📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বানু ইসরাঈলের জন্য খাদ্য-পানীয় ও ছায়ার ব্যবস্থা

📄 বানু ইসরাঈলের জন্য খাদ্য-পানীয় ও ছায়ার ব্যবস্থা


ইসরাঈলীগণ লোহিত সাগর পার হইয়া উহার পূর্ব দিকে অবস্থিত মিনাহ (শূর, সীন বা সায়ন) উপত্যকায় উপনীত হইল, যাহা পর্বত পর্যন্ত বিস্তৃত। বৃক্ষলতা ও খাদ্য-পানীয়বিহীন এই মরুভূমিতে পৌছিয়া তাহারা ঘাবড়াইয়া গেল। দীর্ঘ পথ অতিক্রম করিয়া তাহারা তৃষ্ণার্ত হইয়া পড়িয়াছিল। আল্লাহর নবী মূসা (আ)-এর প্রতি তাহাদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, তিনি আল্লাহ্র নিকট আবেদন করিলে তাহা মঞ্জুর হইবে। তাই তাহারা তাঁহাকে বলিল, আমরা এখন পানি কোথায় পাই? তৃষ্ণায় তো ছটফট করিয়া মারা যাইব। এইখানে তো এক ফোটা পানিও পাওয়া যাইবে না। তখন মূসা (আ) আল্লাহ্র নিকট পানির আবেদন করিলেন। আল্লাহ তাআলা তাহাকে লাঠি দ্বারা যমীনে আঘাত করিতে নির্দেশ দিলেন। মূসা (আ) এই নির্দেশমত যমীনে বা পাথরে আঘাত করিতেই বারোটি ঝর্ণাধারার সৃষ্টি হইয়া উহা হইতে অত্যন্ত সুমিষ্ট পানি প্রবাহিত হইতে লাগিল। বানু ইসরাঈলের বারোটি উপগোত্র উহা হইতে পানি পান করিতে লাগিল। তাহাদের তৃষ্ণা নিবৃত্ত হইল (দ্র. ২:৬০; ৭: ১৬০ নং আয়াত)। তবে বাইবেলে এই সংখ্যার উল্লেখ নাই (দ্র. যাত্রাপুস্তক, ১৭: ৩-৭)।
এখন তাহারা বলিতে লাগিল, পানির তো ব্যবস্থা হইল কিন্তু জীবন ধারণের মূল উপকরণ আহার্য কোথায় পাইব? তখন মূসা (আ)-এর দু'আয় আল্লাহ তাআলা তাহাদের জন্য অত্যন্ত সুস্বাদু খাবার 'মান্না' ও 'সালওয়া'-এর ব্যবস্থা করিয়া দিলেন (দ্র. ২:৫৭, ৭: ১৬০; ২০: ৮০-৮১)। 'মান্না' হইল কাহারও মতে ময়দার পাতলা রুটি, কাহারও মতে মধু, কাহারও মতে আঠা জাতীয় পদার্থ যাহার স্বাদ মধুর ন্যায়, কাহারও মতে কমলালেবু (আল-কামিল, ১খ., ১৪৯)। কাহারও মতে সাদা বরফ খণ্ডের ন্যায় শিশিরের আকৃতিসম্পন্ন এক ধরনের পদার্থ যাহা রাত্রিবেলা আকাশ হইতে যমীনে ও বৃক্ষপত্রে পতিত হইত যাহা অত্যন্ত সুস্বাদু মিষ্টির ন্যায় ছিল (কাসাসুল কুরআন, ১খ, ৭৮)। আর 'সালওয়া' হইল এক প্রকার পাখী সদৃশ যাহা প্রবল দক্ষিণা বায়ুপ্রবাহের ফলে ঝাঁকে ঝাঁকে আসিয়া মাটিতে বসিত, আর বনূ ইসরাঈলগণ সহজেই উহা ধরিয়া ভুনা করিয়া খাইত। ইকরিমার বর্ণনামতে উহা ছিল চড়ুই হইতে একটু বড় পাখি, যাহা জান্নাতের খাবার হইবে। ওয়াহ্হ্ব ইবন মুনাব্বিহ-এর বর্ণনামতে উহা কবুতরের ন্যায় মাংশল এক ধরনের পাখি (ইব্‌ন কাছীর, তাফসীর, ১খ, ৯৬-৯৭)। 'মাননা' আসিত ভোরবেলায় আর 'সালওয়া' আসিত বিকাল বেলায় (আল- বিদায়া, ১খ, ২৮২)। তাহাদের প্রতি নির্দেশ ছিল, প্রত্যেকের যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুই গ্রহণ করিবে, তাহার অধিক নহে। অধিক গ্রহণ করিলে তাহা নষ্ট হইয়া যাইত (ইব্‌ন কাছীর, তাফসীর, প্রাগুক্ত)। প্রতিদিন বিনা পরিশ্রমে তাহাদিগকে এইরূপ খাবার প্রদান করা হইত।
পানাহারের ব্যবস্থা হইয়া গেলে তাহারা বলিল, এই প্রচণ্ড রৌদ্র ও গরমে আমরা কিভাবে বাস করিব? কোন ছায়াবান বৃক্ষ এখানে নাই! তখন মূসা (আ) তাহাদিগকে সান্ত্বনা দিলেন এবং আল্লাহর দরবারে দু'আ করিলেন। ফলে অসংখ্য মেঘখণ্ড আসিয়া তাহাদিগকে ছায়া দিতে লাগিল (দ্র. ২ঃ ৫৭)। তাহারা যেখানেই যাইত, ছায়াও তাহাদের মাথার উপর থাকিয়া সেখানেই গমন করিত। বাইবেলের বর্ণনামতে বানু ইসরাঈলের আবাসের উপর হইতে মেঘ নীত হইলে তাহারা সফরে বাহির হইত, আর ঊর্ধ্বে নীত না হইলে তাহারা সফরে বাহির হইত না। কেননা দিবসে উহা মেঘ এবং রাত্রিতে অগ্নি আবাসের উপর অবস্থিতি করিত (যাত্রাপুস্তক, ৪০: ৩৬-৩৮)।
আবদুল ওয়াহ্হাব আন-নাজজার উল্লেখ করিয়াছেন যে, বানু ইসরাঈলের ঘটনায় পানির যে প্রস্রবণের কথা উল্লেখ করা হইয়াছে তাহা লোহিত সাগরের পূর্ব দিকে মরুভূমিতে সুয়েয হইতে খুব বেশি দূরে নহে। এখনও তাহা 'উয়ুন মূসা' (মূসার প্রস্রবণ) নামে প্রসিদ্ধ হইয়া আছে। উক্ত প্রস্রবণের পানি এখন বহুলাংশে শুকাইয়া গিয়াছে। কোন কোনটির চিহ্নও প্রায় বিলুপ্ত হইয়া গিয়াছে। আর উক্ত প্রস্রবণের উপর কোথাও কোথাও এখন খেজুরের বাগান পরিদৃষ্ট হয় (আন-নাজ্জার, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ২১১)।
কুরআন কারীমে বর্ণিত ঘটনায় বুঝা যায় যে, লাঠি দ্বারা আঘাত করিয়া পানি বাহির করিবার ঘটনা একবারই মাত্র সংঘটিত হয় নাই; বরং 'তীহ' ময়দানের বিভিন্ন স্থানে কয়েকবার সংঘটিত হইয়াছিল (কাসাসুল কুরআন, ১খ, ৪৮)।
মোটকথা হযরত মূসা (আ)-এর বদৌলতে বানু ইসরাঈলের উপর আল্লাহ্র অশেষ রহমতস্বরূপ বিভিন্ন নিয়ামত প্রদান করা হইতেছিল এই আশায় যে, শত শত বৎসরের গোলামী ও নির্যাতনের ফলে তাহাদের মধ্যে সৃষ্ট কাপুরুষতা ও হতাশার অবসান হইবে এবং নব প্রাণচাঞ্চল্যে ও নব উদ্দীপনায় তাহারা আল্লাহর শোকর-গুযারী করিবে। কিন্তু অদ্ভূত স্বভাবের এই সম্প্রদায়ের উপর ইহার কোনই প্রভাব পড়িল না। এত সুস্বাদু খাবার পাইয়াও তাহারা সন্তুষ্ট হইল না। একদিন তাহারা সকলে জড়ো হইয়া মূসা (আ)-কে বলিল, আমরা প্রতিদিন একই রকম খাদ্যে ধৈর্য ধারণ করিতে পারিব না। সুতরাং তুমি তোমার প্রতিপালকের নিকট দু'আ কর, তিনি যেন ভূমিজাত দ্রব্য, শাকসজি, কাঁকুড়, গম, মসুর ও পেঁয়াজ আমাদের জন্য উৎপাদিত করেন যাহাতে আমরা বেশ করিয়া খাইতে পারি (দ্র. ২ঃ ৬১)। হযরত মূসা (আ) তাহাদের এই ধরনের আবেদনে অতিশয় রাগান্বিত হইয়া বলিলেন, তোমরা কেমন বোকা! তোমরা কি উৎকৃষ্টতর বস্তুকে নিকৃষ্টতর বস্তুর সহিত বদল করিতে চাহ? আর এইভাবে তোমরা আল্লাহ্ নিয়ামতের শোকর-গুযারীর পরিবর্তে নাশোকারী করিতে চাহ? বাস্তবেই যদি তোমরা তাহা চাহ তবে কোন নগরে অবতরণ কর, তোমরা যাহা চাহ তাহা সেখানে আছে। এইভাবে তাহারা লাঞ্ছনা ও দারিদ্র্যগ্রস্ত হইল এবং তাহারা আল্লাহ্ ক্রোধের পাত্র হইল (প্রাগুক্ত)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 কিতাব আনয়নের জন্য মূসা (আ)-এর তূর পাহাড়ে গমন

📄 কিতাব আনয়নের জন্য মূসা (আ)-এর তূর পাহাড়ে গমন


ফিরআওনের ধ্বংস এবং তাহার কবল হইতে বানু ইসরাঈলের পরিত্রাণ পাওয়ার পর তাহারা সব ধরনের নির্যাতন হইতে মুক্তি লাভ করিল। আর আল্লাহ তাআলার ওয়াদা ছিল যে, মিসরীয় শাসনের গোলামী হইতে মুক্তি লাভের পর আল্লাহ তাহাদিগকে শারীআত ও কিতাব প্রদান করিবেন। তাই বানু ইসরাঈল এখন মূসা (আ)-কে বলিল, হে মূসা! আমাদের জন্য সেই কিতাব লইয়া আস, ইতোপূর্বে তুমি যাহার অঙ্গীকার করিয়াছিলে। তাহাদের কিতাবের আবেদন করার আরো একটি কারণ ইহাও হইতে পারে যে, সিনাই উপত্যকায় পদার্পণ করিয়াই তাহারা এক সম্প্রদায়কে মূর্তি পূজায় রত দেখিয়া তাহাদের জন্যও অনুরূপ উপাস্য আনিয়া দেওয়ার আবেদন করিয়া মূসা (আ)-এর তিরস্কার ও ভর্ৎসনা শুনিয়াছিল। ফলে ভবিষ্যতে যাহাতে তাহার সঠিক পথে চলিতে পারে, কোনরূপ শিরক ও গোমরাহীতে নিপতিত না হয় তজ্জন্য শরীআত ও কিতাবের প্রয়োজন অনুভব করিয়াছিল এবং সেমতে মূসা (আ)-এর নিকট আবেদন করিয়াছিল। তখন মূসা (আ) আল্লাহর নিকট এই ব্যাপারে প্রার্থনা করিলেন। আল্লাহ তাঁহাকে স্বীয় শরীর ও পোশাক পবিত্র করিয়া তূর পর্বতে গমনের নির্দেশ দিলেন এবং সেখানে ত্রিশ দিন রোযা রাখিয়া ই'তিকাফের নির্দেশ দিয়া বলিলেন, সেইখানেই তিনি তাঁহার সহিত কথা বলিবেন এবং কিতাব প্রদান করিবেন।
অতঃপর মূসা (আ) তাঁহার সম্প্রদায়ের নিকট ত্রিশ দিনের কথা জানাইয়া বলিলেন যে, আল্লাহ তাআলা উক্ত সময়ের মধ্যে কিতাব প্রদান করিবেন এবং তাহা লইয়া তিনি তাহাদের নিকট আগমন করিবেন। এই সময়ের জন্য তিনি হারুন (আ)-কে তাঁহার স্থলাভিষিক্ত বানাইয়া গেলেন। তিনি তাঁহাকে সম্প্রদায়ের মধ্যে তাঁহার প্রতিনিধিত্ব করিবার, তাহাদিগকে সংশোধন করিবার এবং বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের অনুসরণ না করিবার জন্য উপদেশ দিয়া গেলেন (দ্র. ৭: ১৪২)। ইব্‌ন আব্বাস (র), মাসরূক (র) ও মুজাহিদ (র) প্রমুখের বর্ণনামতে আল্লাহ তাআলা মূসা (আ) কে যে ত্রিশ দিনের অঙ্গীকার করিয়াছিলেন, উক্ত দিনসমূহে মূসা (আ) রোযা রাখিলেন। যীকা'দার প্রথম তারিখ হইতে তিনি রোযা রাখা শুরু করেন। ত্রিশ দিন পূর্ণ হইলে মূসা (আ) আল্লাহ্র সহিত কথোপকথনের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করিলেন, তখন আল্লাহ তাআলা আরো দশ দিন বর্ধিত করিয়া চল্লিশ দিন পূর্ণ করিবার নির্দেশ দেন (দ্র. ৭: ১৪২)। কুরআন কারীমে শুধুমাত্র এতটুকুই উল্লিখিত হইয়াছে যে, উক্ত মেয়াদ প্রথমত ত্রিশ দিন ছিল, পরে আরো দশ দিন বর্ধিত করিয়া চল্লিশ দিন পূর্ণ করা হয়। কিন্তু ইহার কোন কারণ উল্লেখ করা হয় নাই। এক বর্ণনামতে আল্লাহ্র মর্জিতে প্রথম হইতে চল্লিশ দিন নির্ধারিত ছিল। যেমন সূরা বাকারায় বর্ণিত হইয়াছে:
"(স্মরণ কর) যখন মূসার জন্য চল্লিশ রাত্রি নির্ধারিত করিয়াছিলাম" (২ঃ ৫১)।
فَتَمَّ مِيقَاتُ رَبِّهِ أَرْبَعِينَ لَيْلَةً (٧: ١٤٢)
"এইভাবে তাহার প্রতিপালকের নির্ধারিত সময় চল্লিশ রাত্রিতে পূর্ণ হয়" (৭ঃ ১৪২)। আয়াতে উহার প্রতিই ইঙ্গিত রহিয়াছে। তবে এইভাবে এইজন্য বলা হইয়াছে যে, ই'তিকাফের এই মেয়াদ পূর্ণ করার জন্য ত্রিশ দিনের পূর্ণ একটি মাস অতিবাহিত করিতে হইবে, অতঃপর পরবর্তী মাসের আরো দশ দিন পূর্ণ করিতে হইবে (আম্বিয়া-ই কুরআন, ২খ., ২০১)। বাইবেলেও এই মেয়াদ চল্লিশ দিন চল্লিশ রাত্রি বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে (দ্র. যাত্রাপুস্তক, ২৪: ১৮)।
দায়লামী হযরত ইবন আব্বাস (রা) সূত্রে বর্ণনা করিয়াছেন যে, মূসা (আ)-এর এক মাস পূর্ণ হইবার পর তিনি আল্লাহ তাআলার সহিত কথোপকথনের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করিলেন। দীর্ঘ একটি মাস রোযা রাখার কারণে মুখে সৃষ্ট দুর্গন্ধ লইয়া তিনি মাহবুবের সহিত কথোপকথন করা ভাল মনে করিলেন না। তাই তিনি 'খারনূব' নামক কাষ্ঠ দ্বারা, মতান্তরে উক্ত গাছের ছাল দ্বারা মিসওয়াক করিলেন। তখন সঙ্গে সঙ্গেই আল্লাহ তাআলা ওহী প্রেরণ করিয়া বলেন যে, তুমি এইরূপ কেন করিলে? তুমি কি জান না যে, রোযাদারের মুখের গন্ধ আমার নিকট মিশকের চাইতেও বেশি পছন্দনীয় (আল-কামিল, ১খ., ১৪৫; কাসাসুল কুরআন, ১খ., ৪৮২)। অতঃপর আল্লাহ তাঁহাকে আরও দশ দিন পূর্ণ করিবার নির্দেশ দিলেন। সুতরাং তিনি আরো দশ দিন সাওম পালন ও ইতিকাফ করিলেন। তবে দায়লামীর এই বর্ণনাটি নির্ভরযোগ্য নহে বলিয়া ইবনুল আছীর, আল-আলুসী ও ইব্‌ন কাছীর মন্তব্য বরিয়াছেন (দ্র. আলা-কামিল, পূর্বোক্ত; রূহুল মা'আনী, ৯খ, পৃ. ৩৮; বিদায়া, ১খ, পৃ. ২৮৩)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মূসা (আ) কর্তৃক আল্লাহর দীদার লাভের আবেদন

📄 মূসা (আ) কর্তৃক আল্লাহর দীদার লাভের আবেদন


তূর পর্বতে হযরত মূসা (আ) যখন রোযা, ই'তিকাফ ও আল্লাহর ইবাদতে চল্লিশ দিন পূর্ণ করিলেন তখন ১০ যিলহজ্জ ঈদুল আযহার রাত্রিতে আড়াল হইতে আল্লাহ তাআলা তাঁহার সহিত বাক্যালাপ করিলেন। মূসা (আ) খুব নিকট হইতেই তাহা শুনিতে পাইতেছিলেন। দীর্ঘ চল্লিশটি দিন অনবরত তিনি যাঁহার ধ্যান করিয়াছেন, এক্ষণে অন্তরাল হইতে যাঁহার কথা শুনিতেছেন সেই প্রিয়তম ও মহিমাময় সত্তাকে স্বচক্ষে দেখার দুর্বার আগ্রহ ও আকর্ষণ তাঁহার অন্তরে জাগ্রত হইল। তিনি আগ্রহ আর চাপিয়া রাখিতে পারিলেন না। মনের কথাটি আল্লাহ তাআলাকে বলিয়া ফেলিলেন, "ওগো আমার প্রতিপালক! আমাকে দর্শন দাও, আমি তোমাকে দেখিব।" কিন্তু ইহা যে অসম্ভব, ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ায় এই চর্মচক্ষু দিয়া সেই জ্যোতির্ময় সত্তাকে দেখা যায় না। তাই আল্লাহ তাআলা তাঁহাকে জানাইয়া দিলেন, "(দুনিয়াতে) তুমি কখনও আমাকে দেখিতে পাইবে না"। কারণ আমার তাজাল্লীর ঝলক তুমি সহ্য করিতে পারিবে না। প্রকৃতপক্ষে সে সামর্থ্য মূসা (আ)-এর ছিল না। কারণ মানুষের তুলনায় অত্যধিক শক্ত ও বৃহৎ স্থির পর্বত পর্যন্ত আল্লাহ্ তাজাল্লী সহ্য করার সামর্থ রাখে না, উহা স্থির ও ঠিক থাকিতে পারে না। পাছে মূসা (আ) মনক্ষুণ্ণ হইবেন তাই আল্লাহ তাঁহাকে একটু বাস্তব অভিজ্ঞতা প্রদানের ইচ্ছা করিলেন। বলিলেন, "তুমি বরং পাহাড়ের প্রতি লক্ষ্য কর, উহা স্বস্থানে স্থির থাকিলে তবে তুমি আমাকে দেখিতে পারিবে" (৭: ১৪৩)। অতঃপর আল্লাহ তাআলা উক্ত তুর পাহাড়ে স্বীয় তাজাল্লীর সামান্যতম পরিমাণ প্রকাশ করিলেন।
আর মূসা (আ) উক্ত দৃশ্যের ঝলক সহ্য করিতে না পারিয়া বেহুঁশ হইয়া মাটিতে লুটাইয়া পড়িলেন। পরে হুঁশ ফিরিয়া আসিতেই সর্বপ্রথম তিনি অনুতপ্ত হইলেন এই ভাবিয়া যে, কেন আমি আল্লাহ তাআলার অনুমতি ব্যতীত তাঁহার নিকট এমন জিনিসের যাজ্ঞা করিয়াছি, যাহা মোটেই সমীচীন নহে। তাই তিনি আল্লাহর প্রশংসা করিয়া নিজের আচরণের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করিলেন এবং তিনি পূর্ব হইতেই মু'মিন বলিয়া ঘোষণা করিলেন: سُبْحَانَكَ تُبْتُ إِلَيْكَ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُؤْمِنِينَ "মহিমাময় তুমি, আমি অনুতপ্ত হইয়া তোমাতেই প্রত্যাবর্তন করিলাম এবং মু'মিনদের মধ্যে আমিই প্রথম" (৭: ১৪৩)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 তাওরাত অবতরণ

📄 তাওরাত অবতরণ


এই তূর পর্বতে মুসা (আ)-এর ৪০ দিনের রোযা ও ই'তিকাফ পূর্ণ হইবার পর আল্লাহ তাআলা তাঁহার উপর তাওরাত কিতাব অবতীর্ণ করেন, যাহা ৪ (চার) খানি আসমানী কিতাবের অন্যতম। এই কিতাব অবতরণ করিয়া আল্লাহ তাআলা তাঁহাকে উহা দৃঢ়ভাবে ধারণ করিবার নির্দেশ দেন এবং তাঁহার সম্প্রদায়কে নির্দেশ দিতে বলেন, তাহারাও যেন দৃঢ়ভাবে উহা ধারণ করে। তাহাদের উভয় জগতের সফলতা ও কল্যাণের বিস্তারিত বিবরণ ইহাতে রহিয়াছে। ইহাতে হালাল-হারাম, ভাল-মন্দ তথা সকল আদেশ-নিষেধ স্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হইয়াছে। ইহাই তাহাদের শারীআত। কুরআন কারীমে এই সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছে: قَالَ يَا مُوسَى إِنِّي اصْطَفَيْتُكَ عَلَى النَّاسِ بِرِسُلْتِي وَبِكَلامِي فَخُذْ مَا أَتَيْتُكَ وَكُنْ مِّنَ الشَّاكِرِينَ. وَكَتَبْنَا لَهُ فِي الأَلْواحِ مِنْ كُلِّ شَيْءٍ مُوْعِظَةً وَتَفْصِيلاً لِكُلِّ شَيْءٍ فَخُذْهَا بِقُوَّةٍ وَأَمُرْ قَوْمَكَ يَأْخُذُوا بِأَحْسَنِهَا سَأُورِيكُمْ دار الفاسِقِينَ (١٤٥-١٤٤ : ٧) "তিনি বলিলেন, হে মূসা! আমি তোমাকে আমার রিসালাত ও বাক্যালাপ দ্বারা মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়াছি, সুতরাং আমি যাহা দিলাম তাহা গ্রহণ কর এবং কৃতজ্ঞ হও। আমি তাহার জন্য ফলকে সর্ব বিষয়ে উপদেশ ও সকল বিষয়ের স্পষ্ট ব্যাখ্যা লিখিয়া দিয়াছি। সুতরাং এইগুলি শক্তভাবে ধর এবং তোমার সম্প্রদায়কে উহাদের যাহা উত্তম তাহা গ্রহণ করিতে নির্দেশ দাও। আমি শীঘ্র সত্যত্যাগীদের বাসস্থান তোমাদিগকে দেখাইব" (৭: ১৪৪-১৪৫)।
এখানে দুইটি বিষয় প্রণিধানযোগ্য: (১) বিজ্ঞ আলিমগণের মতে তূর পাহাড়ের এই ঘটনায় যে সকল হুকুম অবতীর্ণ হয় উহাই তাওরাত। আধুনিক খৃস্টান পণ্ডিতগণ বলেন, এই সময় সেই দশটি হুকুম অবতীর্ণ হয় যাহা মূসা (আ)-এর "শরীআত বা আকাঙ্খাসমূহ" (أحكام عهد) নামে প্রসিদ্ধ। আর তাহা হইল: (১) আমার সাক্ষাতে তোমার জন্য দেবতা না থাকুক; (২) তুমি আপনার নিমিত্তে খোদিত প্রতিমা নির্মাণ করিও না; উপস্থিত স্বর্গে, নীচস্থ পৃথিবীতে ও পৃথিবীর নীচস্থ জল মধ্যে যাহা যাহা আছে, তাহাদের মূর্তি নির্মাণ করিও না; তুমি তাহাদের কাছে প্রণিপাত করিও না এবং তাহাদের সেবা করিও না। কেননা তোমার ঈশ্বর সদাপ্রভু আমি স্বগৌরব রক্ষণে উদ্যোগী ঈশ্বর; আমি পিতৃগণের অপরাধের প্রতিফল সন্তানদের প্রতি বর্তাই, যাহারা আমাকে দ্বেষ করে তাহাদের তৃতীয় চতুর্থ পুরুষ পর্যন্ত বর্তাই; কিন্তু যাহারা আমাকে প্রেম করে ও আমার আজ্ঞা সকল পালন করে আমি তাহাদের সহস্র পুরুষ পর্যন্ত দয়া করি।
(৩) তোমার ঈশ্বর সদাপ্রভুর নাম অনর্থক লইও না। কেননা যে কেহ তাঁহার নাম অনর্থক লয়, সদাপ্রভু তাহাকে নির্দোষ করিবেন না।
(৪) তুমি বিশ্রাম দিন স্মরণ করিয়া পবিত্র করিও, ছয় দিন শ্রম করিও, আপনার সমস্ত কার্য করিও; কিন্তু সপ্তম দিন তোমার ঈশ্বর সদাপ্রভুর উদ্দেশ্যে বিশ্রাম দিন; সেদিন তুমি কি তোমার পুত্র কি কন্যা কি তোমার দাস কি দাসী, কি তোমার পশু, কি তোমার পুরদ্বারের মধ্যবর্তী বিদেশী, কেহ কোন কার্য করিও না। কেননা সদাপ্রভু আকাশমণ্ডল ও পৃথিবী, সমুদ্র ও সেই সকলের মধ্যবর্তী সমস্ত বস্তু ছয় দিনে নির্মাণ করিয়া সপ্তম দিনে বিশ্রাম করিলেন; এইজন্য সদাপ্রভু বিশ্রাম দিনকে আশীর্বাদ করিলেন ও পবিত্র করিলেন।
(৫) তোমার পিতাকে ও তোমার মাতাকে সমাদর করিও, যেন তোমার ঈশ্বর সদাপ্রভু তোমাকে যে দেশ দিবেন, সেই দেশে তোমার দীর্ঘ পরমায়ু হয়।
(৬) নরহত্যা করিও না।
(৭) ব্যভিচার করিও না।
(৮) চুরি করিও না।
(৯) তোমার প্রতিবাসীর বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষ্য দিও না।
(১০) তোমার প্রতিবাসীর গৃহে লোভ করিও না; প্রতিবাসীর স্ত্রীতে কিম্বা তাহার দাসে কি দাসীতে কিম্বা তাহার গোরুতে কি গর্দভে, প্রতিবাসীর কোন বস্তুতেই লোভ করিও না, (যাত্রাপুস্তক ২০:৩-১৭)।
আধুনিক কালের কোন কোন মুফাসসিরেরও মত এই যে, এই সময় "আজ্ঞাসমূহ" অবতীর্ণ হয়। কিন্তু শেষোক্ত উভয় মতই কুরআন কারীম ও বাইবেলের বর্ণনামতে ভ্রান্ত; প্রথম মতটিই নির্ভুল ও সঠিক। কারণ কুরআন কারীম সূরা বাকারায় মূসা (আ)-এর চল্লিশ দিন ই'তিকাফের বর্ণনা দিয়া যখন হুকুম অবতীর্ণ করার কথা বর্ণনা করা হইয়াছে তখন উহাকে 'কিতাব' ও 'ফুরআন' বলা হইয়াছে। এই উভয় বিশেষণই কুরআন কারীমে তাওরাত-এর জন্য বলা হইয়াছে, "আজ্ঞাসমূহ"-এর জন্য নহে (দ্র. ২:৪৫১)। অতঃপর ইরশাদ হইয়াছে:
وَإِذْ أَتَيْنَا مُوسَى الْكِتَابَ وَالْفُرْقَانَ لَعَلَّكُمْ تَهْتَدُونَ . (٥٣ : ٢)
"যখন আমি মূসাকে কিতাব ও ফুরকান দান করিয়াছিলাম যাহাতে তোমরা সৎপথে পরিচারিত হও" (২ঃ ৫৩)।
ইহাতে বুঝা যায় যে, তূর পর্বতে চল্লিশ দিন ই'তিকাফ সম্পন্ন করার পর মূসা (আ)-কে যে বিধান সম্বলিত ফলকসমূহ দেওয়া হইয়াছিল তাহাই ছিল "তাওরাত", কেবল "আজ্ঞাসমূহ" সম্বলিত ফলক তাওরাত নহে (দ্র. ২৪ ৫১)। বাইবেলের ইংরেজী কপির অনুবাদ এ এবং আরবী ও উরদূ কপিতে "শারীআত" শব্দকে সঠিক বলিয়া মানিয়া লইলেও এই শব্দ ব্যাপক অর্থে তাওরাতকেই বুঝায়। আর তাওরাত, শারীআত ও বিধান বলিতে একই বস্তুকে বুঝানো হইয়াছে। আর প্রাচীন খৃষ্ট জগতে এই অর্থই গ্রহণ করা হইত। আজ্ঞাসমূহ উহারই একটি অংশ মাত্র (কাসাসুল কুরআন, ১খ, ৪৮৫-৮৬)।
(২) দ্বিতীয় প্রণিধানযোগ্য বিষয় হইল: আল্লাহ তা'আলা মূসা (আ)-কে তাওরাত প্রদান করিয়া বলিয়াছিলেন, "শীঘ্রই আমি তোমাদিগকে সত্যত্যাগীদের বাসস্থান দেখাইব"। এই বাসস্থান বলিতে কোন্ স্থান বুঝানো হইয়াছে, সে সম্পর্কে বিভিন্নজন বিভিন্ন ব্যাখ্যা প্রদান করিয়াছেন: (ক) ইহা দ্বারা আদ ও ছামূদ জাতির ধ্বংসস্তূপ বুঝানো হইয়াছে; (খ) মিসরকে বুঝানো হইয়াছে অর্থাৎ বনূ ইসরাঈল পুনরায় মিসরে প্রবেশ করিবে; (গ) কাতাদা (র) বলেন, ইহা দ্বারা সিরিয়া-এর পবিত্রভূমি বুঝানো হইয়াছে, যেখানে তখন আমালেকার স্বৈরাচারী ও অত্যাচারী বাদশাহদের রাজত্ব ছিল, আর সেখানেই বনূ ইসরাঈলগণের প্রবেশ করা আল্লাহ্ মঞ্জুরী ছিল। আবদুল ওয়াহ্হাব আন-নাজ্জার ও হিফজুর রাহমান সিউহারবী এই মতকেই প্রধান্য দিয়াছেন, (দ্র. কাসাসুল কুরআন, ১খ. ৪৮৬)।
এক বর্ণনামতে আল্লাহ তা'আলা মূসা (আ)-কে এই সময় তাওরাত-এর সহিত দশখানি সাহীফাও প্রদান করেন, যাহার উল্লেখ কুরআন কারীমের সূরা আ'লা-এর ১৯ নং আয়াতে রহিয়াছে : "(ইহা তো আছে) ইবরাহীম ও মূসার গ্রন্থে" (৮৭ঃ ১৯)।
তাওরাত নাযিল হয় প্রস্তর ফলকে লিখিত আকারে। এক বর্ণনায় উহা সবুজ বর্ণের ফলকে লিখিত ছিল। উহা সাতটি ভাগে বিভক্ত ছিল। কিন্তু মূসা (আ) যখন উহা মাটিতে সজোরে রাখিয়াছিলেন (এই সম্পর্কিত ঘটনা পরে আসিতেছে) তখন উহার ৭/৬ অংশ ভাঙ্গিয়া যায় এবং ৭/১ অংশ অক্ষত থাকে (আল-কামিল, ১খ, ১৪৬; তাবারী, তারীখ, ১খ, ৪২৭)। তবে উহা ইসরাঈলী বর্ণনা যাহা গ্রহণযোগ্য নহে।
বাইবেলে ২টি ফলকের কথা বলা হইয়াছে। উহাতে উক্ত কিতাবের বিবরণ এইভাবে দেওয়া হইয়াছে: "পরে মোশি মুখ ফিরাইলেন, সাক্ষ্যের সেই দুই প্রস্তর ফলক হস্তে লইয়া পৰ্ব্বত হইতে নামিলেন; সে প্রস্তর ফলকের এ পৃষ্ঠে ও পৃষ্ঠে, দুই পৃষ্ঠেই লেখা ছিল। সেই প্রস্তর ফলক ঈশ্বরের নির্মিত এবং সেই লেখা ঈশ্বরের লেখা, ফলকে খোদিত” (যাত্রাপুস্তক, ৩২: ১৫-১৬)।
যাত্রাপুস্তকের ৩১: ১৮-এও ফলকের সংখ্যা দুইটির কথা উল্লিখিত হইয়াছে। বলা হইয়াছে, "পরে তিনি সীনয় পর্ব্বতে মোশির সহিত কথা সাঙ্গ করিয়া সাক্ষ্যের দুই ফলক, ঈশ্বরের অঙ্গুলী দ্বারা লিখিত দুই প্রস্তর ফলক তাহাকে দিলেন" (যাত্রাপুস্তক, ৩১: ১৮)। উক্ত পুস্তকের ৩৪: ২৯-এও দুইটি ফলকের কথা উল্লিখিত হইয়াছে, অবশ্য ৩১: ১৮ হইতে ইহাও জানা যায়, ফলকদ্বয় প্রস্তর নির্মিত ছিল। বাইবেলে বর্ণিত হইয়াছে যে, মূল ফলক মূসা (আ) বনূ ইসরাঈলের গোবৎস পূজার ফলে রাগান্বিত হইয়া ভাঙ্গিয়া ফেলেন। অতঃপর তাহার দুআর ফলে তাহাকে অন্য সাদা ফলক প্রদান করা হয়, যাহার উপর আল্লাহ্র নির্দেশে মূসা (আ) নিজ হস্তে লিখিয়া লন। বর্ণিত হইয়াছে, "আর সদাপ্রভু মোশিকে কহিলেন, তুমি এই সকল বাক্য লিপিবদ্ধ কর, কেননা আমি এই সকল বাক্যানুসারে তোমার ও ইস্রায়েলের সহিত নিয়ম স্থির করিলাম, সেই সময়ে মোশি চল্লিশ দিবারাত্র সেখানে সদাপ্রভুর সহিত অবস্থিতি করিলেন, অন্ন, ভোজন ও জল পান করিলেন না। আর তিনি সেই দুই প্রস্তরে নিয়মের বাক্যগুলি লিখিলেন" (যাত্রাপুস্তক, ৩৪: ২৭-২৮)।
আল্লাহ তাআলা বানু ইসরাঈলের প্রতি দিনে দুই ওয়াক্ত সালাত এবং হজ্জ ফরয করেন (আল-মুনতাজাম, ১খ, ৩৫২)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00