📄 জয় নগরী জয়
আরীহা নগরী জয়ের পর হযরত ইউশা' (আ) আল্লাহ্র নির্দেশে পুরাতন 'অয়' নগরী জয়ের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন এবং অয় নগরীবাসীদের সাথে যুদ্ধে এক বিশেষ কৌশল অবলম্বন করেন। তিনি তিন হাজার বিশিষ্ট এক শক্তিশালী সৈন্যবাহিনী গোপনে রাত্রিতে অয় নগরীর পশ্চাৎ দিকে প্রেরণ করেন। অতঃপর সকালে নিজ সৈন্যবাহিনীসহ অয়বাসীদের সন্মুখ সমরে অবতীর্ণ হন। অয়বাসীরা যখন হযরত ইউশা' (আ)-এর সৈন্যবাহিনী আক্রমণ করিল, তখন তিনি তাঁহার সৈন্যদেরকে লইয়া পিছনে পলায়ন করেন। ইহাতে অয়বাসীরাও শহর হইতে বাহির হইয়া ইসরাঈলী সৈন্যদের পশ্চাৎ অনুসরণ করে। আর এইভাবে নগরী শূন্য হইয়া গেল। ইহার পিছনে লুকাইয়া থাকা তিন হাজার ইসরাঈলী সৈন্য নগরের ভিতরে প্রবেশ করিয়া আগুন লাগাইয়া দেয়। অয়বাসীরা বাহির হইতে পিছনে ফিরিয়া এই দৃশ্য দেখিয়া বিচ্ছিন্ন হইয়া যায়। তাহাতে হযরত ইউশা' (আ) তাহাদের উপর সসৈন্যে দুই দিক হইতে পাল্টা আক্রমণ চালাইয়া তাহাদের পরাস্ত করিয়া উক্ত নগরী জয় করিয়াছিলেন (যিহোশূয়ের পুস্তক, ৭ম অধ্যায়)। উক্ত যুদ্ধে সকল অয়বাসীকে হত্যা করিয়া নগরী পোড়াইয়া দেওয়া হইয়াছিল বলিয়া উল্লেখ আছে (প্রাগুক্ত, ৬: ২৪-২৮)।
📄 গিবয়োনবাসীদের সাথে সন্ধি স্থাপন
বায়তুল মুকাদ্দাসের পার্শ্ববর্তী আর একটি শহর ছিল গিবিয়োন। যিহোশূয়ের পুস্তকে আসিয়াছে: "গিবিয়োন নগর রাজধানীর ন্যায় বৃহৎ এবং অয় অপেক্ষাও বড়, আর তথাকার সমস্ত লোক বলবান ছিল" (যিহোশূয়ের পুস্তক, ১০:২)।
বানু ইসরাঈলের শিবিরিস্থিত গিলগল (জিলজাল) হইতে ইহা ৩ (তিন) দিনের দূরত্বে অবস্থিত (প্রাগুক্ত, ৯: ১৭)। তাহাদের রাজত্ব পার্শ্ববর্তী কফীরা, বৈরূত, কিরিয়ৎ যিয়ারী পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল (প্রাগুক্ত, ৯: ১৭-১৮)। গিবিয়োনবাসীরা আয়াহা ও অয় নগরীর পতন ও ধ্বংসলীলা সম্পর্কে অবহিত হইয়া প্রচণ্ডভাবে ভীত-সন্ত্রস্ত হইয়া যায়। তখন তাহারা বানু ইসরাঈলের সাথে সন্ধি স্থাপনের উদ্যোগ নিল। অয় ইহার জন্য এক কূট-কৌশল অবলম্বন করে। তাহা হইল সরাসরি দূত না পাঠাইয়া ছেড়া নোংরা লেবাস পরিধান করিয়া তালিকাযুক্ত জুতা পরিয়া এবং শুষ্ক রুটি লইয়া একদল গিবিয়োনবাসী বানু ইসরাঈল শিবিরে হাযির হইল এবং বলিল, আমরা আপনাদের দাস। অনেক দূর হইতে আসিয়াছি। অতএব আপনারা আমাদের সাথে নিয়ম স্থির করুন (প্রাগুক্ত, ১:৬, ১১)। "আর যিহোশূয় তাহাদের সহিত সন্ধি করিয়া যাহাতে তাহারা বাঁচে, এমন নিয়ম করিলেন এবং মণ্ডলীর অধ্যক্ষগণ তাহাদের কাছে শপথ করিলেন" (প্রাগুক্ত, ৯: ১৬)।
কিন্তু তিন দিন পরই জানাজানি হইয়া যায় যে, আগন্তুক ব্যক্তিরা গিরিয়োনবাসী। তাহারা ছলচাতুরী করিয়া আশ্রয় লইয়াছে। হযরত ইউশা' (আ) তাহাদের সঙ্গে সন্ধি করিলেন তাহাদেরকে হত্যা করেন নাই, বরং তাহদের প্রবঞ্চনার জন্য তাহাদিগকে কাঠ ছেদন ও পানি বহন কর্মে নিযুক্ত করিলেন দাস-দাসীরূপে গণ্য করিয়া (প্রাগুক্ত, ৯ম অধ্যায়)।
📄 জেরুজালেম নগরীতে প্রবেশ
জেরুসালেম নগরীতে যেইখানে বায়তুল মুকাদ্দাস অবস্থিত, পুরাতন সেই নগরীর শাসক ছিলেন আদোনীষেদক (প্রাগুক্ত, ১০: ১)।
তিনি আরীহা ও অয় নগরীর পতন, গিবিয়োনবাসীর সন্ধি ইত্যাদির মাধ্যমে বনী ইসরাঈলের অগ্রযাত্রার সংবাদ শ্রবণ করিয়া হেবরনের রাজা হোহম, যারমূতের রাজা পিরাম, লাখীশের রাজা যাফিয় এবং ইগ্নোনের রাজা দবীরের নিকট দূত পাঠাইয়া তাহাদিগকে বানু ইসরাঈলের মুকাবিলায় একত্র হইবার আহবান জানায়। ইহাতে প্রথমত তাহারা গিবিয়োনবাসীদের উপরই আক্রমণ করিতে মনস্থ করিল। কেননা ইহারা বানু ইসরাঈলের সাথে সন্ধি করিয়াছে।
যাহা হউক পাঁচ রাজার সম্মিলিত জোট যখন গিবিয়োনবাসীদের উপর আক্রমণ চালাইল, তখন তাহারা জিলজালে (গিলগল) তাঁবুতে অবস্থানরত হযরত ইয়ূশা (আ)-কে তাহাদের সাহায্যে আসিবার জন্য আহবান জানাইল। এইদিকে হযরত ইয়ূশা (আ) এই খবর শুনিয়া রাতারাতি ইসরাঈলী সৈন্যদেরকে লইয়া সম্মিলিত রাজ-বাহিনীর উপর আক্রমণ পরিচালনা করেন এবং বায়ত হারূনের পথ দিয়া তাহাদেরকে তাড়া করেন। আর এইভাবে অসেকা ও মক্কেদা এলাকা পর্যন্ত তাহাদেরকে পিছু হটিতে বাধ্য করেন। আর বায়ত হারূনের পথিমধ্যে তাহাদের উপর আল্লাহ্ পক্ষ হইতে গযবস্বরূপ প্রচণ্ড শিলাবৃষ্টি হয়। তাহাতে ঐ সম্মিলিত সৈন্যবাহিনী ব্যাপক হারে মারা যায় এবং সেই পাঁচজন রাজা মক্কেদার গুহায় আশ্রয় নেওয়ার পর হযরত ইউশা' (আ) তাহা জানিতে পারিয়া তাহাদের সকলকে ধরিয়া আনিবার আদেশ দেন এবং হত্যা করিয়া উহাদের মৃতদেহ গাছে ঝুলাইয়া রাখেন।
উল্লেখ্য, ঐ পাঁচ রাজার সাথে যুদ্ধই ছিল জেরুসালেম তথা বায়তুল মুকাদ্দাস ভূমিতে প্রবেশের মাইল ফলক। যুদ্ধ চলাকালে শুক্রবার সূর্যাস্ত সমাগত হইতেছিল। শনিবার শুরু হইয়া গেলে বানু ইসরাঈলের পক্ষে যুদ্ধ করা সম্ভব হইবে না। তখন হয়ত নিরস্ত্র বানু ইসরাঈলকে শত্রুবাহিনী পরাস্ত ও হত্যা করিবে। সেই আশংকায় হযরত ইউশা' (আ) আল্লাহ পাকের কাছে দু'আ করিলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত শত্রু সৈন্যদের পরাস্ত করা না যায় ততক্ষণ পর্যন্ত যেন শুক্রবারের সূর্য অস্ত না-যায়। আর তাহাই ঘটিল। আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণিত এক হাদীসে আসিয়াছে, মহানবী (স) বলিয়াছেন:
"নবীগণের মধ্যে কোন এক নবী জিহাদে রওয়ানা দিলেন, তাহার পর তিনি জিহাদে লিপ্ত হন এবং আসরের সালাতের সময় কিংবা তাহার কাছাকাছি সময়ে যুদ্ধক্ষেত্রের নিকটবর্তী এক গ্রামে পৌছেন। তখন তিনি সূর্যকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, তুমিও আদিষ্ট এবং আমিও আদিষ্ট। ইয়া আল্লাহ! তুমি ইহাকে আমার জন্য কিছুক্ষণ থামইয়া রাখ। সূর্য থামাইয়া দেওয়া হইল। অবশেষে আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে বিজয় দান করিলেন (সহীহ মুসলিম, ২খ, পৃ. ৮৫)।
"সেই দিন যিহোশূয় সদাপ্রভুর কাছে নিবেদন করিলেন, আর তিনি ইসরাঈলের সাক্ষাতে কহিলেন, "সূর্য, তুমি স্থগিত হও গিবিয়োনে, আর চন্দ্র, তুমি আয়ালোন তলভূমিতে।" "তখন সূর্য স্থগিত হইল ও চন্দ্র স্থির থাকিল, যাবৎ সেই জাতি শত্রুদিগের প্রতিশোধ না লইল" (যিহোশূয়ের পুস্তক, ১০: ১২-১৩)।
বাইবেলের বর্ণনা অনুযায়ী কোন কোন আলেম ঘটনাটি আরীহা নগরী বিজয়ের সময় হযরত ইউশা' (আ)-এর মু'জিযা হিসাবে উল্লেখ করিয়াছেন। আল্লামা কুরতুবী এই মতের সমর্থক (কুরতুবী, প্রাগুক্ত, ৬খ, পৃ. ১১৩)। তাহা ছাড়া উল্লিখিত হাদীছটিতে গনীমতের মালে খেয়ানতের ঘটনাটি ও আরীহা নগরী বিজয়ের ঘটনার প্রতিই ইঙ্গিতবহ বলিয়া মনে হয়। অপরদিকে আল্লামা ইব্ন কাছীর (র)-এর মতে ঘটনাটি বায়তুল মুকাদ্দীস বিজয়ের সময়ে সংঘটিত হয়।
📄 হযরত ইউশা (আ) কর্তৃক অন্যান্য অঞ্চল জয়
উল্লেখ্য, ঐ পাঁচ রাজার পতনের পর তথা ইসরাঈলীগণ বায়তুল মুকাদ্দাস অঞ্চলে প্রবেশের পর সেই দিবসেই মক্কেদা বিজয় করেন এবং সেইখানের অধিবাসীদের হত্যা করেন (প্রাগুক্ত, ১০: ২৮)। এইভাবে লাখীশ বিজয়ের সময় গেষয়ের রাজা লাখীশবাসীদের সহায়তা করিবার জন্য আসিলে ইউশা' (আ) তাহাকেও হত্যা করিলেন (প্রাগুক্ত, ১০: ৩২-৩৩) এবং পার্শ্ববর্তী অন্যান্য রাজত্ব জয় করেন।
যিহোশূয়ের পুস্তকে আরো আসিয়াছে যে, তিনি উত্তরাঞ্চলীয় কনানীয় রাজাদেরকেও পরাস্ত করিয়া সেই সমস্ত অঞ্চল জয় করিয়াছিলেন (প্রাগুক্ত, ১১: ১-২৩)। ইব্ন কাছীর উল্লেখ করিয়াছেন, হযরত ইউশা' ইব্ন নূন (আ) যুদ্ধ করিতে করিতে শাম অঞ্চলের ৩১জন রাজকে পরাভূত করিয়াছিলেন (ইব্ন কাছীর, প্রাগুক্ত, ১খ, পৃ. ৩০১)।
হযরত ইয়ূশা (আ) এইভাবে সকল অঞ্চলে আল্লাহর দীনকে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছিলেন। কিন্তু বানু ইসরাঈল জাতি আল্লাহ্ সেই নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করে নাই। তাহাদেরকে বলা হইয়াছিল, তোমরা বিজয়ী হওয়ায় সিজদা অবনত মস্তকে বায়তুল মুকাদ্দাসে প্রবেশ কর। কিন্তু তাহারা উহার উল্টা করিল তথা দম্ভ প্রকাশে সেইখানে প্রবেশ করিল, যাহা আল-কুরআনেও উক্ত হইয়াছে:
وَإِذْ قُلْنَا ادْخُلُوا هذه القَرْيَةَ فَكُلُوا مِنْهَا حَيْثُ شِئْتُمْ رَغَدًا وَادْخُلُوا الْبَابَ سُجْدًا وَقُولُوا حِطَّةٌ نَغْفِرْ لَكُمْ خَطِيكُمْ وَسَنَزِيدُ الْمُحْسِنِينَ. فَبَدِّلَ الَّذِينَ ظَلَمُوا قَوْلاً غَيْرَ الَّذِي قِيلَ لَهُمْ فَأَنْزَلْنَا عَلَى الَّذِينَ ظَلَمُوا رِجْرًا منَ السَّمَاء بِمَا كَانُوا يَفْسُقُونَ.
স্মরণ কর, যখন আমি বলিলাম, "এই জনপদে প্রবেশ কর, যথা ও যেথা ইচ্ছা স্বচ্ছন্দে আহার কর, নতশিরে প্রবেশ কর দ্বার দিয়া এবং বল, ক্ষমা চাই। আমি তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করিব এবং সৎকর্মপরায়ণ লোকদের প্রতি আমার দান বৃদ্ধি করিব। কিন্তু যাহারা অন্যায় করিয়াছিল তাহার। তাহাদিগকে যাহা বলা হইয়াছিল তাহার পরিবর্তে অন্য কথা বলিল। সুতরাং অনাচারীদের প্রতি আমি আকাশ হইতে শান্তি প্রেরণ করিলাম; কারণ তাহারা সত্য ত্যাগ করিয়াছিল" (২:৫৮-৫৯)।
সহীহ বুখারীর রিওয়ায়াতে উল্লেখ আছে, তাহাদেরকে বলা হইয়াছিল حطة অর্থাৎ حط غيا خظننا অর্থাৎ “আমাদের গুনাহগুলি মিটাইয়া দিন, কিন্তু তাহারা তাহা পরিবর্তন করিয়া বলিতেছিল حبة في شعرة )শীষের মধ্যে শস্যবীজ দিন) অর্থাৎ তাহারা অনেকটা তামাশাচ্ছলে তাহা বলিতে শুরু করিয়াছিল (ইব্ن কাছীর, প্রাগুক্ত, ১খ, পৃ. ৩০২; আরও দ্র. কাসাসুল কুরআন, অনু. মাওলানা নূরুর রহমান, এমদাদিয়া লাইব্রেরী, ঢাকা, ১৯৯৭ খৃ., পৃ. ২৩২)। সেই কারণে আসমানী গযব তাহাদের উপর অবতীর্ণ হইয়াছিল। এই গযব কাহারো মতে প্লেগ রোগ, কাহারো মতে শিলাবৃষ্টি (প্রাগুক্ত, পৃ. ৩০৩); রূহুল-মা'আনী, ১খ, ২৬৭)।