📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সালাত ও কুরবানীর নির্দেশ

📄 সালাত ও কুরবানীর নির্দেশ


বানু ইসরাঈলের প্রতি হুকুম নাযিল করা হইল যে, তাহারা যেন মিসরীয়গণ হইতে পৃথক জায়গায় বসতি স্থাপন করে যাহাতে কোনরূপ শাস্তি আসিলে তাহারা নিরাপদ থাকিতে পারে। কুরআন কারীমে ইরশাদ হইয়াছে :
وَأَوْحَيْنَا إِلَى مُوسَى وَأَخِيهِ أَنْ تَبَوَّأُ لِقَوْمِكُمَا بِمصْرَ بُيُوتًا . (۱۰ : ۸۷)
"আমি মূসা ও তাহার ভ্রাতাকে প্রত্যাদেশ করিলাম, মিসরে তোমাদের সম্প্রদায়ের জন্য গৃহ স্থাপন কর" (১০; ৮৭)।
হযরত শাহ আবদুল কাদের মুহাদ্দিছ দিহলাবী তাহার মূদিহুল কুরআন শীর্ষক তাফসীর গ্রন্থে লিখিয়াছেন যে, ফিরআওনের ধ্বংসের সময় যখন ঘনাইয়া আসিল, তখন মূসা (আ)-এর প্রতি নির্দেশ হইল যে, তোমার সম্প্রদায়কে ইহাদের সহিত মিলিত অবস্থায় রাখিও না; অন্যত্র তোমাদের বসবাস স্থাপন কর। যাহাতে ইহাদের উপর বিপদাপদ আসিলে তাহা তোমার সম্প্রদায়কে স্পর্শ করিতে না পারে। বাইবেলের বর্ণনা হইতে জানা যায় যে, বানু ইসরাঈল পূর্ব হইতেই গুশন অঞ্চলে বসবাস করিত। সম্ভবত এই সময়ে কিছু লোক এদিক-ওদিক ছড়াইয়া পড়িয়াছিল। সেইজন্য এই নির্দেশ দেওয়া হয়।
ফিরআওন বানু ইসরাঈলের সকল উপাসনালয় ধ্বংস করিয়া দিয়াছিল, যাহাতে তাহারা সেখানে আসিয়া আল্লাহ্ ইবাদত করিতে না পারে। এই সময় সালাত তাহাদের স্ব স্ব গৃহেই কায়েম করিবার নির্দেশ দেওয়া হইল। গৃহের কোন একটি অংশ সালাতের জন্য নির্দিষ্ট করিয়া লইতে বলা হইল, যাহাতে তাহারা সালাত পরিত্যাগ না করে (আম্বিয়া-ই কুরআন, ২খ, ১৭৭-১৭৮)। এই ব্যাপারে কুরআন কারীমে ইরশাদ হইয়াছে:
وَاجْعَلُوا بُيُوتَكُمْ قِبْلَةً وَأَقِيمُوا الصَّلوةَ وَبَشِّرِ الْمُؤْمِنِينَ (۸۷ : ۱۰) "তোমাদের গৃহগুলিকে ইবাদতগৃহ কর, সালাত কায়েম কর এবং মুমিনদিগকে সুসংবাদ দাও" (১০:৮৭)। সালাত ও কুরবানী নির্দেশ বানু ইসরাঈলকে মিসরে থাকা অবস্থায়ই দেয়া হয়। বাইবেলে সালাত সম্পর্কিত এই হুকুমের উল্লেখ নাই। তবে কুরবানীর উল্লেখ আছে, যাহা তাহাদের মিসর ত্যাগের কিছু পূর্বে নাযিল হয়। উহার বিস্তারিত বিবরণ যাত্রাপুস্তক, ১২: ১-২৭-এ উল্লিখিত হইয়াছে (জামীল আহমাদ, প্রাগুক্ত)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আল্লাহর নিদর্শনাবলী

📄 আল্লাহর নিদর্শনাবলী


লাঠি সর্পে পরিণত হওয়া এবং হস্ত জ্যোতির্ময় হওয়ার মত এত বড় মুজিযা দেখিবার পরও ফিরআওন ও তাহার সম্প্রদায় ঈমান তো আনিলই না বরং যাহারা মূসা (আ)-এর উপর ঈমান আনয়ন করিয়াছিল, তাহাদিগকে নির্যাতন ও হত্যা করিতে লাগিল। বানু ইসরাঈলদের উপর শাস্তি উত্তরোত্তর বৃদ্ধি করিতে লাগিল। তখন আল্লাহ তাআলা তাহাদিগকে কিছু শাস্তি দিতে চাহিলেন, যাহাতে তাহারা সতর্ক হয় এবং আল্লাহ্র পথে ফিরিয়া আসে। এই উদ্দেশ্যে আল্লাহ তাআলা তাহাদের প্রতি পরপর কিছু নিদর্শন প্রেরণ করেন। সুদ্দীর বর্ণনামতে নিদর্শনগুলি যাদুকরদের সহিত মূসা (আ)-এর মুকাবিলার পূর্বে প্রেরণ করা হইয়াছিল (আত-তাবারী, তারিখ, ১খ, ৪১০; ইবনুল জাওযী, আল-মুনতাজাম, ১খ, ৩৪৪)।
কিন্তু পাপাচারী ফিরআওন ও তাহার সম্প্রদায় ইহাতে সতর্ক হইল না; বরং যখনই কোন শাস্তি বা আল্লাহর নিদর্শন আসিত তাহারা মূসা (আ)-কে বলিত, তোমার প্রতিপালকের নিকট দুআ কর। এই বিপদ কাটিয়া গেলেই আমরা ঈমান আনয়ন করিব এবং বানু ইসরাঈলকে মুক্ত করিয়া তোমার সহিত যাইতে দিব। কিন্তু যখনই উক্ত শাস্তি তুলিয়া লওয়া হইত তখনই তাহারা তাহাদের কৃত অঙ্গীকার ভঙ্গ করিত। কুরআন কারীমে এই প্রসঙ্গে বলা হইয়াছেঃ
وَمَا نُرِيهِمْ مِنْ آيَةٍ إِلَّا هِيَ أَكْبَرُ مِنْ أُخْتِهَا وَأَخَذْنَاهُمْ بِالْعَذَابِ لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ، وَقَالُوا يَا أَيُّهَا السَّاحِرُ ادْعُ لَنَا رَبَّكَ بِمَا عَهِدَ عِنْدَكَ إِنَّنَا لَمُهْتَدُونَ . فَلَمَّا كَشَفْنَا عَنْهُمُ الْعَذَابَ إِذَا هُمْ يَنْكُثُونَ . (٥٠-٤٨ : ٤٣)
"আমি উহাদিগকে এমন কোন নিদর্শন দেখাই নাই যাহা উহার অনুরূপ নিদর্শন অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ নহে। আমি উহাদিগকে শাস্তি দিলাম যাহাতে ইহারা প্রত্যাবর্তন করে। উহারা বলিয়াছিল, হে যাদুকর! তোমার প্রতিপালকের নিকট তুমি আমাদের জন্য তাহা প্রার্থনা কর যাহা তিনি তোমার সহিত অঙ্গীকার করিয়াছেন; তাহা হইলে আমরা অবশ্যই সৎপথ অবলম্বন করিব। অতঃপর যখন আমি উহাদের উপর হইতে শান্তি বিদূরিত করিলাম তখনই উহারা অঙ্গীকার ভঙ্গ করিয়া বসিল" (৪৩:৪৮-৫০)।
কুরআন কারীমে মূসা (আ)-এর উপর প্রেরিত নিদর্শনের সংখ্যা নয়টি বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছেঃ "আমি মূসাকে নয়টি স্পষ্ট নিদর্শন দিয়াছিলাম" (১৭: ১০১)। ইব্‌ন আব্বাস (রা), মুজাহিদ, 'ইকরিমা, শা'বী ও কাতাদার মতে উক্ত নয়টি নিদর্শন হইল: (১) তাঁহার লাঠি; (২) হাত; (৩) দুর্ভিক্ষ; (৪) ফল-ফসলের ক্ষতি; (৫) প্লাবন; (৬) পঙ্গপাল; (৭) উকুন; (৮) বেঙ ও (৯) রক্ত (ইব্‌ন কাছীর, তাফসীর, উপরিউক্ত আয়াতের তাফসীর, ৩খ, ৬৬)।
তাহাদের প্রতি প্রেরিত নিদর্শনগুলির সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিম্নরূপঃ

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 দুর্ভিক্ষ ও ফল-ফসলের ক্ষতি

📄 দুর্ভিক্ষ ও ফল-ফসলের ক্ষতি


কুরআন কারীমে ইরশাদ হইয়াছে:
وَلَقَدْ أَخَذْنَا آلَ فِرْعَوْنَ بِالسِّنِينَ وَنَقْصٍ مِّنَ الثَّمَرَاتِ لَعَلَّهُمْ يَذَكَّرُونَ . (۱۳۰ : ۷)
"আমি তো ফিরআওনের অনুসারিগণকে দুর্ভিক্ষ ও ফল-ফসলের ক্ষতি দ্বারা আক্রান্ত করিয়াছি যাহাতে তাহারা অনুধাবন করে" (৭: ১৩০)।
আল্লাহ তাআলা ফিরআওন ও তাহার সম্প্রদায় কিবতীগণকে দুর্ভিক্ষে ফেলিলেন। তাহাদের শস্য উৎপাদিত হইল না। গরু-ছাগলের বাঁটে দুধ পাওয়া গেল না, বৃক্ষে ফল কম হইল। এইগুলি এইজন্য করা হইল যাহাতে তাহারা আল্লাহকে স্মরণ করে। কিন্তু ইহা হইতে তাহারা শিক্ষা গ্রহণ করিল না, বরং কুফরীতে অটল রহিল। অতঃপর মূসা (আ)-এর দু'আ যখন তাহাদের জমিনে বরকত হইল, বৃক্ষে ফল ফলিল তখন তাহারা বলিল, আমাদের জন্যই ইহা হইয়াছে, ইহাই আমাদের প্রাপ্য। আর যখন অসুবিধা ও অকল্যাণ দেখা দিত তখন তাহারা ইহার দায়ভার মূসা (আ) ও তাঁহার সঙ্গীদের উপর চাপাইত। বলিত, তাহারা অপয়া, তাহাদের কারণেই আমাদের উপর এই দুর্ভোগ আসিয়াছে। আল্লাহ ইহা খণ্ডন করিয়া বলেন, তাহাদের এই দুর্ভোগ ও অকল্যাণ তো আল্লাহ্রই পক্ষ হইতে। তিনিই তাহাদের কর্মের ফলস্বরূপ এই আযাব প্রেরণ করিয়াছেন, "কিন্তু তাহাদের অধিকাংশই এই ব্যাপারে অজ্ঞ। তাহারা বলিল, আমাদিগকে যাদু করিবার জন্য তুমি যে কোন নিদর্শন আমাদের নিকট পেশ কর না কেন আমরা তোমাতে বিশ্বাস করিব না" (৭: ১৩১-১৩২)। কুরআন কারীমে আরো কয়েকটি নিদর্শনের কথা উল্লিখিত হইয়াছে এইভাবেঃ
فَأَرْسَلْنَا عَلَيْهِمُ الطُّوفَانَ وَالْجَرَادَ وَالْقُمَّلَ وَالضَّفَادِعَ وَالدَّمَ آيَاتٍ مُفَصَّلَاتٍ فَاسْتَكْبَرُوا وَكَانُوا قَوْمًا مُجْرِمِينَ (۱۳۳ : ۷)
"অতঃপর আমি তাহাদিগকে প্লাবন, পঙ্গপাল, উকুন, ভেক ও রক্ত দ্বারা ক্লিষ্ট করি। এইগুলি স্পষ্ট নিদর্শন; কিন্তু তাহারা দাম্ভিকই রহিয়া গেল, আর তাহারা ছিল এক অপরাধী সম্প্রদায়" (৭: ১৩৩)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 তুফান

📄 তুফান


ইব্‌ন আব্বাস (রা)-এর বর্ণনামতে তুফান হইল অতিবৃষ্টি। কাহারও মতে বন্যা হইয়া পানি স্থির হইয়া গেল, যাহার ফলে সব কিছুই ডুবিয়া গেল। তাহারা ঘর হইতে বাহির হইতে পারিল না, কোন কাজই করিতে পারিল না। ফসলাদি ও ফল-ফলাদি সব নষ্ট হইয়া গেল। অনন্যপায় হইয়া তাহারা মূসা (আ) কে বলিল, হে মূসা! আমাদের জন্য তোমার রবের নিকট দুআ কর যাহার অঙ্গীকার তিনি তোমাকে দিয়াছেন। যদি তুমি আমাদের উপর হইতে এই বিপদ দূর করিয়া দিতে পার তবে আমরা অবশ্যই তোমার উপর ঈমান আনিব এবং বানু ইসরাঈলকেও তোমার সহিত যাইতে দিব (দ্র. ৭ঃ ১৩৪)। অতঃপর মূসা (আ)-এর দু'আর বরকতে আল্লাহ তাআলা উক্ত মুসীবত অপসারণ করিলেন। ফলে তাহাদের ক্ষেতে শস্য উৎপাদিত হইতে লাগিল, বৃক্ষে ফল ধরিতে লাগিল। কিন্তু তাহারা তাহাদের অঙ্গীকার পূরণ করিল না, ঈমান আনয়ন করিল না (আল-কামিল, ১খ, ১৪২; আত-তাবারী, তারিখ, ১খ, ৪১০; আল-মুনতাজাম, ১খ, ৩৪৪)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00