📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 যুদ্ধের ঐতিহাসিক পটভূমি

📄 যুদ্ধের ঐতিহাসিক পটভূমি


হযরত মূসা (আ) ইসরাঈলীদেরকে ফিরআওনের কবল হইতে মুক্ত করিয়া পবিত্র ভূমিতে (জেরুসালেম) লইয়া আসার পর স্বল্প কালের মধ্যে ইনতিকাল করেন। তাহারা তাওরাতের পথনির্দেশ ভুলিয়া যাইতে থাকে। তাহারা ফিলিস্তীনের সমগ্র এলাকা দখল করিবার পর উহাকে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত করার পরিবর্তে বারোটি গোত্রের মধ্যে বণ্টন করিয়া লয়। ক্রমান্বয়ে তাহারা গোত্রীয় বিবাদে লিপ্ত হইতে থাকে। ফলে তাহারা ঐসব এলাকার পৌত্তলিকদিগকে সমূলে উৎখাত করিতে কখনও সক্ষম হয় নাই। তাহারা পৌত্তলিকদের সহিত একত্রে বসবাস করিতে থাকে এবং তাহাদের শিরকী রীতিনীতি দ্বারা প্রভাবিত হইতে থাকে। এই ক্ষেত্রে বাইবেলের নিম্নোক্ত বিবরণ লক্ষণীয়:
"ইসরাঈল সন্তানগণ সদাপ্রভুর দৃষ্টিতে যাহা মন্দ, তাহাই করিতে লাগিল এবং বাল দেবগণের সেবা করিতে লাগিল। আর যিনি তাহাদের পিতৃপুরুষগণের প্রভু, যিনি তাহাদেরকে মিসর দেশ হইতে বাহির করিয়া আনিয়াছিলেন, সেই সদাপ্রভুকে ত্যাগ করিয়া অন্য দেবগণের অর্থাৎ আপনাদের চতুর্দিকস্থিত লোকদের দেবগণের অনুগামী হইয়া তাহাদের কাছে প্রণিপাত করিতে লাগিল, এইরূপে সদাপ্রভুকে অসন্তুষ্ট করিল। তাহারা সদাপ্রভুকে ত্যাগ করিয়া বাল দেবের ও অষ্টারোত দেবীদের সেবা করিত। তাহাতে ইসরাঈলের বিরুদ্ধে সদাপ্রভুর ক্রোধ প্রজ্বলিত হইল। তিনি তাহাদেরকে লুণ্ঠনকারীদের হস্তে সমর্পণ করিলেন। তাহারা তাহাদের দ্রব্য লুট করিল। আর তিনি তাঁহাদের চতুর্দিকস্থ শত্রুগণের হস্তে তাহাদেরকে বিক্রয় করিলেন, তাহাতে তাহারা আপন শত্রুদের সম্মুখে আর দাঁড়াইতে পারিল না" (বিচারকগণের বিবরণ, ২ঃ ১১-১৪)।
একদিকে ইয়াহুদীরা পথভ্রষ্ট হইতে থাকে এবং তাহাদের মধ্যে বিভেদ ও বিছিন্নতা ছড়াইয়া পড়িতে থাকে, অপরদিকে ফিলিস্তীনী পৌত্তলিকরা ও তাহাদের মিত্ররা ঐক্যবদ্ধ শক্তিতে পরিণত হইতে থাকে। তাহারা সম্মিলিত আক্রমণের মাধ্যমে একের পর এক ইয়াহুদীদের দখলভুক্ত এলাকা কুক্ষিগত করিতে থাকে। অবশেষে তাহারা ইয়াহুদীদের প্রশান্তির সিন্দুকটি পর্যন্ত তাহাদের নিকট হইতে ছিনাইয়া লইয়া যায়। তাহারা চরম লাঞ্ছিত অবস্থায় পতিত হয়।
এই অবস্থায় তাহাদের বোধোদয় হইল যে, একজন শাসকের অধীনে তাহাদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া একান্ত জরুরী। সমসাময়িক নবী হযরত শামুঈল (আ)-এর নিকট তাহাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে তিনি তালূতকে তাহাদের শাসক নিয়োগ করেন (তাফহীমুল কুরআন, ১৭ঃ ৫ আয়াত সংশ্লিষ্ট ৭ নং টীকা দ্র.)। কুরআন মজীদে এই কথাই বলা হইয়াছেঃ "তাহারা যখন তাহাদের নবীকে বলিল, আমাদের জন্য একজন শাসক নিযুক্ত করুন.... তাহাদের নবী তাহাদেরকে বলিলেন, আল্লাহ অবশ্যই তালুতকে তোমাদের শাসক করিয়াছেন" (২: ২৪৬-৭)।
নবী (আ) কর্তৃক তালুত শাসক নিযুক্ত হওয়ার পরপরই তিনি জালুতের বিরুদ্ধে যুদ্ধভিযানের প্রস্তুতি শুরু করেন। ইত্যবসরে আল্লাহর অনুগ্রহে 'তাবৃত' (শান্তির সিন্দুক)-ও তাঁহার ও সঙ্গীগণের হস্তগত হইয়া যায়। ফলে তাহাদের মনোবলও বৃদ্ধি পায় এবং যুদ্ধে যোগদানের জন্য তাহারা উদগ্রীব হইয়া পড়ে (দ্র. ২: ২৪৬)। আল্লাহ তা'আলা ওহীর মাধ্যমে নবীকে জানাইয়া দিলেন যে, বৃদ্ধ, রোগগ্রস্ত, অন্ধ এবং যাহাদের বাস্তবিকই গ্রহণযোগ্য কোন ওজর আছে তাহারা যুদ্ধে গমন করিবে না। যুদ্ধে যোগদানের জন্য তালূত ও তাঁহার বাহিনী সমবেত হইল। তাহারা প্রখর রৌদ্রতাপ ও পানির স্বল্পতা সম্পর্কে অভিযোগ করিলে তালূত তাহাদের জানাইয়া দিলেন যে, আল্লাহ তা'আলা তাহাদেরকে একটি নদী দ্বারা পরীক্ষা করিবেন। নদী অতিক্রমকালে কেহ উহার পানি পান করিতে পারিবে না, এক-দুই আঁজলা ব্যতীত (দ্র. ২: ২৪৯)। কিন্তু সেনাপতির নির্দেশ অমান্য করিয়া অধিকাংশ সৈন্য উদর পূর্তি করিয়া পানি পান করে এবং নদী অতিক্রম করার পর তাহারা যুদ্ধ করিতে অক্ষম হইয়া পড়ে। তাহারা তালূতকে জানাইয়া দিল যে, জালূত ও তাহার সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সামর্থ্য তাহাদের নাই (দ্র. ২: ২৪৯)। কিন্তু যাহারা আল্লাহর সহিত সাক্ষাতে বিশ্বাসী ছিল তাহারা বলিল, কত ক্ষুদ্র বাহিনী কত বৃহৎ বাহিনীকে আল্লাহর হুকুমে পরাভূত করিয়াছে। তালূতের স্বল্প সংখ্যক সৈন্য জালুত ও তাহার বাহিনীর মুকাবিলায় অবতীর্ণ হইয়া আল্লাহর নিকট দো'আ করিল। আল্লাহ যেন তাহাদেরকে ধৈর্য দান করেন, তাহাদেরকে যুদ্ধক্ষেত্রে অবিচল রাখেন এবং কাফেরদের বিরুদ্ধে সাহায্য করেন (দ্র. ২: ২৪৯-২৫০)।
তাফসীরকার সুদ্দী (র) বলেন যে, তালূত আশি হাজার সৈন্যসহ যুদ্ধে রওয়ানা করেন, ইহাদের মধ্যে ছিয়াত্তর হাজার সেনাপতির আদেশ অমান্য করিয়া উদর পূর্তি করিয়া নদীর পানি পান করে এবং অবশিষ্ট থাকে মাত্র চার হাজার (বিদায়া, ২খ., পৃ.৮; আল-কামিল, ১খ, পৃ. ১৬৬; আরাইস, পৃ. ২৯০)। এই পর্যায়ে হাদীছ গ্রন্থাবলীতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সাহাবী হযরত বারাআ ইব্‌ন আযিব (রা)-র একটি বক্তব্য পাওয়া যায়:
عَنِ الْبَرَاءِ قَالَ كُنَّا أَصْحَابُ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَتَحَدَّثُ أَنَّ عِدَّةَ أَصْحَابِ بَدْرٍ عَلَى عِدَّةٍ اصحاب طَالُوْتَ الَّذِينَ جَاوَزُوا مَعَهُ النَّهْرَ وَلَمْ يُجَاوِزُ مَعَهُ الا مُؤْمِنٌ بِضْعَةَ عَشَرَ وَثَلاثَ مِائَةٍ .
"বারাআ (রা) বলেন, আমরা মুহাম্মাদ (স)-এর সাহাবীগণ পরস্পর আলোচনা করিতাম যে, বদর যুদ্ধে যোগদানকারী সাহাবীগণের সংখ্যা ছিল তালুতের সহিত নদী অতিক্রমকারীগণের অনুরূপ তিন শত দশজনের অধিক। কেবল ঈমানদারগণই তাঁহার সহিত নদী পার হইয়াছিল" (বুখারী, ৪খ, মাগাযী, বাব ৪, নং ৩৬৬৭, ৩৬৬৮, আরো দ্র. নং ৩৬৬৬; তিরমিযী, ৩খ, সিয়ার, বাব ৩৭, নং ১৫৪৫; ইব্‌ন মাজা, জিহাদ, বাব ২৫, নং ২৮২৮)।
কুরআন মজীদের বক্তব্য হইতে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, তালূত বাহিনীর সকলেই ছিল মুমিন মুসলমান (দ্র. ২: ২৪৬, ২৪৭, ২৪৮, ২৪৯ ইত্যাদি)। ২৪৯ নং আয়াতে তো পরিষ্কারই বলা হইয়াছে: “সে এবং তাহার সঙ্গী ঈমানদারগণ যখন উহা অতিক্রম করিল...". মুফতী শফী (র) বলেন যে, 'রূহুল মা'আনী'তে উদ্ধৃত ইব্‌ন আব্বাস (রা)-র রিওয়ায়াত দ্বারা বুঝা যায় যে, তালূত বাহিনীতে তিন শ্রেণীর মুমিন ছিলেনঃ একদল দুর্বল মুমিন, যাহারা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইতে পারেন নাই। দ্বিতীয় শ্রেণী পূর্ণ মুমিন যাহারা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়াছেন ঠিকই কিন্তু নিজেদের সংখ্যা- স্বল্পতার দুশ্চিন্তায় ভুগিয়াছিলেন এবং তৃতীয় শ্রেণী ছিলেন পূর্ণ মুমিন যাহারা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়াছেন এবং নিজেদের সংখ্যাস্বল্পতার দুশ্চিন্তার শিকার হন নাই (মাআরেফুল কুরআন, সংক্ষিপ্ত বাংলা সৌদী সংস্করণ, পৃ. ১৩৬)।
ঈমানদার সৈন্যবাহিনীকে সব যুগেই এইরূপ কাঠোর পরীক্ষার সম্মুখীন হইতে হইয়াছে। কারণ সামরিক অভিযানের মত বিপদসংকুল ও জীবনের ঝুঁকিপূর্ণ আর কোন তৎপরতা নাই। তাই এখানে ধৈর্য ও মনোবলের প্রয়োজন সর্বাধিক। বদরের যুদ্ধেও মুসলমানরা নিজেদের সৈন্য সংখ্যার স্বল্পতা ও কাফের সৈন্যদলের সংখ্যাধিক্যে সন্ত্রস্ত হইয়াছিলেন। তাহাদেরকে অভয় দান করিয়া মহান আল্লাহ বলেন:
إِنْ يَكُنْ مِنْكُمْ عِشْرُونَ صَابِرُونَ يَغْلِبُوا مِائَتَيْنِ "তোমাদের মধ্যে বিশজন ধৈর্যশীল থাকিলে তাহারা দুই শতজনের উপর বিজয়ী হইবে ....." (৮:৬৫)।
বাইবেলেও নদী দ্বারা তালূত বাহিনীর সৈন্যদিগকে পরীক্ষা করার কথা আছে। যেমন, "তুমি তাহাদেরকে লইয়া ঐ পানির কাছে নামিয়া যাও। সেখানে আমি তোমার জন্য তাহাদের পরীক্ষা লইব ....। পরে তিনি লোকদেরকে পানির নিকট লইয়া গেলে সদাপ্রভু গিদিওনকে বলিলেন, যে কেহ কুকুরের ন্যায় জিহ্বা দ্বারা পানি চাটিয়া পান করে তাহাকে, যে কেহ পানি পান করিবার জন্য হাঁটুর উপরে উবুড় হয়, তাহাকে পৃথক করিয়া রাখ। তাহাতে সংখ্যায় তিন শত লোক মুখে অঞ্জলি তুলিয়া পানি চাটিয়া খাইল ... এই যে তিন শত লোক পানি চাটিয়া খাইল, ইহাদের দ্বারা আমি তোমাদেরকে নিস্তার করিব" (বিচারক, ৭:৪-৭)।
পরিশেষে বাধ্য হইয়া তালূত সসৈন্যে যুদ্ধে অগ্রসর হইলেন। ইতোমধ্যে আল্লাহ তা'আলা নবী শামূঈল (আ)-কে জানাইয়া দেন যে, বনু ইসরাঈলে দাউদ নামে যিশয়ের এক পুত্র আছে। তাহার হস্তেই জালূত নিহত হইবে। শামূঈল (আ) ওহীর মাধ্যমে ইহা অবগত হইয়া যুদ্ধযাত্রার পূর্বে দাউদ (আ) ও তাঁহার অপর ভ্রাতাগণকে তালূত বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করিলেন। এদিকে দাউদ (আ)-ও মাঠে তাঁহার পিতার মেষপাল চরাইবার কালে অদৃশ্য হইতে শব্দ শুনিতে পান, তুমি জালূতের হন্তা, এখানে কি করিতেছ! তুমি মেষপাল তোমার প্রতিপালকের যিম্মায় ত্যাগ করিয়া তালূত বাহিনীতে যোগদান কর। তালূত জালূতের হত্যাকারীর জন্য নিজ সম্পত্তির অর্ধেক এবং নিজ কন্যাকে তাহার সহিত বিবাহ দেওয়ার ঘোষণা দিয়াছে। তিনি এই অদৃশ্য বাণী শ্রবণ করিয়া তালূত বাহিনীতে যোগদান করিতে রওয়ানা হইয়া যান এবং পথিমধ্যে জালূতকে হত্যা করার তিন খণ্ড পাথর প্রাপ্ত হন (তাহযীব তা'রীখ দিমাক্ক, ৫খ., পৃ. ১৯০-৯১)।
জালূতের সঙ্গে ছিল বিশাল বাহিনী, আর তালূতের সঙ্গে ছিল একটি নগণ্য ক্ষুদ্র বাহিনী। জালুত এই ক্ষুদ্র বাহিনী লক্ষ্য করিয়া তাচ্ছিল্য ও দাম্ভিকতার সহিত তালূতকে মুকাবিলায় অবতীর্ণ হইতে আহবান জানাইল। কিন্তু তালুত বাহিনীর কেহই তাহার মুকাবিলায় অবতীর্ণ হইতে সাহস করিল না।
হযরত দাউদ (আ) এই অবস্থা প্রত্যক্ষ করিয়া জালূতের বিরুদ্ধে নির্ভীকভাবে রণক্ষেত্রে ঝাপাইয়া পড়িলেন এবং সেই আশ্চর্য পাথর নিক্ষেপ করিয়া মুহূর্তের মধ্যে জালুতকে হত্যা করিয়া তাহার দম্ভ চূর্ণ করিয়া দিলেন। সেনাপতির মৃত্যুতে জালূত বাহিনী ভীত-সন্ত্রস্ত হইয়া পলায়ন করিল এবং তালূত বাহিনী আল্লাহর হুকুমে বিজয়ীর বেশে যুদ্ধক্ষেত্র হইতে ফিরিয়া আসিল। এই ঘটনায় দাউদ (আ) সমগ্র ইসরাঈলী জাতির নিকট মহাবীররূপে খ্যাতি লাভ করিলেন এবং তাহাদের প্রিয়পাত্র হইলেন। তালুত তাঁহার কন্যাকে দাউদ (আ)-এর সহিত বিবাহ দিলেন, অবশেষে তিনিই গোটা ইসরাঈল জাতির শাসক হইলেন" (তু. তাহযীর তা'রীখ দিমাশূক, ৫খ., পৃ. ১৯১; আত-তা'রীখুল কামিল, ১খ, পৃ. ১৬৬-৭; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ, পৃ. ৮-৯)।
কোন কোন বর্ণনায় আছে যে, দাউদ (আ) অপরিচিত ব্যক্তি হিসাবেই এই যুদ্ধে যোগদান করেন, এমনকি তালূতও তাঁহার সম্পর্কে অবহিত ছিলেন না। কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে বীরত্ব প্রদর্শনের মাধ্যমেই তিনি পরিচিত হইয়া উঠেন (তাফহীমুল কুরআন, ২৪ ২৫১ আয়াতের ২৭৩ নং টীকা)। পূর্বোক্ত বর্ণনার সহিতও বাইবেলের বর্ণনার মিল পরিলক্ষিত হয় (তু. ১ম শমূয়েল, ১৬৪ ১-২৩; ১৭৪১-৫৪)।
এই যুদ্ধের বর্ণনার সমাপ্তি পর্যায়ে কুরআন মজীদ একটি ঐতিহাসিক বাস্তবতাকে তুলিয়া ধরিয়াছে। বলা হইয়াছে: "আল্লাহ যদি এইভাবে মানুষের এক দলকে অপর দল দ্বারা দমন না করিতেন তবে পৃথিবী বিপর্যস্ত হইয়া যাইত, কিন্তু আল্লাহ জগতবাসীর প্রতি বড়ই অনুগ্রহশীল" (২৪ ২৫১)। অর্থাৎ মানব সমাজের নিয়ম-শৃঙ্খলা অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য আল্লাহ তা'আলা এই স্থায়ী নিয়ম করিয়া দিয়াছেন যে, তিনি বিভিন্ন মানব দলকে একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত আধিপত্য ও শক্তি-সামর্থ্য লাভের সুযোগ দান করেন। কিন্তু কোন দল যখন সেই সীমা লংঘন করিতে থাকে তখন অপর এক মানবদল দ্বারা উহার শক্তি চূর্ণ করিয়া দেন। অতএব জালুত তাহার সীমা লংঘনের কারণে সদলে, তালুত বাহিনী দ্বারা ধ্বংস হইয়াছে। একইভাবে মক্কার মুশরিকরা মহানবী (স) ও মুসলমান-গণকে অন্যায়ভাবে তাহাদের আবাসভূমি হইতে উচ্ছেদ করিলে আল্লাহ তা'আলা নির্যাতিত মুসলমানদেরকে তাহাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের অনুমতি দান করিয়া একই ঐতিহাসিক সত্য তুলিয়া ধরেনঃ وَلَوْلا دَفْعُ اللَّهِ النَّاسَ بَعْضَهُمْ بِبَعْضٍ لَهُدِّمَتْ صَوَامِعُ وَبِيَعٌ وَصَلَوَاتٌ وَمَسْجِدٌ .
"আল্লাহ যদি মানবজাতির একদল দ্বারা অন্য দলকে প্রতিহত না করিতেন, তাহা হইলে বিধ্বস্ত করিয়া দেওয়া হইত খৃস্টান সংসার বিরাগীদের উপাসনা স্থান, গির্জা, উপাসনালয় ও মসজিদসমূহ" (২২৪৪০)।
অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা কায়েম না থাকিলে সবলেরা দুর্বলদেরকে গ্রাস করিয়া ফেলিত।
যুদ্ধ-পরবর্তী যেসব ঘটনাপ্রবাহের বর্ণনা, বিশেষত ছা'লাবীর কাসাসুল আম্বিয়ায়, বিধৃত হইয়াছে, সেই সম্পর্কে কুরআন ও হাদীছে কোন বর্ণনা বা ইঙ্গিত পাওয়া যায় না। এইসব বিবরণ সম্পূর্ণরূপে বাইবেল হইতে লওয়া হইয়াছে। কারণ যুদ্ধ-পরবর্তী তালূত-দাউদ 'সম্পর্কের উত্থান-পতন ও অবনতির যে বিবরণ কাসাস গ্রন্থাবলীতে সন্নিবিষ্ট হইয়াছে তাহা বাইবেলের বিবরণের অনুরূপ। দাউদের নিকট তালূতের কন্যার বিবাহ, দাউদকে তালুতের রাজ্যের অর্ধেক দান; দাউদের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তায় তালুতের ঈর্ষান্বিত হওয়া এবং ইহার পরিণতিতে দাউদকে হত্যার ষড়যন্ত্র, তাহাতে অকৃতকার্য হওয়া, দাউদের নিকট তালূতের ক্ষমা প্রার্থনা ইত্যাকার সকল ঘটনার বিষরণ বাইবেল ভিত্তিক (দ্র. ১ম শমূয়েল, অধ্যায় ১৮-২৮)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 নবুওয়াত ও রিসালাত লাভ

📄 নবুওয়াত ও রিসালাত লাভ


নবী-রাসূলগুণের জীবনেতিহাস পাঠ করিলে জানা যায় যে, তাঁহারা ছোটবেলা হইতেই এক বিশেষ স্বভাবের অধিকারীরূপে বর্দ্ধিত হইতে থাকেন। তাহাদেরকে কেন্দ্র করিয়া নানারূপ অলৌকিক ঘটনা ঘটিতে থাকে। হযরত দাউদ (আ)-এর শৈশব জীবনেও এইরূপ অলৌকিক ঘটনার বিবরণ পাওয়া যায়। একদা তিনি তাঁহার পিতার নিকট উপস্থিত হইয়া বলেন, হে পিতা! আমি অদ্য রজনীতে স্বপ্নে দেখিলাম যে, আমি, বাঘের পৃষ্ঠে চড়িয়া যাইতেছি। ইহা একটি অনুগত পশুর ন্যায় আমাকে লইয়া অগ্রসর হইতে থাকে। আমার মনেই হইল না যে, আমি বাঘের পিঠে আরোহী। আমি উহাকে আমার যে দিকে ইচ্ছা হাঁকাইতে থাকিলাম। তাঁহার পিতা স্বপ্নের বর্ণনা শুনিয়া বলিলেন, আল্লাহ তা'আলা শত্রুদের পক্ষের কোন বীর যোদ্ধাকে তোমার করায়ত্ত করিবেন (আল-আরাইস, পৃ. ২৯১; আল-কামিল, ১খ, পৃ. ১৬৬)। তিনি আরো একটি ঘটনা বিবৃত করিয়া বলিলেন, হে পিতা! অদ্য আমি একটি পাহাড়ের মধ্য দিয়া গমনকালে অস্পষ্ট আওয়াজে আল্লাহর যিকির করিতেছিলাম। হঠাৎ আমার কানে একটি লঘু আওয়াজ ভাসিয়া আসিল। আমি লক্ষ্য করিলাম যে, উক্ত এলাকার পাহাড়সমূহ আমার সহিত তাসবীহ পাঠ করিতেছে। তাঁহার পিতা বলিলেন, আল্লাহ তা'আলা তোমার মর্যাদা বাড়াইয়া দিবৈন (আল-কামিল, ১খ, পৃ. ১৬৬; আরাইস, পৃ. ২৯১)।
যুদ্ধে যোগদানের জন্য হযরত দাউদ (আ) শামুঈল (আ)-এর নিকট উপস্থিত হইলে তিনি তাঁহার জীবনের আশ্চর্যজনক ঘটনা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন। তিনি বলেন, হে আল্লাহর নবী। একদা আমি পথ অতিক্রম করিতেছিলাম। একটি প্রস্তর আমাকে বলিল, হে দাউদ! আমি এককালে কিছুক্ষণ হযরত মূসা (আ)-এর ভ্রাতা হারুন (আ)-এর হাতে ছিলাম। তিনি আমাকে তাঁহার শত্রুর মস্তকে নিক্ষেপ করিয়া তাহাকে বধ করিয়াছিলেন। আপনি আমাকে তুলিয়া আপনার সঙ্গে রাখিয়া দিন, হয়ত আপনারও কোন কাজ সিদ্ধ হইতে পারে। আমি উহাকে তুলিয়া আমার থলির মধ্যে রাখিয়া দেই। অনুরূপভাবে আর একদিন পথ অতিক্রমকালে একটি পাথর আমাকে বলিল, হে দাউদ! আমি এক সময় হযরত মূসা (আ)-এর হাতে ছিলাম। আমি তাঁহার দ্বারা নিক্ষিপ্ত হইয়া তাহার এক চরম শত্রুকে ধ্বংস করিয়াছি। হয়ত আমি আপনারও কোনও কাজে লাগিতে পারি। অতএব আমি পাথরটিকে তুলিয়া লইলাম। আর এক দিন এক খণ্ড পাথর আমাকে ডাকিয়া বলিল, হে দাউদ! তোমাকে এক সময় স্বৈরাচারী জালুতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিতে হইবে। তুমি আমাকে তুলিয়া রাখিয়া দাও। আমার তীব্র আঘাতে সে-ধ্বংসপ্রাপ্ত হইবে। তখন আমি উক্ত পাথরটিও তুলিয়া লইলাম। অতঃপর এই তিন টুকরা পাথর আল্লাহ্‌ কুদরতে একটি পাথরে পরিণত হইয়াছে (তাহযীব তা'রীখ দিমাল্ক, ৫খ, পৃ. ১৯১; বিদায়া, ২খ, পৃ. ৯; আল-কামিল, ১খ, পৃ. ১৬৬; আরাইস, পৃ. ২৯২)। আল্লাহ তা'আলা শামুঈল (আ)-কে জানাইয়া দেন যে, দাউদ (আ) তাঁহার পরে নবী হইবেন (আরাইস, পৃ. ২৯১)। মূসা (আ)-এর মত দাউদ (আ)-ও মেষপাল চরাইয়াছিলেন (প্রত্যেক নবীই মেষ চরাইয়াছেন, এই সংক্রান্ত হাদীছের জন্য দ্র. বুখারী, বিতাবুল ইজারা, বাব ২, নং ২১০২; তু. আম্বিয়া, বাব ২৯, নং ৩১৫৫; মুওয়াত্তা, কিতাবুল জামে, বাব মা জাআ ফী আমরিক গানাম)।
ইয়াহুদী-খৃস্টান সম্প্রদায় হযরত দাউদ (আ)-কে প্রত্যক্ষভাবে মর্যাদা না দিলেও বাইবেলের বর্ণনা হইতে তাঁহার নবুওয়াত প্রমাণিত হয়। বাইবেল বলেঃ "তৎপর দাউদ সদাপ্রভুর কাছে জিজ্ঞাসা করিলেন, আমি কি যিহূদার কোন এক নগরে উঠিয়া যাইব? সভাপ্রভু কহিলেন, যাও। পরে দাউদ জিজ্ঞাসা করিলেন, কোথায় যাইব? তিনি কহিলেন, হেব্রোনে" (২য় শমূয়েল, ২ঃ ১)। এইরূপ আরো উদ্ধৃতি শমূয়েল, গীতসংহিতা ও হিতোপদেশ গ্রন্থে বিদ্যমান আছে।
কুরআন মজীদে তাঁহার নবুওয়াত প্রাপ্তি সম্পর্কে সুস্পষ্ট বক্তব্য বিদ্যমান। "আমি তোমার নিকট ওহী প্রেরণ করিয়াছি, যেমন নূহ ও তাহার পরবর্তী নবীগণের নিকট ওহী প্রেরণ করিয়াছিলাম.... এবং দাউদকে যাবুর দান করিয়াছি" (৪ : ১৬৩; আরও দ্র. ২নং অনুচ্ছেদে উল্লিখিত আয়াতসমূহ)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 যাবুর কিতাবের বিবরণ

📄 যাবুর কিতাবের বিবরণ


নবুওয়াতের নিদর্শনস্বরূপ হযরত দাউদ (আ)-কে প্রধান চারখানি আসমানী কিতাবের অন্তর্ভুক্ত যাবুর কিতাব দান করা হয়। হযরত জাবির (রা) হইতে বর্ণিত এক হাদীছে আছে, রমযান মাসের, ১২ তারিখ যাবুর কিতাব অবতীর্ণ হয়।
ওয়াছিলা ইবনুল আসকা (রা) হইতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, ইবরাহীম (আ)-এর সহীফাসমূহ রমযানের ১ম রাত্রিতে, তাওরাত ৬ষ্ঠ রাত্রিতে, ইন্জীল ১৩শ রাত্রিতে এবং কুরআন ২৪তম রাত্রিতে অবতীর্ণ হয় (ইব্‌ন ক্লাছীর, তাফসীর, ১খ, পৃ. ২১৬)।
যাবূর-এর শাব্দিক অর্থ পারা, খণ্ড, লিখিত কিতাব, পারিভাষিক অর্থে হযরত দাউদ (আ)-এর উপর নাযিলকৃত কিতাব। অভিধান গ্রন্থাবলীতে কেহ কেহ ইহাকে হিব্রু শব্দ বলিয়া দাবি করিলেও ইহা আরবী ভাষার একটি আদি শব্দ। কারণ হিব্রু ভাষায় 'যাবূর' নামে কোন শব্দ নাই। কুরআন মজীদে দাউদ (আ)-এর যাবূরসহ আসমানী কিতাব (সহীফা) বুঝাইতে শব্দটি (এক ও বহু বচনে) ব্যবহৃত হইয়াছে (দ্র. ৩ : ১৮৪; ৪ : ১৬৩; ১৬ : ৪৪; ১৭ : ৫৫; ২১ : ১০৫; ২৬ : ১৯6; ৩৫ : ২৫, ৫৪ : ৪৩); অবশ্য কয়েক স্থানে ভিন্নার্থেও ব্যবহৃত হইয়াছে (দ্র. ১৮ : ৯৬; ২৩ : ৫৩ : ৫৪ : ৫২)।
ইমাম রাগিব (র) বলেন, কেহ কেহ বলিয়াছেন যে, শরীআতের বিধানশূন্য বুদ্ধিবৃত্তিক তত্ত্বজ্ঞান সম্বলিত কিতাবকে যাবুর বলা হয়। দাউদ (আ)-এর কিতাবে কোন শরীআতী বিধান ছিল না বিধায় ইহাকে যাবুর বলা হইয়াছে (রাগিব, মুফরাদাত, শিরো. ز-ب-ر(।
কুরআন মজীদে আল্লাহ তা'আলা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় তাওরাত ও ইনজীলের মত যাবুরকেও তাঁহার পক্ষ হইতে নাযিলকৃত কিতাব বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। "আমি দাউদকে যাবুর দান করিয়াছি" (৪: ১৬৩; ১৭:৫৫)। কুরআন মজীদে যাবুর কিতাবের একটি বাণী উদ্ধৃত হইয়াছে:
وَلَقَدْ كَتَبْنَا فِي الزَّبُورِ مِنْ بَعْدِ الذِّكْرِ أَنَّ الْأَرْضَ يَرِثُهَا عِبَادِيَ الصَّلِحُونَ .
"আমি যাবুর কিতাবে লিখিয়া দিয়াছি যে, আমার সৎকর্মপরায়ণ বান্দাগণ পৃথিবীর উত্তরাধিকারী হইবে" (২১: ১০৫)।
ইব্‌ন আব্বাস (রা), শা'বী, কাতাদা (র) প্রমুখের মতে অত্র আয়াতে 'যাবূর' দ্বারা হযরত দাউদ (আ)-এর উপর নাযিলকৃত যাবুর কিতাব বুঝানো হইয়াছে (তাফসীর ইব্‌ন কাছীর, ২খ., পৃ. ৫২৪, সংশ্লিষ্ট আয়াতাধীন; শায়খুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদুল হাসান, মুফতী শফী, আবুল আলা মাওদূদী, সায়্যিদ কুত্ব শাহীদ প্রমুখও 'যাবুর'-এর অনুরূপ অর্থ বর্ণনা করিয়াছেন)। বর্তমান বাইবেলেও অনুরূপ উক্তি বিদ্যমান আছে: "ধার্মিকেরা দেশের অধিকারী হইবে, তাহারা নিয়ত তথায় বাস করিবে” (মাহমূদুল হাসান, তরজমা, পৃ. ৪৪১, টীকা ১; তাফহীমুল কুরআন, উক্ত আয়াতের ৯৯ নং টীকা; আরও তু. বাইবেলের গীতসংহিতা, ৩৭: ২৯)।
বনূ ইসরাঈলের হিদায়াতের জন্য হযরত মূসা (আ)-এর উপর নাযিলকৃত তাওরাতই ছিল মূল কিতাব। যাবুর কিতাবের শিক্ষাও তাওরাতের উপর ভিত্তিশীল ছিল। এই কিতাবের আলোকে হযরত দাউদ (আ) মূসা (আ)-এর শরী'আতকে উজ্জীবিত করেন, ইসরাঈলীদেরকে পথভ্রষ্টতা হইতে মুক্ত করিয়া হিদায়াতের রাস্তায় তুলিয়া আনেন। এই কিতাবের বিষয়বস্তু ছিল আল্লাহর প্রশংসা ও তাঁহার পবিত্রতা ঘোষণা। ইবাদত-বন্দেগীতে বিনয় ও নম্রতা অবলম্বন, উপদেশসমূহ, সুসংবাদ ও দো'আ-কালাম। বাইবেলে "গীত সংহিতা" ও "হিতোপদেশ” শিরোনামে ইহা অন্তর্ভুক্ত আছে। ইহা যে ভাষায় (প্রাচীন হিব্রু) নাযিল হইয়াছিল সে ভাষা যেমন বহু কাল পূর্বে বিলুপ্ত হইয়াছে, অদ্রূপ উহারও অনেক পূর্বে ঐ ভাষায় নাযিলকৃত আদি ও আসল গ্রন্থখানিও বিলুপ্ত হইয়া গিয়াছে।
মূল যাবুর পৃথিবীর কোথায়ও বিদ্যমান নাই। বর্তমান শতকে ইনজীলের প্রাচীন হিব্রু পাণ্ডুলিপি প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানকালে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন এলাকায় পাওয়া গেলেও আজ পর্যন্ত তাওরাতের অন্তর্ভুক্ত কোন কিতাবের পাণ্ডুলিপি খুঁজিয়া পাওয়া যায় নাই। অতএব আল-কুরআন ব্যতীত অন্য কোন আসমানী কিতাব অবিকৃত অবস্থায় থাকার দাবি অবান্তর। বাইবেলের অন্তর্গত বর্তমান যাবুর পাঠ করিলেই বুঝা যায় যে, আল্লাহর বাণীর সহিত মানুষের মনগড়া কথার সংমিশ্রণ ঘটিয়াছে। বর্তমান যাবুর পাঁচখানি দীওয়ানের সমষ্টি। উহার মধ্যে হযরত দাউদ (আ) ব্যতীত অপরাপর হিব্রু কবিগণের কবিতাও অন্তর্ভুক্ত রহিয়াছে। এইভাবে ইলহামভুক্ত ও ইলহাম বহির্ভূত কালাম মিশ্রিত করা হইয়াছে (ই. বি., ২২খ., পৃ. ৫০৯; কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৩১১)। কুরআন মজীদেও এই বিকৃতির কথা উল্লিখিত হইয়াছে। মহান আল্লাহ ইয়াহুদীদেরকে লক্ষ্য করিয়া বলেন:
مِنَ الَّذِينَ هَادُوا يُحَرِّفُونَ الكَلِمَ عَنْ مُواضِعه .
"ইয়াহুদীদের মধ্যে কতক লোক কথাগুলি স্থানচ্যুত করিয়া বিকৃত করে” (৪৪ ৪৬; আরও দ্র. ৫:১৩, ৪১)।
অতএব ইহাদের নাপাক হস্তক্ষেপ হইতে যাবুর কিতাবও রক্ষা পায় নাই। ইহার পরও এই কিতাবে ইলহামভুক্ত যেসব বাণী অক্ষত রহিয়াছে তাহা যে কোন আল্লাহভীরু মানুষের মনকে উদ্বেলিত করে। যেমন, "ধন্য সেই ব্যক্তি, যে দুষ্টদের মন্ত্রণায় চলে না, পাপীদের পথে দাঁড়ায় না, নিন্দুকদের সভায় বসে না, কিন্তু সদাপ্রভুর ব্যবস্থায় আমোদ করে, তাঁহার ব্যবস্থা দিবারাত্র ধ্যান করে” (গীতসংিহতা, ১৪১-২)।
“হে সদাপ্রভু! আমাকে কৃপা কর, কেননা আমি ম্লান হইয়াছি; হে সদাপ্রভু! আমাকে সুস্থ কর, কেননা আমার অস্থিসকল বিহবল হইয়াছে” (গীত সংহিতা, ৬৪ ২)। এরূপ আবেগময়ী আরো বহু মুনাজাত এই কিতাবে বিধৃত হইয়াছে।
মূল যাবূর যে আল্লাহ্ কিতাব এই বিশ্বাস পোষণ করা মুসলমানদের ঈমানের অঙ্গ। কেননা আল্লাহ তা'আলা তাহাদেরকে পূর্ববর্তী আসমানী কিবতাসমূহে ঈমান আনার নির্দেশ দিয়াছেন (তু. ২: ১৩৬; ২৮৫; ৩ ৪৮৪; ৪: ১৩৬ ইত্যাদি)। তদ্রূপ হযরত দাউদ (আ)-কেও আল্লাহর নবীরূপে স্বীকার করা এবং তাঁহার প্রতি ঈমান আনাও বাধ্যতামূলক। কারণ আল্লাহ তা'আলা সমস্ত নবী-রাসূলের উপর ঈমান আনারও নির্দেশ দিয়াছেন (উপরন্তু তু. ২৪১৭৭; ২৮৫; ৪:৪১৫০-৫২)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 দাউদ (আ)-এর দাওয়াতী কার্যক্রম

📄 দাউদ (আ)-এর দাওয়াতী কার্যক্রম


নবী-রাসূলগণের মিশনের মূল উদ্দেশ্যই হইল আল্লাহর দীনের দাওয়াত মানবজাতির নিকট পৌঁছাইয়া দেওয়া। তাহাদিগকে কিতাব ও প্রজ্ঞা দান করা হয় মানবজাতিকে সংশোধন ও পরিচ্ছন্ন করার জন্য, আল্লাহর বিধান তাহাদেরকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য এবং তাহাদেরকে সত্য-ন্যায়ের পথে পরিচালনার জন্য। মহান আল্লাহ বলেন:
وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَسُولاً أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ.
"আল্লাহ্ ইবাদত করিবার ও তাগূতকে বর্জন করিবার নির্দেশ দিবার জন্য আমি প্রতিটি জাতির 'মধ্যেই রাসূল পাঠাইয়াছি” (১৬: ৩৬)।
وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ مِنْ رَسُولِ إِلا نُوحِي إِلَيْهِ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلا أَنَا فَاعْبُدُونِ . "আমি তোমার পূর্বে যে রাসূলই প্রেরণ করিয়াছি তাহার প্রতি এই ওহীও প্রেরণ করিয়াছি যে, আমি ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ নাই। অতএব তোমরা আমারই ইবাদত কর” (২১:২৫)।
وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ رَسُولُ إِلَّا بِلِسَانِ قَوْمِهِ لِيُبَيِّنَ لَهُمْ.
"আমি প্রত্যেক রাসুলকেই তাহার স্বজাতির ভাষাভাষী করিয়া পাঠাইয়াছি, তাহাদের নিকট পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করিবার জন্য" (১৪:৪)।
নবীগণের মিশন সম্পর্কে জানার জন্য আরও দ্র. ৫:৭২, ১১৭; ৭:৫৯, ৬৫, ৭৩, ৮৫; ১১: ৫০, ৬১, ৮৪ ইত্যাদি)।
অতএব হযরত দাউদ (আ) একজন নবী হিসাবে তাঁহার মিশনই ছিল আল্লাহ্ দীনের দাওয়াত প্রচার। তাঁহার দাওয়াতী কার্যক্রমের বিস্তারিত বিবরণ জানা না গেলেও একথা বলা যায় যে, তিনি মানবজাতিকে, বিশেষত বনূ ইসরাঈলকে মূর্তিপূজার পঙ্কিলতা হইতে মুক্ত করিয়া এক আল্লাহ্ আনুগত্যে আনয়ন করিতে সদা তৎপর ছিলেন। ফোরাত হইতে নীল পর্যন্ত বিরাট ভূভাগ দখল করিয়া তিনি এইসব এলাকার মানুষের মধ্যে আল্লাহর দীনের ব্যাপক প্রচার করেন। (Encyclopedia Americana, vol.: viii, p. 527)। তাঁহার পুত্র নবী সুলায়মান (আ) সাবার সম্রাজ্ঞীকে যে পত্র প্রেরণ করেন তাহার সূচনাই ছিল আল্লাহর নামে : “দয়াময় পরম দয়ালু আল্লাহর নামে” (২৭:৩০)। “সেই নারী (সম্রাজ্ঞী) বলিল, হে আমার প্রতিপালক। আমি তো নিজের প্রতি জুলুম করিয়াছি, আমি সুলায়মানের সহিত বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করিতেছি” (২৭:৪৪)। এই আয়াতদ্বয় প্রমাণ করে যে, দাউদ ও সুলায়মান (আ)-এর মূল লক্ষ্য রাজ্যজয় ছিল না, ছিল আল্লাহ্র দীনের প্রচার ও প্রসার। তাঁহারা রাষ্ট্রীয় শক্তি ও প্রশাসন যন্ত্রকে পূর্ণরূপে এই উদ্দেশ্যে ব্যবহার করিয়াছেন। আর মুমিনগণকে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব দান করা হইলে তাহারা এই কর্তৃত্বকে দাওয়াতী কার্যক্রম প্রসারের জন্য নিয়োজিত করেন।
الَّذِينَ إِنْ مَكَّنُهُمْ فِي الْأَرْضِ أَقَامُوا الصَّلوةَ وَأتُوا الزكوة وآمَرُوا بِالْمَعْرُوفِ وَنَهِوَ عَنِ الْمُنْكَرِ.
"আমি তাহাদেরকে (ঈমানদারগণকে) পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা দান করিলে তাহারা সালাত কায়েম করে, যাকাত দেয়, সৎকাজের নির্দেশ দেয় এবং অসৎ কার্যে নিষেধ করে” (২২:৪১)। হযরত দাউদ (আ)-ও তাহাই করিয়াছিলেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00