📄 দাউদ (আ)-এর দাওয়াতী কার্যক্রম
নবী-রাসূলগণের মিশনের মূল উদ্দেশ্যই হইল আল্লাহর দীনের দাওয়াত মানবজাতির নিকট পৌঁছাইয়া দেওয়া। তাহাদিগকে কিতাব ও প্রজ্ঞা দান করা হয় মানবজাতিকে সংশোধন ও পরিচ্ছন্ন করার জন্য, আল্লাহর বিধান তাহাদেরকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য এবং তাহাদেরকে সত্য-ন্যায়ের পথে পরিচালনার জন্য। মহান আল্লাহ বলেন:
وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَسُولاً أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ.
"আল্লাহ্ ইবাদত করিবার ও তাগূতকে বর্জন করিবার নির্দেশ দিবার জন্য আমি প্রতিটি জাতির 'মধ্যেই রাসূল পাঠাইয়াছি” (১৬: ৩৬)।
وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ مِنْ رَسُولِ إِلا نُوحِي إِلَيْهِ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلا أَنَا فَاعْبُدُونِ . "আমি তোমার পূর্বে যে রাসূলই প্রেরণ করিয়াছি তাহার প্রতি এই ওহীও প্রেরণ করিয়াছি যে, আমি ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ নাই। অতএব তোমরা আমারই ইবাদত কর” (২১:২৫)।
وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ رَسُولُ إِلَّا بِلِسَانِ قَوْمِهِ لِيُبَيِّنَ لَهُمْ.
"আমি প্রত্যেক রাসুলকেই তাহার স্বজাতির ভাষাভাষী করিয়া পাঠাইয়াছি, তাহাদের নিকট পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করিবার জন্য" (১৪:৪)।
নবীগণের মিশন সম্পর্কে জানার জন্য আরও দ্র. ৫:৭২, ১১৭; ৭:৫৯, ৬৫, ৭৩, ৮৫; ১১: ৫০, ৬১, ৮৪ ইত্যাদি)।
অতএব হযরত দাউদ (আ) একজন নবী হিসাবে তাঁহার মিশনই ছিল আল্লাহ্ দীনের দাওয়াত প্রচার। তাঁহার দাওয়াতী কার্যক্রমের বিস্তারিত বিবরণ জানা না গেলেও একথা বলা যায় যে, তিনি মানবজাতিকে, বিশেষত বনূ ইসরাঈলকে মূর্তিপূজার পঙ্কিলতা হইতে মুক্ত করিয়া এক আল্লাহ্ আনুগত্যে আনয়ন করিতে সদা তৎপর ছিলেন। ফোরাত হইতে নীল পর্যন্ত বিরাট ভূভাগ দখল করিয়া তিনি এইসব এলাকার মানুষের মধ্যে আল্লাহর দীনের ব্যাপক প্রচার করেন। (Encyclopedia Americana, vol.: viii, p. 527)। তাঁহার পুত্র নবী সুলায়মান (আ) সাবার সম্রাজ্ঞীকে যে পত্র প্রেরণ করেন তাহার সূচনাই ছিল আল্লাহর নামে : “দয়াময় পরম দয়ালু আল্লাহর নামে” (২৭:৩০)। “সেই নারী (সম্রাজ্ঞী) বলিল, হে আমার প্রতিপালক। আমি তো নিজের প্রতি জুলুম করিয়াছি, আমি সুলায়মানের সহিত বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করিতেছি” (২৭:৪৪)। এই আয়াতদ্বয় প্রমাণ করে যে, দাউদ ও সুলায়মান (আ)-এর মূল লক্ষ্য রাজ্যজয় ছিল না, ছিল আল্লাহ্র দীনের প্রচার ও প্রসার। তাঁহারা রাষ্ট্রীয় শক্তি ও প্রশাসন যন্ত্রকে পূর্ণরূপে এই উদ্দেশ্যে ব্যবহার করিয়াছেন। আর মুমিনগণকে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব দান করা হইলে তাহারা এই কর্তৃত্বকে দাওয়াতী কার্যক্রম প্রসারের জন্য নিয়োজিত করেন।
الَّذِينَ إِنْ مَكَّنُهُمْ فِي الْأَرْضِ أَقَامُوا الصَّلوةَ وَأتُوا الزكوة وآمَرُوا بِالْمَعْرُوفِ وَنَهِوَ عَنِ الْمُنْكَرِ.
"আমি তাহাদেরকে (ঈমানদারগণকে) পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা দান করিলে তাহারা সালাত কায়েম করে, যাকাত দেয়, সৎকাজের নির্দেশ দেয় এবং অসৎ কার্যে নিষেধ করে” (২২:৪১)। হযরত দাউদ (আ)-ও তাহাই করিয়াছিলেন।
📄 দাউদ (আ)-এর ইবাদত বন্দেগী
নবী-রাসূলগণ ছিলেন স্ব স্ব যুগের মানবজাতির জন্য অনুসরণীয় আদর্শ। যাবতীয় কার্যক্রমেই তাঁহারা অনুসরণীয় আদর্শ। তাঁহাদের আচরণ প্রত্যক্ষ করিয়াই মানুষ আল্লাহ্ দীনের প্রতি উদ্বুদ্ধ হয়। তাঁহারা দৈনন্দিন জীবন যাপনে যেমন ছিলেন অনুসরণীয়, তদ্রূপ ইবাদত-বন্দেগীতেও ছিলেন অনুসরণীয়। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইব্ন আমর (রা)-এর রাতভর ইবাদত-বন্দেগী এবং দিনভর রোযা রাখার খবর অবহিত হইয়া তাঁহাকে এই ব্যাপারে দাউদ (আ)-এর অনুসরণ করার উপদেশ দেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন: "দাউদ (আ) ছিলেন সর্বাধিক ইবাদতপ্রিয় মানুষ” (হাদীছ সংক্রান্ত অনুচ্ছেদের ১০ নং হাদীস দ্র.)। মহানবী (স) বলেন: আল্লাহর নিকট সর্বাধিক পছন্দনীয় (নফল) সাওম হইল দাউদ (আ)-এর সাওম (রোজা)। তিনি এক দিন পরপর সাওম পালন করিতেন। আল্লাহ্র নিকট সর্বাধিক পছন্দনীয় (নফল) সালাত হইল দাউদ (আ)-এর সালাত (নামায)। তিনি অর্ধেক রাত্রি ঘুমাইতেন, এক-তৃতীয়াংশ রাত্রি সালাত আদায় করিতেন এবং এক-ষষ্ঠাংশ (আবার) নিদ্রা যাইতেন (হাদীছ সংক্রান্ত অনুচ্ছেদের ১ নং ও ২ নং হাদীস দ্র.)। তিনি ছিলেন অত্যধিক আল্লাহভীরু লাজনম্র স্বভাবের। ইহার ফলে তাঁহাকে রুগ্ন মনে হইত, অথচ তিনি রুগ্ন ছিলেন না (ঐ অনুচ্ছেদের ৫ নং হাদীস দ্র.)। তাঁহার সর্বাধিক লক্ষণীয় রৈশিষ্ট্য এই যে, তিনি এত বিরাট ভূভাগের মহাশক্তিধর শাসক হওয়া সত্ত্বেও নিজের কায়িক শ্রমের উপার্জন দ্বারা নিজের ও নিজ পরিজনের ভরণ-পোষণ করিতেন। রাসূলুল্লাহ (স) স্বশ্রমে উপার্জিত আহারকে সর্বাধিক উত্তম আহার আখ্যায়িত করিয়াছেন (উক্ত অনুচ্ছেদের ৪ নং হাদীস দ্র.)। তিনি স্বোপার্জিত আয়ের এক-তৃতীয়াংশ নিজ পরিবার-পরিজনের জন্য ব্যয় করিতেন এবং দুই-তৃতীয়াংশ গরীব-মিসকীনদেরকে দান করিতেন (তাহযীব তা'রীখ দিমাল্ক, ৫খ, পৃ. ১৯৪)।
তিনি প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহর নিকট এই বলিয়া দো'আ করিতেন: "হে আল্লাহ! অদ্য রজনীতে আসমান হইতে যমীনে যত বিপদাপদ নামিয়া আসিয়াছে, তাহা হইতে আমাকে মুক্তি দান করুন। হে আল্লাহ! অদ্য মিশিথে আসমান হইতে যমীনে যত কল্যাণ অবতীর্ণ হইয়াছে, তাহার প্রতিটির অংশ আমাকে দান করুন" (তাহযীব তারীখ দিমাল্ক, ৫খ, পৃ. ১৯৬-৭)। অনুরূপ আরো মুনাজাত উক্ত গ্রন্থে বিধৃত হইয়াছে।
বাইবেলেও তাঁহার হৃদয়স্পর্শী বহু মুনাজাত আছে। "সদাপ্রভু! তোমার ক্রোধে আমাকে ভর্ৎসনা করিও না, তোমার রোষাগ্নিতে আমাকে শাস্তি দিও না” (গীতসংহিতা, ৩৮: ১)। "সদাপ্রভু! আমাকে পরিত্যাগ করিও না, আমার প্রভু! আমা হইতে দূরে থাকিও না। হে প্রভু! আমার পরিত্রাণ, তুমি আমার সাহায্য করিতে সত্বর হও” (ঐ, ২১-২২)। "হে প্রভু! আমার বিচার কর, অসাধু জাতির সহিত আমার বিবাদ নিষ্পন্ন কর, ছলপ্রিয় ও অন্যায়কারী মনুষ্য হইতে আমাকে উদ্ধার কর” (ঐ, ৪৩ঃ ১)। "হে প্রভু! আমার ওষ্ঠাধর খুলিয়া দাও। আমার মুখ তোমার প্রশংসা প্রচার করিবে (ঐ, ৫১: ১৫)। "তোমার পিতৃগণের পরিবর্তে তোমার পুত্রেরা থাকিবে; তুমি তাহাদিগকে সমস্ত পৃথিবীতে অধ্যক্ষ করিবে” (গীতসংহিতা, ৪৫: ১৬)। অর্থাৎ মহানবী (স) তাঁহার পিতৃব্যগণের পক্ষ হইতে চরম বাধা ও নির্যাতনের শিকার হইয়াছিলেন এবং ইহাদের পরবর্তী বংশধরগণই আবার ইসলাম গ্রহণ করিয়া পৃথিবীর সর্বত্র উহার প্রচার ও প্রসার করিয়াছিলেন। তাহারাই (কুরায়শগণ) দুনিয়ার বিভিন্ন অংশে মুসলিম রাজ্য প্রতিষ্ঠা করিয়া উহার শাসক হইয়াছিলেন। "আমি তোমার নাম সমস্ত পুরুষ পরম্পরায় স্মরণ করাইব, এইজন্য জাতিরা যুগে যুগে চিরকালে তোমার স্তব করিবে” (গীতসংহিতা, ৪৫: ১৭)।
কুরআন মজীদে বলা হইয়াছে : وَرَفَعْنَا لَكَ ذِكْرَكَ
"এরং আমি তোমার খ্যাতিকে উচ্চ মর্যাদা দান করিয়াছি" (৯৪ : ৪)।
আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রা) বলেন, মহানবী (স) বলিয়াছেন : "জিবরাঈল (আ) আমার নিকট আসিয়া আমাকে বলিলেন, আমার রব ও আপনার রব জিজ্ঞাসা করিয়াছেন, আমি (আল্লাহ) কিভাবে তোমার উল্লেখধ্বনি সুউচ্চ করিয়া দিছি? আমি বলিলাম : তাহা আল্লাহই ভালো জানেন। জিবারাঈল (আ) বলিলেন, আল্লাহ তা'আলা বলিয়াছেন, যখন ও যেখানেই আমার উল্লেখ হইবে, তখন সেখানেই আমার সঙ্গে তোমারও উল্লেখ হইবে" (ইবন জারীর, ইবন আবী হাতিম, মুসনাদে আবূ ইয়া'লা, ইবনুল মুনযির, ইব্ন হিব্বান, ইব্ন মারদাবিয়া, আবু নু'আয়ম প্রমুখের বরাতে তাফহীমুল কুরআন, ৬খ, পৃ. ৩৮১-২, টীকা ৩)।
দুনিয়াব্যাপী দৈনিক পাঁচবারের আযানধ্বনি ইহার অন্যতম দৃষ্টান্ত। পাশ্চাত্যের ইয়াহুদী-খৃস্টান পণ্ডিতগণও শত বিদ্বেষ পোষণ সত্ত্বেও তাঁহার গুণগানে পঞ্চমুখ। বহু ইয়াহুদী-খৃস্টান পণ্ডিত আজও তাঁহার প্রশংসায় মুখরিত। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং মার্কিন ঐতিহাসিক উইলিয়াম ম্যাকলেইন ১৯৭৪ খৃ. ১৫ জুলাইর টাইম ম্যাগাজিনের এক জরিপে বলেন, “সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ নেতা হইলেন সম্ভবত মুহাম্মাদ (স)" (দি চয়েস, বাংলা অনু., পৃ. ৫১-৫২ ও ১৬৮)।
এই ক্ষেত্রে মাইকেল এইচ. হার্ট-এর বক্তব্য স্মরণীয়। তিনি লিখিয়াছেন:
"My choice of mohammad to lead the list of the World's most influential persons may surprise some readers and may be questioned by other, but he was the only man in history who was supremely successful on both the religious and secular levels.... Today, thirteeth centuries after his death his influence is still powerfull and pervasive (The Hundred, P. 33)."
অর্থাৎ "সন্দেহ নাই যে, আন্তর্জাতিক বিশ্বের সর্বাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসাবে মুহাম্মদ (স)-কে শীর্ষস্থান প্রদান করার ব্যাপারে আমার এই সিদ্ধান্ত অনেক পাঠককে বিস্মিত করিবে, অনেকেই এই সম্পর্কে নানান প্রশ্ন উত্থাপন করিবেন, কিন্তু তিনিই হইলেন ইতিহাসের একমাত্র ব্যক্তি যিনি ধর্মীয় ও জাগতিক উভয় পর্যায়ে সর্বাধিক সফলতার অধিকারী।..... তাঁহার ইনতিকালের তের শত বৎসর পর আজিও তাঁহার প্রভাব-প্রতিপত্তি অত্যন্ত শক্তিশালী ও সুদূরপ্রসারী।"
📄 যাবুর কিতাবে মহানবী (স) সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী
তাওরাত ও ইনজীল কিতাবদ্বয়ে যেমন রাসূলুল্লাহ (স)-এর আবির্ভাব সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী বিদ্যমান, তদ্রূপ যাবুর কিতাবেও তাহা বিদ্যমান আছে। সম্ভবত কুরআন মজীদের ২১: ১০৫ আয়াতে সেদিকেই ইঙ্গিত করা হইয়াছে। বাইবেলে উক্ত হইয়াছে: "ধন্য তিনি যিনি সদাপ্রভুর নামে আসিতেছেন" (গীতসংহিতা, ১১৮: ২৬)।
"তোমরা সদাপ্রভুর উদ্দেশে গীত গাও, তাঁহার নামের গুণগান কর; যিনি মরুভূমি দিয়া বাহনে আসিতেছেন তাঁহার জন্য রাজপথ বাঁধ" (গীতসংহিতা, ৬৮:৪)। "সদাপ্রভু আপন পবিত্র বাসস্থানে পিতৃহীনদের পিতা ও বিধবাদের বিচারকর্তা” (ঐ, ৬৮: ৫)। "সদাপ্রভু সঙ্গিহীনদিগকে পরিবার মধ্যে বাস করান, তিনি বন্দিগণকে মুক্ত করিয়া কুশলে রাখেন; কিন্তু বিদ্রোহীরা দগ্ধভূমিতে বাস করে" (ঐ, ৬৮: ৬)। "হে প্রভু! তুমি যখন নিজ প্রজাগণের অগ্রে অগ্রে যাইতেছিলে, যখন শুষ্ক ভূমি দিয়া গমন করিতেছিলে, তখন পৃথিবী কম্পমান হইল, সদাপ্রভুর সাক্ষাতে আকাশও জলবিন্দুময় হইল” (ঐ, ৬৮: ৭-৮)। এসব বাক্যে মহানবী (স)-এর আবির্ভাব সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করা হইয়াছে।
"যিনি মরুপথ দিয়া বাহনে আসিতেছেন তাঁহার জন্য রাজপথ বাঁধ” (গীত, ৬৮:৪) বাক্যে মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর আবির্ভাব সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করা হইয়াছে, হযরত ঈসা (আ) সম্পর্কে নয়। কারণ ঈসা (আ)-এর জন্মস্থান বেথেলহাম তৎকালেও এবং বর্তমান কালেও উহার সবুজ শ্যামলিমার জন্য প্রসিদ্ধ। পক্ষান্তরে মহানবী (স)-এর জন্মভূমি মক্কা একটি ঊষর মরু প্রান্তর। তৎকালেও, বর্তমান কালেও। "পিতৃহীনদের পিতা ও বিধবাদের বিচারকর্তা" (গীত, ৬৮: ৫) বলিতেও মহানবী (স)-কে বুঝানো হইয়াছে। কারণ তিনি ছিলেন ইয়াতীম ও বিধবাদের মত আশ্রয়হীনদের আশ্রয়স্থল। "সঙ্গীহীনকে পরিবার মধ্যে বাস করান" (ঐ, ৬৮: ৬) অর্থাৎ মহানবী (স) পিতৃহীন অবস্থায় পৃথিবীতে আগমন করেন এবং তাঁহার ছয় বৎসর বয়সে তাঁহার মাতা ইনতিকাল করেন। উপরন্তু তাঁহার কোন সহোদর ভাই-বোনও ছিল না। যথার্থ অর্থে তিনি ছিলেন নিঃসঙ্গ, আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে "পরিবার" দান করেন। নিম্নোক্ত আয়াতে সেদিকে ইঙ্গিত করা হইয়াছে:
أَلَمْ يَجِدُكَ يَتِيمًا فَأَوى .
"তিনি কি তোমাকে ইয়াতীম অবস্থায় পান নাই আর আশ্রয় দান করেন নাই" (৯৩ঃ ৬)?
"তিনি বন্দিগণকে মুক্ত করিয়া কুশলে রাখেন” (গীত, ৬৮: ৬) অর্থাৎ মহানবী (স)-ই সর্বপ্রথম যুদ্ধবন্দীদের সহিত মানবিক ব্যবহার করেন। তাঁহার ও তাঁহার সাহাবীদের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে কুরআন মজীদে উক্ত হইয়াছে:
وَيُطْعِمُونَ الطَّعَامَ عَلَى حُبِّهِ مِسْكِيْنًا وَيَتِيمًا وَأَسِيرًا .
"আহার্যের প্রতি আসক্তি সত্ত্বেও তাহারা অভাবগ্রস্ত, ইয়াতীম ও বন্দীকে আহার্য দান করে" (৭৬:৮)।
"দগ্ধভূমি” (ঐ, ৬৮: ৬) বলিতে মক্কা উপত্যকাকে বুঝানো হইয়াছে। কুরআন মজীদেও মক্কাকে বিরানভূমি বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে : وَادٍ غَيْرِ ذي زرع ( ‘অনুর্বর উপত্যকা', ১৪: ৩৭)। গীত, ৬৮: ৭-এ মহানবী (স) কর্তৃক পরিচালিত যুদ্ধসমূহের প্রতি ইঙ্গিত করা হইয়াছে (আম্বিয়া-ই কুরআন, ৩খ, পৃ. ৮৩-৫)।
আবদুল ওয়াহ্হাব আন-নাজ্জারের মতে গীতসংহিতা, ৪৫ অধ্যায়েও মহানবী (স)-এর আবির্ভাব সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী বিদ্যমান (কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৩১১, ৩য় সং, বৈরূত তা. বি.)। সেই অধ্যায়ে উক্ত হইয়াছে : "তুমি মনুষ্য-সন্তানগণ অপেক্ষা পরম সুন্দর; তোমার ওষ্ঠাধরে অনুগ্রহ সেচিত হয়; এই নিমিত্ত সদাপ্রভু চিরকালের জন্য তোমাকে আশির্বাদ করিয়াছেন। হে বীর! তোমার খড়গ কটিদেশে বন্ধন কর, তোমার প্রভা ও প্রতাপ (গ্রহণ কর)। আর স্বীয় প্রতাপে কৃতকার্য হও, বাহনে চড়িয়া যাও, সত্যের ও ধার্মিকতাযুক্ত নম্রতার পক্ষে, তাহাতে তোমার দক্ষিণ হস্ত তোমাকে ভয়াবহ কার্য শিখাইবে। তোমার বাণসকল তীক্ষ্ণ, জাতিরা তোমার নীচে পতিত হয়, রাজার শত্রুগণের হৃদয় বিদ্ধ হয়। .... তোমার রাজদণ্ড সরলতার দণ্ড। তুমি ধার্মিকতাকে প্রেম করিয়া আসিতেছ, দুষ্টতাকে ঘৃণা করিয়া আসিতেছ, এই কারণ সদাপ্রভু, তোমার সদাপ্রভু, তোমাকে অভিষিক্ত করিয়াছেন তোমার সখাগণ অপেক্ষা অধিক পরিমাণে আনন্দতৈলে" (গীতসংহিতা, ৪৫: ২-৭)।
বাইবেলের অন্যান্য গ্রন্থেও মহানবী (স)-এর আবির্ভাব সম্পর্কে গীতসংহিতার অনুরূপ ভবিষ্যদ্বাণী বিদ্যমান আছে (উদাহরণস্বরূপ দ্র. দ্বিতীয় বিবরণ, ১৮ : ১৮; যিশাইয়, ২৯ : ১২, যেখানে সর্বপ্রথম ওহী নাযিল হওয়াকালীন অবস্থার প্রতি ইঙ্গিত বিদ্যমান)। এসব ভবিষ্যদ্বাণী দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, সুদীর্ঘ কাল ধরিয়া আসমানী কিতাবসমূহ রাসূলুল্লাহ (স)-এর আগমন সম্পর্কে মানজবাতিকে অবহিত করিয়া আসিতেছিল।
কুরআন মজীদে বলা হইয়াছে : "স্মরণ কর, যখন আল্লাহ নবীদের অঙ্গীকার লইয়াছিলেন যে, তোমাদিগকে কিতাব ও হিকমত যাহা কিছু দিয়াছি, অতঃপর তোমাদের কাছে যাহা আছে তাহার সমর্থকরূপে যখন একজন রাসূল আসিবে তখন তোমরা অবশ্যই তাহার প্রতি ঈমান আনিবে এবং তাহাকে সাহায্য করিবে” (৩:৮১)।
📄 যাবুর কিতাবে মক্কা মুআজ্জমার উল্লেখ
যাবুর কিতাবে বহু স্থানে "সিয়োন” (Zion) পর্বতের উল্লেখ আছে। ইয়াহুদী ও খৃস্টান পণ্ডিতগণ ইহার অর্থ ও অবস্থান নির্ণয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়াছেন। যাবুর কিতাবের গভীর অধ্যয়নে প্রতিভাত হয় যে, ‘সিয়োন’ দ্বারা মক্কা মুআজ্জামাকে বুঝানো হইয়াছে। "... সিয়োন পর্বত, মহান রাজার পুরী। সদাপ্রভু, তাহার অট্টালিকাসমূহের মধ্যে, উচ্চ দুর্গ বলিয়া আপনার পরিচয় দিয়াছেন। কেননা দেখ, রাজগণ সভাস্থ হইয়াছিলেন; তাহারা একসঙ্গে চলিয়া গেলেন; তাহারা দেখিলেন, অমনি স্তম্ভিত হইলেন, বিহ্বল হইলেন, পলায়ন করিলেন” (গীতসংহিতা, ৪৮: ২-৫)।
"তোমরা সিয়োনকে প্রদক্ষিণ কর, তাহার চারিদিকে ভ্রমণ কর, তাহার দুর্গসকল গণনা কর। তাহার দৃঢ় প্রাচীরে মনোযোগ কর, তাহার অট্টালিকা সকল সন্দর্শন কর, যেন ভাবী বংশের কাছে তাহার বর্ণনা করিতে পার” (ঐ, ৪৮: ১২-১৩)।
"ধন্য তাহারা, যাহারা তোমার গৃহে বাস করে, তাহারা সতত তোমার প্রশংসা করিবে। ধন্য সেই ব্যক্তি, যাহার বল তোমাতে, (সিয়োনগামী) রাজপথ যাহার হৃদয়ে রহিয়াছে। তাহারা ক্রন্দনের তলভূমি (ওয়াদী বাকা = Baca) দিয়া গমন করিয়া তাহা উৎসে পরিণত করে; প্রথম বৃষ্টি তাহা বিবিধ মঙ্গলে ভূষিত করে। তাহারা উত্তর উত্তর বলবান হইয়া অগ্রসর হয়, প্রত্যেকে সিয়োনে সদাপ্রভুর কাছে দেখা দেয়” (ঐ, ৮৪: ৪-৭)।
উপরিউক্ত বাক্যে 'ওয়াদী বাকা' (তলভূমি) বলিতে মক্কা মুআজ্জমাকে বুঝানো হইয়াছে। কারণ মক্কার অপর নাম বাক্কা, যাহা কুরআন মজীদেও উক্ত হইয়াছে:
إِنَّ أَوَّلَ بَيْتٍ وُضِعَ لِلنَّاسِ لَلَّذِي بِبَكَّةَ مُبْرَكًا وَهُدًى لِلْعَلَمِينَ.
"নিশ্চয়ই মানবজাতির জন্য সর্বপ্রথম যে গৃহ প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল তাহা তো বাক্কায়, উহা বরকতময় ও বিশ্বজগতের দিশারী" (৩: ৯৬)।
"প্রত্যেকে সিয়োনে সদাপ্রভুর কাছে দেখা দেয়” (গীত, ৮৪: ৭) বাক্যাংশ দ্বারা হজ্জের অনুষ্ঠান বুঝানো হইয়াছে (আম্বিয়া-ই কুরআন, ৩খ, পৃ. ৮৫-৮৭)।
এইভাবে বাইবেলের পুরাতন ও নূতন নিয়মের বহু স্থানে মহানবী (স) সম্পর্কে অগণিত ভবিষ্যদ্বাণী বিদ্যমান।