📄 সুলায়মান (আ) দাউদ (আ)-এর উত্তরাধিকারী
আল্লাহ তা'আলা যোগ্য পিতাকে যোগ্য উত্তরাধিকারী পুত্র দান করিয়াছিলেন (দ্র. ২৭: ১৬)।
وَوَهَبْنَا لِدَاؤُدَ سُلَيْمَانَ نِعْمَ الْعَبْدُ إِنَّهُ أَوَّابٌ .
"আমি দাউদকে দান করিয়াছিলাম সুলায়মান। সে ছিল উত্তম বান্দা এবং অতিশয় আল্লাহ অভিমুখী” (৩৮: ৩০)।
পরবর্তী ইতিহাস প্রমাণ করে যে, সুলায়মান (আ) তাঁহার পিতার রাজত্বকে আরও সম্প্রসারিত করিয়া উহাকে দৃঢ়তা দান করেন, সাবা সাম্রাজ্যকে ইসলামী শাসনাধীনে আনয়ন করেন এবং সাবার রাণী বিলকীস পারিষদবর্গসহ শিরক ত্যাগ করিয়া ইসলাম গ্রহণ করেন (বিস্তারিত দ্র. শিরো. সুলায়মান আ.)।
এখানে উত্তরাধিকার বলিতে ধন-সম্পত্তির উত্তরাধিকার বুঝানো হয় নাই, বরং নবুওয়াত ও খিলাফাতের উত্তরাধিকার বুঝানো হইয়াছে। কারণ তিনি একাধারে নবুওয়াত প্রাপ্ত হন এবং পিতার পরে তাঁহার রাজ্যের অধিপতি হন। অতএব উক্ত আয়াত মহানবী (স)-এর নিম্নোক্ত বাণীর বিরোধী নহে:
لا نُورَثْ مَا تَرَكْنَا صَدَقَةٌ
"আমাদের (নবী-রাসূলগণের) ওয়ারিছ হয় না, আমরা যাহা রাখিয়া যাই তাহা সাদাকা" (বুখারী, জিহাদ, বাব ২০২, নং ২৮৬৩; ই'তিসাম, ৫খ, পৃ. ৪২৪, নং ৬৭৯৫; নাফাকাত, ৫খ, পৃ. ১৬৩-৪, নং ৪৯৫৮; মুসলিম, জিহাদ, ৬খ, নং ৪৪২৫, ৪৪২৭-৮, ৪৪৩০, ৪৪৩৩; তিরমিযী, সিয়ার, বাব ৪৩, নং ১৫৫৪, ১৫৫৬)।
إِنَّ النَّبِيُّ لَا يُورَثُ إِنَّمَا مِيرَاثُهُ فِي فُقَرَاءِ الْمُسْلِمِينَ وَالْمَسَاكِينِ .
"নবীর ওয়ারিছ হয় না। তাঁহার পরিত্যক্ত সম্পত্তি মুসলমানদের ফকীর-মিসকীনদের জন্য" (মুসনাদে আহমাদ, ১খ, পৃ. ১০, ১৩)।
الْعُلَمَاءُ وَرَثَةُ الأَنْبِيَاءِ وَإِنَّ الأَنْبِيَاءَ لَمْ يُوْرِثُوا ديناراً وَلَا دِرْهَمَا وَلَكِنْ وَرَثُوا الْعِلْمَ .
"আলেমগণ নবীগণের ওয়ারিছ। নবীগণ দীনার কিংবা দিরহাম (ধন-সম্পদ) রাখিয়া যান নাই, বরং রাখিয়া গিয়াছেন জ্ঞান" (আবূ দাউদ, ইলম, বাব ১; তিরমিযী, ইলম, বাব ১৯, নং ২৬১৯; ইবন মাজা, মুকাদ্দিমা, বাব ১৭, নং ২২৩)।
অতএব সুলায়মান (আ) তাঁহার পিতার নবুওয়াত ও রাষ্ট্র পরিচালনা কার্যাদির ওয়ারিছ হইয়াছিলেন (বিস্তারিত দ্র. তাফসীরে কবীর, ২৪খ, পৃ. ১৮৬; তাফহীমুল কুরআন, ৩খ, পৃ. ৫৬১-২, টীকা ২০; মাআরেফুল কোরআন, ৬ খ, পৃ. ৬২৩; রূহুল মাআনী, ১৯ খ, পৃ. ১৭০-১)।
📄 দাউদ (আ)-এর কণ্ঠস্বর
আল্লাহ তাআলা দাউদ (আ)-কে এমন এক হৃদয়স্পর্শী সুললিত কণ্ঠস্বর দান করিয়াছিলেন যে, তাঁহার আবেগময় সুরমুর্ছনায় প্রতিটি প্রাণী বিমোহিত হইয়া থমকিয়া দাঁড়াইত। তিনি যখন আল্লাহ্র যিকিরে মশগুল হইতেন বা আল্লাহর কিতাব তিলাওয়াত করিতেন তখন তাঁহার সুর মাধুর্যে প্রাণীজগত বিমোহিত হইয়া তাঁহার সহিত যিকিরে লিপ্ত হইত, এমনকি পাহাড়-পর্বতও যিকিরে শরীক হইত। তাঁহার কণ্ঠস্বর প্রবাদবাক্যে (লাহন-ই দাউদ) পরিণত হইয়াছে (বিদায়া, ২খ, পৃ. ১০-১১; তাহযীব তারীখ দিমাশক, ৫ খ, পৃ. ১৯৪-৫; আরাইস, পৃ. ২৯৭; নাজ্জার, কাসাস, পৃ. ৩১১; তাফসীরে কবীর, ২৬ খ., পৃ. ১৮৫)।
আইশা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) আবূ মূসা আশআরী (রা)-র কুরআন তিলাওয়াত শুনিয়া বলেন, আবূ মূসাকে দাউদ (আ)-এর সুর দান করা হইয়াছে (মুসনাদে আহমাদের বরাতে বিদায়া, ২খ, পৃ. ১১; একই বরাতে আবূ হুরায়রা (রা) কর্তৃকও অনুরূপ হাদীছ বর্ণিত হইয়াছে)।
বাদ্যযন্ত্র শয়তানের আবিষ্কার। শয়তান যখন লক্ষ্য করিল যে, দাউদ (আ)-এর সুরমাধুর্যে মুগ্ধ হইয়া মানব, পশু-পাখি, গাছপালা, পাহাড়-পর্বত ইত্যাদি তাঁহার সহিত আল্লাহর যিকিরে মশগুল হইতেছে, তখন সে তাহাদেরকে পথভ্রষ্ট করিবার উপায় উদ্ভাবন করিতে তাহার অনুচরদিগকে নির্দেশ দিল। ইহারা দাউদ (আ)-এর ৭০টি সুর বিভিন্ন রকম বাদ্যযন্ত্রে নকল করিয়া মানুষকে পথভ্রষ্ট করে (আরাইস, পৃ. ২৯৭; তাহযীব তারীখ দিমাশক, ৫খ, পৃ. ১৯৫-৬)।
এইজন্যই মহানবী (স) বাদ্যযন্ত্রকে “মাযামীরুশ শায়তান” (শয়তানের বাদ্যযন্ত্র) আখ্যায়িত করিয়াছেন। হযরত আবূ বাক্স (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর গৃহে প্রবেশ করিয়া দুইটি বালিকাকে সংগীত পরিবেশন করিতে দেখিয়া বলিলেন:
الْمَرْمُورِ الشَّيْطَانِ فِي بَيْتِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ .
"শয়তানের বাদ্যযন্ত্র দ্বারা কি রাসূলুল্লাহ (স)-এর গৃহে গান গাওয়া হইতেছে”। (মুসলিম, ঈদায়ন, নং ১৯৩১, ৩খ, ২৪৬; আরও দ্র. নং ১৯৩৫, পৃ. ২৪৮; বুখারী, মানাকিব, ৩খ, পৃ. ৬৫৯, বাব ১০৪, নং ৩৬৪১; জিহাদ, বাবা ৮০, নং ২৬৯২, পৃ. ১৩০-১)।
আনাস (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলেনঃ
صوتَانِ مَلْعُونَانِ فَاجِرَانِ أَنْهَى عَنْهُمَا صَوْتُ عِزْمَارٍ وَرَنَّهُ شَيْطَانٍ .
"দুইটি শব্দ অভিশপ্ত ও পাপিষ্ঠ, আমি সেই দুইটি নিষিদ্ধ করিতেছি: বাদ্যযন্ত্রের শব্দ ও শয়তানের আওয়াজ” (জামে তিরমিযীর বরাতে কুরতুবী, ১৪খ, পৃ. ১৫৩)।
উল্লেখ্য যে, দাউদ (আ)-এর কণ্ঠস্বরকেও মিযমার (বাদ্যযন্ত্র) বলা হইয়াছে। তাহা বাদ্যযন্ত্র অর্থে নহে, বরং সুমধুর সুর হিসাবে।
📄 শাসক ও সংগঠক হিসাবে হযরত দাউদ (আ)
হযরত দাউদ, (আ)-এর নবুওয়াত প্রাপ্তি ও রাজত্বলাভ সম্পর্কে কুরআন মজীদে পরিষ্কার বক্তব্য বিদ্যমান থাকিলেও তিনি কোনটি আগে লাভ করিয়াছেন তাহা সুনির্দিষ্টভাবে বর্ণিত হয় নাই। World Biography নামক বিশ্বকোষে বলা হইয়াছে যে, নবী শামুয়েল (আ) গোপনে দাউদ (আ)-কে তালূতের পরবর্তী রাজা মনোনীত করেন (৩খ, পৃ. ২৮৪)। বিভিন্ন গ্রন্থে তাঁহার রাজত্বকাল সম্পর্কে সামান্য ব্যবধান সহকারে নিম্নোক্ত তারিখসমূহ উল্লেখ করা হইয়াছে: তালুতের রাজত্বকাল ১০২০-১০০৪ খৃ, পৃ.; দাউদ (আ)-এর রাজত্বকাল ১০০৪-৯৬৫ খৃ. পূ. এবং সুলায়মান (আ)-এর রাজত্বকাল ৯৬৫-৯২৬ খৃ. পূ. (তাফহীমুল কুরআন, সূরা ইসরার ৭নং টীকা দ্র.)। অন্যান্য গ্রন্থে দাউদ (আ)-এর রাজত্বকাল ১০১০-৯৭০ খৃ. পূ. (World Biography, ৩খ., পৃ. ২৮৪); ১০০০-৯৬০ খৃ. পৃ. (Ency. Religion, ৪খ., পৃ. ২৪২); ১০০০-৯৬২ খৃ. পূ. (Ency. Brit., ৫খ পৃ. ৫১৮); ১০০২-৯৬২ খৃ. পূ. (Ency. Americana, ৮খ, পৃ. ৫২৬)। দাউদ (আ)-ই প্রথম ব্যক্তি যিনি একই সঙ্গে ইয়াহুদী জাতির নবী ও শাসক নিযুক্ত হন। তিনি জুদাহ ও ইসরাঈল এই দুই রাষ্ট্রকে একত্র করেন এবং ইয়াহুদী জাতির ত্রাণকর্তারূপে আবির্ভূত হন। তিনি ইয়াহুদীদেরকে ফিলিস্তিনী আমালিকাদের স্বৈরশাসন হইতে মুক্ত করেন এবং প্রতিবেশী ইদোম, মোয়াব ও আম্মুনের উপর এবং সিরিয়ার আরামিয়ান রাজ্যের উপর কর্তৃত্ব বিস্তার করেন। একই সময় তিনি টায়ার ও হামাহ-এর শাসকগণের সহিত চুক্তিবদ্ধ হন। তিনি সম্মিলিত জুদাহ ও ইসরাঈল রাষ্ট্রের সীমা কতিপয় কানআনী শহর পর্যন্ত বিস্তৃত করেন এবং জেরুসালেম অধিকার করিয়া তথায় স্বীয় রাজ্যের রাজধানী স্থাপন করেন। তাঁহার রাজ্যসীমা ফোরাত নদী হইতে ভূমধ্য সাগর এবং দামিক হইতে আরব সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। তিনিই ছিলেন ইসরাঈলের প্রথম সফল শাসক। তিনিই সর্বপ্রথম ইয়াহুদীদের বারোটি গোত্রকে ঐক্যবদ্ধ করিয়া একটি সুসংহত জাতিতে পরিণত করিতে সক্ষম হন। তিনি সাফল্যের সহিত সাত বৎসর হেব্রোনে এবং তেত্রিশ বৎসর জেরুসালেমে রাজত্ব করেন।
শাসক হিসাবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত ন্যায়পরায়ণ। কারণ তিনি আল্লাহর পথনির্দেশনায় শাসনকার্য পরিচালনা করিতেন। মহান আল্লাহ তাঁহাকে নির্দেশ দেন: “হে দাউদ! আমি তোমাকে পৃথিবীতে খলীফা বানাইয়াছি। অতএব তুমি লোকদের মধ্যে সুবিচার কর” (৩৮: ২৬)। তাঁহার জীবনচারের মধ্য দিয়া তাঁহার ন্যায়পরায়ণতার প্রকাশ ঘটিয়াছে। এতবড় সাম্রাজ্যের একচ্ছত্র শাসক হওয়া সত্ত্বেও তিনি সাধারণ লোকের মত জীবনযাপন করিতেন, রাজকোষ হইতে ভাতা গ্রহণের পরিবর্তে স্বোপার্জিত আয় দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করিতেন এবং আল্লাহ্ ইবাদতে মশগুল থাকিতেন। কোন কোন ঐতিহাসিক হযরত লুকমান হাকীম (দ্র.)-কে তাঁহার সমসাময়িক বলিয়া মত প্রকাশ করিয়াছেন, তিনি তাঁহার রাষ্ট্রের নাগরিক ছিলেন এবং উভয়ের মধ্যে সাক্ষাতও হইয়াছে (তাহযীব তারীখ দিমাল্ক, ৫খ, পৃ. ১৯২)। তিনি তাঁহার মত একজন প্রতিভাবান লোকের দ্বারা প্রশাসনিক কার্যে নিশ্চয়ই উপকৃত হইয়া থাকিবেন। তাঁহার সময়ই জেরুসালেম ইয়াহুদী রাষ্ট্রের রাজধানী হিসাবে গড়িয়া উঠে এবং তিনি এখানে রাজপ্রাসাদ নির্মাণ করেন। তিনিই বায়তুল মাকদিস নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করেন এবং তৎপুত্র সুলায়মান (আ)-এর প্রচেষ্টায় উহার নির্মাণকাজ সমাপ্ত হয় (আল-কামিল, ১খ, পৃ. ১৭৪)। এক কথায় তিনিই ছিলেন ইয়াহুদী রাষ্ট্রের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা এবং ইহার ভিত সুদৃঢ়কারী (আল-মুমজিদ, মু'জাম অংশ, দাউদ শিরো.)।
📄 দাউদ (আ) ও সুলায়মান (আ)-এর বিচারকর্ম
সূরা আম্বিয়ায় দাউদ-সুলায়মান (আ) তথা পিতা-পুত্র কর্তৃক একটি ঘটনার বিচারের কথা উল্লিখিত হইয়াছে। মহান আল্লাহ বলেন: "এবং (স্মরণ কর) দাউদ ও সুলায়মানের কথা, যখন তাহারা শস্যক্ষেত্র সম্পর্কে বিচার করিতেছিল। তাহাতে রাত্রিকালে কোন সম্প্রদায়ের মেষপাল প্রবেশ করিয়াছিল। আমি তাহাদের বিচার প্রত্যক্ষ করিতেছিলাম। আর আমি সুলায়মানকে উহার মীমাংসা বুঝাইয়া দিয়াছিলাম এবং তাহাদের প্রত্যেককে আমি প্রজ্ঞা ও জ্ঞান দান করিয়াছিলাম" (২১:৭৮-৭৯)।
মুসলিম উম্মাহর তাফসীরবিদ ও ঐতিহাসিকগণ ঘটনাটি এইভাবে বর্ণনা করিয়াছেন: এক ব্যক্তির ক্ষেত্রে রাত্রিবেলা অপর এক ব্যক্তির মেষপাল প্রবেশ করিয়া উহার ফসল বিনষ্ট করিয়া দিয়াছিল। অধিকাংশ তাফসীরকার ও ঐতিহাসিকের মতে ইহা ছিল কৃষিক্ষেত্র (তাফসীরে কবীর, ২১খ, ১৯৫; রূহুল মাআনী, ১৭ খ., পৃ. ৭৩) এবং আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ, শুরায়হ ও মুকাতিল (র)-এর মতে আঙ্গুর ক্ষেত্র (কবীর, ২১খ, ১৯৫; রূহ, ১৭খ, ৭৪; ইব্ন কাছীর, ২খ, ৫১৬)। উভয় পক্ষ হযরত দাউদ (আ)-এর দরবারে উপস্থিত হইয়া তাঁহার নিকট বিচার প্রার্থনা করিল।
উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনিয়া তিনি মেষপাল ক্ষেত্রের মালিককে দান করার রায় প্রদান করিলেন। পক্ষদ্বয় সুলায়মান (আ)-এর নিকট দিয়া প্রত্যাবর্তন করাকালে তিনি তাহাদেরকে বিচারের রায় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন। তিনি পক্ষদ্বয়কে থামাইয়া পিতার নিকট উপস্থিত হইয়া তাঁহার রায় সম্পর্কে ভিন্নমত ব্যক্ত করিলেন এবং বলিলেন, মীমাংসা এইভাবে হইতে পারে যে, মেষপাল ক্ষেত্রের মালিকের নিকট সোপর্দ করা হইবে এবং সে ইহার দ্বারা উপকৃত হইতে থাকিবে। আর ক্ষতিগ্রস্ত শস্যক্ষেত্র মেষপালের মালিকের নিকট সোপর্দ করা হইবে। সে ইহার রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচর্যা করিতে থাকিবে। ইহা পূর্বাবস্থায় ফিরিয়া আসিলে সে তাহা মালিকের দখলে সোপর্দ করিয়া তাহার নিকট হইতে নিজের মেষপাল ফিরাইয়া লইবে (কবীর, ২১ খ, পৃ. ১৯৫; মাআরিফুল কোরআন, সংক্ষিপ্ত সৌদী সং, পৃ. ৮৮৩-৪; তাফহীমুল কুরআন, সূরা আম্বিয়া, ৭০ নং টীকা; কাসাসুল কুরআন, ২খ, পৃ. ২৮৭)।
উক্ত রায় সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন, "আমি সুলায়মানকে উহার মীমাংসা বুঝাইয়া দিয়াছিলাম" (২১৪ ৭৯)। ইব্ন আব্বাস (রা)-এর মতে সুলায়মান (আ) তখন এগার বৎসরের বালক (কবীর, ২১ খ, পৃ. ১৯৫)। পিতা-পুত্রের এই রায় ছিল ইজতিহাদ ভিত্তিক। যথার্থ ইনসাফের নিকটতর ফয়সালা আল্লাহ তা'আলা ইলহামের মাধ্যমে সুলায়মান (আ)-কে বুঝাইয়া দিয়াছিলেন। উভয়ের রায়ই মূলত সঠিক ছিল। দাউদ (আ) কেবল কৃষকের ক্ষতির বিষয়টি বিবেচনা করেন এবং তাহার ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করেন। তবে পুত্রের মীমাংসা অধিকতর যথার্থ ছিল (কাসাসুল কুরআন, ২ খ, পৃ. ২৮৭)। অতঃপর এই দুই মহান নবীর যে যোগ্যতার কথা উল্লেখ করা হইয়াছে তাহা এই কথা বুঝাইবার জন্য বলা হইয়াছে যে, ইহা সবই আল্লাহ প্রদত্ত যোগ্যতা (তাফহীম, সূরা আম্বিয়া, ৭০ নং টীকা)।
তৎকালের আরও একটি মোকদ্দমার কথা সহীহ হাদীছে উদ্ধৃত হইয়াছে। দুই নারী একটি শিশু সন্তানের মালিকানার দাবি লইয়া হযরত দাউদ (আ)-এর নিকট উপস্থিত হইয়াছিল। বাইবেলে ঘটনার বিবরণ নিম্নরূপ: "সেই সময়ে দুইটি স্ত্রীলোক-তাহারা বেশ্যা-রাজার নিকটে আসিয়া তাঁহার সম্মুখে দাঁড়াইল। একটি স্ত্রীলোক কহিল, হে আমার প্রভু! আমি ও এই স্ত্রীলোকটি উভয়ে এক ঘরে থাকি এবং আমি উহার কাছে ঘরে থাকিয়া প্রসব করি। আমার প্রসবের পর তিন দিনের দিন এই স্ত্রীলোকটি প্রসব করিল। তখন আমরা একত্র ছিলাম, ঘরে আমাদের সঙ্গে অন্য কোন লোক ছিল না, কেবল আমরা দুইজন ঘরে ছিলাম। আর রাত্রিতে এই স্ত্রীলোকটির সন্তানটি মরিয়া গেল, কারণ এ তাহার উপরে শয়ন করিয়াছিল। তাহাতে এ মধ্যরাত্রে উঠিয়া, যখন আপনার দাসী আমি নিদ্রিতা ছিলাম, তখন আমার পার্শ্ব হইতে আমার সন্তানটিকে লইয়া নিজের কোলে শোয়াইয়া রাখিল এবং নিজের মরা সন্তানটিকে আমার কোলে শোয়াইয়া রাখিল। প্রাতঃকালে আমি আপনার সন্তানটিকে দুধ দিতে উঠিলাম, আর দেখ, মরা ছেলে; কিন্তু সকালে তাহার প্রতি ভাল করিয়া দৃষ্টিপাত করিলাম, আর দেখ, সে আমার প্রসূত সন্তান নয়। অন্য স্ত্রীলোকটি কহিল, না, জীবিত সন্তান আমার, মৃত সন্তান তোমার। প্রথম স্ত্রী কহিল, না, না, মৃত সন্তান তোমার, জীবিত সন্তান আমার। এইরূপে তাহারা দুইজনে রাজার সম্মুখে বলাবলি করিল। তখন রাজা কহিলেন, একজন বলিতেছে, এই জীবিত সন্তান আমার, মৃত সন্তান তোমার; অন্যজন বলিতেছে, না, মৃত সন্তান তোমার, জীবিত সন্তান আমার। পরে রাজা বলিলেন, আমার কাছে একখানা খড়গ আন। তাহাতে রাজার কাছে খড়গ আনা হইল। রাজা বলিলেন, এই জীবিত ছেলেটিকে দুই খণ্ড করিয়া ফেল, আর একজনকে অর্ধেক এবং অন্যজনকে অর্ধেক দাও। তখন জীবিত ছেলেটি যাহার সন্তান, সেই স্ত্রী রাজাকে বলিল, হে আমার প্রভু! বিনয় করি, জীবিত ছেলেটি উহাকে দিন, ছেলেটিকে কোন মতে বধ করিবেন না। কিন্তু অপরজন কহিল, সে আমারও না হউক, তোমারও না হউক, দুই খণ্ড কর। তখন রাজা উত্তর করিয়া কহিলেন, জীবিত ছেলেটি উহাকে দাও, কোন মতে বধ করিও না; ঐ উহার মাতা। রাজা বিচারের এই নিষ্পত্তি করিলেন, তাহা শুনিয়া সমস্ত ইস্রায়েল রাজা হইতে ভীত হইল; কেননা তাহারা দেখিতে পাইল, বিচার করণার্থে তাঁহার অন্তরে সদাপ্রভু প্রদত্ত জ্ঞান আছে" (১ম রাজাবলী, ৩: ১৬-২৮)।
হাদীছ শরীফে ঘটনাটি নিম্নোক্তভাবে বর্ণিত হইয়াছে:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ كَانَتْ امْرَأَتَانِ مَعَهُمَا ابْنَاهُمَا جَاءَ الذِّئْبُ فَذَهَبَ بِابْنِ إِحْدَاهُمَا فَقَالَتْ صَاحِبَتُهَا إِنَّمَا ذَهَبَ بِابْنِكِ وَقَالَتِ الْأُخْرَى إِنَّمَا ذَهَبَ بِابْنِكِ فَتَحَاكَمَنَا إِلَى دَاوُدَ فَقَضَى بِهِ لِلصُّغْرَى .
আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন: দুইটি স্ত্রীলোকের সহিত তাহাদের নিজ নিজ পুত্রসন্তানও ছিল। একটি নেকড়ে বাঘ আসিয়া তাহাদের একজনের সন্তানকে ছিনাইয়া লইয়া গেল। তাহার সঙ্গিনী বলিল, সে তোমার পুত্রকে লইয়া গিয়াছে। অপরজন বলিল, না, সে তোমার পুত্রকেই লইয়া গিয়াছে। তাহারা উভয়ে হযরত দাউদ (আ)-এর নিকট বিচারপ্রার্থী হইল। তিনি ছেলেটির ব্যাপারে অধিক বয়স্কা স্ত্রীলোকটির পক্ষে রায় দিলেন। অতঃপর নারীদ্বয় প্রস্থান করিয়া দাউদ (আ)-এর পুত্র সুলায়মান (আ)-এর সম্মুখ দিয়া অতিক্রম করাকালে তাঁহাকে মোকদ্দমার বিবরণ শুনাইল। তিনি (লোকজনকে) বলিলেন, তোমরা আমার জন্য একটি ছুরি আনো, আমি ইহাকে দ্বিখণ্ডিত করিয়া তাহাদের দুইজনের মধ্যে বণ্টন করিব। স্বল্পবয়সী স্ত্রীলোকটি বলিল, আপনি ইহা করিবেন না, আল্লাহ আপনার প্রতি দয়াপরবশ হউন। (আমি মানিয়া লইয়াছি যে,) শিশুটি তাহারই। অতঃপর তিনি শিশুটির ব্যাপারে স্বল্প বয়স্কা স্ত্রীলোকটির পক্ষে রায় দিলেন” (বুখারী, কিতাবুল আম্বিয়া, বাব ৪০, ১খ, পৃ. ৪৮৭; মুসলিম, কিতাবুল আকদিয়া, বাব বায়ানি ইখতিলাফিল মুজতাহিদায়ন, ২খ, পৃ. ৭৭; তাফসীর ইব্ন কাছীর, ২খ, পৃ. ৫১৬; তাহযীব তারীখ দিমাশক, ৬খ, পৃ. ২৭০)।
হাদীছের বক্তব্য ও বাইবেলের বিবরণের মধ্যে নিম্নরূপ পার্থক্য বিদ্যমান: (১) হাদীছে ইহা হযরত দাউদ (আ)-এর রাজত্বকালের ঘটনা এবং বাইবেলে হযরত সুলায়মান (আ)-এর রাজত্বকালের ঘটনা বলিয়া উদ্ধৃত হইয়াছে। (২) বাইবেলে নারীদ্বয়কে বারাঙ্গনা হিসাবে চিত্রিত করা হইয়াছে, পক্ষান্তরে হাদীছে তাহারা দুইজন সাধারণ নারী হিসাবে উক্ত হইয়াছে এবং তাহাদের প্রতি চারিত্রিক কলঙ্ক আরোপ করা হয় নাই। (৩) বাইবেলে বলা হইয়াছে যে, শিশুটি মাতৃপৃষ্ঠে পিষ্ট হইয়া মারা গিয়াছিল, পক্ষান্তরে হাদীছে বলা হইয়াছে যে, নেকড়ে বাঘ শিশুটিকে ছিনাইয়া লইয়া গিয়াছিল। সার্বিক বিবেচনায় হাদীছের বিবরণই যথার্থ। কারণ বাইবেল যুগযুগান্তরের অব্যাহত বিকৃতিসহ বর্তমান রূপ ধারণ করিয়াছে। তাই একটি অনির্ভরযোগ্য গ্রন্থের বর্ণনা একজন সত্যবাদী ও সত্যবাদী বলিয়া স্বীকৃত নবীর বর্ণনার সমতুল্য হইতে পারে না, উহার সমর্থক হইতে পারে মাত্র।
উল্লিখিত দুইটি মোকদ্দমা ব্যতীত সুলায়মান (আ) কর্তৃক মীমাংসিত আর কোন ঘটনা নির্ভরযোগ্য সূত্রে বর্ণিত হয় নাই। অবশ্য ইতিহাস ও কাসাসুল আম্বিয়া জাতীয় গ্রন্থাবলীতে এই জাতীয় কতক ঘটনার উল্লেখ আছে। এক ব্যক্তি হযরত সুলায়মান (আ)-এর নিকট উপস্থিত হইয়া বলিল, আমার প্রতিবেশী আমার রাজহাঁস চুরি করিয়াছে। তিনি নামাযের জন্য সমবেত হওয়ার আহ্বান জানাইলেন, অতঃপর তাহাদের উদ্দেশে প্রদত্ত ভাষণে বলিলেন, তোমাদের মধ্যকার একজন তাহার প্রতিবেশীর রাজহাঁস চুরি করিয়াছে, অতঃপর মসজিদে প্রবেশ করিয়াছে এবং হাঁসের পালক তাহার মাথায় লাগিয়া আছে। একটি লোক তাহার মাথায় হাত তুলিয়া তাহা মর্দন করিলে হযরত সুলায়মান (আ) বলিলেন, ইহাকে গ্রেফতার কর, সে-ই চোর (তাহযীব তারীখ দিমাশক, ৬খ, পৃ. ২৭০)।