📄 হযরত মূসা ও কারূন
কারুনের ঘটনা কুরআন মজীদ ও বাইবেলে বর্ণিত হইয়াছে। বাইবেলে তাহার নাম 'কারাহ' বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে। তবে উভয় গ্রন্থে বর্ণিত ঘটনার ধরন কিছুটা ভিন্ন। অবশ্য তাহার শাস্তি বর্ণনায় উভয় গ্রন্থের বক্তব্য এক। কারূন ছিল বানু ইসরাঈলের এক ধনাঢ্য ব্যক্তি। ইব্ন আব্বাস (রা), ইবরাহীম নাখঈ, আবদুল্লাহ ইবনুল-হারিছ ইব্ন নাওফাল, সিমাক ইব্ন হারব, কাতাদা, মালিক ইব্ দীনার, ইন্ন জুরায়জ প্রমুখের মতে সে ছিল মূসা (আ)-এর চাচাতো ভাই। ইব্ন ইসহাক তাহাকে মূসা (আ)-এর চাচা বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন, ইহা ঠিক নহে। আলিমগণ ইহা প্রত্যাখ্যান করিয়াছেন। তাহার বংশলতিকা এইভাবে বর্ণনা করা হইয়াছে: কারূন ইব্ন ইয়াস্হার ইব্ন কাহাছ ইব্ন লাবী ইব্ন ইয়াকূব (আ)। উল্লেখ্য, কারূন-এর দাদা কাহাছ ছিলেন মূসা (আ)-এরও দাদা।
কারুনের বংশের একটি ছক নিম্নরূপঃ ইয়া'কূব (আ) লাবী খায়র সূন কাহাছ মারারী শামঈ লাবনী ইয্যীল জারুন ইসহার ইমরান মূশী মাহান্ত্রী জিকরা নাকজ কারুন হারুন (আ) মূসা (আ) আবয়াসাফ আলকানিয়্যা আসীর (দ্র. আম্বিয়া-ই কুরআন, ২খ. ২৫২-৩)।
বাইবেলের বর্ণনামতে হারুন (আ) ছিলেন কারূন-এর ভগ্নীপতি। মুফাসসিরগণের বর্ণনামতে কারূন ছিল মূসা ও হারুন (আ)-এর পরে তাওরাতের বড় বিশেষজ্ঞ। সে ছিল সুদর্শন ও সুকণ্ঠের অধিকারী। ফিরআওনের সহচর ও অন্যতম পারিষদ। অত্যাচারী বাদশাহগণ যেমন কিছু তোষামোদকারী ও বশংবদ-এর সহায়তায় সাধারণ জনগণের উপর শাসন ও শোষণের স্টীমরোলার চালায়, কারূন ছিল ফিরআওনের তেমন একজন তোষামোদকারী বশংবদ। ফিরআওনের সহায়তা ও পৃষ্ঠপোষকতায় সে গড়িয়া তুলিয়াছিল বিশাল ধনভাণ্ডার। কুরআন কারীমে তাহার ধনরত্ন ও বিত্ত-বৈভবের বর্ণনা প্রসঙ্গে বলা হইয়াছে :
وَأَتَيْنَاهُ مِنَ الكُنُوزِ مَا إِنَّ مَفَاتِحَهُ لَتَنُوهُ بِالْعُصْبَةِ أُولِي القُوَّةِ (٧٦ : ۲۸) "আমি তাহাকে দান করিয়াছিলাম এমন ধনভাণ্ডার যাহার চাবিগুলি বহন করা একদল বলবান লোকের পক্ষেও কষ্টসাধ্য ছিল" (২৮: ৭৬)।
কোন কোন মুফাসসির বলেন, তাহার চাবিগুলি ছিল চামড়ার, ৬০ (ষাট)-টি খচ্চর উহা বহন করিত (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ৩০৯)।
তবে সে ছিল বড়ই কৃপণ। এই ধন-সম্পদ তাহাকে উদ্ধত ও অহংকারী করিয়াছিল। ধন-সম্পদ ও প্রাচুর্যের মোহে সে এতই বিভোর ছিল যে, স্বীয় বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন ও নিজ সম্প্রদায়ের লোকজনকেও নীচ ও হেয় জ্ঞান করিত।
ফিরআওন-এর সলিল সমাধি হওয়ার পর তাহার আয়-রোযগারের পথ কিছুটা বন্ধ হইয়া যায়।। সম্মান-প্রতিপত্তিও কমিয়া যায়। এই কারণে সে বাহ্যিকভাবে ঈমান আনিলেও অন্তরে মূসা (আ)-এর প্রতি চরম বিদ্বেষ ও শত্রুতা পোষণ করিত। সামিরীর ন্যায় সেও ছিল মুনাফিক। তাহার মনঃপীড়ার আরো একটি কারণ এই ছিল যে, তাহারই চাচাতো ভাই মূসা ও হারুন (আ) আল্লাহ্ নবী এবং গোটা সম্প্রদায়ের নেতা। আর সে কোনও বিশেষ সম্মানের অধিকারী তো নয়ই, গণনার মধ্যেও তাহাকে আনা হয় না, অথচ সে এত এত বিত্তশালী (আম্বিয়া-ই কুরআন, ২খ, ২৫৩-৫৪)।
মূসা (আ) ও তাঁহার সম্প্রদায় একদা তাহাকে নসীহত করিলেন যে, আল্লাহ তোমাকে অঢেল সম্পদ ও সম্মান-প্রতিপত্তি দান করিয়াছেন। ইহার শোকর আদায় কর এবং সম্পদের হক যাকাত-সাদাকা দিয়া গরীব-মিসকীনদিগকে সাহায্য কর। আল্লাহকে ভুলিয়া যাওয়া এবং তাঁহার হুকুমের বিরোধিতা করা চরম অকৃতজ্ঞতা ও অবাধ্যতা। তাঁহার প্রদত্ত ঐশ্বর্যের দাবি ইহা নহে যে, তুমি দরিদ্র ও দুর্বলদিগকে নীচ জ্ঞান করিবে।
আত্মম্ভরিতায় বিভোর কারূনের নিকট মূসা (আ)-এর এই নসীহত ভাল লাগিল না। সে অহঙ্কারবশে বলিল, মূসা! আমার এই ধন-সম্পদ তোমার আল্লাহ্ দেওয়া নহে, ইহা তো আমি আমার জ্ঞান-বুদ্ধি ও অভিজ্ঞতার দ্বারা অর্জন করিয়াছি। আমি তোমার উপদেশ মান্য করিয়া স্বীয় সম্পদকে এইভাবে ধ্বংস করিতে পারি না। কিন্তু মূসা (আ) বরাবর তাহাকে দাওয়াত দিতেই থাকিলেন। কারন যখন দেখিল মূসা (আ) কিছুতেই তাহার পিছু ছাড়িতেছেন না তখন সে মূসা (আ)-কে বিরক্ত করা ও তাক লাগাইয়া দেওয়ার জন্য এবং নিজের সম্পদের গৌরব দেখাইবার জন্য বড়ই জাঁকজমক ও আড়ম্বরের সহিত বাহির হইল। মূসা (আ) তখন বনী ইস্রাঈলের এক সমাবেশে আল্লাহ্র নির্দেশাবলী শুনাইতেছিলেন। কারূন বিশেষ একটি দল সমভিব্যাহারে জাঁকজমক ও সাজসজ্জা সহকারে উক্ত সমাবেশের পাশ দিয়া যাইতেছিল। তাহার উদ্দেশ্য ছিল, মূসা তাঁহার দাওয়াত ও তাবলীগের এই ধারা যদি চালু রাখেন তবে আমারও বিরাট একটি দল রহিয়াছে, ধনভাণ্ডার রহিয়াছে; উহা দ্বারা মূসাকে পরাস্ত করিষ।
বনী ইসরাঈল যখন কারুনের এই দুনিয়াবী শান-শওকত ও বিত্ত-বৈভব দেখিল, তখন কিছু লোকের অন্তরে উহার প্রভাব পড়িল। তাহারা আক্ষেপ করিয়া বলিতে লাগিল, হায়! কারনকে যে বিত্ত-বৈভব ও শান-শওকত দেওয়া হইয়াছে, আমাদিগকেও যদি তাহা দেওয়া হইত! কিন্তু তাহাদের মধ্যে আলিম ও দূরদর্শী ব্যক্তিগণ বলিলেন, সাবধান! এই দুনিয়াবী শান-শওকতের প্রতি আকৃষ্ট হইও না এবং উহার লালসা করিও না। অতি সত্বর তোমরা দেখিতে পাইবে এই ধন সম্পদের পরিণতি কি হয়। যাহারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে তাহাদের কাছে ইহার কোনই গুরুত্ব নাই; বরং আল্লাহ্ পুরস্কারই শ্রেষ্ঠ। অবশেষে কারূন যখন বেশী বেশী দম্ভ ও অহংকার করিতে লাগিল এবং মূসা ও বনী ইসরাঈলকে ঘৃণার দৃষ্টিতে দেখিতে লাগিল তখন আল্লাহ তাহার প্রতিশোধ লইলেন এবং কারুন, তাহার প্রাসাদ ও তাহার সকল সম্পদ মাটিতে ধ্বসাইয়া দিলেন। ইহা দেখিয়া পূর্ব দিন যাহারা তাহার মত সম্পদ ও প্রতিপত্তিশালী হইবার কামনা করিয়াছিল তাহারা বলিতে লাগিল, দেখিলে তো! আল্লাহ তাহার বান্দাদের মধ্যে যাহার জন্য ইচ্ছা তাহার রিযিক বর্ধিত করেন এবং যাহার জন্য ইচ্ছা উহা হ্রাস করেন। যদি আল্লাহ আমাদের প্রতি সদয় না হইতেন তবে আমাদিগকেও তিনি ভূগর্ভে ধ্বসাইয়া দিতেন (দ্র. ২৮: ৭৬-৮২; কাসাসুল কুরআন, ১খ, ৫২৮-৫৩০)।
কারূন-এর সম্পদ ও প্রাসাদসহ ভূগর্ভে ধ্বসিয়া যাওয়া সম্পর্কে আরো দুই ধরনের বর্ণনা পাওয়া যায়: ইব্ন আব্বাস (রা) ও সুদ্দী হইতে বর্ণিত যে, কারূন এক দুশ্চরিত্রা নারীকে অর্থকড়ি দিয়াছিল এইজন্য যে, মূসা (আ) যখন সমাবেশে ওয়াজ-নসীহত করিবেন তখন সে তাহার সহিত ব্যভিচারের অপবাদ দিবে। ষড়যন্ত্র মত সেই নারী মূসা (আ)-এর সমাবেশে গিয়া বলিল, তুমি আমার সহিত এইরূপ এইরূপ করিয়াছ। তখন মূসা (আ) হতচকিত হইয়া গেলেন। তিনি দুই রাকআত সালাত আদায় করিলেন। অতঃপর সেই নারীকে কসম করিতে বলিলেন এবং সে কেন এইরূপ বলিতেছিল তাহাও জিজ্ঞাসা করিলেন। মূসা (আ)-এর ঈমানী জযবায় সে সত্য কথা প্রকাশ করিয়া দিল। বলিল, কারুনই তাহাকে এই কথা বলিতে প্ররোচিত করিয়াছে এবং অর্থকড়ি দিয়াছে। অতঃপর মূসা (আ)-এর ঈমানী আভায় প্রভাবিত ও আলোকিত হইয়া গেল তাহার হৃদয়; সে আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করিল এবং তওবা করিল। তখন মূসা (আ) সিজদায় পড়িয়া গেলেন এবং আল্লাহ্র নিকট কারুনের জন্য বদদু'আ করিলেন। আল্লাহ তাঁহার নিকট ওহী প্রেরণ করিলেন যে, আমি যমীনকে তোমার আনুগত্য করার নির্দেশ দিয়াছি। অতঃপর কারূনকে তাহার প্রাসাদসহ ধ্বসাইয়া ফেলিতে মূসা (আ) নির্দেশ দিলেন। যমীন তখন তাহাকে ও তাহার প্রাসাদকে গ্রাস করিয়া ফেলিল (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ৩১০; আত-তাফসীরুল মাজহারী, ৭খ, ১৮৪-১৮৫)।
এক বর্ণনামতে কারূন যখন সাজসজ্জা ও জাঁকজমক সহকারে মূসা (আ)-এর মজলিসের নিকট দিয়া যাইতেছিল তখন অনেকেরই মনোযোগ তাহার দিকে আকৃষ্ট হইয়াছিল এবং তাহারা তাঁহার দিকে ফিরিয়া তাঁকাইতেছিল। মূসা (আ) তাহাকে ডাকিয়া বলিলেন, তুমি কেন এইরূপ করিয়াছ? সে বলিল, মুসা! তুমি নবুওয়াতের দিক দিয়া আমা হইতে শ্রেষ্ঠ, আর আমি সম্পদের দিক দিয়া তোমা হইতে শ্রেষ্ঠ। তুমি ইচ্ছা করিলে বাহিরে আসিয়া আমার উপর বদদু'আ করিতে পার, আর আমিও তোমার উপর বদdu'আ করিব। অতঃপর মূসা (আ) বাহিরে আসিলেন; কারূনও তাহার সম্প্রদায়ের নিকট গেল। মূসা (আ) তাহাকে বলিলেন, তুমি আগে দু'আ করিবে, না আমি? কারূন বলিল, আমি আগে বদদু'আ করিব। অতঃপর কারূন দু'আ করিল কিন্তু মূসা (আ)-এর ক্ষেত্রে তাহা কবুল হইল না। মূসা (আ) বলিলেন, এখন কি আমি দু'আ করিব? সে বলিল, হাঁ। অতঃপর মূসা (আ) দু'আ করিলেন। আল্লাহ তাঁহার দু'আর ফলে মাটিকে তাঁহার অনুগত বানাইয়া দিলেন। মূসা (আ) যমীনকে নির্দেশ দিলেন, হে যমীন! তুমি ইহাদিগকে পাকড়াও কর। তখন সঙ্গে সঙ্গেই যমীন তাহাদের পা পর্যন্ত গ্রাস করিল। তিনি আবার বলিলেন, ইহাদিগকে পাকড়াও কর। অতঃপর যমিন তাহাদের হাঁটু পর্যন্ত গ্রাস করিল, অতঃপর কাঁধ পর্যন্ত। তখন মূসা (আ) বলিলেন, উহাদের ধনভাণ্ডার ও সম্পদ গ্রাস কর। যমীন তাহা গ্রাস করিল। তাহারা অসহায়ের মত উহার দিকে তাকাইয়া থাকিল। অতঃপর মূসা (আ) স্বীয় হস্ত দ্বারা ইশারা করিয়া বলিলেন, লাবী বংশধরদিগকে পাকড়াও কর। অতঃপর যমীন তাহাদিগকে ধ্বংস করিয়া দিল (আল-বিদায়া, ১খ, ৩১০-৩১১)।
এক বর্ণনামতে মূসা (আ) ঘোষণা দিলেন, হে বনী ইসরাঈল! আল্লাহ আমাকে ফিরআউনের প্রতি প্রেরণ করিয়াছিলেন, তেমনি কারুনের প্রতিও প্রেরণ করিয়াছেন। সুতরাং যে তাহার সহিত থাকিবে সে ঐখানেই অবস্থান করুক, আর যে আমার সহিত থাকিবে সে আলাদা হইয়া চলিয়া আসুক। অতঃপর দুই ব্যক্তি ব্যতীত আর সকলেই মূসা (আ)-এর দলে চলিয়া আসিল। উক্ত দুইজনসহ কারূন ভূগর্ভে ধ্বসিয়া যায় (আত-তাফসীরুল মাজহারী, ৭খ, ১৮৫)।
কাতাদা (র) বলেন, যমীন উহাদিগকে কিয়ামত পর্যন্ত প্রতিদিন একজন মানুষের দৈর্ঘ্যের সমপরিমাণ ধ্বসাইতে থাকিবে। ইব্ন আব্বাস (রা) বলেন, যমীন তাহার সপ্তম স্তর পর্যন্ত তাহাদিগকে ধ্বসাইবে (প্রাগুক্ত, পৃ.৩১১)। কুরআন কারীমের আরো দুই স্থানে কারূনের কথা উল্লেখ করা হইয়াছে:
وَقَارُونَ وَفِرْعَوْنَ وَهَامَانَ وَلَقَدْ جَاءَهُمْ مُوسَى بالبَيِّنَاتِ فَاسْتَكْبَرُوا فِي الْأَرْضِ وَمَا كَانُوا سَابِقِينَ. فَكُلاً اخَذْنَا بِذَنْبِهِ فَمِنْهُمْ مَنْ أَرْسَلْنَا عَلَيْهِ حَاصِبًا وَمِنْهُمْ مَنْ أَخَذَتْهُ الصَّيْحَةُ وَمِنْهُمْ مَنْ أَخَذْنَا بِهِ الْأَرْضَ وَمِنْهُمْ مَنْ أَغْرَقْنَا وَمَا كَانَ اللهُ لِيَظْلِمَهُمْ وَلَكِنْ كَانُوا أَنْفُسَهُمْ يَظْلِمُونَ . ( ٤٠ - ٣٩ : ٢٩)
“এবং আমি ধ্বংস করিয়াছিলাম কারুন, ফিরআওন ও হামানকে। মূসা উহাদের নিকট সুস্পষ্ট নিদর্শনসহ আসিয়াছিল; তখন তাহারা দেশে দম্ভ করিত; কিন্তু উহারা আমার শাস্তি এড়াইতে পারে নাই। উহাদের প্রত্যেককেই তাহার অপরাধের জন্য শাস্তি দিয়াছিলাম; উহাদের কাহারও প্রতি প্রেরণ করিয়াছি প্রস্তরসহ প্রচণ্ড ঝটিকা, উহাদের কাহাকেও আঘাত করিয়াছিল মহানাদ, কাহাকেও আমি প্রোথিত করিয়াছিলাম ভূগর্ভে এবং কাহাকেও করিয়াছিলাম নিমজ্জিত। আল্লাহ তাহাদের প্রতি কোন জুলুম করেন নাই; তাহারা নিজেরাই নিজেদের প্রতি জুলুম করিয়াছিল" (২৯: ৩৯-৪০)।
وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا مُوسَى بِأَيْتِنَا وَسُلْطَانٍ مُبِينٍ إِلَى فِرْعَوْنَ وَهَامَانَ وَقَارُونَ فَقَالُوا سَحِرٌ كَذَابٌ. (٢٤-٢٣ : ٤٠)
"আমি আমার নিদর্শন ও স্পষ্ট প্রমাণসহ মূসাকে প্রেরণ করিয়াছিলাম ফিরআওন, হামান ও কারুনের নিকট। কিন্তু উহারা বলিয়াছিল, এতো এক যাদুকর, চরম মিথ্যাবাদী" (৪০: ২৪-২৫)।
হাদীসে কারুন সম্পর্কে উল্লিখিত হইয়াছে যে, ইমাম আহমাদ (র) আবদুল্লাহ ইব্ন আমর (রা) হইতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, যে সালাতের পাবন্দী করে কিয়ামতের দিন উহা তাহার জন্য নূর, প্রমাণ (বুরহান) ও নাজাতের কারণ হইবে। আর যে সালাতের পাবন্দী করিবে না উহা তাহার জন্য নূর, বুরহান ও নাজাতের কারণ কিছুই হইবে না। সে কিয়ামতের দিন কারুন, ফিরআওন, হামান ও উবায় ইব্ন খালাফ-এর সহিত থাকিবে (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ৩১২)।
কারুনের এই ঘটনা কখন সংঘটিত হইয়াছিল, ফিরআওনের ডুবিয়া মৃত্যু হওয়ার পূর্বে মিসরে, না তাহার মৃত্যুর পর 'তীহ' ময়দানে, এই বিষয়ে মুফাস্স্সিরগণের দুইটি মত রহিয়াছে। ইব্ন কাছীর বলেন, ইহা যদি ফিরআওন-এর ডুবিয়া মরিবার পূর্বের ঘটনা ধরা হয় তবে আয়াতে دار (প্রাসাদ)-এর অর্থ তাহার প্রকৃত বাড়ি ও প্রাসাদ। আর যদি পরের ঘটনা ধরা হয় তবে অর্থ তীহ ময়দানে অবস্থিত তাহার তাঁবু (কাসাসুল কুরআন, ১খ, ৫৩০-৫৩১)।
মাওলানা হিফজুর রাহমান সিউহারবী এই ঘটনাকে তীহ-এর ময়দানের ঘটনা সম্বলিত বলিয়া অভিমত দিয়াছেন। কারণ হিসাবে তিনি উল্লেখ করিয়াছেন যে, কুরআন কারীমে কারুনের ভূমিতে প্রোথিত হওয়ার এই ঘটনাকে ফিরআওনের ডুবিয়া মৃত্যুর ঘটনার পর উল্লেখ করা হইয়াছে (প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৩১)।
📄 মূসা (আ)-এর প্রতি ইসরাঈলীদের অপবাদ
কুরআন কারীমের দুইটি স্থলে বনী ইসরাঈল কর্তৃক মূসা (আ)-কে কষ্ট দেওয়ার কথা উল্লিখিত হইয়াছে।
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ أَذَوْا مُوسَى فَبَرَاهُ اللهُ مِمَّا قَالُوا وَكَانَ عِنْدَ اللهِ وَجِيْها . "হে মুমিনগণ! মূসাকে যাহারা ক্লেশ দিয়াছে তোমরা উহাদের ন্যায় হইও না; উহারা যাহা রটনা করিয়াছিল আল্লাহ্ উহা হইতে তাহাকে নির্দোষ প্রমাণিত করেন এবং আল্লাহ্র নিকট সে মর্যাদাবান" (৩৩:৬৯)।
وَإِذْ قَالَ مُوسَى لِقَوْمِهِ يَا قَوْمِ لِمَ تُؤْذُونَنِي وَقَدْ تَعْلَمُونَ أَنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ فَلَمَّا زَاغُوا أَزَاغَ اللَّهُ قُلُوبَهُمْ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَاسِقِينَ (٥ : ٦١)
"স্মরণ কর, মূসা তাহার সম্প্রদায়কে বলিয়াছিল, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আমাকে কেন কষ্ট দিতেছ যখন তোমরা জান যে, আমি তোমাদের নিকট আল্লাহ্র রাসূল। অতঃপর উহারা যখন বক্র পথ অবলম্বন করিল তখন আল্লাহ উহাদের হৃদয়কে বক্র করিয়া দিলেন। আল্লাহ পাপাচারী সম্প্রদায়কে হিদায়াত করেন না" (৬১:৫)।
ইহা কি ধরনের ক্লেশ ছিল সেই সম্পর্কে বিভিন্ন রকমের বর্ণনা পাওয়া যায়। কাহারও মতে ইহা বিশেষ কোনও ধরনের ক্লেশ নহে; বরং বানু ইসরাঈলের মূর্তিপূজার আবেদন, গো-বৎস পূজা, তাওরাত গ্রহণে অস্বীকৃতি, পবিত্র ভূমিতে প্রবেশে অস্বীকৃতি, মান্না-সালওয়ার নাশোকরী প্রভৃতি আল্লাহদ্রোহী কর্মকাণ্ডে তিনি ব্যথিত হইতেন। তাহারই কথা এইভাবে উল্লেখ করা হইয়াছে।
তবে অধিকাংশ মুফাস্সিরের মতে এইখানে বিশেষ এক ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করা হইয়াছে। তন্মধ্যে একটি বুখারী ও মুসলিম-এর হাদীছে বর্ণিত হইয়াছে। আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত, রাসূলূল্লাহ (স) বলেন: মূসা (আ) ছিলেন খুবই লাজুক প্রকৃতির। তাই তিনি সব সময় শরীর আবৃত রাখিতেন। লজ্জাশীলতার কারণে তাঁহার দেহের কোনও অংশ খোলা দেখা যাইত না। অপর দিকে বনী ইসরাঈল ছিল ইহার বিপরীত স্বভাবের। তাহারা জনসমক্ষে উলঙ্গ হইয়া গোসল করিত। তাহারা বরং মূসা (আ)-কে লইয়া হাসি-ঠাট্টা করিত এবং বলিত যে, তাহার একশিরা বা অন্য কোনও রোগ রহিয়াছে। তাহারা আবার কখনও বলিত, তাহার লজ্জাস্থানে স্বেতী রোগ রহিয়াছে যাহার দরুন তিনি একাকী নির্জনে গোসল করেন। মূসা (আ) ইহা শুনিয়া চুপ করিয়া থাকিতেন। অবশেষে আল্লাহ তা'আলা এই অপবাদ দূর করিয়া দেন। প্রতিদিনকার ন্যায় মূসা (আ) একদিন জনগণ হইতে দূরে নির্জনে গোসল করিতেছিলেন এবং স্বীয় কাপড় একটি পাথরের উপর রাখেন। অতঃপর পাথরটি তাঁহার কাপড় লইয়া পলায়ন করিতে লাগিল। তখন মূসা (আ) উহার পিছনে ছুটিতে লাগিলেন এবং বলিতে লাগিলেন, পাথর, আমার কাপড়! পাথর, আমার কাপড়! এইভাবে পাথরটি বনী ইসরাঈল যেখানে সকলে গোসল করিতেছিল সেখানে গিয়া থামিল। অনন্যোপায় হইয়া মূসা (আ)-ও পাথরের পিছনে পিছনে সেখানে গিয়া পৌঁছিলেন। তখন বনী ইসরাঈলের লোকেরা দেখিল যে, তাহারা মূসা (আ)-কে যেসব অপবাদ দিত উহার সবগুলি হইতে তিনি মুক্ত। মূসা (আ) রাগান্বিত হইয়া লাঠি দ্বারা পাথরের উপর ৬/৭টি আঘাত করিলেন, ফলে পাথরের উপর উহার চিহ্ন পড়িয়া যায়।
মিসরীয় আলিম ও গবেষক আবদুল ওয়াহহাব আন-নাজ্জার এই ব্যাপারে ভিন্নতর মত পোষণ করেন। তিনি বলেন, নবীর এইরূপ সতর খুলিয়া জনসমক্ষে হাজির করানো শোভনীয় নহে। তাহা ছাড়া মূসা (আ) যে তাঁহার সম্প্রদায়কে বলিয়াছিলেন, তোমরা কেন আমাকে কষ্ট দিতেছ যখন তোমরা জান যে, আমি আল্লাহর রাসূল? শারীরিক দোষের সহিত রিসালাতের কী সম্পর্ক আছে যে, মূসা (আ) ঐরূপ বলিবেন? উপরিউক্ত যে হাদীছে পাথরের উক্ত ঘটনা বিবৃত হইয়াছে, উহার সনদে 'আওফ' নামক এক রাবী রহিয়াছেন যাহার সম্পর্কে হাফিজ ইব্ন হাজার আল-'আসকালানী তাঁহার 'তাহযীবুত-তাহযীব' গ্রন্থে সমালোচনা করিয়া বলিয়াছেন যে, তিনি ছিলেন শী'আ রাফেষী শয়তান। সুতরাং উক্ত হাদীস গ্রহণযোগ্য নহে (আন-নাজ্জার, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ২৯১)।
তবে আন-নাজ্জারের এই বক্তব্য এই কারণে গ্রহণযোগ্য নহে যে, বুখারী ও মুসলিমে উদ্ধৃত উল্লিখিত হাদীসে আওফ নামের কোন রাবী নাই'। উক্ত আয়াতের শানে নুযূল সম্পর্কে ইব্ন আবী হাতিম (র) আলী (রা) হইতে অন্য একটি রিওয়ায়াত বর্ণনা করেন যে, আলী (রা) বলেন, তীহ ময়দানে একবার মূসা ও হারুন (আ) 'হাওর' পর্বতে যান। হারুন (আ) সেখানেই ইনতিকাল করেন। তাঁহার দাফন শেষে মূসা (আ) সম্প্রদায়ের নিকট একাকী ফেরত আসেন। ইহা দেখিয়া বনী ইসরাঈল মূসা (আ)-এর উপর অপবাদ দিল যে, তিনি হারুন (আ)-কে হত্যা করিয়াছেন। ইহাতে মূসা (আ) দারুনভাবে ব্যথিত হন। একদিকে আপন সহোদরের মৃত্যুশোক, আর অপরদিকে অর্বাচীন বনী ইসরাঈলের পক্ষ হইতে এই জঘন্য অপবাদ। তখন আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদেরকে হারুন (আ)-এর লাশ বনী ইসরাঈলের সম্মুখে উপস্থাপনের নির্দেশ দেন। ফেরেশতাগণ বানু ইসরাঈলের সমাবেশস্থল সোজা শূন্যে হারুন (আ)-এর লাশ হাজির করেন। তখন তাহারা ইহা দেখিয়া শান্ত হয় যে, বাস্তবিকই হারুন (আ)-এর স্বাভবিক মৃত্যু হইয়াছে, তাঁহারা শরীরের হত্যার কোনও চিহ্ন নাই (কাসাসুল কুরআন, ১খ, ৫৩৫)।
অপর একটি রিওয়ায়াত ইব্ন আব্বাস (রা) ও সুদ্দী হইতে বর্ণিত, যাহা তাফসীর গ্রন্থসমূহে উল্লিখিত হইয়াছে। তাঁহাদের বর্ণনামতে মূসা (আ) যখন কারূনকে যাকাত ও সাদাকা দিতে বলিলেন তখন সম্পদ দেওয়ার ভয়ে সে মূসা (আ)-কে প্রস্তরাঘাতে হত্যা করিবার ষড়যন্ত্র করিল। এক মহিলাকে সে অর্থ দিয়া রাযী করাইল যে, সে বলিবে, মূসা (আ) তাহার সহিত ব্যভিচার করিয়াছেন। পরবর্তী দিন সে মূসা (আ)-কে বলিল, শরীআতে কি এই হুকুম নাই যে, ব্যভিচারীকে প্রস্তরাঘাতে হত্যা করিতে হইবে? মূসা (আ) বলিলেন, হাঁ। কারুন বলিল, আপনি অমুক মহিলার সহিত ব্যভিচার করিয়াছেন। তাই উক্ত শাস্তির জন্য নিজকে পেশ করুন। অতঃপর সাক্ষীস্বরূপ উক্ত মহিলাকে যখন হাজির করা হইল তখন সে আসল ঘটনা জানাইয়া দিল যে, কারূন তাহাকে মূসা (আ) সম্পর্কে এই কথা বলিতে শিখাইয়াছে, আসলে তিনি ইহা হইতে পবিত্র। কুরআন কারীমের আয়াত: ফَبَرَّاهُ اللهُ مِمَّا قَالُوا وَكَانَ عِنْدَ اللَّهِ وَجِيْهَا ، (٦٩ : ٣٣) "তাহারা যাহা রটনা করিয়াছিল আল্লাহ উহা হইতে তাহাকে নির্দোষ প্রমাণিত করেন এবং আল্লাহ্র নিকট সে মর্যাদাবান" (৩৩ : ৬৯)-ও এই ঘটনার সহিত অধিক সাদৃশ্যপূর্ণ। তাফসীরকার বায়দাবী ও আলুসী এবং ইতিহাসবিদ ইবনুল-আছীর ইহা বর্ণনা করিয়াছেন। 'আবদুল ওয়াহহাব নাজ্জারও এই মত গ্রহণ করিয়াছেন (দ্র. আন-নাজ্জার, কাসাসুল'-আম্বিয়া, পৃ. ২৯০-২৯১)।
• এই ব্যাপারে মাওলানা হিফজুর রাহমান সিউহারবী মন্তব্য করিয়াছেন যে, কুরআন কারীমে যেহেতু মূসা (আ)-এর ক্লেশ সম্পর্কিত ঘটনাটি সাধারণভাবে বর্ণিত হইয়াছে, কোন বিস্তারিত বিবরণ উল্লেখ করা হয় নাই, তাই আমাদের জন্যও সমীচীন হইবে উহার বিশদ বিবরণ না দিয়া এবং কোনও বিশেষ ঘটনার সহিত ইহাকে সম্পর্কিত ও সুনির্দিষ্ট না করিয়া ঘটনার প্রতি বিশ্বাস রাখা। যে হিকমতের কারণে আল্লাহ উহাকে সাধারণভাবে অব্যক্ত রাখিয়াছেন, আমরাও উহাতে সন্তুষ্ট থাকিব এবং তদ্রূপ বিশ্বাস করিব (কাসাসুল কুরআন, ১খ, ৫৬৩)।
📄 খিয়র (আ)-এর সহিত সাক্ষাত
হযরত খিফ্র (আ)-এর সহিত সাক্ষাত মূসা (আ)-এর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কুরআন কারীমে সূরা কাহ্ফ-এ (৬০-৮৩ নং আয়াত) এবং সাহীহ বুখারীর হাদীছে এই ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ উল্লিখিত হইয়াছে। অবশ্য কুরআন কারীমে তাঁহার নাম উল্লেখ করা হয় নাই। বলা হইয়াছে, "এক বান্দা যাহাকে আল্লাহ্র নিকট হইতে অনুগ্রহ এবং এক বিশেষ জ্ঞান দান করা হইয়াছিল (১৭: ৬৫)। আর সহীহ বুখারীতে সুস্পষ্টভাবে তাঁহার নামোল্লেখ করা হইয়াছে। প্রকৃতপক্ষে কুরআন কারীমে যাহা বর্ণিত হইয়াছে বুখারীর হাদীছ উহারই ব্যাখ্যা। উহাতে ইয়ালা ইব্ন মুসলিম ও আমর ইবন দীনার উভয় রাবীর রিওয়ায়াত স্থান পাইয়াছে, যাহা সামান্য শাব্দিক পার্থক্য ছাড়া মূল ঘটনা একই।
উহাতে বর্ণিত হইয়াছে, সাঈদ ইব্ন জুবায়র (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইব্ন আব্বাস (রা)-কে বলিলাম, নাওফ আল-বীক্কালী বলিয়াছেন, খিফ্র (আ)-এর সহিত যে মূসার সাক্ষাত হইয়াছিল তিনি বনী ইসরাঈলের মূসা নহেন; বরং অন্য এক মূসা। তখন ইব্ন আব্বাস (রা) বলিলেন, 'আল্লাহ্র দুশমন মিথ্যা বলিয়াছে। আমার নিকট উবায় ইব্ন কা'ব (রা) বর্ণনা করিয়াছেন যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিতে শুনিয়াছেন, একদিন মূসা (আ) বনী ইসরাঈলের সম্মুখে ওয়াজ করিতেছিলেন। তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করা হইল :
মানুষের মধ্যে সবচাইতে জ্ঞানী ব্যক্তি কে? তিনি বলিলেন, আমি। ইয়ালার বর্ণনামতে তাঁহার বক্তৃতা শুনিয়া যখন শ্রোতাদের চক্ষু হইতে অশ্রু প্রবাহিত হইতে লাগিল এবং অন্তর বিগলিত হইল তখন মূসা (আ) (বক্তৃতা সমাপ্ত করিয়া) ফিরিয়া আসিতে উদ্যত হইলেন। তখন এক ব্যক্তি তাঁহাকে প্রশ্ন করিল, হে আল্লাহর রাসূল! এই পৃথিবীতে আপনার চাইতে অধিক জ্ঞানী আর কেহ আছে কি? তিনি বলিলেন, না। ইহাতে আল্লাহ তা'আলা তাঁহার উপর অসন্তুষ্ট হইলেন। কেননা এই জ্ঞানের কথাটি তিনি আল্লাহ্র উপর হাওয়ালা করেন নাই। ইয়ালার বর্ণনা মতে তাঁহাকে বলা হইল, নিশ্চয়ই আছে। (তাঁহার উচিৎ ছিল ইহা আল্লাহর জ্ঞানের উপর সোপর্দ করিয়া এই কথা বলা যে, 'আল্লাহই ভাল জানেন)। আল্লাহ তাঁহার প্রতি ওহী অবতীর্ণ করিলেন, আমার এক বান্দা, যে সমুদ্রের সংগমস্থলে আছে, সে তোমা হইতে অধিক জ্ঞানী। মূসা (আ) বলিলেন, হে আমার প্রতিপালক! আমি কিরূপে তাঁহার সাক্ষাত পাইব? আল্লাহ বলিলেন, থলির মধ্যে একটি মাছ লও, যেখানে মাছটি হারাইয়া যাইবে সেইখানেই তুমি তাহাকে পাইবে। ইয়ালার বর্ণনামতে, আল্লাহ তাঁহাকে বলিলেন, একটি মৃত মাছ লও, যেখানে মাছটির মধ্যে প্রাণ সঞ্চারিত হইবে সেইখানেই তাহাকে পাইবে নির্দেশমত মূসা (আ) থলির মধ্যে একটি মাছ লইলেন এবং তাঁহার খাদেম ইউশা ইব্ নূন-এর সহিত উক্ত বান্দার সন্ধানে চলিলেন। ইয়ালার বর্ণনামতে তিনি খাদেমকে বলিলেন, আমি তোমাকে শুধু এই দায়িত্ব দিতেছি যে, মাছটি যে স্থানে তোমার নিকট হইতে চলিয়া যাইবে, সেই স্থানটির কথা আমাকে স্মরণ করাইয়া দিবে। খাদেম বলিল, ইহা বড় কোনও দায়িত্ব নহে! অতঃপর তাঁহারা উভয়ে পাথরের নিকট পৌঁছিয়া পাথরে মাথা রাখিয়া ঘুমাইয়া পড়িলেন। এদিকে মাছটি জীবন্ত হইয়া থলি হইতে লাফাইয়া পড়িল এবং সমুদ্রে চলিয়া গেল। রাবী সুফ্যান বলেন, 'আমর ইব্ন দীনার ছাড়া সকল বর্ণনাকারী বলিয়াছেন, পাথরটির তলদেশে একটি ঝর্ণা ছিল; তাহাকে 'হায়াত' বলা হইত। কেননা যে মৃতের উপর উহার পানি পড়িত অমনি উহা জীবিত হইয়া উঠিত। সে মাছটির উপরও ঐ ঝর্ণার পানি পড়ে এবং সঙ্গে সঙ্গে উহা লাফাইয়া উঠে। অতঃপর মাছটি থলি হইতে বাহির হইয়া সমুদ্রে চলিয়া যায়। মাছটি পানির যে স্থান দিয়া গিয়াছিল আল্লাহ সেই স্থানে পানির প্রবাহ বন্ধ করিয়া দিলেন। সেখানে সুড়ংগের ন্যায় একটি পথ হইয়া গেল (এই ঘটনা ইউশা দেখিয়াছিলেন)। কিন্তু মূসা (আ) জাগ্রত হইলে তিনি তাঁহাকে ইহা অবহিত করিতে ভুলিয়া যান। অতঃপর উভয়ে চলিতে লাগিলেন এবং দিনের অবশিষ্ট অংশ এবং রাতভর তাহারা চলিলেন। পরবর্তী দিন মূসা (আ) তাঁহার খাদেমকে বলিলেন, আমাদের খাবার আন, আমরা এই সফরে ক্লান্ত হইয়া পড়িয়াছি। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, মূসা (আ) ক্লান্তি তখন অনুভব করেন যখন নির্ধারিত স্থান অতিক্রম করিয়া যান। নির্ধারিত স্থান অতিক্রমের পূর্বে তাঁহার কোনরূপ ক্লান্তি অনুভূত হয় নাই।
খাদেম বলিল, আপনি কি লক্ষ্য করিয়াছেন, আমরা যখন সেই পাথরটির-কাছে বিশ্রাম লইতেছিলাম তখন (মাছটি পানিতে চলিয়া গিয়াছে)। মাছটি চলিয়া যাওয়ার কথা বলিতে আমি একেবারেই ভুলিয়া গিয়াছি। প্রকৃতপক্ষে আপনার নিকট তাহা উল্লেখ করিতে একমাত্র শয়তানই আমাকে ভুলাইয়া দিয়াছে। মাছটি নদীতে আশ্চৰ্যজনকভাবে নিজের পথ করিয়া লইয়াছে। বর্ণনাকারী বলেন, পথটি মাছের জন্য ছিল একটি সুড়ঙ্গের মত আর তাঁহাদের জন্য ছিল একটি আশ্চর্যজনক ব্যাপার। মূসা (আ) তাহাকে বলিলেন, উহাই তো সেই স্থান যাহা আমরা খুঁজিতেছি।
অতঃপর তাঁহারা নিজদের পদচিহ্ন ধরিয়া ফিরিয়া চলিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, তাহারা উভয়ে তাঁহাদের পদচিহ্ন অনুসরণ করিয়া সেই পাথরটির কাছে ফিরিয়া আসিলেন। সেখানে আসিয়া তাঁহারা এক ব্যক্তিকে কাপড়ে আবৃত অবস্থায় পাইলেন। ইব্ন জুরায়জ-এর বর্ণনামতে মূসা (আ) খিফ্রকে পাইলেন সমুদ্রের বুকে সবুজ বিছানার উপর। সাঈদ ইব্ন জুবায়র (র) বলেন, তিনি চাদর মুড়ি দিয়াছিলেন। চাদরের এক পার্শ্ব ছিল তাঁহার দুই পায়ের নিচে এবং অন্য পার্শ্ব ছিল তাহার মাথার উপর। মূসা (আ) তাঁহাকে সালাম করিলেন। খিফ্র (আ) বলিলেন, তোমাদের এইখানে সালাম-এর প্রচলন কোথায়? মূসা (আ) বলিলেন, আমি মূসা! তিনি বলিলেন, বনী ইসরাঈলের মূসা? মূসা (আ) বলিলেন, হাঁ। আমি আপনার নিকট আসিয়াছি এইজন্য যে, সত্যের যেই জ্ঞান আপনাকে দেওয়া হইয়াছে তাহা আমাকে শিক্ষা দিবেন।
ইয়া'লার বর্ণনামতে খিফ্র (আ) তখন মূসা (আ)-কে বলিলেন, আপনার নিকট যে তাওরাত রহিয়াছে তাহা কি আপনার জন্য যথেষ্ট নহে? আপনার কাছে তো ওহী আসে। হে মূসা! আমার কাছে যে জ্ঞান আছে তাহা আপনার জন্য সমীচীন নহে, আর আপনার কাছে যে জ্ঞান আছে তাহা আমার জন্য সমীচীন নহে।
আমর ইব্ন দীনারের বর্ণনায়, আল্লাহর জ্ঞান হইতে আমাকে এমন কিছু জ্ঞান দান করা হইয়াছে যাহা আপনি জানেন না, আর আপনাকে আল্লাহ তাঁহার জ্ঞান হইতে যে জ্ঞান দান করিয়াছেন তাহা আমি জানি না। সুতরাং আপনি কখনও আমার সহিত ধৈর্য ধারণ করিয়া থাকিতে পারিবেন না। যে বিষয় আপনার জ্ঞানায়ও নহে সে বিষয়ে আপনি ধৈর্য ধারণ করিবেন কেমন করিয়া? মূসা (আ) বলিলেন, আল্লাহ চাহিলে আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাইবেন এবং আপনার কোনও আদেশ আমি অমান্য করিব না। তখন খিফ্র (আ) তাঁহাকে বলিলেন, আচ্ছা, আপনি যদি আমার অনুসরণ করেনই তবে কোন বিষয়ে আমাকে প্রশ্ন করিবেন না, যতক্ষণ আমি আপনাকে সেই সম্পর্কে অবহিত করি।
তারপর তাঁহারা সমুদ্রের তীর ধরিয়া চলিতে লাগিলেন। তখন একটি নৌকা যাইতেছিল। তাঁহারা তাহাদের নৌকায় উঠিবার জন্য চালকদের সহিত আলাপ করিলেন। তাঁহারা খিফ্র (আ)-কে চিনিয়া ফেলিল। তাই বিনা পারিশ্রমিকে তাহাদিগকে নৌকায় উঠাইয়া লইল। এক বর্ণনামতে তাঁহারা একটি ছোট খেয়া নৌকা পাইলেন, যাহা লোকদিগকে পারাপার করিত। নৌকার লোকেরা খিফ্র (আ)-কে চিনিতে পারিল। তাহারা বলিল, আল্লাহর নেক বান্দা। ইয়ালা বলেন, আমরা সাঈদকে জিজ্ঞাসা করিলাম, তাঁহারা কি খিফ্র সম্পর্কে এই মন্তব্য করিয়াছিল? তিনি বলিলেন, হ্যাঁ। অতঃপর যখন তাঁহারা উভয়ে নৌকায় আরোহণ করিলেন তখন খিফ্র (আ) কুড়াল দিয়া নৌকার একটি তক্তা বিদীর্ণ করিলেন। ইহা দেখিয়া মূসা (আ) চমকিয়া উঠিয়া তাঁহাকে বলিলেন, এই লোকেরা তো বিনা পারিশ্রমিকে আমাদিগকে বহন করিতেছে অথচ আপনি ইহাদের নৌকাটি বিনষ্ট করিলেন! আপনি নৌকাটি বিদীর্ণ করিয়া ফেলিলেন যাহাতে আরোহীরা ডুবিয়া যায়। আপনি তো এক গুরুতর অন্যায় কাজ করিলেন! খিফ্র (আ) বলিলেন, আমি কি বলিনি যে, আপনি আমার সঙ্গে কিছুতেই ধৈর্য ধারণ করিতে পারিবেন না! মূসা (আ) বলিলেন, আমার ভুলের জন্য আমাকে অপরাধী করিবেন না এবং আমার ব্যাপারে অত্যধিক কঠোরতা অবলম্বন করিবেন না।
রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, মূসা (আ)-এর প্রথম বারের এই প্রতিবাদ ভুলবশত হইয়াছিল। অতঃপর একটি চড়ুই পাখি আসিয়া নৌকার পার্শ্বে বসিল এবং ঠোঁট দিয়া সমুদ্র হইতে একবার অথবা দুইবার পানি উঠাইল। খিযর (আ) মূসা (আ)-কে বলিলেন, এই সমুদ্র হইতে চড়ুই পাখিটি যতটুকু পানি ঠোঁটে লইল আমার ও আপনার জ্ঞান আল্লাহ্ জনের তুলনায় তেমনই নিতান্তই অল্প। ইয়ালার বর্ণনায় চড়ুই পাখির এই ঘটনাটি তাহাদের নৌকায় আরোহণের পূর্বেই সংঘটিত হইয়াছিল।
অতঃপর তাঁহারা নৌকা হইতে অবতরণ করিয়া সমুদ্রের তীর ধরিয়া চলিতে লাগিলেন। এমন সময় খিফ্র (আ) একটি বালককে অন্য বালকদের সহিত খেলিতে দেখিলেন। তিনি ছেলেটির মাথা হাত দিয়া বিচ্ছিন্ন করিয়া ফেলিলেন। ইয়ালার বর্ণনায় আছে যে, সাঈদ বলিয়াছেন, খিফ্র (আ) একদল বালককে খেলাধুলা করিতে দেখিলেন। তিনি একটি বুদ্ধিমান চটপটে কাফির বালককে ধরিলেন। অতঃপর উহাকে পার্শ্বদেশে শোয়াইয়া ছুরি দ্বারা যবাহ করিলেন। মূসা (আ) বলিলেন, আপনি কি হত্যার অপরাধ ছাড়াই এক নিষ্পাপ জীবন নাশ করিলেন! নিশ্চয়ই আপনি একটি অন্যায় কাজ করিলেন। খিফ্র (আ) বলিলেন, আমি কি আপনাকে বলি নাই যে, আপনি আমার সঙ্গে কিছুতেই ধৈর্য ধারণ করিতে পারিবেন না? রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, এবারের প্রতিবাদ ছিল প্রথমটির চাইতেও গুরুতর। মূসা (আ) বলিলেন, ইহার পর যদি আমি আপনাকে কোন বিষয়ে জিজ্ঞাসা করি তবে আপনি আমাকে সঙ্গে রাখিবেন না। আপনার নিকট আমার ওযর-আপত্তি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌছিয়া গিয়াছে।
অতঃপর উভয়ে চলিতে লাগিলেন। অবশেষে তাঁহারা এক জনপদে পৌঁছিয়া উহার অধিবাসীদের নিকট খাদ্য চাহিলেন। কিন্তু তাহারা তাঁহাদের মেহমানদারী করিতে অস্বীকার করিল। তাঁহারা তথায় এক পতনোন্মুখ প্রাচীর দেখিতে পাইলেন। খিফ্র (আ) দাঁড়াইলেন এবং নিজ হাতে তাহা সোজা করিয়া দিলেন। ইয়ালার বর্ণনায় আছে যে, সাঈদ তাহার হাত দ্বারা ইশারা করিয়া বলিলেন, এইরূপ এবং তিনি তাহার হাত উঠাইয়া সোজা করিলেন। ইয়ালা বলেন, আমার মনে হয়—সাঈদ বলিয়াছিলেন, খিয় প্রাচীরের উপর তাঁহার দুই হাতে স্পর্শ করিলে উহা সোজা হইয়া গেল। মূসা (আ) বলিলেন, এই লোকদের নিকট আমরা আগমন করিলাম অথচ তাহারা আমাদিগকে খাবারও দিল না এবং মেহমানদারীও করিল না। আপনি তো ইচ্ছা করিলে ইহার জন্য পারিশ্রমিক গ্রহণ করিতে পারিতেন। তিনি বলিলেন, এইখানেই আপনার ও আমার মধ্যে সম্পর্কচ্ছেদ হইল। যে বিষয়ে আপনি ধৈর্য ধারণ করিতে পারেন নাই আমি তাহার তাৎপর্য ব্যাখ্যা করিতেছি।
নৌকাটির ব্যাপারে: ইহা ছিল কতিপয় দরিদ্র ব্যক্তির, উহারা সমুদ্রে জীবিকা অন্বেষণ করিত; আমি ইচ্ছা করিলাম নৌকাটিকে ত্রুটিযুক্ত করিতে। কারণ উহাদের সম্মুখে ছিল এক রাজা, যে বলপ্রয়োগে নৌকাসকল ছিনাইয়া লইত। সাঈদ ব্যতীত অন্য সকল বর্ণনাকারী সেই রাজার নাম বলিয়াছেন 'হুদাদ ইব্ন বুদাদ'। আর হত্যাকৃত বালকটির নাম 'জায়সূর'। খিফ্র (আ)-এর নৌকা বিদীর্ণ করার উদ্দেশ্য ছিল, উক্ত অত্যাচারী রাজা ত্রুটিযুক্ত নৌকা দেখিলে তাহা ছিনাইয়া নিবে না। অতঃপর তাহরা সেই রাজার রাজ্য যখন অতিক্রম করিয়া গেল, তখন তাহাদের নৌকা মেরামত করিয়া লইল এবং উহা ব্যবহারোপযোগী করিয়া তুলিল। কেহ বলেন, তাহারা নৌকার ছিদ্রটি মেরামত করিয়াছিল সীসা গলাইয়া, আর কেহ বলেন, আলকাতরা মিলাইয়া।
দ্বিতীয় আচরণের ব্যাখ্যা দিয়া খিফ্র (আ) বলেন: আর কিশোরটি, তাহার পিতা-মাতা ছিল মুমিন আর সে বালকটি ছিল কাফির। আমি আশংকা করিলাম যে, সে বিদ্রোহাচরণ ও কুফরীর দ্বারা উহাদিগকে বিব্রত করিবে। অর্থাৎ তাহার স্নেহ-ভালবাসা তাহাদিগকে তাহার ধর্মের অনুসারী করিয়া ফেলিবে। ইহার পর আমি চাহিলাম যে, উহাদের প্রতিপালক যেন উহাদিগকে উহার পরিবর্তে এক সন্তান দান করেন যে হইবে পবিত্রতায় মহত্তর এবং ভক্তি ও ভালবাসায় ঘনিষ্ঠতর। খিফ্র (আ) যে বালকটিকে হত্যা করিয়াছিলেন সেই বালকটির চেয়ে পরবর্তী বালকটির প্রতি তাহার পিতা-মাতা অধিক স্নেহশীল ও দয়াশীল হইবেন। সাঈদ ব্যতীত অন্য সকল বর্ণনাকারী বলিয়াছেন যে, ইহার অর্থ হইল সেই বালকটির পরিবর্তে আল্লাহ তাহাদের একটি কন্যা সন্তান দান করেন।
তৃতীয় আচরণের ব্যাখ্যা দিয়া খিফ্র (আ) বলেন: আর ঐ প্রাচীরটি, উহা ছিল নগরবাসী দুই পিতৃহীন কিশোরের, উহার নিম্নদেশে ইহাদের গুপ্তধন রহিয়াছে। ইহাদের পিতা ছিল সৎকর্মপরায়ণ। সুতরাং তোমার প্রতিপালক দয়াপরবশ হইয়া ইচ্ছা করিলেন যে, ইহারা বয়ঃপ্রাপ্ত হউক এবং উহাদের ধনভাণ্ডার উদ্ধার করুক। আমি নিজ হইতে কিছুই করি নাই; আপনি যে বিষয়ে ধৈর্য ধারণে অপারগ হইয়াছিলেন, ইহাই তাহার ব্যাখ্যা। রাসূলুল্লাহ (স) এই হাদীছ বর্ণনা করিয়া বলেন: আমার মনোবাঞ্ছা হইতেছে যে, মূসা (আ) যদি আর একটু ধৈর্য ধারণ করিতেন তবে আল্লাহ তাহাদের আরও ঘটনা আমাদিগকে জানাইতেন" (দ্র. ১৮: ৬০-৮৩ নং আয়াত; আল-বুখারী, আস-সাহীহ, কিতাবুত-তাফসীর, সূরা কাহফ, ২খ, পৃ. ৬৮৮, ৬৮৯, ১খ, পৃ. ৪৮২, ৪৮৩, হাদীছ নং ৫২৫৭, ৫২৫৮, ৫২৫৯)।
কুরআন কারীমে এই ঘটনার শুরুতে খিফ্র (আ)-এর এই জ্ঞান সম্পর্কে বলা হইয়াছে:
وَعَلَّمْنَاهُ مِنْ لَدُنَّا عِلْمًا (٦٥ :١٨) "আমার নিকট হইতে তাহাকে শিক্ষা দিয়াছিলাম এক বিশেষ জ্ঞান" (১৮: ৬৫)।
আর ঘটনার শেষে বলা হইয়াছে:
وَمَا فَعَلْتُهُ عَنْ أَمْرِي (۸۳ : ۱۸) "আমি নিজ হইতে কিছু করি নাই" (১৮: ৮৩)।
ইহাতে বুঝা যায় যে, আল্লাহ তা'আলা খিফ্র (আ)-কে কোনও কোনও বিষয়ের মূল তত্ত্ব সম্পর্কে এমন জ্ঞান দান করিয়াছিলেন যাহা অতীন্দ্রিয় জগতের সহিত সম্পৃক্ত (সিউহারবী, কাসাস, ১খ, ৫৪৩)।
সূরা কাহ্ফ্-এর আয়াতগুলি তিলাওয়াত করিলে স্পষ্টরূপে বুঝা যায় যে, মূসা (আ) যেহেতু একজন উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন নবী ও রাসূল ছিলেন এবং শরীআতের জ্ঞান ও হুকুম-আহকামের প্রচার করা তাঁহার দায়িত্ব ছিল সেহেতু তিনি অতীন্দ্রিয় জগতের রহস্য প্রকাশকে সহ্য করিতে পারিতেছিলেন না। তাই সবর করার অঙ্গীকার করা সত্ত্বেও শরীআতের খেলাফ কোন কাজ দেখিয়া তিনি স্থির থাকিতে পারিতেছিলেন না; বরং খিফ্র (আ)-কে বারবার তিনি সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ করিয়া যাইতেছিলেন। এমনি করিয়া এক সময় উভয়ে পৃথক হইয়া গেলেন (প্রাগুক্ত)।
📄 খিয়র (আ)-এর পরিচয়
কুরআন কারীমে তাঁহার নামের উল্লেখ করা হয় নাই, বুখারী শরীফে তাঁহাকে খিফ্র (সঠিক উচ্চারণ 'খাদির') বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে। খিফ্র শব্দটি তাঁহার নাম না উপাধি—এই ব্যাপারে মুফাসসিরগণের মধ্যে মতভেদ রহিয়াছে। অধিকাংশের মতে খিফ্র তাঁহার উপাধি। তাঁহার প্রকৃত নাম সম্পর্কেও কয়েক ধরনের বর্ণনা পাওয়া যায়; যেমন বালয়া ইব্ন মালকান, ঈলিয়া ইব্ন মাল্ল্কান, খান, মা'মার, ইলয়াস, আল-য়াসা ইত্যাদি (কাসাসুল করআন, ১খ, ৫৪৪)।
খিফ্র শব্দের অর্থ সবুজ। তাঁহাকে খিফ্র কেন বলা হইয়াছে এই সম্পর্কে একাধিক বর্ণনা পাওয়া যায়। ইমাম বুখারী আবূ হুরায়রা (রা)-এর একটি রিওয়ায়াত বর্ণনা করিয়াছেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) বলেন: তাঁহাকে খিফ্র এইজন্য বলা হইত যে, একদা তিনি ঘাস-পাতাবিহীন শুষ্ক সাদা জায়গায় বসিয়াছিলেন। সেখান হইতে তিনি উঠিয়া যাওয়ার পরই হঠাৎ ঐ স্থানটি সবুজ হইয়া গেল (আল-বুখারী, আস-সাহীহ, কিতাবুল আম্বিয়া, বাব হাদীছিল খাদির মা'আ মূসা (আ), হাদীছ নং ৩১৫৫)।
এক বর্ণনামতে তিনি যেখানেই উপবেশন করিতেন সেই স্থানই সবুজ-শ্যামল হইয়া উঠিত। অপর এক বর্ণনামতে তিনি যখন সালাত আদায় করিতেন তখন সেই স্থান এবং উহার পার্শ্ববর্তী স্থান সমূহ সবুজের সমরোহে ভরিয়া উঠিত (ইসলামী বিশ্বকোষ, ১০খ, ৯৩)।
খিযির (আ) কি নবী ছিলেন, না রাসূল, না নেক বান্দা আল্লাহ্ ওয়ালী— এই ব্যাপারে কয়েকটি মত পাওয়া যায়। কাহারও মতে তিনি রাসূল ছিলেন; আর কাহারও মতে তিনি নেক বান্দা ওয়ালী ছিলেন। তবে জামহুর-এর মতে তিনি নবী ছিলেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ২৯৯)। তাফসীরকারদের অধিকাংশই তাঁহার নবী হওয়ার পক্ষে মত ব্যক্ত করিয়াছেন। ইব্ন আব্বাস (রা)-এর এক বর্ণনায় তিনি নবী ছিলেন, কিন্তু নূতন কিতাবের অধিকারী ছিলেন না (ইব্ন হাজার আল-আসকালানী, আল-ইসাবা, ১খ, ৪৩০)।
খিযির (আ) এখনও জীবিত আছেন না ইনতিকাল করিয়াছেন, এই ব্যাপারে দুইটি মত পাওয়া যায়। একদল আলিমের মতে অদ্যাবধি তিনি জীবিত আছেন। আর বিজ্ঞ আলিমদের মতে কুরআন কারীম ও সহীহ হাদীছের কোথাও তাঁহার এখনও বাঁচিয়া থাকার প্রমাণ নাই। সুতরাং তিনিও অন্যান্য লোকের ন্যায় স্বাভাবিকভাবে ইন্তিকাল করিয়াছেন (কাসাসুল কুরআন, ১খ, ৫৪৪)। কারণ কুরআন কারীমে সুস্পষ্টরূপে বর্ণিত হইয়াছে:
وَمَا جَعَلْنَا لِبَشَرٍ مِنْ قَبْلِكَ الْخُلْدَ (٣٤ : ٢١) "আমি তোমার পূর্বেও কোন মানুষকে অনন্ত জীবন দান করি নাই" (২১ঃ ৩৪)।
এতদ্ব্যতীত বুখারী ও মুসলিম-এর হাদীছে বর্ণিত হইয়াছে যে, আবদুল্লাহ ইবন উমার (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) একবার ইশার সালাত আদায় করার পর বলিলেন, অদ্য রাত্রে যাহারাই পৃথিবীর বুকে বর্তমান আছে এক শতাব্দী পর তাহাদের একজনও এই পৃথিবীর বুকে জীবিত থাকিবে না (আল-বুখারী, আস-সাহীহ, কিতাবুল ফাদাইল; কাসাসুল কুরআন, ১খ., ৫৪৬-৫৪৭)।
হাফিজ ইব্ন কায়্যিম দাবি করিয়াছেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) ও সাহাবায়ে কিরাম কাহারও নিকট হইতে এই ব্যাপারে একটিও সহীহ হাদীছ বর্ণিত নাই। তাই শায়খুল ইসলাম ইব্ন তায়মিয়া, ইব্ কায়্যিম, ইন্ন কাছীর, ইব্ন জাওযী, ইমাম বুখারী, কাদী আবূ ইয়ালা হাম্বালী, আবূ তাহির ইবনুল গুযারী, আলী ইব্ন মূসা আর-রিদা, আবুল ফাদল মুরায়সী, আবু তাহির ইবনুল-ইবাদী, আবুল ফাদল ইব্ন নাসির, কাযী আবূ বাকর ইবনুল-আরাবী, আবূ বাকর মুহাম্মাদ ইবনুল-হাসান প্রমুখ মুহাদ্দিছ ও মুফাসসির তাহার মৃত্যুর পক্ষেই মত প্রকাশ করিয়াছেন, (কাসাসুল-কুরআন, ১খ, ৫৪৭)।