📄 বানু ইসরাঈলের উপর তূর পর্বত উত্তোলন
বানু ইসরাঈলের উক্ত সত্তর ব্যক্তি নিজ সম্প্রদায়ের নিকট ফিরিয়া আসিয়া সকল ঘটনা বিবৃত করিল এবং সাক্ষ্য দিল যে, মূসা (আ) যাহা আনয়ন করিয়াছেন উহা আল্লাহ্রই কিতাব তাওরাত এবং আমাদের জন্য পালনীয় বিধান। কিন্তু তাহারা ইহাকে সত্য বলিয়া জানা সত্ত্বেও তাওরাতের বিধান পালন করা কষ্টসাধ্য মনে করিল এবং উহার উপর আমল করিতে অস্বীকার করিল। তখন আল্লাহ তাআলার নির্দেশে জিবরাঈল (আ) বানু ইসরাঈলের সমুদয় লোককে ঢাকিয়া ফেলিতে পারে, তূর পর্বতের এমন বিশাল একটি অংশ তাহাদের উপর তুলিয়া ধরিলেন। উহা দৈর্ঘ্য ও প্রস্থে ছিল এক ফারসাখ। এক বর্ণনামতে জিবরাঈল (আ) উহা ফিলিস্তীন হইতে আনিয়া তাহাদের মাথা হইতে একজন মানুষের সমান উঁচুতে ধরিলেন। তাহাদের সম্মুখে অগ্নি ও পিছনে সমুদ্র হাজির করা হইল এবং আল্লাহ বলিলেন, আমি যাহা দিলাম দৃঢ়তার সহিত তাহা গ্রহণ কর এবং তাহাতে যাহা আছে তাহা স্মরণ রাখ, যাহাতে তোমরা সাবধান হইয়া চলিতে পার (২ঃ ৬৩; তু. ৭: ১৭১)। অন্যত্র বর্ণিত হইয়াছে, আল্লাহ বলিলেন, আমি যাহা দিলাম তাহা দৃঢ়রূপে গ্রহণ কর এবং শ্রবণ কর (২ঃ ৯৩)। তোমরা যদি ইহা কবুল কর এবং তোমাদের যাহা নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে তাহা পালন কর তো ভাল, নতুবা এই পর্বত দ্বারা তোমাদিগকে পিষ্ট করা হইবে, এই সমুদ্রে তোমাদিগকে ডুবাইয়া মারা হইবে এবং এই অগ্নি দ্বারা তোমাদিগকে দগ্ধীভূত করা হইবে।
তাহারা যখন দেখিল যে, পলায়নের আর কোন পথ নাই তখন তাহারা উহা গ্রহণ করিল। এক বর্ণনামতে তাহারা মুখে বলিল, আমরা শ্রবণ করিলাম কিন্তু মনে মনে বলিল, 'অমান্য করিলাম' (ইফাবা প্রণীত আল-কুরআনুল করীম-এর ৬৯ নং টীকা, ২ : ৯৩ আয়াত দ্র.)। অতঃপর তাহারা মুখমণ্ডলের এক দিক দিয়া সিজদা করিল। সিজদারত অবস্থায়ই তাহারা মুখমণ্ডলের অপর দিক দিয়া পর্বতের দিকে তাঁকাইয়া দেখিতে লাগিল পাছে উহা আবার তাহাদিগকে পিষ্ট করিয়া ফেলে কিনা। তাহারা মনে করিয়াছিল যে, উহা তাহাদের উপর পড়িয়া যাইবে (৭ : ১৭১)। অতঃপর ইহাই বানু ইসরাঈলদের সিজদার পদ্ধতি হইয়া দাঁড়ায় যে, তাহারা মুখমণ্ডলের এক পার্শ্ব দিয়া সিজদা করে (আল-কামিল, ১খ, ১৪৭-১৪৮)। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, কয়েক দিন যাইতে না যাইতেই তাহাদের মজ্জাগত স্বভাববশে এই অঙ্গীকারও তাহারা ভঙ্গ করিল (দ্র. ২ : ৬৪)।
বাইবেলে পর্বত উত্তোলনের কথা উল্লেখ নাই, বরং বলা হইয়াছে যে, উহা কাঁপিতেছিলঃ "তাহা (পর্বত) হইতে ধূম উঠিতে লাগিল এবং পর্বত অতিশয় কাঁপিতে লাগিল" (যাত্রাপুস্তক, ১৯ : ১৮)।
কোনও কোনও তাফসীরকার পর্বত উত্তোলনের বিষয়টি এড়াইয়া গিয়া উহার কষ্ট-কল্পিত ব্যাখ্যা প্রদান করিয়াছেন। মাওলানা আবুল কালাম আযাদও তাঁহার তাফসীর গ্রন্থ তারজুমানুল কুরআন-এ উল্লেখ করিয়াছেন যে, পর্বত উত্তোলন করা হয় নাই, বরং ভূমিকম্পের ফলে উহা এমন প্রবলভাবে কম্পিত হইতেছিল যে, মনে হইতে লাগিল উহা তাহাদের উপর পড়িয়া যাইবে (আম্বিয়া-ই কুরআন, ২খ, ২৩১)। কিন্তু কুরআন কারীমের সুস্পষ্ট বর্ণনায় প্রতীয়মান হয় যে, এই ধরনের ব্যাখ্যা উহার সহিত সঙ্গতিপূর্ণ নহে।
📄 পবিত্র ভূমি ফিলিস্তিনে প্রবেশ ও জিহাদের নির্দেশ
সীনাইর যে ময়দানে বানু ইসরাঈল অবস্থান করিতেছিল তাহা ছিল ফিলিস্তীনের নিকটবর্তী। হযরত ইবরাহীম (আ) তাঁহার বাপ-দাদার দেশ বাবিল হইতে হিজরত করিয়া ফিলিস্তীন আগমন করিয়াছিলেন। বাইবেলে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তাআলা তাঁহার সহিত অঙ্গীকার করিয়াছিলেন যে, এই রাজত্ব তাঁহাকে ও তাঁহার বংশধরকে দান করিবেন। অতঃপর হযরত ইসহাক (আ) ও হযরত ইয়া'কূব (আ)-এর সহিতও উক্ত অঙ্গীকার করা হয়। হযরত ইউসুফ (আ)-এর সময় হইতেই বানু ইসরাঈল মিসরে বসবাস শুরু করে। বাইবেলের বর্ণনানুযায়ী তাহারা ৪৩০ বৎসর সেখানে বসবাস করিবার পর মূসা (আ)-এর নেতৃত্বে মিসর ত্যাগ করত লোহিত সাগর পার হইয়া সীনাই ময়দানে উপনীত হয়। এখন আল্লাহ তাআলার অঙ্গীকার বাস্তবায়নের সময় আসিয়া গেল। সেই সময় বৃহত্তর শামে আমালিকাদের রাজত্ব ছিল। তাই উক্ত শামেরই একটি অংশ ফিলিস্তীন তখন হায়ছানী, ফাযারী ও কিনআনী প্রভৃতি উপগোত্রের স্বৈরাচারী ও অহঙ্কারী লোকজনের অধিকারে ছিল। তাহারা ছিল খুবই শক্তিশালী। আল্লাহ তাআলা মূসা (আ)-এর মাধ্যমে বানু ইসরাঈলকে হুকুম দিলেন তোমরা জিহাদ করিয়া সেখানকার স্বৈরাচারী ও অত্যাচারী সম্প্রদায়কে বিতাড়ন করত সেখানে সত্য ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা কর এবং সেখানে নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন জীবন যাপন কর। উক্ত ভূমির মালিক তোমরা। আল্লাহ তাআলা অঙ্গীকার করেন যে, বিজয় তোমাদেরই হইবে আর স্বৈরাচারী ও অত্যাচারী শত্রুগণ পরাজিত হইবে।
হযরত মূসা (আ) বানু ইসরাঈলকে উক্ত পবিত্র ভূমিতে প্রবেশ করার জন্য উদ্বুদ্ধ করার পূর্বেই নেতৃস্থানীয় ১২ ব্যক্তিকে সেখানকার অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য প্রেরণ করিলেন। তাহারা ফিলিস্তীনের নিকটবর্তী শহর 'আরীহায়' প্রবেশ করেন এবং সেখানকার সকল অবস্থা খুব তীক্ষ্ণভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। ফিরিয়া আসিয়া তাহারা মূসা (আ)-কে বলিলেন, তাহারা বিরাট বিরাট দেহধারী এবং খুবই শক্তিশালী। মূসা (আ) বলিলেন, আমার সহিত যেরূপ বলিয়াছ সম্প্রদায়ের আর কাহারও সহিত সেরূপ বলিও না। কারণ দীর্ঘ কয়েক শতাব্দীর গোলামীর ফলে তাহাদের শক্তি-সাহস রহিত হইয়া গিয়াছে এবং কাপুরুষতা স্থান করিয়া লইয়াছে। কিন্তু ইহারাও তো ছিল বনূ ইসরাঈলেরই লোক। দুইজন ব্যতীত ইহাদের কেহ মূসা (আ)-এর কথা মান্য করিল না; বরং চুপি চুপি আরও ফুলাইয়া ফাঁপাইয়া শত্রুদের বীরত্ব ও শক্তিমত্তার কথা স্বীয় সম্প্রদায়ের লোকজনের নিকট প্রকাশ করিল। যে দুইজন লোক মূসা (আ)-এর নির্দেশ মান্য করিয়াছিলেন তাঁহারা হইলেন ইউশা ইব্ নূন ও কালিব ইব্ন ইউফান্না। তাঁহারা এমন কোন কথা বলিলেন না যাহাতে সম্প্রদায়ের মধ্যে ত্রাস ও ভীতির সঞ্চার হয়।
অতঃপর বানু ইসরাঈলের কাছে সেই খবর প্রকাশিত হওয়ার পর তাহারা নিরাশ ও হতবিহ্বল হইয়া গেল, এমনকি আবার মিসরে ফিরিয়া যাওয়ার উদ্যোগ নিল। তাই মূসা (আ) যখন তাহাদেরকে যুদ্ধে আহবান করিলেন, তখন তাহারা সেই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করিতে অপারগতা প্রকাশ করিল। এই বিষয়টি আল-কুরআনেও নিম্নোক্তভাবে আসিয়াছে:
يُقَوْمِ ادْخُلُوا الْأَرْضَ الْمُقَدَّسَةَ الَّتِي كَتَبَ اللهُ لَكُمْ وَلَا تَرْتَدُّوا عَلَى أَدْبَارِكُمْ فَتَنْقَلِبُوا خَسِرِينَ قَالُوا يُمُوسَى إِنَّ فِيهَا قَوْمًا جَبَّارِيْنَ وَإِنَّا لَنْ نَدْخُلَهَا حَتَّى يَخْرُجُوا مِنْهَا فَإِنْ يَخْرُجُوا مِنْهَا فَإِنَّا دُخِلُوْنَ .
"হে আমার সম্প্রদায়! আল্লাহ তোমাদের জন্য যে পবিত্র ভূমি নির্দিষ্ট করিয়াছেন, তাহাতে তোমরা প্রবেশ কর এবং পশ্চাদপসরণ করিও না, করিলে তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত হইবে। তাহারা বলিল, হে মূসা। সেইখানে এক দুর্দান্ত সম্প্রদায় রহিয়াছে এবং তাহারা সেই স্থান হইতে বাহির না হওয়া পর্যন্ত আমরা কখনও সেইখানে প্রবেশ করিব না, তাহারা সেই স্থান হইতে বাহির হইয়া গেলেই আমরা প্রবশ করিব" (৫: ২১-২২)।
অনন্তর ইসরাঈলী শিবিরে প্রচণ্ড সংকট অবস্থার সৃষ্টি হয়। তাহারা বলিতে লাগিল, মূসা আমাদেরকে মিসর হইতে বাহির করিয়া আনিয়া দুর্ধর্ষ জাতির তলোয়ার দ্বারা আমাদের হত্যা করিবার ফন্দী করিয়াছেন। আর এইভাবে হযরত মূসা (আ) বিপাকে পড়িয়া যান। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে দুই ব্যক্তি বানু ইসরাঈলকে শান্ত করিবার জন্য আগাইয়া আসেন। তাঁহারা হইলেন হযরত ইউশা' ইব্ন নূন (আ) ও কালিব ইব্ন ইয়ুফান্না। তাহারা উভয়ে বানু ইসরাঈলকে যুদ্ধে উৎসাহ প্রদান এবং তাহাদের মনোবল ফিরাইয়া আনিবার চেষ্টা করিতে লাগিলেন। আল- কুরআনের ভাষায়:
قَالَ رَجُلَنِ مِنَ الَّذِينَ يَخَا فُوْنَ أَنْعَمَ اللهُ عَلَيْهِمَا ادْخُلُوا الْبَابَ فَإِذَا دَخَلْتُمُوهُ فَإِنَّكُمْ غُلِبُونَ وَعَلَى اللَّهِ فَتَوَكَّلُوا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ .
"যাহারা ভয় করিতেছিল তাহাদের মধ্যে দুইজন, যাহাদের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ করিয়াছিলেন, বলিল, তোমরা তাহাদের মোকাবিলা করিয়া (নগর) দ্বারে প্রবেশ কর, প্রবেশ করিলেই জয়ী হইবে। আল্লাহর উপরই নির্ভর কর যদি তোমরা মুমিন হও” (৫ঃ ২৩)।
এই বিষয়টি বাইবেলে বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হইয়াছে (দ্র. গণনাপুস্তক, ১৩: ৩০-৩৩): "পরে সমস্ত মণ্ডলী উচ্চৈস্বরে কলরব করিল এবং লোকেরা সেই রাত্রিতে রোদন করিল। আর ইস্রায়েল সন্তানগণ সকলে মোশির বিপরীতে ও হারোনের বিপরীতে বচসা করিল ও সমস্ত মণ্ডলী তাহাদিগকে কহিল, হায় হায়, আমরা কেন মিসর দেশে মরি নাই, এই প্রান্তরেই বা কেন মরি নাই? সদাপ্রভু আমাদিগকে খড়গধারে নিপাত করাইতে এই দেশে কেন আনিলেন? আমাদের স্ত্রী ও বালকগণ ত লুটিত হইবে। মিশরে ফিরিয়া যাওয়া কি আমাদের ভাল নয়? পরে তাহারা পরস্পর বলাবলি করিল। আইস, আমরা একজনকে সেনাপতি করিয়া মিসরে ফিরিয়া যাই। তাহাতে মোশি ও হারোন ইসরাঈল-সন্তানগণের মণ্ডলীর সমস্ত সমাজের সম্মুখে উবুড় হইয়া পড়িলেন। আর যাঁহারা দেশ নিরীক্ষণ করিয়া আসিয়াছিলেন, তাঁহাদের মধ্যে নূনের পুত্র যিহোশূয় ও যিফুন্নীর পুত্র কালেব আপন আপন বস্ত্র চিরিলেন এবং ইসরাঈল-সন্তানগণের সমস্ত মণ্ডলীকে কহিলেন, আমরা যে দেশ নিরীক্ষণ করিতে গিয়াছিলাম সে যারপর নাই উত্তম দেশ। সদাপ্রভু যদি আমাদিগেতে প্রীত হন তবে তিনি আমাদিগকে সেই দেশে প্রবেশ করাইবেন ও সেই দুগ্ধ-মধু প্রবাহী দেশ আমাদিগকে দিবেন। কিন্তু তোমরা কোনমতে সদাপ্রভুর বিদ্রোহী হইও না, ও সে দেশের লোকদিগকে ভয় করিও না। কেননা তাহারা আমাদের ভক্ষ্যস্বরূপ, তাহাদের আশ্রয়-ছত্র তাহাদের উপর হইতে নীত হইল, সদাপ্রভু আমাদের সহর্বত্তী, তাহাদিগকে ভয় করিও না" (গণনাপুস্তক ১৪: ১-৯)।
আল-কুরাআন ও বাইবেলের উপরিউক্ত বর্ণনায় দেখা যায় যে, তিনি মূসা (আ)-এর বিশ্বস্ত সহচর ও দুঃসাহসী ঈমানদার সেনাপতি ছিলেন। আল্লাহ পাকের ইচ্ছা ও বিধান হইল শক্তিশালী ঈমানদারগণের মাধ্যমেই তাঁহার দীন বিজয়ী হয়। তাই দুইজন ব্যতীত ইসরাঈলীগণ কাপুরুষতা ও হীনমন্যতা প্রদর্শন করিল। ঐ দুইজন ব্যতীত অন্য সকলের মৃত্যুর পরই সেই পবিত্র ভূমিতে প্রবেশের ব্যবস্থা হয়। আর সেই দুইজনের মধ্যে একজন ছিলেন হযরত ইউশা' ইব্ন নূন (দ্র. গণনাপুস্তক ৩২: ১১-১২)।
হযরত মূসা (আ)-এর যখন অন্তim সময় ঘনাইয়া আসে তখন মূসা (আ) দু'আয় আল্লাহ আধ্যাত্মিক, শারীরিক ও মানসিক শক্তিতে বলীয়ান হযরত ইউশা' ইব্ন নূন (আ)-কে মূসা (আ)-এর প্রতিনিধি নিয়োগের নির্দেশ দেন। এইভাবে হযরত ইউশা' (আ) হযরত মূসা (আ)-এর প্রতিনিধি হিসাবে বানু ইসরাঈলের সার্বজনীন নেতা মনোনীত হন।
📄 গাভী যবাহ্-এর ঘটনা
ইব্ন আব্বাস (রা), উবায়দা আস-সালমানী, আবুল আলিয়া, মুজাহিদ, সুদ্দী প্রমুখ বর্ণনা করেন যে, বানু ইসরাঈলের মধ্যে এক ধনাঢ্য বৃদ্ধ লোক ছিল, যাহার নাম ছিল আমীল। তিনি ছিলেন নিঃসন্তান। তাহার কয়েকজন ভ্রাতুষ্পুত্র ছিল। তাহারা বৃদ্ধের মৃত্যু কামনা করিত যাহাতে মৃত্যুর পর তাহারা তাহার সম্পদের মালিক হইতে পারে। এই উদ্দেশ্যে তাহাদের একজন রাত্রে বৃদ্ধকে হত্যা করিয়া রাস্তার সংযোগস্থলে, মতান্তরে অন্য এক লোকের ঘরের দরজায় ফেলিয়া রাখে। সকাল বেলা লোকজন তাঁহাকে লইয়া বিতর্ক করিতে থাকে'। ইতোমধ্যে তাহার ভ্রাতুষ্পুত্র আগমন করে। সে চীৎকার করিয়া উক্ত জুলুমের প্রতিকার দাবি করিতে থাকে। তাহারা বলিল, তোমরা আল্লাহ্ নবীর নিকট গমন কর না কেন!
অতঃপর মৃতের ভ্রাতুষ্পুত্র আল্লাহর নবী মূসা (আ)-এর নিকট গমন করত স্বীয় চাচার হত্যার অভিযোগ দায়ের করিল। মূসা (আ) বলিলেন, আল্লাহ্র কসম দিয়া বলিতেছি, তোমাদের মধ্যে কাহারও এই মৃতের ব্যপারটি জানা থাকিলে আমাকে জানাও। সবাই চুপ রহিল, কাহারও বিষয়টি জানা ছিল না। তাহারা এই বিষয়ে আল্লাহ্র নিকট জিজ্ঞাসা করিবার আবেদন জানাইল। অতঃপর মূসা (আ) এই বিষয়ে আল্লাহর নিকট জানিতে চহিলেন। তখন আল্লাহ তাআলা তাহাদিগকে একটি গাভী যবাহ-এর নির্দেশ দিলেন। মূসা (আ) তাহাদিগকে এই কথা জানাইলে তাহারা বলিল, আপনি কি আমাদের সহিত ঠাট্টা করিতেছেন? আমরা মৃতের অবস্থা জানিতে চাহিতেছি, আর আপনি গাভী যবাহ-এর কথা বলিতেছেন! মূসা (আ) উত্তর দিলেন, আমি মূর্খদের অন্তর্ভুক্ত হইব এই ব্যাপারে আমি আল্লাহ্র নিকট পানাহ চাহিতেছি। কারণ বিদ্রূপ করা তো মূর্খদের কাজ।
ইবন আব্বাস (রা), উবায়দা, মুজাহিদ, আবুল আলিয়া, ইকরিমা, সুদ্দী প্রমুখের বর্ণনামতে বানু ইসরাঈল যদি বারংবার জিজ্ঞাসাবাদ না করিয়া প্রথমবারই যে কোনও গাভী যবাহ করিত তবে তাহাই তাহাদের উদ্দেশ্য সাধনের জন্য যথেষ্ট হইত। কিন্তু তাহারা একে একে জিজ্ঞাসা করিয়া বিষয়টি নিজেদের জন্য জটিল করিয়া ফেলে। প্রথমত তাহারা ইহার বর্ণনা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে যে, তাহা কেমন? তাহাদিগকে বলা হয়, উহা খুব বয়স্কও নহে আবার একবারে অল্পবয়স্কও নহে, এতদুভয়ের মধ্যম ধরনের। অতঃপর তাহারা উহার রং সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে যে, উহা কি রং-এর গাভী? উত্তরে বলা হয় যে, উহা হলুদ বর্ণের গরু, উহার রং উজ্জ্বল গাঢ় যাহা দেখিবামাত্র দর্শকদের চক্ষু জুড়াইয়া যায়। অতঃপর তাহারা বিষয়টি আরো জটিল বানাইয়া ফেলে। আবারও জিজ্ঞাসা করে যে, তুমি তোমার প্রতিপালকের নিকট জিজ্ঞাসা কর যে, তাহা কী ধরনের? কারণ একই রকমের গাভী অনেক আছে। তখন নির্দেশ দেওয়া হইল, উহা কোনও চাষাবাদ বা পানি সেচে ব্যবহার করা হয় নাই, যাহাতে কোনও খুঁত নাই। তাহারা বলিল, এইবার তুমি সঠিক বিবরণ আনিয়াছ।
এক বর্ণনামতে তাহারা এতগুলি শর্তে আবদ্ধ গাভী কোথাও পাইল না, কেবল এক ব্যক্তির নিকট পাওয়া গেল, যে তাহার পিতার মতান্তরে মাতার খুবই খেদমত করিত। তাহারা তাহার নিকট উক্ত গাভীটি চাহিল। লোকটি উহা দিতে অস্বীকার করিল। সুদ্দীর বর্ণনামতে তাহারা উহার সমপরিমাণ স্বর্ণ দিতে চাহিল; কিন্তু ইহাতেও সে অস্বীকার করিল। অতঃপর তাহারা উহার দশগুণ স্বর্ণ দিল। অতঃপর লোকটি উক্ত মূল্যে গাভীটি তাহাদের নিকট বিক্রয় করিল। অপর এক বর্ণনামতে উহার চামড়ায় যে পরিমাণ স্বর্ণ ধরে তাহার বিনিময়ে।
মূসা (আ) গাভীটি যবাহ করার নির্দেশ দিলেন। তাহারা দ্বিধা-দ্বন্দু ও সংশয়ে ভুগিতেছিল। অবশেষে সমস্ত সংশয় কাটাইয়া তাহারা উহা যবাহ করিল। আল্লাহ্র নির্দেশ অনুসারে মূসা (আ) তাহাদিগকে নির্দেশ দিলেন যে, গাভীটির একটি অংশ মৃত ব্যক্তির উপর নিক্ষেপ কর। এক বর্ণনামতে রানের গোশত, অপর বর্ণনামতে গলনালীর সহিত মিলিত হাড্ডির গোশত, ভিন্নমতে উভয় কাঁধের মধ্যখানের অংশ। নির্দেশ মত তাহারা যখন উহা মৃত ব্যক্তির শরীরে নিক্ষেপ করিল তখন আল্লাহ তাআলা লোকটিকে জীবিত করিয়া দিলেন। সে উঠিয়া দাঁড়াইল। তাহার ক্ষতস্থান হইতে রক্ত ঝরিতেছিল। মূসা (আ) তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমাকে কে হত্যা করিয়াছে? সে জওয়াব দিল : আমার ভ্রাতুষ্পুত্র আমাকে হত্যা করিয়াছে। ইহা বলিয়াই আবার সে পূর্বের ন্যায় মৃত হইয়া গেল (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ২৯৩-২৯৫; আল-কুরআনুল কারীম, ২ঃ ৬৭-৭৩ নং আয়াত দ্র.)।
📄 হযরত মূসা ও কারূন
কারুনের ঘটনা কুরআন মজীদ ও বাইবেলে বর্ণিত হইয়াছে। বাইবেলে তাহার নাম 'কারাহ' বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে। তবে উভয় গ্রন্থে বর্ণিত ঘটনার ধরন কিছুটা ভিন্ন। অবশ্য তাহার শাস্তি বর্ণনায় উভয় গ্রন্থের বক্তব্য এক। কারূন ছিল বানু ইসরাঈলের এক ধনাঢ্য ব্যক্তি। ইব্ন আব্বাস (রা), ইবরাহীম নাখঈ, আবদুল্লাহ ইবনুল-হারিছ ইব্ন নাওফাল, সিমাক ইব্ন হারব, কাতাদা, মালিক ইব্ দীনার, ইন্ন জুরায়জ প্রমুখের মতে সে ছিল মূসা (আ)-এর চাচাতো ভাই। ইব্ন ইসহাক তাহাকে মূসা (আ)-এর চাচা বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন, ইহা ঠিক নহে। আলিমগণ ইহা প্রত্যাখ্যান করিয়াছেন। তাহার বংশলতিকা এইভাবে বর্ণনা করা হইয়াছে: কারূন ইব্ন ইয়াস্হার ইব্ন কাহাছ ইব্ন লাবী ইব্ন ইয়াকূব (আ)। উল্লেখ্য, কারূন-এর দাদা কাহাছ ছিলেন মূসা (আ)-এরও দাদা।
কারুনের বংশের একটি ছক নিম্নরূপঃ ইয়া'কূব (আ) লাবী খায়র সূন কাহাছ মারারী শামঈ লাবনী ইয্যীল জারুন ইসহার ইমরান মূশী মাহান্ত্রী জিকরা নাকজ কারুন হারুন (আ) মূসা (আ) আবয়াসাফ আলকানিয়্যা আসীর (দ্র. আম্বিয়া-ই কুরআন, ২খ. ২৫২-৩)।
বাইবেলের বর্ণনামতে হারুন (আ) ছিলেন কারূন-এর ভগ্নীপতি। মুফাসসিরগণের বর্ণনামতে কারূন ছিল মূসা ও হারুন (আ)-এর পরে তাওরাতের বড় বিশেষজ্ঞ। সে ছিল সুদর্শন ও সুকণ্ঠের অধিকারী। ফিরআওনের সহচর ও অন্যতম পারিষদ। অত্যাচারী বাদশাহগণ যেমন কিছু তোষামোদকারী ও বশংবদ-এর সহায়তায় সাধারণ জনগণের উপর শাসন ও শোষণের স্টীমরোলার চালায়, কারূন ছিল ফিরআওনের তেমন একজন তোষামোদকারী বশংবদ। ফিরআওনের সহায়তা ও পৃষ্ঠপোষকতায় সে গড়িয়া তুলিয়াছিল বিশাল ধনভাণ্ডার। কুরআন কারীমে তাহার ধনরত্ন ও বিত্ত-বৈভবের বর্ণনা প্রসঙ্গে বলা হইয়াছে :
وَأَتَيْنَاهُ مِنَ الكُنُوزِ مَا إِنَّ مَفَاتِحَهُ لَتَنُوهُ بِالْعُصْبَةِ أُولِي القُوَّةِ (٧٦ : ۲۸) "আমি তাহাকে দান করিয়াছিলাম এমন ধনভাণ্ডার যাহার চাবিগুলি বহন করা একদল বলবান লোকের পক্ষেও কষ্টসাধ্য ছিল" (২৮: ৭৬)।
কোন কোন মুফাসসির বলেন, তাহার চাবিগুলি ছিল চামড়ার, ৬০ (ষাট)-টি খচ্চর উহা বহন করিত (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ৩০৯)।
তবে সে ছিল বড়ই কৃপণ। এই ধন-সম্পদ তাহাকে উদ্ধত ও অহংকারী করিয়াছিল। ধন-সম্পদ ও প্রাচুর্যের মোহে সে এতই বিভোর ছিল যে, স্বীয় বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন ও নিজ সম্প্রদায়ের লোকজনকেও নীচ ও হেয় জ্ঞান করিত।
ফিরআওন-এর সলিল সমাধি হওয়ার পর তাহার আয়-রোযগারের পথ কিছুটা বন্ধ হইয়া যায়।। সম্মান-প্রতিপত্তিও কমিয়া যায়। এই কারণে সে বাহ্যিকভাবে ঈমান আনিলেও অন্তরে মূসা (আ)-এর প্রতি চরম বিদ্বেষ ও শত্রুতা পোষণ করিত। সামিরীর ন্যায় সেও ছিল মুনাফিক। তাহার মনঃপীড়ার আরো একটি কারণ এই ছিল যে, তাহারই চাচাতো ভাই মূসা ও হারুন (আ) আল্লাহ্ নবী এবং গোটা সম্প্রদায়ের নেতা। আর সে কোনও বিশেষ সম্মানের অধিকারী তো নয়ই, গণনার মধ্যেও তাহাকে আনা হয় না, অথচ সে এত এত বিত্তশালী (আম্বিয়া-ই কুরআন, ২খ, ২৫৩-৫৪)।
মূসা (আ) ও তাঁহার সম্প্রদায় একদা তাহাকে নসীহত করিলেন যে, আল্লাহ তোমাকে অঢেল সম্পদ ও সম্মান-প্রতিপত্তি দান করিয়াছেন। ইহার শোকর আদায় কর এবং সম্পদের হক যাকাত-সাদাকা দিয়া গরীব-মিসকীনদিগকে সাহায্য কর। আল্লাহকে ভুলিয়া যাওয়া এবং তাঁহার হুকুমের বিরোধিতা করা চরম অকৃতজ্ঞতা ও অবাধ্যতা। তাঁহার প্রদত্ত ঐশ্বর্যের দাবি ইহা নহে যে, তুমি দরিদ্র ও দুর্বলদিগকে নীচ জ্ঞান করিবে।
আত্মম্ভরিতায় বিভোর কারূনের নিকট মূসা (আ)-এর এই নসীহত ভাল লাগিল না। সে অহঙ্কারবশে বলিল, মূসা! আমার এই ধন-সম্পদ তোমার আল্লাহ্ দেওয়া নহে, ইহা তো আমি আমার জ্ঞান-বুদ্ধি ও অভিজ্ঞতার দ্বারা অর্জন করিয়াছি। আমি তোমার উপদেশ মান্য করিয়া স্বীয় সম্পদকে এইভাবে ধ্বংস করিতে পারি না। কিন্তু মূসা (আ) বরাবর তাহাকে দাওয়াত দিতেই থাকিলেন। কারন যখন দেখিল মূসা (আ) কিছুতেই তাহার পিছু ছাড়িতেছেন না তখন সে মূসা (আ)-কে বিরক্ত করা ও তাক লাগাইয়া দেওয়ার জন্য এবং নিজের সম্পদের গৌরব দেখাইবার জন্য বড়ই জাঁকজমক ও আড়ম্বরের সহিত বাহির হইল। মূসা (আ) তখন বনী ইস্রাঈলের এক সমাবেশে আল্লাহ্র নির্দেশাবলী শুনাইতেছিলেন। কারূন বিশেষ একটি দল সমভিব্যাহারে জাঁকজমক ও সাজসজ্জা সহকারে উক্ত সমাবেশের পাশ দিয়া যাইতেছিল। তাহার উদ্দেশ্য ছিল, মূসা তাঁহার দাওয়াত ও তাবলীগের এই ধারা যদি চালু রাখেন তবে আমারও বিরাট একটি দল রহিয়াছে, ধনভাণ্ডার রহিয়াছে; উহা দ্বারা মূসাকে পরাস্ত করিষ।
বনী ইসরাঈল যখন কারুনের এই দুনিয়াবী শান-শওকত ও বিত্ত-বৈভব দেখিল, তখন কিছু লোকের অন্তরে উহার প্রভাব পড়িল। তাহারা আক্ষেপ করিয়া বলিতে লাগিল, হায়! কারনকে যে বিত্ত-বৈভব ও শান-শওকত দেওয়া হইয়াছে, আমাদিগকেও যদি তাহা দেওয়া হইত! কিন্তু তাহাদের মধ্যে আলিম ও দূরদর্শী ব্যক্তিগণ বলিলেন, সাবধান! এই দুনিয়াবী শান-শওকতের প্রতি আকৃষ্ট হইও না এবং উহার লালসা করিও না। অতি সত্বর তোমরা দেখিতে পাইবে এই ধন সম্পদের পরিণতি কি হয়। যাহারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে তাহাদের কাছে ইহার কোনই গুরুত্ব নাই; বরং আল্লাহ্ পুরস্কারই শ্রেষ্ঠ। অবশেষে কারূন যখন বেশী বেশী দম্ভ ও অহংকার করিতে লাগিল এবং মূসা ও বনী ইসরাঈলকে ঘৃণার দৃষ্টিতে দেখিতে লাগিল তখন আল্লাহ তাহার প্রতিশোধ লইলেন এবং কারুন, তাহার প্রাসাদ ও তাহার সকল সম্পদ মাটিতে ধ্বসাইয়া দিলেন। ইহা দেখিয়া পূর্ব দিন যাহারা তাহার মত সম্পদ ও প্রতিপত্তিশালী হইবার কামনা করিয়াছিল তাহারা বলিতে লাগিল, দেখিলে তো! আল্লাহ তাহার বান্দাদের মধ্যে যাহার জন্য ইচ্ছা তাহার রিযিক বর্ধিত করেন এবং যাহার জন্য ইচ্ছা উহা হ্রাস করেন। যদি আল্লাহ আমাদের প্রতি সদয় না হইতেন তবে আমাদিগকেও তিনি ভূগর্ভে ধ্বসাইয়া দিতেন (দ্র. ২৮: ৭৬-৮২; কাসাসুল কুরআন, ১খ, ৫২৮-৫৩০)।
কারূন-এর সম্পদ ও প্রাসাদসহ ভূগর্ভে ধ্বসিয়া যাওয়া সম্পর্কে আরো দুই ধরনের বর্ণনা পাওয়া যায়: ইব্ন আব্বাস (রা) ও সুদ্দী হইতে বর্ণিত যে, কারূন এক দুশ্চরিত্রা নারীকে অর্থকড়ি দিয়াছিল এইজন্য যে, মূসা (আ) যখন সমাবেশে ওয়াজ-নসীহত করিবেন তখন সে তাহার সহিত ব্যভিচারের অপবাদ দিবে। ষড়যন্ত্র মত সেই নারী মূসা (আ)-এর সমাবেশে গিয়া বলিল, তুমি আমার সহিত এইরূপ এইরূপ করিয়াছ। তখন মূসা (আ) হতচকিত হইয়া গেলেন। তিনি দুই রাকআত সালাত আদায় করিলেন। অতঃপর সেই নারীকে কসম করিতে বলিলেন এবং সে কেন এইরূপ বলিতেছিল তাহাও জিজ্ঞাসা করিলেন। মূসা (আ)-এর ঈমানী জযবায় সে সত্য কথা প্রকাশ করিয়া দিল। বলিল, কারুনই তাহাকে এই কথা বলিতে প্ররোচিত করিয়াছে এবং অর্থকড়ি দিয়াছে। অতঃপর মূসা (আ)-এর ঈমানী আভায় প্রভাবিত ও আলোকিত হইয়া গেল তাহার হৃদয়; সে আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করিল এবং তওবা করিল। তখন মূসা (আ) সিজদায় পড়িয়া গেলেন এবং আল্লাহ্র নিকট কারুনের জন্য বদদু'আ করিলেন। আল্লাহ তাঁহার নিকট ওহী প্রেরণ করিলেন যে, আমি যমীনকে তোমার আনুগত্য করার নির্দেশ দিয়াছি। অতঃপর কারূনকে তাহার প্রাসাদসহ ধ্বসাইয়া ফেলিতে মূসা (আ) নির্দেশ দিলেন। যমীন তখন তাহাকে ও তাহার প্রাসাদকে গ্রাস করিয়া ফেলিল (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ৩১০; আত-তাফসীরুল মাজহারী, ৭খ, ১৮৪-১৮৫)।
এক বর্ণনামতে কারূন যখন সাজসজ্জা ও জাঁকজমক সহকারে মূসা (আ)-এর মজলিসের নিকট দিয়া যাইতেছিল তখন অনেকেরই মনোযোগ তাহার দিকে আকৃষ্ট হইয়াছিল এবং তাহারা তাঁহার দিকে ফিরিয়া তাঁকাইতেছিল। মূসা (আ) তাহাকে ডাকিয়া বলিলেন, তুমি কেন এইরূপ করিয়াছ? সে বলিল, মুসা! তুমি নবুওয়াতের দিক দিয়া আমা হইতে শ্রেষ্ঠ, আর আমি সম্পদের দিক দিয়া তোমা হইতে শ্রেষ্ঠ। তুমি ইচ্ছা করিলে বাহিরে আসিয়া আমার উপর বদদু'আ করিতে পার, আর আমিও তোমার উপর বদdu'আ করিব। অতঃপর মূসা (আ) বাহিরে আসিলেন; কারূনও তাহার সম্প্রদায়ের নিকট গেল। মূসা (আ) তাহাকে বলিলেন, তুমি আগে দু'আ করিবে, না আমি? কারূন বলিল, আমি আগে বদদু'আ করিব। অতঃপর কারূন দু'আ করিল কিন্তু মূসা (আ)-এর ক্ষেত্রে তাহা কবুল হইল না। মূসা (আ) বলিলেন, এখন কি আমি দু'আ করিব? সে বলিল, হাঁ। অতঃপর মূসা (আ) দু'আ করিলেন। আল্লাহ তাঁহার দু'আর ফলে মাটিকে তাঁহার অনুগত বানাইয়া দিলেন। মূসা (আ) যমীনকে নির্দেশ দিলেন, হে যমীন! তুমি ইহাদিগকে পাকড়াও কর। তখন সঙ্গে সঙ্গেই যমীন তাহাদের পা পর্যন্ত গ্রাস করিল। তিনি আবার বলিলেন, ইহাদিগকে পাকড়াও কর। অতঃপর যমিন তাহাদের হাঁটু পর্যন্ত গ্রাস করিল, অতঃপর কাঁধ পর্যন্ত। তখন মূসা (আ) বলিলেন, উহাদের ধনভাণ্ডার ও সম্পদ গ্রাস কর। যমীন তাহা গ্রাস করিল। তাহারা অসহায়ের মত উহার দিকে তাকাইয়া থাকিল। অতঃপর মূসা (আ) স্বীয় হস্ত দ্বারা ইশারা করিয়া বলিলেন, লাবী বংশধরদিগকে পাকড়াও কর। অতঃপর যমীন তাহাদিগকে ধ্বংস করিয়া দিল (আল-বিদায়া, ১খ, ৩১০-৩১১)।
এক বর্ণনামতে মূসা (আ) ঘোষণা দিলেন, হে বনী ইসরাঈল! আল্লাহ আমাকে ফিরআউনের প্রতি প্রেরণ করিয়াছিলেন, তেমনি কারুনের প্রতিও প্রেরণ করিয়াছেন। সুতরাং যে তাহার সহিত থাকিবে সে ঐখানেই অবস্থান করুক, আর যে আমার সহিত থাকিবে সে আলাদা হইয়া চলিয়া আসুক। অতঃপর দুই ব্যক্তি ব্যতীত আর সকলেই মূসা (আ)-এর দলে চলিয়া আসিল। উক্ত দুইজনসহ কারূন ভূগর্ভে ধ্বসিয়া যায় (আত-তাফসীরুল মাজহারী, ৭খ, ১৮৫)।
কাতাদা (র) বলেন, যমীন উহাদিগকে কিয়ামত পর্যন্ত প্রতিদিন একজন মানুষের দৈর্ঘ্যের সমপরিমাণ ধ্বসাইতে থাকিবে। ইব্ন আব্বাস (রা) বলেন, যমীন তাহার সপ্তম স্তর পর্যন্ত তাহাদিগকে ধ্বসাইবে (প্রাগুক্ত, পৃ.৩১১)। কুরআন কারীমের আরো দুই স্থানে কারূনের কথা উল্লেখ করা হইয়াছে:
وَقَارُونَ وَفِرْعَوْنَ وَهَامَانَ وَلَقَدْ جَاءَهُمْ مُوسَى بالبَيِّنَاتِ فَاسْتَكْبَرُوا فِي الْأَرْضِ وَمَا كَانُوا سَابِقِينَ. فَكُلاً اخَذْنَا بِذَنْبِهِ فَمِنْهُمْ مَنْ أَرْسَلْنَا عَلَيْهِ حَاصِبًا وَمِنْهُمْ مَنْ أَخَذَتْهُ الصَّيْحَةُ وَمِنْهُمْ مَنْ أَخَذْنَا بِهِ الْأَرْضَ وَمِنْهُمْ مَنْ أَغْرَقْنَا وَمَا كَانَ اللهُ لِيَظْلِمَهُمْ وَلَكِنْ كَانُوا أَنْفُسَهُمْ يَظْلِمُونَ . ( ٤٠ - ٣٩ : ٢٩)
“এবং আমি ধ্বংস করিয়াছিলাম কারুন, ফিরআওন ও হামানকে। মূসা উহাদের নিকট সুস্পষ্ট নিদর্শনসহ আসিয়াছিল; তখন তাহারা দেশে দম্ভ করিত; কিন্তু উহারা আমার শাস্তি এড়াইতে পারে নাই। উহাদের প্রত্যেককেই তাহার অপরাধের জন্য শাস্তি দিয়াছিলাম; উহাদের কাহারও প্রতি প্রেরণ করিয়াছি প্রস্তরসহ প্রচণ্ড ঝটিকা, উহাদের কাহাকেও আঘাত করিয়াছিল মহানাদ, কাহাকেও আমি প্রোথিত করিয়াছিলাম ভূগর্ভে এবং কাহাকেও করিয়াছিলাম নিমজ্জিত। আল্লাহ তাহাদের প্রতি কোন জুলুম করেন নাই; তাহারা নিজেরাই নিজেদের প্রতি জুলুম করিয়াছিল" (২৯: ৩৯-৪০)।
وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا مُوسَى بِأَيْتِنَا وَسُلْطَانٍ مُبِينٍ إِلَى فِرْعَوْنَ وَهَامَانَ وَقَارُونَ فَقَالُوا سَحِرٌ كَذَابٌ. (٢٤-٢٣ : ٤٠)
"আমি আমার নিদর্শন ও স্পষ্ট প্রমাণসহ মূসাকে প্রেরণ করিয়াছিলাম ফিরআওন, হামান ও কারুনের নিকট। কিন্তু উহারা বলিয়াছিল, এতো এক যাদুকর, চরম মিথ্যাবাদী" (৪০: ২৪-২৫)।
হাদীসে কারুন সম্পর্কে উল্লিখিত হইয়াছে যে, ইমাম আহমাদ (র) আবদুল্লাহ ইব্ন আমর (রা) হইতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, যে সালাতের পাবন্দী করে কিয়ামতের দিন উহা তাহার জন্য নূর, প্রমাণ (বুরহান) ও নাজাতের কারণ হইবে। আর যে সালাতের পাবন্দী করিবে না উহা তাহার জন্য নূর, বুরহান ও নাজাতের কারণ কিছুই হইবে না। সে কিয়ামতের দিন কারুন, ফিরআওন, হামান ও উবায় ইব্ন খালাফ-এর সহিত থাকিবে (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ৩১২)।
কারুনের এই ঘটনা কখন সংঘটিত হইয়াছিল, ফিরআওনের ডুবিয়া মৃত্যু হওয়ার পূর্বে মিসরে, না তাহার মৃত্যুর পর 'তীহ' ময়দানে, এই বিষয়ে মুফাস্স্সিরগণের দুইটি মত রহিয়াছে। ইব্ন কাছীর বলেন, ইহা যদি ফিরআওন-এর ডুবিয়া মরিবার পূর্বের ঘটনা ধরা হয় তবে আয়াতে دار (প্রাসাদ)-এর অর্থ তাহার প্রকৃত বাড়ি ও প্রাসাদ। আর যদি পরের ঘটনা ধরা হয় তবে অর্থ তীহ ময়দানে অবস্থিত তাহার তাঁবু (কাসাসুল কুরআন, ১খ, ৫৩০-৫৩১)।
মাওলানা হিফজুর রাহমান সিউহারবী এই ঘটনাকে তীহ-এর ময়দানের ঘটনা সম্বলিত বলিয়া অভিমত দিয়াছেন। কারণ হিসাবে তিনি উল্লেখ করিয়াছেন যে, কুরআন কারীমে কারুনের ভূমিতে প্রোথিত হওয়ার এই ঘটনাকে ফিরআওনের ডুবিয়া মৃত্যুর ঘটনার পর উল্লেখ করা হইয়াছে (প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৩১)।