📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হযরত মূসা (আ)-এর সহকারী রূপে হযরত ইউশা ইবন নূন (আ) - প্রতিষ্ঠিত ভূমিতে প্রবেশের সুসংবাদ

📄 হযরত মূসা (আ)-এর সহকারী রূপে হযরত ইউশা ইবন নূন (আ) - প্রতিষ্ঠিত ভূমিতে প্রবেশের সুসংবাদ


পূর্বেই বলা হইয়াছে, হযরত মূসা (আ)-এর নবুওয়াত লাভের পরবর্তী জীবনের ঘটনাবলীতে হযরত হারুন (আ)-এর পর হযরত ইউশা ইবন নূন (আ)-এর উল্লেখ একাধিক বার আসিয়াছে। তিনি হযরত মূসা (আ)-এর একনিষ্ঠ সহচর ছিলেন। কোন কোন মুফাস্স্সিরের মতে, তিনি মূসা (আ)-এর নিকট হইতে শিক্ষা গ্রহণ করিয়াছিলেন (দ্র. আলুসী, প্রাগুক্ত, ১৫খ., পৃ. ৩১১)।
তিনি মূসা (আ)-এর খাদেম ছিলেন। সেইজন্য আল-কুরআনেও তাঁহাকে 'মূসা (আ)-এর যুবক' বলিয়া অভিহিত করা হয় (দ্র. ১৭:৬০)। এমনকি বর্তমান প্রচলিত তাওরাতেও আসিয়াছে, "পরে মোশি ও তাঁহার পরিচারক যিহোশূয় উঠিলেন" (দ্র. বাইবেল, যাত্রাপুস্তক ২৪: ১৩)। এমনিভাবে বাইবেলের অন্যত্র আসিয়াছে, "সদাপ্রভুর দাস মোশির মৃত্যু হইলে পর সদাপ্রভু নূনের পুত্র যিহোশূয় নামে মোশির পরিচারককে কহিলেন, আমার দাস মোশির মৃত্যু হইয়াছে, এখন উঠ, তুমি এই সমস্ত লোক লইয়া এই যদ্দন পার হও” (যিহোশূয়ের পুস্তক, ১: ১-২)।
তাওরাতের কিছু কিছু তথ্য অনুসারে বুঝা যায় যে, তাওরাত গ্রহণ করিবার জন্য মূসা (আ) যখন তূর পর্বতে গিয়াছিলেন হযরত ইউশা' (আ) তখন এককভাবে হযরত মূসা (আ)-এর সফরসঙ্গী ছিলেন। বাইবেলে বর্ণিত নিম্নের তথ্যগুলি সেই দিকেই ইঙ্গিত করে:
"আর সদাপ্রভু মোশিকে কহিলেন, তুমি পর্বতে আমার নিকটে উঠিয়া আসিয়া এই স্থানে থাক, তাহাতে আমি দুইখানা প্রস্তর ফলক এবং আমার লিখিত ব্যবস্থা ও আজ্ঞা তোমাকে দিব, যেন তুমি লোকদিগকে শিক্ষা দিতে পার। পরে মোশি ও তাঁহার পরিচারক যিহোশূয় উঠিলেন এবং মোশি ঈশ্বরের পর্বতে উঠিলেন" (যাত্রাপুস্তক, ২৪: ১২-১৩)।
আল-কুরআনুল করীম ও হাদীসের ভাষ্যে বুঝা যায় যে, হযরত মূসা (আ) যখন হযরত খিযির (আ)-এর সঙ্গে সাক্ষাত লাভের উদ্দেশ্যে সফরে বের হন, তখন মূসা (আ)- এর সফরসঙ্গী ছিলেন যুবক যূশা ইবন নূন (আ)। কিন্তু সেই সফর কোথায় কখন হইয়াছিল সেই সম্পর্কে বিভিন্ন মত রহিয়াছে (দ্র. বুখারী, আস-সাহীহ, কিতাবুত্-তাফসীর, বাব ওয়া ইয কালা মূসা লিফাতাহু: আস্কালানী, প্রাগুক্ত, ৮খ, পৃ., ৪০৯; তাবারী, তাফসীর, ১৫খ, পৃ. ১৮২ এই প্রসঙ্গে আল-কুরআনে মূসা (আ)-এর সহিত ইউশা' (আ)-এর কথোপকথনের উল্লেখ রহিয়াছে:
وَإِذْ قَالَ مُوسَى لِفَتَهُ لَا أَبْرَحُ حَتَّى ابْلُغَ مَجْمَعَ البَحْرَيْنِ أَوْ أَمْضِيَ حُقُبًا ، فَلَمَّا بَلَغَا مَجْمَعَ بَيْنِهِمَا نَسِيَا حُوتَهُمَا فَاتَّخَذَ سَبِيلَهُ فِي الْبَحْرِ سَرَبًا . فَلَمَّا جَاوَزَا قَالَ لِفَتْهُ أَتَنَا غَدًا عَنَا لَقَدْ لَقِينَا مِنْ سَفَرِنَا هَذَا نَصَبًا . قَالَ أَرَمَيْتَ إِذْ أَوَيْنَا إِلَى الصَّخْرَةِ فَإِنِّي نَسِيتُ الحُوْتَ وَمَا أَنْسَنِيهُ إِلا الشَّيْطَنُ أَنْ أَذْكُرَهُ وَاتَّخَذَ سَبِيلَهُ فِي الْبَحْرِ عَجَبًا . قَالَ ذَلِكَ مَا كُنَّا نَبْغِ فَارْتَدًا عَلَى آثَارِهِمَا قَصَصًا .
"যখন মূসা তাহার যুবক সংগীকে বলিয়াছিল, দুই সমুদ্রের সংগমস্থলে না পৌঁছিয়া আমি থামিব না অথবা আমি যুগ যুগ ধরিয়া চলিতে থাকিব। উহারা উভয়ে যখন দুই সমুদ্রের সংগমস্থলে পৌঁছিল উহারা নিজেদের মৎস্যের কথা ভুলিয়া গেল, উহা সুড়ংগের মত নিজের পথ করিয়া সমুদ্রে নামিয়া গেল। যখন উহারা আরো অগ্রসর হইল মূসা তাহার সঙ্গীকে বলিল, 'আমাদের প্রাতঃরাশ আন, আমরা তো আমাদের এই সফরে ক্লান্ত হইয়া পড়িয়াছি'। সে বলিল, আপনি কি লক্ষ্য করিয়াছেন, আমরা যখন শিলাখণ্ডে বিশ্রাম করিতেছিলাম তখন আমি মৎস্যের কথা ভুলিয়া গিয়াছিলাম? শয়তানই উহার কথা বলিতে আমাকে ভুলাইয়া দিয়াছিল, মৎস্যটি আশ্চর্যজনকভাবে নিজের পথ করিয়া নামিয়া গেল সমুদ্রে। মূসা বলিল, আমরা তো সেই স্থানটির অনুসন্ধান করিতেছিলাম। অতঃপর উহারা নিজদের পদচিহ্ন ধরিয়া ফিরিয়া চলিল” (১৮: ৬০-৬৪)।
হযরত মূসা (আ) যখন সিনাই ভূমিতে ছিলেন, তখন তিনি মাদায়েন ও আমালেকাসহ তৎপার্শ্ববর্তী কয়েকটি জাতির সহিত যুদ্ধ করিবার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। আর তিনি বানু ইসরাঈলকেও যুদ্ধ করিতে হুকুম দেন। সেই সময়ে হযরত ইউশা' (আ) হযরত মূসা (আ)-এর সহিত প্রতিটি কাজে বিশেষভাবে অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন। অপরদিকে মূসা (আ)-ও অন্যান্যদের তুলনায় হযরত ইউশা'কে বেশী গুরুত্ব দিতেন। বাইবেলে এই প্রসঙ্গে কিছু কিছু তথ্য আসিয়াছে, যাহাতে মনে হয়, হযরত ইউশা' (আ)-কে হযরত মূসা (আ) বিভিন্ন যুদ্ধে সেনাপতি নিয়োগ করিয়াছিলেন। নিম্নের উদ্ধৃতিটি লক্ষণীয়:
"ঐ সময়ে অমালেক আসিয়া রফীদীমে ইস্রায়েলের সহিত যুদ্ধ করিতে লাগিল। তাহাতে মোশি যিহোশূয়কে কহিলেন, তুমি আমাদের জন্য লোক মনোনীত করিয়া লও, যাও, অমালেকের সহিত যুদ্ধ কর, কল্য আমি ঈশ্বরের যষ্টি হস্তে লইয়া পর্বতের শিখরে দাঁড়াইব। পরে যিহোশূয় মোশির আজ্ঞানুসারে কর্ম করিলেন, অমালেকের সহিত যুদ্ধ করিলেন এবং মোশি, হারোন ও হূর পর্বতের শৃঙ্গে উঠিলেন। আর এইরূপ হইল, মোশি যখন আপন হস্ত তুলিয়া ধরেন, তখন ইস্রায়েল জয়ী হয়, কিন্তু মোশি আপন হস্ত নামাইলে অমালেক জয়ী হয়" (যাত্রাপুস্তক, ১৭:৮-১১)।
পরবর্তীতে দেখা যায়, মূসা (আ)-এর দু'আ ও হযরত ইউশা' (আ)-এর অদম্য প্রচেষ্টায় ইস্রায়েলগণ অমালেকদের পরাস্ত করিয়াছিল। বাইবেলে আসিয়াছে: "আর মোশির হস্ত ভারী হইতে লাগিল, তখন উহারা একখানি প্রস্তর আনিয়া তাঁহার নীচে রখিলেন, আর তিনি তাহার উপর বসিলেন এবং হারোন ও হূর একজন একদিকে ও অন্যজন অন্যদিকে তাঁহার হস্ত ধরিয়া রাখিলেন, তাহাতে সূর্য অস্তগত না হওয়া পর্যন্ত তাঁহার হস্ত স্থির থাকিল। আর যিহোশূয় অmaলেককে ও তাহার লোকদিগকে খড়গধারে পরাজয় করিলেন। পরে সদাপ্রভু মোশিকে কহিলেন, এই কথা স্মরণার্থে পুস্তকে লিখ এবং যিহোশূয়ের কর্ণগোচরে শুনাইয়া দেও, কেননা আমি আকাশে নীচে হইতে অমালেকের নাম নিঃশেষে লোপ করিব" (যাত্রাপুস্তক, ১৭:১২-১৫)।
অনন্তর হযরত মূসা (আ) প্রতিশ্রুত পবিত্রভূমি বায়তুল মাকদিসে প্রবেশের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। ইহাতে তিনি ইসরাঈলীদেরকে বার দলে বিভক্ত করিয়া প্রত্যেক দলের জন্য একজন নকীব বা কর্ণধার নিযুক্ত করেন, যাহাদের কথা আল-কুরআনেও আসিয়াছে (দ্র. সূরা ৫; রূদ: ১২)। তন্মধ্যে হযরত ইউশা' (আ)-কে সিত্তে ইউসুফ (আ)-এর নকীব নিয়োগ করেন, যাহাদের সংখ্যা ছিল ৪০,৫০০ (চল্লিশ হাজার পাঁচশত) জন (দ্র. আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৯খ., পৃ. ২৯৯)।
অতঃপর হযরত মূসা (আ) সেই বারজন নকীবকে বায়তুল মুকাদ্দাস ও তৎসংলগ্ন অঞ্চলসমূহের জাতিসমূহের অবস্থা গোপনে পর্যবেক্ষণ করিবার জন্য গোয়েন্দা হিসাবে প্রেরণ করিয়াছিলেন। তাহারা তথায় গমন করিয়া সেই জাতিসমূহের দুর্ধর্ষতা সম্পর্কে অবহিত হন যে, উহারা ভয়ংকর ও শক্তিশালী জাতি। তাহারা ধারণা করিল যে, ঐ সমস্ত জাতিসমূহের সাথে যুদ্ধে পারিয়া উঠা সম্ভব নয়। তাহারা সিদ্ধান্ত করিল যে, এই অবস্থাটি ইসরাঈলীদের সামনে প্রকাশ করা যাইবে না। তাহা শুধু মূসা (আ)-কে অবহিত করা হইবে। অতঃপর তাহারা যখন বানু ইসরাঈলের নিকট ফিরিয়া আসিল, তখন দশজন নকীবই খেয়ানত করিয়া বসিল। তাহারা তাহাদের আত্মীয়-স্বজনদের নিকট গোপনে সব বলিয়াছিল, যাহাতে গোটা বানু ইসরাঈলের কাছে সেই গোপনীয় তথ্যটি ফাঁস হইয়া যায় (দ্র. কুরতুবী, প্রাগুক্ত, ৬খ, প., ১১২)। মাত্র দুইজন সেই তথ্য গোপন রাখেন। তাহারা হইলেন ইউশা' ইব্‌ন নূন (আ) ও কালিব ইব্‌ন ইয়ুফান্না। ইবন 'আব্বাসের মতে সেই দুইজনের বর্ণনা আল-কুরআনেও আসিয়াছে (দ্র. প্রাগুক্ত, ৬খ, পৃ. ১২৭)।
অপর দিকে বানু ইসরাঈলের কাছে সেই খবর প্রকাশিত হওয়ার পর তাহারা নিরাশ ও হতবিহ্বল হইয়া গেল, এমনকি আবার মিসরে ফিরিয়া যাওয়ার উদ্যোগ নিল। তাই মূসা (আ) যখন তাহাদেরকে যুদ্ধে আহবান করিলেন, তখন তাহারা সেই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করিতে অপারগতা প্রকাশ করিল। এই বিষয়টি আল-কুরআনেও নিম্নোক্তভাবে আসিয়াছে:
يُقَوْمِ ادْخُلُوا الْأَرْضَ الْمُقَدَّسَةَ الَّتِي كَتَبَ اللهُ لَكُمْ وَلَا تَرْتَدُّوا عَلَى أَدْبَارِكُمْ فَتَنْقَلِبُوا خَسِرِينَ قَالُوا يُمُوسَى إِنَّ فِيهَا قَوْمًا جَبَّارِيْنَ وَإِنَّا لَنْ نَدْخُلَهَا حَتَّى يَخْرُجُوا مِنْهَا فَإِنْ يَخْرُجُوا مِنْهَا فَإِنَّا دُخِلُوْنَ .
"হে আমার সম্প্রদায়! আল্লাহ তোমাদের জন্য যে পবিত্র ভূমি নির্দিষ্ট করিয়াছেন, তাহাতে তোমরা প্রবেশ কর এবং পশ্চাদপসরণ করিও না, করিলে তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত হইবে। তাহারা বলিল, হে মূসা। সেইখানে এক দুর্দান্ত সম্প্রদায় রহিয়াছে এবং তাহারা সেই স্থান হইতে বাহির না হওয়া পর্যন্ত আমরা কখনও সেইখানে প্রবেশ করিব না, তাহারা সেই স্থান হইতে বাহির হইয়া গেলেই আমরা প্রবশ করিব" (৫: ২১-২২)।
অনন্তর ইসراঈলী শিবিরে প্রচণ্ড সংকট অবস্থার সৃষ্টি হয়। তাহারা বলিতে লাগিল, মূসা আমাদেরকে মিসর হইতে বাহির করিয়া আনিয়া দুর্ধর্ষ জাতির তলোয়ার দ্বারা আমাদের হত্যা করিবার ফন্দী করিয়াছেন। আর এইভাবে হযরত মূসা (আ) বিপাকে পড়িয়া যান। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে দুই ব্যক্তি বানু ইসরাঈলকে শান্ত করিবার জন্য আগাইয়া আসেন। তাঁহারা হইলেন হযরত ইউশা' ইব্‌ন নূন (আ) ও কালিব ইব্‌ন ইয়ুফান্না। তাহারা উভয়ে বানু ইসরাঈলকে যুদ্ধে উৎসাহ প্রদান এবং তাহাদের মনোবল ফিরাইয়া আনিবার চেষ্টা করিতে লাগিলেন। আল- কুরআনের ভাষায়:
قَالَ رَجُلَنِ مِنَ الَّذِينَ يَخَا فُوْنَ أَنْعَمَ اللهُ عَلَيْهِمَا ادْخُلُوا الْبَابَ فَإِذَا دَخَلْتُمُوهُ فَإِنَّكُمْ غُلِبُونَ وَعَلَى اللَّهِ فَتَوَكَّلُوا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ .
"যাহারা ভয় করিতেছিল তাহাদের মধ্যে দুইজন, যাহাদের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ করিয়াছিলেন, বলিল, তোমরা তাহাদের মোকাবিলা করিয়া (নগর) দ্বারে প্রবেশ কর, প্রবেশ করিলেই জয়ী হইবে। আল্লাহর উপরই নির্ভর কর যদি তোমরা মুমিন হও” (৫ঃ ২৩)।
এই বিষয়টি বাইবেলে বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হইয়াছে (দ্র. গণনাপুস্তক, ১৩: ৩০-৩৩): "পরে সমস্ত মণ্ডলী উচ্চৈস্বরে কলরব করিল এবং লোকেরা সেই রাত্রিতে রোদন করিল। আর ইস্রায়েল সন্তানগণ সকলে মোশির বিপরীতে ও হারোনের বিপরীতে বচসা করিল ও সমস্ত মণ্ডলী তাহাদিগকে কহিল, হায় হায়, আমরা কেন মিসর দেশে মরি নাই, এই প্রান্তরেই বা কেন মরি নাই? সদাপ্রভু আমাদিগকে খড়গধারে নিপাত করাইতে এই দেশে কেন আনিলেন? আমাদের স্ত্রী ও বালকগণ ত লুটিত হইবে। মিশরে ফিরিয়া যাওয়া কি আমাদের ভাল নয়? পরে তাহারা পরস্পর বলাবলি করিল। আইস, আমরা একজনকে সেনাপতি করিয়া মিসরে ফিরিয়া যাই। তাহাতে মোশি ও হারোন ইসরাঈল-সন্তানগণের মণ্ডলীর সমস্ত সমাজের সম্মুখে উবুড় হইয়া পড়িলেন। আর যাঁহারা দেশ নিরীক্ষণ করিয়া আসিয়াছিলেন, তাঁহাদের মধ্যে নূনের পুত্র যিহোশূয় ও যিফুন্নীর পুত্র কালেব আপন আপন বস্ত্র চিরিলেন এবং ইসরাঈল-সন্তানগণের সমস্ত মণ্ডলীকে কহিলেন, আমরা যে দেশ নিরীক্ষণ করিতে গিয়াছিলাম সে যারপর নাই উত্তম দেশ। সদাপ্রভু যদি আমাদিগেতে প্রীত হন তবে তিনি আমাদিগকে সেই দেশে প্রবেশ করাইবেন ও সেই দুগ্ধ-মধু প্রবাহী দেশ আমাদিগকে দিবেন। কিন্তু তোমরা কোনমতে সদাপ্রভুর বিদ্রোহী হইও না, ও সে দেশের লোকদিগকে ভয় করিও না। কেননা তাহারা আমাদের ভক্ষ্যস্বরূপ, তাহাদের আশ্রয়-ছত্র তাহাদের উপর হইতে নীত হইল, সদাপ্রভু আমাদের সহর্বত্তী, তাহাদিগকে ভয় করিও না" (গণনাপুস্তক ১৪: ১-৯)।
আল-কুরাআন ও বাইবেলের উপরিউক্ত বর্ণনায় দেখা যায় যে, তিনি মূসা (আ)-এর বিশ্বস্ত সহচর ও দুঃসাহসী ঈমানদার সেনাপতি ছিলেন। আল্লাহ পাকের ইচ্ছা ও বিধান হইল শক্তিশালী ঈমানদারগণের মাধ্যমেই তাঁহার দীন বিজয়ী হয়। তাই দুইজন ব্যতীত ইসরাঈলীগণ কাপুরুষতা ও হীনমন্যতা প্রদর্শন করিল। ঐ দুইজন ব্যতীত অন্য সকলের মৃত্যুর পরই সেই পবিত্র ভূমিতে প্রবেশের ব্যবস্থা হয়। আর সেই দুইজনের মধ্যে একজন ছিলেন হযরত ইউশা' ইব্‌ন নূন (দ্র. গণনাপুস্তক ৩২: ১১-১২)।
হযরত মূসা (আ)-এর যখন অন্তim সময় ঘনাইয়া আসে তখন মূসা (আ) দু'আয় আল্লাহ আধ্যাত্মিক, শারীরিক ও মানসিক শক্তিতে বলীয়ান হযরত ইউশা' ইব্‌ন নূন (আ)-কে মূসা (আ)-এর প্রতিনিধি নিয়োগের নির্দেশ দেন। এইভাবে হযরত ইউশা' (আ) হযরত মূসা (আ)-এর প্রতিনিধি হিসাবে বানু ইসরাঈলের সার্বজনীন নেতা মনোনীত হন।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হযরত ইউশা (আ)-এর বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ

📄 হযরত ইউশা (আ)-এর বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ


কোনও কোনও বর্ণনায় দেখা যায় যে, হযরত ইয়ুশা ইব্‌ নূন (আ) হযরত মূসা (আ)-এর ওফাতের সময় উপস্থিত ছিলেন এবং কিছু কিছু বর্ণনায় দেখা যায় হযরত ইয়ূশা (আ)-এর বিরুদ্ধে বানু ইসরাঈল অপবাদ দেয় যে, তিনি হযরত মূসা (আ)-কে হত্যা করিয়াছেন (নাউযুবিল্লাহ)।
বর্ণিত আছে, একদা হযরত মূসা (আ) ইউশা' ইব্‌ নূন (আ)-কে সঙ্গে লইয়া হাঁটিতেছিলেন; হঠাৎ করিয়া এক কাল বাতাস প্রবাহিত হইতে শুরু করিল। হযরত ইয়ূশা (আ) যখন তাহ দেখিলেন, তিনি মনে করিলেন যে, ইহাই কিয়ামত। তিনি মূসা (আ)-কে জড়াইয়া ধরিলেন এবং বলিলেন, কিয়ামত যখন সংঘটিত হইতেছে তখন আমি আল্লাহর নবীকে জড়াইয়া ধরা অবস্থায় তাহা ঘটুক। কিন্তু মূসা (আ) তাঁহার জামার নীচ দিয়া সরিয়া গেলেন। আর জামাটি ইয়ূশা (আ)-এর হাতেই রহিয়া গেল। অতঃপর যখন ইয়ূশা (আ) সেই জামা লইয়া বানু ইসরাঈলের নিকট আসিলেন, তখন উহারা তাহাকে পাকড়াও করিয়া বলিতে লাগিল, তুমি আল্লাহ্ নবীকে হত্য করিয়াছ। ইহা বলিয়া উহারা তাহাকে হত্যা করিতে উদ্যত হইল। তখন ইউশা (আ) বলিলেন, আমি হত্যা করি নাই, বরং তিনি আমার হাত হইতে ফসকাইয়া গিয়াছেন, কিন্তু তাহা তোমরা বিশ্বাস করিবে না। তিনি আরও বলিলেন, তোমরা যখন আমাকে বিশ্বাসই করিতেছ না, তখন আমাকে তিন দিন পর্যবেক্ষণ কর। অতঃপর তিনি আল্লাহ্র নিকট দু'আ করিলেন। অনন্তর যাহারা তাহাকে চোখে চোখে রাখিত তাহারা স্বপ্ন দেখিল, তাহাদেরকে আল্লাহ্র পক্ষ হইতে জানানো হইতেছে যে, ইয়ূশ (আ) হযরত মূসা (আ)-কে হত্যা করে নাই, বরং আমি তাহাকে উঠাইয়া লইয়াছি। অতঃপর তাহারা ইয়ূশা (আ)-কে ছাড়িয়া দিল (দ্র. ইব্‌ন কাছীর, প্রাগুক্ত, ১খ., পৃ. ২৯৭, আরও দ্র আল-কামিল, বৈরূত ১৪০৭/১৯৮৭, ১খ, পৃ. ১৫০-৫১)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 নবুওয়াত লাভ

📄 নবুওয়াত লাভ


পূর্বেই উল্লেখ করা হইয়াছে যে, হযরত মূসা (আ)-এর জীবদ্দশাতেই হযরত ইউশা' ইব্‌ন নূন (আ)-এর নবুওয়াত প্রদানের সুসংবাদ দেওয়া হইয়াছিল। আল্লাহ মূসা (আ)-কে হযরত ইয়ূশ (আ)-এর মাথায় হাত রাখিয়া দু'আ করিতে বলিয়াছিলেন। বাইবেলে উল্লেখ আছে: "পরে সদাপ্রভু মোশিকে কহিলেন, দেখ, তোমার মৃত্যুদিন আসন্ন, তুমি যিহোশূয়কে ডাক এবং তোমরা উভয়ে সমাগম তাম্বুতে উপস্থিত হও, আমি তাহাকে আজ্ঞা দিব। তাহাতে মোশি ও যিহোশূয় গিয়া সমাগম তাম্বুতে উপস্থিত হইলেন" (দ্বিতীয় বিবরণ ৩১: ১৪-১৫)।
এক উক্তির দ্বারা বুঝা যায়, আল্লাহ পাক হযরত মূসা (আ)-এর মাধ্যমেই হযরত ইউশা'কে এক সংবাদে সরাসরি আদেশ দান, নবুওয়াত, সাহায্য এবং তাঁহার দ্বারা পবিত্রভূমি উদ্ধারের জন্য নিযুক্তির কথা জানাইয়া দিয়াছিলেন। অতঃপর যখন মূসা (আ) ইনতিকাল করেন তখন সরাসরি তাঁহাকে নবুওয়াতের দায়িত্ব পালন করিবার জন্য আদেশ দেওয়া হয় এবং তাঁহার নিকট ওহীও আসিতে থাকে।
আহলে কিতাব (ইয়াহুদী ও নাসারা) সকলে হযরত ইউশা' (আ)-এর নবুওয়াত সম্পর্কে ঐক্যমত পোষণ করে (ইব্‌ন কাছীর, প্রাগুক্ত, পৃ. ২৯৭)। এমনকি ইয়াহুদীদের মধ্যে সামেরীয় নামে এক উপদল রহিয়াছে, যাহারা মূসা (আ)-এর পর আর কোন ব্যক্তিকে নবী হিসাবে মানে না একমাত্র হযরত ইউশা' ইব্‌ন নূন ব্যতীত। যেহেতু তাঁহার কথা বাইবেলে স্পষ্টভাবে আসিয়াছে (প্রাগুক্ত, পৃ. ১৯৮)। ইব্‌ন কাছীর উপরিউক্ত বর্ণনাটি সম্পর্কে বলেন, উপরিউক্ত বর্ণনাটি মানিয়া নেওয়া যায় না। কেননা ইবন ইসহাকের অন্য এক বর্ণনায় দেখা যায় যে, হযরত মূসা (আ)-এর মৃত্যু অবধি তাঁহার উপর আদেশ-নিষেধ সম্বলিত ওহী আসিতেছিল (প্রাগুক্ত, পৃ. ১৯৮)।
মোটকথা, মূসা (আ)-এর জীবদ্দশায় তাঁহার নবুওয়াত স্থানান্তরিত হয় নাই। তিনি মৃত্যু অবধি আল্লাহ্‌র নবী ছিলেন। তাঁহার ইনতিকালের পরই ইউশা' (আ) নবুওয়াত লাভ করেন। বাইবেলেও ইহার সমর্থন পাওয়া যায় : "মোশির মৃত্যু হইলে পর সদাপ্রভু নূনের পুত্র যিহোশূয় নামে মোশির পরিচারককে কহিলেন, আমার দাস মোশির মৃত্যু হইয়াছে। এখন উঠ, তুমি এই সমস্ত লোক লইয়া যদ্দন পার হও” (বাইবেলের যিহোশয় ১: ১-২)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 দায়িত্ব ও তাবলীগ

📄 দায়িত্ব ও তাবলীগ


হযরত ইউশা' (আ) নবুওয়াত লাভ করিবার পর নিজেকে দাওয়াত ও তাবলীগে নিবিষ্ট করেন। তাঁহার জীবনী পর্যালোচনা করিলে দেখা যায়, তিনি বিভিন্ন দাওয়াতী কাজকর্ম আঞ্জাম দিয়াছিলেন।
প্রথমত, তিনি যুদ্ধ পরিচালনা করিয়া মুশরিকদের নিকট হইতে পবিত্র ভূমি বায়তুল মুকাদ্দাস উদ্ধার করিয়াছিলেন। সেই ভূমি যাহা হযরত ইবরাহীম (আ) ও তদীয় পুত্র ইসহাক ও প্রোপৌত্র ইয়া'কূব (আ) আবাদ করিয়াছিলেন। তেমনি তৎকালে মুসলিম জনগোষ্ঠী হিসাবে স্বীকৃত বানু ইসরাঈলের শত্রু বিনাশ করিবার লক্ষ্যে সেই পবিত্র ভূমির পার্শ্বস্থ অঞ্চলগুলিও জয় করিয়াছিলেন।
দ্বিতীয়ত, প্রশাসনিক শৃংখলা প্রতিষ্ঠাকরণ।
তৃতীয়ত, সমাজ সংস্কারমূলক কাজ সম্পাদন।
চতুর্থত, ওয়াজ-নসীহত।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00