📄 তালূত ও জালূতের যুদ্ধ
তৃতীয় খণ্ডে দাউদ (আ) নিবন্ধ দ্র.)।
📄 দায়িত্ব ও কার্যক্রম
শামূঈল (আ) সারাদেশে বৎসর ব্যাপিয়া সফর করিয়া দাওয়াত ও হিদায়তের কাজ আনজাম দিতেন। যখন প্রতিশ্রুত সিন্দুক সম্পর্কে তিনি অবহিত হইলেন যে, শত্রু ইহা ছিনাইয়া লইয়াছে, তখন তিনি বনী ইসরাঈলকে সমবেত করিয়া সতর্ক করিয়া বলিয়াছিলেন, ইহা তোমাদেরই কৃতকর্মের ফল, শিরক ও অন্যায়-অনাচারের শাস্তিস্বরূপ তোমাদেরকে ইহা প্রদান করা হইয়াছে। এখনও যদি তোমরা স্বীয় গোমরাহী ও বিপথগামিতা পরিহার কর এবং আল্লাহ্ একত্ববাদে বিশ্বাসী হও তাহা হইলে অচিরেই আল্লাহ্ তা'আলা স্বীয় বিশেষ করুণার দ্বারা তোমাদেরকে আচ্ছাদিত করিয়া লইবেন। তাওরাতে বলা হইয়াছে: পরে শমূয়েল লোকদিগকে কহিলেন, ভয় করিও না, তোমরা এই সমস্ত দুষ্কার্য করিয়াছ বটে কিন্তু কোন মতে সদাপ্রভুর পশ্চাৎ হইতে সরিয়া যাইও না, সমস্ত অন্তঃকরণের সহিত সদাপ্রভুর সেবা কর। সরিয়া যাইও না, গেলে সেই সকল অবস্তুর অনুগামী হইবে, যাহারা অবস্তু বলিয়া উপকার ও উদ্ধার করিতে পারে না। কারণ সদাপ্রভু আপন মহানামের গুণে আপন প্রজাদিগকে ত্যাগ করিবেন না; কেননা তোমাদিগকে আপন প্রজা করিতে সদাপ্রভুর অভিমত হইয়াছে। আর আমিই যে তোমাদের জন্য প্রার্থনা করিতে বিরত হইয়া সদাপ্রভুর বিরুদ্ধে পাপ করিব, তাহা দূরে থাকুক, আমি তোমাদিগকে উত্তম ও সরল পথ শিক্ষা দিব; তোমরা কেবল সদাপ্রভুকে ভয় কর ও সমস্ত অন্তঃকরণের সহিত সত্যে তাঁহার সেবা কর; কেননা দেখ, তিনি তোমাদের জন্য কেমন মহৎ মহৎ কর্ম করিলেন। কিন্তু তোমরা যদি মন্দ আচরণ কর, তবে তোমরা ও তোমাদের রাজা উভয়ে বিনষ্ট হইবে (আম্বিয়ায়ে কুরআন, ৩খ., ২৬; পবিত্র বাইবেল পুরাতন ও নূতন নিয়ম, ১ শামুয়েল, ১২ ২০-২৫, পৃ. ৪৩৫-৪৩৬)।
📄 শামূঈল (আ)-এর স্থায়ী নিবাস
শামূঈল (আ) তাঁহার পূর্বপুরুষদের শহর রামায় স্থায়ীভাবে বসবাস করিতেন। যাবজ্জীবন তিনি বনী ইসরাঈলের মধ্যে নবুওয়াতের দায়িত্ব পালন ও ন্যায়বিচার করিয়াছেন। ইনসাফ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি প্রতি বৎসর দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘুরিয়া বেড়াইতেন। এই সম্পর্কে তাওরাতের বিবরণ নিম্নরূপ: "শামুয়েল যাবজ্জীবন ইস্রায়েলের বিচার করিলেন। তিনি প্রতি বৎসর বৈথেলে, গিলগিলে ও মিসপাতে পরিভ্রমণ করিয়া সেই সকল স্থানে ইস্রায়েলের বিচার করিতেন। পরে তিনি রামাতে ফিরিয়া আসিতেন। কেননা সেই স্থানে তাঁহার বাটী ছিল এবং সেই স্থানে তিনি ইস্রায়েলের বিচার করিতেন; আর তিনি সেই স্থানে সদাপ্রভুর উদ্দেশ্যে এক যজ্ঞবেদি নির্মাণ করেন (আম্বিয়া-ই কুরআন, ৩খ., ২৬; পবিত্র বাইবেল পুরাতন ও নূতন নিয়ম, প্রাগুক্ত, ১ শামূঈল ৭-১৫-১৭)।
📄 উপদেশ ও শিক্ষণীয় বিষয়
হিফজুর রহমান সিউহারূবী শামূঈল (আ), তালুত ও দাউদ (আ) সম্পর্কিত এই ঘটনাবলী হইতে কয়েকটি শিক্ষণীয় বিষয় চয়ন করিয়াছেন। তাহা নিম্নরূপ:
(১) আল্লাহ্ তা'আলা সকল জাতির স্বভাবে এই বৈশিষ্ট্য আমানত রাখিয়াছেন যে, যখন তাহাদের স্বাধীনতা হুমকীর সম্মুখীন হইয়া পড়ে এবং কোন স্বৈরাচারী তাহাদেরকে দাসে রূপান্তরিত করিবার ষড়যন্ত্রে মাঁতিয়া উঠে তখন তাহারা মতানৈক্য পরিহার করিয়া ঐক্য গড়িয়া তোলার প্রচেষ্টা চালায়, এমন একজন নেতার সন্ধানে মনোনিবেশ করে যিনি তাহাদেরকে অধঃপতন হইতে উত্তরণ করিয়া মর্যাদায় দাঁড় করাইতে সক্ষম হন। বানী ইসরাঈল শামৃঈল (আ)-এর নিকট নিম্নোক্ত বাক্য দ্বারা যেই আবেদন করিয়াছিল ইহাই তাহার প্রমাণ:
وَابْعَتْ لَنَا مَلِكًا تُقَاتِلْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ .
"আমাদের জন্য এক রাজা নিযুক্ত কর যাহাতে আমরা আল্লাহ্র রাস্তায় জিহাদ করিতে পারি" (২: ২৪৬)।
(২) স্বাধীনতা ও অধিকার সংরক্ষণের এই অনুভূতি পরিপূর্ণভাবে সকল জাতির নেতৃস্থানীয় মানুষের মধ্যে প্রথমে জাগ্রত হয়, ক্রমে ইহা সাধারণ মানুষের মধ্যে বিস্তৃত হয়। এই ব্যাপারে নেতৃবর্গ যত সচেতন থাকে সেই জাতির সাধারণ মানুষরাও সে অনুপাতে উদ্বুদ্ধ হয়।
(৩) জনসাধারণ নেতাদের অনুপ্রেরণায় সাধারণভাবে উদ্বুদ্ধ হইলেও যখন তাহারা বাস্তব পরিস্থিতির সম্মুখীন হয় তখন তাহাদের অক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতা প্রকাশ পায়। পূর্ণ নিষ্ঠাবান ব্যতিরেকে এহেন বন্ধুর পথে কেহ অগ্রসর হইতে পারে না। এই বিষয়টি আল-কুরআনে এইভাবে ব্যক্ত হইয়াছে:
فَلَمَّا كُتِبَ عَلَيْهِمُ الْقِتَالُ تَوَلَّوْا إِلَّا قَلِيلاً مِّنْهُمْ وَاللَّهُ عَلِيمٌ بِالظَّالِمِينَ .
"অতঃপর যখন তাহাদের প্রতি যুদ্ধের বিধান দেওয়া হইল তখন তাহাদের স্বল্প সংখ্যক ব্যতীত সকলেই পৃষ্ঠ প্রদর্শন করিল। আল্লাহ্ জালিমদের সম্পর্কে সবিশেষ অবহিত” (২ঃ ২৪৬)।
(৪) বিভিন্ন জাতির মধ্যে যেসব কুসংস্কার ও জাহিলী প্রথা গড়িয়া উঠিয়াছিল তাহার মধ্যে ইহাও ছিল যে, নেতৃত্ব ও রাজত্বে একমাত্র সেই ব্যক্তিই সমাসীন হইবে যাহার বিত্ত-বৈভব, খ্যাতি ও বংশীয় মর্যাদা রহিয়াছে। এই কুসংস্কার এতই বিস্তৃত হইয়াছিল যে, সংস্কৃতিবান ও বিবেক-বুদ্ধিসম্পন্ন বুদ্ধিজীবীরাও এইরূপ মনোভাব পোষণ করিত। শিক্ষিত লোকেরা বরং এই ভ্রান্ত প্রথাকে যৌক্তিকতার প্রলেপ দিয়া আরও জোরদার করিয়াছিল। বনী ইসরাঈল সম্প্রদায়ও ইহার ব্যতিক্রম ছিল না। ফলে তাহারা তালুতের রাজপদে অভিষিক্ত হইবার ব্যাপার এই বলিয়া আপত্তি করিয়া বসিলঃ
وَنَحْنُ أَحَقُّ بِالْمُلْكِ مِنْهُ وَلَمْ يُؤْتَ سَعَةً مِّنَ الْمَالِ .
"আমরা তাহার অপেক্ষা রাজত্বের অধিক হকদার এবং তাহাকে প্রচুর ঐশ্বর্ষ দেওয়া হয় নাই" (২: ২৪৭)।
(৫) ইসলাম এই জাহিলী ধারণার বিপরীত এই কথা পরিষ্কারভাবে জানাইয়া দিল যে, হুকুমতও নেতৃত্বের সম্পর্ক বিত্ত-বৈভবের সহিত সম্পৃক্ত নহে। বংশীয় মর্যাদাও ইহার মাপকাঠি নহে বরং জ্ঞান-বুদ্ধি ও শক্তিমত্তাই ইহার পূর্বশর্ত। বনী ইসরাঈলগণ যখন শামূঈল (আ)-এর সম্মুখে তালুত সম্পর্কে নানান আপত্তি উত্থাপন করিল তখন তিনি সঙ্গে সঙ্গে তাহা নাকচ করিয়া দিলেন। আল-কুরআনের ভাষায়:
إِنَّ اللَّهَ اصْطَفُهُ عَلَيْكُمْ وَزَادَهُ بَسْطَةً فِي العِلْمِ وَالْجِسْمِ.
"আল্লাহ অবশ্যই তাহাকে তোমাদের জন্য মনোনীত করিয়াছেন এবং তিনি তাহাকে জ্ঞানে ও দেহে সমৃদ্ধ করিয়াছেন" (২ঃ ২৪৭)।
(৬) হক ও বাতিলের সংঘর্ষকালে হকপন্থীরা পরিপূর্ণরূপে আন্তরিক হইলে এবং নিবেদিত মনে হকের পক্ষে ইস্পাত কঠিনভাবে দাঁড়াইলে হকের বিজয় অবধারিত হয়। ইহাতে হকপন্থীদের সংখ্যাল্পতা ও বাতিলপন্থীদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার কোন মূল্য নাই বরং পূর্ণ তাওয়াক্কুলের সহিত হকপন্থীরা প্রতিরোধে অগ্রসর হইলে সংখ্যা স্বল্পতা সত্ত্বেও তাহাদের বিজয়ের পাল্লা ভারী হইয়া উঠে, সংখ্যাগরিষ্ঠরা তাহাদের নিকট হার মানিতে বাধ্য হয়। এই সত্যই আল-কুরআনে এইভাবে ব্যক্ত হইয়াছেঃ
كَمْ مِنْ فِئَةٍ قَلِيلَةٍ غَلَبَتْ فِئَةً كَثِيرَةٌ بِإِذْنِ اللَّهِ .
"আল্লাহ্ হুকুমে কত ক্ষুদ্র দল কত বৃহৎ দলকে পরাভূত করিয়াছে" (২ঃ ২৪৯)।
(হিফজুর রহমান সিউহারুবী, ২খ, ৫৪-৫৬)। রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর যুগে বিভিন্ন যুদ্ধে এবং ইসলামের দীর্ঘ ইতিহাসে এই সত্য বারবার প্রমাণিত হইয়াছে। বদর, কাদিসিয়া, ইয়ারমুক প্রভৃতি যুদ্ধ ইহার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।