস্তুকে প্রকাশ করেন, যিনি জানেন- যাহা তোমরা গোপন কর এবং যাহা তোমরা ব্যক্ত কর। আল্লাহ, তিনি ব্যতীত কোন ইলাহ নাই, তিনি মহাআরশের অধিপতি। সুলায়মান বলিল, আমি দেখিব তুমি কি সত্য বলিয়াছ, না তুমি মিথ্যাবাদী? তুমি আমার এই পত্র লইয়া যাও এবং ইহা তাহাদের নিকট অর্পণ কর; অতঃপর তাহাদের নিকট হইতে সরিয়া থাকিও এবং লক্ষ্য করিও তাহাদের প্রতিক্রিয়া কী? সেই নারী বলিল, হে পারিষদবর্গ! আমাকে এক সম্মানিত পত্র দেওয়া হইয়াছে। ইহা সুলায়মানের নিকট হইতে এবং ইহা এই: দয়াময় পরম দয়ালু আল্লাহ্ নামে। অহমিকাবশে আমাকে অমান্য করিও না এবং আনুগত্য স্বীকার করিয়া আমার নিকট উপস্থিত হও। সেই নারী বলিল, হে পারিষদবর্গ! আমার এই সমস্যায় তোমাদের অভিমত দাও। আমি কোন ব্যাপারে তোমাদের উপস্থিতি ব্যতীত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি না। তাহারা বলিল, আমরা তো শক্তিশালী ও কঠোর যোদ্ধা। তবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা আপনারই, কী আদেশ করিবেন তাহা আপনি ভাবিয়া দেখুন। সে বলিল, রাজা-বাদশাহরা যখন কোন জনপদে প্রবেশ করে তখন উহাকে বিপর্যস্ত করিয়া দেয় এবং তথাকার মর্যাদাবান ব্যক্তিদিগকে অপদস্থ করে; ইহারাও এইরূপই করিবে। আমি তাহাদের নিকট উপঢৌকন পাঠাইতেছি; দেখি, দূতেরা কী লইয়া ফিরিয়া আসে। দূত সুলায়মানের নিকট আসিলে সুলায়মান বলিল, তোমরা কি আমাকে ধন-সম্পদ দিয়া সাহায্য করিতেছ? আল্লাহ আমাকে যাহা দিয়াছেন তাহা তোমাদেরকে যাহা দিয়াছেন তাহা হইতে উৎকৃষ্ট, অথচ তোমরা তোমাদের উপঢৌকন লইয়া উৎফুল্ল বোধ করিতেছ।
তুমি উহাদের নিকট ফিরিয়া যাও। আমি অবশ্যই উহাদের বিরুদ্ধে লইয়া আসিব এক সৈন্যবাহিনী যাহার মুকাবিলা করিবার শক্তি উহাদের নাই। আমি অবশ্যই উহাদেরকে তথা হইতে বহিষ্কার করিব লাঞ্ছিতভাবে এবং উহারা হইবে অবনমিত। সুলায়মান আরো বলিল, হে আমার পারিষদবর্গ! তাহারা আত্মসমর্পণ করিয়া আমার নিকট আসিবার পূর্বে তোমাদের মধ্যে কে তাহার সিংহাসন আমার নিকট লইয়া আসিতে পারে? এক শক্তিশালী জিন্ন বলিল, আপনি আপনার স্থান হইতে উঠিবার পূর্বেই আমি উহা আপনাকে আনিয়া দিব এবং এই ব্যাপারে আমি অবশ্যই ক্ষমতাবান, বিশ্বস্ত। কিতাবের জ্ঞান যাহার ছিল সে বলিল, আপনি চক্ষুর পলক ফেলিবার পূর্বেই আমি উহা আপনাকে আনিয়া দিব। সুলায়মান উহা তাহার সম্মুখে রক্ষিত অবস্থায় দেখিয়া বলিল, ইহা আমার প্রতিপালকের অনুগ্রহ, যাহাতে তিনি আমাকে পরীক্ষা করিতে পারেন- আমি কৃতজ্ঞ না অকৃতজ্ঞ। যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, সে তো নিজের কল্যাণের জন্যই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এবং যে অকৃতজ্ঞ সে জানিয়া রাখুক যে, আমার প্রতিপালক অভাবমুক্ত, মহানুভব। সুলায়মান বলিল, তাহার সিংহাসনের আকৃতি অপরিচিত করিয়া বদলাইয়া দাও; দেখি সে সঠিক দিশা পায়, না সে বিভ্রান্তদের শামিল হয়। সেই নারী যখন আসিল, তখন তাহাকে জিজ্ঞাসা করা হইল, তোমার সিংহাসন কি এইরূপই? সে বলিল, ইহা তো যেন উহাই। আমাদেরকে ইতিপূর্বেই প্রকৃত জ্ঞান দান করা হইয়াছে এবং আমরা আত্মসমর্পণও করিয়াছি। আল্লাহ্র পরিবর্তে সে যাহার পূজা করিত তাহাই তাহাকে সত্য হইতে নিবৃত্ত করিয়াছে, সে ছিল কাফির সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত। তাহাকে বলা হইল, এই প্রাসাদে প্রবেশ কর। যখন সে উহা দেখিল তখন সে উহাকে এক গভীর জলাশয় মনে করিল এবং সে তাহার পদদ্বয় অনাবৃত করিল। সুলায়মান বলিল, ইহা তো স্বচ্ছ স্ফটিক মণ্ডিত প্রাসাদ। সেই নারী বলিল, হে আমার প্রতিপালক! আমি তো নিজের প্রতি জুলুম করিয়াছি। আমি সুলায়মানের সহিত জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহ্র নিকট আত্মসমর্পণ করিতেছি” (২৭: ১৫- ৪৪)।
وَلِسُلَيْمَنَ الرِّيْحَ غُدُوُّهَا شَهْرٌ وَرَوَاحُهَا شَهْرٌ . وَأَسَلْنَا لَهُ عَيْنَ الْقِطْرِ وَمِنَ الْجِنِّ مَنْ يَّعْمَلُ بَيْنَ يَدَيْهِ بِإِذْنِ رَبِّهِ ، وَمَنْ تَزِغْ مِنْهُمْ عَنْ أَمْرِنَا نُذِقْهُ مِنْ عَذَابِ السَّعِيْرِ. يَعْمَلُوْنَ لَهُ مَا يَشَاءُ مِنْ مَّحَارِيْبَ وَتَمَاثِيْلَ وَحِفَانِ كَالْجَوَابِ وَقُدُوْرٍ رَّاسِيَاتٍ . اِعْمَلُوْا أَلَ دَاوُدَ شُكْرًا وَقَلِيْلٌ مِّنْ عِبَادِيَ الشَّكُوْرُ . فَلَمَّا قَضَيْنَا عَلَيْهِ الْمَوْتَ مَا دَلَّهُمْ عَلٰى مَوْتِهِ اِلَّا دَابَّةُ الْأَرْضِ تَأْكُلُ مِنْسَأَتَهُ فَلَمَّا خَرَّ تَبَيَّنَتِ الْجِنُّ اَنْ لَّوْ كَانُوْا يَعْلَمُوْنَ الْغَيْبَ مَا لَبِثُوْا فِي الْعَذَابِ الْمُهِيْنِ .
"আমি সুলায়মানের অধীন করিয়াছিলাম বায়ুকে, যাহা প্রভাতে এক মাসের পথ এবং সন্ধ্যায় এক মাসের পথ অতিক্রম করিত। আমি তাহার জন্য গলিত তাম্রের এক প্রস্রবণ প্রবাহিত করিয়াছিলাম। তাহার প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে জিন্নদের কতক তাহার সম্মুখে কাজ করিত। উহাদের মধ্যে যে আমার নির্দেশ অমান্য করে তাহাকে আমি জ্বলন্ত অগ্নির শাস্তি আস্বাদন করাইব। উহারা সুলায়মানের ইচ্ছা অনুযায়ী প্রাসাদ, ভাস্কর্য, হাউযসদৃশ বৃহদাকার পাত্র এবং সুদৃঢ়ভাবে স্থাপিত ডেক নির্মাণ করিত। আমি বলিয়াছিলাম, হে দাউদ পরিবার! কৃতজ্ঞতার সঙ্গে তোমরা কাজ করিতে থাক। আমার বান্দাদের মধ্যে অল্পই কৃতজ্ঞ। যখন আমি সুলায়মানের মৃত্যু ঘটাইলাম তখন জিন্নদেরকে তাহার মৃত্যু বিষয়ে জানাইল কেবল মাটির পোকা, যাহা তাহার লাঠিকে খাইতেছিল। সে যখন পড়িয়া গেল তখন জিন্নরা বুঝিতে পরিল যে, উহারা যদি অদৃশ্য বিষয় অবগত থাকিত তাহা হইলে উহারা লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তিতে আবদ্ধ থাকিত না" (৩৪:১২-১৪)।
وَوَهَبْنَا لِدَاوُدَ سُلَيْمَانَ نِعْمَ الْعَبْدُ إِنَّهُ أَوَّابٌ . إِذْ عُرِضَ عَلَيْهِ بِالعَشِيِّ الصَّفِنْتُ الْجِيَادُ . فَقَالَ إِنِّي أَحْبَبْتُ حُبُّ الْخَيْرِ عَنْ ذِكْرِ رَبِّي حَتَّى تَوَارَتْ بِالْحِجَابِ. رُدُّوهَا عَلَى فَطَقِ مَسْحًا بِالسُّوقِ وَالْأَعْنَاقِ . وَلَقَدْ فَتَنَّا سُلَيْمَانَ وَالْقَيْنَا عَلَى كُرْسِيَّهِ جَسَدًا ثُمَّ أَنَابَ . قَالَ رَبِّ اغْفِرْ لِي وَهَبْ لِي مُلْكًا لَا يَنْبَغِي لِأَحَدٍ مِّنْ بَعْدِي إِنَّكَ أَنْتَ الْوَهَّابُ. فَسَخَّرْنَا لَهُ الرَّيْحَ تَجْرِي بِأَمْرِهِ رُخَاءً حَيْثُ أَصَابَ وَالشَّيْطِينُ كُلِّ بَنَاءٍ وَعَواصِ . وَآخَرِيْنَ مُقَرَّنِينَ فِي الْأَصْفَادِ . هُذَا عَطَاؤُنَا فَامْنُنْ أَوْ أَمْسَكَ بِغَيْرِ حِسَابٍ ، وَإِنَّ لَهُ عِنْدَنَا لَزُلْفَى وَحُسْنَ مَاب ."আমি দাউদকে দান করিলাম সুলায়মান। সে ছিল উত্তম বান্দা এবং সে ছিল অতিশয় আল্লাহ অভিমুখী। যখন অপরাহ্নে তাহার সম্মুখে ধাবনোদ্যত উৎকৃষ্ট অশ্বরাজিকে উপস্থিত করা হইল তখন সে বলিল, আমি তো' আমার প্রতিপালকের স্মরণ হইতে বিমুখ হইয়া ঐশর্য প্রীতিতে মগ্ন হইয়া পড়িয়াছি, এদিকে সূর্য অস্তমিত হইয়া গিয়াছে। এইগুলিকে পুনরায় আমার সম্মুখে আনয়ন কর। অতঃপর সে উহাদের পদ ও গলদেশ ছেদন করিতে লাগিল। আমি তো সুলায়মানকে পরীক্ষা করিলাম এবং তাহার আসনের উপর রাখিলাম একটি ধড়। অতঃপর সুলায়মান আমার অভিমুখী হইল। সে বলিল, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে ক্ষমা কর এবং আমাকে দান কর এমন এক রাজ্য যাহার অধিকারী আমি ছাড়া কেহ না হয়। তুমি তো পরম দাতা। তখন আমি তাহার অধীন করিয়া দিলাম বায়ুকে, যাহা তাহার আদেশে, সে যেখানে ইচ্ছা করিত সেথায় মৃদুমন্দভাবে প্রবাহিত হইত; এবং শয়তানদেরকে, যাহারা সকলেই ছিল প্রাসাদ নির্মাণকারী ও ডুবুরী এবং শৃঙ্খলে আবদ্ধ আরও অনেককে। এইসব আমার অনুগ্রহ, ইহা হইতে তুমি অন্যকে দিতে অথবা নিজে রাখিতে পার। ইহার জন্য তোমাকে হিসাব দিতে হইবে না। এবং আমার নিকট রহিয়াছে তাহার জন্য নৈকট্যের মর্যাদা ও শুভ পরিণাম” (৩৮: ৩০-৪০)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বাল্যকাল

📄 বাল্যকাল


(ঘ) বাল্যকাল: হযরত সুলায়মান (আ)-এর বাল্যকাল সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানা যায় না। তবে তিনি যে বাল্যকাল হইতেই বুদ্ধিমান ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ছিলেন, ইহার প্রমাণ পাওয়া যায় (তাফসীরে উছমানী, পৃ. ৪৩৭, টীকা ৮)। দাউদ (আ) ইহা লক্ষ্য করিয়া তাঁহার প্রতি বিশেষ যত্নবান হইলেন এবং রাজকার্যে বিভিন্ন বিষয়ে তাঁহার সহিত পরামর্শ করিতেন, এমনকি কোন কোন ব্যাপারে তাঁহার মতই গ্রহণ করিতেন (আনওয়ারে আম্বিয়া, পৃ. ১১২)। বিচার সংক্রান্ত এইরূপ একাধিক ঘটনা কুরআন মজীদে ও হাদীছ শরীফে উল্লিখিত হইয়াছে।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 নবুওয়াত প্রাপ্তি ও দাওয়াতী কার্যক্রম

📄 নবুওয়াত প্রাপ্তি ও দাওয়াতী কার্যক্রম


(ঙ) নবুওয়াত প্রাপ্তি ও দাওয়াতী কার্যক্রম: হযরত সুলায়মান (আ) কখন নবুওয়াতপ্রাপ্ত হইয়াছিলেন তাহা স্পষ্টরূপে জানা যায় না। তবে কোন কোন ঐতিহাসিকের মতে তিনি হযরত দাউদ (আ)-এর ইনতিকালের পর সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং একই সময় নবুয়াতপ্রাপ্ত হন। কুরআন মজীদে বলা হইয়াছে:
وَوَرِثَ سُلَيْمَنُ دَاوُدَ .
"সুলায়মান হইয়াছিল দাউদের উত্তরাধিকারী" (২৭: ১৬)।
বিশেষজ্ঞ আলিমগণের মতে হযরত সুলায়মান ('আ) তাঁহার পিতার নবুওয়াত ও রাজত্বের উত্তরাধিকারী হইয়াছিলেন, পিতার ব্যক্তিগত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির নয়। কারণ দাউদ (আ)-এর আরো সন্তান ছিল এবং তাহাদেরকে ওয়ারিসী স্বত্ব হইতে বঞ্চিত করার কোন কারণ নাই (বিদায়া, ২খ, পৃ. ১৮; ছা'আলিবীর আরাইস, পৃ. ৩১৫; তাফসীরে ইব্‌ন আব্বাস, পৃ. ৩১৬; তাফসীরে উছমানী, পৃ. ৫০৩, টীকা ১১; তাফসীরে কবীর, ২৪ খ, পৃ. ১৮৬; রূহুল মা'আনী, পৃ. ১৭১-১; মা'আরিফুল কুরআন, ৬খ, পৃ. ৬২৩; তাফহীমুল কুরআন, ৩খ, পৃ. ৫৬১-২, টীকা ২০)। এই পর্যায়ে মহানবী (স)-এর বাণী প্রণিধানযোগ্য।
نَحْنُ مَعَاشَرَ الْأَنبِيَاء لَا نُورَثُ .
"আমাদের নবীগণের (পরিত্যক্ত সম্পত্তির) কোন ওয়ারিছ নাই" (আল-বিদায়া, ২খ, পৃ. ১৮ হইতে উদ্ধৃত)।'
অপর হাদীছে বলা হইয়াছে :
لا نُورَتْ مَا تَرَكْنَا هُ صَدَقَةٌ
"আমাদের কোন ওয়ারিছ নাই। আমরা যাহা ত্যাগ করিয়া যাই তাহা সাদাকারূপে গণ্য" (বুখারী, নাফাকাত, বাব হাবসি'র রাজুল কৃতা সানাতিন, ২খ, পৃ. ৮০৬; মুসলিম, ২খ, পৃ. ৯০-৯১; কিতাবুল জিহাদ; তিরমিযী, সিয়ার, ১খ, পৃ. ১৯৪)। অপর এক আয়াতে বলা হইয়াছে: إِنَّا أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ كَمَا أَوْحَيْنَا إِلَى نُوحٍ وَالنَّبِيِّينَ مِنْ بَعْدِهِ وَأَوْحَيْنَا إِلَى إِبْرَاهِيمَ........ وَسُلَيْمَنَ .
"আমি তো তোমার নিকট ওহী প্রেরণ করিয়াছি যেমন নূহ ও তাহার পরবর্তী নবীগণের নিকট ওহী প্রেরণ করিয়াছিলম। আমি আরও ওহী প্রেরণ করিয়াছিলাম ইবরাহীম... ও সুলায়মানের নিকট" (৪: ১৬৩)।
৮: ৮৩-৮৮ আয়াতসমূহে হযরত সুলায়মান (আ)-সহ ১৮জন নবী এবং তাঁহাদেরকে হেদায়াতদানের কথা উল্লেখের পর ৬:৮৯ আয়াতে বলা হইয়াছে :
أُولئِكَ الَّذِينَ أَتَيْنَهُمُ الكُتِبَ وَالْحُكْمَ وَالنُّبُوَّةَ :
"আমি তাহাদেরকে কিতাব, কর্তৃত্ব ও নবুওয়াত দান করিয়াছি"।
উক্ত আয়াতদ্বয় স্পষ্টরূপে হযরত সুলায়মান (আ)-এর নবুওয়াত ও রিসালাতের প্রমাণ বহন করে। কুরআন মজীদে আরও বলা হইয়াছে :
وَلَقَدْ أَتَيْنَا دَاوُدَ وَسُلَيْمَانَ عِلْمًا.
"আমি অবশ্যই দাউদ ও সুলায়মানকে জ্ঞান দান করিয়াছিলাম" (২৭: ১৫)। وَكُلًّا أَتَيْنَا حُكْمًا وَعِلْمًا
"এবং আমি তাহাদের (দাউদ ও সুলায়মান) প্রত্যেককে দিয়াছিলাম প্রজ্ঞা ও জ্ঞান" (২১: ৭৯)।
উক্ত আয়াতদ্বয়ে "জ্ঞান" দ্বারা নবুওয়াত বুঝানো হইয়াছে (দ্র. তাফসীরে ইব্‌ন আব্বাস, পৃ. ২৭৪ ও ৩১৬)।
কুরআন মজীদে স্পষ্টরূপে দ্ব্যর্থহীন বাক্যে হযরত সুলায়মান (আ)-এর নবুওয়াত প্রাপ্তির কথা ব্যক্ত হইয়াছে। কুরআন মজীদ তাঁহাকে যুগপৎ একজন প্রতিপত্তিশালী ন্যায়পরায়ণ শাসক ও মহাসম্মানিত নবী হিসাবে মর্যাদা দান করিয়াছে। কিন্তু তথাকথিত তাওরাত (বাইবেল) হযরত দাউদ ('আ)-এর ন্যায় হযরত সুলায়মান (আ)-কেও শুধুমাত্র একজন শাসক হিসাবে বর্ণনা করিয়াছে এবং তাঁহার নবুওয়াত অস্বীকার করিয়াছে। ইহা শীলোনীয় "অহিয়"-কে তাঁহার সমকালীন নবী হিসাবে উল্লেখ করিয়াছে (দ্র. ১ম রাজাবলী ১১ঃ ৪-৫, ৭ ও ২৯)। শুধু তাহাই নহে, বর্তমান বাইবেল জঘন্য ভাষায় তাঁহার প্রতি যাদুটোনা, কুফরী ও মূর্তি পূজায় লিপ্ত হওয়ার অভিযোগ আরোপ করিয়াছে যাহা উদ্ধৃত করার যোগ্য নহে (দ্র. ১ম রাজাবলী, ১১: ৩৩)। কুরআন মজীদ বিভিন্ন স্থানে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বাইবেলের এই অপবাদ খণ্ডন করিয়াছে।
"সুলায়মান কুফরী করে নাই, বরং শয়তানরাই কুফরী করিয়াছিল" (২ঃ ১০২)। وَمَا كَفَرَ سُلَيْمَنُ وَلَكِنَّ الشَّيْطَينَ كَفَرُوا
نِعْمَ الْعَبْدُ إِنَّهُ أَوَّابٌ . وَإِنَّ لَهُ عِنْدَنَا لَزُلْفَى وَحُسْنَ مَابٍ .
"সে ছিল উত্তম বান্দা এবং সে ছিল অতিশয় আল্লাহ অভিমুখী" (৩৮: ৩০)।
"এবং আমার নিকট তাহার জন্য রহিয়াছে নৈকট্যের মর্যাদা ও শুভ পরিণাম" (৩৮:৪০)।
হযরত সুলায়মান (আ)-এর দাওয়াতী কার্যক্রম সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায় না। তবে সাবার রাণীর আত্মসমর্পণ ও ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কিত কুরআন মজীদের বক্তব্য হইতে স্পষ্টরূপে ধারণা করা যায় যে, হযরত সুলায়মান (আ) তাঁহার নবুওয়াতী ও রাষ্ট্রীয় শক্তি সর্বতোভাবে আল্লাহ্ দীন প্রচারের জন্য নিয়োজিত করিয়াছিলেন। তিনি সাবার রাণীকে যে পত্র প্রেরণ করিয়াছিলেন তাহার দ্বারাও তিনি রাণী ও তাহার সম্প্রদায়কে ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানাইয়াছিলেন (বিদায়া, ২খ, পৃ. ২১)। কুরআন মজীদের বক্তব্য এই ব্যাপারে স্পষ্ট যে, রাণী ও তাঁহার সভাসদ ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তাহার দেশবাসীও যে ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিল তাহাও কুরআন মজীদের বক্তব্য হইতে ধারণা করা যায় (বিস্তারিত আলোচনা যথাস্থানে করা হইবে)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বিচারকার্য

📄 বিচারকার্য


(চ) বিচারকার্য: আল্লাহ তা'আলা হযরত সুলায়মান (আ)-কে তাঁহার যুবা বয়সেই গভীর প্রজ্ঞা ও সূক্ষ্ম ন্যায়বিচার ক্ষমতা দান করিয়াছিলেন। কুরআন মজীদে যেমন, অদ্রূপ তাওরাতেও তাঁহার বিচক্ষণতার কথা উল্লেখ আছে: "আর সদাপ্রভু শলোমনকে বিপুল জ্ঞান ও সূক্ষ্মবুদ্ধি এবং সমুদ্রতীরস্থ বালুকার ন্যায় চিত্তের বিস্তীর্ণতা দিলেন। তাহাতে পূর্বদেশের সমস্ত লোকের জ্ঞান ও মিশ্রীয়দের যাবতীয় জ্ঞান হইতে শলোমনের অধিক জ্ঞান হইল...." (দ্র. ১ম রাজাবলী, ৪: ২৯-৩৪)।
পিতা হযরত দাউদ (আ) তাঁহার জ্ঞানের কদর করিতেন এবং কোন কোন সূক্ষ্ম ও জটিল বিষয়ে সন্তানের মতামতকে নিজের মতামতের উপর অগ্রাধিকার দিতেন। বিচার মীমাংসার এইরূপ একটি ঘটনা কুরআন মজীদেও উক্ত হইয়াছে।
وَدَاوُدَ وَسُلَيْمَنَ إِذْ يَحْكُمُنِ فِي الْحَرْثِ إِذْ نَفَشَتْ فِيْهِ غَنَمُ الْقَوْمِ وَكُنَّا لِحُكْمِهِمْ شُهِدِينَ . فَفَهُمْتُهَا سُلَيْمَنَ وَكُلًّا أَتَيْنَا حُكْمًا وَعِلْمًا
“এবং স্মরণ কর দাউদ ও সুলায়মানের কথা, যখন তাহারা বিচার মীমাংসা করিতেছিল শস্যক্ষেত্র সম্পর্কে। উহাতে রাত্রিকালে কোন সম্প্রদায়ের মেষ প্রবেশ করিয়াছিল। আমি প্রত্যক্ষ করিতেছিলাম তাহাদের বিচারকার্য। আর আমি সুলায়মানকে এই বিষয়ের মীমাংসা বুঝাইয়া দিয়াছিলাম এবং আমি তাহাদের প্রত্যেককে দিয়াছিলাম প্রজ্ঞা ও জ্ঞান" (২১: ৭৮-৭৮)।
বাইবেলে অথবা ইয়াহুদী ধর্মীয় সাহিত্যে বিচার সংক্রান্ত উক্ত ঘটনার কোন উল্লেখ নাই।
তাফসীরের গ্রন্থাবলী ও ইসলামের ইতিহাসে ঘটনার বিবরণ মোটামুটি নিম্নরূপ: এক ব্যক্তির শস্যক্ষেত্রে রাত্রিকালে অপর এক ব্যক্তির মেষপাল ঢুকিয়া উহার ফসল নষ্ট করিয়া ফেলে। অধিকাংশ বিশেষজ্ঞের মতে ইহা ছিল কৃষিক্ষেত্র (তাফসীরে কবীর, ২১খ, পৃ. ১৯৫; রূহুল মা'আনী, ১৭খ, পৃ. ৭৩) এবং আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা), শুরায়হ ও মুকাতিল (র)-এর মতে আঙ্গুর ক্ষেত (কবীর, ২১খ, পৃ. ১৯৫; রূহুল মা'আনী, ১৭খ, পৃ. ৭৪; তাফসীরে ইবন কাছীর, ২খ, পৃ. ৫১৬)। উভয় পক্ষ হযরত দাউদ (আ)-এর নিকট উপস্থিত হইয়া তাঁহার নিকট বিচার প্রার্থনা করিল। তিনি পক্ষদ্বয়ের শুনানী গ্রহণ করার পর ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষকে মেষপাল প্রদানের রায় দিলেন। পক্ষবৃন্দ হযরত সুলায়মান (আ)-এর নিকট দিয়া প্রত্যাবর্তন করাকালে তিনি তাহাদের নিকট মোকদ্দমার রায় জানিতে চাহিলেন। তিনি তাহা অবহিত হইয়া পক্ষদ্বয়কে অপেক্ষা করিতে বলিয়া পিতার নিকট গমন করিলেন। তিনি তাঁহার রায় সম্পর্কে ভিন্নমত পোষণ করিয়া বলিলেন, রায় এইভাবেও হইতে পারে যে, মেষপাল ক্ষেতের মালিকের নিকট সোপর্দ করা হইবে এবং সে ইহার দ্বারা উপকৃত হইতে থাকিবে। অপরদিকে ক্ষতিগ্রস্ত শস্যক্ষেত্র মেষপালের মালিকের নিকট সোপর্দ করা হইবে এবং সে ইহা পূর্বাবস্থাপ্রাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত ইহার পরিচর্যা করিতে থাকিবে, অতঃপর ইহাকে ইহার মালিকের নিকট অর্পণ করিয়া তাহার নিকট হইতে নিজের মেষপাল ফিরাইয়া লইবে (তাফসীরে কবীর, ২১খ, পৃ. ১৯৫; তাফহীমুল কুরআন, ৩খ, পৃ. ১৭৩, টীকা ৭০; তাফসীরে উছমানী, পৃ. ৪৩৭, টীকা ৮; কাসাসুল কুরআন, ২খ, পৃ. ২৮৭; তাহযীব তারীখ দিমাশক, ৬খ, পৃ. ২৫৪; আল-কামিল, ১খ, পৃ. ১৭৫)। ইব্‌ন আব্বাস (রা)-র মতে হযরত সুলায়মান (আ) তখন এগার বৎসরের বালক (তাফসীরে কবীর, ২১খ, পৃ. ১৯৫)। পিতা-পুত্র উভয়ের এই রায় ছিল ইজতিহাদ ভিত্তিক। আল্লাহ তাআলা হযরত সুলায়মান (আ)-কে ইলহামের মাধ্যমে এই মোকদ্দমার যথার্থ ইনসাফের নিকটতর ফয়সালা জ্ঞাত করিলেন, যদিও উভয়ের রায়ই ছিল যথার্থ। হযরত দাউদ (আ) কেবল কৃষকের ক্ষতিপূরণের দিকটি বিবেচনা করেন এবং হযরত সুলায়মান (আ) উভয় পক্ষের জন্য অধিকতর লাভজনক দিকটি বিবেচনা করেন (কাসাসুল কুরআন, ২খ, পৃ. ২৮৭; তাফসীরে উছমানী, পৃ. ৪৩৭, টীকা ৮)। অতঃপর মহান নবীদ্বয় সম্পর্কে বলা হইয়াছে, "এবং তাহাদের প্রত্যেককে আমি প্রজ্ঞা ও জ্ঞান দান করিয়াছিলাম” (২১: ৭৯)। অর্থাৎ তাহাদের এই যোগ্যতা ছিল আল্লাহ প্রদত্ত (তাফহীমুল কুরআন, ৩খ, পৃ. ১৭৩, টীকা ৭০)।
তৎকালের আরও একটি মোকদ্দমার কথা সহীহ হাদীছে উদ্ধৃত হইয়াছে। দুই নারী একটি শিশু সন্তানের মালিকানার দাবি লইয়া হযরত দাউদ (আ)-এর নিকট উপস্থিত হইয়াছিল। বাইবেলে ঘটনার বিবরণ নিম্নরূপ: "সেই সময়ে দুইটি স্ত্রীলোক-তাহারা বেশ্যা-রাজার নিকটে আসিয়া তাঁহার সম্মুখে দাঁড়াইল। একটি স্ত্রীলোক কহিল, হে আমার প্রভু! আমি ও এই স্ত্রীলোকটি উভয়ে এক ঘরে থাকি এবং আমি উহার কাছে ঘরে থাকিয়া প্রসব করি। আমার প্রসবের পর তিন দিনের দিন এই স্ত্রীলোকটি প্রসব করিল। তখন আমরা একত্র ছিলাম, ঘরে আমাদের সঙ্গে অন্য কোন লোক ছিল না, কেবল আমরা দুইজন ঘরে ছিলাম। আর রাত্রিতে এই স্ত্রীলোকটির সন্তানটি মরিয়া গেল, কারণ এ তাহার উপরে শয়ন করিয়াছিল। তাহাতে এ মধ্যরাত্রে উঠিয়া, যখন আপনার দাসী আমি নিদ্রিতা ছিলাম, তখন আমার পার্শ্ব হইতে আমার সন্তানটিকে লইয়া নিজের কোলে শোয়াইয়া রাখিল এবং নিজের মরা সন্তানটিকে আমার কোলে শোয়াইয়া রাখিল। প্রাতঃকালে আমি আপনার সন্তানটিকে দুধ দিতে উঠিলাম, আর দেখ, মরা ছেলে; কিন্তু সকালে তাহার প্রতি ভাল করিয়া দৃষ্টিপাত করিলাম, আর দেখ, সে আমার প্রসূত সন্তান নয়। অন্য স্ত্রীলোকটি কহিল, না, জীবিত সন্তান আমার, মৃত সন্তান তোমার। প্রথম স্ত্রী কহিল, না, না, মৃত সন্তান তোমার, জীবিত সন্তান আমার। এইরূপে তাহারা দুইজনে রাজার সম্মুখে বলাবলি করিল। তখন রাজা কহিলেন, একজন বলিতেছে, এই জীবিত সন্তান আমার, মৃত সন্তান তোমার; অন্যজন বলিতেছে, না, মৃত সন্তান তোমার, জীবিত সন্তান আমার। পরে রাজা বলিলেন, আমার কাছে একখানা খড়গ আন। তাহাতে রাজার কাছে খড়গ আনা হইল। রাজা বলিলেন, এই জীবিত ছেলেটিকে দুই খণ্ড করিয়া ফেল, আর একজনকে অর্ধেক এবং অন্যজনকে অর্ধেক দাও। তখন জীবিত ছেলেটি যাহার সন্তান, সেই স্ত্রী রাজাকে বলিল, হে আমার প্রভু! বিনয় করি, জীবিত ছেলেটি উহাকে দিন, ছেলেটিকে কোন মতে বধ করিবেন না। কিন্তু অপরজন কহিল, সে আমারও না হউক, তোমারও না হউক, দুই খণ্ড কর। তখন রাজা উত্তর করিয়া কহিলেন, জীবিত ছেলেটি উহাকে দাও, কোন মতে বধ করিও না; ঐ উহার মাতা। রাজা বিচারের এই নিষ্পত্তি করিলেন, তাহা শুনিয়া সমস্ত ইস্রায়েল রাজা হইতে ভীত হইল; কেননা তাহারা দেখিতে পাইল, বিচার করণার্থে তাঁহার অন্তরে সদাপ্রভু প্রদত্ত জ্ঞান আছে" (১ম রাজাবলী, ৩: ১৬-২৮)।
হাদীছ শরীফে ঘটনাটি নিম্নোক্তভাবে বর্ণিত হইয়াছে:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ كَانَتْ امْرَأَتَانِ مَعَهُمَا ابْنَهُمَا جَاءَ الذِّئْبُ فَذَهَبَ بِابْنِ إِحْدَاهُمَا فَقَالَتْ صَاحِبَتُهَا إِنَّمَا ذَهَبَ بِابْنِكِ وَقَالَتِ الْأُخْرَى إِنَّمَا ذَهَبَ بِابْنِكِ فَتَحَاكَمَنَا إِلَى دَاوُدَ فَقَضَى بِهِ لِلصُّغْرَى .
আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন: দুইটি স্ত্রীলোকের সহিত তাহাদের নিজ নিজ পুত্রসন্তানও ছিল। একটি নেকড়ে বাঘ আসিয়া তাহাদের একজনের সন্তানকে ছিনাইয়া লইয়া গেল। তাহার সঙ্গিনী বলিল, সে তোমার পুত্রকে লইয়া গিয়াছে। অপরজন বলিল, না, সে তোমার পুত্রকেই লইয়া গিয়াছে। তাহারা উভয়ে হযরত দাউদ (আ)-এর নিকট বিচারপ্রার্থী হইল। তিনি ছেলেটির ব্যাপারে অধিক বয়স্কা স্ত্রীলোকটির পক্ষে রায় দিলেন। অতঃপর নারীদ্বয় প্রস্থান করিয়া দাউদ (আ)-এর পুত্র সুলায়মান (আ)-এর সম্মুখ দিয়া অতিক্রম করাকালে তাঁহাকে মোকদ্দমার বিবরণ শুনাইল। তিনি (লোকদেরকে) বলিলেন, তোমরা আমার জন্য একটি ছুরি আনো, আমি ইহাকে দ্বিখণ্ডিত করিয়া তাহাদের দুইজনের মধ্যে বণ্টন করিব। স্বল্পবয়সী স্ত্রীলোকটি বলিল, আপনি ইহা করিবেন না, আল্লাহ আপনার প্রতি দয়াপরবশ হউন। (আমি মানিয়া লইয়াছি যে,) শিশুটি তাহারই। অতঃপর তিনি শিশুটির ব্যাপারে স্বল্প বয়স্কা স্ত্রীলোকটির পক্ষে রায় দিলেন” (বুখারী, কিতাবুল আম্বিয়া, বাব ৪০, ১খ, পৃ. ৪৮৭; মুসলিম, কিতাবুল আকদিয়া, বাব বায়ানি ইখতিলাফিল মুজতাহিদায়ন, ২খ, পৃ. ৭৭; তাফসীর ইব্‌ন কাছীর, ২খ, পৃ. ৫১৬; তাহযীব তারীখ দিমাশক, ৬খ, পৃ. ২৭০)।
হাদীছের বক্তব্য ও বাইবেলের বিবরণের মধ্যে নিম্নরূপ পার্থক্য বিদ্যমান: (১) হাদীছে ইহা হযরত দাউদ (আ)-এর রাজত্বকালের ঘটনা এবং বাইবেলে হযরত সুলায়মান (আ)-এর রাজত্বকালের ঘটনা বলিয়া উদ্ধৃত হইয়াছে। (২) বাইবেলে নারীদ্বয়কে বারাঙ্গনা হিসাবে চিত্রিত করা হইয়াছে, পক্ষান্তরে হাদীছে তাহারা দুইজন সাধারণ নারী হিসাবে উক্ত হইয়াছে এবং তাহাদের প্রতি চারিত্রিক কলঙ্ক আরোপ করা হয় নাই। (৩) বাইবেলে বলা হইয়াছে যে, শিশুটি মাতৃপৃষ্ঠে পিষ্ট হইয়া মারা গিয়াছিল, পক্ষান্তরে হাদীছে বলা হইয়াছে যে, নেকড়ে বাঘ শিশুটিকে ছিনাইয়া লইয়া গিয়াছিল। সার্বিক বিবেচনায় হাদীছের বিবরণই যথার্থ। কারণ বাইবেল যুগযুগান্তরের অব্যাহত বিকৃতিসহ বর্তমান রূপ ধারণ করিয়াছে। তাই একটি অনির্ভরযোগ্য গ্রন্থের বর্ণনা একজন সত্যবাদী ও সত্যবাদী বলিয়া স্বীকৃত নবীর বর্ণনার সমতুল্য হইতে পারে না, উহার সমর্থক হইতে পারে মাত্র।
উল্লিখিত দুইটি মোকদ্দমা ব্যতীত সুলায়মান (আ) কর্তৃক মীমাংসিত আর কোন ঘটনা নির্ভরযোগ্য সূত্রে বর্ণিত হয় নাই। অবশ্য ইতিহাস ও কাসাসুল আম্বিয়া জাতীয় গ্রন্থাবলীতে এই জাতীয় কতক ঘটনার উল্লেখ আছে। এক ব্যক্তি হযরত সুলায়মান (আ)-এর নিকট উপস্থিত হইয়া বলিল, আমার প্রতিবেশী আমার রাজহাঁস চুরি করিয়াছে। তিনি নামাযের জন্য সমবেত হওয়ার আহ্বান জানাইলেন, অতঃপর তাহাদের উদ্দেশে প্রদত্ত ভাষণে বলিলেন, তোমাদের মধ্যকার একজন তাহার প্রতিবেশীর রাজহাঁস চুরি করিয়াছে, অতঃপর মসজিদে প্রবেশ করিয়াছে এবং হাঁসের পালক তাহার মাথায় লাগিয়া আছে। একটি লোক তাহার মাথায় হাত তুলিয়া তাহা মর্দন করিলে হযরত সুলায়মান (আ) বলিলেন, ইহাকে গ্রেফতার কর, সে-ই চোর (তাহযীব তারীখ দিমাশক, ৬খ, পৃ. ২৭০)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00