📄 মূসা (আ)-এর হজ্জ
কয়েকটি বর্ণনা হইতে জানা যায় যে, মূসা (আ) বায়তুল্লায় হজ্জ পালন করিয়াছিলেন এবং তালবিয়াও পাঠ করিয়াছিলেন। তবে কিভাবে তিনি মক্কায় গমন করিয়াছিলেন তাহার বিবরণ হাদীছে পাওয়া যায় না। তবে সম্ভবত ইবরাহীম (আ) যেরূপ ফিলিস্তীন হইতে আসিয়া মক্কায় স্বীয় পরিবার-পরিজনকে দেখিয়া যাইতেন এবং কা'বা শরীফ নির্মাণ করিয়া গিয়াছিলেন তদ্রূপ আল্লাহ্র পক্ষ হইতে কোনও বিশেষ ব্যবস্থাপনায় মূসা হজ্জ পালন করিয়াছিলেন।
ইমাম আহমাদ (র) ইব্ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) একবার আযরাক উপত্যকা দিয়া যাইতেছিলেন। তিনি সাহাবীদিগকে জিজ্ঞাসা করিলেন, ইহা কোন উপত্যকা? তাহারা বলিলেন, 'আযরাক' উপত্যকা। তিনি বলিলেন, আমি যেন দেখিতেছি মূসা (আ) গিরিপথ হইতে কাতরকণ্ঠে আল্লাহ্ উদ্দেশে তালবিয়া পাঠ করিতে করিতে নামিতেছেন। হারশা টিলায় আসিয়া তিনি বলিলেন, ইহা কোন্ টিলা? তাহারা বলিলেন, ইহা হারশা টিলা। তিনি বলিলেন, আমি যেন ইউনুস ইব্ন মাত্তা (আ)-কে একটি লাল উটের উপর দেখিতে পাইতেছি। তাঁহার পরনে একটি পশমের জুব্বা রহিয়াছে। তাঁহার উষ্ট্রীর নাকের রশি খেজুরের ছাল দিয়া তৈরী। তিনিও তালবিয়া পাঠ করিতেছিলেন। ইমাম মুসলিম এই হাদীছটি উল্লেখ করিয়াছেন।
ইমাম তাবারানী ইব্ন আব্বাস (রা) হইতে একটি মারফু হাদীছ বর্ণনা করিয়াছেন যে, মূসা (আ) একটি লাল ষাঁড়ের উপর আরোহণ করিয়া হজ্জ করিয়াছেন। ইব্ন কাছীর এই বর্ণনা অত্যন্ত গারীব পর্যায়ের বলিয়া মন্তব্য করিয়াছেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ৩১৬)।
ইমাম আহমাদ মুজাহিদ সূত্রে ইব্ন আব্বাস (রা) হইতে একটি হাদীছ বর্ণনা করিয়াছেন। উহাতে উল্লেখ আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন..... আর মূসা (আ), তিনি তো গৌরবর্ণের কোঁকড়ানো চুলের অধিকারী। তিনি একটি লাল উটের উপর আরোহী ছিলেন, যাহার নাকের রশি ছিল খেজুর গাছের ছাল দিয়া তৈরী। আমি যেন তাঁহাকে দেখিতে পাইতেছি তিনি তালবিয়া পাঠ করিতে করিতে উপত্যকা হইতে নামিতেছেন (প্রাগুক্ত)।
📄 মূসা (আ)-এর মর্যাদা
হযরত মূসা (আ) খুবই উচু পর্যায়ের একজন নবী ও রাসূল ছিলেন। হিফজুর রাহমান সিউহারবী শেষ নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স) ও হযরত ইবরাহীম (আ)-এর পরই তাঁহার স্থান বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। কুরআন কারীমের বহু আয়াতে এবং সহীহ হাদীছে বিভিন্নভাবে তাঁহার মর্যাদার কথা ফুটিয়া উঠিয়াছে। দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ করিতে গিয়া, ফিরআওন, ফিরআওন সম্প্রদায় ও বনী ইসরাঈলের পক্ষ হইতে তিনি যেরূপ কষ্ট সহ্য করিয়াছেন, বিভিন্ন দুঃখ-ক্লেশ ও বিপদাপদের মুকাবিলা করিয়াছেন উপরিউক্ত নবীদ্বয় ছাড়া তাহার দৃষ্টান্ত বিরল। তাই উম্মাতে মুহাম্মাদীর শিক্ষা গ্রহণের জন্য কুরআন কারীমে বারবার তাঁহার ও তাঁহার সম্প্রদায়ের কার্যকলাপ ও ঘটনাবলীর উল্লেখ করা হইয়াছে। মূসা (আ)-এর মর্যাদা ও মাহাত্ম্য সম্পর্কে কুরআন কারীমে ইরশাদ হইয়াছে:
"এবং মূসার সহিত আল্লাহ সাক্ষাত বাক্যালাপ করিয়াছিলেন" (৪: ১৬৪)। وَكَلَّمَ اللَّهُ مُوسَى تَكْلِيمًا (٤: ١٦٤)
قَالَ يَا مُوسَى إِنِّي اصْطَفَيْتُكَ عَلَى النَّاسِ برسالاتي وبكلامي (٧: ١٤٤) "তিনি (আল্লাহ) বলিলেন, হে মূসা! আমি তোমাকে আমার রিসালাত ও বাক্যালাপ দ্বারা মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়াছি” (৭ঃ ১৪৪)।
وَاذْكُرْ فِي الْكِتَابِ مُوسَى إِنَّهُ كَانَ مُخْلصًا وَكَانَ رَسُولاً نَبِيًّا (١٩: ٥١) "স্মরণ কর এই কিতাবে মূসার কথা, সে ছিল বিশেষ মনোনীত এবং সে ছিল রাসূল নবী" (১৯:৫১)।
"এবং সে (মূসা) আল্লাহ্র নিকট মর্যাদাবান" (৩৪ : ৬৯)। وَكَانَ عِنْدَ اللهِ وَجِيْهَا (٣٤ : ٦٩)
وَلَقَدْ مَنَنَا عَلَى مُوسَى وَهُرُونَ وَنَجَّيْنَاهُمَا وَقَوْمَهُمَا مِنَ الْكَرْبِ الْعَظِيمِ وَنَصَرْنَاهُمْ فَكَانُوا هُمُ الْطالبين وَأَتَيْنَاهُمَا الكِتَابَ الْمُسْتَبِينَ وَهَدَيْنَاهُمَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ وَتَرَكْنَا عَلَيْهِمَا فِي الْآخِرِينَ سَلامُ عَلَى مُوسَى وَهُرُونَ إِنَّا كَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ إِنَّهُمَا مِنْ عِبَادِنَا الْمُؤْمِنِينَ (٣٧: ١١٤-١٢٢)
"আমি অনুগ্রহ করিয়াছিলাম মূসা ও হারূনের প্রতি এবং তাহাদিগকে ও তাহাদের সম্প্রদায়কে আমি উদ্ধার করিয়াছিলাম মহাসংকট হইতে। আমি সাহায্য করিয়াছিলাম তাহাদিগকে, ফলে তাহারাই হইয়াছিল বিজয়ী। আমি উভয়কে দিয়াছিলাম বিশদ কিতাব এবং তাহাদিগকে আমি পরিচালিত করিয়াছিলাম সরল পথে। আমি তাহাদের উভয়কে পরবর্তীদের স্মরণে রাখিয়াছি। মূসা ও হারূনের প্রতি শান্তি বর্ষিত হউক। এইভাবে আমি সৎকর্মপরায়ণদিগকে পুরস্কৃত করিয়া থাকি। তাহারা উভয়ই ছিল আমার মুমিন বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত" (৩৭ : ১১৪-১২২)।
وَاصْطَنَعْتُكَ لِنَفْسِي "আমি তোমাকে আমার নিজের জন্য প্রস্তুত করিয়া লইয়াছি" (২০:৪১)।
وَلَقَدْ فَتَنَّا قَبْلَهُمْ قَوْمَ فِرْعَوْنَ وَجَاءَهُمْ رَسُولٌ كَرِيمٌ (٤٤:١٧) "ইহাদের পূর্বে আমি তো ফিরআওন সম্প্রদায়কে পরীক্ষা করিয়াছিলাম এবং উহাদের নিকটও আসিয়াছিল এক সম্মানিত রাসূল" (৪৪:১৭)।
তাঁহার প্রতি অবতীর্ণ কিতাবের উপযোগিতা ও প্রশংসা করিয়া সূরা আন'আমে বলা হইয়াছে: ثُمَّ أَتَيْنَا مُوسَى الْكِتَابَ تَمَامًا عَلَى الَّذِي أَحْسَنَ وَتَفْصِيلًا لِكُلِّ شَيْءٍ وَهُدًى وَرَحْمَةً لَعَلَّهُمْ بِلِقَاءِ رَبِّهِمْ يُؤْمِنُونَ: (٦:١٥٤)
"অতঃপর আমি মূসাকে দিয়াছিলাম কিতাব যাহা সৎকর্মপরায়ণের জন্য সম্পূর্ণ, যাহা সমস্ত কিছুর বিশদ বিবরণ, পথনির্দেশ ও দয়াস্বরূপ, যাহাতে তাহারা তাহাদের প্রতিপালকের সাক্ষাত সম্বন্ধে বিশ্বাস করে" (৬:১৫৪)।
রাসূলুল্লাহ (স) হইতে বর্ণিত সাহীহ হাদীসসমূহেও হযরত মূসা (আ)-এর সম্মান ও মর্যাদার উল্লেখ রহিয়াছে। বুখারী ও মুসলিম-এ বর্ণিত হইয়াছে যে, রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, তোমার মূসা (আ)-এর উপর আমাকে প্রাধান্য দিও না। কারণ কিয়ামতের দিন লোকজন যখন বেহুঁশ হইয়া পড়িবে তখন সর্বপ্রথম আমারই হুঁশ ফিরিবে। হুঁশ ফিরিবার পর আমি দেখিতে পাইব যে, মূসা (আ) আরশের স্তম্ভ ধরিয়া আছেন। আমি জানি না, তিনি আমার পূর্বেই হুঁশ ফিরিয়া পাইয়াছেন, নাকি তুর পাহাড়ের সেই বেহুঁশ হওয়ার ফলে আজ তাহাকে বেহুঁশী হইতে মুক্ত রাখা হইয়াছে (আল-বুখারী, আস-সাহীহ, কিতাবুল-আম্বিয়া, ২খ, পৃ. ৪৮৯, হাদীছ নং ৩১৫১)।
📄 মূসা (আ)-এর সহিত রাসূলুল্লাহ (স)-এর সাক্ষাত
ইমাম বুখারী (র) তাঁহার সাহীহ গ্রন্থে মালিক ইবন সা'সাআ (রা) সূত্রে মি'রাজ সম্পর্কিত দীর্ঘ হাদীছ বর্ণনা করিয়াছেন। উহাতে উল্লিখিত হইয়াছে যে, সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ (স) মি'রাজ রজনীতে ষষ্ঠ আসমানে মূসা (আ)-এর সহিত সাক্ষাত করেন। জিবরাঈল (আ) তাঁহাকে পরিচয় করাইয়া দেন যে, ইনি মূসা (আ)! তাঁহাকে সালাম করুন। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, আমি তাঁহাকে সালাম করিলাম। তিনি উহার উত্তর দিয়া বলিলেন, স্বাগতম নেককার ভ্রাতা ও নেক্কার নবী। অতঃপর আমি যখন উক্ত স্থান অতিক্রম করিলাম তখন তিনি কাঁদিয়া ফেলিলেন। তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করা হইল, আপনার ক্রন্দনের কারণ কি? তিনি বলিলেন, আমি এইজন্য কাঁদিয়াছি যে, এক অল্প-বয়স্ক যুবককে আমার পর নবুওয়াত প্রদান করা হইয়াছে। আমার উম্মাতের তুলনায় তাঁহার উম্মাতের অধিক সংখ্যক লোক জান্নাতে প্রবেশ করিবে।
উক্ত হাদীছেই পরের অংশে বর্ণনা করা হইয়াছে যে, আল্লাহ তাঁহার ও তাঁহার উম্মাতের জন্য রাত-দিন পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত ফরয করেন। উহা লইয়া তিনি প্রত্যাবর্তনের সময় আবার মূসা (আ)-এর সহিত সাক্ষাত হইলে তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, আপনাকে কি নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আমাকে প্রতিদিন পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে। মূসা (আ) বলিলেন, আপনার উম্মাত প্রতিদিন পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত আদায়ে সক্ষম হইবে না। আল্লাহ্র কসম! আমি আপনার পূর্বে মানুষকে পর্যবেক্ষণ করিয়াছি এবং বানু ইসরাঈলের হিদায়াতের জন্য কঠোর পরিশ্রম করিয়াছি। তাই আপনি আপনার প্রতিপালকের নিকট ফিরিয়া যান এবং আপনার উম্মাতের জন্য আরো কমাইয়া দেওয়ার আবেদন করুন। আমি ফিরিয়া গেলাম। অতঃপর আল্লাহ দশ ওয়াক্ত হ্রাস করিয়া দিলেন। অতঃপর আমি মূসা (আ)-এর নিকট ফিরিয়া আসিলে তিনি পূর্বের ন্যায় বলিলেন। আমি আবার আল্লাহর নিকট ফিরিয়া গেলাম। তিনি আরও দশ ওয়াক্ত হ্রাস করিয়া দিলেন। আমি মূসা (আ)-এর নিকট ফিরিয়া আসিলে তিনি আবারও পূর্বের ন্যায় বলিলেন। অতঃপর আমি ফিরিয়া গেলাম। তখন আমাকে প্রতি দিন দশ ওয়াক্ত-এর নির্দেশ দেওয়া হইল। আমি ফিরিয়া আসিলে তিনি এইবারও পূর্বের ন্যায় বলিলেন। অতঃপর আমি ফিরিয়া গেলাম। তখন আমাকে প্রতি দিন পাঁচ ওয়াক্তের নির্দেশ দেওয়া হইল। আমি মূসা (আ)-এর নিকট ফিরিয়া আসিলে তিনি বলিলেন, আপনাকে কি আদেশ দেওয়া হইয়াছে। আমি বলিলাম, আমাকে দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে। তিনি বলিলেন, আপনার উম্মাত দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করিতেও সমর্থ হইবে না। আপনার পূর্বে লোকদের সম্পর্কে আমার অভিজ্ঞতা রহিয়াছে। বনু ইসরাঈলের হিদায়াতের জন্য কঠোর পরিশ্রম করিয়াছি। আপনি আপনার প্রতিপালকের নিকট ফিরিয়া যান এবং আপনার উম্মাতের জন্য আরো হ্রাস করিবার আবেদন করুন। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, আমি আমার প্রতিপালকের নিকট অনেকবার আবেদন করিয়াছি। এখন আমি লজ্জাবোধ করিতেছি আর আমি ইহাতেই সন্তুষ্ট হইয়াছি এবং মানিয়া লইয়াছি (আল-বুখারী, আস-সাহীহ, কিতাবুল মানাকিব, বাবুল মি'রাজ, ১খ, পৃ. ৫৪৯-৫০, হাদীছ নং ৩৮৮৭)।
📄 মূসা (আ)-এর জীবনের শেষ দিনগুলি
জীবনের শেষভাগে আসিয়া মূসা (আ) কি করিয়াছিলেন বা তাঁহার উম্মাতকে কি বলিয়াছিলেন সেই সম্পর্কে বাইবেলে বর্ণিত হইয়াছে যে, মূসা (আ) জীবনের শেষ প্রান্তে আসিয়া তাঁহার প্রতি অঙ্গীকারকৃত শামদেশ দেখিবার জন্য আল্লাহ্র নিকট আকাঙ্খা ব্যক্ত করিয়াছিলেন। কিন্তু আল্লাহ তাঁহার এই মনস্কামনা পূরণ না করিয়া বরং পর্বত শৃঙ্গে উঠিয়া চতুর্দিকে দৃষ্টিপাত করিবার নির্দেশ দেন। বাইবেলে বলা হইয়াছে:
"বিনয় করি আমাকে ওপারে গিয়া যদ্দন পারস্থ সেই উত্তম দেশ, সেই রমণীয় গিরিপ্রদেশ ও লিবানোন দেখিতে দাও। কিন্তু সদাপ্রভু তোমাদের জন্য আমার প্রতিকূলে ক্রুদ্ধ হওয়াতে আমার কথা শুনিলেন না, সদাপ্রভু আমাকে কহিলেন, তোমার পক্ষে এই যথেষ্ট, এ বিষয়ে কথা আমাকে আর বলিও না। পিস্সার শৃঙ্গে উঠ এবং পশ্চিম, উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্বদিকে দৃষ্টিপাত কর, আপন চক্ষে নিরীক্ষণ কর; কেননা তুমি এই যদ্দন পার হইতে পাইবে না" (দ্বিতীয় বিবরণ, ৩: ২৫-২৭)। বাইবেলের বর্ণনামতে মূসা (আ)-এর বয়স ছিল তখন এক শত বিশ বৎসর (দ্বিতীয় বিবরণ, ৩১: ২)। মূসা (আ)-কে এই কথাও তখন জানাইয়া দেওয়া হইয়াছিল যে, "যে দেশ আমি ইসরায়েল-সন্তানগণকে দিয়াছি তাহা দেখ, দেখিলে পর তোমার ভ্রাতা হারানের ন্যায় তুমিও আপনা পিতৃগণের নিকট সংগৃহীত হইবে" (গণনাপুস্তক, ২৭ঃ ১২-১৩)। বাইবেলের বর্ণনামতে মূসা (আ)-কে বানু ইসরাঈল সম্পর্কে এই নির্দেশও সুস্পষ্টরূপে জানাইয়া দেওয়া হইয়াছিল যে, তাহারা উক্ত দেশে প্রবেশ করিয়া ব্যভিচার ও অপকর্ম করিবে এবং আল্লাহ্ ক্রোধে নিপতিত হইবে।
শেষ দিনগুলির এক ভাষণে তিনি বানু ইসরাঈলকে বিভিন্ন হিদায়াত প্রদান করত ভবিষ্যতে আগমনকারী একজন মহান নবীর কথা অবগত করান, যাহার কথা 'বাইবেলে এইভাবে বর্ণিত হইয়াছেঃ “তোমার ঈশ্বর সদাপ্রভু তোমার মধ্য হইতে তোমার ভ্রাতৃগণের মধ্য হইতে, তোমার জন্য আমার সদৃশ এক ভাববাদী উৎপন্ন করিবেন, তাঁহারই কথায় তোমরা কর্ণপাত করিবে। কেননা হোরেবে সমাজের দিবসে তুমি আপন ঈশ্বর সদাপ্রভুর কাছে এই প্রার্থনাইত করিয়াছিলে। যথা আমি যেন আপন ঈশ্বর সদাপ্রভুর রব পুনর্বার শুনিতে ও এই মহাগ্নি আর দেখিতে না পাই। পাছে আমি মারা পড়ি। তখন সদাপ্রভু আমাকে কহিলেন, উহারা ভালই বলিয়াছে। আমি উহাদের জন্য উহাদের ভ্রাতৃগণের মধ্য হইতে তোমার সদৃশ এক ভাববাদী উৎপন্ন করিব ও তাঁহার মুখে আমার বাক্য দিব; আর আমি তাহাকে যাহা যাহা আজ্ঞা করিব তাহা তিনি উহাদিগকে বলিবেন। আর আমার নামে তিমি আমার যে সকল বাক্য বলিবেন, তাহাতে যে কেহ কর্ণপাত না করিবে তাহার কাছে আমি পরিশোধ লইব" (দ্বিতীয় বিবরণ, ১৮: ১৫-১৯)। উল্লেখ্য যে, এখানে 'ভ্রাতা' দ্বারা রাসুলুল্লাহ (স)-কে বুঝানো হইয়াছে। তাঁহারই সুসংবাদ দেওয়া হইয়াছে এবং তাঁহারই আনুগত্য করার জন্য নির্দেশ দেয়া হইয়াছে (আম্বিয়া-ই কুরআন, ২খ, ২৭০-২৭১)।
অতঃপর মৃত্যুর কিছু পূর্বে মূসা (আ) বানু ইসরাঈলকে লক্ষ্য করিয়া তাঁহার শেষ বক্তৃতা দিলেন, যাহাতে বানু ইসরাঈলের বিভিন্ন গোত্র সম্পর্কে হিদায়াত ও ভবিষ্যদ্বাণী ছিল। উক্ত বক্তব্যের শুরুতে তিনি বলেন:
সদাপ্রভু সীনয় হইতে আসিলেন, সেয়ীর হইতে তাহাদের প্রতি উদিত হইলেন; ফারান পর্বত হইতে আপন তেজ প্রকাশ করিলেন, অযুত অযুত পবিত্রের নিকট হইতে আসিলেন; তাহাদের জন্য তাঁহার দক্ষিণ হস্তে অগ্নিময় ব্যবস্থা ছিল (দ্বিতীয় বিবরণ, ৩৩ঃ ২)।
মূর ইংরেজী বাইবেলে উক্ত হইয়াছে: He shined for the from mount Paran and he Came with ten thousands of saints (The Holy Bible, P. 277, 33: 2). যাহার অর্থ হইল তিনি ফারান পর্বত হইতে আপন তেজ প্রকাশ করিলেন এবং দশ হাজার পূন্যাত্মা সহকারে আগমন করিলেন। বস্তুত পক্ষে রাসূলুল্লাহ (স) মক্কা বিজয়ের সময় যে দশ হাজার পূন্যাত্মা সাহাবী সহকারে মক্কায় প্রবেশ করিয়াছিলেন, তাহারই প্রতি ইঙ্গিত করা হইয়াছে। কিন্তু উদ্দেশ্য প্রণোদিত ভাবে উহার অনুবাদ করা হইয়াছে "অযুত অযুত পবিত্রের নিকট হইতে আসিলেন"।
উল্লেখ্য যে, সীনয় অর্থ তূর পাহাড়, যেখানে মূসা (আ) নবুওয়াত প্রাপ্ত হন, যেখানে আল্লাহর তাজাল্লী দর্শনে বেহুঁশ হইয়া পড়েন এবং যেখানে তাঁহাকে তাওরাত প্রদান করা হয়। সেয়ীর সেই পৰ্ব্বতকে বলা হয় যাহার পার্শ্বে 'বায়ত লাহম' অবস্থিত, যেখানে ঈসা (আ)-এর জন্ম হয়। ফারান মক্কার পাহাড়ের নাম, যেখানে রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্ম। অগ্নিময় ব্যবস্থা অর্থ জিহাদের হুকুম। মূসা (আ)-এক পর রাসূলুল্লাহ (স) ব্যতীত আর কোনও নবীকে নূতনভাবে জিহাদের নির্দেশ দেওয়া হয় নাই (আম্বিয়া-ই কুরআন, ২খ, ২৭৩-২৭৪)।