📄 বংশপরিচয়
আল্লামা ইব্ন কাছীর তাঁহার ইতিহাস গ্রন্থে লিখিয়াছেন, মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক বলিয়াছেন, আল-য়াসা' (আ) হইলেন আখতৃবের পুত্র। অতঃপর ইন্ন কাছীর বলেন, হাফিজ আবুল কাসিম ইব্ন আসাকির তাঁহার আরবী বর্ণমালা অনুসারে বিন্যাসিত ইতিহাস গ্রন্থের )الیاس( বর্ণমালার অধীনে আল-য়াসা' (আ)-এর বংশতালিকা এইরূপ দিয়াছেন: আল-য়াসা' হইলেন আল-ইসবাত ইন্ন আদী ইব্ন শাওতালম ইব্ন আফরাছীম ইবন ইউসুফ ইব্ন ইয়া'কূব ইবন ইসহাক ইব্ ইবরাহীম খলীল (আ)। বলা হয়, আল-য়াসা' (আ) ছিলেন ইলয়াস (আ)-এর চাচাত ভাই। ডঃ সায়্যিদ তানতাবী বলেন, তাঁহার পিতার নাম ছিল শাফাত। আল্লামা কুরতবী বলেন, একদল লোকের ধারণা হইল আল-য়াসা' (আ)-ই হইলেন ইলয়াস (আ)। এই অভিমত যথার্থ নয়। কারণ আল্লাহ তা'আলা তাঁহাদের কথা পৃথক পৃথকভাবে উল্লেখ করিয়াছেন। আল্লামা সায়্যিদ আলুসী আল-বাগদাদী বলেন, ইব্ন জারীর বলিয়াছেন, আল-য়াসা' (আ) হইলেন আখতৃবের পুত্র আর আখতুব হইলেন আল-আজুষের পুত্র। আল্লামা হিফযুর রহমান সিউহারূবী বলেন, আল-য়াসা' (আ) যে আখতৃবের পুত্র এই কথাটি ওয়াহ্হ্ব ইব্ন মুনাব্বিহ (র) বর্ণিত ইসরাঈলী সূত্র হইতে গৃহীত। হিফযুর রাহমান সিউহারূবী আরও বলেন, যদি তাওরাত গ্রন্থে বর্ণিত য়াস'ইয়া (يسعياه) নবী এবং হযরত আল-য়াসা' (আ) একই ব্যক্তি হইয়া থাকেন তাহা হইলে তাওরাত গ্রন্থে তাঁহাকে আমূসের পূত্র বলা হইয়াছে। আল্লামা কুরতুবী আরও বলেন, কতক লোক মনে করেন, ইলয়াস এবং আল-খিদর (আ) একই ব্যক্ত ছিলেন। তবে অপর কতক লোক এই অভিমতকে প্রত্যাখ্যান করিয়া বলিয়াছেন, আল-য়াসা' (আ)-ই হইলেন আল-খিদর। মাওলানা আবুল আলা মাওদূদী বলেন, আল-য়াসা' (আ) বনী ইসরাঈলের শীর্ষস্থানীয় নবীগণের একজন ছিলেন। তিনি জর্দান নদীর উপকূলস্থিত আবীল মেহুলা (ABEL MEHOLAG) নামক স্থানের অধিবাসী ছিলেন। ইয়াহুদী ও খৃষ্টান জগৎ তাহাকে ইলীশা (ELISHA) নামে উল্লেখ করিয়া থাকে। ইব্ন কাছীর আরও বলেন, বলা হয় আল-য়াসা' (আ) ছিলেন সেই ব্যক্তি যাহাকে যুল-কিফল (আ) এইরূপ নিশ্চয়তা দিয়াছিলেন যে, যদি তিনি তওবা করিয়া আল্লাহর পথে ফিরিয়া আসেন তাহা হইলে তিনি জান্নাতে প্রবেশ করিবেন- এই কিফালত বা নিশ্চয়তা দানের জন্যই তাঁহাকে যুল-কিফল (নিশ্চয়তা দানের অধিকারী) বলিয়া ডাকা হইত।
টিকাঃ
ইব্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, মিসর ১৪০৮ হি. / ১৯৮৮ খৃ., ২খ., ৫
আত-তাফসীরুল ওয়াসীত, মিসর ১৪০৩ হি. / ১৯৮৩ খৃ., ৫খ., ১৬৫
আল-কুরতুবী, আল-জামি'লি, আহকামিল কুরআন, প্রাগুক্ত
কুরতুবী, প্রাগুক্ত, ৭খ., ৩২-৩৩
হিফযুর রাহমান সিউহারূবী, কাসাসুল কুরআন, দিল্লী ১৪০০ হি. / ১৯৮০ খৃ., ২খ., ৩৫
আল-কুরতুবী, আল-জমি'লি আহকামিল কুরআন, প্রাগুক্ত
তাফহীমুল কুরআন, সপ্তম সংস্করণ দিল্লী, ১৯৮২ খৃ., ৪খ., ৩৪৪
আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, প্রাগুক্ত
📄 নবুওয়াত লাভ
আল-য়াসা' (আ)-এর সঠিক পরিচয় উদঘাটনে যতই মতানৈক্য থাকেনা কেন এই ব্যাপারে অবশ্য সকল ইতিহাসবিদ ও আল-কুরআনের ভাষ্যকার প্রায় ঐকমত্য পোষণ করিয়াছেন যে, তিনি হযরত ইলয়াস (আ)-এর শিষ্য ছিলেন এবং তাঁহার উর্ধ্বারোহণের পরবর্তী সময়ে তিনি নবুওয়াত লাভ করিয়াছিলেন। আল্লামা ইব্ন্ন কাছীর বলেনঃ কথিত আছে, হযরত ইলয়াস (আ) যখন কাসিয়ূন (দিমাশক নগরীর পার্শ্বস্থিত একটি পাহাড়, ইয়াকৃত আল-হামাবী, মু'জামুল বুলদান, বৈরূত তা. বি., ৪ খ., ২৯৫) পাহাড়ে সঙ্গোপণে অবস্থান করিতেছিলেন, তখন আল-য়াসা' (আ) তাঁহার সহযাত্রী ছিলেন। তখন ছিল বা'লাবাক্ক নামক বাদশাহের রাজত্বকাল। অতঃপর হযরত ইলয়াস (আ)-কে উর্ধ্বলোকে তুলিয়া লওয়া হইল। তিনি হযরত আল-য়াসা' (আ)-কে তাঁহার উম্মতের জন্য প্রতিনিধি হিসাবে মনোনীত করেন। ইহার পর মহান আল্লাহ তাঁহাকে নবুওয়ত প্রদান করেন। এই তথ্য প্রদান করিয়াছেন আবদুল মুনইম তাঁহার পিতা ইদরীস সূত্রে তিনি ওয়াহ্হ্ ইব্ন মুনাব্বিহ সূত্রে। ইবনুল আছীর আল-জাযারী বলেন, হযরত ইলয়াস (আ) যখন প্রত্যক্ষ করিলেন, বনী ইসরাঈল জাতি কুফরী ও জুলুম পরিহার করিতেছে না, তখন তিনি তাহাদের উদ্দেশে বদদু'আ করিলেন। ইহার ফলে আল্লাহ তা'আলা তাহাদেরকে তিন বৎসর পর্যন্ত অনাবৃষ্টির ক্লেশে আবদ্ধ রাখিলেন। ইহাতে তাহাদের গৃহপালিত প্রাণী, পশু-পক্ষী, তরুলতা ও গাছপালা ধ্বংস হইতে লাগিল। লোকজন অবর্ণনীয় দুর্ভোগে পতিত হইল। দুঃখ-কষ্টে মুহ্যমান বনী ইসরাঈলের সম্ভাব্য নির্যাতনের আশংকায় হযরত ইলয়াস (আ) নির্জনে চলিয়া গেলেন। এই নির্জন বাসস্থানে তাঁহার নিকট তাঁহার খাবার আসিত। অতঃপর একদা রাত্রে তিনি বনী ইসরাঈলের জনৈক মহিলার নিকট আশ্রয় গ্রহণ করিলেন। তাহার ছিল একটি পুত্র সন্তান, যাহাকে আল-য়াসা' ইব্ন আখতৃব বলিয়া অভিহিত করা হইত। সে ছিল কঠিন রোগে আক্রান্ত। ইলয়াস (আ) তাহার জন্য দু'আ করিলেন। ফলে সে আরোগ্য লাভ করিল। পরিণামে সে ইলয়াস (আ)-এর অনুসারী হইয়া গেল এবং তাঁহাকে সত্য বলিয়া স্বীকৃতি দিয়া তাঁহার শিষ্যত্ব গ্রহণ করিল। মাওলানা আবুল আলা মাওদূদী বলেন, হযরত ইলয়াস (আ) যেই যুগে সীনাই উপদ্বীপে অবস্থানরত ছিলেন তখন তাঁহাকে কিছু অতীব গুরুত্বপূর্ণ কাজের নিমিত্ত সিরিয়া ও ফিলিস্তীনে প্রত্যাগমনের নির্দেশ দেওয়া হইয়াছিল। এই গুরুত্বপূর্ণ কার্যাবলীর মধ্যে একটি ছিল হযরত আল-য়াসা' (আ)-কে তাঁহার স্থলাভিষিক্তির জন্য প্রস্তুত করা। নির্দেশানুযায়ী ইলয়াস (আ) তথায় উপনীত হইয়া আল-য়াসা' (আ)-কে হালচাষ করিতে দেখিলেন। তাঁহার সম্মুখে ছিল বার জোড়া বলদ এবং তিনি নিজেই দ্বাদশতম জোড়ার হালগুলোকে হাঁকাইতেছিলেন। হযরত ইলয়াস (আ) তাঁহার পাশ দিয়া অতিক্রম করিবার সময় তাঁহার উপর স্বীয় চাদর ফেলিয়া দিলেন। ফলে আল-য়াসা' (আ) কৃষিকাজ ছাড়িয়া তাঁহার সঙ্গী হইয়া গেলেন। আনুমানিক দশ কিংবা বার বৎসর তিনি ইলয়াস (আ)-এর নিকট দীক্ষা গ্রহণ করিতে থাকিলেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে উর্ধ্বজগতে তুলিয়া লইলে আল-য়াসা' (আ) তাঁহার স্থলাভিষিক্ত নিযুক্ত হইলেন। খৃস্টান বিশ্বকোষ প্রণেতা আল-মুআল্লিম বুতরুস আল-বুসতানী আল-য়াসা' (আ)-কে ইলীশা (ELISHA) বলিয়া দাইরাতুল মাআরিফে উল্লেখ করিয়াছেন। অতঃপর তিনি বলেন, ইলীশা একজন ইবরানী নবী ছিলেন। নবী ইলয়াস (আ)-এর আলয়াসা'-এর সহিত সাক্ষাত করিবার ঘটনাটি ইতোপূর্বে তাফহীমুল কুরআনের উদ্ধৃতিতে যেইভাবে উল্লেখ করা হইয়াছে সেইরূপ বিবরণ বুতরুস আল-বুসতানীও বিবৃত করিয়াছেন। তবে আল-বুসতানীর বিবরণে রহিয়াছে, ইলিয়্যা (ইলয়াস আ)-কে ইয়াহুদী ও খৃস্টান জগৎ এই নামে উল্লেখ করে) তাহার সহিত সাক্ষাত করিয়া তাঁহাকে নবুওয়তের দায়িত্ব গ্রহণের আহ্বান জানাইতেছিলেন। অতঃপর ইলিয়্যা-কে ভূমণ্ডল হইতে উঠাইয়া লওয়া হইলে ইলীশা তাহার চাদরটি গ্রহণ করেন। অতঃপর নবীগণের যেই সকল পুত্র আরীহার অধিবাসী ছিল তাহারা ইলীশা-কে ইলিয়্যার মত চেহারার অধিকারী দেখিতে পাইল। তাহারা বলাবলি করিতে লাগিল, ইলিয়্যার আত্মা ইলীশা'র মধ্যে প্রবিষ্ট হইয়াছে। তাহারা তাঁহার সহিত সাক্ষাত করিতে আসিত এবং তাঁহার সম্মানার্থে মস্তক অবনত করিয়া তাঁহার সম্মুখে দাঁড়াইয়া থাকিত।
টিকাঃ
ইব্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, মিসর ১৯৮৮ খৃ., ২খ., ৫
আল-কামিল ফিত-তারীখ, প্রথম সংস্করণ বৈরূত ১৪০৭ হি. / ১৯৮৭ খৃ., ১খ. ১৬২
তাফহীমুল কুরআন, দিল্লী ১৯৮২ খৃ. ৪খ., ৩৪৪
দাইরাতুল মাআরিফ, বৈরূত, তা. বি., ৪খ., ৩৩৫
📄 আল-কুরআনে আল-ইয়াসা' (আ) প্রসঙ্গ
আল-কুরআনে আল-য়াসা' (আ)-এর প্রসঙ্গ অতি সংক্ষেপে আলোচনা করা হইয়াছে। তাঁহাকে কিভাবে কখন কাহাদের প্রতি প্রেরণ করা হইয়াছিল ইত্যাদির মোটেই আলোচনা নাই। তবে আল্লাহ তা'আলা তাঁহার কথা অন্যান্য নবীগণের (আ) সহিত আলোচনা করিয়াছেন। ইরশাদ হইয়াছে:
وَإِسْمَاعِيلَ وَالْيَسَعَ وَيُونُسَ وَلُوطًا وَكُلًّا فَضَّلْنَا عَلَى الْعَالَمِينَ ،
"আরও সৎপথে পরিচালিত করিয়াছিলাম ইসমাঈল, আল-য়াসা', ইউনুস ও লুতকে; এবং শ্রেষ্ঠত্ব দান করিয়াছিলাম বিশ্বজগতের উপর প্রত্যেককে" (৬: ৮৬)।
وَاذْكُرْ إِسْمَاعِيلَ وَالْيَسَعَ وَذَا الْكِفْلِ وَكُلٌّ مِّنَ الأَخْيَارِ .
"স্মরণ কর ইসমাঈল, আল-য়াসা' ও যুল-কিফলের কথা, ইহারা প্রত্যেকেই ছিল সজ্জন" (৩৮: ৪৮)। প্রথমোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় সায়্যিদ আলুসী বলেন,
وَكُلًّا فَضَّلْنَا عَلَى الْعَالَمِينَ .
ইহার অর্থ হইল প্রত্যেককে নবুওয়ত দানের মাধ্যমে সমকালীন বিশ্বে শ্রেষ্ঠত্ব দান করিয়াছিলাম। ইহাতে এই কথার দলীল রহিয়াছে যে, নবীগণের মর্যাদা ফেরেশতাগণেরও ঊর্ধ্বে।
দ্বিতীয় আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা কুরতুবী বলেন, প্রত্যেককে নবুওয়তের জন্য মনোনীত করা হইয়াছে। অপরদিকে সায়্যিদ আলুসী বলেন, كُلِّ مِّنَ الْأَخْيَارِ এই বাক্যাংশের অর্থ হইল المشهورين بالخيرية "ইহারা সজ্জন ছিল বলিয়া প্রসিদ্ধ ছিল"।
টিকাঃ
রূহুল মাআনী, ৭খ., ২১৪
আল-জামি'লি-আহকামিল কুরআন, ৭খ., ৩২
রূহুল মাআনী, প্রাগুক্ত, ২৩খ., ২১১
📄 সংকট প্রচার
আনওয়ারে আম্বিয়া গ্রন্থে বলা হইয়াছে যে, হযরত আল-য়াসা' (আ)-এর নবুওয়ত লাভের ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, পুণ্যবানদের সংস্পর্শ যে কোন মানুষের উন্নতি ও কৃতকার্যতার মহান সোপান। হযরত ইলয়াস (আ) কৃষি খামার দিয়া যাত্রা করিতেছিলেন। খামারের স্বত্বাধিকারী হাল চাষ করিতেছিল। ইলয়াস (আ)-কে দেখিয়া সে দৌড়াইয়া তাঁহার সহিত চলিতেছিল। তিনি অবাক বিস্ময়ে লোকটিকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি এইভাবে কেন আসিতেছ? কৃষিকর্মের মালিক ইত্যবসরে স্বীয় কর্মের গরুটি লইয়া আসিল এবং উহাকে যবেহ করিয়া গরুটি রান্না করিল এবং আল্লাহুর নামে সকলকে ভক্ষণ করাইল। ইলয়াস (আ) তাহার খোদাভক্তি দেখিয়া তাহার উপর অত্যন্ত খুশী হইলেন। লোকটি হযরত ইলয়াস (আ)-এর খাদেম হইবার বাসনা প্রকাশ করিলে তিনি তাহাকে বরণ করিয়া লইলেন। এই মহৎপ্রাণ ব্যক্তিটিইি ছিলেন আল-য়াসা' (আ)।
হযরত ইলয়াস (আ)-এর ওফাতের সময় নিকটবর্তী হইলে তিনি আল-য়াসা'-কে বিদায় করিয়া দিবার মনস্থ করিলেন। কিন্তু তিনিতো কোনভাবেই ছাড়িয়া যাইতে চাহেন না। ইলয়াস (আ) তাহাকে বলিলেন, কোন মনোবাঞ্ছা থাকিলে বল। তিনি বলিলেন, আমার বাসনা হইল আপনার উপর যেই পবিত্র বরকত অবতীর্ণ হয় তাহা যেন আমার উপরও অবতীর্ণ হয়। ইহার ফলে ইলয়াস (আ) তাহাকে স্বীয় খলীফা নিযুক্ত করিয়া লইলেন। মাওলানা রুমী কতইনা সুন্দর কথা বলিয়াছেনঃ يك زمانه صحبت با اولیاء + بهتر از صد سال طاعت بے ریا . "একটি মুহূর্ত ওলীগণের সংস্পর্শে থাকা শত বর্ষের প্রদর্শনীমুক্ত ইবাদত হইতে উত্তম"।
টিকাঃ
আনওয়ারে আম্বিয়া, ৩০৪ পৃ.