📄 মূসা (আ)-এর সহিত রাসূলুল্লাহ (স)-এর সাক্ষাত
ইমাম বুখারী (র) তাঁহার সাহীহ গ্রন্থে মালিক ইবন সা'সাআ (রা) সূত্রে মি'রাজ সম্পর্কিত দীর্ঘ হাদীছ বর্ণনা করিয়াছেন। উহাতে উল্লিখিত হইয়াছে যে, সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ (স) মি'রাজ রজনীতে ষষ্ঠ আসমানে মূসা (আ)-এর সহিত সাক্ষাত করেন। জিবরাঈল (আ) তাঁহাকে পরিচয় করাইয়া দেন যে, ইনি মূসা (আ)! তাঁহাকে সালাম করুন। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, আমি তাঁহাকে সালাম করিলাম। তিনি উহার উত্তর দিয়া বলিলেন, স্বাগতম নেককার ভ্রাতা ও নেক্কার নবী। অতঃপর আমি যখন উক্ত স্থান অতিক্রম করিলাম তখন তিনি কাঁদিয়া ফেলিলেন। তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করা হইল, আপনার ক্রন্দনের কারণ কি? তিনি বলিলেন, আমি এইজন্য কাঁদিয়াছি যে, এক অল্প-বয়স্ক যুবককে আমার পর নবুওয়াত প্রদান করা হইয়াছে। আমার উম্মাতের তুলনায় তাঁহার উম্মাতের অধিক সংখ্যক লোক জান্নাতে প্রবেশ করিবে।
উক্ত হাদীছেই পরের অংশে বর্ণনা করা হইয়াছে যে, আল্লাহ তাঁহার ও তাঁহার উম্মাতের জন্য রাত-দিন পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত ফরয করেন। উহা লইয়া তিনি প্রত্যাবর্তনের সময় আবার মূসা (আ)-এর সহিত সাক্ষাত হইলে তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, আপনাকে কি নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আমাকে প্রতিদিন পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে। মূসা (আ) বলিলেন, আপনার উম্মাত প্রতিদিন পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত আদায়ে সক্ষম হইবে না। আল্লাহ্র কসম! আমি আপনার পূর্বে মানুষকে পর্যবেক্ষণ করিয়াছি এবং বানু ইসরাঈলের হিদায়াতের জন্য কঠোর পরিশ্রম করিয়াছি। তাই আপনি আপনার প্রতিপালকের নিকট ফিরিয়া যান এবং আপনার উম্মাতের জন্য আরো কমাইয়া দেওয়ার আবেদন করুন। আমি ফিরিয়া গেলাম। অতঃপর আল্লাহ দশ ওয়াক্ত হ্রাস করিয়া দিলেন। অতঃপর আমি মূসা (আ)-এর নিকট ফিরিয়া আসিলে তিনি পূর্বের ন্যায় বলিলেন। আমি আবার আল্লাহর নিকট ফিরিয়া গেলাম। তিনি আরও দশ ওয়াক্ত হ্রাস করিয়া দিলেন। আমি মূসা (আ)-এর নিকট ফিরিয়া আসিলে তিনি আবারও পূর্বের ন্যায় বলিলেন। অতঃপর আমি ফিরিয়া গেলাম। তখন আমাকে প্রতি দিন দশ ওয়াক্ত-এর নির্দেশ দেওয়া হইল। আমি ফিরিয়া আসিলে তিনি এইবারও পূর্বের ন্যায় বলিলেন। অতঃপর আমি ফিরিয়া গেলাম। তখন আমাকে প্রতি দিন পাঁচ ওয়াক্তের নির্দেশ দেওয়া হইল। আমি মূসা (আ)-এর নিকট ফিরিয়া আসিলে তিনি বলিলেন, আপনাকে কি আদেশ দেওয়া হইয়াছে। আমি বলিলাম, আমাকে দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে। তিনি বলিলেন, আপনার উম্মাত দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করিতেও সমর্থ হইবে না। আপনার পূর্বে লোকদের সম্পর্কে আমার অভিজ্ঞতা রহিয়াছে। বনু ইসরাঈলের হিদায়াতের জন্য কঠোর পরিশ্রম করিয়াছি। আপনি আপনার প্রতিপালকের নিকট ফিরিয়া যান এবং আপনার উম্মাতের জন্য আরো হ্রাস করিবার আবেদন করুন। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, আমি আমার প্রতিপালকের নিকট অনেকবার আবেদন করিয়াছি। এখন আমি লজ্জাবোধ করিতেছি আর আমি ইহাতেই সন্তুষ্ট হইয়াছি এবং মানিয়া লইয়াছি (আল-বুখারী, আস-সাহীহ, কিতাবুল মানাকিব, বাবুল মি'রাজ, ১খ, পৃ. ৫৪৯-৫০, হাদীছ নং ৩৮৮৭)।
📄 মূসা (আ)-এর জীবনের শেষ দিনগুলি
জীবনের শেষভাগে আসিয়া মূসা (আ) কি করিয়াছিলেন বা তাঁহার উম্মাতকে কি বলিয়াছিলেন সেই সম্পর্কে বাইবেলে বর্ণিত হইয়াছে যে, মূসা (আ) জীবনের শেষ প্রান্তে আসিয়া তাঁহার প্রতি অঙ্গীকারকৃত শামদেশ দেখিবার জন্য আল্লাহ্র নিকট আকাঙ্খা ব্যক্ত করিয়াছিলেন। কিন্তু আল্লাহ তাঁহার এই মনস্কামনা পূরণ না করিয়া বরং পর্বত শৃঙ্গে উঠিয়া চতুর্দিকে দৃষ্টিপাত করিবার নির্দেশ দেন। বাইবেলে বলা হইয়াছে:
"বিনয় করি আমাকে ওপারে গিয়া যদ্দন পারস্থ সেই উত্তম দেশ, সেই রমণীয় গিরিপ্রদেশ ও লিবানোন দেখিতে দাও। কিন্তু সদাপ্রভু তোমাদের জন্য আমার প্রতিকূলে ক্রুদ্ধ হওয়াতে আমার কথা শুনিলেন না, সদাপ্রভু আমাকে কহিলেন, তোমার পক্ষে এই যথেষ্ট, এ বিষয়ে কথা আমাকে আর বলিও না। পিস্সার শৃঙ্গে উঠ এবং পশ্চিম, উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্বদিকে দৃষ্টিপাত কর, আপন চক্ষে নিরীক্ষণ কর; কেননা তুমি এই যদ্দন পার হইতে পাইবে না" (দ্বিতীয় বিবরণ, ৩: ২৫-২৭)। বাইবেলের বর্ণনামতে মূসা (আ)-এর বয়স ছিল তখন এক শত বিশ বৎসর (দ্বিতীয় বিবরণ, ৩১: ২)। মূসা (আ)-কে এই কথাও তখন জানাইয়া দেওয়া হইয়াছিল যে, "যে দেশ আমি ইসরায়েল-সন্তানগণকে দিয়াছি তাহা দেখ, দেখিলে পর তোমার ভ্রাতা হারানের ন্যায় তুমিও আপনা পিতৃগণের নিকট সংগৃহীত হইবে" (গণনাপুস্তক, ২৭ঃ ১২-১৩)। বাইবেলের বর্ণনামতে মূসা (আ)-কে বানু ইসরাঈল সম্পর্কে এই নির্দেশও সুস্পষ্টরূপে জানাইয়া দেওয়া হইয়াছিল যে, তাহারা উক্ত দেশে প্রবেশ করিয়া ব্যভিচার ও অপকর্ম করিবে এবং আল্লাহ্ ক্রোধে নিপতিত হইবে।
শেষ দিনগুলির এক ভাষণে তিনি বানু ইসরাঈলকে বিভিন্ন হিদায়াত প্রদান করত ভবিষ্যতে আগমনকারী একজন মহান নবীর কথা অবগত করান, যাহার কথা 'বাইবেলে এইভাবে বর্ণিত হইয়াছেঃ “তোমার ঈশ্বর সদাপ্রভু তোমার মধ্য হইতে তোমার ভ্রাতৃগণের মধ্য হইতে, তোমার জন্য আমার সদৃশ এক ভাববাদী উৎপন্ন করিবেন, তাঁহারই কথায় তোমরা কর্ণপাত করিবে। কেননা হোরেবে সমাজের দিবসে তুমি আপন ঈশ্বর সদাপ্রভুর কাছে এই প্রার্থনাইত করিয়াছিলে। যথা আমি যেন আপন ঈশ্বর সদাপ্রভুর রব পুনর্বার শুনিতে ও এই মহাগ্নি আর দেখিতে না পাই। পাছে আমি মারা পড়ি। তখন সদাপ্রভু আমাকে কহিলেন, উহারা ভালই বলিয়াছে। আমি উহাদের জন্য উহাদের ভ্রাতৃগণের মধ্য হইতে তোমার সদৃশ এক ভাববাদী উৎপন্ন করিব ও তাঁহার মুখে আমার বাক্য দিব; আর আমি তাহাকে যাহা যাহা আজ্ঞা করিব তাহা তিনি উহাদিগকে বলিবেন। আর আমার নামে তিমি আমার যে সকল বাক্য বলিবেন, তাহাতে যে কেহ কর্ণপাত না করিবে তাহার কাছে আমি পরিশোধ লইব" (দ্বিতীয় বিবরণ, ১৮: ১৫-১৯)। উল্লেখ্য যে, এখানে 'ভ্রাতা' দ্বারা রাসুলুল্লাহ (স)-কে বুঝানো হইয়াছে। তাঁহারই সুসংবাদ দেওয়া হইয়াছে এবং তাঁহারই আনুগত্য করার জন্য নির্দেশ দেয়া হইয়াছে (আম্বিয়া-ই কুরআন, ২খ, ২৭০-২৭১)।
অতঃপর মৃত্যুর কিছু পূর্বে মূসা (আ) বানু ইসরাঈলকে লক্ষ্য করিয়া তাঁহার শেষ বক্তৃতা দিলেন, যাহাতে বানু ইসরাঈলের বিভিন্ন গোত্র সম্পর্কে হিদায়াত ও ভবিষ্যদ্বাণী ছিল। উক্ত বক্তব্যের শুরুতে তিনি বলেন:
সদাপ্রভু সীনয় হইতে আসিলেন, সেয়ীর হইতে তাহাদের প্রতি উদিত হইলেন; ফারান পর্বত হইতে আপন তেজ প্রকাশ করিলেন, অযুত অযুত পবিত্রের নিকট হইতে আসিলেন; তাহাদের জন্য তাঁহার দক্ষিণ হস্তে অগ্নিময় ব্যবস্থা ছিল (দ্বিতীয় বিবরণ, ৩৩ঃ ২)।
মূর ইংরেজী বাইবেলে উক্ত হইয়াছে: He shined for the from mount Paran and he Came with ten thousands of saints (The Holy Bible, P. 277, 33: 2). যাহার অর্থ হইল তিনি ফারান পর্বত হইতে আপন তেজ প্রকাশ করিলেন এবং দশ হাজার পূন্যাত্মা সহকারে আগমন করিলেন। বস্তুত পক্ষে রাসূলুল্লাহ (স) মক্কা বিজয়ের সময় যে দশ হাজার পূন্যাত্মা সাহাবী সহকারে মক্কায় প্রবেশ করিয়াছিলেন, তাহারই প্রতি ইঙ্গিত করা হইয়াছে। কিন্তু উদ্দেশ্য প্রণোদিত ভাবে উহার অনুবাদ করা হইয়াছে "অযুত অযুত পবিত্রের নিকট হইতে আসিলেন"।
উল্লেখ্য যে, সীনয় অর্থ তূর পাহাড়, যেখানে মূসা (আ) নবুওয়াত প্রাপ্ত হন, যেখানে আল্লাহর তাজাল্লী দর্শনে বেহুঁশ হইয়া পড়েন এবং যেখানে তাঁহাকে তাওরাত প্রদান করা হয়। সেয়ীর সেই পৰ্ব্বতকে বলা হয় যাহার পার্শ্বে 'বায়ত লাহম' অবস্থিত, যেখানে ঈসা (আ)-এর জন্ম হয়। ফারান মক্কার পাহাড়ের নাম, যেখানে রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্ম। অগ্নিময় ব্যবস্থা অর্থ জিহাদের হুকুম। মূসা (আ)-এক পর রাসূলুল্লাহ (স) ব্যতীত আর কোনও নবীকে নূতনভাবে জিহাদের নির্দেশ দেওয়া হয় নাই (আম্বিয়া-ই কুরআন, ২খ, ২৭৩-২৭৪)।
📄 ইনতিকাল
হযরত মূসা (আ) বনূ ইসরাঈলের বিভিন্ন নির্যাতন ও অনৈতিক ক্রিয়াকলাপ অত্যন্ত ধৈর্যের সহিত মোকাবিলা করিয়া তাহাদের দাওয়াত ও হিদায়াতের কাজে নিরন্তর চেষ্টা করিয়া যান। অতঃপর তাঁহার মৃত্যুর সময় আসিয়া যায়। বাইবেলের বর্ণনামতে তাঁহার বয়স যখন এক শত বিশ বৎসর তখন আল্লাহ্ তাঁহাকে মোয়াবের ময়দানে নবো পর্ব্বতের যিরী হো (আরীহা)-এর সম্মুখস্থ পিস্সা শৃঙ্গে উঠিতে নির্দেশ দিলেন। সেখান হইতে সিরিয়ার যে সকল দেশ আল্লাহ তাহাদিগকে দেওয়ার অঙ্গীকার করিয়াছিলেন তাহা দেখাইলেন এবং সেখানেই তিনি ইনতিকাল করিলেন (দ্র. বাইবেল, দ্বিতীয় বিবরণ, ৩৪: ১-৭)। হারুন (আ)-এর তিন বৎসর পর তিনি ইনতিকাল করেন (ইব্ন কুতায়বা, আল-মা'আরিফ, পৃ. ২৬)।
সুদ্দীর সূত্রে অন্য একটি বর্ণনায় আছে যে, একবার মূসা (আ) ও তাঁহার খাদেম ইউশা ইব্ন নূন কোথায়ও যাইতেছিলেন। হঠাৎ কালো এক ধরনের বায়ু প্রবাহিত হইল। ইউশা ইহা দেখিয়া মনে করিলেন যে, কিয়ামত বুঝি শুরু হইয়া গিয়াছে। তিনি মূসা (আ)-কে জাপটাইয়া ধরিলেন এবং (মনে মনে) বলিলেন, কিয়ামত হইয়া যাইবে আর আমি আল্লাহ্ নবী মূসা (আ)-কে জাপ্টাইয়া থাকিব। মূসা (আ) জামার নিচ দিয়া বাহির হইয়া গেলেন আর জামাটি ইউশা-এর হাতে পড়িয়া রহিল। ইউশা যখন জামাটি লইয়া তাঁহার সম্প্রদায়ের নিকট আসিলেন তখন বনূ ইসরাঈল তাহাকে জেরা শুরু করিয়া দিল এবং বলিল, তুমি আল্লাহর নবীকে হত্যা করিয়াছ। ইউশা বলিলেন, না, আল্লাহ্ কসম! আমি তাঁহাকে হত্যা করি নাই, বরং তিনি আমার নিকট হইতে আস্তে বাহির হইয়া গিয়াছেন। ইহা তাহারা বিশ্বাস করিল না বরং তাঁহাকে হত্যা করিবার সংকল্প করিল। ইউশা বলিলেন, তোমরা যদি আমার কথা বিশ্বাস না কর তবে আমাকে তিন দিন সময় দাও। অতঃপর তিনি আল্লাহ্র নিকট দু'আ করিলেন। অতঃপর তাঁহার প্রহরায় যাহারা নিযুক্ত ছিল তাহাদের সকলকেই স্বপ্ন দেখানো হইল যে, ইউশা মূসাকে হত্যা করে নাই, বরং আমরা তাহাকে আমাদের নিকট উঠাইয়া লইয়াছি। অতঃপর তাহারা তাঁহাকে ছাড়িয়া দিল। আর মূসা (আ)-এর সহিত দুর্দান্ত সম্প্রদায়ের গ্রামে প্রবেশ করিতে যাহারাই অস্বীকার করিয়াছিল সকলেই ইনতিকাল করিল। পরবর্তী কালে উক্ত দেশ বিজয়ে তাহারা অংশগ্রহণ করিতে পারে নাই। হাফিজ ইব্ন কাছীর এই রিওয়ায়াত বর্ণনা করিয়া মন্তব্য করিয়াছেন যে, ইহার কিছু কিছু অংশ মুনকার ও গারীব পর্যায়ের (দ্র. প্রাগুক্ত, ১খ, ৩১৮)।
ইব্ন কাছীর (র) ওয়াহ্হ্ ইব্ন মুনাব্বিহ' (র) হইতে মূসা (আ)-এর ইনতিকাল সম্পর্কে একটি সূত্রবিহীন ঘটনার উল্লেখ করিয়াছেন, মূসা (আ) একবার একদল ফেরেশতার নিকট দিয়া যাইতেছিলেন, যাহারা একটি কবর খুঁড়িতেছিলেন। তিনি উহা হইতে সুন্দর, উজ্জ্বল ও দ্যুতিময় কবর আর দেখেন নাই। তাই তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, হে আল্লাহ্ ফেরেশতাগণ! তোমরা কাহার জন্য এই কবর খুঁড়িতেছ? তাহারা বলিলেন, আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে একজন সম্মানিত বান্দার জন্য। আপনি যদি সেই বান্দা হইতে চাহেন তবে এই কবরে প্রবেশ করুন, উহাতে লম্বা ইইয়া শুইয়া পড়ুন। আর আপনার প্রতিপালকের দিকে মনোনিবেশ করুন এবং সহজভাবে শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ করুন। মূসা (আ) তাহাই করিলেন, অতঃপর তিনি ইনতিকাল করিলেন। ফেরেশতাগণ তাঁহার জানাযা পড়িলেন এবং তাঁহাকে দাফন করিলেন (আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১খ, ৩১৮-৩১৯)।
সাহীহ বুখারী ও মুসলিমে হযরত আবু হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মূসা (আ)-এর মৃত্যু নিকটবর্তী হইলে মৃত্যুর ফেরেশতা তাঁহার নিকট উপস্থিত হইয়া বলিলেন, اجب ربه "আপনার প্রতিপালকের পক্ষ,হইতে মৃত্যুর পয়গামে সাড়া দিন"। মূসা (আ) তাহাকে একটি ঘুষি মারিলেন। ইহার ফলে তাহার একটি চক্ষু নষ্ট হইয়া গেল। তিনি আল্লাহ্র নিকট ফিরিয়া গিয়া বলিলেন, আপনি আমাকে এমন এক বান্দার নিকট পাঠাইয়াছেন যিনি মরিতে চাহেন না। আল্লাহর পক্ষ হইতে তাহার চক্ষু ফিরাইয়া দেওয়া হইল। আল্লাহ তাহাকে নির্দেশ দিলেন যে, পুনরায় তাহার নিকট গমন কর এবং তাহাকে বল, সে যেন তাহার হাত একটি বলদের পিঠের উপর রাখে। ইহাতে যতগুলি পশম তাহার হাতের নীচে পড়িবে, প্রতিটি পশমের বদলে তাহাকে এক বৎসরের হায়াত দেওয়া হইবে। মূসা (আ) বলিলেন, হে আমার প্রতিপালক! তাহার পর কি হইবে? আল্লাহ বলিলেন, তাহার পর মৃত্যু। মূসা (আ) বলিলেন, তাহা হইলে এখনই মৃত্যু হউক। তিনি আল্লাহ্র নিকট দু'আ করিলেন, তাহাকে যেন 'আরদে মুকাদ্দাস' তথা পবিত্র ভূমি হইতে একটি পাথর নিক্ষেপের দূরত্বের সমান স্থানে কবর দেওয়া হয়। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, আমি যদি সেইখানে থাকিতাম তবে অবশ্যই আমি তোমাদিগকে রাস্তার পার্শ্বে লাল টিলার নিচে তাঁহার কবরটি দেখাইয়া দিতাম (আল-বুখারী, আস-সাহীহ, কিতাবুল আম্বিয়া, বাব ওয়াফাতু মূসা (আ) ওয়া যিকরুহু বা'দু, ১খ., পৃ. ৪৮৪, হাদীস নং ৩৪০৭; মুসলিম, আস-সাহীহ, কিতাবুল ফাদাইল, হাদীছ নং ৫৯৩৫, ৫৯৩৬)। তবে মুসলিমের বর্ণনায় عينيه ففقاً এবং فرد الله عينه বাক্য দুইটি বেশী আছে। যাহার অর্থ হইল, চপেটাঘাতের কারণে ফেরেশতার একটা চোখ নষ্ট হইয়া গিয়াছিল এবং আল্লাহ ফেরেশতার সে চোখ ভাল করিয়া দিলেন।
📄 মূসা (আ)-এর কবর
মূসা (আ)-এর কবর কোথায় বাইবেলে তাহা কেহ জানে না বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে। বাইবেলে উল্লিখিত হইয়াছে, "তখন সদাপ্রভুর দাস মোশি সদাপ্রভুর বাক্যানুসারে সেই স্থানে মোয়াব দেশে মরিলেন। আর তিনি মোয়াব দেশে বৈৎপিয়োরের Beth peor সম্মুখস্থ উপত্যকাতে তাঁহাকে কবর দিলেন, কিন্তু তাঁহার কবরস্থান অদ্যাপি কেহ জানে না" (বাইবেল, দ্বিতীয় বিবরণ, ৩৪: ৫-৬)। তবে রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার কবরের স্থান নির্দেশ করিয়াছেন। বুখারী ও মুসলিমের হাদীছে আবু হুরায়রা (রা) বর্ণিত রিওয়াতে বলা হইয়াছে যে, রাসূলুল্লাহ (স) ইরশাদ করেন, 'আমি যদি সেইখানে থাকিতাম তবে অবশ্যই তোমাদিগকে রাস্তার পার্শ্বে লাল টীলার নিচে তাঁহার কবরটি দেখাইয়া দিতাম' (আল-বুখারী, কিতাবুল আম্বিয়া, হাদীস নং ৩৪০৭; মুসলিম, কিতাবুল ফাদাইল, হাদীছ নং ৫৯৩৫)।
আনাস ইবন মালিক (রা) হইতে বর্ণিত একটি হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, মিরাজের রাত্রে আমাকে যখন লইয়া যাওয়া হয় তখন আমি মূসা (আ)-এর পার্শ্ব দিয়া গেলাম। তিনি লাল টিলার কাছে অবস্থিত তাঁহার কবরে দাঁড়াইয়া সালাত আদায় করিতেছিলেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, '১খ, ৩১৮)। ভূগোলবিদ মাদ্দিসী বলেন, আরীহা (যিরীহো)-এর নিকট একটি কবর আছে, যাহাকে মূসা (আ)-এর কবর বলিয়া উল্লেখ করা হইয়া থাকে। তাহার এই বর্ণনা হাদীছ ও বাইবেলের বর্ণনার সহিত সামঞ্জস্যশীল (আম্বিয়া-ই কুরআন, ২খ, ২৭৬)।