📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 যাবুর কিতাবে মহানবী (স) সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী

📄 যাবুর কিতাবে মহানবী (স) সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী


তাওরাত ও ইনজীল কিতাবদ্বয়ে যেমন রাসূলুল্লাহ (স)-এর আবির্ভাব সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী বিদ্যমান, তদ্রূপ যাবুর কিতাবেও তাহা বিদ্যমান আছে। সম্ভবত কুরআন মজীদের ২১: ১০৫ আয়াতে সেদিকেই ইঙ্গিত করা হইয়াছে। বাইবেলে উক্ত হইয়াছে: "ধন্য তিনি যিনি সদাপ্রভুর নামে আসিতেছেন" (গীতসংহিতা, ১১৮: ২৬)।
"তোমরা সদাপ্রভুর উদ্দেশে গীত গাও, তাঁহার নামের গুণগান কর; যিনি মরুভূমি দিয়া বাহনে আসিতেছেন তাঁহার জন্য রাজপথ বাঁধ" (গীতসংহিতা, ৬৮:৪)। "সদাপ্রভু আপন পবিত্র বাসস্থানে পিতৃহীনদের পিতা ও বিধবাদের বিচারকর্তা” (ঐ, ৬৮: ৫)। "সদাপ্রভু সঙ্গিহীনদিগকে পরিবার মধ্যে বাস করান, তিনি বন্দিগণকে মুক্ত করিয়া কুশলে রাখেন; কিন্তু বিদ্রোহীরা দগ্ধভূমিতে বাস করে" (ঐ, ৬৮: ৬)। "হে প্রভু! তুমি যখন নিজ প্রজাগণের অগ্রে অগ্রে যাইতেছিলে, যখন শুষ্ক ভূমি দিয়া গমন করিতেছিলে, তখন পৃথিবী কম্পমান হইল, সদাপ্রভুর সাক্ষাতে আকাশও জলবিন্দুময় হইল” (ঐ, ৬৮: ৭-৮)। এসব বাক্যে মহানবী (স)-এর আবির্ভাব সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করা হইয়াছে।
"যিনি মরুপথ দিয়া বাহনে আসিতেছেন তাঁহার জন্য রাজপথ বাঁধ” (গীত, ৬৮:৪) বাক্যে মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর আবির্ভাব সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করা হইয়াছে, হযরত ঈসা (আ) সম্পর্কে নয়। কারণ ঈসা (আ)-এর জন্মস্থান বেথেলহাম তৎকালেও এবং বর্তমান কালেও উহার সবুজ শ্যামলিমার জন্য প্রসিদ্ধ। পক্ষান্তরে মহানবী (স)-এর জন্মভূমি মক্কা একটি ঊষর মরু প্রান্তর। তৎকালেও, বর্তমান কালেও। "পিতৃহীনদের পিতা ও বিধবাদের বিচারকর্তা" (গীত, ৬৮: ৫) বলিতেও মহানবী (স)-কে বুঝানো হইয়াছে। কারণ তিনি ছিলেন ইয়াতীম ও বিধবাদের মত আশ্রয়হীনদের আশ্রয়স্থল। "সঙ্গীহীনকে পরিবার মধ্যে বাস করান" (ঐ, ৬৮: ৬) অর্থাৎ মহানবী (স) পিতৃহীন অবস্থায় পৃথিবীতে আগমন করেন এবং তাঁহার ছয় বৎসর বয়সে তাঁহার মাতা ইনতিকাল করেন। উপরন্তু তাঁহার কোন সহোদর ভাই-বোনও ছিল না। যথার্থ অর্থে তিনি ছিলেন নিঃসঙ্গ, আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে "পরিবার" দান করেন। নিম্নোক্ত আয়াতে সেদিকে ইঙ্গিত করা হইয়াছে:
أَلَمْ يَجِدُكَ يَتِيمًا فَأَوى .
"তিনি কি তোমাকে ইয়াতীম অবস্থায় পান নাই আর আশ্রয় দান করেন নাই" (৯৩ঃ ৬)?
"তিনি বন্দিগণকে মুক্ত করিয়া কুশলে রাখেন” (গীত, ৬৮: ৬) অর্থাৎ মহানবী (স)-ই সর্বপ্রথম যুদ্ধবন্দীদের সহিত মানবিক ব্যবহার করেন। তাঁহার ও তাঁহার সাহাবীদের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে কুরআন মজীদে উক্ত হইয়াছে:
وَيُطْعِمُونَ الطَّعَامَ عَلَى حُبِّهِ مِسْكِيْنًا وَيَتِيمًا وَأَسِيرًا .
"আহার্যের প্রতি আসক্তি সত্ত্বেও তাহারা অভাবগ্রস্ত, ইয়াতীম ও বন্দীকে আহার্য দান করে" (৭৬:৮)।
"দগ্ধভূমি” (ঐ, ৬৮: ৬) বলিতে মক্কা উপত্যকাকে বুঝানো হইয়াছে। কুরআন মজীদেও মক্কাকে বিরানভূমি বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে : وَادٍ غَيْرِ ذي زرع ( ‘অনুর্বর উপত্যকা', ১৪: ৩৭)। গীত, ৬৮: ৭-এ মহানবী (স) কর্তৃক পরিচালিত যুদ্ধসমূহের প্রতি ইঙ্গিত করা হইয়াছে (আম্বিয়া-ই কুরআন, ৩খ, পৃ. ৮৩-৫)।
আবদুল ওয়াহ্হাব আন-নাজ্জারের মতে গীতসংহিতা, ৪৫ অধ্যায়েও মহানবী (স)-এর আবির্ভাব সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী বিদ্যমান (কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৩১১, ৩য় সং, বৈরূত তা. বি.)। সেই অধ্যায়ে উক্ত হইয়াছে : "তুমি মনুষ্য-সন্তানগণ অপেক্ষা পরম সুন্দর; তোমার ওষ্ঠাধরে অনুগ্রহ সেচিত হয়; এই নিমিত্ত সদাপ্রভু চিরকালের জন্য তোমাকে আশির্বাদ করিয়াছেন। হে বীর! তোমার খড়গ কটিদেশে বন্ধন কর, তোমার প্রভা ও প্রতাপ (গ্রহণ কর)। আর স্বীয় প্রতাপে কৃতকার্য হও, বাহনে চড়িয়া যাও, সত্যের ও ধার্মিকতাযুক্ত নম্রতার পক্ষে, তাহাতে তোমার দক্ষিণ হস্ত তোমাকে ভয়াবহ কার্য শিখাইবে। তোমার বাণসকল তীক্ষ্ণ, জাতিরা তোমার নীচে পতিত হয়, রাজার শত্রুগণের হৃদয় বিদ্ধ হয়। .... তোমার রাজদণ্ড সরলতার দণ্ড। তুমি ধার্মিকতাকে প্রেম করিয়া আসিতেছ, দুষ্টতাকে ঘৃণা করিয়া আসিতেছ, এই কারণ সদাপ্রভু, তোমার সদাপ্রভু, তোমাকে অভিষিক্ত করিয়াছেন তোমার সখাগণ অপেক্ষা অধিক পরিমাণে আনন্দতৈলে" (গীতসংহিতা, ৪৫: ২-৭)।
বাইবেলের অন্যান্য গ্রন্থেও মহানবী (স)-এর আবির্ভাব সম্পর্কে গীতসংহিতার অনুরূপ ভবিষ্যদ্বাণী বিদ্যমান আছে (উদাহরণস্বরূপ দ্র. দ্বিতীয় বিবরণ, ১৮ : ১৮; যিশাইয়, ২৯ : ১২, যেখানে সর্বপ্রথম ওহী নাযিল হওয়াকালীন অবস্থার প্রতি ইঙ্গিত বিদ্যমান)। এসব ভবিষ্যদ্বাণী দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, সুদীর্ঘ কাল ধরিয়া আসমানী কিতাবসমূহ রাসূলুল্লাহ (স)-এর আগমন সম্পর্কে মানজবাতিকে অবহিত করিয়া আসিতেছিল।
কুরআন মজীদে বলা হইয়াছে : "স্মরণ কর, যখন আল্লাহ নবীদের অঙ্গীকার লইয়াছিলেন যে, তোমাদিগকে কিতাব ও হিকমত যাহা কিছু দিয়াছি, অতঃপর তোমাদের কাছে যাহা আছে তাহার সমর্থকরূপে যখন একজন রাসূল আসিবে তখন তোমরা অবশ্যই তাহার প্রতি ঈমান আনিবে এবং তাহাকে সাহায্য করিবে” (৩:৮১)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 যাবুর কিতাবে মক্কা মুআজ্জমার উল্লেখ

📄 যাবুর কিতাবে মক্কা মুআজ্জমার উল্লেখ


যাবুর কিতাবে বহু স্থানে "সিয়োন” (Zion) পর্বতের উল্লেখ আছে। ইয়াহুদী ও খৃস্টান পণ্ডিতগণ ইহার অর্থ ও অবস্থান নির্ণয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়াছেন। যাবুর কিতাবের গভীর অধ্যয়নে প্রতিভাত হয় যে, ‘সিয়োন’ দ্বারা মক্কা মুআজ্জামাকে বুঝানো হইয়াছে। "... সিয়োন পর্বত, মহান রাজার পুরী। সদাপ্রভু, তাহার অট্টালিকাসমূহের মধ্যে, উচ্চ দুর্গ বলিয়া আপনার পরিচয় দিয়াছেন। কেননা দেখ, রাজগণ সভাস্থ হইয়াছিলেন; তাহারা একসঙ্গে চলিয়া গেলেন; তাহারা দেখিলেন, অমনি স্তম্ভিত হইলেন, বিহ্বল হইলেন, পলায়ন করিলেন” (গীতসংহিতা, ৪৮: ২-৫)।
"তোমরা সিয়োনকে প্রদক্ষিণ কর, তাহার চারিদিকে ভ্রমণ কর, তাহার দুর্গসকল গণনা কর। তাহার দৃঢ় প্রাচীরে মনোযোগ কর, তাহার অট্টালিকা সকল সন্দর্শন কর, যেন ভাবী বংশের কাছে তাহার বর্ণনা করিতে পার” (ঐ, ৪৮: ১২-১৩)।
"ধন্য তাহারা, যাহারা তোমার গৃহে বাস করে, তাহারা সতত তোমার প্রশংসা করিবে। ধন্য সেই ব্যক্তি, যাহার বল তোমাতে, (সিয়োনগামী) রাজপথ যাহার হৃদয়ে রহিয়াছে। তাহারা ক্রন্দনের তলভূমি (ওয়াদী বাকা = Baca) দিয়া গমন করিয়া তাহা উৎসে পরিণত করে; প্রথম বৃষ্টি তাহা বিবিধ মঙ্গলে ভূষিত করে। তাহারা উত্তর উত্তর বলবান হইয়া অগ্রসর হয়, প্রত্যেকে সিয়োনে সদাপ্রভুর কাছে দেখা দেয়” (ঐ, ৮৪: ৪-৭)।
উপরিউক্ত বাক্যে 'ওয়াদী বাকা' (তলভূমি) বলিতে মক্কা মুআজ্জমাকে বুঝানো হইয়াছে। কারণ মক্কার অপর নাম বাক্কা, যাহা কুরআন মজীদেও উক্ত হইয়াছে:
إِنَّ أَوَّلَ بَيْتٍ وُضِعَ لِلنَّاسِ لَلَّذِي بِبَكَّةَ مُبْرَكًا وَهُدًى لِلْعَلَمِينَ.
"নিশ্চয়ই মানবজাতির জন্য সর্বপ্রথম যে গৃহ প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল তাহা তো বাক্কায়, উহা বরকতময় ও বিশ্বজগতের দিশারী" (৩: ৯৬)।
"প্রত্যেকে সিয়োনে সদাপ্রভুর কাছে দেখা দেয়” (গীত, ৮৪: ৭) বাক্যাংশ দ্বারা হজ্জের অনুষ্ঠান বুঝানো হইয়াছে (আম্বিয়া-ই কুরআন, ৩খ, পৃ. ৮৫-৮৭)।
এইভাবে বাইবেলের পুরাতন ও নূতন নিয়মের বহু স্থানে মহানবী (স) সম্পর্কে অগণিত ভবিষ্যদ্বাণী বিদ্যমান।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ইয়াওমু'স সারত-এর ঘটনা

📄 ইয়াওমু'স সারত-এর ঘটনা


'ইয়াওমু'স-সান্ত' অর্থ শনিবার, সপ্তাহের শেষ দিবস, ইয়াহুদীদের বিশ্রাম দিবস। ইয়াহুদী-খৃস্টানদের বিশ্বাসমতে আল্লাহ তা'আলা ছয় দিবসে বিশ্বজাহান সৃষ্টি শেষ করার পর সপ্তম দিবসে অর্থাৎ শনিবার বিশ্রাম গ্রহণ করেন (নাউযুবিল্লাহ)। বাইবেলের সূচনাই হইয়াছে ইহার বিবরণ দ্বারা (দ্র. আদিপুস্তক, ২: ১-৩১)। এইরূপে আকাশমণ্ডল ও পৃথিবী এবং এতদুভয়স্থ সমস্ত বস্তুব্যূহ সমাপ্ত হইল। পরে খোদাওয়ান্দ সপ্তম দিনে আপনার কৃতকার্য হইতে নিবৃত্ত হইলেন, সেই সপ্তম দিনে আপনার কৃত সমস্ত কার্য হইতে বিশ্রাম করিলেন। "আর সদাপ্রভু সপ্তম দিনকে আশীর্বাদ করিয়া পবিত্র করিলেন, কেননা সেই দিনে সদাপ্রভু আপনার সৃষ্ট ও কৃত সমস্ত কার্য হইতে বিশ্রাম করিলেন" (ঐ, ২: ১-৩; আরও দ্র. যাত্রাপুস্তক, ১৬: ২৩-২৯; ২০: ৮-১০; মথি, ২৪: ২০; মার্ক, ৩:৪ ইত্যাদি)। ইয়াহুদী-খৃস্টান বিশ্বাসমতে সৃষ্টিকর্ম সমাপ্ত করিয়া সদাপ্রভু ক্লান্ত হইয়া যান। তাই সপ্তম দিনে বিশ্রাম গ্রহণ করেন। এইজন্য বিশেষত ইয়াহুদীরা পার্থিব সমস্ত কর্ম হইতে ঐ দিন বিরত থাকে এবং খৃস্টানদের মধ্যকার একটি দলও।
কুরআন মজীদে আল্লাহ তা'আলার বিশ্রাম গ্রহণ সংক্রান্ত ইয়াহুদী-খৃস্টান বিশ্বাসের অত্যন্ত জোরালো প্রতিবাদ করা হইয়াছে। কারণ ক্লান্তি-শ্রান্তি কখনও আল্লাহকে স্পর্শ করিতে পারে না, তিনি সমস্ত দুর্বলতার ঊর্ধ্বে। মহান আল্লাহ বলেন:
وَلَقَدْ خَلَقْنَا السَّمَواتِ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ وَمَا مَسَّنَا مِنْ لُغُوبٍ.
"আমি আকাশমণ্ডলী, পৃথিবী ও উহাদের মধ্যস্থিত সমস্ত কিছু ছয় দিনে সৃষ্টি করিয়াছি এবং কোন ক্লান্তি আমাকে স্পর্শ করে নাই" (৫০: ৩৮; আরও দ্র. ৭ঃ ৫৪; ১০: ৩; ১১ঃ ৭ ও ৫৭:৪)।
আয়াতোক্ত "ছয় দিন"-এর ব্যাখ্যায় তাফসীরকারগণের মধ্যে মতভেদ আছে। ছয় দিন অর্থ পৃথিবীর স্বাভাবিক নিয়মতান্ত্রিক ছয় দিনও হইতে পারে অথবা ছয়টি পর্যায়ও হইতে পারে অথবা ছয়টি কাল-পরস্পরাও হইতে পারে। অতএব আল্লাহ্র সহিত ক্লান্তির ত্রুটি যুক্ত করা তাঁহার সিফাতের (গুণাবলীর) সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ। মহান আল্লাহ আরও বলেন:
الَّذِي خَلَقَ السَّمواتِ وَالْأَرْضَ وَلَمْ يَعْيَ بِخَلْقِهِنَّ .
"যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করিয়াছেন এবং এই সকলের সৃষ্টিতে কোন ক্লান্তিবোধ করেন নাই" (৪৬: ৩৩)।
তাহা ছাড়া আল্লাহ তা'আলার সৃষ্টিকর্ম ছয় দিনে সমাপ্ত হইয়া থামিয়া থাকে নাই, বরং অনবরত নব নব সৃষ্টিকর্ম অস্তিত্ব লাভ করিতেছে, যাহা আমাদের বোধবুদ্ধি ও দৃষ্টির বাহিরে। মহান আল্লাহ বলেনঃ
وَالسَّمَاءَ بَنَيْنَهَا بِأَيْدٍ وَإِنَّا لَمُوسِعُونَ .
"আমি আকাশ নির্মাণ করিয়াছি আমার ক্ষমতাবলে এবং আমি অবশ্যই মহাসম্প্রসারণকারী" (৫১:৪৭)।
যদিও রাসূলুল্লাহ (স) ইয়াহুদীদের শনিবার পালনের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করিয়াছেন এবং সরকারী চাকুরীতে নিয়োজিত কোন ইয়াহুদী শনিবার সরকারী কর্ম হইতে ছুটি চাহিলে তাহা মঞ্জুর করিয়াছেন।
অতএব আল্লাহ্র সহিত সৃষ্টিগত কোন ত্রুটি বা দুর্বলতা যুক্ত করা শিরক-এর অন্তর্ভুক্ত। তাই মুসলমানদের নিকট শনিবারের বিশ্রাম সংক্রান্ত ধারণা প্রত্যাখ্যাত।
শাবাছা (শাব্বাত) হিব্রু শব্দ, ইহা হইতে আরবীকৃত (মু'আররাবা) সাব্ত (সিব্‌ত) শব্দটি গৃহীত হইয়াছে। ইসরাঈলীরা সমস্ত পার্থিব কর্ম হইতে বাধ্যতামূলকভাবে ঐ দিন বিশ্রাম গ্রহণ করিত, তবে ধর্মীয় ইবাদত-বন্দেগী নিষিদ্ধ ছিল না, বরং উপাসনায় লিপ্ত থাকার জন্যই বিশ্রামবারের বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। এই দিনটির মেয়াদ শুক্রবার সন্ধ্যা হইতে শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত। শনিবার উদযাপনের ব্যবস্থা হযরত মূসা (আ)-এর আমলে প্রবর্তিত হইয়াছে, না তাঁহার আগে—এই বিষয়ে মতভেদ আছে (বুতরুস-এর দাইরা, ৯ খ, পৃ. ৪৪১-২)। তবে বর্তমান বাইবেলের বর্ণনা হইতে জানা যায় যে, হযরত মূসা (আ) শনিবার উদযাপনের জন্য গুরুত্ব সহকারে ইয়াহূদীদেরকে নির্দেশ প্রদান করেন। "তুমি বিশ্রাম দিন স্মরণ করিয়া পবিত্র করিও। ছয় দিন শ্রম করিও। আপনার সমস্ত কার্য করিও, কিন্তু সপ্তম দিন তোমার রব সদাপ্রভুর উদ্দেশে বিশ্রাম দিন। সেদিন তুমি কি তোমার পুত্র, কি কন্যা, কি তোমার দাস, কি দাসী, কি তোমার পশু, কি তোমার পুরদ্বারের মধ্যবর্তী বিদেশী, কেহ কোন কার্য করিও না" (যাত্রাপুস্তক, ২০: ৮-১০; আরও তু. ১৬: ২৩-৩০; দ্বিতীয় বিবরণ, ৫: ১২-১৫; যিরমিয়, ১৭: ২১-২৭)। যিহিষ্কেলের গ্রন্থে শনিবারের ব্যবস্থা লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে ইয়াহুদীদের প্রতি গযব নাযিলের হুমকি দেওয়া হইয়াছে (দ্র. যিহিঙ্কেল, ২০: ১২-১৭)। মূসা (আ)-এর শরী'আতে শনিবারের বিধিনিষেধ লংঘন করার শাস্তি ছিল মৃত্যুদণ্ড (দ্র. গণনাপুস্তক, ১৫: ৩২-৬)।
বর্তমান কালের ইয়াহুদীরা এই দিনটি পালন করে এবং খৃস্টানরাও প্রথমদিকে এই দিনটি পালন করিত (Ency. Religion, 10/329; Faith of the World, 2/785)। কারণ তাহারা বাইবেলের নির্দেশ মান্য করিতে বাধ্য এবং হযরত 'ঈসা (আ)-ও এই দিনের বিধিনিষেধ বাতিল করেন নাই। তিনি এই দিনে অবশ্য যাবতীয় ছওয়াবের কাজ করিতে উৎসাহিত করিয়াছেন (দ্র. মথি, ১২: ১-১৩; মার্ক, ২: ২৩-২৮; ৩: ১-৫; লুক, ৬: ১-১০; ১৩: ১১-১৬; ১৪: ১-৫)। এই সম্পর্কে যোহনের উক্তি : আমি প্রভুর দিনে আত্মবিষ্ট হইলাম এবং আমার পশ্চাৎ তুরীধ্বনিবৎ এক মহারব শুনিলাম (বাইবেলের প্রকাশিত বাক্য, ১: ১০)। খৃস্টান জাতি পথভ্রষ্ট হইয়া এক পর্যায়ে এই দিনের বিধিনিষেধ পালন ত্যাগ করে। মহানবী (স)-এর এক হাদীছ হইতেও ইহার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
أَضَلَّ اللَّهُ عَنِ الْجُمُعَةِ مَنْ كَانَ قَبْلَنَا فَكَانَ لِلْيَهُودِ يَوْمُ السَّبْتِ وَكَانَ لِلنَّصَارَى يَوْمُ الْأَحَدِ .
"আল্লাহ তা'আলা জুমুআ'র দিনের ব্যাপারে আমাদের পূর্ববর্তীদেরকে পথভ্রষ্ট করিয়াছেন। অতএব ইয়াহুদীদের জন্য হইল শনিবার এবং খৃস্টানদের জন্য রবিবার" (মুসলিম, জুমু'আ, নং ১৮৫২)।
বিশেষত ইয়াহুদীদের জন্য শনিবারের বিধিনিষেধ মান্য করা যে বাধ্যতামূলক ছিল তাহা কুরআন মজীদ হইতেও জানা যায় এবং উক্ত বিধিনিষেধ লংঘন করার কারণে একটি এলাকার ইয়াহুদীরা আল্লাহর গযবে ধ্বংসপ্রাপ্ত হইয়াছিল তাহাও উল্লেখ আছে। মহান আল্লাহ বলেন:
وَلَقَدْ عَلِمْتُمُ الَّذِينَ اعْتَدَوْا مِنْكُمْ فِي السَّبْتِ فَقُلْنَا لَهُمْ كُونُوا قِرَدَةً خَاسِئِينَ.
"তোমাদের মধ্যে যাহারা শনিবার সম্পর্কে সীমালংঘন করিয়াছিল তাহাদেরকে তোমরা নিশ্চিতভাবে জান। আমি তাহাদেরকে বলিয়াছিলাম, তোমরা ঘৃণিত বানর হও” (২: ৬৫; আরও তু. ৪: ৪৭, ১৫৪; ৭: ১৬৩; ১৬: ১২৪; ১৬: ১২৪)।
একদল ইয়াহুদী রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট কয়েকটি বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করার জন্য উপস্থিত হইলে তিনি তাহাদেরকে বলেন:
وَعَلَيْكُمْ يَا مَعْشَرَ الْيَهُودِ خَاصَّةً لَا تَعْدُوا فِي السَّبْت .
“হে ইয়াহুদী সম্প্রদায়! বিশেষত তোমরা শনিবারের সীমা লংঘন করিও না" (তিরমিযী, ইসতীযান, বাব ৩৩, নং ২৬৭০; তাফসীর সূরা বনী ইসরাঈল, নং ৩০৮২; নাসাঈ, তাহ্রীম)।
যে সম্প্রদায় বানরে রূপান্তরিত হইয়াছিল তাহাদের সম্পর্কেই সূরা আ'রাফে একটু বিস্তৃত বর্ণনা আছে :
وَاسْتَلْهُمْ عَنِ الْقَرْيَةِ الَّتِي كَانَتْ حَاضِرَةَ الْبَحْرِ إِذْ يَعْدُونَ فِي السَّبْتِ إِذْ تَأْتِيهِمْ حِيْتَانُهُمْ يَوْمَ سَبْتِهِمْ شُرَّعًا وَيَوْمَ لَا يَسْبِتُونَ . لَا تَأْتِيهِمْ كَذلِكَ نَبْلُوهُمْ بِمَا كَانُوا يَفْسُقُونَ. وَإِذْ قَالَتْ أُمَّةٌ مِّنْهُمْ لِمَ تَعِظُوْنَ قَوْمًا اللهُ مُهْلِكُهُمْ أَوْ مُعَذِّبْهُمْ عَذَابًا شَدِيدًا . قَالُوا مَعْذِرَةً إِلى رَبِّكُمْ وَلَعَلَّهُمْ يَتَّقُونَ. فَلَمَّا نَسُوا مَا ذُكِّرُوا بِهِ انْجَيْنَا الَّذِينَ يَنْهَوْنَ عَنِ السُّوْءِ وَأَخَذْنَا الَّذِينَ ظَلَمُوا بِعَذَابٍ يَئِيسٍ بِمَا كَانُوا يَفْسُقُونَ. فَلَمَّا عَتَوا عَمَّا نُهُوا عَنْهُ قُلْنَا لَهُمْ كُونُوا قِرَدَةً خَسِنِينَ.
"তাহাদেরকে সমুদ্র তীরবর্তী জনপদবাসীদের সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা কর, তাহারা শনিবারের সীমা লংঘন করিত, শনিবার উদযাপনের দিন মাছ পানিতে ভাসিয়া তাহাদের নিকট আসিত। কিন্তু যেদিন তাহারা শনিবার উদযাপন করিত না সেদিন উহারা তাহাদের নিকট আসিত না। এইভাবে আমি তাহাদেরকে পরীক্ষা করিয়াছিলাম, কারণ তাহারা সত্য ত্যাগ করিত। স্মরণ কর, তাহাদের একদল বলিয়াছিল, আল্লাহ যাহাদেরকে ধ্বংস করিবেন কিংবা কঠোর শাস্তি দিবেন, তোমরা তাহাদেরকে সদুপদেশ দাও কেন? তাহারা বলিয়াছিল, তোমাদের প্রতিপালকের নিকট দায়িত্ব মুক্তির জন্য এবং যাহাতে তাহারা সাবধান হয় এইজন্য। তাহাদেরকে যে উপদেশ দেওয়া হইয়াছিল তাহারা যখন উহা বিস্মৃত হয়, তখন যাহারা অসৎ কার্য হইতে নিবৃত্ত করিত তাহাদেরকে আমি উদ্ধার করি এবং যাহারা যুলুম করে তাহারা কুফরী করিত বলিয়া আমি তাহাদেরকে কঠোর শাস্তি দিলাম। তাহারা যখন নিষিদ্ধ কার্য ঔদ্ধত্য সহকারে করিতে লাগিল তখন তাহাদেরকে বলিলাম, ঘৃণিত বানর হও” (৭: ১৬৩-১৬৬)।
অধিকাংশ তাফসীরকার ও ঐতিহাসিকের মতে, ইহার ঘটনাস্থল 'আইলা' বা আইলাত বা ঈলাত) তাফসীর ইবন আব্বাস, পৃ. ১৪০; তাফসীর ইব্‌ন কাছীর, বাংলা, দ্বিতীয় সং, ১খ, পৃ. ৩৫৫; কুরতুবী, ৭ খ, পৃ. ৩০৬; শায়খুল হিন্দ, পৃ. ২২৭, টীকা ৩; মা'আরেফুল কুরআন, ২ঃ ৬৫ আয়াতাধীন তাফসীর; তাফহীমুল কুরআন, সূরা আ'রাফের টীকা নং ১২২; আল-কামিল, ১খ, পৃ. ১৬৯ ইত্যাদি) এবং ইহা দাউদ (আ)-এর যুগের ঘটনা (কুরতুবী, ৭ খ, পৃ. ৩০৬; কামিল, ২ খ, পৃ. ১৬৯)। ইয়াহুদী-খৃস্টানদের ধর্মীয় কিতাবে ও ইতিহাসে এই ঘটনার উল্লেখ দেখা যায় না।
স্থানটি লোহিত সাগরের তীরে অবস্থিত এবং হিজাযের শেষ সীমা ও সিরিয়ার শুরু (আল-কামিল, ১খ, পৃ. ১৬৯, টীকা ১)। বর্তমান ইয়াহুদী সরকার এখানে উক্ত নামে একটি সামুদ্রিক বন্দর নির্মাণ করিয়াছে, ইহার অদূরেই জর্দানের প্রসিদ্ধ আকাবা নৌ-বন্দর অবস্থিত। বনী ইসরাঈলের উত্থান যুগে ইহা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায় কেন্দ্র ছিল। ইহা হযরত সুলায়মান (আ)-এর লোহিত সাগরীয় যুদ্ধজাহাজ ও বাণিজ্য জাহাজের ঘাটি ছিল (তাফহীমুল কুরআন, পূর্বোক্ত স্থানে)।
ঐ এলাকার ইয়াহুদীরা প্রথম প্রথম অপকৌশলের অন্তরালে শনিবারের বিধিনিষেধ লংঘন করিয়া মৎস শিকার করিত। কুরআন মজীদের বর্ণনামতে, শনিবারই সমুদ্রতীরে ব্যাপক হারে ঝাঁকে ঝাঁকে মাহ ভাসিয়া আসিত, অন্য দিন আসিত না। ইহা ছিল তথাকার ইয়াহুদীদের জন্য একটি ঈমানী পরীক্ষা। কথিত আছে যে, হযরত দাউদ (আ) ঐ দিন সমুদ্র তীরে বসিয়া আল্লাহ্‌র কিতাব তিলাওয়াত করিতেন এবং তাহা শুনিবার জন্য সমস্ত পশুপাখি তীরে আসিয়া ভীড় জমাইত (গোলাম নবী, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ২২৩)। তাহারা সমুদ্র হইতে খাল খনন করিয়া অভ্যন্তর ভাগে মাছ আসিবার ব্যবস্থা করিয়াছিল। খালে মাছ ঢুকিবার পরে তাহারা জাল বা অন্য কিছু দ্বারা মাছের বহির্গমন প্রতিরোধ করিয়া রাখিত। অতঃপর শনিবারের সীমা শেষ হইলে তাহারা মৎস্য শিকার করিত। এইভাবে তাহারা অপকৌশল অবলম্বন করিয়া আল্লাহর বিধান লঙ্ঘন করে।
ঐ এলাকার সৎকর্মপরায়ণ লোকের এই দুষ্কর্ম লিপ্ত ব্যক্তিদের ওয়াজ-নসীহত ও উপদেশের মাধ্যমে মৎস্য শিকার হইতে বিরত রাখিতে চেষ্টা করেন। কিন্তু তাহারা তাহাদের কথায় কর্ণপাত করে নাই। ইহাতে ঐ এলাকার লোক দুই জনপদে বিভক্ত হইয়া যায় এবং তাহারা পৃথক পৃথকভাবে বসবাস করিতে থাকে। আল্লাহ তাআলা দুষ্কৃতকারীদের অপরাধের শাস্তিস্বরূপ তাহাদিগকে বানরে রূপান্তরিত করিয়া দেন। একদিন সকাল বেলা সৎলোকেরা দুষ্কৃতকারীদের এলাকায় চরম নীরবতা লক্ষ্য করিয়া সেখানে গিয়া দেখিতে পান যে, উহারা বানরে পরিণত হইয়াছে। কাতাদা (র)-এর মতে যুবকেরা বানরে এবং বৃদ্ধরা শূকরে রূপান্তরিত হইয়াছিল। ইহারা তিন দিন জীবিত থাকার পর নিঃশেষ হইয়া যায় (কুরতুবী, ১খ, ২৪: ৬৬-এর অধীন; মা'আরিফুল কুরআন, ১খ, ২ : ৬৬ আয়াতাধীন; আল-কামিল, ১খ, পৃ. ১৬৯; আরাইস, পৃ. ৩১০-১১)। তিন দিন পর প্রবল ঝড়বৃষ্টি ইহাদের লাশ সমুদ্রে নিক্ষেপ করে (আরাইস, পৃ. ৩১১)। আল্লাহ তাআলার করুণায় ঐ এলাকার নেককার লোকেরা এই গযব হইতে রেহাই পান।
আবদুল্লাহ ইব্‌ন মাস'উদ (রা) বলেন, কয়েকজন সাহাবী রাসূলুল্লাহ (স)-কে জিজ্ঞাসা করিলেন, আমাদের যুগের বানর ও শূকর কি সেই দেহাবয়ব বিকৃত ইয়াহুদী সম্প্রদায়? তিনি বলিলেন: আল্লাহ যখন কোন সম্প্রদায়ের উপর দেহাবয়ব বিকৃতির শাস্তি নাযিল করেন, তখন তাহারা ধরাপৃষ্ঠ হইতে বিলুপ্ত হইয়া যায়। তিনি আরও বলেন: বানর ও শূকর পৃথিবীতে পূর্বেও ছিল এবং ভবিষ্যতেও থাকিবে। ইহাদের সহিত দেহাবয়ব বিকৃত বানরের কোন সম্পর্ক নাই (সহীহ মুসলিমের বরাতে কুরতুবী ও মাআরিফুল কুরআন, ২: ৬৬ আয়াতের ব্যাখ্যাধীন)।
অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ আলেমের এই মত যে, দেহাবয়র বিকৃতির শাস্তিপ্রাপ্তরা বংশবৃদ্ধি করিতে পারে না। বানর, শূকর ইত্যাদি তৎপূর্বেও ছিল। আল্লাহ তা'আলা যাহাদের দেহবয়ব বিকৃতির দ্বারা শাস্তি দিয়াছেন তাহারা অচিরেই ধ্বংস হইয়া গিয়াছে এবং তাহাদের কোন বংশধর অবশিষ্ট থাকে নাই। কেননা তাহারা আল্লাহর গযব ও অসন্তুষ্টি শিকার হইয়াছে। অতএব তিন দিনের অধিক পৃথিবীতে তাহাদের অস্তিত ছিল না। এই বিষয়ে রাসূলুল্লাহ (স) হইতে বর্ণনা করা হইয়াছে এবং তাহা প্রমাণিত হইয়াছে যে, আল্লাহ্ গযবে দেহাবয়ব বিকৃতরা বংশবিস্তার করে নাই, পানাহার করে নাই এবং তিন দিনের অধিক জীবিত থাকে নাই। ইব্‌ন আব্বাস (রা) হইতেও অনুরূপ বর্ণিত হইয়াছে (কুরতুবী, ১খ, পৃ. ৪৪০-৪১)। মহানবী (স) বলেন : “আল্লাহ তা'আলা যাহাদেরই দেহাবয়ব বিকৃত করিয়াছেন তাহাদের কোন বংশধর বা উত্তরপুরুষ অবশিষ্ট রাখেন নাই" (মুসনাদে আহমাদ, ১খ, পৃ. ৩৯০)।
ইবনুল আরাবীর একটি দুর্বল মত পাওয়া যায় যে, ইহাদের বংশধর বানর, শূকর, গুইসাপ, ইঁদুররূপে অবশিষ্ট আছে (কুরতুবীর আহকামুল কুরআন, ১খ, পৃ. ৪৪০-১)। কোন কোন হাদীস হইতে ইহার সপক্ষে কিছুটা ইঙ্গিত পাওয়া যায়। যেমন আবূ হুয়ায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। নবী (স) বলেন: বনূ ইসরাঈলের একটি গোত্র নিখোঁজ হইয়া যায়। তাহাদের কি পরিণতি হইয়াছিল তাহা অজ্ঞাত। আমার সন্দেহ হয় এই ইঁদুরই (বিকৃত অবয়বে) তাহারা কিনা! ইহাদের সামনে উটের দুধ রাখা হইলে ইহারা তাহা পান করে না, অথচ বকরীর দুধ রাখা হইলে তাহা পান করে। আবৃ হুরায়রা (রা) বলেন, আমি কা'বের নিকট ইহা বর্ণনা করিলে তিনি জিজ্ঞাসা করেন, আপনি কি নবী (স)-কে এই কথা বলিতে শুনিয়াছেন? আমি বলিলাম, হাঁ। কা'ব আমাকে বারবার একথা জিজ্ঞাসা করিলে আমি বলিলাম, আমি কি তাওরাত পড়ি (বুখারী, বাদউল খালক, বাব ১৫, নং ৩০৬১; মুসলিম, যুহদ)?
জাবির ইব্‌ন আবদুল্লাহ (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর সামনে গুইসাপের গোশত পেশ করা হইলে তিনি তাহা ভক্ষণ করেন নাই এবং বলেন: আমি জানি না হয়ত ইহারা পূর্বকালের দেহাবয়ব বিকৃত সম্প্রদায়ভুক্ত কিনা (মুসলিম, কিতাবু'স-সায়দ, বাব ১৮০, নং ৪৮৮৩; আরও তু. নং ৪৮৮৫)! উপরিউক্ত হাদীছ দ্বারা ইবনুল আরাবীর মত প্রমাণিত হয় না। কারণ এইসব হাদীছে কেবল একটা সন্দেহ প্রকাশ করা হইয়াছে, দৃঢ়তার সহিত কিছু বলা হয় নাই। আর পূর্বোক্ত হাদীছসমূহে দৃঢ়তার সহিত বলা হইয়াছে যে, আল্লাহ তাহাদেরকে এবং তাহাদের কোন বংশধরকে অবশিষ্ট রাখেন নাই।
ইসলামী শরীআতে শনিবারের বিশেষ কোন গুরুত্ব নাই। রাসূলুল্লাহ (স) কেবল ইয়াহুদীদেরকেই গুরুত্ব সহকারে এই দিন পালনের নির্দেশ প্রদান করিয়াছেন (দ্র. তিরমিযী, হাদীছ নং ২৬৭০)। তবে তিনি অন্যান্য দিবসের মত কখনও কখনও শনিবারও সাওম (রোয়া) পালন করিতেন। যেমন বলা হইয়াছে যে, তিনি কোনও মাসের শনি, রবি ও সোমবার সাওম পালন করিলে পরবর্তী মাসের মঙ্গল, বুধ ও বৃহস্পতিবার সাওম পালন করিতেন (তিরমিযী, সাওম, বাব ৪৪, নং ৬৯৪)। কিন্তু অপর হাদীছে শনিবার সাওম পালন করিতে নিষেধ করা হইয়ছে। যেমন তিনি বলেন: তোমাদের উপর ফরযকৃত সাওম ব্যতীত শনিবারে তোমরা কোনও সাওম পালন করিও না। তোমাদের কেহ যদি (সেই দিনের আহারের জন্য) আঙ্গুর লতার বাকল অথবা গাছের ডাল ব্যতীত অন্য কিছু না পায়, তাহা হইলে সে যেন (রোযা ভাঙ্গার জন্য) উহাই চিবায় (তিরমিযী, সাওম, বাব ৪৩, নং ৬৯২; ইবন মাজা, সাওম, বাব ৩৮, নং ১৭২৬; সুনানুদ দারিমী, সাওম, বাব ৪০, নং ১৭৪৯; আবূ দাউদ, সাওম, বাব ৫২; মুসনাদে আহমাদ, ৬খ, নং ৩৬৮ ও ৩৮৬)। ইমাম তিরমিযী (র) বলেন, মাকরূহ হওয়ার কারণ কেবল শনিবারকে সাওম পালনের জন্য নির্দিষ্ট করা। কেননা ইয়াহুদীরা শনিবারের প্রতি বিশেষ মর্যাদা প্রদর্শন করিয়া থাকে (পূর্বোক্ত হাদীছের নিম্নে)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 একটি মূল্যায়ন

📄 একটি মূল্যায়ন


শনিবারের উক্ত ঘটনা হযরত দাউদ (আ)-এর যুগে সংঘটিত হইয়াছিল বলিয়া কোনও কোনও তাফসীরকার ও ঐতিহাসিক মত প্রকাশ করিয়াছেন এবং অনেকে উহার কাল নির্দেশ করেন নাই। সংগত কারণে এই ঘটনা দাউদ (আ)-এর সমকালীন বলিয়া মনে হয় না। কারণ দাউদ (আ) ছিলেন একদিকে মহামর্যাদাবান নবী এবং অন্যদিকে তিনি ছিলেন সমকালীন একচ্ছত্র শাসক। তাঁহার রাজধানী বায়তুল মাকদিস হইতে ঘটনাস্থল আইলার দূরত্ব খুব বেশি নহে। কোন একটি সম্প্রদায় তাঁহার মত একজন মহান নবী ও দক্ষ শাসকের শাসনাধীন ও নিকটস্থ এলাকায় অবস্থান করিয়া দিনের পর দিন তাওরাতের একটি কঠোর বিধান (যাহা লংঘনের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড) অমান্য করিয়া দুষ্কর্মে লিপ্ত থাকিবে আর তিনি দেশের সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী হইয়া নীরব থাকিবেন, তাহাদের দমনের জন্য কোন সামরিক বাহিনী প্রেরণ করিবেন না তাহা যেমন প্রশাসনিক নীতিমালার পরিপন্থী তেমনি নবুওয়াতের শানেরও খেলাফ। ঘটনাটি তাঁহার আমলের পূর্বেও ঘটিতে পারে। কারণ তালূত-জালুতের যুদ্ধের পূর্ব পর্যন্ত ইসরাঈলীরা ছিল পথভ্রষ্ট ও পরাধীন, এমনকি তাহারা পৌত্তলিকতায়ও লিপ্ত ছিল। এইরূপ অধঃপতিত অবস্থায় তাহাদের যে কোনরূপ ধর্মবিরোধী তৎপরতায় লিপ্ত হওয়া স্বাভাবিক।
ঘটনাটি দাউদ ও সুলায়মান (আ) বংশের রাজত্বের পতনের পরেও ঘটিতে পারে। যেমন ইয়ারমিয়া (যিরমিয়) নবীর সময় জেরুসালেমের মূল শহরের সিংহদ্বার হইতে লোকেরা শনিবার মাল-সামান লইয়া চলিয়া যাইত এবং ঐ দিনের বিধিনিষেধের তোয়াক্কা করিত না। এই কারণে ইয়ারমিয়া নবী আল্লাহর পক্ষ হইতে ইয়াহুদীদের ধমক দিলেন যে, তাহারা এইভাবে শরীআতের প্রকাশ্য ও স্পষ্ট বিরোধিতা ত্যাগ না করিলে জেরুসালেমকে আগুনে পোড়াইয়া ফেলা হইবে (তু. যিরমিয়, ১৭: ২১-২৭)। হিযকিয়েল (যিহিঙ্কেল) নবীর কিতাবেও শনিবারের অবমাননাকে ইয়াহুদীদের জাতীয় অপরাধসমূহের মধ্যে একটি মারাত্মক অপরাধ বলিয়া ঘোষণা করা হইয়াছে (তু. যিহিঙ্কেল, ২০: ১২-২৪)। অতএব সূরা আল-আ'রাফে শনিবার লংঘনের যে ঘটনা উল্লিখিত হইয়াছে তাহা এই সময়কার হওয়া অসম্ভব নহে (নিবন্ধকার)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00