📄 ইনতিকাল
হযরত মূসা (আ) বনূ ইসরাঈলের বিভিন্ন নির্যাতন ও অনৈতিক ক্রিয়াকলাপ অত্যন্ত ধৈর্যের সহিত মোকাবিলা করিয়া তাহাদের দাওয়াত ও হিদায়াতের কাজে নিরন্তর চেষ্টা করিয়া যান। অতঃপর তাঁহার মৃত্যুর সময় আসিয়া যায়। বাইবেলের বর্ণনামতে তাঁহার বয়স যখন এক শত বিশ বৎসর তখন আল্লাহ্ তাঁহাকে মোয়াবের ময়দানে নবো পর্ব্বতের যিরী হো (আরীহা)-এর সম্মুখস্থ পিস্সা শৃঙ্গে উঠিতে নির্দেশ দিলেন। সেখান হইতে সিরিয়ার যে সকল দেশ আল্লাহ তাহাদিগকে দেওয়ার অঙ্গীকার করিয়াছিলেন তাহা দেখাইলেন এবং সেখানেই তিনি ইনতিকাল করিলেন (দ্র. বাইবেল, দ্বিতীয় বিবরণ, ৩৪: ১-৭)। হারুন (আ)-এর তিন বৎসর পর তিনি ইনতিকাল করেন (ইব্ন কুতায়বা, আল-মা'আরিফ, পৃ. ২৬)।
সুদ্দীর সূত্রে অন্য একটি বর্ণনায় আছে যে, একবার মূসা (আ) ও তাঁহার খাদেম ইউশা ইব্ন নূন কোথায়ও যাইতেছিলেন। হঠাৎ কালো এক ধরনের বায়ু প্রবাহিত হইল। ইউশা ইহা দেখিয়া মনে করিলেন যে, কিয়ামত বুঝি শুরু হইয়া গিয়াছে। তিনি মূসা (আ)-কে জাপটাইয়া ধরিলেন এবং (মনে মনে) বলিলেন, কিয়ামত হইয়া যাইবে আর আমি আল্লাহ্ নবী মূসা (আ)-কে জাপ্টাইয়া থাকিব। মূসা (আ) জামার নিচ দিয়া বাহির হইয়া গেলেন আর জামাটি ইউশা-এর হাতে পড়িয়া রহিল। ইউশা যখন জামাটি লইয়া তাঁহার সম্প্রদায়ের নিকট আসিলেন তখন বনূ ইসরাঈল তাহাকে জেরা শুরু করিয়া দিল এবং বলিল, তুমি আল্লাহর নবীকে হত্যা করিয়াছ। ইউশা বলিলেন, না, আল্লাহ্ কসম! আমি তাঁহাকে হত্যা করি নাই, বরং তিনি আমার নিকট হইতে আস্তে বাহির হইয়া গিয়াছেন। ইহা তাহারা বিশ্বাস করিল না বরং তাঁহাকে হত্যা করিবার সংকল্প করিল। ইউশা বলিলেন, তোমরা যদি আমার কথা বিশ্বাস না কর তবে আমাকে তিন দিন সময় দাও। অতঃপর তিনি আল্লাহ্র নিকট দু'আ করিলেন। অতঃপর তাঁহার প্রহরায় যাহারা নিযুক্ত ছিল তাহাদের সকলকেই স্বপ্ন দেখানো হইল যে, ইউশা মূসাকে হত্যা করে নাই, বরং আমরা তাহাকে আমাদের নিকট উঠাইয়া লইয়াছি। অতঃপর তাহারা তাঁহাকে ছাড়িয়া দিল। আর মূসা (আ)-এর সহিত দুর্দান্ত সম্প্রদায়ের গ্রামে প্রবেশ করিতে যাহারাই অস্বীকার করিয়াছিল সকলেই ইনতিকাল করিল। পরবর্তী কালে উক্ত দেশ বিজয়ে তাহারা অংশগ্রহণ করিতে পারে নাই। হাফিজ ইব্ন কাছীর এই রিওয়ায়াত বর্ণনা করিয়া মন্তব্য করিয়াছেন যে, ইহার কিছু কিছু অংশ মুনকার ও গারীব পর্যায়ের (দ্র. প্রাগুক্ত, ১খ, ৩১৮)।
ইব্ন কাছীর (র) ওয়াহ্হ্ ইব্ন মুনাব্বিহ' (র) হইতে মূসা (আ)-এর ইনতিকাল সম্পর্কে একটি সূত্রবিহীন ঘটনার উল্লেখ করিয়াছেন, মূসা (আ) একবার একদল ফেরেশতার নিকট দিয়া যাইতেছিলেন, যাহারা একটি কবর খুঁড়িতেছিলেন। তিনি উহা হইতে সুন্দর, উজ্জ্বল ও দ্যুতিময় কবর আর দেখেন নাই। তাই তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, হে আল্লাহ্ ফেরেশতাগণ! তোমরা কাহার জন্য এই কবর খুঁড়িতেছ? তাহারা বলিলেন, আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে একজন সম্মানিত বান্দার জন্য। আপনি যদি সেই বান্দা হইতে চাহেন তবে এই কবরে প্রবেশ করুন, উহাতে লম্বা ইইয়া শুইয়া পড়ুন। আর আপনার প্রতিপালকের দিকে মনোনিবেশ করুন এবং সহজভাবে শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ করুন। মূসা (আ) তাহাই করিলেন, অতঃপর তিনি ইনতিকাল করিলেন। ফেরেশতাগণ তাঁহার জানাযা পড়িলেন এবং তাঁহাকে দাফন করিলেন (আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১খ, ৩১৮-৩১৯)।
সাহীহ বুখারী ও মুসলিমে হযরত আবু হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মূসা (আ)-এর মৃত্যু নিকটবর্তী হইলে মৃত্যুর ফেরেশতা তাঁহার নিকট উপস্থিত হইয়া বলিলেন, اجب ربه "আপনার প্রতিপালকের পক্ষ,হইতে মৃত্যুর পয়গামে সাড়া দিন"। মূসা (আ) তাহাকে একটি ঘুষি মারিলেন। ইহার ফলে তাহার একটি চক্ষু নষ্ট হইয়া গেল। তিনি আল্লাহ্র নিকট ফিরিয়া গিয়া বলিলেন, আপনি আমাকে এমন এক বান্দার নিকট পাঠাইয়াছেন যিনি মরিতে চাহেন না। আল্লাহর পক্ষ হইতে তাহার চক্ষু ফিরাইয়া দেওয়া হইল। আল্লাহ তাহাকে নির্দেশ দিলেন যে, পুনরায় তাহার নিকট গমন কর এবং তাহাকে বল, সে যেন তাহার হাত একটি বলদের পিঠের উপর রাখে। ইহাতে যতগুলি পশম তাহার হাতের নীচে পড়িবে, প্রতিটি পশমের বদলে তাহাকে এক বৎসরের হায়াত দেওয়া হইবে। মূসা (আ) বলিলেন, হে আমার প্রতিপালক! তাহার পর কি হইবে? আল্লাহ বলিলেন, তাহার পর মৃত্যু। মূসা (আ) বলিলেন, তাহা হইলে এখনই মৃত্যু হউক। তিনি আল্লাহ্র নিকট দু'আ করিলেন, তাহাকে যেন 'আরদে মুকাদ্দাস' তথা পবিত্র ভূমি হইতে একটি পাথর নিক্ষেপের দূরত্বের সমান স্থানে কবর দেওয়া হয়। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, আমি যদি সেইখানে থাকিতাম তবে অবশ্যই আমি তোমাদিগকে রাস্তার পার্শ্বে লাল টিলার নিচে তাঁহার কবরটি দেখাইয়া দিতাম (আল-বুখারী, আস-সাহীহ, কিতাবুল আম্বিয়া, বাব ওয়াফাতু মূসা (আ) ওয়া যিকরুহু বা'দু, ১খ., পৃ. ৪৮৪, হাদীস নং ৩৪০৭; মুসলিম, আস-সাহীহ, কিতাবুল ফাদাইল, হাদীছ নং ৫৯৩৫, ৫৯৩৬)। তবে মুসলিমের বর্ণনায় عينيه ففقاً এবং فرد الله عينه বাক্য দুইটি বেশী আছে। যাহার অর্থ হইল, চপেটাঘাতের কারণে ফেরেশতার একটা চোখ নষ্ট হইয়া গিয়াছিল এবং আল্লাহ ফেরেশতার সে চোখ ভাল করিয়া দিলেন।
📄 মূসা (আ)-এর কবর
মূসা (আ)-এর কবর কোথায় বাইবেলে তাহা কেহ জানে না বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে। বাইবেলে উল্লিখিত হইয়াছে, "তখন সদাপ্রভুর দাস মোশি সদাপ্রভুর বাক্যানুসারে সেই স্থানে মোয়াব দেশে মরিলেন। আর তিনি মোয়াব দেশে বৈৎপিয়োরের Beth peor সম্মুখস্থ উপত্যকাতে তাঁহাকে কবর দিলেন, কিন্তু তাঁহার কবরস্থান অদ্যাপি কেহ জানে না" (বাইবেল, দ্বিতীয় বিবরণ, ৩৪: ৫-৬)। তবে রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার কবরের স্থান নির্দেশ করিয়াছেন। বুখারী ও মুসলিমের হাদীছে আবু হুরায়রা (রা) বর্ণিত রিওয়াতে বলা হইয়াছে যে, রাসূলুল্লাহ (স) ইরশাদ করেন, 'আমি যদি সেইখানে থাকিতাম তবে অবশ্যই তোমাদিগকে রাস্তার পার্শ্বে লাল টীলার নিচে তাঁহার কবরটি দেখাইয়া দিতাম' (আল-বুখারী, কিতাবুল আম্বিয়া, হাদীস নং ৩৪০৭; মুসলিম, কিতাবুল ফাদাইল, হাদীছ নং ৫৯৩৫)।
আনাস ইবন মালিক (রা) হইতে বর্ণিত একটি হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, মিরাজের রাত্রে আমাকে যখন লইয়া যাওয়া হয় তখন আমি মূসা (আ)-এর পার্শ্ব দিয়া গেলাম। তিনি লাল টিলার কাছে অবস্থিত তাঁহার কবরে দাঁড়াইয়া সালাত আদায় করিতেছিলেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, '১খ, ৩১৮)। ভূগোলবিদ মাদ্দিসী বলেন, আরীহা (যিরীহো)-এর নিকট একটি কবর আছে, যাহাকে মূসা (আ)-এর কবর বলিয়া উল্লেখ করা হইয়া থাকে। তাহার এই বর্ণনা হাদীছ ও বাইবেলের বর্ণনার সহিত সামঞ্জস্যশীল (আম্বিয়া-ই কুরআন, ২খ, ২৭৬)।
📄 স্ত্রী ও সন্তান-সন্তুতি
কুরআন ও হাদীসের বর্ণনা হইতে মূসা (আ)-এর এক স্ত্রীর কথা জানা যায়। একাধিক স্ত্রী ও সন্তান-সন্তুতির কোনও সুস্পষ্ট বিবরণ উহাতে নাই। বাইবেলে মূসা (আ)-এর কয়েকজন স্ত্রী ও সন্তান-সন্তুতির বিবরণ পাওয়া যায়। যথাঃ (১) তাঁহার সর্বপ্রথম বিবাহ হয় সাফুরা zipparah-এর সহিত, যিনি প্রসিদ্ধ বর্ণনামতে শুআয়ব (আ)-এর কন্যা ছিলেন। তাঁহার গর্ভে তাঁহার দুই পুত্র জন্মগ্রহণ করে : (i) জীরসোম Gershom ও (ii) এলিআযর বা আলইযাসার Eleasar ইহারা উভয়েই মায়ান-এ জন্মগ্রহণ করেন, যখন তিনি মিসর হইতে মাদ্য়ান চলিয়া আসেন এবং বিবাহের পর শুআয়ব (আ)-এর নিকট নির্ধারিত সময় অতিবাহিত করেন (যাত্রাপুস্তক, ২: ২১-২২; ৪: ২০; আম্বিয়া-ই কুরআন, ২খ, ২৭৯)।
(২) তাঁহার দ্বিতীয় বিবাহ হয় এক কৃশীয় মহিলার সহিত (গণনাপুস্তক, ১২: ১), যাহার নাম উল্লেখ নাই। ইংরাজীতে তাহাকে Ethiopian অর্থাৎ হাবশী বংশোদ্ভূতা বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে।
(৩) আরও একজন মহিলাকে তিনি বিবাহ করেন যাহার নাম অজ্ঞাত। তবে তাহার পিতার নাম 'কায়নী' বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে।
(৪) আরও একজন স্ত্রীর উল্লেখ পাওয়া যায়। তাঁহারও নাম উল্লেখ করা হয় নাই। অবশ্য তাঁহার পিতার নাম রূইয়াঈল বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে। এই স্ত্রীর গর্ভে এক পুত্র জন্মগ্রহণ করে যাহার নাম ছিল 'হুবাব' Hobab (আম্বিয়া-ই কুরআন, ২খ, ২৭৯-২৮০)।
📄 দৈহিক অবয়ব
সহীহ হাদীসসমূহে হযরত মূসা (আ)-এর দৈহিক অবয়ব সম্পর্কে উল্লিখিত হইয়াছে। তিনি ছিলেন গৌরবর্ণের দীর্ঘ দেহধারী এক সুপুরুষ। তাঁহার চুল ছিল কোঁকড়ানো (দ্র. আল-বুখারী, আস-সাহীহ, কিতাবুল-আম্বিয়া, হাদীছ নং ৩১৪৯; ইব্ন কুতায়বা, আল-মা'আরিফ, পৃ. ২৬)। তাঁহার নাকের বাঁশিতে একটি এবং জিহবার অগ্রভাগে একটি তিলক ছিল (ইব্ন কুতায়বা, প্রাগুক্ত)। তাঁহার জিহবায় কিছুটা জড়তা ছিল যাহার ফলে কথা বলিবার সময় একটু তোতলামি ভাব পরিলক্ষিত হইত। কোনও কোনও মুফাস্স্সির ও সীরাতবিদ ইহাকে শৈশবে ফিরআওন কর্তৃক পরীক্ষা করার সময় তিনি যে অঙ্গার মুখে দিয়াছিলেন উহারই প্রভাব মনে করেন।