📄 নবুওয়াত লাভ
শামূঈল বড় হইলে তাহার মাতা তাঁহাকে বায়তুল মাকদিসে এলি যাজকের নিকট তাওরাত শিক্ষার জন্য সোপর্দ করিলেন। তিনি তাঁহার দেখাশোনার দায়িত্ব গ্রহণ করিলেন এবং তাহাকে পুত্র স্নেহে লালন-পালন করিলেন। শামূঈল সাবালক হইলে তাঁহার নিকট জিবরীল (আ) আগমন করিলেন। তিনি ঘুমন্ত ছিলেন। ইবনুল আছীরের মতে তিনি তখন সালাতরত ছিল (প্রাগুক্ত)। জিবরীল তাঁহার যাজকের স্বরে তাঁহাকে ডাক দিলেন, হে ইশমাঈল! ডাক শুনিয়া তিনি ভীত-সন্ত্রস্ত হইয়া যাজককে জিজ্ঞাসা করিলেন, হে পিত! আপনি আমাকে ডাকিয়াছেন? তিনি তাঁহাকে বলিলেন, হে বৎস! যাও ঘুমাইয়া পড়। যাজকের কথামত তিনি পূর্বের ন্যায় ঘুমাইয়া পড়িলেন। জিবরীল তাঁহাকে দ্বিতীয়বার আহবান করিলেন। তিনি উঠিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, ওহে পিত! আপনি আমাকে ডাকিয়াছেন? যাজক বলিলেন, তৃতীয় বার আমি তোমাকে ডাক দিলে তুমি সাড়া দিবে না। তৃতীয়বার জিবরীল (আ) তাঁহার সামনে আত্মপ্রকাশ করিয়া বলিলেন, আপনি আপনার স্বজাতির নিকট গমন করুন এবং তাঁহাদের নিকট আপনার রবের পয়গাম পৌছাইয়া দিন। কেননা আল্লাহ আপনাকে নবী মনোনীত করিয়াছেন (মাআলিমুত তানযীল, ১খ., ২২৬; তাফসীরুল মাযহারী, ১খ., ৩৪৬; ঐ বঙ্গানুবাদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ১৯৯৭ খৃ., ১ খ., ৭৩৫; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, প্রাগুক্ত)।
আবদুল ওয়াহ্হাব আন-নাজজার ও হিফজুর রহমান সিউহারূবী বলেন, নবী যুশা (আ)-এর জীবনকালে বনী ইসরাঈল যখন ফিলিস্তীন অধিকার করিয়াছিল তখন তাহারা আল্লাহর নির্দেশে তাহাদের মধ্যে এই অঞ্চলটি ভাগ করিয়া নিয়াছিল যাহাতে তাহারা নিরাপদে জীবন-যাপন এবং সঠিক ধর্মের অনুশাসনে কর্ম সম্পাদন করিতে পারে। তাওরাতে পশوع অধ্যায় ২৩-এ এই ঘটনাটি বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হইয়াছে। যূশা (আ) তাঁহার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত উহাকে শোধনের জন্য অবিরাম চেষ্টা করিয়া গিয়াছেন। তাঁহাদের আদান-প্রদানে ও পরস্পরে সংঘাত সৃষ্টি হইলে তাহার নিরসনের জন্য কাযী বা বিচারকগণ নিয়োগ করিয়াছিলেন যাহাতে তাহার অবর্তমানেও তাহারা তাহার প্রবর্তিত শাসন ব্যবস্থা অটুট রাখে। মূসা (আ)-এর ইন্তিকালের প্রায় সাড়ে তিন শত বৎসর পর্যন্ত শাসন ব্যবস্থা এইরূপ ছিল যে, সমাজে সমাজে ও গোত্রে গোত্রে সরদার ও কাযী নিয়োজিত হইতেন। সরদার প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করিতেন এবং কাযী তাহাদের বিবাদ-বিসম্বাদের মীমাংসা করিতেন। তখন তাহাদের মধ্যে যেই নবী প্রেরিত হইতেন তিনি শাসন ও বিচার সংক্রান্ত সকল কার্যক্রম তদারকী করা ছাড়াও দীনের দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ যথাযথভাবে পালন করিয়া যাইতেন। কোন কোন সময় এমনও হইত আল্লাহ্ মেহেরবানীতে এই কাযীগণের মধ্যে হইতে কোন কোন লোক নবুওয়াত লাভ করিতেন। নবী ছাড়া স্বতন্ত্র কোন শাসক না থাকায় অন্যান্য জাতি তাহাদের উপর সুযোগ পাইলেই আক্রমণ চালাইত। কোন সময় আমালিকা, আবার কোন সময় ফিলিস্তীনিরা তাহাদের উপর আক্রমণ করিত। সুযোগ পাইলে সাদইয়ানী ও আরামীরাও আক্রমণ করিতে দ্বিধা করিত না। সম্মুখ যুদ্ধে পরাজিত হইলেও লুটতরাজ করিয়া তাহাদেরকে ব্যতিব্যস্ত রাখিত। মূসা (আ)-এর পরে আনুমানিক শতাব্দীর মধ্যভাগে এলী যাজকের যুগে গাজার পার্শ্ববর্তী আশদূদের অধিবাসীদের উপর ফিলিস্তীনিরা কঠোর আক্রমণ চালাইল। ইসরাঈলীরা এই যুদ্ধে তাহাদের সহিত শান্তির প্রতীক তাবূত (সিন্দুক) বহন করিয়াছিল। ফিলিস্তীনিরা তাহা উহাদের নিকট হইতে কাড়িয়া লাইয়া গেল। ইসরাঈলীরা এই যুদ্ধে মর্মান্তিকভাবে পরাজয় বরণ করিয়াছিল। উল্লেখ্য যে, এই সিন্দুকে তাওরাতের মূল কপি, মূসা ও হারুন (আ)-এর হাতের লাঠি, তাঁহাদের জামা-কাপড় ইত্যাদি ছিল। ফিলিস্তীনিরা তাহা লইয়া গিয়া 'দাজুন' নামক মন্দিরে স্থাপন করিল। দাজুন ছিল তাহাদের সর্বাধিক বড় দেবতার নাম। দাজুনের আকৃতি ছিল মাছের আকৃতি ও মাথা ছিল মানব সদৃশ। বর্তমান কালেও ফিলিস্তীনের প্রসিদ্ধ স্থান রামলায় বায়ত দজোন (بیت دجن) নামক একটি ছোট জনপদ রহিয়াছে। ধারণা করা হয় তাওরাতে উদ্ধৃত দাজুন মন্দিরটি এই এলাকায়ই স্থাপিত ছিল। এলী যাজকের যুগ অতিক্রান্ত হইয়া গেলে বনী ইসরাঈলের অন্যতম কার্যী শামূঈল (আ) আল্লাহ্র পক্ষ হইতে নবী নিযুক্ত হইলেন (আবদুল ওয়াহহাব আন-নাজজার, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৩০০; হিফজুর রহমান সিউহারীবী, প্রাগুক্ত)।
এই সম্পর্কে বাইবেলে 'শামূয়েলের দর্শন প্রাপ্তি' (৩-১-২১) শিরোনামে যাহা বলা হইয়াছে তাহার সারমর্ম প্রায় একই (বাইবেল পুরাতন ও নতুন নিয়ম, শিরোনাম, শমূয়েলের দর্শন প্রাপ্তি, অধ্যায় ৩ঃ ১-২১, বাংলাদেশ বাইবেল সোসাইটি ঢাকা, ৪২১ পৃ.)।
📄 আল-কুরআনে শামূঈল (আ) প্রসঙ্গ
আগেই বলা হইয়াছে যে, সরাসরি আল-কুরআনে শামুঈল (আ)-এর নামের কোন উল্লেখ নাই। তবে তাফসীরকারগণ আল-কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াত তাঁহার সহিত সংশ্লিষ্ট করিয়া বলিয়াছেন, এই ঘটনাটি শামূঈল (আ)-এর সহিত সম্পৃক্ত। ইরশাদ হইয়াছে: اَلَمْ تَرَ إِلَى الْمَلَأُ مِنْ بَنِي إِسْرَائِيلَ مِنْ بَعْدِ مُوسَى إِذْ قَالُوا لِنَبِي لَهُمُ ابْعَتْ لَنَا مَلِكًا تُقَاتِلُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ قَالَ هَلْ عَسَيْتُمْ إِنْ كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِتَالُ أَلا تُقَاتِلُوا قَالُوا وَمَا لَنَا إِلَّا نُقَاتِلَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَقَدْ أَخْرِجْنَا مِنْ دِيَارِنَا وَابْنَائِنَا فَلَمَّا كُتِبَ عَلَيْهِمُ الْقِتَالُ تَوَلَّوْا إِلَّا قَلِيْلًا مِّنْهُمْ وَاللَّهُ عَلِيمٌ بِالظَّالِمِينَ ، وَقَالَ لَهُمْ نَبِيُّهُمْ إِنَّ اللَّهَ قَدْ بَعَثَ لَهُمْ طَالُوتَ مَلَكًا قَالُوا أَنِّى يَكُونُ لَهُ الْمُلْكُ عَلَيْنَا وَنَحْنُ أَحَقُّ بِالْمُلْكِ مِنْهُ وَلَمْ يُؤْتَ سَعَةً مِّنَ الْمَالِ قَالَ إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَهُ عَلَيْكُمْ وَزَادَهُ بَسْطَةً فِي العِلمِ والجِسْمِ وَاللَّهُ يُؤْتِي مُلْكَهُ مَنْ يُشَاءُ وَاللَّهُ وَاسِعٌ علِيمٌ . ( البقرة ٢٤٦-٢٤٧)
"তুমি কি মূসার পরবর্তী বনী ইসরাঈল প্রধানদেরকে দেখ নাই? তাহারা যখন তাহাদের নবীকে বলিয়াছিল, আমাদের জন্য একজন রাজা নিযুক্ত কর যাহাতে আমরা আল্লাহ্র পথে যুদ্ধ করিতে পারি। সে বলিল, ইহা তো হইবে না যে, তোমাদের প্রতি যুদ্ধের বিধান দেওয়া হইলে তখন আর তোমরা যুদ্ধ করিবে না? তাহারা বলিল, আমরা যখন স্ব স্ব আবাস ভূমি ও স্বীয় সন্তান-সন্তুতি হইতে 'বহিষ্কৃত হইয়াছি, তখন আল্লাহর পথে কেন যুদ্ধ করিব না? অতঃপর যখন তাহাদের প্রতি যুদ্ধের বিধান দেওয়া হইল তখন তাহাদের স্বল্প সংখ্যক ব্যতীত সকলেই পৃষ্ঠ প্রদর্শন করিল এবং আল্লাহ যালিমদের সম্বন্ধে সবিশেষ অবহিত। আর তাহাদের নবী তাহাদেরকে বলিয়াছিল, আল্লাহ অবশ্যই তালূতকে তোমাদের রাজা করিয়াছেন। তাহারা বলিল, আমাদের উপর তাহার রাজত্ব কিরূপে হইবে, যখন আমরা তাহা অপেক্ষা রাজত্বের অধিক হকদার এবং তাহাকে প্রচুর ঐশ্বর্য দেওয়া হয় নাই! নবী বলিল, আল্লাহ অবশ্যই তাহাকে তোমাদের জন্য মনোনীত করিয়াছেন এবং তিনি তাহাকে জ্ঞানে ও দেহে সমৃদ্ধ করিয়াছেন। আল্লাহ যাহাকে ইচ্ছা স্বীয় রাজত্ব দান করেন। আল্লাহ্ প্রাচুর্যময়, প্রজ্ঞাময়" (২: ২৪৬-২৪৭)।
এই আয়াতে বনী ইসরাঈলের যেই নবীর কথা উল্লেখ করা হইয়াছে তিনি হইলেন শামূঈল (আ)। অধিকাংশ তাফসীরকার এই অভিমত পোষণ করিয়াছেন। বিখ্যাত তাফসীরকার ও ইতিহাসবিদ আল্লামা ইব্ন কাছীর এই সম্পর্কে বলেন, অধিকাংশ তাফসীরকার বলিয়াছেন, এই আয়াতের সংশ্লিষ্ট নবী হইলেন শামুঈল (আ)। কেহ কেহ মনে করেন, তিনি হইলেন শামউন (আ), আবার অনেকের অভিমত হইল শামূঈল ও শামউন একই ব্যক্তি। একটি দুর্বল অভিমতে রহিয়াছে, তিনি হইলেন যুশা' (আ); ইহা একেবারে অবাস্তব অভিমত। কারণ ইবন জারীর আত-তাবারী তাঁহার ইতিহাস গ্রন্থে বলিয়াছেন, যূশা' (আ)-এর মুত্যু ও শামুঈল (আ)-কে নবী হিসাবে প্রেরণের মধ্যে চার শত ষাট বৎসরের ব্যবধান ছিল (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১/২খ. ৬)। মুহাম্মাদ রাশীদ রিদাও অনুরূপ মত পোষণ করেন (রাশীদ রিদা, তাফসীরুল মানার, ২খ., ৪৭৫; আত-তাফসীরুল কাবীর, ৬খ., ১৭১)।
📄 তালূত পরিচিতি ও রাজ-নিয়োগ লাভ
ইব্নুল আছীর তাঁহার বংশ তালিকা নিম্নরূপ বর্ণনা করিয়াছেন: শাউল ইব্ন কীষস ইবন আনমার ইবন দিরার ইবন যাহরাফ ইবন যাফতাহ ইবন ঈশ (ایش) ইবন বিনয়ামীন ইব্ন ইয়া'কূব ইবন ইসহাক (আল-কামিল ফি'ত-তারীখ, ১৬৫ পৃ.)।
আল্লামা মাসঊদী এইরূপ বর্ণনা করিয়াছেন: তালুত ইব্ন্ন বিশ্ব ইবন ঈনাল (اینال) ইবন তারুন ইবন বাহরূন ইবন আফীহ ইবন সামীদাহ (سمیداح) ইবন ফালিহ ইবন বিনইয়ামীন ইবন ইয়া'কুব ইবন ইসহাক ইবন ইবরাহীম (আ) (মুরূজুয যাহাব, ১খ., ৬৭) যিনি ইউসূফ (আ)-এর সহোদর ভাই বিনয়ামীনের বংশধর ছিলেন। বাদশাহ তালুত 'রাজ' পদে সমাসীন হইবার সময় তাঁহার বয়স ছিল ৩০ বৎসর। তিনি ছিলেন সুঠামদেহী যুবক। তদানীন্তন বনী ইসরাঈল জাতির মধ্যে তাঁহার অপেক্ষা সুশ্রী পুরুষ আর কেহই ছিল না। তাঁহার উচ্চতা এতখানি ছিল যে, অন্যান্য লোক তাহার কাঁধ বরাবর হইত মাত্র (তাফহীমুল কুরআন, ১খ., ১৮৭)।
ইব্ন কাছীর আছ-ছা'লাবীর উদ্ধৃতি দিয়া তাঁহার বংশতালিকা নিম্নরূপ বর্ণনা করিয়াছেন: তালুত ইব্ন কীশ ইবন আফীল (افیل) ইবন সারূ ইবন তাহুরত (تحورت) ইবন আফীহ ইবন আনীস ইবন বিনয়ামীন ইবন ইয়া'কূব ইবন ইসহাক ইবন ইবরাহীম আল-খালীল (আ)। ইকরিমা ও আস-সুদ্দীর মতে তালুত রাজ-সিংহাসন লাভ করিবার পূর্বে একজন ভিস্তী ছিলেন। ওয়াহব ইব্ন মুনাব্বিহের মতে তিনি একজন সংস্কারক ছিলেন। ইহা ছাড়া অন্য মতও রহিয়াছে (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১/২ খ., ৬-৭)। বাংলা বাইবেলে তাঁহার নাম শৌল বলা হইয়াছে (বাইবেল, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪২৯)।
মাসউদী বলেন, মূসা (আ) মিসর হইতে বনী ইসরাঈলকে লইয়া বাহির হইবার এবং তালূত বনী ইসরাঈলের রাজা নিযুক্ত হইবার মধ্যবর্তী সময়ের ব্যবধান ছিল পাঁচ শত বাহাত্তর বৎসর তিন মাস (মুরূজুয-যাহাব, প্রাগুক্ত, ১খ, ৬৭)। মাওলানা আবুল আলা মওদূদী তাঁহার বাদশাহ পদে নিযুক্তি সম্পর্কে বলেন, ইহা খৃস্টপূর্ব প্রায় এক হাজার বৎসর পূর্বের ঘটনা। তখন আমালিকার লোকজন বনী ইসরাঈলের উপর চড়াও হইয়াছিল। ফিলিস্তীনের বেশির ভাগ অঞ্চল তাহারা ইসরাঈলীদের নিকট হইতে কাড়িয়া লইয়াছিল। এই সময় শামূঈল (আ) বনী ইসরাঈলের উপর শাসনকার্য পরিচালনা করিতেছিলেন। কিন্তু তিনি খুব বেশি বয়োবৃদ্ধ হইয়া গিয়াছিলেন। ফলে বনী ইসরাঈলের দলপতিগণ প্রয়োজন বোধ করিয়াছিল যে, অন্য এক ব্যক্তি তাহাদের বাদশাহ হইলে তাঁহার নেতৃত্বে তাহারা যুদ্ধ করিতে সক্ষম হইবে। কিন্তু তখন বনী ইসরাঈল অবিশ্বাসীদের স্বভাব-চরিত্র ও রীতি-নীতির প্রতি এতই আকৃষ্ট হইয়া পড়িয়াছিল যে, তাহাদের মস্তিষ্কে খিলাফত ও বাদশাহীর পার্থক্যবোধ পর্যন্ত বর্তমান ছিল না। এই কারণে তাহারা খলীফা নিযুক্তির আবেদন না করিয়া বাদশাহ নিযুক্তির আবেদন করিয়াছিল। এই প্রসঙ্গে বাইবেলে বলা হইয়াছে : "শমূয়েল যাবজ্জীবন ইস্রায়েলের বিচার করিলেন। তিনি প্রতি বৎসর বৈথেলে, গিলগিলে ও মিসরাতে পরিভ্রমণ করিয়া সেই সকল স্থানে ইস্রায়েলের বিচার করিতেন।
ইস্রায়েলীয়রা রাজা চাহে
অতএব ইসরায়েলের সমস্ত প্রাচীনবর্গ একত্র হইয়া রামাতে শমূয়েলের নিকটে আসিলেন; আর তাহারা তাঁহাকে কহিলেন, দেখুন, আপনি বৃদ্ধ হইয়া এবং আপনার পুত্রেরা আপনার পথে চলে না; এখন অন্য সকল জাতির ন্যায় আমাদের বিচার করিতে আপনি আমাদের উপর একজন রাজা নিযুক্ত করুন।
কিন্তু, 'আমাদের বিচার করিতে আমাদিগকে একজন রাজা দিউন' তাহাদের এই কথা শমূয়েলের মন্দ বোধ হইল; তাহাতে শমূয়েল সদাপ্রভুর কাছে প্রার্থনা করিলেন। তখন সদাপ্রভু শমূয়েলকে কহিলেন, এই লোকেরা তোমার কাছে যাহা যাহা বলিতেছে, সেই সমস্ত বিষয়ে তাহাদের বাক্যে কর্ণপাত কর; কিন্তু তাহাদের বিপক্ষে দৃঢ়রূপে সাক্ষ্য দেও এবং তাহাদের উপরে যে রাজত্ব করিবে, সেই রাজার নিয়ম তাহাগিদকে জ্ঞাত কর। পরে যে লোকেরা শমূয়েলের কাছে রাজা যাজ্ঞা করিয়াছিল, তাহাদিগকে তিনি সদাপ্রভুর ঐ সমস্ত কথা কহিলেন। আরও কহিলেন, তোমাদের উপরে রাজত্বকারী রাজার এইরূপ নিয়ম হইবে, তিনি তোমাদের পুত্রগণকে লইয়া আপনার রথের ও অশ্বের উপরে নিযুক্ত করিবেন এবং তাহারা তাঁহার রথের অগ্রে অগ্রে দৌড়িবে। আর তিনি তাহাদিগকে আপনার সহস্রপাত ও পঞ্চাশৎপাত নিযুক্ত করিবেন এবং কাহাকে কাহাকে তাঁহার ভূমি চাষ ও শস্য ছেদন করিতে এবং যুদ্ধের অস্ত্র ও রথের শয্যা নির্মাণ করিতে নিযুক্ত করিবেন। আর তিনি তোমাদের কন্যাগণকে লইয়া সুগন্ধি দ্রব্য প্রস্তুতকারিনী, পাচিকা রুটিওয়ালী করিবেন। আর তিনি তোমাদের উৎকৃষ্ট শষ্যক্ষেত্র, দ্রাক্ষাক্ষেত্র ও জিতবৃক্ষ সকল লইয়া আপন দাসদিগকে দিবেন। আর তোমাদের শস্যের ও দ্রাক্ষার দশমাংশ লইয়া আপনি কর্মচারীগিদ্কে ও দাসদিগকে দিবেন। আর তিনি তোমাদের দাস-দাসী ও সর্বোত্তম যুবাপুরুষদিগকে ও তোমাদের গর্দভ সকল লইয়া আপন কার্যে নিযুক্ত করিবেন। তিনি তোমাদের মেষগণের দশমাংশ লইবেন ও তোমরা তাহার দাস হইবে। সেই দিন তোমরা আপনাদের মনোনীত রাজা হেতু ক্রন্দন করিবে; কিন্তু সদাপ্রভু সেই দিন তোমাদিগকে উত্তর দিবেন না। তথাপি লোকেরা শমূয়েলের বাক্যে কর্ণপাত করিতে অসম্মত হইয়া কহিল, না, আমাদের উপরে একজন রাজা চাই; তাহাতে আমরা ও আর সকল জাতির সমান হইব এবং আমাদের রাজা আমাদের বিচার করিবেন ও আমাদের অগ্রগামী হইয়া যুদ্ধ করিবেন। তখন শমূয়েল লোকদের সমস্ত কথা শুনিয়া সদাপ্রভুর কণ্ঠগোচরে নিবেদন করিলেন। তাহাতে সদাপ্রভু শমূয়েলকে কহিলেন, তুমি তাহাদের বাক্যে কর্ণপাত কর, তাহাদের নিমিত্ত একজনকে রাজা কর। পরে শমূয়েল ইস্রায়েল লোকদিগকে কহিলেন, তোমরা প্রত্যেকে আপন আপন নগরে যাও (বাইবেল, পুরাতন ও নতুন নিয়ম, প্রাগুক্ত, ৪২৭-৪২৯)।
আল্লামা ইবন জারীর আত-তাবারী তালুতের রাজসিংহাসনে অধিষ্ঠান সম্পর্কে বলেন, তালূতকে আল্লাহ তা'আলা বাদশাহ হিসাবে নিয়োগদানের পর যখন শামূঈল (আ) বানী ইসরাঈলের মধ্যে এই নিয়োগের কথা ঘোষণা করিলেন তখন তাহারা আপত্তি উত্থাপন করিয়া বলিল, ইহা কেমন করিয়া সম্ভব হইবে! সে তো বিনয়ামীন ইবন ইয়া'কূব বংশের লোক। এই বংশের কেহ তো বাদশাহ হইবার কথা নহে। কারণ এই বংশ আদৌ নবী ও বাদশাহের বংশ নহে। আমরাই বাদশাহ হইবার অধিকতর যোগ্য ছিলাম। কারণ আমরা য়াহুদা ইবন ইয়া'কূব বংশের লোক। আপরদিকে এই লোকটি ঐশ্বর্যশালী নহে, সে একজন চর্ম সংস্কারক কিংবা পানি বিক্রেতা। তাহাদের এই অভিযোগ উত্থাপনের একটি বিশেষ কারণ ছিল এই যে, বহুকাল অবধি নবুওয়াতের সিলসিলা বনী লাবী গোত্র হইতে আর রাজা-বাদহশাহের সিলসিলা য়াহুদা ইব্ন ইয়া'কূব গোত্র হইতে চলিয়া আসিতেছিল। ব্যতিক্রমী ঘটনা ছিল তালুতের রাজ-সিংহাসনে অধিষ্ঠান। তাহাদের জওয়াবে শামূঈল (আ) বলিয়াছিলেন, ইহাতে তো আমার কোন হাত নাই। ইহা আল্লাহরই মনোনয়ন, জ্ঞানে ও দেহে আল্লাহ তাঁহাকে সমৃদ্ধ করিয়াছেন, আল্লাহ যাহাকে ইচ্ছা রাজা পদে অভিষিক্ত করেন।
قَالَ إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَهُ عَلَيْكُمْ وَزَادَهُ بَسْطةً في العلم والجِسْمِ وَاللَّهُ يُؤْتِي مُلَكَهُ مَنْ يُشَاءُ .
ইন জারীর আত-তাবারী ওয়াহ্হ্ব ইন্ন মুনাব্বিহ হইতে এই সম্পর্কে বলেন, বানু ইসরাঈলের লোকজন যখন শামূঈল (আ)-কে তাহাদের দাবির কথা জানাইল তখন তিনি আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা জানাইলেন, হে আল্লাহ! বনী ইসরাঈলের জন্য একজন বাদশাহ প্রেরণ করুন। তখন আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে বলিলেন, তোমার গৃহে যেই তুনীরের মধ্যে তৈল রহিয়াছে তাহার প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখিও। তোমার গৃহে যখন এমন কোন লোফ প্রবেশ করিবে যাহার প্রবেশ করামাত্র তুনীরের ঐ তৈল ধ্বনিত হইতে থাকিবে সেই হইবে বনী ইসরাঈলে বাদশাহ্। তাহার মাথায় ইহা হইতে তৈল মর্দন করিয়া দিবে এবং বনী ইসরাঈলের মধ্যে তাহার রাজপদে অভিষিক্ত হওয়ার ঘোষণা করিবে। তাহাকেও সেই সম্পর্কে অবহিত করিবে যাহা সে জানিতে চাহিবে। শামূঈল (আ) এই লোকটি কখন প্রবেশ করিবে তাহার প্রতীক্ষায় রহিলেন। তালুত একজন চামড়া সংস্কারক ছিলেন। বংশগত দিক দিয়া বিনয়ামীন ইব্ন ইয়া'কূব বংশের লোক ছিলেন। সেই বংশে রাজা কিংবা নবীর ধারা ছিল না। এইদিকে তালুত তাঁহার হারাইয়ে যাওয়া প্রাণীর সন্ধানে একজন চাকরকে লইয়া বাহির হইলেন। শামূঈল গোত্রের গৃহে্র পার্শ্ব দিয়া যখন তাহারা দুইজন অতিক্রম করিতেছিলেন তখন চাকরটি বলিল, আপনি যদি এই নবীর গৃহে প্রবেশ করিতেন তাহা হইলে তাঁহাকে আমাদের হারাইয়া যাওয়া প্রাণী সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিতাম। তিনি আমাদেরকে পথ বাতলাইয়া দিতেন এবং আমাদের কল্যাণের জন্য দুআ করিতেন। তালুত বলিলেন, ইহাতে কোন আপত্তি নাই। অতঃপর তাহারা নবী শামৃঈল (আ)-এর দরবারে প্রবেশ করিলেন। তাহারা তাঁহাকে তাহার হারাইয়া যাওয়া পশু সম্পর্কে অবহিত করিলেন এবং কল্যাণের জন্য দুআ চাহিলেন। ইত্যবসরে তুনীরের তৈল ধ্বনিত হইতে লাগিল। অতঃপর শামুঈল (আ) উঠিয়া দাঁড়াইলেন এবং তাঁহাকে জড়াইয়া ধরিয়া বলিলেন, তোমার মাথা আগাইয়া দাও, তিনি তাহাই করিলেন। শামূঈল (আ) তাঁহার মাথায় তৈল মাখাইয়া দিয়া বলিলেন, আপনি বনী ইসরাঈলের রাজা, আল্লাহ তাআলা আমাকে আদেশ করিয়াছেন যেন আমি আপনাকে তাহাদের রাজা নিযুক্ত করি।
ওয়াহব ইবন মুনাব্বিহ হইতে অপর একটি সূত্রে বর্ণিত আছে, বানী ইসরাঈল শামূঈল (আ)-এর নিকট একজন বাদশাহ নিযুক্তির কথা বলিলে তিনি বলিয়াছিলেন, যুদ্ধ করিবার জন্য তোমাদের উপর বাদশাহ প্রেরণ করিবার কি প্রয়োজন? আল্লাহই তো তোমাদের জন্য যথেষ্ট। তাহারা তাহাদের প্রতিপক্ষকে ভয় করিবার কথা জানাইয়া বলিল, যদি কোন একজন বাদশাহ হইতেন তাহা হইলে আমরা শত্রুদের উপর ঝাপাইয়া পড়িতাম। আল্লাহ তা'আলা তখন শামূঈল (আ)-এর নিকট ওহী প্রেরণ করিলেন, তুমি তালূতকে বাদশাহ নিয়োগ কর এবং তাহার মাথায় পবিত্র তৈল মর্দন করিয়া দাও। তালুতের পিতার গাধাগুলি হারাইয়া গিয়াছিল। তিনি স্বীয় পুত্র তালূত এবং অপর একজন চাকরকে তাহার তালাশে প্রেরণ করিলেন। তাহারা শামূঈল (আ)-এর নিকট এই সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিবার জন্য আগমন করিল। শামূঈল (আ) তখন বলিলেন, আল্লাহ আপনাকে বনী ইসরাঈলের রাজা হিসাবে মনোনীত করিয়াছেন। তালূত জিজ্ঞাসা করিলেন, "আমি?” শামূঈল (আ) বলিলেন, হাঁ। তিনি বলিলেন, আপনি কি জানেন না, বনী ইসরাঈলে আমার গোত্র অধম। তিনি বলিলেন, হাঁ জানি। তালূত জিজ্ঞাসা করিলেন, আপনি কি জানেন বংশের পরিবারসমূহের মধ্যে আমার পরিবার সবচাইতে নিম্ন মানের? তিনি বলিলেন, হাঁ, জানি। তালুত বলিলেন, ইহার আলামত কি? শামূঈল (আ) বলিলেন, তুমি গৃহে ফিরিয়া দেখিবে, তোমার পিতা তাঁহার গাধাগুলির সন্ধান পাইয়াছেন। আর যখন তুমি অমুক অমুক স্থানে যাইবে তখন তোমার উপর ওহী নাযিল হইবে। অতঃপর শামূঈল (আ) তাঁহাকে পবিত্র তৈল মর্দন করিয়া দিলেন। আস-সুদ্দী (র)-এর বর্ণনামতে নবী আল্লাহ্ দরবারে দুআ করিলেন এবং একটি লাঠি দেখাইয়া বলিলেন, তোমাদের রাজার দেহের দৈর্ঘ্য হইবে এই লাঠির দৈর্ঘ্যের সমান। তাহারা এই লাঠি দ্বারা নিজেদেরকে মাপিয়া লইল, কিন্তু কাহারও দৈর্ঘ্য লাঠির সমান হইল না। তালূত ছিলেন পানি সরবরাহকারী, তাহার গাধাকে পানি পান করাইতেন। একদা তাহার গাধাটি হারাইয়া গেল। গাধাটির খোঁজে তিনি পথে বাহির হইলে লোকজন তাহাকে ডাকিল এবং লাঠি দিয়া তাহার দেহ মাপিয়া লইল। দেখা গেল লাঠিটি তাহার দেহের সমান। তারপর নবী তাহাদের বলিলেন, আল্লাহ তালূতকে তোমাদের জন্য রাজারূপে প্রেরণ করিয়াছেন (আত-তাবারী, তাফসীর, ২খ, ৩৭৯)।
📄 ইসরাঈলীয়রা রাজা চাহে
অতএব ইসরায়েলের সমস্ত প্রাচীনবর্গ একত্র হইয়া রামাতে শমূয়েলের নিকটে আসিলেন; আর তাহারা তাঁহাকে কহিলেন, দেখুন, আপনি বৃদ্ধ হইয়া এবং আপনার পুত্রেরা আপনার পথে চলে না; এখন অন্য সকল জাতির ন্যায় আমাদের বিচার করিতে আপনি আমাদের উপর একজন রাজা নিযুক্ত করুন।
কিন্তু, 'আমাদের বিচার করিতে আমাদিগকে একজন রাজা দিউন' তাহাদের এই কথা শমূয়েলের মন্দ বোধ হইল; তাহাতে শমূয়েল সদাপ্রভুর কাছে প্রার্থনা করিলেন। তখন সদাপ্রভু শমূয়েলকে কহিলেন, এই লোকেরা তোমার কাছে যাহা যাহা বলিতেছে, সেই সমস্ত বিষয়ে তাহাদের বাক্যে কর্ণপাত কর; কিন্তু তাহাদের বিপক্ষে দৃঢ়রূপে সাক্ষ্য দেও এবং তাহাদের উপরে যে রাজত্ব করিবে, সেই রাজার নিয়ম তাহাগিদকে জ্ঞাত কর। পরে যে লোকেরা শমূয়েলের কাছে রাজা যাজ্ঞা করিয়াছিল, তাহাদিগকে তিনি সদাপ্রভুর ঐ সমস্ত কথা কহিলেন। আরও কহিলেন, তোমাদের উপরে রাজত্বকারী রাজার এইরূপ নিয়ম হইবে, তিনি তোমাদের পুত্রগণকে লইয়া আপনার রথের ও অশ্বের উপরে নিযুক্ত করিবেন এবং তাহারা তাঁহার রথের অগ্রে অগ্রে দৌড়িবে। আর তিনি তাহাদিগকে আপনার সহস্রপাত ও পঞ্চাশৎপাত নিযুক্ত করিবেন এবং কাহাকে কাহাকে তাঁহার ভূমি চাষ ও শস্য ছেদন করিতে এবং যুদ্ধের অস্ত্র ও রথের শয্যা নির্মাণ করিতে নিযুক্ত করিবেন। আর তিনি তোমাদের কন্যাগণকে লইয়া সুগন্ধি দ্রব্য প্রস্তুতকারিনী, পাচিকা রুটিওয়ালী করিবেন। আর তিনি তোমাদের উৎকৃষ্ট শষ্যক্ষেত্র, দ্রাক্ষাক্ষেত্র ও জিতবৃক্ষ সকল লইয়া আপন দাসদিগকে দিবেন। আর তোমাদের শস্যের ও দ্রাক্ষার দশমাংশ লইয়া আপনি কর্মচারীগিদ্কে ও দাসদিগকে দিবেন। আর তিনি তোমাদের দাস-দাসী ও সর্বোত্তম যুবাপুরুষদিগকে ও তোমাদের গর্দভ সকল লইয়া আপন কার্যে নিযুক্ত করিবেন। তিনি তোমাদের মেষগণের দশমাংশ লইবেন ও তোমরা তাহার দাস হইবে। সেই দিন তোমরা আপনাদের মনোনীত রাজা হেতু ক্রন্দন করিবে; কিন্তু সদাপ্রভু সেই দিন তোমাদিগকে উত্তর দিবেন না। তথাপি লোকেরা শমূয়েলের বাক্যে কর্ণপাত করিতে অসম্মত হইয়া কহিল, না, আমাদের উপরে একজন রাজা চাই; তাহাতে আমরা ও আর সকল জাতির সমান হইব এবং আমাদের রাজা আমাদের বিচার করিবেন ও আমাদের অগ্রগামী হইয়া যুদ্ধ করিবেন। তখন শমূয়েল লোকদের সমস্ত কথা শুনিয়া সদাপ্রভুর কণ্ঠগোচরে নিবেদন করিলেন। তাহাতে সদাপ্রভু শমূয়েলকে কহিলেন, তুমি তাহাদের বাক্যে কর্ণপাত কর, তাহাদের নিমিত্ত একজনকে রাজা কর। পরে শমূয়েল ইস্রায়েল লোকদিগকে কহিলেন, তোমরা প্রত্যেকে আপন আপন নগরে যাও (বাইবেল, পুরাতন ও নতুন নিয়ম, প্রাগুক্ত, ৪২৭-৪২৯)।