📄 স্বৈরাচারী জালুতের বিরুদ্ধে দাউদ (আ)-এর জিহাদ
আল্লাহর নবী হযরত শামূঈল (আ)-এর খৃ. পৃ. ১১০০-১০২০ অব্দে) নির্দেশে তৎকালনী শাসক তালূত (শাসনকাল খৃ. পৃ. ১০২৮-১০১২ সাল) কর্তৃক অত্যাচারী শাসক জালুতের বিরুদ্ধে একটি যুদ্ধাভিযান প্রেরিত হয়, যাহা ইতিহাসে তালূত-জালূতের যুদ্ধ নামে খ্যাত। মুসলিম ঐতিহাসিকগণের বর্ণনায় এই যুদ্ধের যে বিবরণ পাওয়া যায় উহার বেশিরভাগই ইসরাঈলী রিওয়ায়াত ভিত্তিক। শুধু তাহাই নহে, কুরআন ও সুন্নাহ্র বাহিরে হযরত দাউদ (আ) সম্পর্কিত প্রায় সমস্ত বিবরণের উৎস উহাই।
হযরত দাউদ (আ) ছিলেন সুঠাম দেহের অধিকারী একজন বলিষ্ঠ যুবক। তিনি তখনও নবুওয়াত প্রাপ্ত হন নাই। তিনি এই যুদ্ধে জালুতকে হত্যা করিয়া প্রসিদ্ধি লাভ করেন এবং জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। আনু. ১০২৮-১০১২ খৃ. পূ. অব্দের মধ্যে এই যুদ্ধ সংঘটিত হইয়া থাকিবে। কুরআন মজীদে এক স্থানেই এই যুদ্ধ 'সম্পর্কে একটি নাতিদীর্ঘ বর্ণনা রহিয়াছে। মহান আল্লাহ বলেনঃ
أَلَمْ تَرَ إِلَى الْمَلَا مِنْ بَنِي إِسْرَائِيلَ مِنْ بَعْدِ مُوسَى إِذْ قَالُوا لِنَبِيٍّ لَهُمُ ابْعَثْ لَنَا مَلِكًا نُقَاتِلُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ قَالَ هَلْ عَسَيْتُمْ إِنْ كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِتَالُ إِلا تُقَاتِلُوا قَالُوا وَمَا لَنَا أَلا نُقَاتِلَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَقَدْ أُخْرِجْنَا مِنْ دِيَارِنَا وَأَبْنَائِنَا فَلَمَّا كُتِبَ عَلَيْهِمُ الْقِتَالُ تُوَلَّوْا إِلَّا قَلِيلاً مِنْهُمْ وَاللهُ أَلِيمٌ بِالظَّلِمِينَ، وَقَالَ لَهُمْ نَبِيُّهُمْ إِنَّ اللَّهَ قَدْ بَعَثَ لَكُمْ طَالُوْتَ مَلَكًا قَالُوا أَنِّى يَكُونُ لَهُ الْمُلْكُ عَلَيْنَا وَنَحْنُ أَحَقُّ بِالْمُلِكَ مِنْهُ وَلَمْ يُؤْتَ سَعَةً مِنَ الْمَالِ قَالَ إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَهُ عَلَيْكُمْ وَزَادَهُ بَسْطَةً فِي الْعِلْمِ وَالْجِسْمِ وَاللَّهُ يُؤْتِي مُلْكَهُ مَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ. وَقَالَ لَهُمْ نَبِيُّهُمْ إِنَّ أَيَةَ مُلْكِهِ أَنْ يَأْتِيَكُمُ التَّابُوتُ فِيهِ سَكِينَةٌ مِّنْ رَّبِّكُمْ وَبَقِيَّةً مِّمَّا تَرَكَ الُ مُوسَى وَالُ هُرُونَ تَحْمِلُهُ الْمَلَئِكَةُ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَةً لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ . فَلَمَّا فَصَلَ طَالُوتُ بِالْجُنُودِ قَالَ إِنَّ اللَّهَ مُبْتَلِيْكُمْ بِنَهَرٍ فَمَنْ شَرِبَ مِنْهُ فَلَيْسَ مِنِّى وَمَنْ لَمْ يَطْعَمْهُ فَإِنَّهُ مِنِّى إِلا مَنِ اعْتَرَفَ غُرْفَةً بِيَدِهِ فَشَرِبُوا مِنْهُ إِلَّا قَليلاً مِّنْهُمْ فَلَمَّا جَاوَزَهُ هُوَ وَالَّذِينَ آمَنُوا مَعَهُ قَالُوا لاَ طَاقَةَ لَنَا الْيَوْمَ بِجَالُوْتَ وَجُنُودِهِ قَالَ الَّذِينَ يَظُنُّونَ أَنَّهُمْ مُلْقُوا الله كَمْ مِنْ فِئَةٍ قَلِيلَةٍ غَلَبَتْ فِئَةً كَثِيرَةٌ بِاذْنِ اللهِ وَاللهُ مَعَ الصَّبِرِينَ ، وَلَمَّا بَرَزُوا لِجَالُوْنَ وَجُنُودِهِ قَالُوا رَبَّنَا أَفْرِغْ عَلَيْنَا صَبْرًا وَثَبِّتْ أَقْدَامَنَا وَانْصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الكُفِرِينَ ، فَهَزَمُوهُمْ بِإِذْنِ اللَّهِ وَقَتَلَ دَاوُدُ جَالُوْتَ وَأَنَّهُ اللهُ المُلكَ وَالحِكْمَةَ وَعَلَمَهُ مِمَّا يَشَاءُ وَلَوْ لا دَفْعُ اللَّهِ النَّاسَ بَعْضَهُمْ بِبَعْضٍ لَفَسَدَتِ الْأَرْضُ وَلَكَنَّ اللَّهَ ذُو فَضْلٍ عَلَى الْعُلَمِينَ تِلْكَ أيتُ اللهِ تَتْلُوهَا عَلَيْكَ الْحَقَّ وَإِنَّكَ لَمِنَ الْمُرْسَلِينَ .
"তুমি কি মূসার পরবর্তী বনী ইসরাঈল প্রধানদেরকে দেখ নাই? তাহারা যখন তাহাদের নবীকে বলিয়াছিল, আমাদের জন্য একজন রাজা নিযুক্ত করুন যাহাতে আমরা আল্লাহ্র পথে যুদ্ধ করিতে পারি। সে বলিল, ইহা তো হইবে না যে, তোমাদের প্রতি যুদ্ধের বিধান দেওয়া হইলে তখন তোমরা আর যুদ্ধ করিবে না? তাহারা বলিল, আমরা যখন নিজস্ব আবাসভূমি ও স্বীয় সন্তান-সন্তুতি হইতে উচ্ছেদ হইয়াছি, তখন আল্লাহ্র পথে কেন যুদ্ধ করিব না! অতঃপর যখন তাহাদের উপর যুদ্ধের বিধান দেওয়া হইল, তখন তাহাদের স্বল্প সংখ্যক ব্যতীত সকলেই পৃষ্ঠ প্রদর্শন করিল। আল্লাহ যালিমদের সম্পর্কে সবিশেষ অবহিত। তাহাদের নবী তাহাদিগকে বলিয়াছিল, আল্লাহ অবশ্যই তালুতকে তোমাদের রাজা করিয়াছেন। তাহারা বলিল, আমাদের উপর তাহার রাজত্ব রিকভাবে হইবে, যখন আমরা তাহার তুলনায় রাজত্বের অধিক যোগ্য এবং তাহাকে প্রচুর ঐশ্বর্যও দেওয়া হয় নাই! নবী বলিল, আল্লাহ অবশ্যই তাহাকে তোমাদের জন্য মনোনীত করিয়াছেন এবং তিনি তাহাকে জ্ঞানে ও দেহে সমৃদ্ধ করিয়াছেন। আল্লাহ যাহাকে ইচ্ছা স্বীয় রাজত্ব দান করেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময়, প্রজ্ঞাময়। তাহাদের নবনী তাহাদেরকে আরও বলিয়াছিল, তাহার রাজত্বের নিদর্শন এই যে, তোমাদের নিকট সেই তাবূত, আসিবে যাহাতে (তোমাদের জন্য) তোমাদের প্রতিপালকের নিকট হইতে চিত্তপ্রশান্তি এবং মূসা ও হারুন বংশীয়গণ যাহা ত্যাগ করিয়া রাখিয়া গিয়াছে তাহার অবশিষ্টাংশ থাকিবে, ফেরেশতাগণ ইহা বহন করিয়া আনিকে। তোমরা যদি মুমিন হও তবে অবশ্যই ইহাতে তোমাদের জন্য নিদর্শন আছে। অতঃপর তালুত সৈন্যবাহিনীসহ বাহির হইল। সে তখন বলিল, আল্লাহ এক নদী দ্বারা তোমাদের পরীক্ষা করিবেন। যে কেহ উহা হইতে পান করিবে সে আমার দলভুক্ত নহে, আর যে কেহ উহার স্বাদ গ্রহণ করিবে না সে আমার দলভুক্ত, ইহা ছাড়া যে কেহ তাহার হস্তে এক কোষ পানি গ্রহণ করিবে সেও। অতঃপর অল্প সংখ্যক ব্যতীত তাহারা উহা হইতে পান করিল। সে এবং তাহার সঙ্গী ঈমানদারগণ উহা অতিক্রম করিবার পর বলিল, জালূত ও তাহার সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার মত শক্তি আজ আমাদের নাই। কিন্তু যাহারা বিশ্বাস করিত যে, আল্লাহ্র সহিত তাহাদের সাক্ষাত ঘটিবে তাহারা বলিল, আল্লাহর হুকুমে কত ক্ষুদ্র দল-কৃত বৃহৎ দলকে পরাভূত করিয়াছে! আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সহিত রহিয়াছেন। তাহারা যুদ্ধার্থে জালুত ও তাহার বাহিনীর সম্মুখীন হইয়া বলিল, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে ধৈর্য দান কর, আমাদের পা অবিচলিত রাখ এবং কাফের সম্প্রায়ের বিরুদ্ধে আমাদেরকে সাহায্য দান কর। সুতরাং তাহারা আল্লাহর হুকুমে ইহাদেরকে পরাভূত করিল, দাউদ জালুতকে হত্যা করিল, আল্লাহ তাহাকে রাজত্ব ও প্রজ্ঞা দান করিলেন এবং যাহা তিনি ইচ্ছা করিলেন তাহা তাহাকে শিক্ষা দিলেন। আল্লাহ যদি মানবজাতির এক দলকে অন্য দল দ্বারা প্রতিহত না করিতেন তবে পৃথিবী বিপর্যস্ত হইয়া যাইত। কিন্তু আল্লাহ জগতসমূহের প্রতি অনুগ্রহশীল। এই সকল আল্লাহ্ আয়াত, আমি তোমাদের নিকট তাহা যথাযথভাবে তিলাওয়াত করিতেছি। নিশ্চয় তুমি রাসূলগণের অন্তর্ভুক্ত” (২: ২৪৬-২৫২)।
কুরআন মজীদের বর্ণনা হইতে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, তালূত ও জালূতের মধ্যকার যুদ্ধ হযরত মূসা (আ)-এর পরবর্তী সময়কার ঘটনা। ইসরাঈলী ইতিহাসের বর্ণনামতে তিনি খৃ. পৃ. ১২৭২ সালে ইনতিকাল করেন (তাফহীমুল কুরআন, সূরা আ'রাফ, ১০৪ নং আয়াতের ৮৫ নং টীকা)। আর তালূতের রাজত্বকাল ছিল খৃ. পৃ. ১০২৮-১০১২ সাল (তাফসীরে মাজেদী, সূরা বাকারা, ২৪৭ নং আয়াতের ৯৩৬ নং টীকা)। অন্যদিকে হযরত ঈসা (আ)-এর জন্মের এক হাজার বৎসরের অধিক কাল পূর্বে এই যুদ্ধ সংঘটিত হয় (তাফহীমুল কুরআন, সূরা বাকারা, ২৪৬ নং আয়াতের ২৬৮ নং টীকা)। অতএব আমাদের কাল হইতে প্রায় তিন হাজার বৎসর পূর্বের এই ঘটনা। আমাদের যুগ হইতে দাউদ (আ)-এর যুগ তিন হাজার বৎসর পূর্বে এবং মূসা (আ)-এর যুগ বত্রিশ-তেত্রিশ শত বৎসর পূর্বে। ইবন ইসহাকের মতে মূসা (আ) ও দাউদ (আ)-এর মধ্যে ৫৬৯ বৎসরের ব্যবধান (মুসতাদরাক হাকেম, ২খ, পৃ. ৫৮৬)।
তালূতের রাজত্বকালে নবী ছিলেন হযরত শামুঈল (আ) এবং তিনিই আল্লাহ্র নির্দেশে তালূতকে বানী ইসরাঈলের শাসক নিয়োগ করেন। তাঁহার সময়কাল ছিল খৃ. পৃ. ১১০০-১০২০ সাল (তাফসীরে মাজেদী, সূরা বাকারার ২৪৬ নং আয়াতের ৯৩০ নং টীকা)। অবশ্য কুরআন মজীদে এবং মহানবী (স)-এর হাদীছে তালূত প্রসঙ্গে একজন নবীর উল্লেখ আছে কিন্তু তাঁহার নাম বলা হয় নাই। বাইবেলে তিনি নবী হিসাবে স্বীকৃত এবং উহাতে তাঁহার নামে দুইটি গ্রন্থও অন্তর্ভুক্ত আছে (শমূয়েল-১ ও শমূয়েল-২)। তাঁহার নির্দেশক্রমেই তালূত স্বৈরাচারী জালূতের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। বস্তুত বনী ইসরাঈলের ধর্মীয় বিষয়াদির সহিত তাহাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের চালিকাশক্তিও ছিলেন তাহাদের নবীগণ। এই প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (স) বলেন:
كَانَتْ بَنُو إِسْرَائِيلَ تَسُوسُهُمُ الْأَنْبِيَاءُ كُلَّمَا هَلَكَ نَبِيُّ خَلَفَهُ نَبِيُّ وَإِنَّهُ لَا نَبِيَّ بَعْدِي وَسَيَكُونُ بَعْدِي خُلَفَاءُ .
"বনী ইসরাঈলের রাজনৈতিক কার্যক্রমও তাহাদের নবীগণ পরিচালনা করিতেন। একজন নবীর ইনতিকালের পর আরেকজন নবী তাঁহার স্থলাভিষিক্ত হইতেন। কিন্তু আমার পরে কোন নবী নাই। আমার পরে হইবে খলীফাগণ” (বুখারী, আম্বিয়া, বাব ৫০, নং ৩১৯৭; মুসলিম, ইমারা, বাব ১২৭, নং ৪৬২০; মুসনাদে আহমাদ, ২খ., পৃ. ২৯৭)।
মানবজাতির পার্থিব জীবনের অধিকাংশ আচরণ রাজনীতি দ্বারা প্রভাবিত। তাওহীদবাদী ধর্মে পার্থিব ও পরকালীন জীবন একই সূত্রে গাঁথা। এই ধর্মে মানুষের কোন আচরণই ধর্মের বিধান বহির্ভূত নহে। তাই নবীগণ কর্তৃক তাওহীদবাদীদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডও পরিচালিত হইত।
যুদ্ধ-পরবর্তী যেসব ঘটনাপ্রবাহের বর্ণনা, বিশেষত ছা'লাবীর কাসাসুল আম্বিয়ায়, বিধৃত হইয়াছে, সেই সম্পর্কে কুরআন ও হাদীছে কোন বর্ণনা বা ইঙ্গিত পাওয়া যায় না। এইসব বিবরণ সম্পূর্ণরূপে বাইবেল হইতে লওয়া হইয়াছে। কারণ যুদ্ধ-পরবর্তী তালূত-দাউদ 'সম্পর্কের উত্থান-পতন ও অবনতির যে বিবরণ কাসাস গ্রন্থাবলীতে সন্নিবিষ্ট হইয়াছে তাহা বাইবেলের বিবরণের অনুরূপ। দাউদের নিকট তালূতের কন্যার বিবাহ, দাউদকে তালুতের রাজ্যের অর্ধেক দান; দাউদের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তায় তালুতের ঈর্ষান্বিত হওয়া এবং ইহার পরিণতিতে দাউদকে হত্যার ষড়যন্ত্র, তাহাতে অকৃতকার্য হওয়া, দাউদের নিকট তালূতের ক্ষমা প্রার্থনা ইত্যাকার সকল ঘটনার বিষরণ বাইবেল ভিত্তিক (দ্র. ১ম শমূয়েল, অধ্যায় ১৮-২৮)।
📄 তালুত
তালূত ছিলেন ইউসুফ (আ)-এর সহোদর বিনয়ামীনের বংশধর। তাঁহার বংশলতিকা নিম্নরূপ: তালূত ইব্ন কীশ ইব্ন আনমার ইব্ন দিরার ইবন ইয়াহরাফ ইবন ইয়াফতাহ ইব্ন ঈশ ইব্ন বিনয়ামীন ইব্ন ইয়া'কূব ইব্ন ইসহাক (আ) (আল-কামিল, ১খ, পৃ. ১৬৫)। অন্যান্য গ্রন্থে প্রদত্ত বংশলতিকার সহিত ইহার কিছু গরমিল আছে (তু. আরাইস, পৃ. ২৮৫-৬; কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৩০৪; বাইবেলের ১ম শমূয়েল, ৯:১-২)।
'ইয়াহূদী ইতিহাসে তিনি তাহাদের প্রথম রাজা। তিনি দৈহিক গঠনে, শারীরিক সৌন্দর্যে, জ্ঞান-গরিমায় ও আত্মপ্রত্যয়ে এক বলিষ্ঠ দীর্ঘদেহী যুবক ছিলেন। বাইবেলের বর্ণনামতে ইসরাঈল সন্তানদের মধ্যে তাঁহার অপেক্ষা সুন্দর কোন পুরুষ ছিল না এবং তিনি অন্য সকল লোকের তুলনায় এক মস্তক দীর্ঘ ছিলেন (১ম শমূয়েল, ৯: ২ ও ১০:২৩)।
ইসরাঈলীদের নিকট দীর্ঘদেহী হওয়া ছিল একটি বিশেষ গুণ এবং ইহা ছিল নেতৃপদে বরিত হওয়ার জন্যও অপরিহার্য। তাওরাতের পর ইয়াহুদীদের পবিত্রতম লিপি হচ্ছে তালমূদ। তাহাতে আছে, আল্লাহ তাঁহার প্রশান্তি এমন ব্যক্তির উপর অবতীর্ণ করেন, যে ধীমান, মজবুত তনু, বিত্তবান ও দীর্ঘদেহী (Everyman's Talmud, পৃ. ১২৮-এর বরাতে তাফসীরে মাজেদী, বাংলা অনু., ১খ, পৃ. ৪৭৮)। একদল গবেষকের মতে কুরআন মজীদের 'তালূত' শব্দটি “তালুত” ছিল, যাহা طول (দৈর্ঘ্য) হইতে নির্গত। হিব্রু ভাষায় তালুতের নাম শাওল (বাইবেলে শৌল), দীর্ঘদেহী হওয়ায় নাম হইল তালূত (মা'আলিমুত-তানযীল)। অপর মতে আরবী শব্দ হইতে নামটির উৎপত্তি এবং উহা আসলে ছিল طولوت (রূহুল মা'আনী)।
বাইবেলের, 'শমূয়েল' গ্রন্থে তাঁহার রাজত্ব প্রতিষ্ঠা সংক্রান্ত বিস্তারিত বর্ণনা আছে। যেমন, শৌলের (তালুতের) উপস্থিত হইবার এক দিবস পূর্বে সদাপ্রভু শমূয়েলের কর্ণগোচরে প্রকাশ করিলেন যে, কল্য এমন সময়ে আমি বিন্যামিন প্রদেশ হইতে একজন লোককে তোমার নিকট প্রেরণ করিব। তুমি তাহাকে আমার প্রজা ইসরাঈলের নায়ক করিবার জন্য অভিষেক করিবে। সে ফিলিস্তীনীদের কবল হইতে আমার প্রজাদিগকে নিস্তার করিবে....। পরে শমূয়েল শৌলকে দেখিলে সদাপ্রভু তাঁহাকে বলিলেন, দেখ এই সেই ব্যক্তি, যাহার বিষয় আমি তোমাকে বলিয়াছিলাম। সেই আমার প্রজাদের উপর কর্তৃত্ব করিবে (১ম শমূয়েল, ৯:১৫-১৬)।
যেখানে ইসরাঈলীরা শমূয়েল (আ)-এর নিকট তাহাদের একজন শাসক নিয়োগের আবেদন করিল এবং তৎপ্রেক্ষিতে তিনি তালুতকে আল্লাহ্র নির্দেশমত তাহাদের শাসক নিয়োগ করিলেন, সেখানে তাঁহার বিরুদ্ধে তাহাদের আপত্তি উত্থাপনের কারণ কি? বনূ ইসরাঈলের বারটি গোত্রের মধ্যে দুইটি বিশেষ গোত্র ছিল: লাওয়া (লেবি) বংশীয়গণের ছিল নবুওয়াত প্রাপ্তির বিশেষ অধিকার এবং যিহূদা (ইয়াহুদা) বংশীয়গণের ছিল রাজত্ব ও সেনাপতিত্ব প্রাপ্তির বিশেষ অধিকার। তালূত এই দুই বংশ বহির্ভূত একটি ক্ষুদ্র গোত্রের লোক ছিলেন। বলা বাহুল্য বার গোত্রের মধ্যে বিনয়ামীন গোত্র ছিল সর্বাপেক্ষা ক্ষুদ্র ও অখ্যাত (ইব্ন জারীর তাবারীর বরাতে তাফসীরে মাজেদী, ১খ, পৃ. ৪৭৬-৪৭৭; ছা'লাবীর কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ২৮৬; বিদায়া, বালাম ১, খ.২, পৃ. ৯; আল-কামিল, ১খ, পৃ. ১৬৫; তু. বাইবেল, ১ম শমূয়েল, ৯: ২১)। কুরআন মজীদেও বলা হইয়াছে যে, আল্লাহ তা'আলা তালূতকে তাহাদের শাসক নিয়োগ করিয়াছিলেন (তু. ২: ২৪৭)।
📄 জালূত
এক ফিলিস্তীনী বীর যোদ্ধা। বাইবেলে তাহার নাম গলিয়াত, গাত-নিবাসী, সাড়ে ছয় হাত দীর্ঘ, মস্তকে পিতলের শিরস্ত্রাণ, সর্বদেহ পিতলের বর্মে সজ্জিত (তু. ১ম শমূয়েল, ১৭ ৪-৬)। দেখিতে মানুষ নহে যেন একটি দৈত্য, ইয়াহুদীদের প্রতিপক্ষ পথভ্রষ্ট ফিলিস্তীনী পৌত্তলিকদের নেতা। কুরআন মজীদে তিনবার তাহার নাম উল্লিখিত হইয়াছে (তু. ২: ২৪৯, ২৫০, ১৫১)।
📄 তাবৃত
কুরআন মজীদের দুই স্থানে 'তাবুত' শব্দটি উল্লিখিত হইয়াছে (তু. ২: ২৪৮ এবং ২০: ৩৬), অর্থ সিন্ধুক। ২: ২৪৮ আয়াতে উদ্ধৃত তাবূত বলিতে সেই "প্রশান্তির সিন্দুক" (Ark of the Covenant)-কে বুঝানো হইয়াছে যাহা বাইবেলে সদাপ্রভুর নিয়ম-সিন্দুক নামে উল্লেখিত হইয়াছে (তু. ১ম শমূয়েল, ৪: ৩)। ইহা ছিল ইয়াহুদীদের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ, মহামূল্যবান ও অতি পবিত্র ধর্মীয় ও জাতীয় উত্তরাধিকারের স্মৃতিবাহী ঐতিহ্য। ইহার মধ্যে তাওরাতের মূল লিপি, মূসা ও হারূন (আ) ভাতৃদ্বয়ের স্মৃতিবাহী জিনিসপত্র, যেমন মু'জিযার লাঠি, মান্ন ইত্যাদি সংরক্ষিত ছিল। ইয়াহুদীরা ইহাকে তাহাদের সৌভাগ্যের চাবিকাঠি বলিয়া বিশ্বাস করিত। তাই তাহারা স্বদেশে, প্রবাসে, যুদ্ধে সব সময় ইহাকে নিজেদের সঙ্গে রাখিত।
এক যুদ্ধে ফিলিস্তীনী পৌত্তলিকরা ইসরাঈলীদিগকে পরাভূত করিয়া সিন্দুকটি হস্তগত করে এবং ইহাকে তাহাদের দাজুন দেবতার মন্দিরে রাখিয়া দেয়। ইহার ফলে প্রতি রাত্রে দেবমূর্তিটি উল্টাইয়া পড়িয়া থাকিত। তাহারা সিন্দুকটি যে জনপদেই রাখিত সেখানেই 'মহামারির প্রাদুর্ভাব ঘটিত। অবশেষে তাহারা ভীত-সন্ত্রস্ত্র হইয়া সিন্দুকটি একটি গরুর 'গাড়িতে স্থাপন করিয়া উহাকে চালকহীনভাবে ইসরাঈলীদের বসতির দিকে হাঁকাইয়া দেয়। আল্লাহর হুকুমে ফেরেশতাগণ গাড়িটিকে হাঁকাইয়া ইয়াহুদীদের জনপদে লইয়া আসে। নবী সমূয়েল (আ) কর্তৃক তালুতকে শাসক নিয়োগকালে এই ঘটনা ঘটে।
হযরত সুলায়ামান (আ)-এর (মৃ. ৯৩৩ খৃ. পৃ.) যুগ পর্যন্ত ইহা ইয়াহুদীদের অধিকারে থাকে। হায়কালে সুলায়মানী (সৌধ বা মিনার) নির্মাণের পর সিন্দুকটি সেখানে স্থাপন করা হইয়াছিল। অতঃপর ইহার আর কোনও ইতিহাস পাওয়া যায় না। ইয়াহুদীদের মধ্যে প্রচলিত বিশ্বাসমতে ইহা এখনো হায়কালে সুলায়মানীর ভিত্তিমূলের কোথাও সমাহিত আছে (মাআরেফুল কোরআন, সংক্ষিপ্ত সং, ২: ২৪৮ নং আয়াতের টীকা; তাফসীরে মাজেদী, ১খ, পৃ. ৪৭৯, টীকা ৯৪৩; তাফহীমুল কুরআন, সূরা বাকারার ২৪৮ আয়াতের ২৭০ নং টীকা; তারীখুল কালিম, ১খ, পৃ. ১৬৫, টীকা ৫; বিদায়া, ২খ, পৃ.৭; তু. বাইবেল, ১ম শমূয়েল, ৪: ১-১১; ৫ ৪...; Encyclopaedia Amerieana, vol. i. See Ark.)।
২০ :৩৯ আয়াতে তাবৃত বলিতে মূসা (আ)-এর জন্মের পর তাঁহাকে যে বাক্সে ভর্তি করিয়া নদীতে ভাসাইয়া দেওয়া হইয়াছিল, সেই বাক্সকে বুঝানো হইয়াছে।