📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 পাখির ভাষা বোঝার ক্ষমতা

📄 পাখির ভাষা বোঝার ক্ষমতা


আল্লাহ তা'আলা হযরত দাউদ (আ) ও হযরত সুলায়মান (আ)-কে মুজিয়াস্বরূপ পাখীর ভাষা বুঝিবার ক্ষমতা দান করিয়াছিলেন। একই ভাষাভাষী মানুষ যেমন সহজেই পরস্পরের কথা বুঝিতে পারে, তদ্রূপ তাঁহারাও পাখির ডাক শুনিয়া তাহার অর্থ বুঝিতে পারিতেন। মহান আল্লাহ বলেন:
وَوَرِثَ سُلَيْمَانُ دَاوُدَ وَقَالَ يَا أَيُّهَا النَّاسُ عُلِّمْنَا مَنْطِقَ الطَّيْرِ وَأُوتِينَا مِنْ كُلِّ شَيْءٍ .
"সুলায়মান দাউদের উত্তরাধিকারী হইল এবং সে বলিল, হে জনগণ! আমাদেরকে পক্ষীকুলের ভাষা শিক্ষা দেওয়া হইয়াছে এবং আমাকে সকল কিছু দেওয়া হইয়াছে; ইহা অবশ্যই সুস্পষ্ট অনুগ্রহ” (২৭: ১৬)।
আল্লামা বায়দাবী (র) বলেন, 'উল্লিমনা' ও 'উতীনা' ক্রিয়াপদদ্বয়ের সর্বনাম (দামীর) দ্বারা, পিতা-পুত্র উভয়কে বুঝানো হইয়াছে (নাজ্জার, কাসাস, পৃ. ৩১০; আরও তু. আনওয়ারে আম্বিয়ড়, পৃ. ১১০-১১; কাসাসুল কুরআন, বাংলা অনু., ২খ, পৃ. ২৮৫)। তবে অনেক তাফসীরকারের মতে কেবল সুলায়মান (আ)-কে এই ক্ষমতা প্রদান করা হইয়াছিল।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সুলায়মান (আ) দাউদ (আ)-এর উত্তরাধিকারী

📄 সুলায়মান (আ) দাউদ (আ)-এর উত্তরাধিকারী


আল্লাহ তা'আলা যোগ্য পিতাকে যোগ্য উত্তরাধিকারী পুত্র দান করিয়াছিলেন (দ্র. ২৭: ১৬)।
وَوَهَبْنَا لِدَاؤُدَ سُلَيْمَانَ نِعْمَ الْعَبْدُ إِنَّهُ أَوَّابٌ .
"আমি দাউদকে দান করিয়াছিলাম সুলায়মান। সে ছিল উত্তম বান্দা এবং অতিশয় আল্লাহ অভিমুখী” (৩৮: ৩০)।
পরবর্তী ইতিহাস প্রমাণ করে যে, সুলায়মান (আ) তাঁহার পিতার রাজত্বকে আরও সম্প্রসারিত করিয়া উহাকে দৃঢ়তা দান করেন, সাবা সাম্রাজ্যকে ইসলামী শাসনাধীনে আনয়ন করেন এবং সাবার রাণী বিলকীস পারিষদবর্গসহ শিরক ত্যাগ করিয়া ইসলাম গ্রহণ করেন (বিস্তারিত দ্র. শিরো. সুলায়মান আ.)।
এখানে উত্তরাধিকার বলিতে ধন-সম্পত্তির উত্তরাধিকার বুঝানো হয় নাই, বরং নবুওয়াত ও খিলাফাতের উত্তরাধিকার বুঝানো হইয়াছে। কারণ তিনি একাধারে নবুওয়াত প্রাপ্ত হন এবং পিতার পরে তাঁহার রাজ্যের অধিপতি হন। অতএব উক্ত আয়াত মহানবী (স)-এর নিম্নোক্ত বাণীর বিরোধী নহে:
لا نُورَثْ مَا تَرَكْنَا صَدَقَةٌ
"আমাদের (নবী-রাসূলগণের) ওয়ারিছ হয় না, আমরা যাহা রাখিয়া যাই তাহা সাদাকা" (বুখারী, জিহাদ, বাব ২০২, নং ২৮৬৩; ই'তিসাম, ৫খ, পৃ. ৪২৪, নং ৬৭৯৫; নাফাকাত, ৫খ, পৃ. ১৬৩-৪, নং ৪৯৫৮; মুসলিম, জিহাদ, ৬খ, নং ৪৪২৫, ৪৪২৭-৮, ৪৪৩০, ৪৪৩৩; তিরমিযী, সিয়ার, বাব ৪৩, নং ১৫৫৪, ১৫৫৬)।
إِنَّ النَّبِيُّ لَا يُورَثُ إِنَّمَا مِيرَاثُهُ فِي فُقَرَاءِ الْمُسْلِمِينَ وَالْمَسَاكِينِ .
"নবীর ওয়ারিছ হয় না। তাঁহার পরিত্যক্ত সম্পত্তি মুসলমানদের ফকীর-মিসকীনদের জন্য" (মুসনাদে আহমাদ, ১খ, পৃ. ১০, ১৩)।
الْعُلَمَاءُ وَرَثَةُ الأَنْبِيَاءِ وَإِنَّ الأَنْبِيَاءَ لَمْ يُوْرِثُوا ديناراً وَلَا دِرْهَمَا وَلَكِنْ وَرَثُوا الْعِلْمَ .
"আলেমগণ নবীগণের ওয়ারিছ। নবীগণ দীনার কিংবা দিরহাম (ধন-সম্পদ) রাখিয়া যান নাই, বরং রাখিয়া গিয়াছেন জ্ঞান" (আবূ দাউদ, ইলম, বাব ১; তিরমিযী, ইলম, বাব ১৯, নং ২৬১৯; ইবন মাজা, মুকাদ্দিমা, বাব ১৭, নং ২২৩)।
অতএব সুলায়মান (আ) তাঁহার পিতার নবুওয়াত ও রাষ্ট্র পরিচালনা কার্যাদির ওয়ারিছ হইয়াছিলেন (বিস্তারিত দ্র. তাফসীরে কবীর, ২৪খ, পৃ. ১৮৬; তাফহীমুল কুরআন, ৩খ, পৃ. ৫৬১-২, টীকা ২০; মাআরেফুল কোরআন, ৬ খ, পৃ. ৬২৩; রূহুল মাআনী, ১৯ খ, পৃ. ১৭০-১)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 দাউদ (আ)-এর কণ্ঠস্বর

📄 দাউদ (আ)-এর কণ্ঠস্বর


আল্লাহ তাআলা দাউদ (আ)-কে এমন এক হৃদয়স্পর্শী সুললিত কণ্ঠস্বর দান করিয়াছিলেন যে, তাঁহার আবেগময় সুরমুর্ছনায় প্রতিটি প্রাণী বিমোহিত হইয়া থমকিয়া দাঁড়াইত। তিনি যখন আল্লাহ্র যিকিরে মশগুল হইতেন বা আল্লাহর কিতাব তিলাওয়াত করিতেন তখন তাঁহার সুর মাধুর্যে প্রাণীজগত বিমোহিত হইয়া তাঁহার সহিত যিকিরে লিপ্ত হইত, এমনকি পাহাড়-পর্বতও যিকিরে শরীক হইত। তাঁহার কণ্ঠস্বর প্রবাদবাক্যে (লাহন-ই দাউদ) পরিণত হইয়াছে (বিদায়া, ২খ, পৃ. ১০-১১; তাহযীব তারীখ দিমাশক, ৫ খ, পৃ. ১৯৪-৫; আরাইস, পৃ. ২৯৭; নাজ্জার, কাসাস, পৃ. ৩১১; তাফসীরে কবীর, ২৬ খ., পৃ. ১৮৫)।
আইশা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) আবূ মূসা আশআরী (রা)-র কুরআন তিলাওয়াত শুনিয়া বলেন, আবূ মূসাকে দাউদ (আ)-এর সুর দান করা হইয়াছে (মুসনাদে আহমাদের বরাতে বিদায়া, ২খ, পৃ. ১১; একই বরাতে আবূ হুরায়রা (রা) কর্তৃকও অনুরূপ হাদীছ বর্ণিত হইয়াছে)।
বাদ্যযন্ত্র শয়তানের আবিষ্কার। শয়তান যখন লক্ষ্য করিল যে, দাউদ (আ)-এর সুরমাধুর্যে মুগ্ধ হইয়া মানব, পশু-পাখি, গাছপালা, পাহাড়-পর্বত ইত্যাদি তাঁহার সহিত আল্লাহর যিকিরে মশগুল হইতেছে, তখন সে তাহাদেরকে পথভ্রষ্ট করিবার উপায় উদ্ভাবন করিতে তাহার অনুচরদিগকে নির্দেশ দিল। ইহারা দাউদ (আ)-এর ৭০টি সুর বিভিন্ন রকম বাদ্যযন্ত্রে নকল করিয়া মানুষকে পথভ্রষ্ট করে (আরাইস, পৃ. ২৯৭; তাহযীব তারীখ দিমাশক, ৫খ, পৃ. ১৯৫-৬)।
এইজন্যই মহানবী (স) বাদ্যযন্ত্রকে “মাযামীরুশ শায়তান” (শয়তানের বাদ্যযন্ত্র) আখ্যায়িত করিয়াছেন। হযরত আবূ বাক্স (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর গৃহে প্রবেশ করিয়া দুইটি বালিকাকে সংগীত পরিবেশন করিতে দেখিয়া বলিলেন:
الْمَرْمُورِ الشَّيْطَانِ فِي بَيْتِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ .
"শয়তানের বাদ্যযন্ত্র দ্বারা কি রাসূলুল্লাহ (স)-এর গৃহে গান গাওয়া হইতেছে”। (মুসলিম, ঈদায়ন, নং ১৯৩১, ৩খ, ২৪৬; আরও দ্র. নং ১৯৩৫, পৃ. ২৪৮; বুখারী, মানাকিব, ৩খ, পৃ. ৬৫৯, বাব ১০৪, নং ৩৬৪১; জিহাদ, বাবা ৮০, নং ২৬৯২, পৃ. ১৩০-১)।
আনাস (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলেনঃ
صوتَانِ مَلْعُونَانِ فَاجِرَانِ أَنْهَى عَنْهُمَا صَوْتُ عِزْمَارٍ وَرَنَّهُ شَيْطَانٍ .
"দুইটি শব্দ অভিশপ্ত ও পাপিষ্ঠ, আমি সেই দুইটি নিষিদ্ধ করিতেছি: বাদ্যযন্ত্রের শব্দ ও শয়তানের আওয়াজ” (জামে তিরমিযীর বরাতে কুরতুবী, ১৪খ, পৃ. ১৫৩)।
উল্লেখ্য যে, দাউদ (আ)-এর কণ্ঠস্বরকেও মিযমার (বাদ্যযন্ত্র) বলা হইয়াছে। তাহা বাদ্যযন্ত্র অর্থে নহে, বরং সুমধুর সুর হিসাবে।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 শাসক ও সংগঠক হিসাবে হযরত দাউদ (আ)

📄 শাসক ও সংগঠক হিসাবে হযরত দাউদ (আ)


হযরত দাউদ, (আ)-এর নবুওয়াত প্রাপ্তি ও রাজত্বলাভ সম্পর্কে কুরআন মজীদে পরিষ্কার বক্তব্য বিদ্যমান থাকিলেও তিনি কোনটি আগে লাভ করিয়াছেন তাহা সুনির্দিষ্টভাবে বর্ণিত হয় নাই। World Biography নামক বিশ্বকোষে বলা হইয়াছে যে, নবী শামুয়েল (আ) গোপনে দাউদ (আ)-কে তালূতের পরবর্তী রাজা মনোনীত করেন (৩খ, পৃ. ২৮৪)। বিভিন্ন গ্রন্থে তাঁহার রাজত্বকাল সম্পর্কে সামান্য ব্যবধান সহকারে নিম্নোক্ত তারিখসমূহ উল্লেখ করা হইয়াছে: তালুতের রাজত্বকাল ১০২০-১০০৪ খৃ, পৃ.; দাউদ (আ)-এর রাজত্বকাল ১০০৪-৯৬৫ খৃ. পূ. এবং সুলায়মান (আ)-এর রাজত্বকাল ৯৬৫-৯২৬ খৃ. পূ. (তাফহীমুল কুরআন, সূরা ইসরার ৭নং টীকা দ্র.)। অন্যান্য গ্রন্থে দাউদ (আ)-এর রাজত্বকাল ১০১০-৯৭০ খৃ. পূ. (World Biography, ৩খ., পৃ. ২৮৪); ১০০০-৯৬০ খৃ. পৃ. (Ency. Religion, ৪খ., পৃ. ২৪২); ১০০০-৯৬২ খৃ. পূ. (Ency. Brit., ৫খ পৃ. ৫১৮); ১০০২-৯৬২ খৃ. পূ. (Ency. Americana, ৮খ, পৃ. ৫২৬)। দাউদ (আ)-ই প্রথম ব্যক্তি যিনি একই সঙ্গে ইয়াহুদী জাতির নবী ও শাসক নিযুক্ত হন। তিনি জুদাহ ও ইসরাঈল এই দুই রাষ্ট্রকে একত্র করেন এবং ইয়াহুদী জাতির ত্রাণকর্তারূপে আবির্ভূত হন। তিনি ইয়াহুদীদেরকে ফিলিস্তিনী আমালিকাদের স্বৈরশাসন হইতে মুক্ত করেন এবং প্রতিবেশী ইদোম, মোয়াব ও আম্মুনের উপর এবং সিরিয়ার আরামিয়ান রাজ্যের উপর কর্তৃত্ব বিস্তার করেন। একই সময় তিনি টায়ার ও হামাহ-এর শাসকগণের সহিত চুক্তিবদ্ধ হন। তিনি সম্মিলিত জুদাহ ও ইসরাঈল রাষ্ট্রের সীমা কতিপয় কানআনী শহর পর্যন্ত বিস্তৃত করেন এবং জেরুসালেম অধিকার করিয়া তথায় স্বীয় রাজ্যের রাজধানী স্থাপন করেন। তাঁহার রাজ্যসীমা ফোরাত নদী হইতে ভূমধ্য সাগর এবং দামিক হইতে আরব সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। তিনিই ছিলেন ইসরাঈলের প্রথম সফল শাসক। তিনিই সর্বপ্রথম ইয়াহুদীদের বারোটি গোত্রকে ঐক্যবদ্ধ করিয়া একটি সুসংহত জাতিতে পরিণত করিতে সক্ষম হন। তিনি সাফল্যের সহিত সাত বৎসর হেব্রোনে এবং তেত্রিশ বৎসর জেরুসালেমে রাজত্ব করেন।
শাসক হিসাবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত ন্যায়পরায়ণ। কারণ তিনি আল্লাহর পথনির্দেশনায় শাসনকার্য পরিচালনা করিতেন। মহান আল্লাহ তাঁহাকে নির্দেশ দেন: “হে দাউদ! আমি তোমাকে পৃথিবীতে খলীফা বানাইয়াছি। অতএব তুমি লোকদের মধ্যে সুবিচার কর” (৩৮: ২৬)। তাঁহার জীবনচারের মধ্য দিয়া তাঁহার ন্যায়পরায়ণতার প্রকাশ ঘটিয়াছে। এতবড় সাম্রাজ্যের একচ্ছত্র শাসক হওয়া সত্ত্বেও তিনি সাধারণ লোকের মত জীবনযাপন করিতেন, রাজকোষ হইতে ভাতা গ্রহণের পরিবর্তে স্বোপার্জিত আয় দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করিতেন এবং আল্লাহ্ ইবাদতে মশগুল থাকিতেন। কোন কোন ঐতিহাসিক হযরত লুকমান হাকীম (দ্র.)-কে তাঁহার সমসাময়িক বলিয়া মত প্রকাশ করিয়াছেন, তিনি তাঁহার রাষ্ট্রের নাগরিক ছিলেন এবং উভয়ের মধ্যে সাক্ষাতও হইয়াছে (তাহযীব তারীখ দিমাল্ক, ৫খ, পৃ. ১৯২)। তিনি তাঁহার মত একজন প্রতিভাবান লোকের দ্বারা প্রশাসনিক কার্যে নিশ্চয়ই উপকৃত হইয়া থাকিবেন। তাঁহার সময়ই জেরুসালেম ইয়াহুদী রাষ্ট্রের রাজধানী হিসাবে গড়িয়া উঠে এবং তিনি এখানে রাজপ্রাসাদ নির্মাণ করেন। তিনিই বায়তুল মাকদিস নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করেন এবং তৎপুত্র সুলায়মান (আ)-এর প্রচেষ্টায় উহার নির্মাণকাজ সমাপ্ত হয় (আল-কামিল, ১খ, পৃ. ১৭৪)। এক কথায় তিনিই ছিলেন ইয়াহুদী রাষ্ট্রের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা এবং ইহার ভিত সুদৃঢ়কারী (আল-মুমজিদ, মু'জাম অংশ, দাউদ শিরো.)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00