📄 মূসা (আ)-এর সহিত বানু ইসরাঈলের ৭০ নেতার তূর পাহাড়ে গমন
আল্লাহর বিধান আনিবার জন্য হযরত মূসা (আ)-এর সহিত বানু ইসরাঈলের ৭০জন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি পাহাড়ে গমন করেন। তাহারা কি গোবৎস পূজা হইতে তওবা করার পূর্বে তূর পাহাড়ে গিয়াছিলেন না পরে সে সম্পর্কে দুই ধরনের বর্ণনা পাওয়া যায় : সুদ্দী, ইব্ন আব্বাস প্রমুখের বর্ণনামতে এই সত্তরজন ছিল বানু ইসরাঈলের আলিম। ইহাদের সহিত ছিলেন মূসা (আ), হারুন (আ), যূশা, হাদাব ও আবীহু। তাহারা মূসা (আ)-এর সহিত তুর পাহাড়ে গমন করেন বানু ইসরাঈলের গোবৎস পূজা হইতে তওবার পূর্বে 'আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করিবার এবং তওবার বিধান আনয়নের জন্য (ইব্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ২৮৯)।
অপর বর্ণনামতে বানু ইসরাঈলের গোবৎস পূজার অপরাধ যখন ক্ষমা করিয়া দেওয়া হইল তখন মূসা (আ) তাহাদিগকে বলিলেন, আমার নিকট এই ফলকে যাহা অবতীর্ণ হইয়াছে ইহা আল্লাহ্র কিতাব। আল্লাহ তাআলা তোমাদের হিদায়াত ও উভয় জগতের কল্যাণের জন্য আমার উপর অবতীর্ণ করিয়াছেন। ইহা তাওরাত। ইহার উপর ঈমান আনয়ন করা এবং ইহার হুকুম-আহকাম পালন করা তোমাদের জন্য ফরয। বানু ইসরাঈল বলিতে লাগিল, আমরা শুধুমাত্র তোমার কথায় কিভাবে বিশ্বাস করিতে পারি যে, ইহা আল্লাহর কিতাব? আমরা ইহার উপর তখনই ঈমান আনিব যখন আমরা চাক্ষুষ আল্লাহকে দেখিব এবং তিনি আমাদিগকে বলিবেন, 'এই তাওরাত আমার কিতাব, তোমরা ইহার উপর ঈমান আনয়ন কর'। মূসা (আ) তাহাদিগকে বুঝাইলেন যে, ইহা নির্বুদ্ধিতার কথা, এই চক্ষু দ্বারা তাঁহাকে দেখা সম্ভব নহে। কিন্তু বানু ইসরাঈলের পীড়াপীড়িতে সম্মত হইয়া তিনি বলিলেন, এত লোক তো আমার সহিত তূর পর্বতে যাওয়া যাইবে না, বরং তোমাদের মধ্য হইতে নেতৃস্থানীয় কিছু লোক বাছাই করিয়া লইয়া যাই, তাহারা আসিয়া যদি উহার সত্যতা স্বীকার করে তবে তোমরাও উহা মানিয়া লইবে। আর যেহেতু তোমরা কিছু কাল পূর্বে গো-বৎস পূজা করিয়া এক মারাত্মক অপরাধ করিয়াছ, এইজন্য নিজেদের অনুতাপ প্রকাশ করা এবং আল্লাহ্র নিকট সর্বদা নেক কাজ করার অঙ্গীকার করার ইহাই সমীচীন ক্ষেত্র। বানু ইসরাঈল ইহাতে সম্মত হইল। অতঃপর মূসা (আ) বানু ইসরাঈলের বিভিন্ন উপগোত্র হইতে ৭০জন আলিম ব্যক্তিকে বাছাই করিলেন (কাসাসুল কুরআন, ১খ, ৫০৪-৫০৫)। সকলকেই তিনি স্ব স্ব কাপড় ও শরীর পবিত্র করিবার এবং সাওম পালন করিবার নির্দেশ দিলেন, অতঃপর আল্লাহ্র নিকট হইতে একটি নির্দিষ্ট সময় লইয়া তুর পাহাড়ে রওয়ানা হইলেন।
মূসা (আ) তূর পর্বতের নিকটবর্তী হইলে তাঁহার উপর সাদা মেঘের আবরণ ও নূরের স্তম্ভ আসিয়া পড়িল। মূসা (আ) আল্লাহকে বলিলেন, হে আমার প্রতিপালক! তুমি বানু ইসরাঈল সম্পর্কে সম্পূর্ণরূপে অবহিত। তাই তোমার এই নূরের আবরণ হইতে তোমার ও আমার কথোপকথন যদি তাহারাও শুনিতে পাইত তবে কতইনা ভাল হইত! আল্লাহ তাঁহার এই আবদার মঞ্জুর করিলেন। অতঃপর সাদা মেঘের সেই আবরণ সম্পূর্ণ পর্বতকে ঢাকিয়া ফেলিল। মূসা (আ) উহাতে প্রবেশ করিলেন এবং তাঁহার সম্প্রদায়ের লোকজনকে বলিলেন, তোমরা আরো নিকবর্তী হও। তাহারাও উক্ত মেঘমালার আবরণের মধ্যে ঢুকিয়া পড়িল। মূসা (আ) যখন আল্লাহ্র সহিত কথা বলিতেন তখন তাঁহার মুখমণ্ডলে এমন এক দ্যুতিময় নূর আসিয়া পড়িত যে, কোনও মানুষ তাঁহার দিকে তাঁকাইতে পারিত না। তাই মূসা (আ) ও তাহাদের মধ্যে একটি পর্দার আবরণ দেওয়া হইল। অতঃপর তাহারা সকলেই সিজদায় পতিত হইল। সিজদা অবস্থায় তাহারা শুনিতে পাইল যে, মূসা (আ)-এর সহিত আল্লাহ তাআলা কথা বলিতেছেন। তাঁহাকে কিছু করিবার নির্দেশ দিতেছেন এবং কিছু বিষয় করিতে নিষেধ করিতেছেন।
অতঃপর আল্লাহ্র ঘোষণা ও নির্দেশ শেষ হইলে উক্ত মেঘমালার আবরণ তুলিয়া লওয়া হইল। তখন মূসা (আ) তাহাদের নিকট আসিলেন। এই সময় তাহারা তাহাদের পূর্বের দাবিতেই অটল থাকিয়া বলিল, আমরা যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহকে প্রত্যক্ষভাবে না দেখিব ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমান আনিব না (দ্র. ২ঃ ৫৫)। তাহাদের এই অবাধ্যতা, ধৃষ্টতা ও অসম্ভব বস্তু দর্শনের জন্য জিদ ও পীড়াপীড়ির কারণে আল্লাহ তাহাদিগকে মৃত্যু দিলেন। বিদ্যুতের এক ভয়ঙ্কর চমক, বজ্র কঠোর আওয়ায ও ভূমিকম্প আসিয়া তাহাদিগকে ধ্বংস করিয়া দিল। সকলেই মৃত অবস্থায় ভূমিতে পড়িয়া রহিল। এইভাবে তাহারা এক দিন এক রাত্রি পড়িয়া থাকে। কেহ কেহ বলিয়াছেন যে, তাহারা প্রকৃতপক্ষে মারা যায় নাই; বরং এই ভয়ানক অবস্থায় তাহারা আতঙ্কগ্রস্ত হইয়া অচেতন হইয়া পড়িয়া থাকে (আবুস-সুউদ, তাফসীর, ১খ, ১৭৭)। তবে এই মত কুরআন করীমের আয়াতের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নহে (২:৫৬)।
এই দৃশ্য দেখিয়া মূসা (আ) কাঁদিয়া ফেলিলেন এবং অত্যন্ত কাকুতি-মিনতিভরে আল্লাহ্র নিকট দু'আ করিলেন, হে আমার প্রতিপালক! তুমি ইচ্ছা করিলে তো পূর্বেই ইহাদিগকে এবং আমাকেও ধ্বংস করিতে পারিতে। আমাদের মধ্যে নির্বোধগণের কর্মফলে আমাদিগকে কি ধ্বংস করিয়া দিবে (দ্র. ৭: ১৫৫)! আমি তাহাদের মধ্যে বাঁছাই করিয়া সত্তরজন উত্তম লোককে লইয়া আসিয়াছি। আমি ফিরিয়া গিয়া বানু ইসরাঈলকে এখন কী বলিব! ইহাদিগকে ছাড়া আমি ফিরিয়া গেলে তো বানু ইসরাঈলের লোকজন আমাকে বিশ্বাস করিবে না। "ইহা তো শুধু তোমার পরীক্ষা যদ্বারা তুমি যাহাকে ইচ্ছা বিপথগামী কর এবং যাহাকে ইচ্ছা সৎপথে পরিচালিত কর। তুমিই তো আমাদের অভিভাবক। সুতরাং আমাদিগকে ক্ষমা কর ও আমাদের প্রতি দয়া কর। ক্ষমাশীলদের মধ্যে তুমিই তো শ্রেষ্ঠ। আমাদের জন্য নির্ধারিত কর ইহকাল ও পরকালের কল্যাণ, আমরা তোমার নিকট প্রত্যাবর্তন করিয়াছি" (দ্র. ৭: ১৫৫-১৫৬)। আল্লাহ তা'আলা মূসা (আ)-এর এই দু'আ কবুল করিলেন এবং ইরশাদ করিলেন :
عذابي أصيب بِهِ مَنْ أَشَاءُ وَرَحْمَتِي وَسِعَتْ كُلَّ شَيْءٍ فَسَاكْتُبُهَا لِلَّذِينَ يَتَّقُونَ، وَيُؤْتُونَ الزَّكَوٰةَ وَالَّذِينَ هُمْ بِآيَاتِنَا يُؤْمِنُونَ (١٥٦ : ٧)
"আমার শান্তি যাহাকে ইচ্ছা দিয়া থাকি, আর আমার দয়া—তাহা তো প্রত্যেক বস্তুতেই ব্যাপ্ত। সুতরাং আমি উহা তাহাদের জন্য নির্ধারিত করিব যাহারা তাকওয়া আবলম্বন করে, যাকাত দেয় ও আমার নিদর্শনে বিশ্বাস করে" (৭: ১৫৬)।
অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাহাদিগকে পুনরায় জীবিত করিলেন। তাহারা এক একজন করিয়া জীবিত হইতেছিল এবং দাঁড়াইয়া একে অপরের প্রতি বিস্ময়ের দৃষ্টিতে তাঁকাইতেছিল (তারীখ তাবারী, ১খ, ৪২৯; আল-কামিল, ১খ, ১৪৭)।
📄 বানু ইসরাঈলের উপর তূর পর্বত উত্তোলন
বানু ইসরাঈলের উক্ত সত্তর ব্যক্তি নিজ সম্প্রদায়ের নিকট ফিরিয়া আসিয়া সকল ঘটনা বিবৃত করিল এবং সাক্ষ্য দিল যে, মূসা (আ) যাহা আনয়ন করিয়াছেন উহা আল্লাহ্রই কিতাব তাওরাত এবং আমাদের জন্য পালনীয় বিধান। কিন্তু তাহারা ইহাকে সত্য বলিয়া জানা সত্ত্বেও তাওরাতের বিধান পালন করা কষ্টসাধ্য মনে করিল এবং উহার উপর আমল করিতে অস্বীকার করিল। তখন আল্লাহ তাআলার নির্দেশে জিবরাঈল (আ) বানু ইসরাঈলের সমুদয় লোককে ঢাকিয়া ফেলিতে পারে, তূর পর্বতের এমন বিশাল একটি অংশ তাহাদের উপর তুলিয়া ধরিলেন। উহা দৈর্ঘ্য ও প্রস্থে ছিল এক ফারসাখ। এক বর্ণনামতে জিবরাঈল (আ) উহা ফিলিস্তীন হইতে আনিয়া তাহাদের মাথা হইতে একজন মানুষের সমান উঁচুতে ধরিলেন। তাহাদের সম্মুখে অগ্নি ও পিছনে সমুদ্র হাজির করা হইল এবং আল্লাহ বলিলেন, আমি যাহা দিলাম দৃঢ়তার সহিত তাহা গ্রহণ কর এবং তাহাতে যাহা আছে তাহা স্মরণ রাখ, যাহাতে তোমরা সাবধান হইয়া চলিতে পার (২ঃ ৬৩; তু. ৭: ১৭১)। অন্যত্র বর্ণিত হইয়াছে, আল্লাহ বলিলেন, আমি যাহা দিলাম তাহা দৃঢ়রূপে গ্রহণ কর এবং শ্রবণ কর (২ঃ ৯৩)। তোমরা যদি ইহা কবুল কর এবং তোমাদের যাহা নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে তাহা পালন কর তো ভাল, নতুবা এই পর্বত দ্বারা তোমাদিগকে পিষ্ট করা হইবে, এই সমুদ্রে তোমাদিগকে ডুবাইয়া মারা হইবে এবং এই অগ্নি দ্বারা তোমাদিগকে দগ্ধীভূত করা হইবে।
তাহারা যখন দেখিল যে, পলায়নের আর কোন পথ নাই তখন তাহারা উহা গ্রহণ করিল। এক বর্ণনামতে তাহারা মুখে বলিল, আমরা শ্রবণ করিলাম কিন্তু মনে মনে বলিল, 'অমান্য করিলাম' (ইফাবা প্রণীত আল-কুরআনুল করীম-এর ৬৯ নং টীকা, ২ : ৯৩ আয়াত দ্র.)। অতঃপর তাহারা মুখমণ্ডলের এক দিক দিয়া সিজদা করিল। সিজদারত অবস্থায়ই তাহারা মুখমণ্ডলের অপর দিক দিয়া পর্বতের দিকে তাঁকাইয়া দেখিতে লাগিল পাছে উহা আবার তাহাদিগকে পিষ্ট করিয়া ফেলে কিনা। তাহারা মনে করিয়াছিল যে, উহা তাহাদের উপর পড়িয়া যাইবে (৭ : ১৭১)। অতঃপর ইহাই বানু ইসরাঈলদের সিজদার পদ্ধতি হইয়া দাঁড়ায় যে, তাহারা মুখমণ্ডলের এক পার্শ্ব দিয়া সিজদা করে (আল-কামিল, ১খ, ১৪৭-১৪৮)। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, কয়েক দিন যাইতে না যাইতেই তাহাদের মজ্জাগত স্বভাববশে এই অঙ্গীকারও তাহারা ভঙ্গ করিল (দ্র. ২ : ৬৪)।
বাইবেলে পর্বত উত্তোলনের কথা উল্লেখ নাই, বরং বলা হইয়াছে যে, উহা কাঁপিতেছিলঃ "তাহা (পর্বত) হইতে ধূম উঠিতে লাগিল এবং পর্বত অতিশয় কাঁপিতে লাগিল" (যাত্রাপুস্তক, ১৯ : ১৮)।
কোনও কোনও তাফসীরকার পর্বত উত্তোলনের বিষয়টি এড়াইয়া গিয়া উহার কষ্ট-কল্পিত ব্যাখ্যা প্রদান করিয়াছেন। মাওলানা আবুল কালাম আযাদও তাঁহার তাফসীর গ্রন্থ তারজুমানুল কুরআন-এ উল্লেখ করিয়াছেন যে, পর্বত উত্তোলন করা হয় নাই, বরং ভূমিকম্পের ফলে উহা এমন প্রবলভাবে কম্পিত হইতেছিল যে, মনে হইতে লাগিল উহা তাহাদের উপর পড়িয়া যাইবে (আম্বিয়া-ই কুরআন, ২খ, ২৩১)। কিন্তু কুরআন কারীমের সুস্পষ্ট বর্ণনায় প্রতীয়মান হয় যে, এই ধরনের ব্যাখ্যা উহার সহিত সঙ্গতিপূর্ণ নহে।
📄 পবিত্র ভূমি ফিলিস্তিনে প্রবেশ ও জিহাদের নির্দেশ
সীনাইর যে ময়দানে বানু ইসরাঈল অবস্থান করিতেছিল তাহা ছিল ফিলিস্তীনের নিকটবর্তী। হযরত ইবরাহীম (আ) তাঁহার বাপ-দাদার দেশ বাবিল হইতে হিজরত করিয়া ফিলিস্তীন আগমন করিয়াছিলেন। বাইবেলে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তাআলা তাঁহার সহিত অঙ্গীকার করিয়াছিলেন যে, এই রাজত্ব তাঁহাকে ও তাঁহার বংশধরকে দান করিবেন। অতঃপর হযরত ইসহাক (আ) ও হযরত ইয়া'কূব (আ)-এর সহিতও উক্ত অঙ্গীকার করা হয়। হযরত ইউসুফ (আ)-এর সময় হইতেই বানু ইসরাঈল মিসরে বসবাস শুরু করে। বাইবেলের বর্ণনানুযায়ী তাহারা ৪৩০ বৎসর সেখানে বসবাস করিবার পর মূসা (আ)-এর নেতৃত্বে মিসর ত্যাগ করত লোহিত সাগর পার হইয়া সীনাই ময়দানে উপনীত হয়। এখন আল্লাহ তাআলার অঙ্গীকার বাস্তবায়নের সময় আসিয়া গেল। সেই সময় বৃহত্তর শামে আমালিকাদের রাজত্ব ছিল। তাই উক্ত শামেরই একটি অংশ ফিলিস্তীন তখন হায়ছানী, ফাযারী ও কিনআনী প্রভৃতি উপগোত্রের স্বৈরাচারী ও অহঙ্কারী লোকজনের অধিকারে ছিল। তাহারা ছিল খুবই শক্তিশালী। আল্লাহ তাআলা মূসা (আ)-এর মাধ্যমে বানু ইসরাঈলকে হুকুম দিলেন তোমরা জিহাদ করিয়া সেখানকার স্বৈরাচারী ও অত্যাচারী সম্প্রদায়কে বিতাড়ন করত সেখানে সত্য ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা কর এবং সেখানে নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন জীবন যাপন কর। উক্ত ভূমির মালিক তোমরা। আল্লাহ তাআলা অঙ্গীকার করেন যে, বিজয় তোমাদেরই হইবে আর স্বৈরাচারী ও অত্যাচারী শত্রুগণ পরাজিত হইবে।
হযরত মূসা (আ) বানু ইসরাঈলকে উক্ত পবিত্র ভূমিতে প্রবেশ করার জন্য উদ্বুদ্ধ করার পূর্বেই নেতৃস্থানীয় ১২ ব্যক্তিকে সেখানকার অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য প্রেরণ করিলেন। তাহারা ফিলিস্তীনের নিকটবর্তী শহর 'আরীহায়' প্রবেশ করেন এবং সেখানকার সকল অবস্থা খুব তীক্ষ্ণভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। ফিরিয়া আসিয়া তাহারা মূসা (আ)-কে বলিলেন, তাহারা বিরাট বিরাট দেহধারী এবং খুবই শক্তিশালী। মূসা (আ) বলিলেন, আমার সহিত যেরূপ বলিয়াছ সম্প্রদায়ের আর কাহারও সহিত সেরূপ বলিও না। কারণ দীর্ঘ কয়েক শতাব্দীর গোলামীর ফলে তাহাদের শক্তি-সাহস রহিত হইয়া গিয়াছে এবং কাপুরুষতা স্থান করিয়া লইয়াছে। কিন্তু ইহারাও তো ছিল বনূ ইসরাঈলেরই লোক। দুইজন ব্যতীত ইহাদের কেহ মূসা (আ)-এর কথা মান্য করিল না; বরং চুপি চুপি আরও ফুলাইয়া ফাঁপাইয়া শত্রুদের বীরত্ব ও শক্তিমত্তার কথা স্বীয় সম্প্রদায়ের লোকজনের নিকট প্রকাশ করিল। যে দুইজন লোক মূসা (আ)-এর নির্দেশ মান্য করিয়াছিলেন তাঁহারা হইলেন ইউশা ইব্ নূন ও কালিব ইব্ন ইউফান্না। তাঁহারা এমন কোন কথা বলিলেন না যাহাতে সম্প্রদায়ের মধ্যে ত্রাস ও ভীতির সঞ্চার হয়।
অতঃপর বানু ইসরাঈলের কাছে সেই খবর প্রকাশিত হওয়ার পর তাহারা নিরাশ ও হতবিহ্বল হইয়া গেল, এমনকি আবার মিসরে ফিরিয়া যাওয়ার উদ্যোগ নিল। তাই মূসা (আ) যখন তাহাদেরকে যুদ্ধে আহবান করিলেন, তখন তাহারা সেই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করিতে অপারগতা প্রকাশ করিল। এই বিষয়টি আল-কুরআনেও নিম্নোক্তভাবে আসিয়াছে:
يُقَوْمِ ادْخُلُوا الْأَرْضَ الْمُقَدَّسَةَ الَّتِي كَتَبَ اللهُ لَكُمْ وَلَا تَرْتَدُّوا عَلَى أَدْبَارِكُمْ فَتَنْقَلِبُوا خَسِرِينَ قَالُوا يُمُوسَى إِنَّ فِيهَا قَوْمًا جَبَّارِيْنَ وَإِنَّا لَنْ نَدْخُلَهَا حَتَّى يَخْرُجُوا مِنْهَا فَإِنْ يَخْرُجُوا مِنْهَا فَإِنَّا دُخِلُوْنَ .
"হে আমার সম্প্রদায়! আল্লাহ তোমাদের জন্য যে পবিত্র ভূমি নির্দিষ্ট করিয়াছেন, তাহাতে তোমরা প্রবেশ কর এবং পশ্চাদপসরণ করিও না, করিলে তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত হইবে। তাহারা বলিল, হে মূসা। সেইখানে এক দুর্দান্ত সম্প্রদায় রহিয়াছে এবং তাহারা সেই স্থান হইতে বাহির না হওয়া পর্যন্ত আমরা কখনও সেইখানে প্রবেশ করিব না, তাহারা সেই স্থান হইতে বাহির হইয়া গেলেই আমরা প্রবশ করিব" (৫: ২১-২২)।
অনন্তর ইসরাঈলী শিবিরে প্রচণ্ড সংকট অবস্থার সৃষ্টি হয়। তাহারা বলিতে লাগিল, মূসা আমাদেরকে মিসর হইতে বাহির করিয়া আনিয়া দুর্ধর্ষ জাতির তলোয়ার দ্বারা আমাদের হত্যা করিবার ফন্দী করিয়াছেন। আর এইভাবে হযরত মূসা (আ) বিপাকে পড়িয়া যান। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে দুই ব্যক্তি বানু ইসরাঈলকে শান্ত করিবার জন্য আগাইয়া আসেন। তাঁহারা হইলেন হযরত ইউশা' ইব্ন নূন (আ) ও কালিব ইব্ন ইয়ুফান্না। তাহারা উভয়ে বানু ইসরাঈলকে যুদ্ধে উৎসাহ প্রদান এবং তাহাদের মনোবল ফিরাইয়া আনিবার চেষ্টা করিতে লাগিলেন। আল- কুরআনের ভাষায়:
قَالَ رَجُلَنِ مِنَ الَّذِينَ يَخَا فُوْنَ أَنْعَمَ اللهُ عَلَيْهِمَا ادْخُلُوا الْبَابَ فَإِذَا دَخَلْتُمُوهُ فَإِنَّكُمْ غُلِبُونَ وَعَلَى اللَّهِ فَتَوَكَّلُوا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ .
"যাহারা ভয় করিতেছিল তাহাদের মধ্যে দুইজন, যাহাদের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ করিয়াছিলেন, বলিল, তোমরা তাহাদের মোকাবিলা করিয়া (নগর) দ্বারে প্রবেশ কর, প্রবেশ করিলেই জয়ী হইবে। আল্লাহর উপরই নির্ভর কর যদি তোমরা মুমিন হও” (৫ঃ ২৩)।
এই বিষয়টি বাইবেলে বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হইয়াছে (দ্র. গণনাপুস্তক, ১৩: ৩০-৩৩): "পরে সমস্ত মণ্ডলী উচ্চৈস্বরে কলরব করিল এবং লোকেরা সেই রাত্রিতে রোদন করিল। আর ইস্রায়েল সন্তানগণ সকলে মোশির বিপরীতে ও হারোনের বিপরীতে বচসা করিল ও সমস্ত মণ্ডলী তাহাদিগকে কহিল, হায় হায়, আমরা কেন মিসর দেশে মরি নাই, এই প্রান্তরেই বা কেন মরি নাই? সদাপ্রভু আমাদিগকে খড়গধারে নিপাত করাইতে এই দেশে কেন আনিলেন? আমাদের স্ত্রী ও বালকগণ ত লুটিত হইবে। মিশরে ফিরিয়া যাওয়া কি আমাদের ভাল নয়? পরে তাহারা পরস্পর বলাবলি করিল। আইস, আমরা একজনকে সেনাপতি করিয়া মিসরে ফিরিয়া যাই। তাহাতে মোশি ও হারোন ইসরাঈল-সন্তানগণের মণ্ডলীর সমস্ত সমাজের সম্মুখে উবুড় হইয়া পড়িলেন। আর যাঁহারা দেশ নিরীক্ষণ করিয়া আসিয়াছিলেন, তাঁহাদের মধ্যে নূনের পুত্র যিহোশূয় ও যিফুন্নীর পুত্র কালেব আপন আপন বস্ত্র চিরিলেন এবং ইসরাঈল-সন্তানগণের সমস্ত মণ্ডলীকে কহিলেন, আমরা যে দেশ নিরীক্ষণ করিতে গিয়াছিলাম সে যারপর নাই উত্তম দেশ। সদাপ্রভু যদি আমাদিগেতে প্রীত হন তবে তিনি আমাদিগকে সেই দেশে প্রবেশ করাইবেন ও সেই দুগ্ধ-মধু প্রবাহী দেশ আমাদিগকে দিবেন। কিন্তু তোমরা কোনমতে সদাপ্রভুর বিদ্রোহী হইও না, ও সে দেশের লোকদিগকে ভয় করিও না। কেননা তাহারা আমাদের ভক্ষ্যস্বরূপ, তাহাদের আশ্রয়-ছত্র তাহাদের উপর হইতে নীত হইল, সদাপ্রভু আমাদের সহর্বত্তী, তাহাদিগকে ভয় করিও না" (গণনাপুস্তক ১৪: ১-৯)।
আল-কুরাআন ও বাইবেলের উপরিউক্ত বর্ণনায় দেখা যায় যে, তিনি মূসা (আ)-এর বিশ্বস্ত সহচর ও দুঃসাহসী ঈমানদার সেনাপতি ছিলেন। আল্লাহ পাকের ইচ্ছা ও বিধান হইল শক্তিশালী ঈমানদারগণের মাধ্যমেই তাঁহার দীন বিজয়ী হয়। তাই দুইজন ব্যতীত ইসরাঈলীগণ কাপুরুষতা ও হীনমন্যতা প্রদর্শন করিল। ঐ দুইজন ব্যতীত অন্য সকলের মৃত্যুর পরই সেই পবিত্র ভূমিতে প্রবেশের ব্যবস্থা হয়। আর সেই দুইজনের মধ্যে একজন ছিলেন হযরত ইউশা' ইব্ন নূন (দ্র. গণনাপুস্তক ৩২: ১১-১২)।
হযরত মূসা (আ)-এর যখন অন্তim সময় ঘনাইয়া আসে তখন মূসা (আ) দু'আয় আল্লাহ আধ্যাত্মিক, শারীরিক ও মানসিক শক্তিতে বলীয়ান হযরত ইউশা' ইব্ন নূন (আ)-কে মূসা (আ)-এর প্রতিনিধি নিয়োগের নির্দেশ দেন। এইভাবে হযরত ইউশা' (আ) হযরত মূসা (আ)-এর প্রতিনিধি হিসাবে বানু ইসরাঈলের সার্বজনীন নেতা মনোনীত হন।
📄 গাভী যবাহ্-এর ঘটনা
ইব্ন আব্বাস (রা), উবায়দা আস-সালমানী, আবুল আলিয়া, মুজাহিদ, সুদ্দী প্রমুখ বর্ণনা করেন যে, বানু ইসরাঈলের মধ্যে এক ধনাঢ্য বৃদ্ধ লোক ছিল, যাহার নাম ছিল আমীল। তিনি ছিলেন নিঃসন্তান। তাহার কয়েকজন ভ্রাতুষ্পুত্র ছিল। তাহারা বৃদ্ধের মৃত্যু কামনা করিত যাহাতে মৃত্যুর পর তাহারা তাহার সম্পদের মালিক হইতে পারে। এই উদ্দেশ্যে তাহাদের একজন রাত্রে বৃদ্ধকে হত্যা করিয়া রাস্তার সংযোগস্থলে, মতান্তরে অন্য এক লোকের ঘরের দরজায় ফেলিয়া রাখে। সকাল বেলা লোকজন তাঁহাকে লইয়া বিতর্ক করিতে থাকে'। ইতোমধ্যে তাহার ভ্রাতুষ্পুত্র আগমন করে। সে চীৎকার করিয়া উক্ত জুলুমের প্রতিকার দাবি করিতে থাকে। তাহারা বলিল, তোমরা আল্লাহ্ নবীর নিকট গমন কর না কেন!
অতঃপর মৃতের ভ্রাতুষ্পুত্র আল্লাহর নবী মূসা (আ)-এর নিকট গমন করত স্বীয় চাচার হত্যার অভিযোগ দায়ের করিল। মূসা (আ) বলিলেন, আল্লাহ্র কসম দিয়া বলিতেছি, তোমাদের মধ্যে কাহারও এই মৃতের ব্যপারটি জানা থাকিলে আমাকে জানাও। সবাই চুপ রহিল, কাহারও বিষয়টি জানা ছিল না। তাহারা এই বিষয়ে আল্লাহ্র নিকট জিজ্ঞাসা করিবার আবেদন জানাইল। অতঃপর মূসা (আ) এই বিষয়ে আল্লাহর নিকট জানিতে চহিলেন। তখন আল্লাহ তাআলা তাহাদিগকে একটি গাভী যবাহ-এর নির্দেশ দিলেন। মূসা (আ) তাহাদিগকে এই কথা জানাইলে তাহারা বলিল, আপনি কি আমাদের সহিত ঠাট্টা করিতেছেন? আমরা মৃতের অবস্থা জানিতে চাহিতেছি, আর আপনি গাভী যবাহ-এর কথা বলিতেছেন! মূসা (আ) উত্তর দিলেন, আমি মূর্খদের অন্তর্ভুক্ত হইব এই ব্যাপারে আমি আল্লাহ্র নিকট পানাহ চাহিতেছি। কারণ বিদ্রূপ করা তো মূর্খদের কাজ।
ইবন আব্বাস (রা), উবায়দা, মুজাহিদ, আবুল আলিয়া, ইকরিমা, সুদ্দী প্রমুখের বর্ণনামতে বানু ইসরাঈল যদি বারংবার জিজ্ঞাসাবাদ না করিয়া প্রথমবারই যে কোনও গাভী যবাহ করিত তবে তাহাই তাহাদের উদ্দেশ্য সাধনের জন্য যথেষ্ট হইত। কিন্তু তাহারা একে একে জিজ্ঞাসা করিয়া বিষয়টি নিজেদের জন্য জটিল করিয়া ফেলে। প্রথমত তাহারা ইহার বর্ণনা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে যে, তাহা কেমন? তাহাদিগকে বলা হয়, উহা খুব বয়স্কও নহে আবার একবারে অল্পবয়স্কও নহে, এতদুভয়ের মধ্যম ধরনের। অতঃপর তাহারা উহার রং সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে যে, উহা কি রং-এর গাভী? উত্তরে বলা হয় যে, উহা হলুদ বর্ণের গরু, উহার রং উজ্জ্বল গাঢ় যাহা দেখিবামাত্র দর্শকদের চক্ষু জুড়াইয়া যায়। অতঃপর তাহারা বিষয়টি আরো জটিল বানাইয়া ফেলে। আবারও জিজ্ঞাসা করে যে, তুমি তোমার প্রতিপালকের নিকট জিজ্ঞাসা কর যে, তাহা কী ধরনের? কারণ একই রকমের গাভী অনেক আছে। তখন নির্দেশ দেওয়া হইল, উহা কোনও চাষাবাদ বা পানি সেচে ব্যবহার করা হয় নাই, যাহাতে কোনও খুঁত নাই। তাহারা বলিল, এইবার তুমি সঠিক বিবরণ আনিয়াছ।
এক বর্ণনামতে তাহারা এতগুলি শর্তে আবদ্ধ গাভী কোথাও পাইল না, কেবল এক ব্যক্তির নিকট পাওয়া গেল, যে তাহার পিতার মতান্তরে মাতার খুবই খেদমত করিত। তাহারা তাহার নিকট উক্ত গাভীটি চাহিল। লোকটি উহা দিতে অস্বীকার করিল। সুদ্দীর বর্ণনামতে তাহারা উহার সমপরিমাণ স্বর্ণ দিতে চাহিল; কিন্তু ইহাতেও সে অস্বীকার করিল। অতঃপর তাহারা উহার দশগুণ স্বর্ণ দিল। অতঃপর লোকটি উক্ত মূল্যে গাভীটি তাহাদের নিকট বিক্রয় করিল। অপর এক বর্ণনামতে উহার চামড়ায় যে পরিমাণ স্বর্ণ ধরে তাহার বিনিময়ে।
মূসা (আ) গাভীটি যবাহ করার নির্দেশ দিলেন। তাহারা দ্বিধা-দ্বন্দু ও সংশয়ে ভুগিতেছিল। অবশেষে সমস্ত সংশয় কাটাইয়া তাহারা উহা যবাহ করিল। আল্লাহ্র নির্দেশ অনুসারে মূসা (আ) তাহাদিগকে নির্দেশ দিলেন যে, গাভীটির একটি অংশ মৃত ব্যক্তির উপর নিক্ষেপ কর। এক বর্ণনামতে রানের গোশত, অপর বর্ণনামতে গলনালীর সহিত মিলিত হাড্ডির গোশত, ভিন্নমতে উভয় কাঁধের মধ্যখানের অংশ। নির্দেশ মত তাহারা যখন উহা মৃত ব্যক্তির শরীরে নিক্ষেপ করিল তখন আল্লাহ তাআলা লোকটিকে জীবিত করিয়া দিলেন। সে উঠিয়া দাঁড়াইল। তাহার ক্ষতস্থান হইতে রক্ত ঝরিতেছিল। মূসা (আ) তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমাকে কে হত্যা করিয়াছে? সে জওয়াব দিল : আমার ভ্রাতুষ্পুত্র আমাকে হত্যা করিয়াছে। ইহা বলিয়াই আবার সে পূর্বের ন্যায় মৃত হইয়া গেল (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ২৯৩-২৯৫; আল-কুরআনুল কারীম, ২ঃ ৬৭-৭৩ নং আয়াত দ্র.)।