📄 হযরত হারূন (আ)-এর শেষ জীবন
শেষ জীবন পর্যন্ত হযরত হারুন (আ) তীহ্ প্রান্তরে বনী ইসরাঈল সম্প্রদায়ের সঙ্গে ছিলেন এবং হযরত মূসা (আ)-এর কাঁধে কাঁধ মিলাইয়া দায়িত্ব পালন করিতে থাকেন। সিনাই উপত্যকা হইতে তিনি বনী ইসরাঈলের সঙ্গে রাফীদীন-এ পৌছেন, ঐ স্থানে হযরত মূসা (আ) পাথরে তাঁহার লঠি দ্বারা আঘাত করিয়া আল্লাহ্র নির্দেশে পানি'র ১২টি ঝর্ণা প্রবাহিত করিয়োছিলেন। তথা হইতে হযরত হারুন কাবেস-এ পৌঁছেন, যেখানে মান্না ও সালওয়া নাযিল হইয়াছিল। এই স্থানে বনী ইসরাঈলকে জিহাদ করার নির্দেশ দেওয়া হইলে তাহারা সিরিয়ায় প্রবেশ করিতে অস্বীকার করে এবং আল্লাহ্ ও তাঁহার রাসূলের সাথে বেআদবি শুরু করে, তখন হারূনও মূসা'র সঙ্গে আল্লাহর ভয়ে সিজদায় পতিত হন। হযরত মূসা'র অনুসরণে তাঁহার তৎপরতা এবং তাঁহার উপর হযরত মূসা'র আস্থা-ঐ সময়ে মূসা (আ) আল্লাহ্র দরবারে যে আরয করিয়াছিলেন, তাহার দ্বারাই বুঝা যায় : قَالَ رَبِّ إِنِّي لَا أَمْلِكُ إِلَّا نَفْسِي وَأَخِي فَافْرُقْ بَيْنَنَا وَبَيْنَ الْقَوْمِ الْفُسْقِينَ.
"সে (মূসা) বলিল, হে আমার প্রতিপালক! আমার ও আমার ভ্রাতা ব্যতীত অপর কাহারও উপর আমার আধিপত্য নাই। সুতরাং তুমি আমাদের ও সত্যত্যাগী সম্প্রদায়ের মধ্যে ফয়সালা করিয়া দাও” (৫:২৫)।
বনী ইসরাঈলকে এই অপতৎপরতার কারণে (সিরিয়া, ফিলিস্তীন ও জর্দানের অংশ) আল্লাহর নির্দেশে ৪০ বৎসরের জন্য শামদেশে তাহাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয় এবং বলিয়া দেওয়া হয় যে, বর্তমান প্রজন্মের ইউশা' (আ) ও কালিব ছাড়া আর কেউ-ই শামদেশে প্রবেশ করিতে পারিবে না। এই নিষেধাজ্ঞার ফলে হযরত হারুন (আ) বনী ইসরাঈলের সঙ্গে দীর্ঘ কাল কাবেস-এ অবস্থান করেন। অতঃপর বনী ইসরাঈল যখন কাবেস হইতে প্রস্থান করে তখন তিনিও তাহাদের সহযাত্রী হইয়া আদূম রাজ্যের সীমান্তে অবস্থিত কূহ্ শা'ঈর-এর পার্শ্ব দিয়া অতিক্রম করেন। ইহাই ছিল তাঁহার জীবনের শেষ সফর (আম্বিয়ায়ে কুরআন, ২খ, পৃ. ৩০০-৩০১)।
📄 হযরত হারূন (আ)-এর ইনতিকাল
বাইবেলের গণনা পুস্তকে হযরত হারুন (আ)-এর ইন্তিকালের বর্ণনা নিম্নরূপঃ "তুমি হারোণকে ও তাহার পুত্র ইলীয়াসকে হোর পর্বতের উপরে লইয়া যাও। আর হারোণকে তাহার বস্ত্র ত্যাগ করাইয়া তাহার পুত্র ইলীয়াসকে তাহা পরিধান করাও। হারোণ সে স্থানে (আপন লোকদের কাছে) সংগৃহীত হইবে, সেখানে মরিবে। তখন মোশি সদাপ্রভুর আজ্ঞানুযায়ী কর্ম করিলেন; তাঁহারা সমস্ত মণ্ডলীর সাক্ষাতে হোর পর্বতে উঠিলেন। পরে মোশি হারোণকে তাঁহার বস্ত্র ত্যাগ করাইয়া তাঁহার পুত্র ইলীয়াসকে তাহা পরিধান করাইলেন; এবং হারোণ সে স্থানে পর্বত শৃঙ্গে মরিলেন; পরে মোশি ও ইলীয়াস পর্বত হইতে নামিয়া আসিলেন। আর যখন সমস্ত মণ্ডলী দেখিল যে, হারোণ মরিয়া গিয়াছেন, তখন সমস্ত ইসরাঈল-কুল হারোণের জন্য ত্রিশ দিন পর্যন্ত শোক করিল (গণনা পুস্তক, ২০ঃ ২৫-২৯)।
বাইবেলের দ্বিতীয় বিবরণে বলা হইয়াছে: "ইসরাঈল সন্তানগণ বেরোৎ-বেনেয়াকন হইতে মোষেরোতে যাত্রা করিলে হারোণ সে স্থানে মরিলেন এবং সেই স্থানে তাঁহার কবর হইল; এবং তাঁহার পুত্র ইলীয়াস তাঁহার পরিবর্তে যাজক হইলেন" (দ্বিতীয় বিবরণ, ১০: ৬)।
হযরত হারুন (আ)-এর ইন্তিকাল সম্পর্কে ইব্ন কাছীর বলেন, "আল্লাহ তা'আলা হযরত মূসা'র নিকট ওহী নাযিল করেন যে, আমি হারুনকে মৃত্যু দিতে চাই। অতএব তাহাকে নিয়া অমুক পাহাড়ে যাও। অতঃপর মূসা ও হারুন সেই পাহাড়ে গেলেন। তাহারা সেইখানে একটি বৃক্ষ দেখেন যেমন বৃক্ষ ইতোপূর্বে কেহ দেখে নাই। তাঁহারা সেইখানে নির্মিত একটি গৃহ দেখেন, সেই গৃহে একটি খাট ছিল এবং পবিত্র বাতাস প্রবাহিত হইতেছিল। হযরত হারূন যখন ঐ পাহাড়, গৃহ ও ঐ গৃহের মধ্যে যাহা ছিল সবকিছু দেখিয়া আশ্চর্যান্বিত হইলেন, তখন তিনি মূসাকে বলিলেন, হে মূসা..... আমি এই খাটের বিছানায় ঘুমাইতে চাই। মূসা তাহাকে বলিলেন, আপনি এই বিছানায় ঘুমান। হারুন বলিলেনঃ আমি ভয় পাইতেছি যে, এইখানে ঘুমাইলে এই গৃহের মালিক আসিয়া দেখিতে পাইলে হয়তো আমার উপর রাগান্বিত হইবেন। মূসা তাঁহাকে বলিলেন, আপনি ভয় পাইবেন না, আমি এই গৃহের মালিককে বুঝাইয়া বলিব। আপনি নিশ্চিন্তে ঘুমান। হারুন (আ) বলিলেন, তুমিও আমার সহিত ঘুমাও। বাড়ির মালিক আসিলে উভয়ের উপরই রাগ করিবে। অতঃপর তাঁহারা উভয়ে যখন ঘুমাইলেন তখন হযরত হারূনের মৃত্যু ঘনাইয়া আসিল। তিনি মৃত্যুর স্পর্শ অনুভব করিয়া বলিলেন, হে মূসা! তুমি আমাকে প্রতারণা করিয়াছ। অতঃপর যখন তাঁহার মৃত্যু হইল তখন ঐ গৃহ ও বৃক্ষ অদৃশ্য হইয়া গেল এবং খাটটি তাঁহাকে নিয়া আকাশে উঠিয়া গেল।
অতঃপর হযরত মূসা যখন একা তাঁহার সম্প্রদায়ের নিকট প্রত্যাবর্তন করিলেন, তখন তাহারা বলিতে লাগিল, বনী ইসরাঈলের নিকট হারুন অধিক প্রিয় হওয়ায় হিংসার কারণে মূসা হারূনকে হত্যা করিয়াছেন এবং হারূন তাহাদের নিকট মূসা'র তুলনায় নমনীয় ছিলেন। মূসা (আ)-এর মধ্যে কিছুটা কঠোরতা ছিল। মূসা (আ) এই কথা শুনিয়া তাহাদিগকে বলেন, আফসোস! আমার ভাইকে আমি হত্যা করিয়াছি? তাহারা যখন এই ব্যাপারে অত্যধিক বাড়াবাড়ি শুরু করিল তখন হযরত মূসা (আ) দুই রাক'আত সালাত আদায় করেন এবং আল্লাহর নিকট দু'আ করেন। ফলে খাটটি (হারুনকে লইয়া) নিচের দিকে নামিয়া আসে। বনী ইসরাঈলের লোকজন আসমান ও যমীনের মধ্যে তাহা দেখিতে পায় (ইব্ন কাছীর, কাসাসুল আম্বিয়া; অবদুল ওয়াহ্হাব আন-নাজ্জার এই প্রসঙ্গে অনুরূপ একটি বর্ণনায় বলেন যে, হারূনের দেহে আঘাতের কোন চিহ্ন দেখা যায় নাই (কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ২৯৮)।
এই সম্পর্কে Encyclopaedia of Islam-এ হারূন নিবন্ধের প্রবন্ধকার বলেন, একদিন মূসা ও হারুন একটি গর্ত দেখিতে পাইলেন, যেখানে একটি উজ্জ্বল আলো জ্বলিতেছিল। তাঁহারা উভয়ে সেই গর্তে প্রবেশ করিলেন এবং সেখানে একটি স্বর্ণ নির্মিত সিংহাসন পাইলেন। ঐ সিংহাসনে নিম্নলিখিত শব্দসমূহ লিখিত ছিলঃ এই সিংহাসন তাহার জন্য, যিনি ইহার উপযুক্ত। সিংহাসনটি হযরত মূসা'র জন্য খুবই ছোট ছিল। হযরত হারূন ইহাতে আসন গ্রহণ করিলেন। তখন মৃত্যুর ফেরেস্তা আসিয়া হযরত হারুনের জান কবজ করেন। হযরত হারুন, হযরত মূসা'র তিন বৎসর পূর্বে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন। ইহার পর মূসা (আ) ইসরাঈলীদের নিকট প্রত্যাবর্তন করেন, তখন তাহারা মূসাকে তাঁহার ভাই হারূন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। তাহারা হারূনের মৃত্যুর কথা শুনিয়া মূসাকে দায়ী করে যে, তিনিই হযরত হারুনকে হত্যা করিয়াছেন। ফেরেশতা তখন হারূনের কফিন নিয়া উপস্থিত হন এবং বলেন, মূসাকে এই অপরাধের জন্য সন্দেহ করিও না। অন্য এক বর্ণনায় আছে, হযরত মূসা ইসরাঈলীদের হযরত হারূনের কবরের নিকট নিয়া যান এবং হযরত হারুন পুনরায় জীবিত হইয়া তাঁহার ভাই মূসাকে নির্দোষ ঘোষণা করেন (The Encyclopaedia of Islam, vol. iii, p, 231-32)।
📄 সন্তান-সন্তুতি
বাইবেলে হযরত হারুনের এক স্ত্রী ও চারজন পুত্রের উল্লেখ রহিয়াছে। তাঁহার স্ত্রীর নাম ছিল আল-য়াসা যিনি আম্মীনাদাব (Amminadab)-এর কন্যা এবং নাহসূন-এর বোন ছিলেন। এই বিবাহ তাঁহার মিসরে অবস্থানকালে সংঘটিত হয়। আল-য়াসা-এর গর্ভে তাঁহার চার সন্তান জন্মগ্রহণ করেন। সন্তানদের নাম: নাদাব (Nadab), আবীহু (Abihu) ও আল-য়া'যার (Eleasar), ইথমর (Ithamar)।
হযরত মূসা (আ) তাঁহাদের উভয়ের লাশ উঠাইয়া তাঁবুর বাহিরে পাঠাইয়া দেন এবং হযরত হারুন (আ) ও তাঁহার পুত্রদিগকে ও মাতম না করিতে পরামর্শ দান করেন। সম্ভবত ঐ সময় পর্যন্ত হযরত হারূনের ঐ দুই পুত্র নওজোয়ান ও অবিবাহিত ছিলেন (আম্বিয়ায়ে কুরআন, ২খ, পৃ. ৩০০)। এই সম্পর্কে বাইবেল বলা হইয়াছেঃ এবং নাদাব ও আবীহু সীনাই প্রান্তরে যখন আগুন প্রজ্জ্বলিত করেন, তখন তাঁহারা উভয়ে আল্লাহর হুকুমে মারা যান এবং তাঁহারা নিঃসন্তানও ছিলেন। আল-য়া'যার (Elasar) ও ইথামর (Ithamar), তাঁহাদের পিতা হারূনের (আ) উপস্থিতিতে যাজকের দায়িত্ব পালন করিতেন (গণনাপুস্তক, ৩৪৪)।
হযরত হারূনের ইন্তিকালের পর আল-য়া'যার (Eleasar) পদে রীতিসিদ্ধভাবে অধিষ্ঠিত হন। হযরত হারুনের মোট যাজক চার পুত্রের সকলেই মিসরে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন। আল-য়া'যার-এর বিবাহ হইয়াছিল ফুতাঈল-এর কন্যার সঙ্গে এবং তাঁহাদের সন্তানের নাম ছিল ফায়খাস (যাত্রাপুস্তক, ৭: ১৪-২৭; গণনাপুস্তক ৩: ১-৪ এবং ১৭-২০; গণনাপুস্তক ২৬ : ৬০-৬১ ইত্যাদি)।
📄 গ্রন্থপঞ্জী
(১) মুহাম্মাদ জামীল আহমাদ, আম্বিয়ায়ে কুরআন, ২খ, লাহোর; (২) মাওলানা হিফজুর রহমান সিওহারাবী, কাসাসুল কুরআন, অনুবাদ মাওলানা নূরুর রহমান, ২খ, এমদাদিয়া লাইব্রেরী, ঢাকা ১৯৮৫ খৃ.; (৩) আল্-কুরআনুল করীম, ইসলামিক ফাউণ্ডেশন বাংলাদেশ, ঢাকা ১৯৯২ খৃ.; (৪) ইমাম আবুল ফিদা ইসমাঈল ইব্ন কাছীর, কাসাসুল আম্বিয়া, ১খ, বৈরূত, লেবানন তাবি.; (৫) Encyclopaedia of Islam, vol. iii, New Edition E. j Brill, Leiden, Hollana, 1479; (৬) মুফতী মুহাম্মদ শফী, তাফসীরে মাআরেফুল কুরআন, ইসলামিক ফাউণ্ডেশন বাংলাদেশ, ঢাকা; (7) Good news Bible Today's English verson : United Bible Societies, Third print, London 1477; (৮) আবদুল ওয়াহ্হাব আন-নাজ্জার, কাসাসুল আম্বিয়া, বৈরূত, লেবানন, তা. বি.; (৯) আবদুল মাজেদ দরিয়াবাদী, তাফসীরে মাজেদী, লাহোর।