📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 নাম ও বংশপরিচয়

📄 নাম ও বংশপরিচয়


তাঁহার নাম শামূঈল বলিয়াই খ্যাত। কেহ কেহ তাঁহার নাম ইশমাঈল বলিয়াও উল্লেখ করিয়াছেন। ইশমাঈলের হিব্রু অর্থ হইল ইসমাঈল, যাহার আরবী হইবে سَمِعَ اللَّهُ دُعَالٰی আল্লাহ আমার দুআ' শুনিয়াছেন বা কবূল করিয়াছেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ, ৫-৬)। বেশির ভাগ গ্রন্থে তাঁহার নাম সামুঈল (شموئیل) বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে (তাফহীমুল কুরআন, ১খ., ১৮৫)।
তাঁহার বংশ তালিকা হইল : শামুয়েল অথবা ইশমাঈল ইব্‌ন বালী ইব্‌ন আলকামাহ ইব্‌ন ইয়ারখাম ইব্‌নুল ইয়াহ্ ইব্‌ন তাহু ইবন সাওফ ইব্‌ন আলকামা ইবন মাহিছ ইব্‌ন আমূসা ইব্‌ন আযরিয়া। শামূঈল (আ) সম্পর্কে মুকাতিল বলিয়াছেন, তিনি ছিলেন হযরত হারুন (আ)-এর বংশধর। কাহারও কাহারও মতে তিনি ছিলেন ইয়া'কূব (আ)-এর বংশধর। মুজাহিদের বর্ণনামতে তিনি ছিলেন ইশমাবীল ইব্‌ন হালফাকা (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, প্রাগুক্ত)। আল্লামা ইবন জারীর আত-তাবারী তাঁহার বর্ণনায় বারহাম। অনুরূপ ইন্ন কাছীর কর্তৃক বর্ণিত তালিকায় বলা হইয়াছে ইবনুল ইয়াহ্ ইবন তাহ্ ইব্‌ন সাওফ, পক্ষান্তরে আত-তাবারীর বর্ণনায় রহিয়ছে ইবনুলতু ইব্‌ন ইয়াহু সাওফ। আযরিয়ার ঊর্ধ্বতন বংশ তালিকার বর্ণনায় তাবারী বলেন, আযরিয়া ইন্ন সাফিয়্যা ইন্ন আলকামাহী ইবন আবী ইয়াসিক ইব্‌ন কারুন ইব্‌ন য়াসহার ইবন কাহিছ ইবন লাবী (লাবী )لاوی( ইবন ইয়াকূব ইব্‌ন ইসহাক ইব্‌ন ইবরাহীম (আত-তাবারী, জামিউল বায়ান ফী তাফসীরিল কুরআন, ২খ, ৩৭৩)। সায়্যিদ আলুসী আল-বাগদাদী শামুঈল (আ)-র বংশ তালিকায় আবু উবায়দার বরাতে বলেন, ইশমাবীল ইবন হান্নাহ ইবনুল আকির। ইহা হইতে ঊর্ধ্বতন আর কাহারও নাম তিনি অবশ্য উল্লেখ করেন নাই (আলুসী আল-বাগদাদী, রূহুল মাআনী, ২খ., ১৬৪)। হিফজুর রহমান সিউহারুবী বলেন, শামূঈল শব্দটি হিব্রু শব্দ ইশয়াবীলই ছিল, কিন্তু ব্যবহারের আধিক্যতার কারণে ইহা শামুঈল হইয়া গিয়াছে (কাসাসুল কুরআন, ২খ, ৩৯)। আল্লামা মাসউদী তাঁহার বংশতালিকার বিবরণ এইরূপ দিয়াছেন: শামুঈল ইবন বারূহান بروحان( ইবন নাহুরা ناحوراء( )মুরূজুয যাহাব ওয়া মাআদিনুল জাওহার, ১খ., ৬৭)। আল্লামা কুরতুবী বলেন, শামূঈল (আ) ইবনুল আজয নামে পরিচতি ছিলেন। সুদ্দীর মতে তিনি ছিলেন শাম্ঊন। তাঁহাকে ইবনুল আজয বলিবার কারণ হইল, ইবনুল আজম অর্থ বৃদ্ধার ছেলে। কারণ তাঁহার মাতা বৃদ্ধা হইয়া গিয়াছিলেন। সন্তান ধারণের ক্ষমতা হারানোর বয়সে উপনীত হইয়া তিনি আল্লাহ্র দরবারে দুআ' করিয়াছিলেন। তাহার দু'আর ফলে আল্লাহ তাঁহাকে এই সন্তান দান করিয়াছিলেন। আল্লাহ আমার দু'আ শুনিয়াছেন এবং তিনি তাঁহার নাম রাখিলেন সাম'ঊন )سمعون(। সীন বর্ণটি হিব্রু ভাষায় শীন (শ) হইয়া যায় (আল-জামিউ লিআহকামিল কুরআন, ২/৩ খ., ২৪৩)।
বাইবেলে বর্ণিত আছে যে, ঈদী নামক একজন যাজক ছিলেন। তাহার ইন্তিকালের পূর্বে ইফ্রয়িম রাজ্যের পাহাড়ী অঞ্চলে রামাতীম সূফীমের (RAMA THIM ZOPHIM) এক ব্যক্তি বসবাস করিত যাহার নাম ছিল ইলকানা (ELKANAH)। তাহার দুইজন স্ত্রী ছিল। একজনের নাম হান্না (HANNAH) আর অপর জনের নাম পনিন্না (PENINNAH)। পনিন্নার সন্তান ছিল, কিন্তু হান্না ছিল সন্তান ধারণে অক্ষম। এই কারণে হান্নাকে পনিন্না তিরস্কার করিত। হান্না খুবই ব্যথিত হইত। প্রতি বৎসর বলিদানের উদ্দেশে ইলকামা শিলো শহরে গমন করিতেন। সঙ্গে তাহার এই দুই স্ত্রীও যাইতেন। এখানে যাজক ঈলী বসবাস করিতেন। একদা শিলোতে বার্ষিক বলিদানের উৎসবকালে পনিন্না কর্তৃক তিরস্কৃত হইয়া হান্না খুবই ব্যথিত হইলেন এবং আল্লাহর দরবারে পুত্র সন্তান লাভের জন্য কায়মনোবাক্যে দু'আ করিলেন। পুত্র সন্তান লাভ করিলে তিনি তাহাকে আল্লাহর নামে উৎসর্গ করিবার পণ করিলেন। ঈলীও তাহার জন্য দু'আ করিলেন। ইহার পর ইলকানা তাহার দুই স্ত্রীকে লইয়া রামায় (RAMAH) প্রত্যাবর্তন করিলেন। পরবর্তী বৎসর হান্না একটি পুত্র সন্তান প্রসব করিলেন। যেহেতু আল্লাহ তা'আলা হান্নার ফরিয়াদ শুনিয়া তাহাকে সন্তান দান করিয়াছিলেন এই কারণে হান্না তাঁহার নাম শামূঈল রাখিয়াছিলেন। হিব্রু ভাষায় এই কাজটি سمع) - شماع / اشماع ایل( অর্থাৎ শ্রবণ করা। یل। অর্থাৎ আল্লাহ অর্থাৎ আল্লাহ্র শ্রবণ। দুধপান কাল অতিক্রান্ত হইলে হান্না তাহাকে লইয়া যাজক ঈলীর নিকট আসিলেন এবং মানত অনুযায়ী তাহাকে ঈলীর হাতে সোপর্দ করিলেন। তিনি এই যাজক ঈলীর তত্ত্বাবধানেই লালিত-পালিত হইয়াছিলেন (বাইবেল, শমূয়েল ১, ১-২৮; জামীল আহমদ, আমবিয়ায়ে কুরআন, ৩খ., ২৩)।
মুহাম্মাদ জামীল আহমদ তাঁহার বংশতালিকার ছক নিম্নরূপ আকিয়াছেনঃ
ইবরাহীম (আ) 1 ইসহাক (আ) 1 ইয়া'কূব (আ) 1 LEVI লাবী 1 KOHATH কুহাত
(IZ HAR OR AMMINADAB) 1 (اظهار یا عمیداب) ইদহার অথবা আমীদাব
(আমরা) عمرام AMRAM
ক্বোরাহ (ক্বারুন) KORAH 1 আসসীর (اسیر) ASSIR
ইলকানাহ (القانه) ELKANAH 1 (صوفی دیاموف) ZUPH 1 তাহত বা তাহু (تحت) TOHU
আলইয়াব বা আলীহু (الياب (يا اليهو) ELIHU 1 য়ারূহাম (بروحام) JEROHAM
ইলকানা (القانه) ELKANAH 1 শামুঈল (شمویل) SAMUEL
আবিয়াহ (ابیاء) ABIAH জুয়েল (وایل) (আমবিয়ায়ে কুরআন, প্রাগুক্ত, ৩খ., ২৫)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 জন্মগ্রহণ ও নামকরণ

📄 জন্মগ্রহণ ও নামকরণ


ওয়াহ্হ্ ইবন মুনাব্বিহ, ইবন ইসহাক ও আল-কালবী প্রমূখ সূত্রে বর্ণিত, মূসা (আ)-এর মৃত্যুর পর ইসরাঈলের মধ্যে তাওরাতের বিধান প্রতিষ্ঠা করিবার জন্য যূশা (আ) তাঁহার স্থলাভিষিক্ত মনোনীত হইলেন। মৃত্যু অবধি তিনি সেই দায়িত্ব পালন করিয়া গিয়েছেন। ইহার পর কালিব ইবন যুবানা সেই দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হইলেন। তিনিও যথাযথভাবে আল্লাহর হুকুম ও তাওরাতের বিধান প্রতিষ্ঠা করিলেন। ইহার পর হিযকীল (আ) এই দায়িত্ব লাভ করিলেন। তাঁহার ইন্তিকালের পর বনী ইসরাঈলের মধ্যে বিভিন্ন প্রকার ফিতনা-ফাসাদের সৃষ্টি হয়। উহারা আল্লাহর বিধান বিস্মৃত হইয়া মূর্তিপূজা শুরু করিয়া দেয়। তখন আল্লাহ তা'আলা তাহাদের প্রতি ইলয়াস (আ)-কে নবী হিসাবে প্রেরণ করেন। তিনি তাহাদেরকে আল্লাহর পথে ফিরিয়া আসিবার আহবান জানান। মূসা (আ)-এর পর বনী ইসরাঈলে যত নবীর আবির্ভাব ঘটিয়াছে তাঁহাদের মূল কাজ ছিল বনী ইসরাঈল তাওরাতের যেই সকল বিধান বিস্তৃত হইয়া যাইত তাহা পুন প্রবর্তিত করা। ইলয়াস (আ)-এর পর আল-য়াসা' (আ) তাঁহার স্থলাভিষিক্ত হইলেন। তাঁহার ইন্তিকালের পর আরও অনেক নবী সেই কাজে নিয়োজিত হইলেন। জালুতের সম্প্রদায় বনী ইসরাঈলের শত্রু হইয়া দাঁড়াইল। ইহারা মিসর ও ফিলিস্তীনের মধ্যস্থিত সাগর উপকূলে বসবাস করিত। ইহাদেরকে আমালিকা বলিয়াও আখ্যায়িত করা হইত। উহারা বনী ইসরাঈলের উপর আক্রমণ করিয়া তাহাদের অধিকৃত বহু ভূমি দখল করিয়া লইল। তাহাদের সন্তান-সন্ততিকে বন্দী করিল, এমনকি তাহারা বনী ইসরাঈলের রাজবংশের চার শত চল্লিশ জনকে গ্রেফতার করিল। তাহাদের উপর কর আরোপ করিল। এমনিভাবে বনী ইসরাঈল উহাদের দ্বারা নিদারুণ যাতনা ভোগ করিল। তাহাদের তাওরাত ছিনাইয়া লইল। প্রতিকার করিবার কেহই ছিল না। নবুওয়াতের বংশানুক্রম ধ্বংস হইয়া গেল। নবী বংশের একজন মাত্র গর্ভধারিনী মহিলা ব্যতীত আর কেহই জীবিত ছিল না। তাহার স্বামীও নিহত হইয়াছিল। বনী ইসরাঈলগণ শুধু তাহার স্বস্থানে রহিয়াছিল। তাহারা আশাবাদী ছিল যে, তাহার পুত্র সন্তান জন্মলাভ করিবে। মহিলা আল্লাহর দরবারে দুআ করিলেন। আল্লাহ তাহার দুআ কবুল করিয়া তাহাকে একটি পুত্র সন্তান দান করিলেন। পুত্র সন্তান লাভ করিবার পর মহিলা তাহার নাম রাখিলেন ইসমাঈল (বাগাবী, মাআলিমুত তানযীল, ১খ ২২৬; কাযী মুহাম্মদ ছানাউল্লাহ পানীপথী, আত-তাফসীরুল মাযহারী, ১খ., ৩৪৬; ঐ বঙ্গানুবাদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ১খ., ৭৩৫)। এই সন্তানের নাম সে ইশমাবীল হিসাবে নামকরণ করিল (ইবনুল আছীর আল-জাযারী, আল-কামিল ফিত তারীখ, ১খ., ১৬৪।) বাইবেলে এই সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা রহিয়াছে। (দ্র. পবিত্র বাইবেল, পুরাতন ও নূতন নিয়ম, বাংলাদেশ বাইবেল সোসাইটি, ঢাকা, শিরোনাম শমূয়েলের প্রথম পুস্তক, পৃ. ৪১৭)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 নবুওয়াত লাভ

📄 নবুওয়াত লাভ


শামূঈল বড় হইলে তাহার মাতা তাঁহাকে বায়তুল মাকদিসে এলি যাজকের নিকট তাওরাত শিক্ষার জন্য সোপর্দ করিলেন। তিনি তাঁহার দেখাশোনার দায়িত্ব গ্রহণ করিলেন এবং তাহাকে পুত্র স্নেহে লালন-পালন করিলেন। শামূঈল সাবালক হইলে তাঁহার নিকট জিবরীল (আ) আগমন করিলেন। তিনি ঘুমন্ত ছিলেন। ইবনুল আছীরের মতে তিনি তখন সালাতরত ছিল (প্রাগুক্ত)। জিবরীল তাঁহার যাজকের স্বরে তাঁহাকে ডাক দিলেন, হে ইশমাঈল! ডাক শুনিয়া তিনি ভীত-সন্ত্রস্ত হইয়া যাজককে জিজ্ঞাসা করিলেন, হে পিত! আপনি আমাকে ডাকিয়াছেন? তিনি তাঁহাকে বলিলেন, হে বৎস! যাও ঘুমাইয়া পড়। যাজকের কথামত তিনি পূর্বের ন্যায় ঘুমাইয়া পড়িলেন। জিবরীল তাঁহাকে দ্বিতীয়বার আহবান করিলেন। তিনি উঠিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, ওহে পিত! আপনি আমাকে ডাকিয়াছেন? যাজক বলিলেন, তৃতীয় বার আমি তোমাকে ডাক দিলে তুমি সাড়া দিবে না। তৃতীয়বার জিবরীল (আ) তাঁহার সামনে আত্মপ্রকাশ করিয়া বলিলেন, আপনি আপনার স্বজাতির নিকট গমন করুন এবং তাঁহাদের নিকট আপনার রবের পয়গাম পৌছাইয়া দিন। কেননা আল্লাহ আপনাকে নবী মনোনীত করিয়াছেন (মাআলিমুত তানযীল, ১খ., ২২৬; তাফসীরুল মাযহারী, ১খ., ৩৪৬; ঐ বঙ্গানুবাদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ১৯৯৭ খৃ., ১ খ., ৭৩৫; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, প্রাগুক্ত)।
আবদুল ওয়াহ্হাব আন-নাজজার ও হিফজুর রহমান সিউহারূবী বলেন, নবী যুশা (আ)-এর জীবনকালে বনী ইসরাঈল যখন ফিলিস্তীন অধিকার করিয়াছিল তখন তাহারা আল্লাহর নির্দেশে তাহাদের মধ্যে এই অঞ্চলটি ভাগ করিয়া নিয়াছিল যাহাতে তাহারা নিরাপদে জীবন-যাপন এবং সঠিক ধর্মের অনুশাসনে কর্ম সম্পাদন করিতে পারে। তাওরাতে পশوع অধ্যায় ২৩-এ এই ঘটনাটি বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হইয়াছে। যূশা (আ) তাঁহার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত উহাকে শোধনের জন্য অবিরাম চেষ্টা করিয়া গিয়াছেন। তাঁহাদের আদান-প্রদানে ও পরস্পরে সংঘাত সৃষ্টি হইলে তাহার নিরসনের জন্য কাযী বা বিচারকগণ নিয়োগ করিয়াছিলেন যাহাতে তাহার অবর্তমানেও তাহারা তাহার প্রবর্তিত শাসন ব্যবস্থা অটুট রাখে। মূসা (আ)-এর ইন্তিকালের প্রায় সাড়ে তিন শত বৎসর পর্যন্ত শাসন ব্যবস্থা এইরূপ ছিল যে, সমাজে সমাজে ও গোত্রে গোত্রে সরদার ও কাযী নিয়োজিত হইতেন। সরদার প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করিতেন এবং কাযী তাহাদের বিবাদ-বিসম্বাদের মীমাংসা করিতেন। তখন তাহাদের মধ্যে যেই নবী প্রেরিত হইতেন তিনি শাসন ও বিচার সংক্রান্ত সকল কার্যক্রম তদারকী করা ছাড়াও দীনের দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ যথাযথভাবে পালন করিয়া যাইতেন। কোন কোন সময় এমনও হইত আল্লাহ্ মেহেরবানীতে এই কাযীগণের মধ্যে হইতে কোন কোন লোক নবুওয়াত লাভ করিতেন। নবী ছাড়া স্বতন্ত্র কোন শাসক না থাকায় অন্যান্য জাতি তাহাদের উপর সুযোগ পাইলেই আক্রমণ চালাইত। কোন সময় আমালিকা, আবার কোন সময় ফিলিস্তীনিরা তাহাদের উপর আক্রমণ করিত। সুযোগ পাইলে সাদইয়ানী ও আরামীরাও আক্রমণ করিতে দ্বিধা করিত না। সম্মুখ যুদ্ধে পরাজিত হইলেও লুটতরাজ করিয়া তাহাদেরকে ব্যতিব্যস্ত রাখিত। মূসা (আ)-এর পরে আনুমানিক শতাব্দীর মধ্যভাগে এলী যাজকের যুগে গাজার পার্শ্ববর্তী আশদূদের অধিবাসীদের উপর ফিলিস্তীনিরা কঠোর আক্রমণ চালাইল। ইসরাঈলীরা এই যুদ্ধে তাহাদের সহিত শান্তির প্রতীক তাবূত (সিন্দুক) বহন করিয়াছিল। ফিলিস্তীনিরা তাহা উহাদের নিকট হইতে কাড়িয়া লাইয়া গেল। ইসরাঈলীরা এই যুদ্ধে মর্মান্তিকভাবে পরাজয় বরণ করিয়াছিল। উল্লেখ্য যে, এই সিন্দুকে তাওরাতের মূল কপি, মূসা ও হারুন (আ)-এর হাতের লাঠি, তাঁহাদের জামা-কাপড় ইত্যাদি ছিল। ফিলিস্তীনিরা তাহা লইয়া গিয়া 'দাজুন' নামক মন্দিরে স্থাপন করিল। দাজুন ছিল তাহাদের সর্বাধিক বড় দেবতার নাম। দাজুনের আকৃতি ছিল মাছের আকৃতি ও মাথা ছিল মানব সদৃশ। বর্তমান কালেও ফিলিস্তীনের প্রসিদ্ধ স্থান রামলায় বায়ত দজোন (بیت دجن) নামক একটি ছোট জনপদ রহিয়াছে। ধারণা করা হয় তাওরাতে উদ্ধৃত দাজুন মন্দিরটি এই এলাকায়ই স্থাপিত ছিল। এলী যাজকের যুগ অতিক্রান্ত হইয়া গেলে বনী ইসরাঈলের অন্যতম কার্যী শামূঈল (আ) আল্লাহ্র পক্ষ হইতে নবী নিযুক্ত হইলেন (আবদুল ওয়াহহাব আন-নাজজার, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৩০০; হিফজুর রহমান সিউহারীবী, প্রাগুক্ত)।
এই সম্পর্কে বাইবেলে 'শামূয়েলের দর্শন প্রাপ্তি' (৩-১-২১) শিরোনামে যাহা বলা হইয়াছে তাহার সারমর্ম প্রায় একই (বাইবেল পুরাতন ও নতুন নিয়ম, শিরোনাম, শমূয়েলের দর্শন প্রাপ্তি, অধ্যায় ৩ঃ ১-২১, বাংলাদেশ বাইবেল সোসাইটি ঢাকা, ৪২১ পৃ.)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আল-কুরআনে শামূঈল (আ) প্রসঙ্গ

📄 আল-কুরআনে শামূঈল (আ) প্রসঙ্গ


আগেই বলা হইয়াছে যে, সরাসরি আল-কুরআনে শামুঈল (আ)-এর নামের কোন উল্লেখ নাই। তবে তাফসীরকারগণ আল-কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াত তাঁহার সহিত সংশ্লিষ্ট করিয়া বলিয়াছেন, এই ঘটনাটি শামূঈল (আ)-এর সহিত সম্পৃক্ত। ইরশাদ হইয়াছে: اَلَمْ تَرَ إِلَى الْمَلَأُ مِنْ بَنِي إِسْرَائِيلَ مِنْ بَعْدِ مُوسَى إِذْ قَالُوا لِنَبِي لَهُمُ ابْعَتْ لَنَا مَلِكًا تُقَاتِلُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ قَالَ هَلْ عَسَيْتُمْ إِنْ كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِتَالُ أَلا تُقَاتِلُوا قَالُوا وَمَا لَنَا إِلَّا نُقَاتِلَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَقَدْ أَخْرِجْنَا مِنْ دِيَارِنَا وَابْنَائِنَا فَلَمَّا كُتِبَ عَلَيْهِمُ الْقِتَالُ تَوَلَّوْا إِلَّا قَلِيْلًا مِّنْهُمْ وَاللَّهُ عَلِيمٌ بِالظَّالِمِينَ ، وَقَالَ لَهُمْ نَبِيُّهُمْ إِنَّ اللَّهَ قَدْ بَعَثَ لَهُمْ طَالُوتَ مَلَكًا قَالُوا أَنِّى يَكُونُ لَهُ الْمُلْكُ عَلَيْنَا وَنَحْنُ أَحَقُّ بِالْمُلْكِ مِنْهُ وَلَمْ يُؤْتَ سَعَةً مِّنَ الْمَالِ قَالَ إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَهُ عَلَيْكُمْ وَزَادَهُ بَسْطَةً فِي العِلمِ والجِسْمِ وَاللَّهُ يُؤْتِي مُلْكَهُ مَنْ يُشَاءُ وَاللَّهُ وَاسِعٌ علِيمٌ . ( البقرة ٢٤٦-٢٤٧)
"তুমি কি মূসার পরবর্তী বনী ইসরাঈল প্রধানদেরকে দেখ নাই? তাহারা যখন তাহাদের নবীকে বলিয়াছিল, আমাদের জন্য একজন রাজা নিযুক্ত কর যাহাতে আমরা আল্লাহ্র পথে যুদ্ধ করিতে পারি। সে বলিল, ইহা তো হইবে না যে, তোমাদের প্রতি যুদ্ধের বিধান দেওয়া হইলে তখন আর তোমরা যুদ্ধ করিবে না? তাহারা বলিল, আমরা যখন স্ব স্ব আবাস ভূমি ও স্বীয় সন্তান-সন্তুতি হইতে 'বহিষ্কৃত হইয়াছি, তখন আল্লাহর পথে কেন যুদ্ধ করিব না? অতঃপর যখন তাহাদের প্রতি যুদ্ধের বিধান দেওয়া হইল তখন তাহাদের স্বল্প সংখ্যক ব্যতীত সকলেই পৃষ্ঠ প্রদর্শন করিল এবং আল্লাহ যালিমদের সম্বন্ধে সবিশেষ অবহিত। আর তাহাদের নবী তাহাদেরকে বলিয়াছিল, আল্লাহ অবশ্যই তালূতকে তোমাদের রাজা করিয়াছেন। তাহারা বলিল, আমাদের উপর তাহার রাজত্ব কিরূপে হইবে, যখন আমরা তাহা অপেক্ষা রাজত্বের অধিক হকদার এবং তাহাকে প্রচুর ঐশ্বর্য দেওয়া হয় নাই! নবী বলিল, আল্লাহ অবশ্যই তাহাকে তোমাদের জন্য মনোনীত করিয়াছেন এবং তিনি তাহাকে জ্ঞানে ও দেহে সমৃদ্ধ করিয়াছেন। আল্লাহ যাহাকে ইচ্ছা স্বীয় রাজত্ব দান করেন। আল্লাহ্ প্রাচুর্যময়, প্রজ্ঞাময়" (২: ২৪৬-২৪৭)।
এই আয়াতে বনী ইসরাঈলের যেই নবীর কথা উল্লেখ করা হইয়াছে তিনি হইলেন শামূঈল (আ)। অধিকাংশ তাফসীরকার এই অভিমত পোষণ করিয়াছেন। বিখ্যাত তাফসীরকার ও ইতিহাসবিদ আল্লামা ইব্‌ন কাছীর এই সম্পর্কে বলেন, অধিকাংশ তাফসীরকার বলিয়াছেন, এই আয়াতের সংশ্লিষ্ট নবী হইলেন শামুঈল (আ)। কেহ কেহ মনে করেন, তিনি হইলেন শামউন (আ), আবার অনেকের অভিমত হইল শামূঈল ও শামউন একই ব্যক্তি। একটি দুর্বল অভিমতে রহিয়াছে, তিনি হইলেন যুশা' (আ); ইহা একেবারে অবাস্তব অভিমত। কারণ ইবন জারীর আত-তাবারী তাঁহার ইতিহাস গ্রন্থে বলিয়াছেন, যূশা' (আ)-এর মুত্যু ও শামুঈল (আ)-কে নবী হিসাবে প্রেরণের মধ্যে চার শত ষাট বৎসরের ব্যবধান ছিল (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১/২খ. ৬)। মুহাম্মাদ রাশীদ রিদাও অনুরূপ মত পোষণ করেন (রাশীদ রিদা, তাফসীরুল মানার, ২খ., ৪৭৫; আত-তাফসীরুল কাবীর, ৬খ., ১৭১)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00