📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 খিয়র (আ)-এর পরিচয়

📄 খিয়র (আ)-এর পরিচয়


কুরআন কারীমে তাঁহার নামের উল্লেখ করা হয় নাই, বুখারী শরীফে তাঁহাকে খিফ্র (সঠিক উচ্চারণ 'খাদির') বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে। খিফ্র শব্দটি তাঁহার নাম না উপাধি—এই ব্যাপারে মুফাসসিরগণের মধ্যে মতভেদ রহিয়াছে। অধিকাংশের মতে খিফ্র তাঁহার উপাধি। তাঁহার প্রকৃত নাম সম্পর্কেও কয়েক ধরনের বর্ণনা পাওয়া যায়; যেমন বালয়া ইব্ন মালকান, ঈলিয়া ইব্ন মাল্ল্কান, খান, মা'মার, ইলয়াস, আল-য়াসা ইত্যাদি (কাসাসুল করআন, ১খ, ৫৪৪)।
খিফ্র শব্দের অর্থ সবুজ। তাঁহাকে খিফ্র কেন বলা হইয়াছে এই সম্পর্কে একাধিক বর্ণনা পাওয়া যায়। ইমাম বুখারী আবূ হুরায়রা (রা)-এর একটি রিওয়ায়াত বর্ণনা করিয়াছেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) বলেন: তাঁহাকে খিফ্র এইজন্য বলা হইত যে, একদা তিনি ঘাস-পাতাবিহীন শুষ্ক সাদা জায়গায় বসিয়াছিলেন। সেখান হইতে তিনি উঠিয়া যাওয়ার পরই হঠাৎ ঐ স্থানটি সবুজ হইয়া গেল (আল-বুখারী, আস-সাহীহ, কিতাবুল আম্বিয়া, বাব হাদীছিল খাদির মা'আ মূসা (আ), হাদীছ নং ৩১৫৫)।
এক বর্ণনামতে তিনি যেখানেই উপবেশন করিতেন সেই স্থানই সবুজ-শ্যামল হইয়া উঠিত। অপর এক বর্ণনামতে তিনি যখন সালাত আদায় করিতেন তখন সেই স্থান এবং উহার পার্শ্ববর্তী স্থান সমূহ সবুজের সমরোহে ভরিয়া উঠিত (ইসলামী বিশ্বকোষ, ১০খ, ৯৩)।
খিযির (আ) কি নবী ছিলেন, না রাসূল, না নেক বান্দা আল্লাহ্ ওয়ালী— এই ব্যাপারে কয়েকটি মত পাওয়া যায়। কাহারও মতে তিনি রাসূল ছিলেন; আর কাহারও মতে তিনি নেক বান্দা ওয়ালী ছিলেন। তবে জামহুর-এর মতে তিনি নবী ছিলেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ২৯৯)। তাফসীরকারদের অধিকাংশই তাঁহার নবী হওয়ার পক্ষে মত ব্যক্ত করিয়াছেন। ইব্‌ন আব্বাস (রা)-এর এক বর্ণনায় তিনি নবী ছিলেন, কিন্তু নূতন কিতাবের অধিকারী ছিলেন না (ইব্‌ন হাজার আল-আসকালানী, আল-ইসাবা, ১খ, ৪৩০)।
খিযির (আ) এখনও জীবিত আছেন না ইনতিকাল করিয়াছেন, এই ব্যাপারে দুইটি মত পাওয়া যায়। একদল আলিমের মতে অদ্যাবধি তিনি জীবিত আছেন। আর বিজ্ঞ আলিমদের মতে কুরআন কারীম ও সহীহ হাদীছের কোথাও তাঁহার এখনও বাঁচিয়া থাকার প্রমাণ নাই। সুতরাং তিনিও অন্যান্য লোকের ন্যায় স্বাভাবিকভাবে ইন্তিকাল করিয়াছেন (কাসাসুল কুরআন, ১খ, ৫৪৪)। কারণ কুরআন কারীমে সুস্পষ্টরূপে বর্ণিত হইয়াছে:
وَمَا جَعَلْنَا لِبَشَرٍ مِنْ قَبْلِكَ الْخُلْدَ (٣٤ : ٢١) "আমি তোমার পূর্বেও কোন মানুষকে অনন্ত জীবন দান করি নাই" (২১ঃ ৩৪)।
এতদ্ব্যতীত বুখারী ও মুসলিম-এর হাদীছে বর্ণিত হইয়াছে যে, আবদুল্লাহ ইবন উমার (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) একবার ইশার সালাত আদায় করার পর বলিলেন, অদ্য রাত্রে যাহারাই পৃথিবীর বুকে বর্তমান আছে এক শতাব্দী পর তাহাদের একজনও এই পৃথিবীর বুকে জীবিত থাকিবে না (আল-বুখারী, আস-সাহীহ, কিতাবুল ফাদাইল; কাসাসুল কুরআন, ১খ., ৫৪৬-৫৪৭)।
হাফিজ ইব্‌ন কায়্যিম দাবি করিয়াছেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) ও সাহাবায়ে কিরাম কাহারও নিকট হইতে এই ব্যাপারে একটিও সহীহ হাদীছ বর্ণিত নাই। তাই শায়খুল ইসলাম ইব্‌ন তায়মিয়া, ইব্‌ কায়্যিম, ইন্ন কাছীর, ইব্‌ন জাওযী, ইমাম বুখারী, কাদী আবূ ইয়ালা হাম্বালী, আবূ তাহির ইবনুল গুযারী, আলী ইব্‌ন মূসা আর-রিদা, আবুল ফাদল মুরায়সী, আবু তাহির ইবনুল-ইবাদী, আবুল ফাদল ইব্‌ন নাসির, কাযী আবূ বাকর ইবনুল-আরাবী, আবূ বাকর মুহাম্মাদ ইবনুল-হাসান প্রমুখ মুহাদ্দিছ ও মুফাসসির তাহার মৃত্যুর পক্ষেই মত প্রকাশ করিয়াছেন, (কাসাসুল-কুরআন, ১খ, ৫৪৭)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সাক্ষাতের স্থান

📄 সাক্ষাতের স্থান


কুরআন কারীমে মূসা (আ) ও খিফ্র-এর সাক্ষাতের স্থান বলা হইয়াছে 'মাজমাউল বাহ্রায়ন' (দুই সমুদ্রের সঙ্গমস্থল)। কিন্তু ইহা দ্বারা কোন্ দুই সমুদ্রের সঙ্গমস্থল বুঝানো হইয়াছে সে সম্পর্কে মতভেদ রহিয়াছে। কাহারও কাহারও মতে আফ্রিকার দুইটি সমুদ্রের সঙ্গমস্থল (আম্বিয়া-ই কুরআন, ২খ, ২৬৮; ইফা. আল-কুরআনুল কারীম, টীকা নং ৯৭১)।
আধুনিক কালের অধিকাংশ আলিমের মতে ভূমধ্য সাগর ও লোহিত সাগরের সঙ্গমস্থল। সম্ভবত যখন এই ঘটনা সংঘটিত হইয়াছিল তখন এই উভয় সমুদ্রের মধ্যে সংযোগ বিদ্যমান ছিল যেখানে মূসা (আ) ও খিফ্র (আ)-এর সাক্ষাত হয়। এই মতটিকেই মাওলানা হিফজুর রাহমান সিউহারবী যুক্তিসঙ্গত বলিয়া মন্তব্য করিয়াছেন। কারণ মিসর হইতে বাহির হওয়া এবং তীহ ময়দানে অবস্থানকালে এই সমুদ্রদ্বয়ের সহিতই উক্ত ঘটনা সম্পৃক্ত হইতে পারে। আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মীরী বলেন, ইহা সেই স্থান যাহা বর্তমানে 'আকাবা নামে প্রসিদ্ধ (প্রাগুক্ত; কাসাসুল কুরআন, ১খ., ৫৪৮)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 শেষ নবীর উম্মত হওয়ার জন্য মূসা (আ)-এর আকাঙ্ক্ষা

📄 শেষ নবীর উম্মত হওয়ার জন্য মূসা (আ)-এর আকাঙ্ক্ষা


কাতাদা হইতে বর্ণিত যে, মূসা (আ) আল্লাহ তা'আলার সহিত কথোপকথনের সময় একবার বলিলেন, হে আমার প্রতিপালক! আমি তাওরাত সূত্রে জানিলাম যে, মানুষের কল্যাণের জন্য একটি উম্মাত আবির্ভূত হইবে। তাহারা সৎকাজের আদেশ করিবে এবং অসৎ কাজ হইতে নিষেধ করিবে। হে আমার প্রতিপালক! তাহাদিগকে আমার উম্মাত বানাও। আল্লাহ তাআলা বলিলেন, উহারা তো আহমাদ-এর উম্মাত।
মূসা (আ) পুনরায় বলিলেন, হে আমার প্রতিপালক! আমি তাওরাতে দেখিতে পাইতেছি যে, এমন একটি উম্মাত আছে যাহাদের আবির্ভাব সকলের শেষে হইবে অথচ তাহারা সর্বাগ্রে জান্নাতে প্রবেশ করিবে। ওগো আমার প্রতিপালক! তাহাদিগকে আমার উম্মাত বানাও। আল্লাহ তা'আলা বলিলেন, উহারা তো আহমাদ-এর উম্মাত।
তিনি পুনরায় আরয করিলেন, হে আমার প্রতিপালক! আমি তাওরাতে এমন এক উম্মাতের কথা পাইতেছি যাহাদের কিতাব তাহাদের সীনায় থাকিবে। তাহারা উহা (মুখস্থ) পাঠ করিবে। কাতাদা (র) বলেন, ইহার পূর্বের উম্মাতগণ তাহাদের কিতাব দেখিয়া দেখিয়া পড়িত। এমনকি যখন উহা উঠাইয়া লওয়া হইত তখন তাহারা উহার কিছুই স্মরণ করিতে পারিত না এবং উহার কোনও অংশই আর চিনিতে ও বুঝিতে পারিত না। হে উম্মাত (মুহাম্মাদী)! আল্লাহ তোমাদিগকে এমন মুখস্থ শক্তি দান করিয়াছেন যাহার কিয়দাংশও পূর্ববর্তী কোনও উম্মাতকে দেওয়া হয় নাই। মূসা (আ) বলিলেন, হে আমার প্রতিপালক! উহাদিগকে আমার উম্মাত কর। আল্লাহ তা'আলা বলিলেন, তাহারা আহমাদ-এর উম্মাত।
মূসা (আ) বলিলেন, হে আমার প্রতিপালক! আমি তাওরাতে এমন এক উম্মাতের কথা দেখিতে পাইতেছি, যাহারা পূর্বের কিতাবের উপরও ঈমান আনিবে, পরের কিতাবের উপরও। বিভিন্ন সময়ে সৃষ্ট গোমরাহীর বিরুদ্ধে তাহারা জিহাদ করিবে, এমনকি তাহারা মিথ্যাবাদী কানা দাজ্জাল-এর বিরুদ্ধেও যুদ্ধ করিবে। তাহাদিগকে আমার উম্মাত বানাও। আল্লাহ বলিলেন, উহারা তো আহমাদ-এর উম্মাত।
মূসা (আ) বলিলেন, হে আমার প্রতিপালক! আমি তাওরাতে এমন এক উম্মাতের কথা পাইতেছি, যাহাদের সাদাকা তাহারা আহার করিবে অথচ ইহার জন্য তাহাদিগকে বিনিময় ও ছাওয়াব দেওয়া হইবে! কাতাদা (র) বলেন, ইহার পূর্বে কোনও ব্যক্তি সাদাকা করিলে তাহা যদি কবুল হইত তবে আল্লাহ উহার জন্য অগ্নি প্রেরণ করিতেন, সেই অগ্নি আসিয়া উহা পোড়াইয়া ফেলিত। আর কবুল না হইলে উহা অমনি পড়িয়া থাকিত। জীবজন্তু ও পশু-পক্ষী উহা খাইয়া ফেলিত। অথচ আল্লাহ তা'আলা তোমাদের ধনীদের নিকট হইতে সাদাকা লইয়া আহারের জন্য দরিদ্রদিগকে দেন। মূসা (আ) বলিলেন, হে আমার প্রতিপালক! তাহাদিগকে আমার উম্মাত বানাও। আল্লাহ তা'আলা বলিলেন, উহারা আহমাদ-এর উম্মাত।
মূসা (আ) বলিলেন, হে আমার প্রতিপালক! আমি তাওরাতে দেখিতেছি যে, তাহাদের কেহ কোনও নেক কাজের সংকল্প করিয়া উহা করিতে না পারিলেও ইহাতে তাহার একটি নেকী লেখা হইবে। আর যদি সে উহা করে তবে তাহার জন্য দশ হইতে সাত শত গুণ পর্যন্ত নেকী লেখা হইবে। হে আমার প্রতিপালক! উহাদিগকে আমার উম্মাত কর। আল্লাহ তা'আলা বলিলেন, তাহারা আহমাদ-এর উম্মাত।
মূসা (আ) বলিলেন, হে আমার প্রতিপালক! আমি তাওরাতে দেখিতেছি যে, এমন এক উম্মাত হইবে যাহারা নিজেরও সুপারিশকারী হইবে, আবার তাহাদের জন্য সুপারিশ করা হইবে। হে আমার প্রতিপালক! তাহাদিগকে আমার উম্মাত বানাও। আল্লাহ তা'আলা বলিলেন, উহারা তো আহমাদ-এর উম্মাত। কাতাদা (র) বলেন, বর্ণিত আছে যে, অতঃপর মূসা (আ) তাওরাত রাখিয়া দিলেন এবং বলিলেন, হে আল্লাহ! আমাকে আহমাদ-এর উম্মাতের অন্তর্ভুক্ত কর (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ২৯০)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মূসা (আ)-এর হজ্জ

📄 মূসা (আ)-এর হজ্জ


কয়েকটি বর্ণনা হইতে জানা যায় যে, মূসা (আ) বায়তুল্লায় হজ্জ পালন করিয়াছিলেন এবং তালবিয়াও পাঠ করিয়াছিলেন। তবে কিভাবে তিনি মক্কায় গমন করিয়াছিলেন তাহার বিবরণ হাদীছে পাওয়া যায় না। তবে সম্ভবত ইবরাহীম (আ) যেরূপ ফিলিস্তীন হইতে আসিয়া মক্কায় স্বীয় পরিবার-পরিজনকে দেখিয়া যাইতেন এবং কা'বা শরীফ নির্মাণ করিয়া গিয়াছিলেন তদ্রূপ আল্লাহ্র পক্ষ হইতে কোনও বিশেষ ব্যবস্থাপনায় মূসা হজ্জ পালন করিয়াছিলেন।
ইমাম আহমাদ (র) ইব্‌ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) একবার আযরাক উপত্যকা দিয়া যাইতেছিলেন। তিনি সাহাবীদিগকে জিজ্ঞাসা করিলেন, ইহা কোন উপত্যকা? তাহারা বলিলেন, 'আযরাক' উপত্যকা। তিনি বলিলেন, আমি যেন দেখিতেছি মূসা (আ) গিরিপথ হইতে কাতরকণ্ঠে আল্লাহ্ উদ্দেশে তালবিয়া পাঠ করিতে করিতে নামিতেছেন। হারশা টিলায় আসিয়া তিনি বলিলেন, ইহা কোন্ টিলা? তাহারা বলিলেন, ইহা হারশা টিলা। তিনি বলিলেন, আমি যেন ইউনুস ইব্‌ন মাত্তা (আ)-কে একটি লাল উটের উপর দেখিতে পাইতেছি। তাঁহার পরনে একটি পশমের জুব্বা রহিয়াছে। তাঁহার উষ্ট্রীর নাকের রশি খেজুরের ছাল দিয়া তৈরী। তিনিও তালবিয়া পাঠ করিতেছিলেন। ইমাম মুসলিম এই হাদীছটি উল্লেখ করিয়াছেন।
ইমাম তাবারানী ইব্‌ন আব্বাস (রা) হইতে একটি মারফু হাদীছ বর্ণনা করিয়াছেন যে, মূসা (আ) একটি লাল ষাঁড়ের উপর আরোহণ করিয়া হজ্জ করিয়াছেন। ইব্‌ন কাছীর এই বর্ণনা অত্যন্ত গারীব পর্যায়ের বলিয়া মন্তব্য করিয়াছেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ৩১৬)।
ইমাম আহমাদ মুজাহিদ সূত্রে ইব্‌ন আব্বাস (রা) হইতে একটি হাদীছ বর্ণনা করিয়াছেন। উহাতে উল্লেখ আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন..... আর মূসা (আ), তিনি তো গৌরবর্ণের কোঁকড়ানো চুলের অধিকারী। তিনি একটি লাল উটের উপর আরোহী ছিলেন, যাহার নাকের রশি ছিল খেজুর গাছের ছাল দিয়া তৈরী। আমি যেন তাঁহাকে দেখিতে পাইতেছি তিনি তালবিয়া পাঠ করিতে করিতে উপত্যকা হইতে নামিতেছেন (প্রাগুক্ত)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00