📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মূসা (আ) কর্তৃক আল্লাহর দীদার লাভের আবেদন

📄 মূসা (আ) কর্তৃক আল্লাহর দীদার লাভের আবেদন


তূর পর্বতে হযরত মূসা (আ) যখন রোযা, ই'তিকাফ ও আল্লাহর ইবাদতে চল্লিশ দিন পূর্ণ করিলেন তখন ১০ যিলহজ্জ ঈদুল আযহার রাত্রিতে আড়াল হইতে আল্লাহ তাআলা তাঁহার সহিত বাক্যালাপ করিলেন। মূসা (আ) খুব নিকট হইতেই তাহা শুনিতে পাইতেছিলেন। দীর্ঘ চল্লিশটি দিন অনবরত তিনি যাঁহার ধ্যান করিয়াছেন, এক্ষণে অন্তরাল হইতে যাঁহার কথা শুনিতেছেন সেই প্রিয়তম ও মহিমাময় সত্তাকে স্বচক্ষে দেখার দুর্বার আগ্রহ ও আকর্ষণ তাঁহার অন্তরে জাগ্রত হইল। তিনি আগ্রহ আর চাপিয়া রাখিতে পারিলেন না। মনের কথাটি আল্লাহ তাআলাকে বলিয়া ফেলিলেন, "ওগো আমার প্রতিপালক! আমাকে দর্শন দাও, আমি তোমাকে দেখিব।" কিন্তু ইহা যে অসম্ভব, ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ায় এই চর্মচক্ষু দিয়া সেই জ্যোতির্ময় সত্তাকে দেখা যায় না। তাই আল্লাহ তাআলা তাঁহাকে জানাইয়া দিলেন, "(দুনিয়াতে) তুমি কখনও আমাকে দেখিতে পাইবে না"। কারণ আমার তাজাল্লীর ঝলক তুমি সহ্য করিতে পারিবে না। প্রকৃতপক্ষে সে সামর্থ্য মূসা (আ)-এর ছিল না। কারণ মানুষের তুলনায় অত্যধিক শক্ত ও বৃহৎ স্থির পর্বত পর্যন্ত আল্লাহ্ তাজাল্লী সহ্য করার সামর্থ রাখে না, উহা স্থির ও ঠিক থাকিতে পারে না। পাছে মূসা (আ) মনক্ষুণ্ণ হইবেন তাই আল্লাহ তাঁহাকে একটু বাস্তব অভিজ্ঞতা প্রদানের ইচ্ছা করিলেন। বলিলেন, "তুমি বরং পাহাড়ের প্রতি লক্ষ্য কর, উহা স্বস্থানে স্থির থাকিলে তবে তুমি আমাকে দেখিতে পারিবে" (৭: ১৪৩)। অতঃপর আল্লাহ তাআলা উক্ত তুর পাহাড়ে স্বীয় তাজাল্লীর সামান্যতম পরিমাণ প্রকাশ করিলেন।
আর মূসা (আ) উক্ত দৃশ্যের ঝলক সহ্য করিতে না পারিয়া বেহুঁশ হইয়া মাটিতে লুটাইয়া পড়িলেন। পরে হুঁশ ফিরিয়া আসিতেই সর্বপ্রথম তিনি অনুতপ্ত হইলেন এই ভাবিয়া যে, কেন আমি আল্লাহ তাআলার অনুমতি ব্যতীত তাঁহার নিকট এমন জিনিসের যাজ্ঞা করিয়াছি, যাহা মোটেই সমীচীন নহে। তাই তিনি আল্লাহর প্রশংসা করিয়া নিজের আচরণের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করিলেন এবং তিনি পূর্ব হইতেই মু'মিন বলিয়া ঘোষণা করিলেন: سُبْحَانَكَ تُبْتُ إِلَيْكَ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُؤْمِنِينَ "মহিমাময় তুমি, আমি অনুতপ্ত হইয়া তোমাতেই প্রত্যাবর্তন করিলাম এবং মু'মিনদের মধ্যে আমিই প্রথম" (৭: ১৪৩)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 তাওরাত অবতরণ

📄 তাওরাত অবতরণ


এই তূর পর্বতে মুসা (আ)-এর ৪০ দিনের রোযা ও ই'তিকাফ পূর্ণ হইবার পর আল্লাহ তাআলা তাঁহার উপর তাওরাত কিতাব অবতীর্ণ করেন, যাহা ৪ (চার) খানি আসমানী কিতাবের অন্যতম। এই কিতাব অবতরণ করিয়া আল্লাহ তাআলা তাঁহাকে উহা দৃঢ়ভাবে ধারণ করিবার নির্দেশ দেন এবং তাঁহার সম্প্রদায়কে নির্দেশ দিতে বলেন, তাহারাও যেন দৃঢ়ভাবে উহা ধারণ করে। তাহাদের উভয় জগতের সফলতা ও কল্যাণের বিস্তারিত বিবরণ ইহাতে রহিয়াছে। ইহাতে হালাল-হারাম, ভাল-মন্দ তথা সকল আদেশ-নিষেধ স্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হইয়াছে। ইহাই তাহাদের শারীআত। কুরআন কারীমে এই সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছে: قَالَ يَا مُوسَى إِنِّي اصْطَفَيْتُكَ عَلَى النَّاسِ بِرِسُلْتِي وَبِكَلامِي فَخُذْ مَا أَتَيْتُكَ وَكُنْ مِّنَ الشَّاكِرِينَ. وَكَتَبْنَا لَهُ فِي الأَلْواحِ مِنْ كُلِّ شَيْءٍ مُوْعِظَةً وَتَفْصِيلاً لِكُلِّ شَيْءٍ فَخُذْهَا بِقُوَّةٍ وَأَمُرْ قَوْمَكَ يَأْخُذُوا بِأَحْسَنِهَا سَأُورِيكُمْ دار الفاسِقِينَ (١٤٥-١٤٤ : ٧) "তিনি বলিলেন, হে মূসা! আমি তোমাকে আমার রিসালাত ও বাক্যালাপ দ্বারা মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়াছি, সুতরাং আমি যাহা দিলাম তাহা গ্রহণ কর এবং কৃতজ্ঞ হও। আমি তাহার জন্য ফলকে সর্ব বিষয়ে উপদেশ ও সকল বিষয়ের স্পষ্ট ব্যাখ্যা লিখিয়া দিয়াছি। সুতরাং এইগুলি শক্তভাবে ধর এবং তোমার সম্প্রদায়কে উহাদের যাহা উত্তম তাহা গ্রহণ করিতে নির্দেশ দাও। আমি শীঘ্র সত্যত্যাগীদের বাসস্থান তোমাদিগকে দেখাইব" (৭: ১৪৪-১৪৫)।
এখানে দুইটি বিষয় প্রণিধানযোগ্য: (১) বিজ্ঞ আলিমগণের মতে তূর পাহাড়ের এই ঘটনায় যে সকল হুকুম অবতীর্ণ হয় উহাই তাওরাত। আধুনিক খৃস্টান পণ্ডিতগণ বলেন, এই সময় সেই দশটি হুকুম অবতীর্ণ হয় যাহা মূসা (আ)-এর "শরীআত বা আকাঙ্খাসমূহ" (أحكام عهد) নামে প্রসিদ্ধ। আর তাহা হইল: (১) আমার সাক্ষাতে তোমার জন্য দেবতা না থাকুক; (২) তুমি আপনার নিমিত্তে খোদিত প্রতিমা নির্মাণ করিও না; উপস্থিত স্বর্গে, নীচস্থ পৃথিবীতে ও পৃথিবীর নীচস্থ জল মধ্যে যাহা যাহা আছে, তাহাদের মূর্তি নির্মাণ করিও না; তুমি তাহাদের কাছে প্রণিপাত করিও না এবং তাহাদের সেবা করিও না। কেননা তোমার ঈশ্বর সদাপ্রভু আমি স্বগৌরব রক্ষণে উদ্যোগী ঈশ্বর; আমি পিতৃগণের অপরাধের প্রতিফল সন্তানদের প্রতি বর্তাই, যাহারা আমাকে দ্বেষ করে তাহাদের তৃতীয় চতুর্থ পুরুষ পর্যন্ত বর্তাই; কিন্তু যাহারা আমাকে প্রেম করে ও আমার আজ্ঞা সকল পালন করে আমি তাহাদের সহস্র পুরুষ পর্যন্ত দয়া করি।
(৩) তোমার ঈশ্বর সদাপ্রভুর নাম অনর্থক লইও না। কেননা যে কেহ তাঁহার নাম অনর্থক লয়, সদাপ্রভু তাহাকে নির্দোষ করিবেন না।
(৪) তুমি বিশ্রাম দিন স্মরণ করিয়া পবিত্র করিও, ছয় দিন শ্রম করিও, আপনার সমস্ত কার্য করিও; কিন্তু সপ্তম দিন তোমার ঈশ্বর সদাপ্রভুর উদ্দেশ্যে বিশ্রাম দিন; সেদিন তুমি কি তোমার পুত্র কি কন্যা কি তোমার দাস কি দাসী, কি তোমার পশু, কি তোমার পুরদ্বারের মধ্যবর্তী বিদেশী, কেহ কোন কার্য করিও না। কেননা সদাপ্রভু আকাশমণ্ডল ও পৃথিবী, সমুদ্র ও সেই সকলের মধ্যবর্তী সমস্ত বস্তু ছয় দিনে নির্মাণ করিয়া সপ্তম দিনে বিশ্রাম করিলেন; এইজন্য সদাপ্রভু বিশ্রাম দিনকে আশীর্বাদ করিলেন ও পবিত্র করিলেন।
(৫) তোমার পিতাকে ও তোমার মাতাকে সমাদর করিও, যেন তোমার ঈশ্বর সদাপ্রভু তোমাকে যে দেশ দিবেন, সেই দেশে তোমার দীর্ঘ পরমায়ু হয়।
(৬) নরহত্যা করিও না।
(৭) ব্যভিচার করিও না।
(৮) চুরি করিও না।
(৯) তোমার প্রতিবাসীর বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষ্য দিও না।
(১০) তোমার প্রতিবাসীর গৃহে লোভ করিও না; প্রতিবাসীর স্ত্রীতে কিম্বা তাহার দাসে কি দাসীতে কিম্বা তাহার গোরুতে কি গর্দভে, প্রতিবাসীর কোন বস্তুতেই লোভ করিও না, (যাত্রাপুস্তক ২০:৩-১৭)।
আধুনিক কালের কোন কোন মুফাসসিরেরও মত এই যে, এই সময় "আজ্ঞাসমূহ" অবতীর্ণ হয়। কিন্তু শেষোক্ত উভয় মতই কুরআন কারীম ও বাইবেলের বর্ণনামতে ভ্রান্ত; প্রথম মতটিই নির্ভুল ও সঠিক। কারণ কুরআন কারীম সূরা বাকারায় মূসা (আ)-এর চল্লিশ দিন ই'তিকাফের বর্ণনা দিয়া যখন হুকুম অবতীর্ণ করার কথা বর্ণনা করা হইয়াছে তখন উহাকে 'কিতাব' ও 'ফুরআন' বলা হইয়াছে। এই উভয় বিশেষণই কুরআন কারীমে তাওরাত-এর জন্য বলা হইয়াছে, "আজ্ঞাসমূহ"-এর জন্য নহে (দ্র. ২:৪৫১)। অতঃপর ইরশাদ হইয়াছে:
وَإِذْ أَتَيْنَا مُوسَى الْكِتَابَ وَالْفُرْقَانَ لَعَلَّكُمْ تَهْتَدُونَ . (٥٣ : ٢)
"যখন আমি মূসাকে কিতাব ও ফুরকান দান করিয়াছিলাম যাহাতে তোমরা সৎপথে পরিচারিত হও" (২ঃ ৫৩)।
ইহাতে বুঝা যায় যে, তূর পর্বতে চল্লিশ দিন ই'তিকাফ সম্পন্ন করার পর মূসা (আ)-কে যে বিধান সম্বলিত ফলকসমূহ দেওয়া হইয়াছিল তাহাই ছিল "তাওরাত", কেবল "আজ্ঞাসমূহ" সম্বলিত ফলক তাওরাত নহে (দ্র. ২৪ ৫১)। বাইবেলের ইংরেজী কপির অনুবাদ এ এবং আরবী ও উরদূ কপিতে "শারীআত" শব্দকে সঠিক বলিয়া মানিয়া লইলেও এই শব্দ ব্যাপক অর্থে তাওরাতকেই বুঝায়। আর তাওরাত, শারীআত ও বিধান বলিতে একই বস্তুকে বুঝানো হইয়াছে। আর প্রাচীন খৃষ্ট জগতে এই অর্থই গ্রহণ করা হইত। আজ্ঞাসমূহ উহারই একটি অংশ মাত্র (কাসাসুল কুরআন, ১খ, ৪৮৫-৮৬)।
(২) দ্বিতীয় প্রণিধানযোগ্য বিষয় হইল: আল্লাহ তা'আলা মূসা (আ)-কে তাওরাত প্রদান করিয়া বলিয়াছিলেন, "শীঘ্রই আমি তোমাদিগকে সত্যত্যাগীদের বাসস্থান দেখাইব"। এই বাসস্থান বলিতে কোন্ স্থান বুঝানো হইয়াছে, সে সম্পর্কে বিভিন্নজন বিভিন্ন ব্যাখ্যা প্রদান করিয়াছেন: (ক) ইহা দ্বারা আদ ও ছামূদ জাতির ধ্বংসস্তূপ বুঝানো হইয়াছে; (খ) মিসরকে বুঝানো হইয়াছে অর্থাৎ বনূ ইসরাঈল পুনরায় মিসরে প্রবেশ করিবে; (গ) কাতাদা (র) বলেন, ইহা দ্বারা সিরিয়া-এর পবিত্রভূমি বুঝানো হইয়াছে, যেখানে তখন আমালেকার স্বৈরাচারী ও অত্যাচারী বাদশাহদের রাজত্ব ছিল, আর সেখানেই বনূ ইসরাঈলগণের প্রবেশ করা আল্লাহ্ মঞ্জুরী ছিল। আবদুল ওয়াহ্হাব আন-নাজ্জার ও হিফজুর রাহমান সিউহারবী এই মতকেই প্রধান্য দিয়াছেন, (দ্র. কাসাসুল কুরআন, ১খ. ৪৮৬)।
এক বর্ণনামতে আল্লাহ তা'আলা মূসা (আ)-কে এই সময় তাওরাত-এর সহিত দশখানি সাহীফাও প্রদান করেন, যাহার উল্লেখ কুরআন কারীমের সূরা আ'লা-এর ১৯ নং আয়াতে রহিয়াছে : "(ইহা তো আছে) ইবরাহীম ও মূসার গ্রন্থে" (৮৭ঃ ১৯)।
তাওরাত নাযিল হয় প্রস্তর ফলকে লিখিত আকারে। এক বর্ণনায় উহা সবুজ বর্ণের ফলকে লিখিত ছিল। উহা সাতটি ভাগে বিভক্ত ছিল। কিন্তু মূসা (আ) যখন উহা মাটিতে সজোরে রাখিয়াছিলেন (এই সম্পর্কিত ঘটনা পরে আসিতেছে) তখন উহার ৭/৬ অংশ ভাঙ্গিয়া যায় এবং ৭/১ অংশ অক্ষত থাকে (আল-কামিল, ১খ, ১৪৬; তাবারী, তারীখ, ১খ, ৪২৭)। তবে উহা ইসরাঈলী বর্ণনা যাহা গ্রহণযোগ্য নহে।
বাইবেলে ২টি ফলকের কথা বলা হইয়াছে। উহাতে উক্ত কিতাবের বিবরণ এইভাবে দেওয়া হইয়াছে: "পরে মোশি মুখ ফিরাইলেন, সাক্ষ্যের সেই দুই প্রস্তর ফলক হস্তে লইয়া পৰ্ব্বত হইতে নামিলেন; সে প্রস্তর ফলকের এ পৃষ্ঠে ও পৃষ্ঠে, দুই পৃষ্ঠেই লেখা ছিল। সেই প্রস্তর ফলক ঈশ্বরের নির্মিত এবং সেই লেখা ঈশ্বরের লেখা, ফলকে খোদিত” (যাত্রাপুস্তক, ৩২: ১৫-১৬)।
যাত্রাপুস্তকের ৩১: ১৮-এও ফলকের সংখ্যা দুইটির কথা উল্লিখিত হইয়াছে। বলা হইয়াছে, "পরে তিনি সীনয় পর্ব্বতে মোশির সহিত কথা সাঙ্গ করিয়া সাক্ষ্যের দুই ফলক, ঈশ্বরের অঙ্গুলী দ্বারা লিখিত দুই প্রস্তর ফলক তাহাকে দিলেন" (যাত্রাপুস্তক, ৩১: ১৮)। উক্ত পুস্তকের ৩৪: ২৯-এও দুইটি ফলকের কথা উল্লিখিত হইয়াছে, অবশ্য ৩১: ১৮ হইতে ইহাও জানা যায়, ফলকদ্বয় প্রস্তর নির্মিত ছিল। বাইবেলে বর্ণিত হইয়াছে যে, মূল ফলক মূসা (আ) বনূ ইসরাঈলের গোবৎস পূজার ফলে রাগান্বিত হইয়া ভাঙ্গিয়া ফেলেন। অতঃপর তাহার দুআর ফলে তাহাকে অন্য সাদা ফলক প্রদান করা হয়, যাহার উপর আল্লাহ্র নির্দেশে মূসা (আ) নিজ হস্তে লিখিয়া লন। বর্ণিত হইয়াছে, "আর সদাপ্রভু মোশিকে কহিলেন, তুমি এই সকল বাক্য লিপিবদ্ধ কর, কেননা আমি এই সকল বাক্যানুসারে তোমার ও ইস্রায়েলের সহিত নিয়ম স্থির করিলাম, সেই সময়ে মোশি চল্লিশ দিবারাত্র সেখানে সদাপ্রভুর সহিত অবস্থিতি করিলেন, অন্ন, ভোজন ও জল পান করিলেন না। আর তিনি সেই দুই প্রস্তরে নিয়মের বাক্যগুলি লিখিলেন" (যাত্রাপুস্তক, ৩৪: ২৭-২৮)।
আল্লাহ তাআলা বানু ইসরাঈলের প্রতি দিনে দুই ওয়াক্ত সালাত এবং হজ্জ ফরয করেন (আল-মুনতাজাম, ১খ, ৩৫২)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বানু ইসরাঈলের গো-বৎস পূজা

📄 বানু ইসরাঈলের গো-বৎস পূজা


মূসা (আ) তুর পাহাড়ে গমনের সময় স্বীয় সম্প্রদায়কে বলিয়া গিয়াছিলেন যে, ত্রিশ দিনের পর তিনি তাহাদের জন্য কিতাব ও শরীআত লইয়া আগমন করিবেন। তাই উক্ত ত্রিশ দিন পার হইবার পরও যখন মূসা (আ) কিতাব লইয়া আগমন করিলেন না তখন বানু ইসরাঈল অধৈর্য হইয়া পড়িল এবং ফিতনায় নিপতিত হইল।
এদিকে আল্লাহর নবী হারুন (আ) বানু ইসরাঈলকে নির্দেশ দিলেন যে, কিবতীগণ হইতে যে স্বর্ণালংকারসমূহ তোমরা ধারস্বরূপ লইয়া আসিয়াছিলে তাহা এখন গনীমতের মাল। আর গনীমতের মাল তোমাদের জন্য বৈধ নহে। তাই যাহার যাহার নিকট সেইগুলি আছে সে যেন তাহা একটি গর্তে জমা করিয়া মাটিচাপা দিয়া রাখে। অতঃপর মূসা আসিয়া যদি গনীমতের মাল তোমাদের জন্য হালাল করেন তবে তোমরা উহা লইয়া যাইও নতুবা এইভাবেই উহা থাকিবে। অতঃপর তাহারা স্বর্ণালংকার গর্তে জমা করিল।
তাহাদের মধ্যে সামিরী নামে এক লোক ছিল। এক বর্ণনামতে সে বানু ইসরাঈলের প্রতিবেশী এক সম্প্রদায়ের লোক ছিল। তাহার সম্প্রদায় গাভীর পূজা করিত। সে মূসা ও বানু ইসরাঈলের সঙ্গে আসিয়াছিল (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ৩০৫)। অপর এক বর্ণনামতে, সে জাযীরা অঞ্চলের রিক্কা নামক স্থানের নিকটবর্তী বালীখ-এর একটি গ্রাম 'বাজারমা-এর অধিবাসী। মতান্তরে সে ছিল বানু ইসরাঈল বংশীয় লোক (আল-কামিল, ১খ, ১৪৫)। ইমাম তাবারীর বর্ণনামতে তাহার নাম ছিল মূসা ইব্‌ন জা'ফার (আত-তাবারী, তারীখ, ১খ, ৪২৫)। জিবরীল (আ) যখন ঘোড়ায় চড়িয়া মূসা (আ)-এর নিকট তাঁহাকে লইয়া যাইবার জন্য আগমন করিয়াছিলেন তখন সামিরী তাহা দেখিয়াছিল। উহা তাহার নিকট আশ্চর্য ও বিস্ময়কর মনে হইয়াছিল (প্রাগুক্ত, পৃ. ৪২২)। এক বর্ণনামতে সে দেখিতেছিল, ঘোড়াটি যেখানেই পা রাখিতেছে উহার ক্ষুরের নীচ হইতে সবুজ ঘাস উৎপাদিত হইতেছে (আল-বিদায়া, ১খ, ২৮৮)। তখন সে মনে মনে ভাবিল, ইহার একটি ভিন্ন গুণ ও বৈশিষ্ট্য রহিয়াছে। তাই সে ঘোড়ার ক্ষুরের নিচ হইতে একটু মাটি উঠাইয়া রাখিয়াছিল। এক বর্ণনামতে এই মাটি সে ফিরআওনের পানিতে ডুবিয়া মরার পূর্ব মুহূর্তে জিবরীল (আ)-এর ঘোড়ার ক্ষুরের নীচ হইতে উঠাইয়া রাখিয়াছিল।
বানু ইসরাঈল উক্ত স্বর্ণালংঙ্কার জমা করার পর সামিরী উহার মধ্যে এই মাটি নিক্ষেপ করিল। এক বর্ণনামতে স্বর্ণালংকারসমূহ অগ্নিতে গলানো হয়। ভিন্নমতে সামিরী তিন দিন ধরিয়া উহা দ্বারা একটি গোবৎস তৈরি করে (আল-কামিল, ১খ, ১৪৬)। অতঃপর সামিরী উহাতে উক্ত মাটি নিক্ষেপ করিলে উহা 'হাম্বা' 'হাম্বা' রব করিতে আরম্ভ করে। কাতাদার বর্ণনামতে মাটি নিক্ষেপের পর তাহার শরীর রক্ত-মাংসের দেহে পরিণত হইয়া গিয়াছিল (১খ, ২৮৭)। গোবৎসটি ডাকিতেছিল আর চলাফেরা করিতেছিল। এক বর্ণনামতে একবারই মাত্র উহা ডাকিয়াছিল। অপর এক বর্ণনামতে বাতাস যখন উহার পিছন দিয়া ভিতরে প্রবেশ করিতেছিল তখন উহা গোবৎস ডাকার ন্যায় শব্দ করিতেছিল। তখন বানু ইসরাঈল উহার চতুষ্পার্শ্ব ঘিরিয়া ঘুরিয়া নৃত্য ও আনন্দ করিতে লাগিল (প্রাগুক্ত)। ইহা দেখিয়া সামিরী বানু ইসরাঈলকে বলিল, এই হইল তোমাদের ও মূসার ইলাহ। অথচ সে ভুলিয়া গিয়াছে (দ্র. ২০:৮৮)। তাই ইহা ত্যাগ করিয়া অন্যত্র গিয়াছে ইলাহের সন্ধানে।
অতঃপর বানু ইসরাঈল উহার পূজা শুরু করিয়া দিল। হযরত হারূন (আ) তাহাদিগকে উহা হইতে বারণ করিলেন এবং বলিলেন যে, ইহা দ্বারা তাহাদিগকে পরীক্ষায় ফেলা হইয়াছে। তাহাদের আসল প্রতিপালক হইলেন দয়াময় আল্লাহ। সুতরাং আল্লাহ্র নির্দেশ পালন করিতে হইলে তোমরা আমার অনুসরণ কর এবং আমারই নির্দেশ মানিয়া চল (দ্র. ২০:৯০)। অতঃপর কিছু লোক তাঁহার কথা মান্য করিয়া তাঁহার আনুগত্য করিল আর অধিকাংশ লোক অমান্য করিয়া সেই গোবৎসের পূজা করিতে লাগিল। তাহারা বলিল, মূসা আমাদের মধ্যে ফিরিয়া না আসা পর্যন্ত আমরা ইহারই পূজা করিতে থাকিব (দ্র. ২০:৯১)। অতঃপর হারূন (আ) তাহাদের সহিত বিবাদ বা যুদ্ধ না করিয়া নিজে ও-তাঁহার অনুসারিগণসহ সত্যের উপর অনড় রহিলেন (আল-কামিল, ১খ, ১৪৬)। আল্লাহ তাআলা তাহাদের এই অপরিণামদর্শী ও অযৌক্তিক কাজের অসারতা বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেন:
أَفَلَا يَرَوْنَ أَلَّا يَرْجِعُ إِلَيْهِمْ قَوْلًا وَلَا يَمْلِكُ لَهُمْ ضَرًّا وَلَا نَفْعًا (২০:৮৯)
"তবে কি উহারা ভাবিয়া দেখে না যে, উহা তাহাদের কথায় সাড়া দেয় না এবং তাহাদের কোন ক্ষতি অথবা উপকার করিবার ক্ষমতাও রাখে না" (২০ঃ৮৯)?
হযরত মূসা (আ) তূর পর্বতে আগমন করিয়া আল্লাহ্র সহিত সাক্ষাৎ বাক্যালাপ করিলেন। এক বর্ণনামতে মূসা (আ) তাওরাত আনিতে তুর পাহাড়ে যাওয়ার সময় সঙ্গে কয়েকজন গোত্রীয় প্রধানকে লইয়া যান। তিনি আল্লাহ্র সঙ্গে কথোপকথনের আগ্রহে তাহাদের পূর্বেই তথায় পৌছিয়া গিয়াছিলেন (দ্র. ইফা প্রণীত আল-কুরআনুল করীম-এর ৪৬৬ নং টীকা, ২০:৮৩ আয়াত)।
আল্লাহ তাআলা মূসা (আ)-কে ত্বরা করিয়া আগমনের কারণ জিজ্ঞাসা করিলে মূসা (আ) জানাইলেন যে, আল্লাহর সন্তুষ্টি বিধানের জন্যই তিনি এইরূপ করিয়াছেন। সম্প্রদায়ের লোকেরা পিছনে আসিতেছে (দ্র. ২০:৮৩-৮৪)। অতঃপর আল্লাহ তাআলা তাঁহাকে তাঁহার রাখিয়া আসা সম্প্রদায়ের গোমরাহীর খবর জানাইয়া দিলেন। বলিলেন, আমি তোমার সম্প্রদায়কে পরীক্ষায় ফেলিয়াছি। তুমি চলিয়া আসার পর সামিরী উহাদিগকে পথভ্রষ্ট করিয়াছে (দ্র. ২০:৮৫)। কুফরীর কারণে তাহাদের অন্তরে গোবৎস প্রীতি সিঞ্চিত হইয়াছিল (দ্র. ২:৯৩)।
একদিকে নির্ভেজাল তাওহীদের বিধান প্রদান, অপরদিকে যাহাদের জন্য এই বিধান তাহারাই প্রকাশ্য শিরকে নিমজ্জিত হইয়াছে! ফলে একজন পয়গাম্বরের মানসিক অবস্থা কিরূপ হইতে পারে তাহা সহজেই অনুমেয়। মূসা (আ) স্বীয় সম্প্রদায়ের এইরূপ গোমরাহী ও শিরকের সংবাদ পাইয়া ক্রুদ্ধ ও ক্ষুব্ধ হইলেন। তাঁহার কম্পিত হাত হইতে তাওরাতের ফলক পড়িয়া গেল। তিনি স্বীয় ভ্রাতা হারুন (আ)-এর দাড়ি ও চুল ধরিয়া টান দিলেন। বলিলেন, হারুন! তুমি যখন তাহাদিগকে গোমরাহ হইতে দেখিলে তখন আমার আনুগত্যের কথা কেন বল নাই? তুমি কি আমার নির্দেশ অমান্য করিয়াছ? আসলে মূসা (আ) একেতো সম্প্রদায়ের সরাসরি কুফরীতে নিমজ্জিত দেখিয়া চরমভাবে ক্ষুব্ধ হইয়াছিলেন, তাহার উপর আবার মনে করিয়াছিলেন হারুন (আ) বুঝি তাঁহার রিসালাতের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেন নাই। সেইজন্য আল্লাহর হুকুমকে প্রাধান্য দিয়া স্বীয় ভ্রাতা হারুন (আ) বয়সে বড় হওয়া সত্ত্বেও তাঁহার দাড়ি ও চুল ধরিয়া টান দিয়াছিলেন। ইহা ছিল তাঁহার ঈমানী জযবা ও আল্লাহ্ জন্যই ভালবাসা ও আল্লাহর জন্যই ক্রোধ-এর বহিঃপ্রকাশ, কাহাকেও অপমান করার উদ্দেশ্য ও প্রয়াস নহে। হারুন (আ) তখন প্রকৃত ঘটনা ব্যক্ত করিয়া বলিলেন, ভ্রাত! আমার দাড়ি বা চুল ধরিও না, আমি তো তাহাদিগকে নিষেধ করিয়াছি, তবে তাহাদের সহিত বিবাদে লিপ্ত হই নাই, এইজন্য যে, তুমি ফিরিয়া আসিয়া বলিবে, তুমি বানু ইসরাঈলের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করিয়া দিয়াছ; আমার কথার প্রতি দৃষ্টিপাত কর নাই (দ্র. ২০:৯২-৯৪)। তিনি আরও বলিলেন, হে আমার সহোদর! লোকেরা তো আমাকে দুর্বল মনে করিয়াছিল এবং আমাকে প্রায় হত্যাই করিয়া ফেলিয়াছিল। তুমি আমার সহিত এমন আচরণ করিও না যাহাতে শত্রুরা আনন্দিত হয়। আর আমাকে জালিমদের অন্তর্ভুক্তও মনে করিও না (দ্র. ৭: ১৫০)। মূসা (আ) তখন হারুন (আ)-এর নির্দোষিতা বুঝিতে পারিলেন। ইহাতে তাঁহার ক্রোধ প্রশমিত হইল। তখন আল্লাহ তাআলার নিকট দু'আ করিলেনঃ
رَبِّ اغْفِرْ لِي وَلأَخِي وَأَدْخِلْنَا فِي رَحْمَتِكَ وَأَنْتَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ (١٥١ : ٧) "হে আমার প্রতিপালক! আমাকে ও আমার ভ্রাতাকে ক্ষমা কর এবং আমাদিগকে তোমার রহমতের মধ্যে দাখিল কর। তুমিই শ্রেষ্ঠ দয়ালু" (৭৪৫১)।
অতঃপর তিনি তাঁহার সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, হে আমার সম্প্রদায়! তোমাদের প্রতিপালক কি তোমাদিগকে এক উত্তম প্রতিশ্রুতি দেন নাই যে, তিনি তোমাদের সঠিক পথে চলার বিধান দান করিবেন? তোমরা কেন তার আগেই এরূপ গর্হিত কাজ করিলে? তবে কি প্রতিশ্রুত কাল তোমাদের নিকট সুদীর্ঘ মনে হইয়াছিল, না তোমরা চাহিয়াছ তোমাদের প্রতি তোমাদের প্রতিপালকের ক্রোধ আপতিত হউক? তাহারা মূসা (আ)-এর ঈমানী তেজ ও রণমূর্তি দেখিয়া ভয় পাইয়া গেল এবং সবিনয়ে বলিল, আমরা তোমার প্রতি প্রদত্ত অঙ্গীকার স্বেচ্ছায় ভঙ্গ করি নাই; আমাদের উপর লোকের অলংকারের বোঝা চাপাইয়া দেওয়া হইয়াছিল এবং আমরা উহা অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করি, অনুরূপভাবে সামিরীও নিক্ষেপ করে (দ্র. ২০: ৮৬-৮৭)। অতঃপর তিনি সামিরীর কাছে গেলেন, বলিলেন, সামিরী! তোমার বক্তব্য কি? সে বলিল, আমি এমন জিনিস দেখিয়াছিলাম যাহা উহারা দেখে নাই। অতঃপর আমি সেই দূত জিবরাঈল (আ)-এর পদচিহ্ন হইতে একমুষ্টি মাটি লইয়াছিলাম, আমার প্রবৃত্তি আমাকে এই কাজে প্ররোচিত করিয়াছিল।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বানু ইসরাঈলের তওবা

📄 বানু ইসরাঈলের তওবা


বানু ইসরাঈলের গো-বৎস পূজার পর মূসা (আ)-এর সতর্কবাণীর ফলে নিজেদের ভুল বুঝিতে পারে এবং মূসা (আ)-এর নিকট এই পাপ হইতে তওবা করার উপায় জানিতে চাহে। অতঃপর তাহাদের অনুতাপের কারণে আল্লাহর পক্ষ হইতে তাহাদের জন্য তওবার বিধান দেওয়া হইল যে, তাহারা একে অপরকে যাহাকেই সম্মুখে পাইবে হত্যা করিবে (দ্র. ২ঃ৫৪)।
এমনিভাবে পারস্পরিক হত্যা ব্যাপক আকার ধারণ করিল। এমনকি নিহতের সংখ্যা দাঁড়াইল প্রায়-সত্তর হাজারে। বাইবেলে এই সংখ্যা তিন হাজার বলা হইয়াছে (যাত্রাপুস্তক, ৩২:২৭-২৮)। তখন মূসা (আ) ও হারুন (আ) আল্লাহ্র নিকট দু'আ করিলেন, হে আমাদের প্রতিপালক! বানূ ইসরাঈল তো ধ্বংস হইয়া যাইবে। হে আমাদের প্রতিপালক! অবশিষ্টদিগকে বাঁচান। তখন আল্লাহ তাআলা তাহাদিগকে হাতিয়ার রাখিয়া দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। এইভাবে তাহাদের তওবা কবুল করা হইল। এক বর্ণনামতে যাহারা গো-বৎসের পূজা করে নাই তাহারা তরবারি হাতে যাহারা পূজা করিয়াছিল তাহাদিগকে হত্যা করে (দ্র. তাবারী, তারীখ, ১খ, ৪২৪; বিদায়া, ১ খৃ., ২৮৮)।
এক বর্ণনামতে এই সময় মূসা (আ) সামিরীকে হত্যা করিতে চাহিয়াছিলেন কিন্তু আল্লাহ তাঁহাকে নিষেধ করেন। কারণ পরবর্তীতে সে অভিশপ্ত জীবন যাপন করিয়া স্বীয় কৃতকর্মের শাস্তি ভোগ করিবে (আল-কামিল, ১খ, ১৪৭)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00