📄 নবুওয়াত লাভ
পূর্বেই উল্লেখ করা হইয়াছে যে, হযরত মূসা (আ)-এর জীবদ্দশাতেই হযরত ইউশা' ইব্ন নূন (আ)-এর নবুওয়াত প্রদানের সুসংবাদ দেওয়া হইয়াছিল। আল্লাহ মূসা (আ)-কে হযরত ইয়ূশ (আ)-এর মাথায় হাত রাখিয়া দু'আ করিতে বলিয়াছিলেন। বাইবেলে উল্লেখ আছে: "পরে সদাপ্রভু মোশিকে কহিলেন, দেখ, তোমার মৃত্যুদিন আসন্ন, তুমি যিহোশূয়কে ডাক এবং তোমরা উভয়ে সমাগম তাম্বুতে উপস্থিত হও, আমি তাহাকে আজ্ঞা দিব। তাহাতে মোশি ও যিহোশূয় গিয়া সমাগম তাম্বুতে উপস্থিত হইলেন" (দ্বিতীয় বিবরণ ৩১: ১৪-১৫)।
এক উক্তির দ্বারা বুঝা যায়, আল্লাহ পাক হযরত মূসা (আ)-এর মাধ্যমেই হযরত ইউশা'কে এক সংবাদে সরাসরি আদেশ দান, নবুওয়াত, সাহায্য এবং তাঁহার দ্বারা পবিত্রভূমি উদ্ধারের জন্য নিযুক্তির কথা জানাইয়া দিয়াছিলেন। অতঃপর যখন মূসা (আ) ইনতিকাল করেন তখন সরাসরি তাঁহাকে নবুওয়াতের দায়িত্ব পালন করিবার জন্য আদেশ দেওয়া হয় এবং তাঁহার নিকট ওহীও আসিতে থাকে।
আহলে কিতাব (ইয়াহুদী ও নাসারা) সকলে হযরত ইউশা' (আ)-এর নবুওয়াত সম্পর্কে ঐক্যমত পোষণ করে (ইব্ন কাছীর, প্রাগুক্ত, পৃ. ২৯৭)। এমনকি ইয়াহুদীদের মধ্যে সামেরীয় নামে এক উপদল রহিয়াছে, যাহারা মূসা (আ)-এর পর আর কোন ব্যক্তিকে নবী হিসাবে মানে না একমাত্র হযরত ইউশা' ইব্ন নূন ব্যতীত। যেহেতু তাঁহার কথা বাইবেলে স্পষ্টভাবে আসিয়াছে (প্রাগুক্ত, পৃ. ১৯৮)। ইব্ন কাছীর উপরিউক্ত বর্ণনাটি সম্পর্কে বলেন, উপরিউক্ত বর্ণনাটি মানিয়া নেওয়া যায় না। কেননা ইবন ইসহাকের অন্য এক বর্ণনায় দেখা যায় যে, হযরত মূসা (আ)-এর মৃত্যু অবধি তাঁহার উপর আদেশ-নিষেধ সম্বলিত ওহী আসিতেছিল (প্রাগুক্ত, পৃ. ১৯৮)।
মোটকথা, মূসা (আ)-এর জীবদ্দশায় তাঁহার নবুওয়াত স্থানান্তরিত হয় নাই। তিনি মৃত্যু অবধি আল্লাহ্র নবী ছিলেন। তাঁহার ইনতিকালের পরই ইউশা' (আ) নবুওয়াত লাভ করেন। বাইবেলেও ইহার সমর্থন পাওয়া যায় : "মোশির মৃত্যু হইলে পর সদাপ্রভু নূনের পুত্র যিহোশূয় নামে মোশির পরিচারককে কহিলেন, আমার দাস মোশির মৃত্যু হইয়াছে। এখন উঠ, তুমি এই সমস্ত লোক লইয়া যদ্দন পার হও” (বাইবেলের যিহোশয় ১: ১-২)।
📄 দায়িত্ব ও তাবলীগ
হযরত ইউশা' (আ) নবুওয়াত লাভ করিবার পর নিজেকে দাওয়াত ও তাবলীগে নিবিষ্ট করেন। তাঁহার জীবনী পর্যালোচনা করিলে দেখা যায়, তিনি বিভিন্ন দাওয়াতী কাজকর্ম আঞ্জাম দিয়াছিলেন।
প্রথমত, তিনি যুদ্ধ পরিচালনা করিয়া মুশরিকদের নিকট হইতে পবিত্র ভূমি বায়তুল মুকাদ্দাস উদ্ধার করিয়াছিলেন। সেই ভূমি যাহা হযরত ইবরাহীম (আ) ও তদীয় পুত্র ইসহাক ও প্রোপৌত্র ইয়া'কূব (আ) আবাদ করিয়াছিলেন। তেমনি তৎকালে মুসলিম জনগোষ্ঠী হিসাবে স্বীকৃত বানু ইসরাঈলের শত্রু বিনাশ করিবার লক্ষ্যে সেই পবিত্র ভূমির পার্শ্বস্থ অঞ্চলগুলিও জয় করিয়াছিলেন।
দ্বিতীয়ত, প্রশাসনিক শৃংখলা প্রতিষ্ঠাকরণ।
তৃতীয়ত, সমাজ সংস্কারমূলক কাজ সম্পাদন।
চতুর্থত, ওয়াজ-নসীহত।
📄 আরীহা নগরী বিজয় ও পবিত্র ভূমিতে প্রবেশ
হযরত ইউশা' ইব্ন নূন (আ) সমকালীন প্রসিদ্ধ নগরী আরীহা জয় করিয়াছিলেন, যেইখানে দুর্ধর্ষ জাতিসমূহ বাস করিত। ইব্ন ইসহাকের বর্ণনামতে, হযরত মূসা (আ) নিজেই আরীহা নগরী জয় করিয়াছিলেন এবং পবিত্র ভূমি বায়তুল মাকদিসে প্রবেশ করিয়া বানু ইসরাঈলকে সেইখানে প্রতিষ্ঠিত করিয়া যান। হযরত ইউশা' (আ) ছিলেন তাঁহার সৈন্যবাহিনীর অগ্রবর্তী দলের নেতা। আর সেই জাতিসমূহের মাঝে বাস করিতেন বাল্আম ইব্ন বা'উর, যিনি ইসমে আজম জানিতেন। সেইজন্য তাহার স্বজাতি তাহাকে মূসা (আ) ও তাঁহার সৈন্যবাহিনীর উপর বদদু'আ করিতে বাধ্য করিয়াছিল। প্রথমে তিনি অসম্মতি প্রকাশ করেন। কিন্তু বারবার চাপের মুখে বদdu'আ করিলে তাহার জিহ্বা বুকের দিকে বাহির হইয়া যায়। যেই জন্য বদdu'আ করিতে পারেন নাই (ইব্ন কাছীর, প্রাগুক্ত, ১খ, পৃ. ৩০০)। কিন্তু প্রসিদ্ধ মত প্রথমটিই অর্থাৎ আরীহা বিজয়ী হইলেন হযরত ইউশা' (আ) এবং তিনিই ইসরাঈলীদের লইয়া পবিত্র ভূমিতে প্রবেশ করিয়াছিলেন।
ইবন কাছীর এই মতের স্বপক্ষে একাধিক যুক্তি প্রদর্শন করিয়াছেন। তাঁহার মতে, বাল'আমের বদ্দু'আ করিবার ঘটনাটি সম্ভবত তখনকার যখন মূসা (আ) মিসর ভূমি হইতে বাহির হইয়া বায়তুল মুকাদ্দাসে প্রবেশের ইচ্ছা করিয়াছিলেন। সম্ভবত ইবন ইসহাকের বর্ণনার উদ্দেশ্য তাহাই। কিন্তু তাঁহার পরবর্তী বর্ণনাকারিগণ ঐ বিষয়টি বুঝিতে পারেন নাই আর বাইবেলের বর্ণনায়ও এই সম্ভাবনারই কিছুটা সমর্থন পাওয়া যায়। সম্ভবত মূসা (আ)-এর সিনাইয়ে অবস্থানকালে কোন এক সময়ে ঘটনাটি সংঘটিত হইয়াছিল। কেননা বাল'আম বদ্দু'আ করিবার জন্য হসবান নামক পাহাড়ের চূড়ায় আরোহণ করিয়াছিলেন। আর ঐ পাহাড়টি বায়তুল মুকাদ্দাস হইতে অনেক দূরে অবস্থিত। অথবা ইহা ছিল মূসা (আ)-এর গঠিত সেন্যবাহিনীর উদ্দেশ্যেই, যাহার নেতৃত্বে ছিলেন হযরত ইউশা ইব্ন নূন (আ), যখন তিনি বায়তুল মুকাদ্দাসের উদ্দেশে তীহ ভূমি হইতে বাহির হইয়াছিলেন। আল্লামা সুদ্দী এই মত পোষণ করিয়াছেন (প্রাগুক্ত)। সুতরাং মূসা (আ)-এর প্রচেষ্টায় সৈন্যবাহিনী গঠিত হইলে তাহাদের সঙ্গে বায়তুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত তাঁহার থাকা জরুরী নহে।
বাল'আমের ঘটনাটি যে হযরত ইউশা' (আ)-এর আরীহা নগরীতে প্রবেশের পূর্বের ঘটনা তাহার একটি ইংগিত যিহোশূয়ের পুস্তকেও পাওয়া যায়ঃ "পরে সিপ্পোরের পুত্র মোয়াব রাজ বালাক উঠিয়া ইসরাঈলের সহিত যুদ্ধ করিল এবং লোক পাঠাইয়া তাহাদিগকে শাপ দিবার জন্য বিয়োরের পুত্র বিলিয়মকে ডাকাইয়া আনিল। কিন্তু আমি বিলিয়মের কথায় কর্ণপাত করিতে অসম্মত হইলাম। সে তাহাতে তোমাদিগকে কেবল আশীর্ব্বাদই করিল, এইরূপে আমি তাহার হস্ত হইতে তোমদিগকে উদ্ধার করিলাম। পরে তোমরা যদ্দন পার হইয়া যিরীহোতে উপস্থিত হইলে" (যিহোশূয়ের পুস্তক, ২৪ : ৯-১১)।
ইন কাছীর বলেন, হযরত মূসা (আ) নিজের জীবিতকালেই পবিত্র ভূমিতে অত্যাচারী মুশরিক কওমগুলির সহিত মুকাবিলা করিবার জন্য হযরত ইউশা' ইব্ন নূন (আ)-কে প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত করিয়াছিলেন এবং বানু ইসরাঈলদিগকে গোত্রে গোত্রে বিভক্ত করিয়া প্রত্যেক গোত্রের সোনাপতির নাম ঘোষণা করিয়া দিয়াছিলেন (প্রাগুক্ত, পৃ. ২৯৯)।
যাহাই হউক হযরত মূসা (আ)-এর ইনতিকালের পর যখন তীহ ভূমিতে বানু ইসরাঈলের চল্লিশ বৎসর পূর্ণ হইল, এবং তাহাদের মধ্যে নূতন বংশধর সৃষ্টি হইল, তখন আল্লাহ পাকের নির্দেশে হযরত ইউশা' ইব্ন নূন (আ) তাহাদেরকে লইয়া পবিত্র ভূমিতে প্রবেশের প্রস্তুতি গ্রহণ করিলেন। পথিমধ্যে ছিল প্রাচীরঘেরা সুরক্ষিত নগরী। উহা বিজয়ের লক্ষ্যে প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে অবহিত হওয়ার জন্য হযরত ইয়ূশা (আ) গোয়েন্দা প্রেরণ করিবার মনস্থ করিলেন। সেই লক্ষ্যে তিনি শিটীম হইতে দুই ব্যক্তিকে গোয়েন্দা হিসাবে প্রেরণ করিলেন (যিহোশূয়, প্রাগুক্ত, ২: ১)।
"তখন ঐ দুই ব্যক্তি আরীহা নগরীতে প্রবেশ করিয়া "রাহব" নাম্নী এক বেশ্যার গৃহে আশ্রয় নিল। কিন্তু ইসারঈলী ঐ দুই ব্যক্তি আরীহা প্রবেশের সংবাদ সেই নগরীর রাজার কাছে পৌছে। তখন তিনি রাহবের নিকট এই কথা বলিয়া পাঠাইলেন যে, ইসরাঈলী লোকেরা তোমার কাছে আসিয়া তোমার গৃহে অবস্থান লইয়াছে। তাহাদিগকে বাহির করিয়া আন। কেননা তাহারা ইসরাঈলী চর। তাহারা আমাদের দেশ অনুসন্ধান করিতে আসিয়াছে। তখন ঐ স্ত্রীলোকটি ঐ দুইজনকে লুকাইয়া রাখিল এবং বলিল, সত্য, সেই লোকেরা আমার কাছে আসিয়াছিল বটে, কিন্তু তাহারা কেথাকার তাহা আমি জানিতাম না। অন্ধকার হইলে নগরদ্বার বন্ধ করিবার একটু আগে সেই লোকেরা কোথায় চলিয়া গিয়াছে, আমি তাহা জানি না। শীঘ্র তোমরা তাহাদের পশ্চাদানুসরণ কর। হইতে পারে তাহাদের তোমরা ধরিতে পারিবে। আগত রাজার লোকজন স্ত্রীলোকটির এই কথা শুনিয়া নগরের প্রবেশ দ্বারের দিকে ছুটিয়া গেল। আর ঐ ইসরাঈলী চরদ্বয় রক্ষা পাইল (যিহোশূয় পুস্তক, ২:২-৭)। তাহারা দেশ নিরীক্ষণ করিয়া চলিয়া আসিবার পূর্বে ঐ স্ত্রীলোকটির সাথে ওয়াদা করিল যে, ইসরাঈলীগণ যখন এই নগরী জয় করিবে, তখন তাহাকে ও তাহার পরিবার-পরিজনকে রক্ষা করা হইবে (প্রাগুক্ত, ২:১২, ১৮-১৯)।
উল্লেখ্য যে, আরীহা, বায়তুল মুকাদ্দাস ইত্যাদি অঞ্চলের লোকজন হযরত মূসা ও বনী ইসরাঈলের আগমনের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে জানিত। সেই বানু ইসরাঈল যাহাদের রক্ষা করিতে আল্লাহ পাক ফিরআওন ও তাহার সৈন্যবাহিনীকে পানিতে ডুবাইয়া মারিয়াছেন, ইসরাঈলীদেরকে মরু প্রান্তরে মান্না-সালওয়াসহ বিভিন্ন সাহায্য করিয়াছেন এবং পবিত্র ভূমি তথা বায়তুল মুকাদ্দীসে ও তৎসংলগ্ন এলাকা তাহাদেরকে প্রদানের ওয়াদা করিয়াছেন। এই সকল সংবাদ শ্রবণ করিয়া সেই অঞ্চলের লোকজন পূর্ব হইতেই ইসরাঈলী আতংকে ভীত-সন্ত্রস্ত ছিল। সেই স্ত্রীলোকটি উক্ত চরদ্বয়কে বলিয়াছিলঃ "আমি জানি, সদাপ্রভু তোমাদিগকে এই দেশ দিয়াছেন, আর তোমাদের হইতে আমাদের উপরে মহাভয় উপস্থিত হইয়াছে ও তোমাদের সম্মুখে এই দেশনিবাসী সমস্ত লোক গলিয়া গিয়াছে। কেননা মিসর হইতে তোমরা বাহির হইয়া আসিলে সদাপ্রভু তোমাদের সম্মুখে কি প্রকারে সূফ সাগরের জল শুষ্ক করিয়াছিলেন, এবং তোমরা যৰ্দ্দনের ও পারস্থ সীহোন ও ওগ নামে ইমোরীয়দের দুই রাজার প্রতি যাহা করিয়াছ, তাহাদিগকে যে নিঃশেষে বিনষ্ট করিয়াছ, তাহা আমরা শুনিলাম, আর শুনিবা মাত্র আমাদের হৃদয় গলিয়া গেল, তোমাদের হেতু কাহারো মনে সাহস রহিল না। কেননা তোমাদের ইশ্বর সদাপ্রভু উপরিস্থ স্বর্গে ও নীচস্থ পৃথিবীতে ঈশ্বর" (যিহোশূয়ের পুস্তক, ২ঃ ৯-১১)।
উক্ত গুপ্তচরদ্বয় আরীহা নগরীর অধিবাসীদের পর্যবেক্ষণ করিয়া হযরত ইউশা' (আ)-এর নিকট সেখানকার অবস্থা বর্ণনা করিলেন। অতঃপর হযরত ইউশা' ইব্ন নূন (আ) বানু ইসরাঈলকে আল্লাহ তা'আলার পয়গাম শুনাইয়া কানআন ভূমির সর্বপ্রথম শহর আরীহায় প্রবেশের নিমিত্তে তদীয় রাজা ও তাহার সৈন্যদের সাথে যুদ্ধ করিবার জন্য প্রস্তুত হইতে আদেশ জারী করিলেন। বাইবেলে আসিয়াছে: যখন বানু ইসরাঈলরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হইল তখন আল্লাহ তা'আলার আদেশে সাকীনা সম্বলিত প্রতিশ্রুত তাঁবুটি (পবিত্র সিন্দুক) তাহাদের সঙ্গী হইল এবং উহার সঙ্গে সঙ্গেই ইসরাঈলী সৈন্যগণ আরীহার দিকে অগ্রসর হইল। "পরে যিহোশূয় প্রত্যুষে উঠিয়া সমস্ত ইসরাঈল-সন্তানের সহিত শিটীম হইতে যাত্রা করিয়া যদান সমীপে উপস্থিত হইলেন, কিন্তু তখন পার না হইয়া সে স্থানে রাত্রি যাপন করিলেন। তিন দিনের পর অধ্যক্ষগণ শিবিরের মধ্য দিয়া গেলেন, তাঁহারা লোকদিগকে এই আজ্ঞা করিলেন, তোমরা যে সময়ে তোমাদের ঈশ্বর সদাপ্রভুর নিয়ম সিন্দুক ও লেবীয় যাজকগণকে তাহা বহন করিতে দেখিবে, তৎকালে আপন আপন স্থান হইতে যাত্রা করিয়া তাহার পশ্চাতে পশ্চাতে গমন করিবে। তথাপি তাহার ও তোমাদের মধ্যে অনুমান দুই সহস্র হস্ত পরিমিত ভূমি ব্যবধান থাকিবে, তাহার আর নিকটবর্তী হইবে না, যেন তোমরা আপনাদের গন্তব্য পথ জানিতে পার, কেননা ইতোপূর্বে তোমরা এই পথ দিয়া যাও নাই" (যিহোশূয়ের পুস্তক, ৩ঃ ১-৪)।
এইভাবে লোকদেরকে পবিত্রতা অর্জন করিয়া উক্ত সিন্দুকের পশ্চাতে গমন করিবার জন্য হযরত ইউশা' (আ) আদেশ করিলেন (প্রাগুক্ত, ৩ঃ ৫)। সৈন্য-সামন্ত লইয়া জর্দান নদীর পাড়ে আসিবার পর আল্লাহ পাক হযরত ইউশা' (আ)-কে এক মু'জিযা প্রদান করেন। উক্ত সিন্দুক লইয়া সৈন্য-সামন্ত পার হইবার সময় জর্দান নদীর পানি দুই ভাগে ভাগ হইয়া এক শুষ্ক রাস্তা তৈরি হইয়া যায়। ইহাতে তাহাই ঘটিল যেমন ঘটিয়াছিল হযরত মূসা (আ)-এর হাতে।
সেই মুহূর্তে ইউশা' (আ) কনানীয়, হিত্তীয়, হিব্বীয়, গির্গাশীয় ও যিয়ূশীয় ইত্যাদি দুর্ধর্ষ জাতিসমূহকে পরাস্ত করিবার সুসংবাদ জানাইয়া বানু ইসরাঈলের মনোবল আরো দৃঢ় করিবার চেষ্টা করেন। তেমনি জর্দান নদী পার হইবার সময় হযরত মূসা (আ)-এর মতই তাহাদেরকে ১২ দলে বিভক্ত করিয়া বারজন নেতা নিয়োগ করিয়া তাহাদের নেতৃত্বে জর্দান নদী পার হইবার নির্দেশ দিয়াছিলেন।
আর এইভাবে হযরত ইউশা' ইব্ন নূন (আ) বানু ইসরাঈলসহ জর্দান নদী পার হইয়া আরীহা নগরীর সম্মুখে শিবির স্থাপন করেন। কিন্তু আরীহা ছিল সুদৃঢ় প্রাচীর ঘেরা দুর্গের মাধ্যমে সুরক্ষিত নগরী, যাহার সুউচ্চ প্রাচীর অতিক্রম করা সহজসাধ্য ছিল না। অর্থাৎ সেই নগরীটি সুউচ্চ প্রাচীর দ্বারা অত্যন্ত সুরক্ষিত ছিল যাহাতে সবচেয়ে উঁচু উঁচু প্রাসাদ নির্মিত হইয়াছিল (ইব্ন কাছীর, প্রাগুক্ত, ১খ, পৃ. ৩০১)। এইভাবে হযরত ইউশা' (আ) স্বীয় সেনাবাহিনীসহ আরীহা নগরী ঘেরাও করেন এবং ছয় মাস অবরোধ করিয়া রাখেন (প্রাগুক্ত: আরো ইবনুল আছীর, প্রাগুক্ত, ১খ, পৃ. ১৫৫)।
বাইবেল বর্ণিত তথ্যে দেখা যায়, তখন ইউশা' (আ) সিন্দুক বহনকারীসহ ইসরাঈলী সৈন্যদেরকে ছয় দিন উক্ত শহরের প্রাচীরের বাহির দিক দিয়া প্রদক্ষিণ করিবার নির্দেশ দিয়াছিলেন, সঙ্গে সঙ্গে তুরী বাজাইতেও আদেশ দিয়াছিলেন। সপ্তম দিনে সকলে সমস্বরে আওয়ায করিলে শহরের প্রাচীর ভাঙ্গিয়া যাইবার পর তিনি সসৈন্যে শহরে প্রবেশ করিয়া তাহা দখল করিয়া লইয়াছিলেন (যিহোশূয়ের পুস্তক, ৬ : ১-২০)। এই যুদ্ধে শত্রুপক্ষের ১২ হাজার লোক নিহত হইয়াছিল (ইব্ন কাছীর, প্রাগুক্ত; যিহোশূয়ের পুস্তক, ১: ২০-২১)। একমাত্র সেই রাহব নামক মহিলা যে দুইজন ইসরাঈলী চরকে আশ্রয় দিয়াছিল তাহাকে ও তাহার পরিবার-পরিজনকে হত্যা করা হয় নাই (যিহোশূয়ের পুস্তক, ৬: ২২-২৬)।
যাহা হউক, বানু ইসরাঈল সেনাবাহিনী সেই শহর জয় করিবার পর প্রচুর গনীমত লাভ করিয়াছিল। তাহাদের সময় গনীমতের সম্পদ ভোগ করা নিষিদ্ধ ছিল। সেইগুলি একত্রে জমা করিবার পর আগুন আসিয়া তাহা জ্বালাইয়া দিত। কিন্তু গনীমতের সম্পদ একত্র করিবার পরও আগুন না আসায় হযরত ইউশা' চিন্তিত হইয়া পড়েন। তিনি বলেন, নিশ্চয় ইসরাঈলীদের কেহ কোন কিছু আত্মসাৎ করিয়া থাকিবে। পরিশেষে হযরত ইউশা' (আ) তাহাদের হাত স্পর্শ করিতে করিতে ইয়াহূদ বংশীয় আখন নামক ব্যক্তিকে চিহ্নিত করেন যে, সে-ই আত্মসাৎকারী। আর সেও তাহা স্বীকার করিয়া আত্মসাৎকৃত মাল জমা দেওয়ার পর আগুন আসিয়া সব ভক্ষণ করিয়া ফেলিল। আর আখনকেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হইল (যিহোশূয়ের পুস্তক, ৭: ১-২৬; আরও কুরতুবী, প্রাগুক্ত, ৬খ, পৃ. ১৩০)।
যিহোশূয়ের পুস্তকে আসিয়াছে, বানু ইসরাঈল উক্ত শহরের সবকিছু পোড়াইয়া দিয়াছিল। "আর লোকেরা নগর ও তথাকার সমস্ত বস্তু আগুনে পোড়াইয়া দিল" (যিহোশূয়ের পুস্তক, ৬ : ২৪)। ১৯৩৬ সালে জন গার্সটিংগ (John Garsting)-এর নেতৃত্বে একদল বৃটিশ পুরাতত্ত্ববিদ কর্তৃক উক্ত নগরীর ধ্বংসাবশেষ খননের ফলে শহরের দেয়াল ধ্বসে পড়া এবং আগুনে পোড়াইয়া দেওয়ার বিভিন্ন চিহ্ন পরিলক্ষিত হইয়াছে (আম্বিয়া-ই কুরআন, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩১৪)।
📄 জয় নগরী জয়
আরীহা নগরী জয়ের পর হযরত ইউশা' (আ) আল্লাহ্র নির্দেশে পুরাতন 'অয়' নগরী জয়ের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন এবং অয় নগরীবাসীদের সাথে যুদ্ধে এক বিশেষ কৌশল অবলম্বন করেন। তিনি তিন হাজার বিশিষ্ট এক শক্তিশালী সৈন্যবাহিনী গোপনে রাত্রিতে অয় নগরীর পশ্চাৎ দিকে প্রেরণ করেন। অতঃপর সকালে নিজ সৈন্যবাহিনীসহ অয়বাসীদের সন্মুখ সমরে অবতীর্ণ হন। অয়বাসীরা যখন হযরত ইউশা' (আ)-এর সৈন্যবাহিনী আক্রমণ করিল, তখন তিনি তাঁহার সৈন্যদেরকে লইয়া পিছনে পলায়ন করেন। ইহাতে অয়বাসীরাও শহর হইতে বাহির হইয়া ইসরাঈলী সৈন্যদের পশ্চাৎ অনুসরণ করে। আর এইভাবে নগরী শূন্য হইয়া গেল। ইহার পিছনে লুকাইয়া থাকা তিন হাজার ইসরাঈলী সৈন্য নগরের ভিতরে প্রবেশ করিয়া আগুন লাগাইয়া দেয়। অয়বাসীরা বাহির হইতে পিছনে ফিরিয়া এই দৃশ্য দেখিয়া বিচ্ছিন্ন হইয়া যায়। তাহাতে হযরত ইউশা' (আ) তাহাদের উপর সসৈন্যে দুই দিক হইতে পাল্টা আক্রমণ চালাইয়া তাহাদের পরাস্ত করিয়া উক্ত নগরী জয় করিয়াছিলেন (যিহোশূয়ের পুস্তক, ৭ম অধ্যায়)। উক্ত যুদ্ধে সকল অয়বাসীকে হত্যা করিয়া নগরী পোড়াইয়া দেওয়া হইয়াছিল বলিয়া উল্লেখ আছে (প্রাগুক্ত, ৬: ২৪-২৮)।