📄 সূরা সাদ -এর তিলাওয়াতের সিজদা
সূরা সাদ-এর ২৪ নম্বর আয়াত তিলাওয়াত করিলে সিজদা দিতে হয়। হানাফী মাযহাবমতে এখানে সিজদা করা ওয়াজিব, শাফিঈ মাযহাবমতে ঐচ্ছিক, কারণ ইহা একজন নবীর তওবা মাত্র। এই বিষয়ে ইব্ন আব্বাস (রা) হইতে তিনটি হাদীছ বর্ণিত হইয়াছে।
(১) ইব্ন আব্বাস (রা) বলেন, সূরা সাদ-এর সিজদা অত্যাবশ্যকীয় সিজদাসমূহের অন্তর্ভুক্ত নহে। তবে নবী (স)-কে আমি ইহাতে সিজদা করিতে দেখিয়াছি (বুখারী, বাংলা সং, ই.ফা., পৃ. ২৭২, বাব ৬৮৬, নং ১০০৮; তিরমিযী, সাফার, বাব ১৫, নং ৫৩৮; আবু দাউদ, ই.ফা., বাংলা সং, ২খ, পৃ. ২৯২, সালাত, বাব ৩৩৮, নং ১৪০৯; মুসনাদে আহমাদের বরাতে বিদায়া, ২খ, পৃ. ১২-১৩)।
(২) সূরা সাদ-এ নবী (স) সিজদা করিয়াছেন এবং বলিয়াছেন: দাউদ (আ) তওবাস্বরূপ সিজদা করিয়াছিলেন, আর আমরা শুকরিয়াস্বরূপ: সিজদা করিতেছি অর্থাৎ তাঁহার তওবা কবুল হইয়াছে বিধায় আমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিতেছি (নাসাঈ, ইফতিতাহ, বাব সুজদিল কুরআন)।
(৩) মুজাহিদ (র) ইব্ন আব্বাস (রা)-কে জিজ্ঞাসা করেন, সূরা সাদ-এ কি সিজদা আছে? তিনি বলেন, হাঁ (বুখারী, তাফসীর সূরা আন'আম, নং ৪২৭১, আধুনিক প্রকাশনী সং, ৪খ, পৃ. ৩৮৮)।
আবূ সাঈদ (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) মিম্বারে দাঁড়াইয়া সূরা সাদ তিলাওয়াত করেন। তিনি সিজদার আয়াত পড়ার পর নিচে নামিয়া সিজদা করেন এবং তাঁহার সঙ্গের লোকজনও সিজদা করে। তিনি অন্য এক দিনও এই সূরা পাঠ করেন এবং সিজদার আয়াতে পৌছিলে লোকজন সিজদা দিতে উদ্যত হয়। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন: ইহা তো একজন নবীর তওবার সিজদা। কিন্তু আমি লক্ষ্য করিতেছি যে, তোমরা সিজদা করিতে উদ্যত হইয়াছ। অতএব তিনি নিচে নামিয়া সিজda করেন এবং তাহারাও সিজদা করে (আবূ দাউদ, পূর্বোক্ত সং, সালাত, বাব ৩৩৮, নং ১৪১০)।
অতএব ইমামগণের সর্বসম্মতভাবে না হইলেও সূরা সাদ-এ তিলাওয়াতের সিজদা ওয়াজিব হওয়ার মতই অগ্রাধিকারযোগ্য (তু. তাফহীমুল কুরআন, উক্ত সূরার ২৬ নং টীকা)। কথিত আছে যে, হযরত দাউদ (আ) সিজদারত অবস্থায় চল্লিশ দিন কাটাইয়া দেন, কেবল জরুরী প্রয়োজন ছাড়া সিজদা হইতে উঠিতেন না (তাফসীরে কাশশাফ, ৩খ, পৃ. ৩৭১; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ., পৃ. ১৩; সার্বিক আলোচনার জন্য দ্র. জাসসাস, আহকামুল কুরআন, ৩খ, পৃ. ৩৮০; ইবনুল আরাবী, আহ্কামুল কুরআন, ৪খ, পৃ. ১৬৪০; কুরতুবী, আহ্কামুল কুরআন, ১৫ খ, পৃ. ১৮৩-৪; তাফসীর মাজহারী, ৮খ, পৃ. ১৬৯)।
📄 দাউদ (আ)-এর মু'জিযা ও মর্যাদা
কুরআন মজীদের তিন স্থানে দাউদ (আ)-এর সহিত পাহাড়-পর্বত ও বিহঙ্গকূলের আল্লাহ্ যিকির ও তাঁহার মহিমা ঘোষণায় যোগ দেওয়ার কথা উদ্ধৃত হইয়াছে। যেমন, "আমি পর্বতমালা ও পক্ষীকুলকে অধীন করিয়া দিয়াছিলাম, ইহারা দাউদের সঙ্গে আমার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করিত। আমিই ছিলাম এইসবের কর্তা" (২১: ৭৯)।
"নিশ্চয় আমি দাউদের প্রতি অনুগ্রহ করিয়াছি। হে পর্বতমালা! দাউদের সহিত আমার পবিত্রতা ঘোষণা কর এবং পক্ষীকুলকেও (একই নির্দেশ দিয়াছি)" (৩৪: ১০)।
"আমি পর্বতমালাকে নিয়োজিত করিয়াছিলাম যেন ইহারা সকাল-সন্ধ্যায় তাঁহার সহিত আমার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে এবং সমবেত পক্ষীকুলকেও (নিয়োজিত করিয়াছিলাম), সকলেই ছিল তাঁহার অভিমুখী” (৩৮: ১৮-১৯)।
হযরত দাউদ (আ)-এর সহিত তাঁহার সুমধুর কণ্ঠে কণ্ঠ মিলাইয়া পাহাড়-পর্বত ও পক্ষীকুলের আল্লাহর মহিমা ও পবিত্রতা ঘোষণায় শরীক হওয়া একটি সুপ্রসিদ্ধ বিষয়। আল্লাহ তা'আলা দাউদ (আ)-কে প্রদত্ত গুণাবলীর সহিত তাঁহাকে সুমধুর কণ্ঠস্বরও দান করিয়াছিলেন। তিনি যখন যাবূর কিতাব পাঠ করিতেন তখন পক্ষীকুল শূন্যলোকে থামিয়া যাইত এবং তাঁহার সহিত আল্লাহর মহিমা ঘোষণায় শরীক হইত। একইভাবে পর্বতমালা, তরুলতা ইত্যাদি হইতেও তাসবীহ্ আওয়াজ শোনা যাইত। ইহা ছিল দাউদ (আ)-কে আল্লাহ্ প্রদত্ত একটি মুজিযা। প্রতিটি অচেতন বস্তুর মধ্যেও মুজিযারূপে চেতনা সৃষ্টি হইতে পারে। প্রামাণ্য সত্য এই যে, পাহাড় ও পাথরসমূহের মধ্যেও ইহাদের উপযোগী জীবন ও চেতনা বিদ্যমান রহিয়াছে (মাআরেফুল কোরআন, পৃ. ৮৮৪, তাফহীম, সূরা আম্বিয়া, ৭১ নং টীকা; তাফসীরে কবীর, ২১খ, পৃ. ১৯৯; বিদায়া, বালাম ১, ২খ, পৃ. ১০-১১)। যেমন কুরআন মজীদে পাথর সম্পর্কে বলা হইয়াছে:
وَإِنَّ مِنَ الْحِجَارَةِ لَمَا يَتَفَجَّرُ مِنْهُ الْأَنْهُرُ وَإِنَّ مِنْهَا لَمَا يَشَقَّقُ فَيَخْرُجُ مِنْهُ الْمَاءُ وَإِنَّ مِنْهَا لَمَا يَهْبِطُ مِنْ خشية الله .
"কতক পাথর এমন যে, উহা হইতে নদী-নালা প্রবাহিত হয় এবং কতক এইরূপ যে, বিদীর্ণ হওয়ার পর উহা হইতে পানি নির্গত হয়, আবার কতক এমন যে, তাহারা আল্লাহর ভয়ে ধ্বসিয়া পড়ে” (২ঃ ৭৪)।
বস্তুত আল্লাহ্ প্রতিটি সৃষ্টিই নিজ নিজ ভাষায় তাঁহার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে। মহান আল্লাহ বলেন:
أَلَمْ تَرَ أَنَّ اللَّهَ يُسَبِّحُ لَهُ مَنْ فِي السَّمُوتِ وَالْأَرْضِ وَالطَّيْرُ صُقْتِ كُلُّ قَدْ عَلِمَ صَلَاتَهُ وَتَسْبِيحَهُ.
"তুমি কি দেখ না যে, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যাহারা আছে তাহারা এবং দলবদ্ধভাবে উড্ডীয়মান বিহঙ্গকুল আল্লাহ্র পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে? প্রত্যেকেই নিজ নিজ ইবাদতের ও মহিমা ঘোষণার পদ্ধতি জ্ঞাত আছে” (২৪:৪১)।
تُسَبِّحُ لَهُ السَّمُوتُ السَّبْعُ وَالْأَرْضُ وَمَنْ فِيهِنَّ وَإِنْ مِّنْ شَيْءٍ إِلا يُسَبِّحُ بِحَمْدِهِ وَلَكِنْ لَا تَفْقَهُونَ تَسْبيحَهُمْ .
"সপ্ত আকাশ ও পৃথিবী এবং এতদুভয়ের মধ্যের সমস্ত কিছু তাঁহার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে। এমন কিছু নাই যাহা তাঁহার সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে না, কিন্তু উহাদের পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা তোমরা বুঝিতে পার না" (১৭: ৪৪; আরও দ্র. ১৩: ১৩; ৫৯: ২৪; ৬২: ১; ৬৪:১ ও ২১৪ ২০)।
আল্লামা যামাখশারী (র) ও অপরাপর তাফসীরকার বলেন, ইহা অবাস্তব নহে যে, আল্লাহ তা'আলা প্রতিটি বস্তুর মধ্যে এই পরিমাণ বোধশক্তি ও চেতনা নিহিত রাখিয়াছেন, যাহা দ্বারা সে তাহার স্রষ্টা প্রভুর পরিচয় জানিতে পারে। ইহাও অবাস্তব নহে যে, ইহাদেরকে বিশেষ প্রকারের ভাষাজ্ঞান দান করা হইয়াছে এবং বিশেষ প্রকার তাসবীহ ও ইবাদত-বন্দেগীর নিয়ম-কানুন শিক্ষা দেওয়া হইয়াছে, যাহাতে তাহারা মশগুল থাকে (মাআরেফুল কোরআন, পৃ. ৯৪৮)।
"কিন্তু তোমরা তাহাদের পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা বুঝিতে পার না" অর্থাৎ সকল মানুষ বুঝিতে না পারিলেও আল্লাহ তা'আলা নবী-রাসূলগণকে তাহা বুঝিবার ক্ষমতা দান করিয়াছেন। "আমিই ছিলাম ইহার কর্তা" (২১:৭৯) অর্থাৎ এইসব স্বাভাবিক প্রাকৃতিক নিয়ম বিরুদ্ধ ঘটনা আল্লাহ তা'আলার নির্দেশেই ঘটিয়াছিল।
উক্ত আয়াতসমূহ হইতে স্বতই প্রমাণিত হয় যে, দাউদ (আ) যখন আল্লাহ্র প্রশংসা করিতেন, তাঁহার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিতেন এবং তাঁহার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করিতেন, তখন তাঁহার সুমধুর সুরের ঝংকারে পাহাড়-পর্বত, পক্ষীকুল ইত্যাদি বিমোহিত হইয়া তাঁহার সুরে সুর মিলাইত। মহানবী (স)-এর পবিত্র বাণী হইতেও দাউদ (আ)-এর সুমধুর কণ্ঠস্বরের প্রমাণ পাওয়া যায়। তাঁহার অন্যতম সাহাবী আবূ মূসা আশ'আরী (রা)-র কণ্ঠস্বর ছিল অসাধারণ সুমধুর। একদা তিনি কুরআন তিলাওয়াত করিতেছিলেন এবং মহানবী (স) এই দিক দিয়া অতিক্রম করিতেছিলেন। তিনি তাঁহার কণ্ঠস্বর শুনিয়া দাঁড়াইয়া গেলেন এবং দীর্ঘক্ষণ ধরিয়া তাঁহার তিলাওয়াত শুনিলেন। তিনি তিলাওয়াত শেষ করিলে মহানবী (স) বলেন:
لَقَدْ أُوتِيَ مِزْماراً مِنْ مَزامير آل داؤد "এই ব্যক্তিকে দাউদ (আ)-এর সুমধুর কণ্ঠস্বরের এক অংশ দেওয়া হইয়াছে।"
এখানে 'মাযামীর' বলিতে দাউদ (আ)-এর সুললিত কণ্ঠে আল্লাহ তা'আলার মহিমা ও পবিত্রতা সম্পর্কিত আসমানী কিতাবের বাণীসমূহ তিলাওয়াত বুঝায় যাহা তাঁহার চতুষ্পার্শ্বের পরিবেশেও প্রতিধ্বনিত হইত।
📄 হযরত দাউদ (আ)-এর মু'জিযাঃ লৌহবর্ম
আল্লাহ তা'আলা হযরত দাউদ (আ)-কে যে প্রজ্ঞাপূর্ণ জ্ঞান দান করিয়াছিলেন, লৌহবর্ম নির্মাণ সংক্রান্ত প্রযুক্তিও তাহার অন্তর্ভুক্ত। কুরআন মজীদের দুই স্থানে এই সংক্রান্ত বর্ণনা আসিয়াছে। মহান আল্লাহ বলেন: “এবং আমি তাহাকে তোমাদের জন্য বর্ম নির্মাণ শিক্ষা দিয়াছিলাম, যাহাতে তাহা তোমাদের যুদ্ধে তোমাদেরকে রক্ষা করে। অতএব তোমরা কি কৃতজ্ঞ হইবে না" (২১ঃ ৮০)?
"আর আমি তাহার জন্য নমনীয় করিয়াছিলাম লৌহ, যাহাতে তুমি পূর্ণ মাপের বর্ম নির্মাণ করিতে এবং বুননে পরিমাপ রক্ষা করিতে পার" (৩৪: ১০)।
দাউদ (আ)-এর বর্ম নির্মাণ প্রযুক্তি আয়ত্ত করা সম্পর্কে ইব্ন আসাকির বর্ণনা করিয়াছেন যে, তিনি তাঁহার জীবনকালের উল্লেখযোগ্য সময় আল্লাহর ইবাদতে ও অসহায়ের সেবায় ব্যয় করেন। তিনি প্রায়ই ছদ্মবেশে বাহিরে যাইতেন এবং আগন্তুকদের নিকট তাহাদের আগমনের কারণ-জিজ্ঞাসা করিতেন। তিনি তাহাদেরকে নিজের পরিচয় গোপন রাখিয়া নিজের সম্পর্কে তাহাদের মতামত অবহিত হইতেন। তাহারা বলিত, তিনি তাঁহার নিজের ও তাঁহার উম্মতের জন্য আল্লাহর এক কল্যাণময় সৃষ্টি। একদা আল্লাহ তা'আলা একজন ফেরেশতাকে মানববেশে তাঁহার নিকট পাঠাইলে তিনি তাহাকেও একইভাবে জিজ্ঞাসা করেন। ফেরেশতাবেশে মানবও তাঁহার সম্পর্কে একই মন্তব্য করেন। দাউদ (আ) আল্লাহ তা'আলার নিকট দু'আ করেন যে, তিনি তাঁহাকে এমন একটি পেশা শিখাইয়া দিন যাহাকে অবলম্বন করিয়া তাঁহার ও তাঁহার পরিবারবর্গের জীবিকার ব্যবস্থা করিতে পারেন। আল্লাহ তা'আলা তাঁহার দু'আ কবুল করেন, তাঁহাকে লৌহবর্ম নির্মাণের কৌশল শিখাইয়া দেন। তিনি উহা নির্মাণ করিয়া বাজারে বিক্রয় করিয়া যে অর্থ পাইতেন তাহার এক-তৃতীয়াংশ দান-খয়রাত করিতেন, এক-তৃতীয়াংশ দ্বারা পরিজনবর্গের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ক্রয় করিতেন এবং যেদিন অন্যরূপ ব্যস্ততার কারণে কাজ করিতে পারিবেন না সেদিন দান-খয়রাত করার জন্য এক-তৃতীয়াংশ সঞ্চয় করিয়া রাখিতেন (তাহযীব তারীখ দিমাশক, ৫খ, পৃ. ১৯৩-৪)।
স্বশ্রমে উপার্জন করিয়া জীবিকা নির্বাহ একটি প্রশংসনীয় বিষয়। মহানবী (স) বলেনঃ "স্বহস্তে বা স্বশ্রমে উপার্জিত খাদ্য অপেক্ষা উত্তম খাদ্য কেহ ভক্ষণ করে নাই। আল্লাহ্ নবী দাউদ (আ) স্বশ্রমে উপার্জন করিয়া জীবিকা নির্বাহী করিতেন” (বুখারী, বুয়ু, বাব ১৫, নং ১৯২৭)।
আধুনিক কালের ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা ও খননকার্যে প্রমাণিত হয় যে, মানব সমাজে লৌহ ব্যবহারের যুগ খৃ. পৃ. ১২০০-১০০০ বৎসরের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হইয়াছিল। ইহাই ছিল হযরত দাউদ (আ)-এর সময়কাল। আকাবা ও আয়লা সন্নিহিত হযরত সুলায়মান (আ)-এর আমলের সামুদ্রিক বন্দর ইচুউন জাবির-এর প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে যে কারখানার ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গিয়াছে তাহা পর্যবেক্ষণ করিয়া অনুমান করা হইয়াছে যে, তাহাতে এমন সব সূত্র প্রয়োগ করা হইত, যাহা বর্তমান কালের Blast Furnace-এ ব্যবহৃত হইয়া থাকে। হযরত দাউদ (আ) সর্বপ্রথম সর্বাধিকভাবে এই নূতন পন্থাকে সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করিয়াছেন (তাফহীম, সূরা আম্বিয়া, ৭১ নং টীকা)। "আমি দাউদের জন্য লৌহ নরম করিয়া দিয়াছিলাম" অর্থাৎ তাঁহার হাতের স্পর্শে লোহা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নরম হইয়া যাইত। তিনি মোমের ন্যায় ইহাকে যেভাবে ইচ্ছা মোটা, সরু, লম্বা, চওড়া করিতে পারিতেন। ইহার জন্য কঠোর শ্রম ও লোহারের যন্ত্রপাতি ইত্যাদি কিছুই দরকার হইত না (মা'আরিফুল কুরআন, সৌদী সং, পৃ. ৮৮৪; কাসাসুল কুরআন-হিফজুর রহমান, ২খ, পৃ. ২৮৪; কাসাসুল আম্বিয়া, নাজ্জার, পৃ. ৩১০)। ইমাম রাযী (র) বলেন, হযরত দাউদ (আ)-ই সর্বপ্রথম লৌহবর্ম নির্মাণ করেন, অতঃপর লোকেরা তাঁহার নিকট হইতে ইহার নির্মাণবিদ্যা শিক্ষা করে এবং এইভাবে তাহারা উহার উত্তরাধিকারী হয় (তাফসীরে কবীর, ২১খ, ২০১)।
যে শিল্প দ্বারা সমাজের মানুষ উপকৃত হয়, তাহাদের প্রয়োজন পূর্ণ হয় এবং পেশাগত বা অন্য কাজে লাগে সেই শিল্প উৎপাদন করা অত্যন্ত ছওয়াবের কাজ। মহানবী (স) বলেনঃ
"যে শিল্পী তাহার শিল্পকর্মের সওয়াব লাভের নিয়ত রাখে সে মূসা (আ)-এর মাতার অনুরূপ। তিনি নিজ সন্তানকে দুধ পান করাইয়া অপরের নিকট হইতে পারিশ্রমিকও পাইয়াছিলেন" (মা'আরিফুল কুরআন, ৬খ, ২১২)।
নবী-রাসূলগণও কায়িক শ্রমে নিয়োজিত হইয়াছেন। যেমন দাউদ (আ) শস্য বপন ও কর্তন করিয়াছেন। অতএব যে ব্যক্তি জনসাধারণের উপকার সাধনের অভিপ্রায়ে শিল্পকর্ম করে, সে জনসেবার সওয়াব তো পাইবেই, উপরন্তু শিল্পকর্মের পার্থিব উপকারও প্রাপ্ত হইবে (মা'আরিফুল কুরআন, সৌদী সং, পৃ. ৮৮৪-৫; আরও দ্র. পৃ. ৮৫২)।
📄 পাখির ভাষা বোঝার ক্ষমতা
আল্লাহ তা'আলা হযরত দাউদ (আ) ও হযরত সুলায়মান (আ)-কে মুজিয়াস্বরূপ পাখীর ভাষা বুঝিবার ক্ষমতা দান করিয়াছিলেন। একই ভাষাভাষী মানুষ যেমন সহজেই পরস্পরের কথা বুঝিতে পারে, তদ্রূপ তাঁহারাও পাখির ডাক শুনিয়া তাহার অর্থ বুঝিতে পারিতেন। মহান আল্লাহ বলেন:
وَوَرِثَ سُلَيْمَانُ دَاوُدَ وَقَالَ يَا أَيُّهَا النَّاسُ عُلِّمْنَا مَنْطِقَ الطَّيْرِ وَأُوتِينَا مِنْ كُلِّ شَيْءٍ .
"সুলায়মান দাউদের উত্তরাধিকারী হইল এবং সে বলিল, হে জনগণ! আমাদেরকে পক্ষীকুলের ভাষা শিক্ষা দেওয়া হইয়াছে এবং আমাকে সকল কিছু দেওয়া হইয়াছে; ইহা অবশ্যই সুস্পষ্ট অনুগ্রহ” (২৭: ১৬)।
আল্লামা বায়দাবী (র) বলেন, 'উল্লিমনা' ও 'উতীনা' ক্রিয়াপদদ্বয়ের সর্বনাম (দামীর) দ্বারা, পিতা-পুত্র উভয়কে বুঝানো হইয়াছে (নাজ্জার, কাসাস, পৃ. ৩১০; আরও তু. আনওয়ারে আম্বিয়ড়, পৃ. ১১০-১১; কাসাসুল কুরআন, বাংলা অনু., ২খ, পৃ. ২৮৫)। তবে অনেক তাফসীরকারের মতে কেবল সুলায়মান (আ)-কে এই ক্ষমতা প্রদান করা হইয়াছিল।