📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আল-কুরআনে আল-ইয়াসা' (আ) প্রসঙ্গ

📄 আল-কুরআনে আল-ইয়াসা' (আ) প্রসঙ্গ


আল-কুরআনে আল-য়াসা' (আ)-এর প্রসঙ্গ অতি সংক্ষেপে আলোচনা করা হইয়াছে। তাঁহাকে কিভাবে কখন কাহাদের প্রতি প্রেরণ করা হইয়াছিল ইত্যাদির মোটেই আলোচনা নাই। তবে আল্লাহ তা'আলা তাঁহার কথা অন্যান্য নবীগণের (আ) সহিত আলোচনা করিয়াছেন। ইরশাদ হইয়াছে:
وَإِسْمَاعِيلَ وَالْيَسَعَ وَيُونُسَ وَلُوطًا وَكُلًّا فَضَّلْنَا عَلَى الْعَالَمِينَ ،
"আরও সৎপথে পরিচালিত করিয়াছিলাম ইসমাঈল, আল-য়াসা', ইউনুস ও লুতকে; এবং শ্রেষ্ঠত্ব দান করিয়াছিলাম বিশ্বজগতের উপর প্রত্যেককে" (৬: ৮৬)।
وَاذْكُرْ إِسْمَاعِيلَ وَالْيَسَعَ وَذَا الْكِفْلِ وَكُلٌّ مِّنَ الأَخْيَارِ .
"স্মরণ কর ইসমাঈল, আল-য়াসা' ও যুল-কিফলের কথা, ইহারা প্রত্যেকেই ছিল সজ্জন" (৩৮: ৪৮)। প্রথমোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় সায়্যিদ আলুসী বলেন,
وَكُلًّا فَضَّلْنَا عَلَى الْعَالَمِينَ .
ইহার অর্থ হইল প্রত্যেককে নবুওয়ত দানের মাধ্যমে সমকালীন বিশ্বে শ্রেষ্ঠত্ব দান করিয়াছিলাম। ইহাতে এই কথার দলীল রহিয়াছে যে, নবীগণের মর্যাদা ফেরেশতাগণেরও ঊর্ধ্বে।
দ্বিতীয় আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা কুরতুবী বলেন, প্রত্যেককে নবুওয়তের জন্য মনোনীত করা হইয়াছে। অপরদিকে সায়্যিদ আলুসী বলেন, كُلِّ مِّنَ الْأَخْيَارِ এই বাক্যাংশের অর্থ হইল المشهورين بالخيرية "ইহারা সজ্জন ছিল বলিয়া প্রসিদ্ধ ছিল"।

টিকাঃ
রূহুল মাআনী, ৭খ., ২১৪
আল-জামি'লি-আহকামিল কুরআন, ৭খ., ৩২
রূহুল মাআনী, প্রাগুক্ত, ২৩খ., ২১১

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সংকট প্রচার

📄 সংকট প্রচার


আনওয়ারে আম্বিয়া গ্রন্থে বলা হইয়াছে যে, হযরত আল-য়াসা' (আ)-এর নবুওয়ত লাভের ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, পুণ্যবানদের সংস্পর্শ যে কোন মানুষের উন্নতি ও কৃতকার্যতার মহান সোপান। হযরত ইলয়াস (আ) কৃষি খামার দিয়া যাত্রা করিতেছিলেন। খামারের স্বত্বাধিকারী হাল চাষ করিতেছিল। ইলয়াস (আ)-কে দেখিয়া সে দৌড়াইয়া তাঁহার সহিত চলিতেছিল। তিনি অবাক বিস্ময়ে লোকটিকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি এইভাবে কেন আসিতেছ? কৃষিকর্মের মালিক ইত্যবসরে স্বীয় কর্মের গরুটি লইয়া আসিল এবং উহাকে যবেহ করিয়া গরুটি রান্না করিল এবং আল্লাহুর নামে সকলকে ভক্ষণ করাইল। ইলয়াস (আ) তাহার খোদাভক্তি দেখিয়া তাহার উপর অত্যন্ত খুশী হইলেন। লোকটি হযরত ইলয়াস (আ)-এর খাদেম হইবার বাসনা প্রকাশ করিলে তিনি তাহাকে বরণ করিয়া লইলেন। এই মহৎপ্রাণ ব্যক্তিটিইি ছিলেন আল-য়াসা' (আ)।
হযরত ইলয়াস (আ)-এর ওফাতের সময় নিকটবর্তী হইলে তিনি আল-য়াসা'-কে বিদায় করিয়া দিবার মনস্থ করিলেন। কিন্তু তিনিতো কোনভাবেই ছাড়িয়া যাইতে চাহেন না। ইলয়াস (আ) তাহাকে বলিলেন, কোন মনোবাঞ্ছা থাকিলে বল। তিনি বলিলেন, আমার বাসনা হইল আপনার উপর যেই পবিত্র বরকত অবতীর্ণ হয় তাহা যেন আমার উপরও অবতীর্ণ হয়। ইহার ফলে ইলয়াস (আ) তাহাকে স্বীয় খলীফা নিযুক্ত করিয়া লইলেন। মাওলানা রুমী কতইনা সুন্দর কথা বলিয়াছেনঃ يك زمانه صحبت با اولیاء + بهتر از صد سال طاعت بے ریا . "একটি মুহূর্ত ওলীগণের সংস্পর্শে থাকা শত বর্ষের প্রদর্শনীমুক্ত ইবাদত হইতে উত্তম"।

টিকাঃ
আনওয়ারে আম্বিয়া, ৩০৪ পৃ.

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আল-ইয়াসা' (আ)-কে সঙ্গে লইয়া ইলয়াস (আ)-এর দু'আ

📄 আল-ইয়াসা' (আ)-কে সঙ্গে লইয়া ইলয়াস (আ)-এর দু'আ


আল্লাহ্ তা'আলা ইলয়াস (আ)-এর প্রতি এই মর্মে ওয়াহয়ি পাঠাইলেন যে, তোমার অবাধ্যতা একমাত্র বনী ইসরাঈলরা করিতেছে। ইহাদের অবাধ্যতার কারণে তুমি বৃষ্টি আটকাইয়া দিয়াছ। ইহার ফলে পশু-পাখি, কীট-পতঙ্গ, বৃক্ষ, লতাপাতা ধরনের জগতের অসংখ্য সৃষ্টি ধ্বংসের মুখে পতিত হইতেছে। আল্লাহ এই কথা শুনিয়া ইলয়াস (আ) অত্যন্ত বিনম্র হইয়া গেলেন। কথিত আছে যে, ইলয়াস (আ) তাৎক্ষণিকভাবে বলিয়া উঠিলেন, হে আমার রব! আমাকে অনুমতি দিন, আমিই তাহাদের জন্য দু'আপ্রার্থী হইব। তাহারা অনাবৃষ্টির ফলে যেই দুর্ভোগ পোহাইতেছে তাহা হইতে নিষ্কৃতি লাভ করিয়া স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়া আসিবে, অতঃপর আশা করা যায় তাহারা তুমি ছাড়া অন্য যাহাদের উপাসনা করিতেছে তাহা হইতে প্রত্যাবর্তন করিবে। তিনি অনুমতি লাভ করিবার পর বনী ইসরাঈলের নিকট চলিয়া গিয়া বলিলেন, আহা কি যে সর্বনাশী খেলায় তোমরা মতিয়া উঠিয়াছ! ক্ষুধা-তৃষ্ণার জ্বালায় ধুকিয়া ধুকিয়া মৃত্যুকে আলিঙ্গন করিতেছ। হায়! তোমাদের কৃতকর্মের ফলে পশু-পাখি, জীব-জন্তু, গাছ-পালা, লতা-পাতা অনাবৃষ্টির ফলে ধ্বংস হইতেছে। তোমরা তাহা হইলে আমার সঙ্গে এই প্রতিমাগুলিকে লইয়া মাঠে অবতরণ কর। যদি তাহাদের দু'আ কবুল হয় তাহা হইলে তো তাহাদের সত্যতা সম্পর্কে কোন কথাই নাই। আর যদি ইহারা তোমাদের কথামত কিছুই দিতে সক্ষম না হয় তাহা হইলে ইহাদেরকে বাতিল বলিয়া জ্ঞান করিবে। ইহার পর আমি তোমাদের জন্য দু'আ করিব। আমার দু'আর ফলে তোমাদের সংকট মোচন হইবে বলিয়া আমি আশাবাদী। তাহারা বলিল, আপনি সত্য কথা বলিয়াছেন। অতঃপর তাহারা তাহাদের প্রতিমাগুলি লইয়া বাহির হইল। উহাদের লইয়া দু'আ করিল কিন্তু তাহাদের দু'আ কবুল হইল না, অনাবৃষ্টি জনিত সংকট হইতে মুক্তি পাইল না। তাহারা ইলয়াস (আ)-কে অনুরোধ করিয়া বলিল, হে ইলয়াস! আল্লাহ্ দরবারে আমাদের জন্য দু'আ করুন। ইলয়াস (আ) তাহাতে সাড়া দিয়া আল-য়াসা' (আ)-কে সঙ্গে লইয়া আল্লাহর দরবারে দু'আ করিলেন। অনাবৃষ্টি জনিত দুর্ভোগ লাঘব করিবার জন্য ঢাল সদৃশ এক খণ্ড মেঘ সমুদ্রের উপর ছায়াপাত করিল। তাহারা ইহা প্রত্যক্ষ করিল। মেঘখণ্ডটি তাহাদের দিকে ধাবিত হইয়া তাহাদের উপর বর্ষিত হইল। ইহাতে তাহাদের সমগ্র আবাস ভূমিসিঞ্চিত হইল। তাহাদের উপর এই পরিমাণ বারিপাত হইয়াছিল যে, ইহার ফলে অনেক দালান ধ্বসিয়া পড়িয়া গিয়াছিল। অতঃপর তাহারা আল্লাহর নবী ইলয়াস (আ)-এর নিকট দালানকোঠা ধ্বসিয়া পড়ার এবং বীজ না থাকার অভিযোগ পেশ করিল। বলিল, আমাদের নিকট চাষাবাদ করিবার উপযোগী কোন শস্যদানা নাই। তখন আল্লাহ তা'আলা ইলয়াস (আ)-এর নিকট ওয়াহয়ি পাঠাইলেন যে, তাহারা যেন জমিতে লবণ ছিটাইয়া দেয়। তাহারা ওয়াহয়ির আদেশ মুতাবিক তাহা করিল। ইহার ফলে তাহাদের জন্য বুট উৎপন্ন হইল। বালি ছিটাইয়া দিবার আদেশ করা হইলে তাহারা তাহা করিল। ইহার ফলে তাহাদের জন্য চারাগাছ উৎপন্ন হইল। এইভাবে মহান আল্লাহ বনী ইসরাঈলের সংকট মোচন করিয়া দিবার পর তাহারা ওয়াদা ভঙ্গ করিল। কুফরী হইতে ফিরিল না, বরং পূর্ব হইতে আরও অধিক মাত্রায় গোমরাহিতে লিপ্ত হইল। ইলয়াস (আ) ইহা দেখিয়া আল্লাহর দরবারে এখান হইতে চলিয়া যাইবার দু'আ করিলেন। তাঁহার নিকট ওয়াহয়ি আসিল, তুমি অমুক অমুক দিন পর্যন্ত অপেক্ষা কর, আর অমুক দিবসে অমুক স্থানে বাহির হইয়া পড়িও। যখন তোমার নিকট কোন জিনিস আসিতে দেখিবে তখন তুমি উহার উপর সওয়ার হইয়া যাইবে। ইহাতে ভীত হইবে না।
কথামত ইলয়াস (আ) বাহির হইলেন। তাঁহার সহিত আল-য়াসা' ইব্‌ন আখতুব (আ)-ও বাহির হইলেন। নির্দেশিত স্থানে যখন তাঁহারা উপনীত হইলেন তখন আগুনের একটি অশ্বকে তাহাদের দিকে ধাবিত হইতে দেখিলেন। অশ্বটি ইলয়াস (আ)-এর সামনে অবস্থান করিল। তিনি দ্রুত উহার উপর সওয়ার হইলেন। তাঁহাকে লইয়া অশ্বটি যাত্রারম্ভ করিলে আল-য়াসা' (আ) তাঁহাকে ডাকিয়া বলিলেন, হে ইলয়াস! আমাকে কী নির্দেশ দিয়া যাত্রা করিতেছেন? এই সময় আল-য়াসা' (আ)-এর উপর খোলা আকাশ হইতে ইলয়াস (আ)-এর চাদরটি নিক্ষিপ্ত হইল। ইহাই ছিল ইলয়াস (আ)-এর অন্তিম যাত্রা। তাঁহাকে বনী ইসরাঈল সম্প্রদায় হইতে উঠাইয়া লওয়া হইয়াছিল। পানাহার গ্রহণের চাহিদা তাঁহার হইতে দূর করা হইয়াছিল। তাঁহাকে পালকযুক্ত কাপড় পরানো হইয়াছিল। তিনি নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলে মানব ফেরেশতারূপে গণ্য হইয়া গেলেন। ইলয়াস (আ)-কে তুলিয়া লইবার পর আল্লাহ তা'আলা স্বীয় করুণা দ্বারা আল-য়াসা' (আ)-কে নবুওয়ত দান করিলেন। বনী ইসরাঈলের নবী ও রাসূল হিসাবে তাঁহাকে নিযুক্ত করা হইল। তাঁহার নিকট ওয়াহয়ি আসিতে লাগিল। মহান আল্লাহ তাঁহার বান্দা ইলয়াস (আ)-কে যেইভাবে স্থানে স্থানে সব সময় সাহায্য করিয়াছিলেন সেইভাবে তাঁকেও সাহায্য করিতেন। বনী ইসরাঈল সম্প্রদায় তাঁহার আনুগত্য স্বীকার করিয়া লইল। তাঁহার উপর ঈমান আনিল। তাহারা তাঁহাকে খুবই ভক্তি করিত। তাঁহার আদেশ-নিষেধকে মাথা পাতিয়া গ্রহণ করিত। বনী ইসরাঈল হইতে আল-য়াসা' (আ)-এর পৃথক হইবার পূর্ব পর্যন্ত আল্লাহ্র আদেশ তাহাদের মধ্যে অটুট ছিল।

টিকাঃ
ছা'লাবী, কাসাসুল আমবিয়া, ২৭৮ পৃ.)

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আল-ইয়াসা' (আ)-এর নবুওয়াত লাভকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষিত

📄 আল-ইয়াসা' (আ)-এর নবুওয়াত লাভকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষিত


তাওরাত গ্রন্থের আলোকে তাঁহার নবুওয়ত লাভের সময় ইসরাঈলের অধিপতি ছিলেন যূরাম (ইউরাম), শাসনকাল অনুমানিক খৃষ্টপূর্ব ৮৪৫ হইতে ৮৩৪। ইয়াহুদার রাজা ছিলেন আকযিয়াহ (আখযিয়াহ), শাসনকাল আনুমানিক ৮৩৮ হইতে ৮৩৪ খৃষ্টপূর্ব। তাঁহার ইন্তিকালের সময় য়াহুদার অধিপতিগণের মধ্যে যুওয়াসের রাজত্বকাল ছিল। শাসনকাল অনুমানিক ৮২৯ হইতে ৭৯০ খৃস্টপূর্ব। তাওরাতের বিবরণসমূহ হইতে অনুমেয়, আরামীদের সংগে যুদ্ধের সময় তিনি অত্যন্ত কঠিন ও বিপদ-সংকুল দিনগুলোতে বনী ইসরাঈলকে সাহায্য করিয়াছিলেন এবং তাহাদেরকে উৎসাহ প্রদান করিয়াছিলেন। কিন্তু এই সকল ঘটনার কেবল গুটিকতক ঘটনা ইতহিাস সমর্থিত। তাওরাতের অধ্যয়নে যেইভাবে ইলয়াস (আ)-এর ধর্মের সুস্পষ্ট কোন চিত্র আমাদের মধ্যে প্রস্ফুটিত হয় না সেইরূপ অবস্থা আল-য়াসা' (আ)-র ধর্মের। 'হিব্রু ইলীশা' শব্দের অর্থ হইল "আল্লাহ্র অনুগ্রহে মুক্তিপ্রাপ্ত"।

টিকাঃ
উরদূ দাইরায়ে মাআরিফে ইসলামিয়া, লাহোর ১৩৮৮ হি,/১৯৬৮ খৃ., ২১৪-২১৫ পৃ.)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00