📄 জন্ম ও বংশ পরিচয়
হযরত দাউদ (আ) ছিলেন বনূ ইসরাঈলের একজন মহান নবী ও রাসূল এবং পরাক্রমশালী শাসক। কুরআন মজীদে যে কয়জন নবী-রাসূলের নাম, সংক্ষিপ্ত পরিচয় ও প্রাসঙ্গিক বিষয়াদি উল্লিখিত হইয়াছে, তিনি তাঁহাদের অন্তর্ভুক্ত। তাঁহার জন্মতারিখ সম্পর্কে সঠিক তথ্য অজ্ঞাত। তবে অনুমান করা হয় যে, তাঁহার সময়কাল ছিল হযরত মূসা (আ)-এর দুই শত বৎসর পরে এবং হযরত ঈসা (আ)-এর এক হাজার বৎসর পূর্বে (তালূত-জালূতের মধ্যকার যুদ্ধ অধ্যায়ে সন-তারিখ সংক্রান্ত, আলোচনা করা হইয়াছে)। বুতরুস আল-বুস্তানী তাঁহার জন্মসন ১০৮৬ খৃ. পূ., জন্মস্থান বেথেলহাম, মৃত্যু সন ১০১৫ খৃ. পূ. এবং মৃত্যুস্থান জেরুসালেম উল্লেখ করিয়াছেন (দাইরা, ৭খ, পৃ. ৫৭৪)।
তাঁহার বংশলতিকা নিম্নরূপ: দাউদ (আ) ইব্ন ঈশা (ঈশী) (যিশয়) ইব্ন আওবিদ ইব্ন আবির (আধিক্ষ) ইব্ন সালমূন ইব্ন নাহশূন ইব্ন আমিনাদিব ইব্ন ইরাম ইব্ন হাসরূন ইব্ন ফারিস ইব্ন ইয়াহুয়া ইব্নই য়াকুব (আ) ইব্ন ইসহাক (আ) ইব্ন ইবরাহীম (আ) (ইব্ন জারীর তাবারী, তারীখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, ১খ., পৃ. ২৪৭; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ, পৃ. ৯)। অন্যান্য গ্রন্থে প্রদত্ত তালিকায় নামের উচ্চারণে কিছু বিভিন্নতা আছে (তু. আল-মুসতাদরাক, ২খ., পৃ. ৫৮৫; আল-কামিল, ফি'ত-তারীখ, ১খ., পৃ. ১৬৯; তাহযীব তারীখ দিমাশ্ক আল-কাবীর, ৫খ, পৃ. ১৯০ ইত্যাদি)। রাইবেল প্রদত্ত বংশলতিকা নিম্নরূপঃ দাউদ ইব্ন যিশয় ইব্ন ওবেদ ইব্ন বোয়স ইব্ন সলমোন ইব্ন নহশোন ইব্ন আম্মিনাদব ইব্ন রাস ইব্ন হিব্রোণ ইব্ন পেরেস ইব্ন যিহুদা (রূতের বিবরণ, ৪ঃ ১৭-২২; আরও তু. মথি, ১: ১-৬; লুক, ৩: ২৩)। তবে সবকয়টি উৎসই একমত যে, হযরত দাউদ (আ) হযরত ইয়াকুব (আ)-এর বারজন পুত্র হইতে উদ্ভূত বারটি গোত্রের মধ্য হইতে ইয়াহুদার (যিহুদা) বংশভুক্ত ছিলেন। বাইবেলের বর্ণনামতে ইশার (যিশয়) আট পুত্রের মধ্যে দাউদ (আ) ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ; বয়োজ্যেষ্ঠ তিন পুত্রের নাম ইলীয়াব, অবীনাদব ও শম্ম (১ম শমুয়েল, ১৭ঃ ১২-১৩)। ইব্ন কাছীরের মতে তাঁহারা ছিলেন তের ভাই (২খ, পৃ. ৮)।
ইব্ন ইসহাক (র) ওয়াহ্হ্ ইব্ন-মুনাব্বিহ (র)-এর বরাতে হযরত দাউদ (আ)-এর দেহাবয়ব নিম্নরূপ বর্ণনা করিয়াছেন: তিনি ছিলেন খর্বকায়, ক্ষুদ্রদেহী ও নীল চক্ষুবিশিষ্ট। তাঁহার দেহে পশম ছিল যৎসামান্য এবং তাঁহার চেহারা হইতে তাঁহার আত্মার পবিত্রতা প্রস্ফুটিত হইত (বিদায়া, বান্দর ১, খ. ২, পৃ. ৯; আল-মুসতাদরাক, ২ খ, পৃ. ৫৮৫; তু. ১ম শমূয়েল, ১৬ঃ ১৮; ১৭ঃ ৪২)। তিনি ছিলেন পর্যাপ্ত দৈহিক শক্তির অধিকারী (তু. ৩৮: ১৭)। বাদশাহ তালুতের সহিত যুদ্ধে যোগদানের আগে ও পরে তিনি পিতার মেষ চরাইতেন (১ম শমূয়েল, ১৭ঃ ১৫) এবং এই অবস্থায়ই তিনি অদৃশ্য হইতে যুদ্ধে যোগদানের আহবান শুনিতে পান। তাঁহাকে ডাকিয়া বলা হইল, হে দাউদ! জালূত তোমার হস্তে নিহত হইবে। তুমি এখানে কি করিতেছ! তোমার মেষপাল তোমার প্রতিপালকের যিম্মায় রাখিয়া তোমার ভ্রাতাগণের সহিত মিলিত হও। কারণ তালুত জালূতের হত্যাকারীর জন্য তাঁহার সম্পত্তির অর্ধেক এবং তাহার সহিত তাঁহার কন্যার বিবাহ দেওয়ার ঘোষণা দিয়াছেন। অতএব তিনি মেষপাল তাঁহার প্রতিপালকের যিম্মায় ত্যাগ করিয়া যুদ্ধে যোগদানের জন্য রওয়ানা হন (তাহযীব তারীখ দিমাশুক, ৫খ., পৃ. ১৯০)। প্রথিমধ্যে পুরপুর তিনটি পাথর তাঁহাকে ডাকিয়া বলে, হে দাউদ! আমাকে তোমার সঙ্গেও। আল্লাহর হুকুমে আমি তোমার পক্ষে জালুতকে হত্যা করিব। দ্বিতীয় পাথরটি হযরত ইসহাক (আ)-এর এবং তৃতীয় পাথরটি হযরত ইয়াকুব (আ)-এর বলিয়া কথিত। দাউদ (আ) তিনটি পাথরই তাঁহার থলের মধ্যে পুরিয়া লইলেন। পাথর জালুতকে কিভাবে হত্যা করিবে, দাউদ (আ) এই কথা জিজ্ঞাসা করিলে উহা বলিল, আমি আল্লাহর হুকুমে বাতাসের সাহায্য নিব এবং বাতাস তাহার শিরস্ত্রাণ খুলিয়া ফেলিলে তাহার কপালে পতিত হইয়া তাঁহাকে হত্যা করিব। উল্লেখ্য যে, থলের মধ্যে পাথর তিনটি একটি পাথরে রূপান্তরিত হইয়া যায় (পৃ. গ্র., ৫খ, পৃ. ১৯১)।
📄 কুরআন মজীদে হযরত দাউদ (আ)
কুরআন মজীদের নয়টি সূরার মোট ষোল স্থানে প্রসঙ্গক্রমে হযরত দাউদ (আ)-এর কিছু বর্ণনা আছে।
(ক) সর্বপ্রথম তাঁহার নাম উল্লিখিত হইয়াছে-জালূতের বিরুদ্ধে তালূতের যুদ্ধাভিযান সম্পর্কিত বিবরণে। এই যুদ্ধে সৈনিক দাউদ বিপক্ষের সমরনায়ক জালুতকে হত্যা করিয়া আলোচিত ব্যক্তিত্বে পরিণত হইয়াছিলেন। মহান আল্লাহ বলেন:
وَقَتَلَ دَاوُدُ جَالُونَ وَأنهُ اللهُ المُلكَ وَالحِكْمَةَ وَعَلَمَهُ مِمَّا يَشَاءُ. "এবং দাউদ জালূতকে হত্যা করিল, আল্লাহ তাহাকে রাজত্ব ও প্রজ্ঞা দান করিলেন এবং যাহা তিনি ইচ্ছা করিলেন তাহা তাহাকে শিক্ষা দিলেন" (২৪ ২৫১)।
(খ) সূরা আন-নিসার ১৬৩ আয়াতে তাঁহাকে ওহীপ্রাপ্ত নবীগণের অন্তর্ভুক্ত করা হইয়াছে। মহান আল্লাহ বলেন :
أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ كَمَا أَوْحَيْنَا إِلَى نُوحٍ وَالنَّبِيِّينَ مِن بَعْدِهِ وَأَوْحَيْنَا إِلَى إِبْرَاهِيمَ وَاسْمُعِيلَ وَاسْحَقَ وَيَعْقُوبَ والارتباط وعيسى وَأَيُّوبَ وَيُوتُنسَ وَهُرُونَ وَسُلَيْمَنَ وَأَتَيْنَا دَاوُدَ رَبُورًا.
"নিশ্চয় আমি আপনার নিকট ওহী প্রেরণ করিয়াছি, যেমন নূহ্ ও তাহার পরবর্তী নবীগণের নিকট ওহী প্রেরণ করিয়াছিলাম। আমি ইবরাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকুব ও তাহার বংশধরগণ, ঈসা, আয়্যব, ইউনুস, হারুন ও সুলায়মানের নিকটও ওহী প্রেরণ করিয়াছিলাম এবং দাউদকে যাবুর দিয়াছিলাম" (৪:৪ ১৬৩)।
(গ) দাউদ (আ)-এর যবানীতে বনী ইসরাঈলের অবাধ্য ব্যক্তিদের অভিসম্পাত প্রসঙ্গে:
لُعِنَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ بَنِي إِسْرَائِيلَ عَلَى لِسَانِ دَاوُدَ وَعِيسَى بْنِ مَرْيَمَ ذَلِكَ بِمَا عَصَوْا وَكَانُوا يَعْتَدُونَ.
"বনূ ইসরাঈলের মধ্যে যাহারা কুফরী করিয়াছিল তাহারা দাউদ ও ঈসা ইবন মারয়াম কর্তৃক অভিশপ্ত হইয়াছিল। তাহা এই কারণে যে, তাহারা ছিল অবাধ্য ও সীমালংঘনকারী” (৫:৭৮)।
(ঘ) পূর্ববর্তী কতক নবীর বংশধরকে হেদায়াতদান প্রসঙ্গে:
وَوَهَبْنَا لَهُ إِسْحَقَ وَيَعْقُوبَ كُلا هَدَيْنَا وَنُوحًا هَدَيْنَا مِنْ قَبْلُ وَمِنْ ذُرِّيَّتِهِ دَاوُدَ وَسُلَيْمَنَ وَأَيُّوبَ وَيُوسُفَ وَمُوسَى وَهَرُونَ وَكَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ.
“আর আমি তাহাকে দান করিয়াছিলাম ইসহাক ও ইয়াকূব, তাহাদের প্রত্যেককে সৎপথে পরিচালিত করিয়াছিলাম, পূর্বে নূহকেও সৎপথে পরিচালিত করিয়াছিলাম এবং তাহার বংশধর দাউদ, সুলায়মান, আয়্যব, ইউসুফ, মূসা ও হারুনকেও। এভাবেই আমি সৎকর্মপরায়ণদেরকে পুরষ্কৃত করি” (৬:৮৪)।
(ঙ) যাবুর কিতাব প্রদান প্রসঙ্গে:
وَلَقَدْ فَضَّلْنَا بَعْضَ النَّبِيِّينَ عَلَى بَعْضٍ وَأَتَيْنَا دَاوُدَ زَبُورًا .
“নিশ্চয় আমি নবীগণের কতকের উপর কতককে মর্যাদা দান করিয়াছি এবং দাউদকে যাবুর দান করিয়াছি” (১৭:৫৫)।
(ছ) তাঁহাকে প্রজ্ঞা ও জ্ঞান এবং প্রাকৃতিক বস্তুর উপর অলৌকিক প্রভাব খাটাইবার ক্ষমতা প্রদান প্রসঙ্গে
وَدَاوُدَ وَسُلَيْمَنَ إِذْ يَحْكُمَن فِي الْحَرْثِ إِذْ نَفَشَتْ فِيهِ غَنَمُ الْقَوْمِ وَكُنَّا لِحُكْمِهِمْ شُهِدِيْنَ ، فَفَهَّمْنَهَا سُلَيْمَنَ وَكُلا أَتَيْنَا حُكْمًا وَعِلْمًا وَسَخَّرْنَا مَعَ دَاوُدَ الْجِبَالَ يُسَبِّحْنَ وَالطَّيْرَ وَكُنَّا فَعَلَيْنَا وَعَلَّمْنَهُ صَنْعَةَ لَيُوسَ لَكُمْ لِتُحْصَنَكُمْ مِنْ بَأْسِكُمْ فَهَلْ أَنْتُمْ شُكُرُونَ .
“এবং স্মরণ কর দাউদ ও সুলায়মানের কথা, যখন তাহারা শস্যক্ষেত্র সম্পর্কে বিচার করিতেছিল। উহাতে রাত্রিকালে কোন সম্প্রদায়ের মেষ প্রবেশ করিয়াছিল। আমি তাহাদের বিচার প্রত্যক্ষ করিতেছিলাম। আর আমি সুলায়মানকে এই বিষয়ের মীমাংসা বুঝাইয়া দিয়াছিলাম এবং তাহাদের প্রত্যেককে আমি প্রজ্ঞা ও জ্ঞান দান করিয়াছিলাম। আমি পর্বত ও পক্ষীকুলকে অধীন করিয়া দিয়াছিলাম, ইহারা দাউদের সঙ্গে, আমার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করিত। আমিই ছিলাম এই সবের কর্তা। আর আমি তাহাকে তোমাদের জন্য বর্ম নির্মাণ শিক্ষা দিয়াছিলাম, যাহাতে উহা তোমাদের যুদ্ধে তোমাদেরকে রক্ষা করে। অতএব তোমরা কি কৃতজ্ঞ হইবে?” (২১: ৭৮-৮০)।
(জ) দাউদ ও সুলায়মান (আ)-কে জ্ঞানদান প্রসঙ্গে: وَلَقَدْ آتَيْنَا دَاوُدَ وَسُلَيْمَانَ علمًا وَقَالاً الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي فَضَّلَنَا عَلَي كَثِيرٍ مِنْ عِبَادِهِ الْمُؤْمِنِينَ، وَوَرِثَ سُلَيْمَانُ دَاوُدَ .
"আমি অবশ্যই দাউদ ও সুলায়মানকে জ্ঞান দান করিয়াছি এবং তাহারা উভয়ে বলিল, সকল প্রশংসা আল্লাহর যিনি আমাদেরকে তাঁহার বহু মুমিন বান্দার উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করিয়াছেন। সুলায়মান হইল দাউদের উত্তরাধিকারী" (২৭: ১৫-১৬)।
(ঝ) দাউদ (আ)-কে অনুগ্রহধন্য করা প্রসঙ্গে: وَلَقَدْ أَتَيْنَا دَاوُدَ مِنَّا فَضْلاً يُجِبَالُ الَّتِي مَعَهُ وَالطَّيْرَ وَالْنَّا لَهُ الْحَدِيدَ أَنِ اعْمَلْ سُبِغَتِ وَقَدِّرْ فِي السَّرْدِ وَاعْمَلُوا صَالِحًا إِنِّي بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ .
"নিশ্চয় আমি দাউদের প্রতি অনুগ্রহ করিয়াছি। হে পর্বতমালা! দাউদের সঙ্গে আমার পবিত্রতা ঘোষণা কর এবং পক্ষীকুলকেও। তাহার জন্য নমনীয় করিয়াছিলাম লৌহ, যাহাতে তুমি পূর্ণ মাপের বর্ম তৈয়ার করিতে এবং বুননে পরিমাণ রক্ষা করিতে পার এবং তোমরা সৎকর্ম কর। তোমরা যাহা কিছু করু আমি উহার সম্যক দ্রষ্টা" (৩৪: ১০-১১)।
اعْمَلُوا آلَ دَاوُدَ شُكْرًا وَقَلِيلٌ مِّنْ عِبَادِي الشَّكُورُ .
“হে দাউদ পরিবার! কৃতজ্ঞতা সহকারে তোমরা কাজ করিতে থাক। আমার বান্দাদের মধ্যে অল্পই কৃতজ্ঞ' (৩৪: ১৩)।
(ঞ) দাউদ (আ)-এর প্রশংসা, একটি বিবাদ মীমাংসার ঘটনা এবং তাঁহাকে রাজত্ব প্রদান প্রসঙ্গেঃ اصبر عَلَى مَا يَقُولُونَ وَاذْكُرْ عَبْدَنَا دَاوُدَ ذَا الْأَيْد إِنَّهُ أَوَّابُ - أَنَّا سَخَّرْنَا الْجِبَالَ مَعَهُ يُسَبِّحْنَ بِالْعَشِيِّ والإشراق والطَّيْرَ مَحْشُورَةٌ كُلٌّ لَهُ أَوَابٌ ، وَشَدَدْنَا مُلكَهُ وَأَتَيْنُهُ الحكمة وفصل الخطاب ، وَهَلْ أَلكَ نَبوا الخَصْمِ إِذْ تَسَوَّرُوا الْمِحْرَابَ إِذْ دَخَلُوا عَلَى دَاوُدَ فَفَزِعَ مِنْهُمْ قَالُوا لَا تَخَفْ خَصْمَن بَغَى بَعْضُنَا عَلَى بَعْضٍ فَاحْكُمْ بَيْنَنَا بِالْحَقِّ وَلَا تُسْطِطْ وَاهْدِنَا إِلَى سَوَاءِ الصِّرَاطِ إِنَّ هَذَا أَخِي لَهُ تِسْعَ وَتَسْعُونَ نَعْجَةً وَلَئِى نَعْجَةً وَاحِدَةً فَقَالَ القَلْنِيهَا وَعَرَنِى في الخطاب قال لقد ظلمك بسؤالَ نَعْجَتَكَ إِلَى نِعَاجَهُ وَأَنَّ كَثِيرًا مِنَ الْخَلَطَاءِ لِيَسْفِي بَعْضُهُمْ عَلَى بَعْضٍ إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّلِحَتِ وَقَلِيلٌ عِبَاهُمْ وَظَنَّ دَاوُدُ إِنَّمَا فَتَنَّهُ فَاسْتَغْفَرَ رَبَّهُ وَخَرَّ رَاكِعًا وَأَنَابَ : فَغَفَرْنَا لَهُ ذلكَ وَإِنَّ لَهُ عِنْدَنَا لَزُلْفَى وَحُشْنَ مَابٌ يُدَاؤُهُ إِنَّا جَعَلْنَكَ خَلِيقَةً في الْأَرْضِ فَاحْكُمُ بَيْنَ النَّاسِ بِالْحَقِّ وَلَا تَتَّبع الهوى فَيُضِلُّكَ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ إِنَّ الَّذِينَ يُصَلُّونَ يُضِلُّونَ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ وَلَهُمْ عَذَابٌ شَدِيدٌ بِمَا نَسُوا يَوْمَ الْحِسَابِ.
"ইহারা যাহা বলে তাহাতে তুমি ধৈর্য ধারণ কর এবং স্মরণ কর আমার শক্তিশালী বান্দা দাউদের কথা। সে ছিল অতিশয় আল্লাহ অভিমুখী। আমি পর্বতমালাকে নিয়োজিত করিয়াছিলাম যেন ইহারা সকাল-সন্ধ্যায় তাহার সহিত আমার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে, এবং সমবেত পক্ষীকুলকেও, সকলেই ছিল তাঁহার অভিমুখী। আমি তাহার রাজ্যকে সুদৃঢ় করিয়াছিলাম এবং তাহাকে প্রজ্ঞা ও ফয়সালাকারী বাগ্মিতা দান করিয়াছিলাম। তোমার নিকট বিবদমান লোকদের বৃত্তান্ত পৌছিয়াছে কি? যখন তাহারা প্রাচীর টপকাইয়া ইবাদতখানায় আসিল এবং দাউদের নিকট পৌঁছিল, তখন তাহাদের কারণে সে ভীতহুইয়া পড়িল। তাহারা বলিল, আপনি ভীত হইবেন না, আমরা দুই বিবদমান পক্ষ, আমাদের এক পক্ষ অপর পক্ষের উপর জুলুম করিয়াছে। অতএব আপনি আমাদের মধ্যে ন্যায়বিচার করিয়া দিন, অবিচার করিবেন না এবং আমাদেরকে সঠিক পথনির্দেশ করুন। এই ব্যক্তি আমার ভাই, তাহার নিরানব্বইটি মেষ আছে এবং আমার কাছে একটি মেষ। তবুও সে বলে, ইহা আমার যিম্মায় দিয়া দাও, এবং কথায় সে আমার প্রতি কঠোরতা প্রদর্শন করিয়াছে। দাউদ বলিল, তোমার মেষটিকে তাঁহার মেষগুলির সহিত যুক্ত করিবার দাবি করিয়া সে তোমার প্রতি জুলুম করিয়াছে। অংশীদারগণের অনেকে একে অপরের উপর তো অবিচার করিয়া থাকে, কেবল মুমিনগণ ও সৎকর্মপরায়ণ ব্যক্তিগণ তাহা করে না এবং তাহারা সংখ্যায় অল্প। দাউদ বুঝিতে পারিল যে, আমি তাহাকে পরীক্ষা করিয়াছি। অতঃপর সে তাহার প্রতিপালকের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করিল, নত হইয়া লুটাইয়া পড়িল এবং তাঁহার অভিমুখী হইল। অতএব আমি তাহার ত্রুটি ক্ষমা করিলাম। আমার নিকট তাঁহার জন্য রহিয়াছে নৈকট্যের মর্যাদা ও শুভ পরিণাম। হে দাউদ! আমি তোমাকে পৃথিবীতে প্রতিনিধি করিয়াছি। অতএব তুমি লোকদের মধ্যে সুবিচার কর এবং প্রবৃত্তির অনুসরণ করিও না। কেননা ইহা তোমাকে আল্লাহ্র পথ হইতে বিচ্যুত করিবে। 'যাহারা আল্লাহ্র পথ হইতে ভ্রষ্ট হয় তাহাদের জন্য রহিয়াছে কঠিন শান্তি। কারণ তাহারা বিচার দিবসকে বিস্তৃত হইয়া আছে” (৩৮ : ১৭-২৬)।
📄 হাদীছ শরীফে হযরত দাউদ (আ)
১. আব্দুল্লাহ ইব্ন, আমর (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে বলিলেনঃ "আল্লাহর নিকট অধিক পছন্দনীয় (নফল) সাওম হইল দাউদ (আ) এর সাওম (রোজা)। তিনি একদিন সাওম পালন করিতেন এবং একদিন বিরতি দিতেন। আল্লাহর নিকৃষ্ট সর্বাধিক, পছন্দনীয় (নফল) সালাত হইল দাউদ (আ)-এর সালাত। তিনি অর্ধেক রাত্রি ঘুমাইতেন, রাত্রির এক-তৃতীয়াংশে সালাত আদায় করিতেন এবং অবশিষ্ট ষষ্ঠাংশ (আবার) ঘুমাইতেন" (বুখারী, কিতাবুল আম্বিয়া, বাব ৩৮, নং ৩১৬৮; আরও দ্র. নং ৩১৬৬; ১৮৪১; মুসলিম, সাওম, বাব ২৮, নং ২৫৯৬; ২৬০৬; ২৬০৭, ২৬০৮, ২৬০৯, ২৬১০)।
২. নবী (স) আবদুল্লাহ ইব্ন য়াামর (রা)-কে বলেন: তাহা হইলে তুমি দাউদ (আ)-এর সাওম পালন কর। তিনি একদিন সাওম পালন করিতেন এবং একদিন বিরতি দিতেন। তিনি শত্রুর সম্মুখীন হইলে পলায়ন করিতেন না" (বুখারী, কিতাবুল আম্বিয়া, বাব ৩৭, নং ৩১৬৭; সাওম, বাব ৬০, নং ১৮৪০; তিরমিযী, সাওম, বাব ৫৭, নং ৭১৮; মুসলিম, সাওম, বাব ২৮, নং ২৬০১ ও ২৬০৩; আবূ দাউদ, নাসাঈ ও ইব্ন মাজাহতেও হাদীসটি সংকলিত হইয়াছে)।
৩. আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: "দাউদ (আ)-এর জন্য যাবুর কিতাবের তিলাওয়াত সহজসাধ্য করিয়া দেওয়া হইয়াছিল। তিনি তাঁহার বাহনের পিঠে জীন বাঁধিবার আদেশ করিতেন এবং উহার উপর জীন বাঁধা হইত। কিন্তু বাহনের পিঠে জীন বাঁধার পূর্বেই তিনি (যাবুর) তিলাওয়াত শেষ করিতে পারিতেন। তিনি স্বহস্তে উপার্জন দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করিছেন" (বুখারী, কিতাবুল আম্বিয়া, বাব ৩৭, নং ৩১৬৫, আরও দ্র. নং ১৯২৮)।
৪. মিকদাম (রা) হইতে বর্ণিত। নবী (স) বলেনঃ "স্বহস্তে বা স্বশ্রমে উপার্জিত খাদ্য অপেক্ষা উত্তম খাদ্য কেহ আহার করে নাই। আল্লাহ্র নবী দাউদ (আ) স্বহস্তে বা স্বশ্রমে উপার্জন করিয়া জীবিকা নির্বাহী করিজেন" (বুখারী, কিতাবুল বুয়ূ, বাব ১৫, নং ১৯২৭)।
৫. ইব্ন উমার (রা) হইতে বর্ণিত। নবী (স) বলেন: "লোকেরা দাউদ (আ)-কে দেখিতে আসিত এবং ধারণী করিত যে, তাঁছার ব্যাধি আছে। অথচ তাঁহার কোন ব্যাধি ছিল না, বরং আল্লাহ্ তা'আলার ভয় ও লজ্জাশীলতার আধিক্যে তাঁহার এইরূপ অবস্থা হইত" (ইব্ন আসাকির ও আবূ নুআয়ম-এর বরাতে কানযুল উম্মাল, ১১খ, নং ৩২৩২৩ ও ৩২৩২৪)।
৬. আবূ সা'ঈদ (রা) হইতে বর্ণিত। নবী (স) বলেনঃ দাউদ (আ) তাঁহার প্রভুর নিকট একটি আবেদন করিয়া বলিলেন, আমাকে ইবরাহীম, ইসহাক ও ইয়া'কূব (আ)-এর সমকক্ষ করুন। আল্লাহ তাঁহার নিকট ওহী পাঠাইলেন, নিশ্চয় আমি ইবরাহীমকে আগুনের দ্বারা পরীক্ষা করিয়াছি এবং সে ধৈর্য ধারণ করিয়াছে, ইসহাককেও কুরবানীর (দ্র. ইসমাইল) দ্বারা (পরীক্ষা করিয়াছি) এবং সেও ধৈর্য ধারণ করিয়াছে এবং ইয়াকূবকেও (ইউসুফের নিখোঁজ হওয়ার দ্বারা) এবং সেও ধৈর্য ধারণ করিয়াছে (আদ-দায়লামীর বরাতে কানযুল 'উম্মাল, ১১খ, নং ৩২৩২৫)।
৭. আবু ইসহাক (র) বলেন, আমরা অবহিত হইয়াছি যে, নবী (স) বলিয়াছেন: "দাউদ (আ) মেষ চারণ করিয়াছিলেন এবং তিনি নবী হইয়াছেন, মূসা (আ) মেষ চারণ করিয়াছিলেন এবং তিনি নবী হইয়াছেন এবং আমিও জিয়াদ নামক এলাকায় আমার বংশের মেষপাল চরাইয়াছি এবং আমিও নবী হইয়াছি” (তাবারানী, আবু নু'আয়ম, বাগাবী, ইব্ন মান্দা ও ইবন সা'দ-এর বরাতে কানযুল উম্মাল, ১১খ, নং ৩২৩২৬)।
৮. আবু হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। নবী (স) বলেন: "দাউদ (আ)-এর ছিল প্রবল আত্মমর্যাদাবোধ। তিনি বাহিরে গমন করিলে বাড়ির দ্বারসমূহ বন্ধ করিয়া দেওয়া হইত এবং তিনি ফিরিয়া না আসা পর্যন্ত তাঁহার পরিবার-পরিজনের নিকট কেহ প্রবেশ করিতে পারিত না। একদিন তিনি বাহিরে গমন করিলেন এবং যথারীতি বাড়ির দ্বারসমূহ বন্ধ করিয়া দেওয়া হইল। তাঁহার স্ত্রী অগ্রসর হইয়া ঘরে উঁকি মারিয়া হঠাৎ একটি লোককে ঘরের মধ্যস্থলে দাঁড়ানো অবস্থায় দেখিতে পাইলেন। স্ত্রী ঘরের লোকজনকে বলিলেন, এই লোকটি কোন দিক দিয়া ঘরে প্রবেশ করিল, অথচ দরজাগুলি বন্ধ রহিয়াছে। আল্লাহ্র শপথ! তোমরা তো দাউদ (আ)-এর দ্বারা অপমানিত হইবে। দাউদ (আ) আসিয়া দেখিলেন যে, লোকটি ঘরের মধ্যস্থলে দাঁড়াইয়া আছে। দাউদ (আ) তাহাকে বলিলেন: আপনি কে? আগন্তুক বলিলেন, আমি সেই ব্যক্তি যে রাজা-বাদশাহদিগকে ভয় করে না এবং কোন প্রতিবন্ধক আমার জন্য বাধা হইতে পারে না। দাউদ (আ) বলিলেন: আল্লাহর শপথ! তাহা হইলে আপনি তো মৃত্যুর ফেরেশতা। আল্লাহ্র নির্দেশকে স্বাগতম। যেই স্থানে দাউদ (আ)-এর রূহ কবজ করা হইল সেই স্থানেই তাঁহাকে কম্বল দিয়া ঢাকিয়া দেওয়া হইল। অবশেষে তিনি ইনতিকাল করিলেন। তাঁহার উপর সূর্য উদিত হইলে অর্থাৎ রৌদ্র পতিত হইলে সুলায়মান (আ) পক্ষীকুলকে বলিলেন: দাউদ (আ)-কে ছায়াদান কর। অতএব পক্ষীকুল তাহাদের ডানা দ্বারা তাঁহাকে ছায়াদীন করিতে থাকে। উহাতে পৃথিবী অন্ধকার হইয়া যায়। সুলায়মান (আ) পক্ষীকুলকে বলেন: এক এক করিয়া ডানা গুটাইয়া লও। সেই দিন বাজপাখিই উহার লম্বা ডানা দ্বারা অধিক স্থানে ছায়া বিস্তার করিয়া রাখে” (মুসনাদে আহমাদ, ২খ, পৃ. ৪১৯, কানযুল উম্মাল হইতে উদ্ধৃত, ১১খ, নং ৩২৩২৭)।
৯. আবু দারদা (রা) হইতে বর্ণিত। নবী (স) বলেন: "দাউদ (আ)-কে তাঁহার সাহাবীগণের উপস্থিতিতে আল্লাহ তা'আলা মৃত্যু দান করেন। ফলে তাহারা বিভ্রান্ত হয় নাই এবং পরিবর্তিতও হয় নাই। অপরদিকে ঈসা মসীহ (আ)-এর সঙ্গীগণ তাঁহার পরে মাত্র দুই শত বৎসর তাঁহার রীতিনীতির উপর ও তাঁহার প্রদর্শিত পথের উপর অবস্থান করে" (মুসনাদ আবূ ইয়া'লা ও তাবারানীর মু'জামুল কাবীর-এর বরাতে কানযুল উম্মাল, ১১খ, নং ৩২৩২৮)।
১০. আবূ দারদা (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: দাউদ (আ)-এর দু'আসমূহের একটি এই যে, তিনি বলিতেন, “হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট তোমার ভালোবাসা এবং যে তোমাকে ভালোবাসে তাহার ভালোবাসা প্রার্থনা করি এবং এমন কাজ করার তৌফিক চাই যাহা তোমার ভালোবাসা পর্যন্ত পৌছাইয়া দেয়। হে আল্লাহ! তোমার ভালোবাসাকে আমার জান-মাল, পরিবার-পরিজন ও শীতল পানির চাইতেও অধিক প্রিয় বানাইয়া দাও"। রাবী বলেন, মহানবী (স) যখনই দাউদ (আ)-এর আলোচনা করিতেন তখনই তাঁহার সম্পর্কে বলিতেন ৪. জিনি সকল লোকের তুলনায় অধিক ইবাদতগুযার ছিলেন" (তিরমিযী, আবওয়াবুদ দা'ওয়াত, বাব ৭৪, নং ৩৪৪২; হাকেম নীশাপুরীর আল-মুসতাদরাক ও সহীহ মুসলিমেও হাদীছটি উদ্ধৃত হইয়াছে; তু.. মুসলিম, কিতাবুস সিয়াম, বাব ২৮, নং ২৫৯৭, আবু দারদা (রা) কর্তৃক বর্ণিত)।
১১. আবু হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: "আল্লাহ তা'আলা আদম (আ)-কে সৃষ্টি করিয়া তাঁহার পৃষ্ঠদেশ মাস্হ করিলে তাঁহার পৃষ্ঠদেশ হইতে তাঁহার সকল সন্তান বাহির হইল, যাহাদেরকে তিনি কিয়ামত পর্যন্ত সৃষ্টি করিবেন। তিনি তাহাদের প্রত্যেকের দুই চক্ষুর মধ্যস্থানে নূরের ঔজ্জ্বল্য দান করিলেন, অতঃপর তাহাদেরকে আদম (আ)-এর সম্মুখে পেশ করিলেন। আদম (আ) বলিলেন, হে প্রভু! ইহারা কাহারা? আল্লাহ্ বলেন, ইঁহারা তোমার সন্তান। আদম (আ)-এর দৃষ্টি তাঁহার সন্তানদের এমন একজনের উপর পতিত হইল যাহার দুই চক্ষুর মধ্যখানের ঔজ্জ্বল্যে তিনি বিস্মিত হইলেন। তিনি বলিলেন, হে আমার প্রভু! এই ব্যক্তি কে? আল্লাহ বলিলেন, পরবর্তী কালের উম্মাতের অন্তর্গত তোমার সন্তানদের একজন। তাহার নাম দাউদ (আ)। আদম (আ) বলিলেন, হে আমার প্রভু! তাহার আয়ু কত বৎসর নির্ধারণ করিয়াছেন? আল্লাহ বলেন, ষাট বৎসর। আদম (আ) বলিলেন, প্রভু! আমার আয়ু হইতে চল্লিশ বৎসর তাঁহাকে দান করুন" (তিরমিযী, তাফসীর সূরা আ'রাফ, নং ৩০১৫; মুসনাদ ইমাম আহমাদ, ১খ, পৃ. ২৫২, ২৯৯, ৩৭১; আল-মুসতাদরাক গ্রন্থেও হাদীছটি সংকলিত হইয়াছে)।
১২. "দাউদ (আ) আল্লাহ্র নিকট দু'আ করিয়াছিলেন যে, তিনি যেন অনবরত তাঁহার বংশধরগণের মধ্য হইতে নবী পাঠান" (তিরমিযী, তাফসীর সূরা ১৭, নং ৩০৮২)।
১৩. আবূ মূসা (রা) হইতে বর্ণিত। নবী (স) বলেনঃ "হে আবূ মূসা! তোমাকে দাউদ (আ) পরিবারের সুমধুর সুরসমূহের মধ্য হইতে একটি সুর দান করা হইয়াছে" (তিরমিযী, মানাকিব, বাব ১২৯, নং ৩৭৯২; বুখারী, ফাদাইলুল কুরআন, বাব ৩০, নং ৪৬৭৫; মুসলিম; ফাদাইলুল কুরআন, বাবা ২, নং ১৭২১, ১৭২২)।
📄 অন্যান্য ধর্মগ্রন্থে দাউদ (আ)
একমাত্র বাইবেল ব্যতীত অন্য কোন ধর্মগ্রন্থে হযরত দাউদ (আ) সম্পর্কে আলোচনা পাওয়া যায় না। বাইবেলের পুরাতন নিয়ম-এর কয়েকটি গ্রন্থে তাঁহার সম্পর্কে তথ্য বিদ্যমান। কিন্তু নতুন নিয়ম-এ শুধু এতটুকু বিবরণ আছে যে, হযরত ঈসা (আ) হযরত দাউদ (আ)-এর বংশধর (তু. মথির সুসমাচার, ১: ১; লুকের সুসমাচার, ৩: ২৩)। পুরাতন নিয়ম-এ কোন কোন বিষয়ে তাঁহার প্রশংসা বিদ্যমান থাকিলেও তাঁহার সহিত এমন কতিপয় নিন্দনীয় অপবাদ যুক্ত করা হইয়াছে যাহা তাঁহার সমস্ত অবদানকে মলিন করিয়া দেয়। দাউদ (আ) সংক্রান্ত তথ্যাবলীর জন্য দ্র. বাইবেলের বংশাবলী-১; শমূয়েল-১ ও রাজাবলী-১)। ইসরাঈল জাতিকে যে সকল মহান নবী-রাসূল লাঞ্ছনা ও অপমানের আস্তাকুঁড় হইতে তুলিয়া সম্মান ও গৌরবের উচ্চতম শিখরে আরোহণ করাইয়াছিলেন, আজ তাহারা যে ঐতিহাসিক কীর্তি লইয়া গর্ব করে, তাহা তাহারা যে মহান ব্যক্তিগণের কল্যাণে লাভ করিয়াছে, ইয়াহুদীরা তাঁহাদের পূত-পবিত্র জীবনে কালিমা লেপন করিতে মোটেই কুণ্ঠাবোধ করে নাই। হযরত নূহ, ইবরাহীম, লূত, ইসহাক, ইয়াকূব, ইউসূফ, মূসা ও হারুন (আ), এক কথায় কোন নবীই তাহাদের জঘন্যতম কুৎসা রটনা হইতে রেহাই পান নাই (বিস্তারিত দ্র. নূহ: আদিপুস্তক, ৯ : ২০-২৫; ইবরাহীম, ঐ, ১২: ১২; ২০: ১-৩; লূত: ঐ, ১৯ : ৩০-৮; ইসহাক: ঐ, ২৬: ৭-১২; ইয়াকূবঃ ঐ, ২৭ : ১-২৫; ১৯ : ১৬-২৯; ৩৪: সম্পূর্ণ; ৩৬: ২২; হারূন: যাত্রাপুস্তক, ৩২: ১-২৪ ইত্যাদি)। তাহারা সর্বাধিক কুৎসা রটনা করিয়াছে হযরত দাউদ ও সুলায়মান (আ)-এর। তাহাদেরকে তাহারা নবীগণের কাতার হইতে মামুলি রাজা-বাদশাদের কাতারে নামাইয়া আনিয়াছে। মিথ্যাচার, ধোঁকাবাজি, দুর্নীতি, নিপীড়ন, ব্যভিচার ও শেরেকীর অপরাধ পর্যন্ত তাহাদের উপর আরোপ করা হইয়াছে (দ্র. ১ম রাজাবলী, ১১: ১-১০)।
পাশ্চাত্যের ইয়াহুদী-খৃস্টান লেখকগণও বাইবেল ও বাইবেলীয় সাহিত্যের কল্যাণে নবী-রাসূলগণের চরিত্র কলংকিত করিতে মোটেও কুণ্ঠাবোধ করেন নাই। তাহারা নবী-রাসূলগণকে প্রতিভাধর ব্যক্তিত্ব (Genius) হিসাবে মূল্যায়ন করিলেও তাহাদের লেখায় তাহাদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের লেশমাত্রও লক্ষ্য করা যায় না। পৃথিবীর তাবৎ প্রতিভাধর ব্যক্তিগণ যেখানে সীমিত কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ যোগ্যতার অধিকারী হইয়া থাকেন, উহার বিপরীতে নবী-রাসূলগণ প্রতিটি বিষয়ে যোগ্যতার শীর্ষদেশে অবস্থান করেন। তাঁহারা পরিপক্ক জ্ঞানের অধিকারী, পরিচ্ছন্ন চিন্তায় সঞ্জীবিত, হীনতা-নীচতা হইতে পবিত্র, যাবতীয় মানবীয় গুণে সুশোভিত, তাঁহাদের চিন্তা-চেতনা ও জ্ঞানের উৎস ঊর্ধ্ব জগতের সহিত সংযুক্ত। কোনও নবী সম্পর্কে এইরূপ ধারণা করা যায় না যে, তিনি ভদ্রতা, সভ্যতা, সৌজন্য ও মনুষ্যত্বের দাবিসমূহ উপেক্ষা করিয়াছেন। তাঁহার দ্বারা এমন কোনও কাজও সংঘটিত হওয়া সম্ভব নহে যাহা তাঁহার সম্মান, মর্যাদা ও ব্যক্তিত্বকে কলংকিত করিতে পারে। তাঁহারা আল্লাহ প্রদত্ত জীবন বিধানের ধারক ও বাহক, তাঁহাদের জীবন অনুসরণীয় আদর্শ। তাঁহাদের গোপন ও প্রকাশ্য জীবন সবই উজ্জ্বল। তাঁহাদের ব্যক্তিগত জীবন তাঁহাদের আনীত পয়গামের সহিত সম্পূর্ণ সংগতিপূর্ণ। কিন্তু পাশ্চাত্য লেখকগণ বাইবেল ও বাইবেল ভিত্তিক ধর্মীয় সাহিত্যের ভিত্তিতে নবী-রাসূলগণের মূল্যায়ন করিতে গিয়া তাঁহাদেরকে সাধারণ মানুষের পর্যায়ে নামাইয়া আনিয়াছেন এবং কোন কোন স্থানে নিকৃষ্টভাবে চিত্রিত করিয়াছেন। বর্তমান কালের পাশ্চাত্য লেখকদের রচিত বিশ্বকোষসমূহেও তাহাদের এইরূপ আলোচনা লক্ষ্য করা যায়। একটি বিশ্বকোষে হযরত দাউদ (আ)-এর একটি কল্পিত বিবস্ত্র মূর্তিও স্থান পাইয়াছে (তু. Encyclopaedia of World Biograpy, vol. 3, p. 284-5; Ency. Britannica, vol. 5, p. 517-19; Encyclopedia of Religion, vol. 4, p. 242-45; Encylopedia Americana, vol. 8, p. 526-27)।
একমাত্র কুরআন মজীদই নবী-রাসূলগণের ভাবমূর্তি স্বচ্ছ ও কলুষমুক্ত রাখিয়াছে, তাঁহাদের প্রকৃত মাহাত্ম ও মর্যাদা সম্পর্কে বিশ্ববাসীকে পরিচিত করিয়াছে। কুরআন মজীদ নাযিল না হইলে তাঁহাদেরকে নবী-রাসূল মান্য করা তো দূরের কথা, সম্মানের সহিত তাঁহাদের নামও উচ্চারিত হইত না। কুরআন ইয়াহুদী খৃস্টানদের দাউদ (আ) সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা সংশোধন করিয়া বলে যে, তিনি ছিলেন একজন মহান নবী এবং আল্লাহ তাঁহাকে অত্যন্ত উচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করিয়াছেন। হযরত ইবরাহীম (আ)-এর বংশধরের বর্ণনা প্রসঙ্গে দাউদ ও সুলায়মান (আ)-এর উল্লেখ করিয়া কুরআন মজীদ বলেন:
"আমি এভাবেই সৎকর্মপরায়ণদেরকে পুরষ্কৃত করি" (৬:৮৪)। وَكَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ
"তাহাদের সকলেই সৎকর্মপরায়ণ" (৬:৮৫)। كُلٌّ مِّنَ الصَّلِحِينَ
"এবং (তাহাদের) প্রত্যেককে আমি বিশ্ববাসীর উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করিয়াছি” (৬:৮৬)। وَكُلاً فَضَّلْنَا عَلَى العُلَمِينَ.
"আমি তাহাদেরকে মনোনীত করিয়াছিলাম এবং সরল পথে পরিচালিত করিয়াছিলাম" (৬:৮৭)। وَاجْتَبَيْنَهُمْ وَهَدَيْنَهُمْ إِلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ.
أولئِكَ الَّذِيْنَ أَتَيْنُهُمُ الْكِتَبَ وَالْحُكْمَ وَالنُّبُوَّةَ "আমি তাহাদেরকে কিতাব, কর্তৃত্ব ও নবুওয়াত দান করিয়াছি" (৬:৮৯)। أولئك الذين هَدَى اللهُ فَبِهُدَى هُمُ اقْتَدِهِ : "তাহাদিগকে আল্লাহ সৎপথে পরিচালিত করিয়াছেন। অতএব তুমি তাহাদের পথের অনুসরণ কর" (৬:৯০)।