📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হযরত মূসা (আ)-এর প্রত্যাবর্তন ও হযরত হারূন (আ)-এর সাথে বিতর্ক

📄 হযরত মূসা (আ)-এর প্রত্যাবর্তন ও হযরত হারূন (আ)-এর সাথে বিতর্ক


তূর পাহাড়ে আল্লাহ তা'আলা হযরত মূসা (আ)-কে বনী ইসরাঈলের গোমরাহীর কথা অবহিত করেন। ফলে তিনি অত্যন্ত চিন্তিত ও রাগান্বিত অবস্থায় দ্রুত কওমের নিকট প্রত্যাবর্তন করেন। তাওরাতের বর্ণনায় দেখা যায় যে, যখন তিনি বনী ইসরাঈলের অবস্থানস্থলের সন্নিকটে পৌছেন, তখন তিনি বনী ইসরাঈলের আওয়ায শুনিতে পান। এ আওয়ায ঐ বাছুর পূজার গানের আওয়ায ছিল। ঐ সময় হযরত মূসার সঙ্গে তাঁহার খাস খাদেম হযরত ইউশা ইব্‌ন্ন নূনও ছিলেন। তিনি মনে করেন যে, সম্ভবত ইহা যুদ্ধের আওয়ায (আম্বিয়ায়ে কুরআন, ২খ, পৃ. ২৯২)।
বাইবেলে আছেঃ "পরে যিহোশূয় কোলাহলকারী লোকদের রব শুনিয়া মোশিকে কহিলেন, শিবিরে যুদ্ধের শব্দ হইতেছে। তিনি কহিলেন, উহা ত জয়ধ্বনির শব্দ নয়, পরাজয় ধ্বনিরও শব্দ নয়; আমি গানের শব্দ শুনিতে পাইতেছি। পরে তিনি শিবিরের নিকটবর্তী হইলে ঐ গোবৎস এবং নৃত্য দেখিলেন" (বাইবেলের যাত্রাপুস্তক, ৩২: ১৭-১৯)।
এই ঘটনায় হযরত মূসা (আ) অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হন। তিনি সম্ভবত এইজন্য বেশী রাগান্বিত হন যে, হযরত হারূন (আ)-এর উপস্থিতিতে ইহাদের পথভ্রষ্টতা কিভাবে সীমা অতিক্রম করিল। কওমের লোকদের নিকট পৌঁছিয়া তিনি তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা করেন, তোমাদের একী অবস্থা? তোমরা কি শুরু করিয়াছ? কওমের লোকেরা তাঁহার ক্ষোভ ও ঈমানী জযবা দেখিয়া ভয়ে কাঁপিতে লাগিল এবং বলিতে লাগিল, আমরা নির্দোষ, এই ভুল আমাদের নিজেদের ইচ্ছায় করি নাই। সামেরী আমাদের অলংকারগুলি গলাইয়া বাছুর বানায় এবং বলে, মূসা (আ) আমাদিগকে ভুলিয়া গিয়াছেন, তোমাদের মা'বৃদ তো এখানেই রহিয়াছে। ফলে আমরা ইহার পূজা করিতে শুরু করিলাম।" কওমের লোকদের এই জওয়াব শুনার পরও হযরত মূসা এই তথ্য পান নাই যে, হযরত হারূন এই প্রেক্ষিতে কওমকে বাছুর পূজা হইতে বিরত রাখার জন্য কি কি পদক্ষেপ নিয়াছিলেন এবং তাহাদের হিদায়াত ও সংশোধনের জন্য কি ধরনের চেষ্টা করিয়াছিলেন। তিনি প্রচণ্ড রাগে ও ক্ষোভে ফাটিয়া পড়েন এবং তাঁহার হাত হইতে তাওরাতের ফলকগুলি ফেলিয়া দিয়া হযরত হারূনের দিকে অগ্রসর হইয়া তাঁহার মাথা ও দাড়ি ধরিয়া নিজের দিকে টানিয়া আনিলেন (আম্বিয়ায়ে কুরআন, ২খ, পৃ. ২৯২-২৯৩)।
হযরত হারুন (আ) রিসালাত ও নবুওয়াতের ব্যাপারে হযরত মূসার সাহায্যকারী এবং ঐ মুহূর্তে তাঁহার প্রতিনিধি। এইজন্য তিনি হযরত হারুনকে কৈফিয়তের সুরে বলেন, “হে হারুন! তুমি যখন দেখিলে উহারা পথভ্রষ্ট হইয়াছে তখন কিসে তোমাকে নিবৃত্ত করিল আমার অনুসরণ করা হইতে? তবে কি তুমি আমার আদেশ অমান্য করিলে” (দ্র. ২০: ৯২-৯৩)?
হযরত হারূনের প্রতিনিধিত্বের সময় যে ফিতনা সংঘটিত হয় এবং যিনি হযরত মূসা’র ক্রোধ দেখিয়া প্রথম দিকে নিশ্চুপ ছিলেন, তিনি এইবার কৈফিয়ত দানের ভাষায় বলিতে লাগিলেন, “হারুন বলিল : হে আমার সহোদর! আমার শ্মশ্রু ও কেশ ধরিয়া আকর্ষণ করিও না; আমি আশংকা করিয়াছিলাম যে, তুমি বলিবে, তুমি বনী ইসরাঈলদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করিয়াছ ও তুমি আমার বাক্য পালনে যত্নবান হও নাই” (দ্র. ২০ঃ ৯৪)।
উপরন্তু হযরত হারুন (আ) বলেন যে, বনী ইসরাঈলের মধ্যে মতপার্থক্য ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না হয় সেইজন্য আমি কঠোর কোন পদক্ষেপ গ্রহণের আগে তোমার প্রত্যাবর্তনের জন্য অপেক্ষা করা সমীচীন মনে করিলাম (আম্বিয়ায়ে কুরআন, ২খ, পৃ. ২৯৫)।
এই ক্ষেত্রে একটি প্রশ্ন উত্থাপিত হইতে পারে যে, হযরত মূসা (আ) আল্লাহ্র রাসূল ছিলেন এবং তাঁহার ভাই হযরত হারূনও আল্লাহর প্রেরিত নবী ছিলেন। তাহা ছাড়া হযরত হারূন মূসা'র বড় ভাই ছিলেন। কিন্তু তাহা সত্ত্বেও হযরত মূসা (আ) কিভাবে তাঁহার বড় ভাই হারূন (আ)-এর সহিত রূঢ় আচরণ করিলেন? ইহা কি নবী-রাসূলের শান-এর পরিপন্থী নহে? ইহার উত্তরে মাওলানা শিব্বীর আহমদ উছমানী (র) বলেন :
“হযরত মূসা (আ) বনী ইসারঈলের ঐ মুশরেকী কর্মকাণ্ড দেখিয়া এবং হযরত হারুন (আ)-এর নম্রতা ও দুর্বলতার কথা অনুমান করিয়া এত উত্তেজিত হইয়া পড়েন যে, হারুন (আ)-এর প্রতি রাগে ও ক্ষোভে এবং ঈমানী তেজে তেজোদ্দীপ্ত হইয়া তাঁহার দাড়ি ও মাথার চুল টানিয়া ধরেন। তিনি হারুনকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য এই কাজ করেন নাই।
“হযরত হারুন সম্পর্কে তাঁহার তখন এই ধারণা হইয়াছিল যে, তিনি সম্ভবত ঐ অবস্থার সংশোধনের যথাযথ চেষ্টা করেন নাই, অথচ তাঁহাকে এই ব্যাপারে তাগিদ দেওয়া হইয়াছিল। অবশ্যই হারুন তাঁহার বড় ভাই ও নবী ছিলেন, কিন্তু পদমর্যাদায় তিনি (মূসা) বড় ছিলেন এবং রাজনৈতিক ও অন্যান্য সার্বিক ব্যবস্থাপনার দিক হইতে হযরত হারুনকে তাঁহার উযীর ও অনুসারী বানানো হইয়াছিল। এই ঘটনায় মূসা (আ)- এর নেতৃত্বের ও শাসন ক্ষমতার মর্যাদার প্রকাশ ঘটে, যেন তাঁহার পক্ষ হইতে উত্তেজনা প্রকাশ ও কঠোর বিচার-বিশ্লেষণ হযরত হারুনের ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থাপনার উপর এক ধরনের ভর্ৎসনা ছিল। ইহা দ্বারা কওমকেও এই মর্মে অবহিত করা হয় যে, পয়গাম্বরের অন্তর তাওহীদের প্রেমে কতখানি বিভোর এবং শিক ও কুফরের প্রতি কতখানি বিতৃষ্ণ হইতে পারে, যাহার ফলে এই বিষয়ে বিন্দুমাত্র অলসতা অথবা নীরবতা সহ্য করিতে পারেন না। এমনকি কোন নবী'র ব্যাপারে যদি এমন ধারণা হয় যে, তিনি শিক-এর মুকাবিলায় উচ্চকণ্ঠ হওয়ায় ন্যূনতম ত্রুটি করিয়াছেন তাহা হইলে তিনি আল্লাহর নিকট মর্যাদার অধিকারী হইলেও এইরূপ জবাবদিহিতা হইতে তিনি নিষ্কৃতি পাইবেন না। এই অবস্থায় শারী'আতের দৃষ্টিতে মূসা (আ)-এর কোন ত্রুটি ছিল না" (আম্বিয়ায়ে কুরআন, ২খ, পৃ. ২৯৩-২৯৪)।
হযরত মূসা (আ)-এর রাগ, ক্ষোভ ও হযরত হারূনের সহিত রূঢ় আচরণ যে কোন ব্যক্তিগত বা মর্যাদাগত কারণে ছিল না তাহা সহজেই অনুমেয়। হযরত মূসা (আ) যখন প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে অবগত হইলেন, তখন তাঁহার রাগ ও ক্ষোভ নির্বাপিত হইয়া গেল। তৎক্ষণাৎ তিনি আল্লাহর দরবারে তাঁহার নিজের জন্য ও. হযরত হারূনের ক্ষমার জন্য দু'আ করেন: "মূসা বলিল, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে ও আমার ভ্রাতাকে ক্ষমা কর এবং আমাদিগকে তোমার দয়ার আশ্রয় দাও আর তুমিই শ্রেষ্ঠ দয়ালু" (দ্র. ৭ঃ ১৫১)।
বাইবেলে স্বর্ণের বাছুর তৈরী সম্পর্কে যে তথ্য উপস্থাপন করা হইয়াছে তাহাতে দেখা যায় যে, হযরত হারূন-ই ঐ বাছুর তৈরি করিয়াছিলেন (দ্র. যাত্রাপুস্তক, ২৪১-৬)। অনুরূপ আরও কিছু তথ্য হযরত হারুন (আ) সম্পর্কে উল্লিখিত হইয়াছে, যাহা হযরত হারূনের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অপবাদ।
কিন্তু পবিত্র কুরআন এমন এক মু'জিযা যে, এই কুরআন প্রত্যেক পয়গাম্বরকে নিষ্পাপ প্রমাণ করে এবং তাহাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অমূলক অভিযোগ ও অপবাদ হইতে তাহাদিগকে পবিত্র ও নির্দোষ ঘোষণা করিয়া পয়গাম্বরদের পবিত্রতাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে। হযরত হারূনের ব্যাপারেও কুরআন মিথ্যা ও অসত্যের প্রাসাদকে আসল অপরাধীর নাম উল্লেখ করিয়া কেবল একটি শব্দ "সামেরী” দ্বারা সর্বকালের জন্য ধুলিস্যাৎ করিয়া দেয় (আম্বিয়ায়ে কুরআন, ২খ, পৃ. ২৯৭)। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ বলেন: قَالَ فَإِنَّا قَدْ فَتَنَّا قَوْمَكَ مِنْ بَعْدِكَ وَأَضَلَّهُمُ السَّامِرِيُّ . "তিনি বলিলেন, আমি তোমার সম্প্রদায়কে পরীক্ষায় ফেলিয়াছি তোমার চলিয়া আসার পর এবং সামেরী উহাদিগকে পথভ্রষ্ট করিয়াছে” (২০:৮৫)।
অতঃপর হযরত মূসা (আ)-এর অনুসন্ধানের পর খোদ বনী ইসরাঈলের যবানীতে কুরআন নিম্নোক্ত সাক্ষ্য দেয়: قَالُوا مَا أَخْلَفْنَا مَوْعِدَكَ بِمَلْكِنَا وَلَكِنَّا حُمَلْنَا أَوْزَارًا مِّنْ زِينَةِ الْقَوْمِ فَقَدَفْتُهَا فَكَذَلِكَ الْقَى السَّامِرِيُّ. "উহারা বলিল, আমরা তোমার প্রতি প্রদত্ত অংগীকার স্বেচ্ছায় ভংগ করি নাই। তবে আমাদের উপর চাপাইয়া দেওয়া হইয়াছিল লোকের অলংকারের বোঝা এবং আমরা উহা অগ্নিকাণ্ডে নিক্ষেপ করি, অনুরূপভাবে সামেরীও নিক্ষেপ করে” (২০৪৮৭)।
হযরত হারুন (আ)-এর বিরুদ্ধে বাইবেলের অপবাদের উত্তরে স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা হযরত হারূনের নির্দোষ হওয়ার ঘোষণা দেন: وَ لَقَدْ قَالَ لَهُمْ هُرُونَ مِنْ قَبْلُ لِقَوْمٍ إِنَّمَا فُتِتُمْ بِهِ وَإِنَّ رَبَّكُمُ الرَّحْمَنُ فَاتَّبِعُونِي وَأَطِيعُوا أَمْرِي "হারুন উহাদিগকে পূর্বেই বলিয়াছিল, হে আমার সম্প্রদায়! ইহা দ্বারা তো কেবল তোমাদিগকে পরীক্ষায় ফেলা হইয়াছে। তোমাদের প্রতিপালক দয়াময়; সুতরাং তোমরা আমার অনুসরণ কর এবং আমার আদেশ মানিয়া চল" (২০ : ৯০)।
হযরত মূসা (আ) ও হযরত হারুন (আ)-এর কথাবার্তার পর হযরত মূসা (আ) সামিরীকে যে প্রশ্ন করেন, সেই প্রশ্নের উত্তরে হারূনের নির্দোষিতা ও সামেরীর অপরাধ প্রমাণিত হইয়া যায়। পবিত্র কুরআনে বলা হইয়াছে:
قَالَ فَمَا خَطْبُكَ يَا سَامِرِيُّ . قَالَ بَصُرْتُ بِمَا لَمْ يَبْصُرُوا بِهِ فَقَبَضْتُ قَبْضَةً مِنْ أَثَرِ الرَّسُولِ فَنَبَدْتُهَا وَكَذَلِكَ سَوَّلَتْ لِي نَفْسِي . "মূসা বলিল, হে সামেরী! তোমার ব্যাপার কী? সে বলিল, আমি দেখিয়াছিলাম যাহা উহারা দেখে নাই। অতঃপর আমি সেই দূতের পদচিহ্ন হইতে একমুষ্টি মাটি লইয়াছিলাম এবং আমি উহা নিক্ষেপ করিয়াছিলাম এবং আমার মন আমার জন্য শোভন করিয়াছিল এইরূপ করা" (২০:৯৫-৯৬)।
সামেরী'র স্বীকারোক্তিমূলক এই আয়াতের তাফসীরে হযরত শাহ্ আবদুল কাদের দেহলবী (র) বলেন, যখন বনী ইসরাঈল দ্বিধাবিভক্ত সমুদ্রের মধ্যে প্রবেশ করিল, জিবরাঈল (আ) মধ্যস্থলে পড়িলেন, যাহাতে ফিরআওন বনী ইসরাঈল পর্যন্ত পৌঁছিতে না পারে। সামেরী চিনিতে পারিল যে, ইনি জিবরাঈল (আ)। তাঁহার পদচিহ্ন হইতে সে কিছু মাটি উঠাইয়া লইল। সেই মাটিই সে স্বর্ণ-নির্মিত গো-বাছুরের মধ্যে নিক্ষেপ করিল। স্বর্ণগুলি ছিল কাফিরের সম্পদ যাহা ধোঁকার মাধ্যমে গ্রহণ করা হইয়াছিল। এখন উহাতে বরকতময় মাটি পতিত হইল। হক ও বাতিল মিশ্রিত হইয়া এক চমৎকারিত্বের সৃষ্টি হইল, ফলে উহার মধ্যে প্রাণচাঞ্চল্য ও আওয়ায উৎপন্ন হইল। এমন বস্তু হইতে দূরে থাকা উচিত। ইহা হইতেই মূর্তিপূজা প্রসার লাভ করে (হিফজুর রহ্মান সিওহারাবী, কাসাসুল কুরআন, বংগানুবাদ, ২খ, পৃ. ২১২)।
সুতরাং ইহা একটি প্রতিষ্ঠিত সত্যে পরিণত হইয়া গেল যে, হযরত মূসা (আ) যখন হযরত হারুন (আ)-কে বনী ইসরাঈলের মধ্যে তাঁহার স্থলাভিষিক্তরূপে রাখিয়া তূর পাহাড়ে যান, তখন হযরত হারুন (আ) সঠিকভাবেই দায়িত্ব পালন করিয়াছিলেন। অস্থিরমতি, অসহিষ্ণু ও পথভ্রষ্ট বনী ইসরাঈল সামেরীর প্ররোচনায় পৌত্তলিকতায় লিপ্ত হয়। হযরত হারূন তাহাদিগকে শত চেষ্টা করিয়াও নিবৃত্ত করিতে পারেন নাই। প্রথমে হযরত মূসা (আ) হযরত হারুন (আ)-এর প্রতি অসন্তুষ্ট হইলেও পরে প্রকৃত অবস্থা বুঝিতে পারেন এবং সামেরীকে ভর্ৎসনা করেন। সামেরী চিরকালের জন্য ধিকৃত হইবে তাহা জানাইয়া দেন, যাহা পবিত্র কুরআনের ভাষায় নিম্নোক্তরূপে বর্ণিত হইয়াছে:
وَانْظُرْ إِلَى الْهَكَ الَّذِي ظَلْتَ عَلَيْهِ عَاكِفًا لَنُحَرِّقَنَّهُ ثُمَّ لَنَنْسِفَنَّهُ فِي الْيَمِّ نَسْفًا . "মূসা বলিল, দূর হও! তোমার জীবদ্দশায় তোমার জন্য ইহাই রহিল যে, তুমি বলিবে, আমি অস্পৃশ্য এবং তোমার জন্য রহিল এক নির্দিষ্ট কাল, তোমার বেলায় যাহার ব্যতিক্রম হইবে না এবং তুমি তোমার সেই ইলাহের প্রতি লক্ষ্য কর যাহার পূজায় তুমি রত ছিলে। আমরা উহাকে জ্বালাইয়া দিবই, অতঃপর উহাকে বিক্ষিপ্ত করিয়া সাগরে নিক্ষেপ করিবই" (২০:৯৭)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হযরত হারূন (আ)-এর শেষ জীবন

📄 হযরত হারূন (আ)-এর শেষ জীবন


শেষ জীবন পর্যন্ত হযরত হারুন (আ) তীহ্ প্রান্তরে বনী ইসরাঈল সম্প্রদায়ের সঙ্গে ছিলেন এবং হযরত মূসা (আ)-এর কাঁধে কাঁধ মিলাইয়া দায়িত্ব পালন করিতে থাকেন। সিনাই উপত্যকা হইতে তিনি বনী ইসরাঈলের সঙ্গে রাফীদীন-এ পৌছেন, ঐ স্থানে হযরত মূসা (আ) পাথরে তাঁহার লঠি দ্বারা আঘাত করিয়া আল্লাহ্র নির্দেশে পানি'র ১২টি ঝর্ণা প্রবাহিত করিয়োছিলেন। তথা হইতে হযরত হারুন কাবেস-এ পৌঁছেন, যেখানে মান্না ও সালওয়া নাযিল হইয়াছিল। এই স্থানে বনী ইসরাঈলকে জিহাদ করার নির্দেশ দেওয়া হইলে তাহারা সিরিয়ায় প্রবেশ করিতে অস্বীকার করে এবং আল্লাহ্ ও তাঁহার রাসূলের সাথে বেআদবি শুরু করে, তখন হারূনও মূসা'র সঙ্গে আল্লাহর ভয়ে সিজদায় পতিত হন। হযরত মূসা'র অনুসরণে তাঁহার তৎপরতা এবং তাঁহার উপর হযরত মূসা'র আস্থা-ঐ সময়ে মূসা (আ) আল্লাহ্র দরবারে যে আরয করিয়াছিলেন, তাহার দ্বারাই বুঝা যায় : قَالَ رَبِّ إِنِّي لَا أَمْلِكُ إِلَّا نَفْسِي وَأَخِي فَافْرُقْ بَيْنَنَا وَبَيْنَ الْقَوْمِ الْفُسْقِينَ.
"সে (মূসা) বলিল, হে আমার প্রতিপালক! আমার ও আমার ভ্রাতা ব্যতীত অপর কাহারও উপর আমার আধিপত্য নাই। সুতরাং তুমি আমাদের ও সত্যত্যাগী সম্প্রদায়ের মধ্যে ফয়সালা করিয়া দাও” (৫:২৫)।
বনী ইসরাঈলকে এই অপতৎপরতার কারণে (সিরিয়া, ফিলিস্তীন ও জর্দানের অংশ) আল্লাহর নির্দেশে ৪০ বৎসরের জন্য শামদেশে তাহাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয় এবং বলিয়া দেওয়া হয় যে, বর্তমান প্রজন্মের ইউশা' (আ) ও কালিব ছাড়া আর কেউ-ই শামদেশে প্রবেশ করিতে পারিবে না। এই নিষেধাজ্ঞার ফলে হযরত হারুন (আ) বনী ইসরাঈলের সঙ্গে দীর্ঘ কাল কাবেস-এ অবস্থান করেন। অতঃপর বনী ইসরাঈল যখন কাবেস হইতে প্রস্থান করে তখন তিনিও তাহাদের সহযাত্রী হইয়া আদূম রাজ্যের সীমান্তে অবস্থিত কূহ্ শা'ঈর-এর পার্শ্ব দিয়া অতিক্রম করেন। ইহাই ছিল তাঁহার জীবনের শেষ সফর (আম্বিয়ায়ে কুরআন, ২খ, পৃ. ৩০০-৩০১)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হযরত হারূন (আ)-এর ইনতিকাল

📄 হযরত হারূন (আ)-এর ইনতিকাল


বাইবেলের গণনা পুস্তকে হযরত হারুন (আ)-এর ইন্তিকালের বর্ণনা নিম্নরূপঃ "তুমি হারোণকে ও তাহার পুত্র ইলীয়াসকে হোর পর্বতের উপরে লইয়া যাও। আর হারোণকে তাহার বস্ত্র ত্যাগ করাইয়া তাহার পুত্র ইলীয়াসকে তাহা পরিধান করাও। হারোণ সে স্থানে (আপন লোকদের কাছে) সংগৃহীত হইবে, সেখানে মরিবে। তখন মোশি সদাপ্রভুর আজ্ঞানুযায়ী কর্ম করিলেন; তাঁহারা সমস্ত মণ্ডলীর সাক্ষাতে হোর পর্বতে উঠিলেন। পরে মোশি হারোণকে তাঁহার বস্ত্র ত্যাগ করাইয়া তাঁহার পুত্র ইলীয়াসকে তাহা পরিধান করাইলেন; এবং হারোণ সে স্থানে পর্বত শৃঙ্গে মরিলেন; পরে মোশি ও ইলীয়াস পর্বত হইতে নামিয়া আসিলেন। আর যখন সমস্ত মণ্ডলী দেখিল যে, হারোণ মরিয়া গিয়াছেন, তখন সমস্ত ইসরাঈল-কুল হারোণের জন্য ত্রিশ দিন পর্যন্ত শোক করিল (গণনা পুস্তক, ২০ঃ ২৫-২৯)।
বাইবেলের দ্বিতীয় বিবরণে বলা হইয়াছে: "ইসরাঈল সন্তানগণ বেরোৎ-বেনেয়াকন হইতে মোষেরোতে যাত্রা করিলে হারোণ সে স্থানে মরিলেন এবং সেই স্থানে তাঁহার কবর হইল; এবং তাঁহার পুত্র ইলীয়াস তাঁহার পরিবর্তে যাজক হইলেন" (দ্বিতীয় বিবরণ, ১০: ৬)।
হযরত হারুন (আ)-এর ইন্তিকাল সম্পর্কে ইব্‌ন কাছীর বলেন, "আল্লাহ তা'আলা হযরত মূসা'র নিকট ওহী নাযিল করেন যে, আমি হারুনকে মৃত্যু দিতে চাই। অতএব তাহাকে নিয়া অমুক পাহাড়ে যাও। অতঃপর মূসা ও হারুন সেই পাহাড়ে গেলেন। তাহারা সেইখানে একটি বৃক্ষ দেখেন যেমন বৃক্ষ ইতোপূর্বে কেহ দেখে নাই। তাঁহারা সেইখানে নির্মিত একটি গৃহ দেখেন, সেই গৃহে একটি খাট ছিল এবং পবিত্র বাতাস প্রবাহিত হইতেছিল। হযরত হারূন যখন ঐ পাহাড়, গৃহ ও ঐ গৃহের মধ্যে যাহা ছিল সবকিছু দেখিয়া আশ্চর্যান্বিত হইলেন, তখন তিনি মূসাকে বলিলেন, হে মূসা..... আমি এই খাটের বিছানায় ঘুমাইতে চাই। মূসা তাহাকে বলিলেন, আপনি এই বিছানায় ঘুমান। হারুন বলিলেনঃ আমি ভয় পাইতেছি যে, এইখানে ঘুমাইলে এই গৃহের মালিক আসিয়া দেখিতে পাইলে হয়তো আমার উপর রাগান্বিত হইবেন। মূসা তাঁহাকে বলিলেন, আপনি ভয় পাইবেন না, আমি এই গৃহের মালিককে বুঝাইয়া বলিব। আপনি নিশ্চিন্তে ঘুমান। হারুন (আ) বলিলেন, তুমিও আমার সহিত ঘুমাও। বাড়ির মালিক আসিলে উভয়ের উপরই রাগ করিবে। অতঃপর তাঁহারা উভয়ে যখন ঘুমাইলেন তখন হযরত হারূনের মৃত্যু ঘনাইয়া আসিল। তিনি মৃত্যুর স্পর্শ অনুভব করিয়া বলিলেন, হে মূসা! তুমি আমাকে প্রতারণা করিয়াছ। অতঃপর যখন তাঁহার মৃত্যু হইল তখন ঐ গৃহ ও বৃক্ষ অদৃশ্য হইয়া গেল এবং খাটটি তাঁহাকে নিয়া আকাশে উঠিয়া গেল।
অতঃপর হযরত মূসা যখন একা তাঁহার সম্প্রদায়ের নিকট প্রত্যাবর্তন করিলেন, তখন তাহারা বলিতে লাগিল, বনী ইসরাঈলের নিকট হারুন অধিক প্রিয় হওয়ায় হিংসার কারণে মূসা হারূনকে হত্যা করিয়াছেন এবং হারূন তাহাদের নিকট মূসা'র তুলনায় নমনীয় ছিলেন। মূসা (আ)-এর মধ্যে কিছুটা কঠোরতা ছিল। মূসা (আ) এই কথা শুনিয়া তাহাদিগকে বলেন, আফসোস! আমার ভাইকে আমি হত্যা করিয়াছি? তাহারা যখন এই ব্যাপারে অত্যধিক বাড়াবাড়ি শুরু করিল তখন হযরত মূসা (আ) দুই রাক'আত সালাত আদায় করেন এবং আল্লাহর নিকট দু'আ করেন। ফলে খাটটি (হারুনকে লইয়া) নিচের দিকে নামিয়া আসে। বনী ইসরাঈলের লোকজন আসমান ও যমীনের মধ্যে তাহা দেখিতে পায় (ইব্‌ন কাছীর, কাসাসুল আম্বিয়া; অবদুল ওয়াহ্হাব আন-নাজ্জার এই প্রসঙ্গে অনুরূপ একটি বর্ণনায় বলেন যে, হারূনের দেহে আঘাতের কোন চিহ্ন দেখা যায় নাই (কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ২৯৮)।
এই সম্পর্কে Encyclopaedia of Islam-এ হারূন নিবন্ধের প্রবন্ধকার বলেন, একদিন মূসা ও হারুন একটি গর্ত দেখিতে পাইলেন, যেখানে একটি উজ্জ্বল আলো জ্বলিতেছিল। তাঁহারা উভয়ে সেই গর্তে প্রবেশ করিলেন এবং সেখানে একটি স্বর্ণ নির্মিত সিংহাসন পাইলেন। ঐ সিংহাসনে নিম্নলিখিত শব্দসমূহ লিখিত ছিলঃ এই সিংহাসন তাহার জন্য, যিনি ইহার উপযুক্ত। সিংহাসনটি হযরত মূসা'র জন্য খুবই ছোট ছিল। হযরত হারূন ইহাতে আসন গ্রহণ করিলেন। তখন মৃত্যুর ফেরেস্তা আসিয়া হযরত হারুনের জান কবজ করেন। হযরত হারুন, হযরত মূসা'র তিন বৎসর পূর্বে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন। ইহার পর মূসা (আ) ইসরাঈলীদের নিকট প্রত্যাবর্তন করেন, তখন তাহারা মূসাকে তাঁহার ভাই হারূন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। তাহারা হারূনের মৃত্যুর কথা শুনিয়া মূসাকে দায়ী করে যে, তিনিই হযরত হারুনকে হত্যা করিয়াছেন। ফেরেশতা তখন হারূনের কফিন নিয়া উপস্থিত হন এবং বলেন, মূসাকে এই অপরাধের জন্য সন্দেহ করিও না। অন্য এক বর্ণনায় আছে, হযরত মূসা ইসরাঈলীদের হযরত হারূনের কবরের নিকট নিয়া যান এবং হযরত হারুন পুনরায় জীবিত হইয়া তাঁহার ভাই মূসাকে নির্দোষ ঘোষণা করেন (The Encyclopaedia of Islam, vol. iii, p, 231-32)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সন্তান-সন্তুতি

📄 সন্তান-সন্তুতি


বাইবেলে হযরত হারুনের এক স্ত্রী ও চারজন পুত্রের উল্লেখ রহিয়াছে। তাঁহার স্ত্রীর নাম ছিল আল-য়াসা যিনি আম্মীনাদাব (Amminadab)-এর কন্যা এবং নাহসূন-এর বোন ছিলেন। এই বিবাহ তাঁহার মিসরে অবস্থানকালে সংঘটিত হয়। আল-য়াসা-এর গর্ভে তাঁহার চার সন্তান জন্মগ্রহণ করেন। সন্তানদের নাম: নাদাব (Nadab), আবীহু (Abihu) ও আল-য়া'যার (Eleasar), ইথমর (Ithamar)।
হযরত মূসা (আ) তাঁহাদের উভয়ের লাশ উঠাইয়া তাঁবুর বাহিরে পাঠাইয়া দেন এবং হযরত হারুন (আ) ও তাঁহার পুত্রদিগকে ও মাতম না করিতে পরামর্শ দান করেন। সম্ভবত ঐ সময় পর্যন্ত হযরত হারূনের ঐ দুই পুত্র নওজোয়ান ও অবিবাহিত ছিলেন (আম্বিয়ায়ে কুরআন, ২খ, পৃ. ৩০০)। এই সম্পর্কে বাইবেল বলা হইয়াছেঃ এবং নাদাব ও আবীহু সীনাই প্রান্তরে যখন আগুন প্রজ্জ্বলিত করেন, তখন তাঁহারা উভয়ে আল্লাহর হুকুমে মারা যান এবং তাঁহারা নিঃসন্তানও ছিলেন। আল-য়া'যার (Elasar) ও ইথামর (Ithamar), তাঁহাদের পিতা হারূনের (আ) উপস্থিতিতে যাজকের দায়িত্ব পালন করিতেন (গণনাপুস্তক, ৩৪৪)।
হযরত হারূনের ইন্তিকালের পর আল-য়া'যার (Eleasar) পদে রীতিসিদ্ধভাবে অধিষ্ঠিত হন। হযরত হারুনের মোট যাজক চার পুত্রের সকলেই মিসরে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন। আল-য়া'যার-এর বিবাহ হইয়াছিল ফুতাঈল-এর কন্যার সঙ্গে এবং তাঁহাদের সন্তানের নাম ছিল ফায়খাস (যাত্রাপুস্তক, ৭: ১৪-২৭; গণনাপুস্তক ৩: ১-৪ এবং ১৭-২০; গণনাপুস্তক ২৬ : ৬০-৬১ ইত্যাদি)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00