📄 বানু ইসরাঈলের গো-বৎস পূজা
মূসা (আ) তুর পাহাড়ে গমনের সময় স্বীয় সম্প্রদায়কে বলিয়া গিয়াছিলেন যে, ত্রিশ দিনের পর তিনি তাহাদের জন্য কিতাব ও শরীআত লইয়া আগমন করিবেন। তাই উক্ত ত্রিশ দিন পার হইবার পরও যখন মূসা (আ) কিতাব লইয়া আগমন করিলেন না তখন বানু ইসরাঈল অধৈর্য হইয়া পড়িল এবং ফিতনায় নিপতিত হইল।
এদিকে আল্লাহর নবী হারুন (আ) বানু ইসরাঈলকে নির্দেশ দিলেন যে, কিবতীগণ হইতে যে স্বর্ণালংকারসমূহ তোমরা ধারস্বরূপ লইয়া আসিয়াছিলে তাহা এখন গনীমতের মাল। আর গনীমতের মাল তোমাদের জন্য বৈধ নহে। তাই যাহার যাহার নিকট সেইগুলি আছে সে যেন তাহা একটি গর্তে জমা করিয়া মাটিচাপা দিয়া রাখে। অতঃপর মূসা আসিয়া যদি গনীমতের মাল তোমাদের জন্য হালাল করেন তবে তোমরা উহা লইয়া যাইও নতুবা এইভাবেই উহা থাকিবে। অতঃপর তাহারা স্বর্ণালংকার গর্তে জমা করিল।
তাহাদের মধ্যে সামিরী নামে এক লোক ছিল। এক বর্ণনামতে সে বানু ইসরাঈলের প্রতিবেশী এক সম্প্রদায়ের লোক ছিল। তাহার সম্প্রদায় গাভীর পূজা করিত। সে মূসা ও বানু ইসরাঈলের সঙ্গে আসিয়াছিল (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ৩০৫)। অপর এক বর্ণনামতে, সে জাযীরা অঞ্চলের রিক্কা নামক স্থানের নিকটবর্তী বালীখ-এর একটি গ্রাম 'বাজারমা-এর অধিবাসী। মতান্তরে সে ছিল বানু ইসরাঈল বংশীয় লোক (আল-কামিল, ১খ, ১৪৫)। ইমাম তাবারীর বর্ণনামতে তাহার নাম ছিল মূসা ইব্ন জা'ফার (আত-তাবারী, তারীখ, ১খ, ৪২৫)। জিবরীল (আ) যখন ঘোড়ায় চড়িয়া মূসা (আ)-এর নিকট তাঁহাকে লইয়া যাইবার জন্য আগমন করিয়াছিলেন তখন সামিরী তাহা দেখিয়াছিল। উহা তাহার নিকট আশ্চর্য ও বিস্ময়কর মনে হইয়াছিল (প্রাগুক্ত, পৃ. ৪২২)। এক বর্ণনামতে সে দেখিতেছিল, ঘোড়াটি যেখানেই পা রাখিতেছে উহার ক্ষুরের নীচ হইতে সবুজ ঘাস উৎপাদিত হইতেছে (আল-বিদায়া, ১খ, ২৮৮)। তখন সে মনে মনে ভাবিল, ইহার একটি ভিন্ন গুণ ও বৈশিষ্ট্য রহিয়াছে। তাই সে ঘোড়ার ক্ষুরের নিচ হইতে একটু মাটি উঠাইয়া রাখিয়াছিল। এক বর্ণনামতে এই মাটি সে ফিরআওনের পানিতে ডুবিয়া মরার পূর্ব মুহূর্তে জিবরীল (আ)-এর ঘোড়ার ক্ষুরের নীচ হইতে উঠাইয়া রাখিয়াছিল।
বানু ইসরাঈল উক্ত স্বর্ণালংঙ্কার জমা করার পর সামিরী উহার মধ্যে এই মাটি নিক্ষেপ করিল। এক বর্ণনামতে স্বর্ণালংকারসমূহ অগ্নিতে গলানো হয়। ভিন্নমতে সামিরী তিন দিন ধরিয়া উহা দ্বারা একটি গোবৎস তৈরি করে (আল-কামিল, ১খ, ১৪৬)। অতঃপর সামিরী উহাতে উক্ত মাটি নিক্ষেপ করিলে উহা 'হাম্বা' 'হাম্বা' রব করিতে আরম্ভ করে। কাতাদার বর্ণনামতে মাটি নিক্ষেপের পর তাহার শরীর রক্ত-মাংসের দেহে পরিণত হইয়া গিয়াছিল (১খ, ২৮৭)। গোবৎসটি ডাকিতেছিল আর চলাফেরা করিতেছিল। এক বর্ণনামতে একবারই মাত্র উহা ডাকিয়াছিল। অপর এক বর্ণনামতে বাতাস যখন উহার পিছন দিয়া ভিতরে প্রবেশ করিতেছিল তখন উহা গোবৎস ডাকার ন্যায় শব্দ করিতেছিল। তখন বানু ইসরাঈল উহার চতুষ্পার্শ্ব ঘিরিয়া ঘুরিয়া নৃত্য ও আনন্দ করিতে লাগিল (প্রাগুক্ত)। ইহা দেখিয়া সামিরী বানু ইসরাঈলকে বলিল, এই হইল তোমাদের ও মূসার ইলাহ। অথচ সে ভুলিয়া গিয়াছে (দ্র. ২০:৮৮)। তাই ইহা ত্যাগ করিয়া অন্যত্র গিয়াছে ইলাহের সন্ধানে।
অতঃপর বানু ইসরাঈল উহার পূজা শুরু করিয়া দিল। হযরত হারূন (আ) তাহাদিগকে উহা হইতে বারণ করিলেন এবং বলিলেন যে, ইহা দ্বারা তাহাদিগকে পরীক্ষায় ফেলা হইয়াছে। তাহাদের আসল প্রতিপালক হইলেন দয়াময় আল্লাহ। সুতরাং আল্লাহ্র নির্দেশ পালন করিতে হইলে তোমরা আমার অনুসরণ কর এবং আমারই নির্দেশ মানিয়া চল (দ্র. ২০:৯০)। অতঃপর কিছু লোক তাঁহার কথা মান্য করিয়া তাঁহার আনুগত্য করিল আর অধিকাংশ লোক অমান্য করিয়া সেই গোবৎসের পূজা করিতে লাগিল। তাহারা বলিল, মূসা আমাদের মধ্যে ফিরিয়া না আসা পর্যন্ত আমরা ইহারই পূজা করিতে থাকিব (দ্র. ২০:৯১)। অতঃপর হারূন (আ) তাহাদের সহিত বিবাদ বা যুদ্ধ না করিয়া নিজে ও-তাঁহার অনুসারিগণসহ সত্যের উপর অনড় রহিলেন (আল-কামিল, ১খ, ১৪৬)। আল্লাহ তাআলা তাহাদের এই অপরিণামদর্শী ও অযৌক্তিক কাজের অসারতা বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেন:
أَفَلَا يَرَوْنَ أَلَّا يَرْجِعُ إِلَيْهِمْ قَوْلًا وَلَا يَمْلِكُ لَهُمْ ضَرًّا وَلَا نَفْعًا (২০:৮৯)
"তবে কি উহারা ভাবিয়া দেখে না যে, উহা তাহাদের কথায় সাড়া দেয় না এবং তাহাদের কোন ক্ষতি অথবা উপকার করিবার ক্ষমতাও রাখে না" (২০ঃ৮৯)?
হযরত মূসা (আ) তূর পর্বতে আগমন করিয়া আল্লাহ্র সহিত সাক্ষাৎ বাক্যালাপ করিলেন। এক বর্ণনামতে মূসা (আ) তাওরাত আনিতে তুর পাহাড়ে যাওয়ার সময় সঙ্গে কয়েকজন গোত্রীয় প্রধানকে লইয়া যান। তিনি আল্লাহ্র সঙ্গে কথোপকথনের আগ্রহে তাহাদের পূর্বেই তথায় পৌছিয়া গিয়াছিলেন (দ্র. ইফা প্রণীত আল-কুরআনুল করীম-এর ৪৬৬ নং টীকা, ২০:৮৩ আয়াত)।
আল্লাহ তাআলা মূসা (আ)-কে ত্বরা করিয়া আগমনের কারণ জিজ্ঞাসা করিলে মূসা (আ) জানাইলেন যে, আল্লাহর সন্তুষ্টি বিধানের জন্যই তিনি এইরূপ করিয়াছেন। সম্প্রদায়ের লোকেরা পিছনে আসিতেছে (দ্র. ২০:৮৩-৮৪)। অতঃপর আল্লাহ তাআলা তাঁহাকে তাঁহার রাখিয়া আসা সম্প্রদায়ের গোমরাহীর খবর জানাইয়া দিলেন। বলিলেন, আমি তোমার সম্প্রদায়কে পরীক্ষায় ফেলিয়াছি। তুমি চলিয়া আসার পর সামিরী উহাদিগকে পথভ্রষ্ট করিয়াছে (দ্র. ২০:৮৫)। কুফরীর কারণে তাহাদের অন্তরে গোবৎস প্রীতি সিঞ্চিত হইয়াছিল (দ্র. ২:৯৩)।
একদিকে নির্ভেজাল তাওহীদের বিধান প্রদান, অপরদিকে যাহাদের জন্য এই বিধান তাহারাই প্রকাশ্য শিরকে নিমজ্জিত হইয়াছে! ফলে একজন পয়গাম্বরের মানসিক অবস্থা কিরূপ হইতে পারে তাহা সহজেই অনুমেয়। মূসা (আ) স্বীয় সম্প্রদায়ের এইরূপ গোমরাহী ও শিরকের সংবাদ পাইয়া ক্রুদ্ধ ও ক্ষুব্ধ হইলেন। তাঁহার কম্পিত হাত হইতে তাওরাতের ফলক পড়িয়া গেল। তিনি স্বীয় ভ্রাতা হারুন (আ)-এর দাড়ি ও চুল ধরিয়া টান দিলেন। বলিলেন, হারুন! তুমি যখন তাহাদিগকে গোমরাহ হইতে দেখিলে তখন আমার আনুগত্যের কথা কেন বল নাই? তুমি কি আমার নির্দেশ অমান্য করিয়াছ? আসলে মূসা (আ) একেতো সম্প্রদায়ের সরাসরি কুফরীতে নিমজ্জিত দেখিয়া চরমভাবে ক্ষুব্ধ হইয়াছিলেন, তাহার উপর আবার মনে করিয়াছিলেন হারুন (আ) বুঝি তাঁহার রিসালাতের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেন নাই। সেইজন্য আল্লাহর হুকুমকে প্রাধান্য দিয়া স্বীয় ভ্রাতা হারুন (আ) বয়সে বড় হওয়া সত্ত্বেও তাঁহার দাড়ি ও চুল ধরিয়া টান দিয়াছিলেন। ইহা ছিল তাঁহার ঈমানী জযবা ও আল্লাহ্ জন্যই ভালবাসা ও আল্লাহর জন্যই ক্রোধ-এর বহিঃপ্রকাশ, কাহাকেও অপমান করার উদ্দেশ্য ও প্রয়াস নহে। হারুন (আ) তখন প্রকৃত ঘটনা ব্যক্ত করিয়া বলিলেন, ভ্রাত! আমার দাড়ি বা চুল ধরিও না, আমি তো তাহাদিগকে নিষেধ করিয়াছি, তবে তাহাদের সহিত বিবাদে লিপ্ত হই নাই, এইজন্য যে, তুমি ফিরিয়া আসিয়া বলিবে, তুমি বানু ইসরাঈলের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করিয়া দিয়াছ; আমার কথার প্রতি দৃষ্টিপাত কর নাই (দ্র. ২০:৯২-৯৪)। তিনি আরও বলিলেন, হে আমার সহোদর! লোকেরা তো আমাকে দুর্বল মনে করিয়াছিল এবং আমাকে প্রায় হত্যাই করিয়া ফেলিয়াছিল। তুমি আমার সহিত এমন আচরণ করিও না যাহাতে শত্রুরা আনন্দিত হয়। আর আমাকে জালিমদের অন্তর্ভুক্তও মনে করিও না (দ্র. ৭: ১৫০)। মূসা (আ) তখন হারুন (আ)-এর নির্দোষিতা বুঝিতে পারিলেন। ইহাতে তাঁহার ক্রোধ প্রশমিত হইল। তখন আল্লাহ তাআলার নিকট দু'আ করিলেনঃ
رَبِّ اغْفِرْ لِي وَلأَخِي وَأَدْخِلْنَا فِي رَحْمَتِكَ وَأَنْتَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ (١٥١ : ٧) "হে আমার প্রতিপালক! আমাকে ও আমার ভ্রাতাকে ক্ষমা কর এবং আমাদিগকে তোমার রহমতের মধ্যে দাখিল কর। তুমিই শ্রেষ্ঠ দয়ালু" (৭৪৫১)।
অতঃপর তিনি তাঁহার সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, হে আমার সম্প্রদায়! তোমাদের প্রতিপালক কি তোমাদিগকে এক উত্তম প্রতিশ্রুতি দেন নাই যে, তিনি তোমাদের সঠিক পথে চলার বিধান দান করিবেন? তোমরা কেন তার আগেই এরূপ গর্হিত কাজ করিলে? তবে কি প্রতিশ্রুত কাল তোমাদের নিকট সুদীর্ঘ মনে হইয়াছিল, না তোমরা চাহিয়াছ তোমাদের প্রতি তোমাদের প্রতিপালকের ক্রোধ আপতিত হউক? তাহারা মূসা (আ)-এর ঈমানী তেজ ও রণমূর্তি দেখিয়া ভয় পাইয়া গেল এবং সবিনয়ে বলিল, আমরা তোমার প্রতি প্রদত্ত অঙ্গীকার স্বেচ্ছায় ভঙ্গ করি নাই; আমাদের উপর লোকের অলংকারের বোঝা চাপাইয়া দেওয়া হইয়াছিল এবং আমরা উহা অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করি, অনুরূপভাবে সামিরীও নিক্ষেপ করে (দ্র. ২০: ৮৬-৮৭)। অতঃপর তিনি সামিরীর কাছে গেলেন, বলিলেন, সামিরী! তোমার বক্তব্য কি? সে বলিল, আমি এমন জিনিস দেখিয়াছিলাম যাহা উহারা দেখে নাই। অতঃপর আমি সেই দূত জিবরাঈল (আ)-এর পদচিহ্ন হইতে একমুষ্টি মাটি লইয়াছিলাম, আমার প্রবৃত্তি আমাকে এই কাজে প্ররোচিত করিয়াছিল।
📄 বানু ইসরাঈলের তওবা
বানু ইসরাঈলের গো-বৎস পূজার পর মূসা (আ)-এর সতর্কবাণীর ফলে নিজেদের ভুল বুঝিতে পারে এবং মূসা (আ)-এর নিকট এই পাপ হইতে তওবা করার উপায় জানিতে চাহে। অতঃপর তাহাদের অনুতাপের কারণে আল্লাহর পক্ষ হইতে তাহাদের জন্য তওবার বিধান দেওয়া হইল যে, তাহারা একে অপরকে যাহাকেই সম্মুখে পাইবে হত্যা করিবে (দ্র. ২ঃ৫৪)।
এমনিভাবে পারস্পরিক হত্যা ব্যাপক আকার ধারণ করিল। এমনকি নিহতের সংখ্যা দাঁড়াইল প্রায়-সত্তর হাজারে। বাইবেলে এই সংখ্যা তিন হাজার বলা হইয়াছে (যাত্রাপুস্তক, ৩২:২৭-২৮)। তখন মূসা (আ) ও হারুন (আ) আল্লাহ্র নিকট দু'আ করিলেন, হে আমাদের প্রতিপালক! বানূ ইসরাঈল তো ধ্বংস হইয়া যাইবে। হে আমাদের প্রতিপালক! অবশিষ্টদিগকে বাঁচান। তখন আল্লাহ তাআলা তাহাদিগকে হাতিয়ার রাখিয়া দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। এইভাবে তাহাদের তওবা কবুল করা হইল। এক বর্ণনামতে যাহারা গো-বৎসের পূজা করে নাই তাহারা তরবারি হাতে যাহারা পূজা করিয়াছিল তাহাদিগকে হত্যা করে (দ্র. তাবারী, তারীখ, ১খ, ৪২৪; বিদায়া, ১ খৃ., ২৮৮)।
এক বর্ণনামতে এই সময় মূসা (আ) সামিরীকে হত্যা করিতে চাহিয়াছিলেন কিন্তু আল্লাহ তাঁহাকে নিষেধ করেন। কারণ পরবর্তীতে সে অভিশপ্ত জীবন যাপন করিয়া স্বীয় কৃতকর্মের শাস্তি ভোগ করিবে (আল-কামিল, ১খ, ১৪৭)।
📄 মূসা (আ)-এর সহিত বানু ইসরাঈলের ৭০ নেতার তূর পাহাড়ে গমন
আল্লাহর বিধান আনিবার জন্য হযরত মূসা (আ)-এর সহিত বানু ইসরাঈলের ৭০জন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি পাহাড়ে গমন করেন। তাহারা কি গোবৎস পূজা হইতে তওবা করার পূর্বে তূর পাহাড়ে গিয়াছিলেন না পরে সে সম্পর্কে দুই ধরনের বর্ণনা পাওয়া যায় : সুদ্দী, ইব্ন আব্বাস প্রমুখের বর্ণনামতে এই সত্তরজন ছিল বানু ইসরাঈলের আলিম। ইহাদের সহিত ছিলেন মূসা (আ), হারুন (আ), যূশা, হাদাব ও আবীহু। তাহারা মূসা (আ)-এর সহিত তুর পাহাড়ে গমন করেন বানু ইসরাঈলের গোবৎস পূজা হইতে তওবার পূর্বে 'আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করিবার এবং তওবার বিধান আনয়নের জন্য (ইব্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ২৮৯)।
অপর বর্ণনামতে বানু ইসরাঈলের গোবৎস পূজার অপরাধ যখন ক্ষমা করিয়া দেওয়া হইল তখন মূসা (আ) তাহাদিগকে বলিলেন, আমার নিকট এই ফলকে যাহা অবতীর্ণ হইয়াছে ইহা আল্লাহ্র কিতাব। আল্লাহ তাআলা তোমাদের হিদায়াত ও উভয় জগতের কল্যাণের জন্য আমার উপর অবতীর্ণ করিয়াছেন। ইহা তাওরাত। ইহার উপর ঈমান আনয়ন করা এবং ইহার হুকুম-আহকাম পালন করা তোমাদের জন্য ফরয। বানু ইসরাঈল বলিতে লাগিল, আমরা শুধুমাত্র তোমার কথায় কিভাবে বিশ্বাস করিতে পারি যে, ইহা আল্লাহর কিতাব? আমরা ইহার উপর তখনই ঈমান আনিব যখন আমরা চাক্ষুষ আল্লাহকে দেখিব এবং তিনি আমাদিগকে বলিবেন, 'এই তাওরাত আমার কিতাব, তোমরা ইহার উপর ঈমান আনয়ন কর'। মূসা (আ) তাহাদিগকে বুঝাইলেন যে, ইহা নির্বুদ্ধিতার কথা, এই চক্ষু দ্বারা তাঁহাকে দেখা সম্ভব নহে। কিন্তু বানু ইসরাঈলের পীড়াপীড়িতে সম্মত হইয়া তিনি বলিলেন, এত লোক তো আমার সহিত তূর পর্বতে যাওয়া যাইবে না, বরং তোমাদের মধ্য হইতে নেতৃস্থানীয় কিছু লোক বাছাই করিয়া লইয়া যাই, তাহারা আসিয়া যদি উহার সত্যতা স্বীকার করে তবে তোমরাও উহা মানিয়া লইবে। আর যেহেতু তোমরা কিছু কাল পূর্বে গো-বৎস পূজা করিয়া এক মারাত্মক অপরাধ করিয়াছ, এইজন্য নিজেদের অনুতাপ প্রকাশ করা এবং আল্লাহ্র নিকট সর্বদা নেক কাজ করার অঙ্গীকার করার ইহাই সমীচীন ক্ষেত্র। বানু ইসরাঈল ইহাতে সম্মত হইল। অতঃপর মূসা (আ) বানু ইসরাঈলের বিভিন্ন উপগোত্র হইতে ৭০জন আলিম ব্যক্তিকে বাছাই করিলেন (কাসাসুল কুরআন, ১খ, ৫০৪-৫০৫)। সকলকেই তিনি স্ব স্ব কাপড় ও শরীর পবিত্র করিবার এবং সাওম পালন করিবার নির্দেশ দিলেন, অতঃপর আল্লাহ্র নিকট হইতে একটি নির্দিষ্ট সময় লইয়া তুর পাহাড়ে রওয়ানা হইলেন।
মূসা (আ) তূর পর্বতের নিকটবর্তী হইলে তাঁহার উপর সাদা মেঘের আবরণ ও নূরের স্তম্ভ আসিয়া পড়িল। মূসা (আ) আল্লাহকে বলিলেন, হে আমার প্রতিপালক! তুমি বানু ইসরাঈল সম্পর্কে সম্পূর্ণরূপে অবহিত। তাই তোমার এই নূরের আবরণ হইতে তোমার ও আমার কথোপকথন যদি তাহারাও শুনিতে পাইত তবে কতইনা ভাল হইত! আল্লাহ তাঁহার এই আবদার মঞ্জুর করিলেন। অতঃপর সাদা মেঘের সেই আবরণ সম্পূর্ণ পর্বতকে ঢাকিয়া ফেলিল। মূসা (আ) উহাতে প্রবেশ করিলেন এবং তাঁহার সম্প্রদায়ের লোকজনকে বলিলেন, তোমরা আরো নিকবর্তী হও। তাহারাও উক্ত মেঘমালার আবরণের মধ্যে ঢুকিয়া পড়িল। মূসা (আ) যখন আল্লাহ্র সহিত কথা বলিতেন তখন তাঁহার মুখমণ্ডলে এমন এক দ্যুতিময় নূর আসিয়া পড়িত যে, কোনও মানুষ তাঁহার দিকে তাঁকাইতে পারিত না। তাই মূসা (আ) ও তাহাদের মধ্যে একটি পর্দার আবরণ দেওয়া হইল। অতঃপর তাহারা সকলেই সিজদায় পতিত হইল। সিজদা অবস্থায় তাহারা শুনিতে পাইল যে, মূসা (আ)-এর সহিত আল্লাহ তাআলা কথা বলিতেছেন। তাঁহাকে কিছু করিবার নির্দেশ দিতেছেন এবং কিছু বিষয় করিতে নিষেধ করিতেছেন।
অতঃপর আল্লাহ্র ঘোষণা ও নির্দেশ শেষ হইলে উক্ত মেঘমালার আবরণ তুলিয়া লওয়া হইল। তখন মূসা (আ) তাহাদের নিকট আসিলেন। এই সময় তাহারা তাহাদের পূর্বের দাবিতেই অটল থাকিয়া বলিল, আমরা যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহকে প্রত্যক্ষভাবে না দেখিব ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমান আনিব না (দ্র. ২ঃ ৫৫)। তাহাদের এই অবাধ্যতা, ধৃষ্টতা ও অসম্ভব বস্তু দর্শনের জন্য জিদ ও পীড়াপীড়ির কারণে আল্লাহ তাহাদিগকে মৃত্যু দিলেন। বিদ্যুতের এক ভয়ঙ্কর চমক, বজ্র কঠোর আওয়ায ও ভূমিকম্প আসিয়া তাহাদিগকে ধ্বংস করিয়া দিল। সকলেই মৃত অবস্থায় ভূমিতে পড়িয়া রহিল। এইভাবে তাহারা এক দিন এক রাত্রি পড়িয়া থাকে। কেহ কেহ বলিয়াছেন যে, তাহারা প্রকৃতপক্ষে মারা যায় নাই; বরং এই ভয়ানক অবস্থায় তাহারা আতঙ্কগ্রস্ত হইয়া অচেতন হইয়া পড়িয়া থাকে (আবুস-সুউদ, তাফসীর, ১খ, ১৭৭)। তবে এই মত কুরআন করীমের আয়াতের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নহে (২:৫৬)।
এই দৃশ্য দেখিয়া মূসা (আ) কাঁদিয়া ফেলিলেন এবং অত্যন্ত কাকুতি-মিনতিভরে আল্লাহ্র নিকট দু'আ করিলেন, হে আমার প্রতিপালক! তুমি ইচ্ছা করিলে তো পূর্বেই ইহাদিগকে এবং আমাকেও ধ্বংস করিতে পারিতে। আমাদের মধ্যে নির্বোধগণের কর্মফলে আমাদিগকে কি ধ্বংস করিয়া দিবে (দ্র. ৭: ১৫৫)! আমি তাহাদের মধ্যে বাঁছাই করিয়া সত্তরজন উত্তম লোককে লইয়া আসিয়াছি। আমি ফিরিয়া গিয়া বানু ইসরাঈলকে এখন কী বলিব! ইহাদিগকে ছাড়া আমি ফিরিয়া গেলে তো বানু ইসরাঈলের লোকজন আমাকে বিশ্বাস করিবে না। "ইহা তো শুধু তোমার পরীক্ষা যদ্বারা তুমি যাহাকে ইচ্ছা বিপথগামী কর এবং যাহাকে ইচ্ছা সৎপথে পরিচালিত কর। তুমিই তো আমাদের অভিভাবক। সুতরাং আমাদিগকে ক্ষমা কর ও আমাদের প্রতি দয়া কর। ক্ষমাশীলদের মধ্যে তুমিই তো শ্রেষ্ঠ। আমাদের জন্য নির্ধারিত কর ইহকাল ও পরকালের কল্যাণ, আমরা তোমার নিকট প্রত্যাবর্তন করিয়াছি" (দ্র. ৭: ১৫৫-১৫৬)। আল্লাহ তা'আলা মূসা (আ)-এর এই দু'আ কবুল করিলেন এবং ইরশাদ করিলেন :
عذابي أصيب بِهِ مَنْ أَشَاءُ وَرَحْمَتِي وَسِعَتْ كُلَّ شَيْءٍ فَسَاكْتُبُهَا لِلَّذِينَ يَتَّقُونَ، وَيُؤْتُونَ الزَّكَوٰةَ وَالَّذِينَ هُمْ بِآيَاتِنَا يُؤْمِنُونَ (١٥٦ : ٧)
"আমার শান্তি যাহাকে ইচ্ছা দিয়া থাকি, আর আমার দয়া—তাহা তো প্রত্যেক বস্তুতেই ব্যাপ্ত। সুতরাং আমি উহা তাহাদের জন্য নির্ধারিত করিব যাহারা তাকওয়া আবলম্বন করে, যাকাত দেয় ও আমার নিদর্শনে বিশ্বাস করে" (৭: ১৫৬)।
অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাহাদিগকে পুনরায় জীবিত করিলেন। তাহারা এক একজন করিয়া জীবিত হইতেছিল এবং দাঁড়াইয়া একে অপরের প্রতি বিস্ময়ের দৃষ্টিতে তাঁকাইতেছিল (তারীখ তাবারী, ১খ, ৪২৯; আল-কামিল, ১খ, ১৪৭)।
📄 বানু ইসরাঈলের উপর তূর পর্বত উত্তোলন
বানু ইসরাঈলের উক্ত সত্তর ব্যক্তি নিজ সম্প্রদায়ের নিকট ফিরিয়া আসিয়া সকল ঘটনা বিবৃত করিল এবং সাক্ষ্য দিল যে, মূসা (আ) যাহা আনয়ন করিয়াছেন উহা আল্লাহ্রই কিতাব তাওরাত এবং আমাদের জন্য পালনীয় বিধান। কিন্তু তাহারা ইহাকে সত্য বলিয়া জানা সত্ত্বেও তাওরাতের বিধান পালন করা কষ্টসাধ্য মনে করিল এবং উহার উপর আমল করিতে অস্বীকার করিল। তখন আল্লাহ তাআলার নির্দেশে জিবরাঈল (আ) বানু ইসরাঈলের সমুদয় লোককে ঢাকিয়া ফেলিতে পারে, তূর পর্বতের এমন বিশাল একটি অংশ তাহাদের উপর তুলিয়া ধরিলেন। উহা দৈর্ঘ্য ও প্রস্থে ছিল এক ফারসাখ। এক বর্ণনামতে জিবরাঈল (আ) উহা ফিলিস্তীন হইতে আনিয়া তাহাদের মাথা হইতে একজন মানুষের সমান উঁচুতে ধরিলেন। তাহাদের সম্মুখে অগ্নি ও পিছনে সমুদ্র হাজির করা হইল এবং আল্লাহ বলিলেন, আমি যাহা দিলাম দৃঢ়তার সহিত তাহা গ্রহণ কর এবং তাহাতে যাহা আছে তাহা স্মরণ রাখ, যাহাতে তোমরা সাবধান হইয়া চলিতে পার (২ঃ ৬৩; তু. ৭: ১৭১)। অন্যত্র বর্ণিত হইয়াছে, আল্লাহ বলিলেন, আমি যাহা দিলাম তাহা দৃঢ়রূপে গ্রহণ কর এবং শ্রবণ কর (২ঃ ৯৩)। তোমরা যদি ইহা কবুল কর এবং তোমাদের যাহা নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে তাহা পালন কর তো ভাল, নতুবা এই পর্বত দ্বারা তোমাদিগকে পিষ্ট করা হইবে, এই সমুদ্রে তোমাদিগকে ডুবাইয়া মারা হইবে এবং এই অগ্নি দ্বারা তোমাদিগকে দগ্ধীভূত করা হইবে।
তাহারা যখন দেখিল যে, পলায়নের আর কোন পথ নাই তখন তাহারা উহা গ্রহণ করিল। এক বর্ণনামতে তাহারা মুখে বলিল, আমরা শ্রবণ করিলাম কিন্তু মনে মনে বলিল, 'অমান্য করিলাম' (ইফাবা প্রণীত আল-কুরআনুল করীম-এর ৬৯ নং টীকা, ২ : ৯৩ আয়াত দ্র.)। অতঃপর তাহারা মুখমণ্ডলের এক দিক দিয়া সিজদা করিল। সিজদারত অবস্থায়ই তাহারা মুখমণ্ডলের অপর দিক দিয়া পর্বতের দিকে তাঁকাইয়া দেখিতে লাগিল পাছে উহা আবার তাহাদিগকে পিষ্ট করিয়া ফেলে কিনা। তাহারা মনে করিয়াছিল যে, উহা তাহাদের উপর পড়িয়া যাইবে (৭ : ১৭১)। অতঃপর ইহাই বানু ইসরাঈলদের সিজদার পদ্ধতি হইয়া দাঁড়ায় যে, তাহারা মুখমণ্ডলের এক পার্শ্ব দিয়া সিজদা করে (আল-কামিল, ১খ, ১৪৭-১৪৮)। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, কয়েক দিন যাইতে না যাইতেই তাহাদের মজ্জাগত স্বভাববশে এই অঙ্গীকারও তাহারা ভঙ্গ করিল (দ্র. ২ : ৬৪)।
বাইবেলে পর্বত উত্তোলনের কথা উল্লেখ নাই, বরং বলা হইয়াছে যে, উহা কাঁপিতেছিলঃ "তাহা (পর্বত) হইতে ধূম উঠিতে লাগিল এবং পর্বত অতিশয় কাঁপিতে লাগিল" (যাত্রাপুস্তক, ১৯ : ১৮)।
কোনও কোনও তাফসীরকার পর্বত উত্তোলনের বিষয়টি এড়াইয়া গিয়া উহার কষ্ট-কল্পিত ব্যাখ্যা প্রদান করিয়াছেন। মাওলানা আবুল কালাম আযাদও তাঁহার তাফসীর গ্রন্থ তারজুমানুল কুরআন-এ উল্লেখ করিয়াছেন যে, পর্বত উত্তোলন করা হয় নাই, বরং ভূমিকম্পের ফলে উহা এমন প্রবলভাবে কম্পিত হইতেছিল যে, মনে হইতে লাগিল উহা তাহাদের উপর পড়িয়া যাইবে (আম্বিয়া-ই কুরআন, ২খ, ২৩১)। কিন্তু কুরআন কারীমের সুস্পষ্ট বর্ণনায় প্রতীয়মান হয় যে, এই ধরনের ব্যাখ্যা উহার সহিত সঙ্গতিপূর্ণ নহে।