📄 মূসা (আ)-এর উপর ঈমান আনয়নকারীদের সংখ্যা
ইব্ন আব্বাস (রা)-এর বর্ণনামতে যাদুকরদের পরাজয়ের পর-মূসা (আ) আরো ২০ বৎসর ফিরআওন ও তাহার সম্প্রদায়ের নিকট অবস্থান করিয়া বিভিন্নভাবে তাহাদিগকে দাওয়াত দিতে থাকেন এবং একটির পর একটি নিদর্শন দেখাইতে থাকেন (আল-মুনতাজাম, ১খ, ৩৪৫)। কিন্তু কতিপয় লোক গোপনে ঈমান আনয়ন করা ছাড়া প্রথমদিকে প্রকাশ্যে কেহই ঈমান আনিল না। কুরআন কারীমে ইরশাদ হইয়াছে: فَمَا أَمَنَ لِمُوسَى إِلَّا ذُرِّيَّةٌ مِّنْ قَوْمِهِ عَلَى خَوْفٌ مِّنْ فِرْعَوْنَ وَمَلَاهِمْ أَنْ يُفْتِنَهُمْ وَإِنَّ فِرْعَوْنَ لَعَالٍ فِي الْأَرْضِ وَإِنَّهُ لَمِنَ الْمُسْرِفِينَ (۸۳ : ۱۰)
"ফিরআওন ও তাহার পারিষদবর্গ নির্যাতন করিবে এই আশংকায় তাহার সম্প্রদায়ের একদল ব্যতীত আর কেহ মূসার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে নাই। দেশে তো ফিরআওন পরাক্রমশালী ছিল এবং সে ছিল অবশ্যই সীমালংঘনকারীদের অন্তর্ভুক্ত" (১০:৮৩)। এক বর্ণনামতে উহাদের সংখ্যা ছিল ৩ জন: ফিরআওনের স্ত্রী, ফিরআওন বংশের এক ব্যক্তি, যাহার উপদেশ ও পরামর্শের কথা পূর্বে উল্লেখ করা হইয়াছে; আর শহরের প্রান্ত হইতে ছুটিয়া আসিয়া যে ব্যক্তি মূসাকে সংবাদ দিয়াছিল যে, পারিষদবর্গ তাঁহাকে হত্যার পরামর্শ করিতেছে, তাই সে যেন শহর হইতে বাহির হইয়া যায়। হইহা ইব্ন আব্বাস (রা)-এর মত। অপর এক বর্ণনামতে কিবতীদের মধ্যে ফিরআওন বংশের একটি দল, সকল যাদুকর এবং বানু ইসরাঈলের সকল শাখা মূসা (আ)-এর উপর ঈমান আনিয়া (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ২৬৮)। প্রকৃতপক্ষে প্রথমদিকে মূসা (আ)-এর উপর ঈমান আনিয়াছিল বানু ইসরাঈলের কিছু সংখ্যক যুবক। কিছু কাল পরে বানু ইসরাঈলের অন্য সকলেই তাঁহার দলভুক্ত হইয়াছিল এবং সেই সকলকে লইয়া তিনি মিসর ত্যাগ করিয়াছিলেন। এক বর্ণনামতে তাহাদের সংখ্যা ছিল প্রায় ছয় লক্ষ (আত-তাবারী, তারিখ, ১খ, ৪১৪)।
📄 মূসা (আ)-এর বদদু'আ
ফিরআওন ও তাহার সম্প্রদায়, মূসা (আ) ও হারুন (আ)-এর প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা, বিনম্র ও হিকমতের সহিত দাওয়াত এবং উপর্যুপরি আল্লাহর নিদর্শনাবলী দেখিবার পরও ঈমান আনিল না; বরং তাহারা একের পর এক অঙ্গীকার করিয়া তাহা ভঙ্গ করিল। ঈমান তো আনিলই না, বরং উত্তরোত্তর তাহাদের অবাধ্যতা ও কুফরী এবং বনু ইসরাঈলের প্রতি অত্যাচার ও নির্যাতন বৃদ্ধি পাইতে লাগিল। ইহাতে মূসা (আ) নিরাশ হইয়া তাহাদের জন্য বদদুআ করিলেন এবং তাঁহার ভ্রাতা হারুন (আ) উক্ত দুআয় আমীন আমীন বলিলেন। কুরআন কারীমে তাঁহার সেই দুআ এইভাবে আসিয়াছে: وَقَالَ مُوسى رَبَّنَا إِنَّكَ أَتَيْتَ فِرْعَوْنَ وَمَلَاتَهُ زِينَةً وَأَمْوَالاً فِي الْحَيَاتِ الدُّنْيَا رَبَّنَا لِيُضِلُّوا عَنْ سَبِيلِكَ رَبَّنَا اطمس عَلَى أَمْوَالِهِمْ وَاشْدُدْ عَلَى قُلُوبِهِمْ فَلَا يُؤْمِنُوا حَتَّى يَرَوْا الْعَذَابَ الْأَلِيمَ (۸۸ : ۱۰)
"মূসা বলিল, হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি তো ফিরআওন ও তাহার পারিষদবর্গকে পার্থিব জীবনে শোভা ও সম্পদ দান করিয়াছ, যদ্দ্বারা হে আমাদের প্রতিপালক! উহারা মানুষকে তোমার পথ হইতে ভ্রষ্ট করে। হে আমাদের প্রতিপালক! উহাদের সম্পদ বিনষ্ট কর, উহাদের হৃদয় কঠিন করিয়া দাও, উহারা তো মর্মন্তুদ শান্তি প্রত্যক্ষ না করা পর্যন্ত ঈমান আনিবে না" (১০ঃ ৮৮)।
ইব্ন আব্বাস (রা)-এর বর্ণনামতে এই বদদুআ ছিল আল্লাহ ও তাঁহার দীনের স্বার্থে। অতপর আল্লাহ তাঁহাদের এই দুআ কবুল করিলেন এবং দীনের উপর অটল থাকিবার নির্দেশ দিলেন। কুরআন কারীমে ইরশাদ হইয়াছে: قَالَ قَدْ أُجِيبَتْ دَعْوَتُكُمَا فَاسْتَقِيمًا وَلَا تَتَّبِعَانِ سَبِيلَ الَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ . (۸۹ : ۱۰)
"তিনি বলিলেন, তোমাদের দুইজনের দু'আ কবুল হইল। সুতরাং তোমরা দৃঢ় থাক এবং তোমরা কখনো অজ্ঞদের পথ অনুসরণ করিও না" (১০:৮৯)।
অতঃপর আল্লাহ তাআলা তাহাদের ক্ষেতের ফসলাদি, এক বর্ণনামতে সকল মুদ্রা তথা দিরহাম, দীনার সবকিছু পাথরে রূপান্তরিত করিলেন (আত-তাবারী, ১খ, ৪১৪; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ২৬৯-৭০; আল-কামিল, ১খ, ১৪৩)।
📄 ফিরআওন ও তাহার সম্প্রদায়ের পানিতে ডুবিয়া মৃত্যু
ফিরআওনের অবাধ্যতা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছিবার ফলে আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত শাস্তির সময় ঘনাইয়া আসিল। আল্লাহ তাআলা মূসা (আ)-কে বানু ইসরাঈলসহ নির্দেশ দিলেন। এক বর্ণনামতে বানু ইসরাঈল তাহাদের উৎসবে যোগদানের জন্য ফিরআওনের নিকট অনুমতি চাহিল। ফিরআওন অনিচ্ছা সত্ত্বেও অনুমতি দিল। কারণ তখন তাহারা দেশত্যাগের জন্য সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত হইয়াছিল। বাইবেলের বর্ণনামতে আল্লাহ তাহাদিগকে নির্দেশ দিয়াছিলেন কিবতীগণের নিকট হইতে অলঙ্কার ধার লইতে। অতঃপর উৎসব উপলক্ষে কিবতীগণ বহু অলংকার বানু ইসরাঈলকে ধারস্বরূপ দিল (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ২৭০; আল-কামিল, ১খ, ১৪৩; আল-মুনতাজাম, ১খ, ৩৪৭)। অতঃপর মূসা (আ) বানু ইসরাঈলকে লইয়া রাত্রি বেলায় গোপনে শাম দেশের উদ্দেশে রওয়ানা হইলেন। বানু ইসরাঈলের সংখ্যা ছিল ছয় লক্ষ। মতান্তরে ছয় লক্ষ বিশ হাজার প্রাপ্তবয়স্ক যোদ্ধা, বিশ বৎসর বয়সের নীচের বালক এবং ষাট বৎসর বয়সোর্ধ বৃদ্ধ এই সংখ্যা বহির্ভূত (আত তাবারী, ১খ, ৪১৪; ইবন কাছীর, প্রাগুক্ত; ইবনুল আছীর, প্রাগুক্ত)।
এক বর্ণনামতে আল্লাহর নির্দেশে মূসা (আ) হযরত ইউসুফ (আ)-এর তাবূত (সিন্দুক) লইয়া রওয়ানা হইয়াছিলেন পবিত্র ভূমিতে (বায়তুল মুকাদ্দাসে) তাঁহার পূর্বপুরুষের নিকট দাফন করিবার জন্য (আল-কামিল, ১খ, ১৪৩)। বানু ইসরাঈলকে লইয়া মূসা (আ)-কে রাত্রিবেলা বাহির হইবার জন্য আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দেন এবং ফিরআওন তাহাদের পশ্চাদ্ধাবন করিবে এবং তাহার দলবলসহ পানিতে ডুবিয়া মারা যাইবে, এই সংবাদও আল্লাহ তাঁহাকে জানাইয়া দেন। কুরআন কারীমে ইরশাদ হইয়াছে:
وَأَوْحَيْنَا إِلَى مُوسَى أَنْ أَسْرِ بِعِبَادِى إِنَّكُمْ مُتَّبَعُونَ (٢٦ : ٥٢) "আমি মূসার প্রতি ওহী করিয়াছিলাম এই মর্মেঃ আমার বান্দাদিগকে লইয়া তুমি রজনী যোগে বহির্গত হও, তোমাদের তো পশ্চাদ্ধাবন করা হইবে" (২৬ঃ ৫২)।
فَأَسْرِ بِعِبَادِي لَيْلا أَنَّكُمْ مُتَّبَعُونَ. وَاتْرُكِ الْبَحْرَ رَهْوًا إِنَّهُمْ جُنْدٌ مُغْرَقُونَ . (٤٤ : ٢٣-٢٤) "তুমি আমার বান্দাদিগকে লইয়া রজনী যোগে বাহির হইয়া পড়, তোমাদের পশ্চাদ্ধাবন করা হইবে। সমুদ্রকে স্থির থাকিতে দাও, উহারা এমন এক বাহিনী যাহা নিমজ্জিত হইবে" (৪৪: ২৩-২৪)।
রাজধানী রামসীস ও বনূ ইসরাঈলের আবাসভূমি জুশন হইতে ফিলিস্তীন যাওয়ার স্থলপথে সোজা ও নিকটবর্তী রাস্তা ছিল। সেই রাস্তা দিয়া তখনকার যুগে যাতায়াতও ছিল। কিন্তু বাইবেলের বর্ণনা হইতে বুঝা যায় যে, হযরত মূসা (আ) আল্লাহ্র ইচ্ছানুযায়ী তাঁহার ইঙ্গিতে স্থলপথের এই সোজা রাস্তা দিয়া গমন করেন নাই, বরং তাহারা রামসীসের জুশন অঞ্চল হইতে সুক্কোত পর্যন্ত পদব্রজে গমন করেন (যাত্রাপুস্তক, ১২ : ৩৭)। অতঃপর সেখান হইতে রওয়ানা করিয়া এথমে শিবির স্থাপন করেন (যাত্রাপুস্তক, ১৩ : ২০)। অতঃপর সেখান হইতে তাহারা মিজদাল ও সমুদ্রের মধ্যস্থলে পী-হহীরোতের সম্মুখে বালসফোভনের সম্মুখে শিবির স্থাপন করেন। তাহাদের সম্মুখে ছিল লোহিত সাগর (যাত্রাপুস্তক, ১৪: ১-২)।
মিসর ত্যাগের সময় বানু ইসরাঈলদের মিসরে বসবাসের সময়কাল হইয়াছিল প্রায় চারি শত ত্রিশ বৎসর (যাত্রাপুস্তক, ১২:৪০)। তখন বানু ইসরাঈলের হিসাবমতে আবীর মাস চলিতেছিল (যাত্রাপুস্তক, ১৩:৪)। অতঃপর ফিরআওন তাহাদের গমন সংবাদ জানিয়া ফেলিল এবং ভীষণভাবে ক্ষিপ্ত হইয়া সৈন্য সামন্ত ও দলবল জড়ো করিবার নির্দেশ দিল। কুরআন কারীমে ইরশাদ হইয়াছে:
فَأَرْسَلَ فِرْعَوْنُ فِي الْمَدَائِنِ حَاشِرِيْنَ إِنْ هُؤُلَاءِ لَشِرْدِمَةً قَلِيلُونَ . وَإِنَّهُمْ لَنَا لَغَائِظُونَ، وَإِنَّا لَجَمِيعٌ حاضرون (٥٦-٥٣ : ٢٦)
"অতঃপর ফিরআওন শহরে শহরে লোক সংগ্রহকারী পাঠাইল এই বলিয়া, ইহারা তো ক্ষুদ্র একটি দল, উহারা তো আমাদের ক্রোধ উদ্রেক করিয়াছে; এবং আমরা তো সকলেই সদা শংকিত" (২৬ঃ ৫৩-৫৬)।
তাফসীরবিদগণের বর্ণনামতে ফিরআওন বিশাল বাহিনী সমভিব্যাহারে বানু ইসরাঈলের লোকদের পদচিহ্ন অনুসরণ করিয়া রওয়ানা হইল। তাহার দলে অসংখ্য উত্তম ও শক্তিশালী ঘোড়া ছিল। মোট ঘোড়ার সংখ্যা ছিল সতের লক্ষ (আত-তাবারী, তারীখ, ১খ, ৪১৪)। তন্মধ্যে উৎকৃষ্ট জাতের কালো ঘোড়া ছিল এক লক্ষ। আর তাহার সৈন্যসংখ্যা ছিল ষোল লক্ষাধিক (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ২৭০)। এক বর্ণনামতে এই সময়ে মূসা (আ)-এর বয়স ছিল ৮০ বৎসর। বানূ ইসরাঈল যেদিন তাহাদের পূর্বপুরুষ ইসরাঈলসহ মিসরে আগমন করিয়াছিলেন সেই দিন হইতে মূসা (আ)-এর সঙ্গে বাহির হইয়া যাওয়ার সময় পর্যন্ত মোট ৪২৬ সৌর বৎসরের ব্যবধান ছিল (আল-বিদায়া, ১খ, ২৭০)। ইবরাহীম (আ)-এর জন্ম হইতে এই পর্যন্ত ৫০৫ (পাঁচ শত পাঁচ) বৎসরের ব্যবধান। আর আদম (আ)-এর পৃথিবীতে আগমনের সময় হইতে এই সময় পর্যন্ত মোট ৩৮৪০ (তিন হাজার আট শত চল্লিশ) বৎসর (আল-মুনতাজাম, ১খ, ৩৪৮)।
বনূ ইসরাঈলের অগ্রভাগে ছিলেন হারুন (আ), আর মূসা (আ) ছিলেন তাহাদের বাহুতে। অপরদিকে ফিরআওন বাহিনীর অগ্রভাগে ছিল হামান। তাহারা সূর্যোদয়ের সময় বানু ইসরাঈলের নিকটে পৌঁছিয়া গেল (দ্র. ২৬: ৬০)। উভয় দল উভয় দলকে দেখিতে পাইল। তখন মূসা (আ)-এর সঙ্গীবৃন্দ ঘাবড়াইয়া গিয়া বলিতে লাগিল, আমরা তো ধরা পড়িয়া গেলাম (দ্র. ২৬৪ ৬১)। এই সময় তাহারা আরো বলিতে লাগিল, তুমি আগমনের পূর্বেও আমাদিগকে শাস্তি দেওয়া হইত, আমাদের কন্যা সন্তানগণকে বাঁচাইয়া রাখিয়া পুত্র সন্তানগণকে হত্যা করা হইত; আর তুমি আগমনের পর এখনো। কারণ আমাদের সম্মুখে সমুদ্র আর পিছনে ফিরআওন বাহিনী। সুতরাং উহারা এখনই আমাদিগকে ধরিয়া হত্যা করিবে (আল-কামিল, ১খ, ১৪৩; আত-তাবারী, তারীখ, ১খ, ৪১৫)। কিন্তু মূসা (আ)-এর আল্লাহ্র প্রতি ছিল অগাধ আস্থা ও অটুট বিশ্বাস। তাই দৃঢ়কণ্ঠে তিনি বলিলেন:
كَلَّا إِنَّ مَعِيَ رَبِّي سَيَهْدِيْنِ. (٢٦ : ٦٢) "কিছুতেই নয়! আমার সঙ্গে আছেন আমার প্রতিপালক; সত্বর তিনি আমাকে পথ দেখাইবেন" (২৬ঃ ৬২)।
তিনি আরো বলিলেনঃ عَسَى رَبُّكُمْ أَنْ يُهْلِكَ عَدُوكُمْ وَيَسْتَخْلِفَكُمْ فِي الْأَرْضِ فَيَنْظُرَ كَيْفَ تَعْمَلُوْنَ (৭ : ১২৯) "শীঘ্রই তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের শত্রু ধ্বংস করিবেন এবং তিনি তোমাদিগকে রাজ্যে তাহাদের স্থলাভিষিক্ত করিবেন। অতঃপর তোমরা কী কর তাহা তিনি লক্ষ্য করিবেন" (৭: ১২৯)।
অতঃপর তিনি অগ্রভাগে গেলেন এবং সমুদ্রের প্রতি দৃষ্টিপাত করিলেন। তখন সমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গমালা গর্জন করিতেছিল। তিনি বলিতেছিলেন, এইখানে আসার জন্যই আমাকে নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে। তাঁহার সঙ্গে ছিল তদীয় ভ্রাতা হারুন (আ), বনূ ইসরাঈলের অন্যতম সরদার ও আলিম ইউশা' ইব্ন নূন। তাহাদের সহিত ফিরআওন বংশের মুমিন ব্যক্তিটিও ছিলেন। তাহারা সমুদ্রের কিনারে আসিয়া থমকিয়া দাঁড়াইয়াছিলেন। এক বর্ণনামতে উক্ত মুমিন ব্যক্তিটি তাহার ঘোড়া লইয়া সমুদ্রে চলার কয়েক বার উদ্যোগ গ্রহণ করেন, কিন্তু তাহা সম্ভব হইল না। তিনি মূসা (আ)-কে বলিলেন, হে আল্লাহর নবী! আপনি কি এইখানে আগমন করিতে নির্দেশিত হইয়াছেন? মূসা (আ) বলিলেন, হাঁ।
ফিরআওন বাহিনী যখন নিকটতর হইল এবং বানু ইসরাঈল একেবারে নিরূপায় হইয়া দণ্ডায়মান রহিল তখন মহান আল্লাহ তাআলার পক্ষ হইতে মূসা (আ)-এর প্রতি নির্দেশ আসিল, "তোমার লাঠি দ্বারা সমুদ্রে আঘাত কর"। তখন মূসা (আ) স্বীয় লাঠি দ্বারা সমুদ্রে আঘাত করিলেন এবং বলিলেন, আল্লাহ্র নির্দেশে পথ হইয়া যাও। তখন উহা বিভক্ত হইয়া প্রত্যেক ভাগ বিশাল পর্বত সদৃশ হইয়া গেল (দ্র. ২৬ঃ ৬৩-৬৪)। মুফাসসিরগণের বর্ণনামতে তখন সমুদ্রে ১২টি পথ হইয়া গেল। প্রত্যেক উপগোত্রের জন্য একটি করিয়া রাস্তা হইল। পশ্চিমা বায়ুকে প্রবাহিত হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হইল। ফলে পথগুলি শুকাইয়া গেল। তাহারা উহা ধরিয়া চলিতে শুরু করিল। এক বর্ণনামতে প্রত্যেক উপগোত্র বলিতে লাগিল, আমাদের সঙ্গীরা মারা গিয়াছে। তখন মূসা (আ) আল্লাহ্র নিকট দুআ করিলেন। অতঃপর এক পথ হইতে অন্য পথের মধ্যে জানালা হইয়া গেল যাহাতে এক গোত্র অন্য গোত্রকে দেখিতে পায় এবং তাহাদের মনে কোনরূপ সংশয় না থাকে। হাফিজ ইব্ন কাছীর এই বর্ণনাকে সংশয়পূর্ণ ও সমালোচনাযোগ্য (فيه نظر) বলিয়া মন্তব্য করিয়াছেন (আল-বিদায়া, ১খ, ২৭১)।
মূসা (আ) ও তাঁহার অনুসারিগণ উৎফুল্লচিত্তে দ্রুত সমুদ্র পার হইয়া গেলেন। তাহাদের শেষ ব্যক্তিটি যখন পার হইয়া কিনারে উঠিয়া গেল তখন ফিরআওন তাহার দলবল লইয়া সেখানে উপস্থিত হইল। তখন মূসা (আ) তাঁহার লাঠি দ্বারা পুনরায় সমুদ্রে আঘাত করিতে উদ্যত হইলেন যাহাতে উহা পূর্বের ন্যায় হইয়া যায় এবং ফিরআওন ও তাহার দলবল সমুদ্র পার হইতে না পারে। তখন আল্লাহ তাআলা তাহাকে উহা করিতে নিষেধ করিলেন এবং সমুদ্রকে উক্ত অবস্থায় রাখিতে বলিলেন। কারণ তিনি যে উহাতে ফিরআওন ও তাহার দলবলকে ডুবাইয়া মারিবেন। এই ঘটনার আনুপূর্বিক বর্ণনা দিয়া কুরআন কারীমে ইরশাদ হইয়াছে:
وَلَقَدْ فَتَنَّا قَبْلَهُمْ قَوْمَ فِرْعَوْنَ وَجَاءَهُمْ رَسُولٌ كَرِيمٌ أَنْ أَدُّوا إِلَيَّ عِبَادَ اللَّهِ إِنِّي لَكُمْ رَسُولٌ أَمِينٌ، وَأَنْ لَا تَعْلُوا عَلَى اللَّهِ إِنِّي أَتَيْكُمْ بِسُلْطَانٍ مُبِينٍ، وَإِنِّي عُذْتُ بِرَبِّي وَرَبِّكُمْ أَنْ تَرْجُمُونِ ، وَإِنْ لَمْ تُؤْمِنُوا لِي فَاعْتَزِلُونَ . فَدَعَا رَبَّهُ أَنْ هَؤُلاء قَوْمٌ مُجْرِمُونَ . فَأَسْرِ بِعِبَادِي لَيْلاً إِنَّكُمْ مُتَّبَعُونَ. وَاتْرُكِ الْبَحْرَ رَهْوا إِنَّهُمْ جُنْدٌ مُغْرَقُونَ . كَمْ تَرَكُوا مِنْ جَنَّاتٍ وَعُيُون، وَزُرُوعٍ وَمَقَامٍ كَرِيم وَنَعْمَةٍ كَانُوا فِيهَا فَاكِهِينَ. كَذَلِكَ وَأَوْرَثْنَاهَا قَوْمًا أَخَرِينَ. فَمَا بَكَتْ عَلَيْهِمُ السَّمَاءُ وَالْأَرْضُ وَمَا كَانُوا مُنْظَرِينَ. وَلَقَدْ نَجَّيْنَا بَنِي إِسْرَائِيلَ مِنْ الْعَذَابِ الْمُهِينِ مِنْ فِرْعَوْنَ إِنَّهُ كَانَ عَالِيًا مِنَ الْمُسْرِفِينَ. وَلَقَدِ اخْتَرْنَاهُمْ عَلَى عِلْمٍ عَلَى الْعَالَمِينَ. وَآتَيْنَاهُمْ مِّنَ الْآيَاتِ مَا فِيهِ بَلَاءٌ مُّبِينٌ (৪৪ : ১৭-৩৩)
"ইহাদের পূর্বে আমি তো ফিরআওন সম্প্রদায়কে পরীক্ষা করিয়াছিলাম এবং উহাদের নিকটও আসিয়াছিল এক সম্মানিত রাসূল। সে বলিল, আল্লাহ্র বান্দাদিগকে আমার নিকট প্রত্যর্পণ কর। আমি তোমাদের জন্য এক বিশ্বস্ত রাসূল। এবং তোমরা আল্লাহ্ বিরুদ্ধে ঔদ্ধত্য প্রকাশ করিও না, আমি তোমাদের নিকট উপস্থিত করিতেছি স্পষ্ট প্রমাণ। তোমরা যাহাতে আমাকে প্রস্তরাঘাতে হত্যা করিতে না পার, তজ্জন্য আমি আমার প্রতিপালক ও তোমাদের প্রতিপালকের শরণ লইতেছি। যদি তোমরা আমার কথায় বিশ্বাস স্থাপন না কর, তবে তোমরা আমা হইতে দূরে থাক। অতপর মূসা তাহার প্রতিপালকের নিকট নিবেদন করিল, 'ইহারা তো এক অপরাধী সম্প্রদায়! আমি বলিয়াছিলাম, তুমি আমার বান্দাদিগকে লইয়া রজনী যোগে বাহির হইয়া পড়, তোমাদের পশ্চাদ্ধাবন করা হইবে। সমুদ্রকে স্থির থাকিতে দাও, উহারা এমন এক বাহিনী যাহা নিমজ্জিত হইবে। উহারা পশ্চাতে রাখিয়া গিয়াছিল কত প্রস্রবণ, কত শস্যক্ষেত্র ও সুরম্য প্রাসাদ, কত বিলাস উপকরণ, উহাতে তাহারা আনন্দ পাইত। এইরূপই ঘটিয়াছিল এবং আমি এই সমুদয়ের উত্তরাধিকারী করিয়াছিলাম ভিন্ন সম্প্রদায়কে। আকাশ ও পৃথিবী কেহই উহাদের জন্য অশ্রুপাত করে নাই এবং উহাদিগকে অবকাশও দেওয়া হয় নাই। আমি তো উদ্ধার করিয়াছলাম বনূ ইসরাঈলকে লাঞ্ছনাদায়ক শান্তি হইতে, ফিরআওনের; সে তো ছিল পরাক্রান্ত সীমালংঘনকারীদের মধ্যে। আমি জানিয়া-শুনিয়াই উহাদিগকে বিশ্বে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়াছিলাম এবং উহাদিগকে দিয়াছিলাম নিদর্শনাবলী, যাহাতে ছিল সুস্পষ্ট পরীক্ষা" (৪৪:১৭-৩৩)।
ফিরআওন সেখানে পৌঁছিয়া যখন এই অবস্থা দেখিল তখন সে মনে মনে ঘাবড়াইয়া গেল। সে বুঝিতে পারিল যে, ইহা সম্মানিত আরশের অধিপতি মহা ক্ষমতাধর প্রতিপালকেরই কাজ। সে থমকিয়া দাঁড়াইল, সম্মুখে আর অগ্রসর হইল না; বরং মনে মনে ইহাদের পশ্চাদ্ধাবনে বাহির হওয়ার জন্য লজ্জিত ও অনুতপ্ত হইল। তাহার এই লজ্জা ও অনুতাপ কোন কাজে আসিল না। সে ইহা গোপন রাখিয়া তাহার সেনাবাহিনী ও পারিষদবর্গকে বলিল, দেখ! সমুদ্র আমার জন্য কিভাবে রাস্তা করিয়া দিয়াছে, যাহাতে আমার শত্রুদিগকে পাকড়াও করিতে পারি, যাহারা আমার আনুগত্য ও আমার দেশ হইতে পলায়ন করিয়া আসিয়াছে। প্রকাশ্যে এই দম্ভোক্তি করিলেও সে মনে মনে বলিতেছিল, যদি তাহাদের পিছনে পিছনে পার হওয়া যায়। তাই সে একবার সম্মুখে অগ্রসর হইতেছিল, আবার উহা হইতে বিরত থাকিতেছিল এবং পিছাইয়া আসিতেছিল।
এক বর্ণনামতে তাহার এই অবস্থা দেখিয়া জিবরাঈল (আ) একটি মাদী ঘোড়ায় সওয়ার হইয়া ফিরআওনের পুরুষ ঘোড়াটির সম্মুখ দিয়া দ্রুত ছুটিয়া গেলেন এবং সমুদ্রের পথে ধাবিত হইতে লাগিলেন। ইহা দেখিয়া ফিরআওনের পুরুষ ঘোড়াটি দ্রুত উহার পিছু পিছু ছুটিল। ফিরআওন নিরুপায় হইয়া উহার উপর নির্বিকার চিত্তে বসিয়া রহিল। তাহার কিছুই করার ছিল না। নিজের ভাল মন্দ-তাহার হাতে ছিল না। ফিরআওনের সৈন্য-সামন্ত ইহা দেখিয়া তাহারাও তাহার পিছু অনুসরণ করিয়া সমুদ্রে আসিয়া পড়িল। অতঃপর একে একে শেষ ব্যক্তিটিও যখন সমুদ্রে নামিল এবং তাহাদের প্রথম ব্যক্তি অপর তীরের কাছাকাছি আসিয়া গেল তখন আল্লাহ তাআলা মূসা (আ)-কে তাঁহার লাঠি দ্বারা পুনরায় সমুদ্রে আঘাত করিবার নির্দেশ দিলেন। মূসা (আ) লাঠি দ্বারা আঘাত করিতেই রাস্তাবিলীন হইয়া গেল এবং পূর্বের ন্যায় পানিতে একাকার হইয়া গেল। তাহাদের একটি লোকও আর নিস্তার পাইল না, সকলেই পানিতে নিমজ্জিত হইল। কুরআন কারীমে ইরশাদ হইয়াছে:
وَأَنْجَيْنَا مُوسَى وَمَنْ مَعَهُ أَجْمَعِينَ . ثُمَّ أَعْرَقْنَا الْآخَرِيْنَ (٦٦-٦٥ : ٢٦) "আমি উদ্ধার করিলাম মূসা ও তাহার সঙ্গী সকলকে, তৎপর নিমজ্জিত করিলাম অপর দলটিকে" (২৬: ৬৫-৬৬)।
ফিরআওন যখন ডুবিতেছিল তখন ভয় ও আতঙ্কে বলিয়া উঠিল: أمَنْتُ أَنَّهُ لا إِلهَ إِلَّا الَّذِي أَمَنَتْ بِهِ بَنُو إِسْرَائِيلَ وَآنَا مِنَ الْمُسْلِمِينَ. (۹۰ : ۱۰) "আমি বিশ্বাস করিলাম বানু ইসরাঈল যাহাতে বিশ্বাস করে। নিশ্চয়ই তিনি ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ নাই এবং আমি আত্মসমর্পণকারীদের অন্তর্ভুক্ত" (১০: ৯০)।
তখন জিবরাঈল (আ) সমুদ্রের তলদেশ হইতে কালো কাদা তুলিয়া ফিরআওনের মুখে পুরিয়া দিলেন। ইব্ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (স) বলেন: আল্লাহ যখন ফিরআওনকে ডুবাইয়া মারিতেছিলেন তখন সে বলিয়াছিল - أمَنْتُ بالذي أمَنَتْ به بَنُو إِسْرَائِيلَ وَآنَا مِنَ المُسلمين . জিবরাঈল (আ) বলেন, হে মুহাম্মাদ তখন যদি আপনি আমাকে দেখিতেন। আমি তো সমুদ্রের তলদেশ হইতে কাদা লইয়া তাহার মুখে পুরিয়া দিতেছিলাম এই ভয়ে যে, না জানি আল্লাহ্র রহমত তাহাকে পাইয়া বসে (তিরমিযী, আস-সুনান আস-সাহীহ, কিতাবুত-তাফসীর, সূরা ইউনূস)।
📄 ফিরআওনের লাশ
ফিরআওন পানিতে ডুবিয়া মারা যাওয়ার বিষয়টি সমুদ্র পার হইয়া যাওয়া বানু ইসরাঈলও বিশ্বাস করিতে পারিতেছিল না যে, ফিরআওন মারা গিয়াছে। তাহাদের কেহ কেহ বলিতেছিল, সে এখনই আমাদিগকে ধরিয়া ফেলিবে এবং হত্যা করিবে। তাই কেহ কেহ বারবার পিছনে ফিরিয়া তাকাইয়াও দেখিতেছিল যে, ফিরআওন সমুদ্র হইতে উঠিয়া আসে কিনা। তখন মূসা (আ) আল্লাহ্র নিকট দুআ করিলেন, আল্লাহ তাআলা সমুদ্রকে নির্দেশ দিলেন তাহার লাশ উঠাইয়া দিতে। অতঃপর সমুদ্র উহার কিনারায় এক উচু জায়গায় ঢেউয়ে তাহার লাশ ভাসাইয়া তুলিল। ফলে সকলেই উহা প্রত্যক্ষ করিয়া নিশ্চিত হইল। এক বর্ণনামতে পানির উপরেই তাহার লাশ ভাসিয়া উঠিল। তাহার পরনে তখনও তাহার বর্মটি ছিল যাহা বানু ইসরাঈল চিনিত (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ২৭৩)। এইভাবেই আল্লাহ তাআলা বানু ইসরাঈলকে তাঁহার কুদরত প্রদর্শন করাইলেন এবং তাহারাও তাহাদের চরম শত্রুর মৃত্যু বিষয়ে নিশ্চিত হইল ও স্বস্তি লাভ করিল।
ফিরআওন ডুবিয়া যাইবার সময় যে ঈমানের ঘোষণা দিয়াছিল আল্লাহ তাহা প্রত্যাখ্যান করত তাহাকে জানাইয়া দিয়াছিলেন যে, তাহার দেহটি রক্ষা করিবেন যাহাতে তাহা পরবর্তীদের জন্য নিদর্শন হইয়া থাকে। কুরআন কারীমে ইরশাদ হইয়াছে : فَالْيَوْمَ نُنَجِّيكَ بِبَدَنِكَ لِتَكُونَ لِمَنْ خَلْفَكَ آيَةً وَإِنَّ كَثِيرًا مِّنَ النَّاسِ عَنْ آيَاتِنَا لَغَافِلُونَ (۹۲ : ۱۰) "আজ আমি তোমার দেহটি রক্ষা করিব যাহাতে তুমি তোমার পরবর্তীদের জন্য নিদর্শন হইয়া থাক। অবশ্যই মানুষের মধ্যে অনেকে আমার নিদর্শন সম্বন্ধে গাফিল" (১০ঃ ৯২)।
আল্লাহ তাঁহার এই ঘোষণা সত্যে পরিণত করিয়াছেন এবং তাহার দেহ রক্ষা করিয়াছেন। মিসরবাসী যখন ফিরআওনের লাশ দেখিল তখন তাহাদের এই অপমানজনক পরাজয় গোপন করিবার জন্য খুব দ্রুত তাহারা উহা উঠাইয়া লইয়া যায় এবং মমি করত দাফন করিয়া রাখে। হাজার হাজার বৎসর অজানা থাকিবার পর উনবিংশ শতকের শেষদিকে প্রত্নতাত্ত্বিক খনন ও গবেষণায় এই লাশ আবিষ্কৃত হয়। অতঃপর উহা কয়েকবার যাদুঘরে দর্শনার্থীদের জন্য রাখা হইয়াছে। উহা আজ পর্যন্ত অবিকল রহিয়াছে। এক বর্ণনামতে ডুবিয়া যাওয়ার সময় কোন এক পাথরের সাথে আঘাত লাগিয়া তাহার বিচুকের হাড় ভাঙ্গিয়া যায়, সেই ভাঙ্গা এখনো রহিয়াছে (আম্বিয়া-ই কুরআন, ২খ, ১৯২-১৯৩)। এক বর্ণনায় তাহার নাকের কিছুটা মাছে বা হাঙ্গরে খাইয়া ফেলে যাহা আজও পরিদৃষ্ট হয় (কাসাসুল কুরআন, ১খ, ৪৫৯)।
এই ব্যাপারে ড. মরিস বুকাইলি প্রচুর গবেষণা করেন এবং ফিরআওনের সেই মমির পরীক্ষা- নিরীক্ষাও করেন। তিনি বলেন, "মিসর রাজ দ্বিতীয় রামেসীসের সন্তান মারনেপ্তাহ-ই ছিল সেই ফিরআওন, যে হযরত মূসা (আ)-এর নেতৃত্বে ইয়াহুদীদের মিসর ত্যাগের ঘটনার সহিত জড়িত ছিল এবং সমুদ্রে ডুবিয়া মারা যায়। এই ফিরআওন মারনেপ্তাহর মমিকৃত দেহটি আবিষ্কার করেন মিঃ লরেট-১৮৯৮ খৃস্টাব্দে থেবেসের রাজকীয় উপত্যকা হইতে। সেখান হইতে মমিটিকে কায়রো আনা হয়। ১৯০৭ সালের ৮ই জুলাই এলিয়ট স্মীথ এই মমিটির আবরণ উন্মোচন করেন। তিনি তাহার 'রয়্যাল মামিজ' পুস্তকে (১৯১২) এই আবরণ উন্মোচন এবং মমিটির দেহ পরীক্ষার বিস্তারিত বিবরণ লিপিবদ্ধ করিয়া গিয়াছেন। এই বিবরণ হইতে জানা যায় কয়েকটি জায়গায় কিছু কিছু বিকৃতি ঘটিলেও মোটামুটিভাবে লাশটি সন্তোষজনকভাবে সংরক্ষিত ছিল। সেই সময় হইতে কায়রোর যাদুঘরে পর্যটকদের দর্শনের জন্য মমিটিকে রাখা হইয়াছে। মাথা ও ঘাড়টি খোলা, বাদবাকী দেহটি কাপড়ে ঢাকা। প্রদর্শনের এই ব্যবস্থা খোলা, বাদবাকী দেহটি কাপড়ে ঢাকা। প্রদর্শনের এই ব্যবস্থা সত্ত্বেও মমিটিকে এমন কঠোরভাবে সংরক্ষণ করা হইতেছে যে, কাহাকেও ওই মমির ফটো পর্যন্ত তুলিতে দেওয়া হয় না। সেই ১৯১২ সালে স্মীথের তোলা ফটোগুলি ছাড়া আর কোন ফটো যাদুঘর কর্তৃপক্ষের নিকটেও নাই।
"১৯৭৫ সালের জুন মাসে মিসরীয় কর্তৃপক্ষ মেহেরবানী করিয়া আমাকে (মরিস বুকাইলিকে) মমিটির শরীরের বিভিন্ন অংশ পরীক্ষা করিয়া দেখার অনুমতি দান করেন। এতদিন যাবত মমিটির দেহের এইসব অংশ কাপড়েই ঢাকা পড়িয়াছিল। কর্তৃপক্ষ আমাকে মমিটির শরীরের বিভিন্ন অংশের ফটো তোলারও অনুমতি দিয়াছিলেন।
"আমার পরামর্শক্রমে ১৯৭৫ সালের জুন মাসে মমিটিকে পরীক্ষা করিয়া দেখার জন্য একটি বিশেষ টীম গঠন করা হয়। ড. এল. মেলিগাই ও ড. র্যামসিয়ীস-এর দ্বারা মমিটির উপর চমৎকারভাবে রেডিওগ্রাফিক স্টাডি পরিচালিত হয়। ড. মুস্তাফা মানিয়ালাভী মমিটির বুকের একটা ফাঁকা জায়গা দিয়া বুকের ভিতরটাও ভালভাবে পরীক্ষা করিয়া দেখেন। ইহা ছাড়া মমিটির পেটেও ব্যাপকভাবে পরীক্ষা চালানো হয়। কোন মমির উদরের অভ্যন্তরে এই ধরনের পরীক্ষা ও তদন্ত পরিচালনা ইহাই প্রথম।
"এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আমরা মমিটির অভ্যন্তর ভাগের বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিস্তারিতভাবে জানিবার এবং সেই সবের ফটো তুলিবার সুযোগ পাই। অধ্যাপক সেসালডির দ্বারা মমিটির উপর পরিচালিত হইয়াছিল মেডিকো-লিগ্যাল স্টাডি। মমিটির দেহ হইতে খসিয়া পড়া একটা টুকরা অনুবীক্ষণ যন্ত্র দ্বারা পরীক্ষা করিয়া দেখা হয়। এই চূড়ান্ত পরীক্ষা ও গবেষণা পরিচালিত হয় অধ্যাপক মিগনট ও ড. ডুরিগণের দ্বারা। দুঃখের বিষয়, এইসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও তদন্তের সুনির্দিষ্ট ফলাফল এই মুহূর্তে পাঠকদিগকে জানানো সম্ভব হইতেছে না- কেননা মুদ্রণের জন্য এই পুস্তকের পাণ্ডুলিপি প্রেসে পাঠাইতে হইতেছে (১ম সংস্করণ, নভেম্বর ১৯৭৫)।
"তবুও এইসব পরীক্ষা ও তদন্তের ফলে উপস্থিত যাহা জানা গিয়াছে, তাহাও কম গুরুত্বপূর্ণ নহে। দেখা গিয়াছে মমিটির হাড়ে একাধিক ক্ষত বিদ্যমান। সেইগুলিতে বড় বড় ফাঁকও রহিয়াছে। উহার কোন কোনটি হয়তোবা ক্ষয় হইয়া গিয়া থাকিতে পারে। তবে সেইগুলি ফিরআওনের মৃত্যুর আগে হইয়াছে না পরে এখন তাহা নির্ণয় করা সম্ভব হইতেছে না। মমিটি পরীক্ষা করিয়া আরো যাহা পাওয়া গিয়াছে তাহাতে বলা যাইতে পারে যে, এই ফির'আওনের মৃত্যু হইয়াছে- ধর্মগ্রন্থ তথা কুরআন কারীমে যেমনটি বলা হইয়াছে, পানিতে ডুবিয়া যাওয়ার কারণে কিংবা পানিতে ডুবিয়া যাওয়ার প্রাক্কালে নিদারুণ কোনও 'শক'-এর দরুন। আবার একই সঙ্গে সংঘটিত এই দুইটি কারণেও তাহার মৃত্যু ঘটা বিচিত্র নহে” (বাইবেল কোরআন ও বিজ্ঞান, মূলঃ ড. মরিস বুকাইলি, অনু, আখতার-উল-আলম, পৃ. ৩২১-৩২৩)।
ফিরআওনের মৃত্যু ও বনু ইসরাঈলের মুক্তি লাভ হইয়াছিল মুহাররাম মাসের দশ তারিখ (আল-বুখারী, আস-সাহীহ, বাব সওমু য়াওমি 'আশূরা)।