📄 অঞ্চল বিভাজন
তিনি ওহীর মাধ্যমে আদেশ প্রাপ্ত হইয়া বানু ইসরাঈলের মাঝে বিজিত ও তৎপার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহ বিভাজন করিয়াছিলেন (বিস্তারিত বিবরণের জন্য পবিত্র বাইবেল, দ্বিতীয় বিবরণ, ৩: ১২, ১৬-১৭; যিহোশূয়ের পুস্তক, ১৩: ১৫-২৩)।
📄 কর্মকর্তা ও বিচারক নিয়োগ
দ্বিতীয়ত, হযরত ইউশা' (আ) প্রশাসনিক শৃংখলা বিধানে বানু ইসরাঈলের মধ্যে প্রতি এক হাজার, প্রতি এক শত, প্রতি দশজন এইভাবে বিভক্ত করিয়া প্রতি ইউনিটের জন্য একজন নেতা নির্ধারণ করিয়া দেন। আর শরঈ আইনে বিচার কাজের সুবিধার্থে বিচারক নিয়োগ করেন (বাইবেলের যিহোশূয়, ১৩: ১৫-২৩)।
📄 সমাজ কল্যাণমূলক কর্ম
হযরত ইউশা' (আ)-এর সংস্কারমূলক কাজের মধ্যে আর একটি উল্লেখযোগ্য দিক হইল ছয়টি আশ্রয় নগর নির্ণয়। এইসব নগরে অজ্ঞাতসারে ও ভুলক্রমে হত্যাকারীর প্রতিশোধের হাত হইতে রক্ষা পাওয়ার জন্য আশ্রয় গ্রহণ করিতে পারিত।
হযরত ইউশা' (আ) সামরিক ও রাজনৈতিক কার্যাবলীর পাশাপাশি দীনী দাওয়াতের কাজও সম্পন্ন করিয়াছেন। তিনি বিভিন্ন ক্ষেত্রে বানু ইসরাঈল ও তাহাদের নেতৃবৃন্দ এবং যাজকগণের সামনে ওয়া'জ-নসীহত করিতেন। বানূ রূবেন, বানু গাদ এবং বানু মনঃশি, যাহাদেরকে জর্দানের পূর্বাঞ্চল দিয়াছিলেন তাহাদের সেই সমস্ত অঞ্চলে পাঠাইবার প্রাককালে তিনি এক ভাষণে বলিয়াছিলেন:
"বহু দিন হইতে অদ্য পর্যন্ত তোমরা আপন আপন ভ্রাতৃগণকে ছাড়িয়া যাও নাই, কিন্তু তোমাদের সদাপ্রভুর আজ্ঞা পালন করিয়া আসিয়াছ। সম্প্রতি তোমাদের ইশ্বর সদাপ্রভু আপন প্রতিজ্ঞানুসারে তোমাদের ভ্রাতৃগণকে বিশ্রাম দিয়াছেন, অতএব এখন তোমরা আপন আপন তাম্বুতে অর্থাৎ সদাপ্রভুর দাস মোশির যদানের পরপারে যে দেশ তোমাদিগকে দিয়াছেন, আপনাদের সেই অধিকার দেশে ফিরিয়া যাও। কেবল এই বিষয়ে যত্নবান থাকিও এবং সদাপ্রভুর দাস মোশি তোমাদিগকে যে আজ্ঞা ও ব্যবস্থা দিয়াছেন, তাহা পালন করিও, তোমাদের সদাপ্রভুকে প্রেম করিও, তাঁহার সমস্ত পথে চলিও, তাঁহার আজ্ঞা সকল পালন করিও। তাঁহাতে আসক্ত থাকিও এবং সমস্ত হৃদয় ও সমস্ত প্রাণের সহিত তাঁহার সেবা করিও” (যিহোশূয়ের পুস্তক, ২২: ৩-৫)। পরে যিহোশূয় তাহাদিগকে আশীর্ব্বাদ করিয়া বিদায় করিলেন (প্রাগুক্ত, ২২:৬)।
এইভাবে ইসরাঈলীদের শত্রুদের পক্ষ হইতে কোন রকম আক্রমণের আশংকা রহিল না। হযরত ইউশা' (আ) দুর্বল ও বয়োবৃদ্ধ হইয়া যাইতেছিলেন। তখন ইসরাঈলী নেতৃবৃন্দ, বিচারকমণ্ডলী এবং বিভিন্ন পদে সমাসীন ব্যক্তিবর্গকে একত্র করিয়া তিনি এক উপদেশমূলক ভাষণ দিয়াছিলেন যাহার কিয়দংশ নিম্নরূপ:
"অতএব তোমরা মোশির ব্যবস্থা গ্রন্থে লিখিত সমস্ত বাক্য পালন ও রক্ষণ করিবার জন্য সাহস কর, তাহার দক্ষিণে কিংবা বামে ফিরিও না। আর এই জাতিগণের যে অবশিষ্ট লোক তোমাদের মধ্যে রহিল তাহাদের মধ্যে প্রবেশ করিও না, তাহাদের দেবতাদের নাম লইও না, তাহাদের নামে দিব্য করিও না, এবং তাহাদের সেবা ও তাহাদের কাছে প্রণিপাত করিও না, কিন্তু অদ্য পর্যন্ত যেমন করিয়া আসিতেছ তদ্রূপ তোমাদের সদাপ্রভুতে আসক্ত থাক। কেননা সদাপ্রভু তোমাদের সম্মুখ হইতে বৃহৎ বলবান জাতিদিগকে তাড়াইয়া দিয়াছেন, প্রভুর ক্রোধ প্রজ্জ্বলিত হইবে এবং তাঁহার দত্ত এই উত্তম দেশ হইতে তোমরা ত্বরায় বিনষ্ট হইবে" (যিহোশূয়ের পুস্তক, ২৩:৬ঃ ১৬)।
অতঃপর তিনি শিটীম বা সিকিম (Shechem)-এ সকল ইসরাঈলী, তাহাদের নেতৃবৃন্দ, বিচারক মণ্ডলী এবং অন্যান্য পদস্থ কর্মকর্তা ও কর্মচারীদেরকে একত্র করেন। সেইখানে তিনি অত্যন্ত প্রাঞ্জল ও হৃদয়গ্রাহী ভাষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ প্রদান করেন আর তাহাদের সকলকে সম্বোধন করিয়া বলেন, পুরাকালে তোমাদের পিতৃপুরুষেরা যেমন হযরত ইবরাহীম (আ) নাহোর-এর পিতা তারেহ সুদূর ফুরাত নদীর তীরে বাস করিত যেইখানে শিরক ও মূর্তিপূজা ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা হযরত ইবরাহীম (আ)-কে পথপ্রদর্শক হিসাবে প্রেরণ করেন এবং কনান ভূমির কর্তৃত্ব তাঁহাকে দান করেন। আর তাঁহার সন্তান-সন্ততিরাই বৃদ্ধি পাইতে পাইতে এইসব এলাকায় ছড়াইয়া যায়। অতঃপর যখন বানু ইসরাঈল মিসরে আবার গোলামীর যিন্দিগী শুরু করে, তখন হযরত মূসা (আ) ও হারূন (আ)-কে নবুওয়াত দিয়া প্রেরণ করেন। তাহাদের মাধ্যমে সেই গোলামী হইতে নাজাত লাভ হয়। অতঃপর কনান ভূমির বিভিন্ন দুর্ধর্ষ শাসকদের মুকাবিলায় আল্লাহ তোমাদেরকে বিজয় দান করেন এবং তাহাদের রাজত্বাধীন অঞ্চলসমূহ তোমাদের কর্তৃত্বে প্রদান করেন এবং তোমাদেরকে এমন দেশ প্রদান করেন যাহা অর্জনের জন্য তেমন কোন শ্রম দিতে হয় নাই কিংবা তাহা পত্তনও কর নাই। তাহা ছাড়া ফুলে-ফলে সজ্জিত এমন অনেক বাগবাগিচা প্রদান করিয়াছেন যাহা তোমরা বপণ কর নাই (দ্র. যিহোশূয়ের পুস্তক, ২৪: ১-১৩)।
অতঃপর হযরত ইউশা' (আ) এইসব নেয়ামত উল্লেখ পূর্বক তাহাদেরকে বলেন, "অতএব এখন তোমরা সদাপ্রভুর তর কর, সরলতায় ও সত্যে তাঁহার সেবা কর, আর তোমাদের পিতৃপুরুষেরা (ফুরাৎ) নদীর ওপারে ও মিসরে যে দেবগণের সেবা করিত, তাহাদিগকে দূর করিয়া দেও" (প্রাগুক্ত, ২৪:১৪)।
এইভাবে হযরত ইউশা' (আ) তাহাদের নিকট প্রচারকার্য চালাইয়া যান। তিনি একমাত্র আল্লাহ্ ইবাদত করিবার জন্য তাহাদের নিকট হইতে স্বীকারোক্তি ও অঙ্গীকার আদায় করেন। আর তাহারাও ইহার উপর অটল থাকিবে বলিয়া ঘোষণা দিল। শেষ পর্যন্ত তিনি এই বাণীগুলিকে প্রস্তর খণ্ডে লিখিয়া একটি গাছের তলদেশে পুতিয়া রাখিয়াছিলেন।
📄 হযরত ইউশা (আ)-এর ইনতিকাল
হযরত ইউশা' (আ) সুদীর্ঘ সামরিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রচারমূলক কাজ করিতে করিতে একসময় অত্যন্ত দুর্বল ও বয়োবৃদ্ধ হইয়া পড়েন। এইভাবে বানু ইসরাঈলকে মোটামুটিভাবে বিজয়ী বেশে রাখিয়া একদা তিনি ইনতিকাল করেন। তিনি কত সালে ইনতিকাল করেন, তাহা নির্দিষ্টভাবে জানা যায় না। তবে ঐতিহাসিকগণের মতে তিনি মূসা (আ)-এর পর ২৭ বৎসর জীবিত ছিলেন (দ্র. ইব্ন কাছীর, প্রাগুক্ত, ১খ, পৃ. ৩০৩; আরও দ্র, ইবনুল আছীর, প্রাগুক্ত, ১খ, পৃ. ১৫৫)। তিনি কত বৎসর জীবিত ছিলেন তাহা লইয়া কিছু মতভেদ আছে। যিহোশূয়ের পুস্তকে লেখা আছে যে, তিনি এক শত দশ বৎসর জীবিত ছিলেন (যিহোশূয়ের পুস্তক, ১৪: ২৯)। ইবনুল আছীরের মতে এক শত ছাব্বিশ বৎসর (ইবনুর আছীর, প্রাগুক্ত) ইন্ন কাছীরের মতে এক শত সাতাইশ বৎসর (ইন্ন কাছীর, প্রাগুক্ত)। যিহোশূয়ের পুস্তকে উল্লেখ আছে, গাশ পর্ব্বতের উত্তরে পর্ব্বতময় ইফ্রায়িম প্রদেশস্থ তিমনাথ সেরাহ শহরে তাঁহাকে দাফন করা হয় (দ্র. যিহোশূয়ের পুস্তক, ২৪:৩০)।