📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ফিরআওন পরিবারের এক মু'মিন ব্যক্তির উপদেশ

📄 ফিরআওন পরিবারের এক মু'মিন ব্যক্তির উপদেশ


ফিরআওনের সম্প্রদায় ও তাহার দরবারের এক ব্যক্তি মূসা (আ)-এর উপর তাঁহার দাওয়াত ও তাবলীগে প্রভাবান্বিত হইয়া এবং তাঁহার মুজিয়া দেখিয়া ঈমাম আনিয়াছিল, কিন্তু ফিরআওনের ভয়ে তাহা গোপন রাখিয়াছিল। ইব্‌ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত যে, ফিরআওন সম্প্রদায়ের তিন ব্যক্তি মূসা (আ)-এর উপর ঈমান আনয়ন করিয়াছিল : (১) এই ঈমানদার ব্যক্তি, যাহার কথা একটু পরই আলোচনা করা হইতেছে; (২) আর একজন হইলেন ফিরআওনের স্ত্রী আসিয়া এবং (৩) অপরজন হইলেন সেই ব্যক্তি যে, মূসা (আ) কর্তৃক কিবতী হত্যার পর শহরের প্রান্ত হইতে দ্রুত আসিয়া মূসা (আ) কে জানাইয়াছিলেন যে, ফিরআওন ও তাহার পারিষদবর্গ তাঁহাকে হত্যার পরামর্শ করিতেছে। সুতরাং তিনি যেন অতি দ্রুত শহর হইতে বাহির হইয়া যান। ফিরআওন মূসা (আ)-কে হত্যার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে। তখন ফিরআওন পরিবারের উক্ত ঈমানদার লোকটি মূসা (আ)-এর প্রতি দয়াপরবশ হইয়া পরামর্শস্বরূপ ফিরআওন ও তাহার পারিষদবর্গের নিকট সত্য কথা তুলিয়া ধরিলেন। এই প্রসঙ্গে কুরআন কারীমে ইরশাদ হইয়াছে:
وَقَالَ رَجُلٌ مُّؤْمِنٌ مِّنْ آلِ فِرْعَوْنَ يَكْتُمُ إِيْمَانَهُ أَتَقْتُلُونَ رَجُلاً أَنْ يَقُولَ رَبِّيَ اللَّهُ وَقَدْ جَاءَكُمْ بِالْبَيِّنَاتِ مِنْ رَبِّكُمْ وَإِنْ يَكُ كَاذِبًا فَعَلَيْهِ كَذِبُهُ وَإِنْ يَكُ صَادِقًا يُصِبْكُمْ بَعْضُ الَّذِي يَعِدُكُمْ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي مَنْ هُوَ مُسْرِفٌ كَذَّابٌ . يَا قَوْمِ لَكُمُ الْمُلْكُ الْيَوْمَ ظَاهِرِينَ فِي الْأَرْضِ فَمَنْ يَنْصُرُنَا مِنْ بَأْسِ اللَّهِ إِنْ جَاءَنَا .(٤٠ : ۲۸-۲۹)
"ফিরআওন বংশের এক ব্যক্তি, যে মুমিন ছিল এবং নিজ ঈমান গোপন রাখিত, বলিল, 'তোমরা কি এক ব্যক্তিকে এইজন্য হত্যা করিবে যে, সে বলে, আমার প্রতিপালক আল্লাহ্! অথচ সে তোমাদের প্রতিপালকের নিকট হইতে সুস্পষ্ট প্রমাণসহ তোমাদের নিকট আসিয়াছে। সে মিথ্যাবাদী হইলে তাহার মিথ্যাবাদিতার জন্য সে দায়ী হইবে। আর যদি সে সত্যবাদী হয়, তবে সে তোমাদিগকে যে শাস্তির কথা বলে তাহার কিছু তো তোমাদের উপর আপতিত হইবেই। আল্লাহ সীমালংঘনকারী ও মিথ্যাবাদীকে সৎপথে পরিচালিত করেন না। হে আমার সম্প্রদায়! আজ কর্তৃত্বে তোমাদের দেশে তোমরাই প্রবল; কিন্তু আমাদের উপর আল্লাহর শাস্তি আসিয়া পড়িলে কে আমাদিগকে সাহায্য করিবে" (৪০ : ২৮-২৯)?
লোকটির সঠিক পরিচয় সম্পর্কে কিছুটা মতভেদ পরিলক্ষিত হয়। এক বর্ণনামতে লোকটি ছিল ফিরআওনের চাচাতো ভাই। এক বর্ণনাতে তাহার নাম ছিল হিযকীল। মতান্তরে হিযরাক। কাহারও কাহারও ধারণামতে তিনি ইসরাঈল বংশীয় ছিলেন, কিন্তু ইহা অযৌক্তিক এবং কুরআন কারীমের বর্ণনার সহিতও অসংগতিপূর্ণ। দারা কুতনীর বর্ণনামতে তাহার নাম ছিল শামআন। তারীখুত তাবারানীতে তাঁহার নাম খায়র বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে। ফিরআওন নিশ্চিত জানিত যে, মূসা (আ) আল্লাহর পক্ষ হইতে যাহা আনয়ন করিয়াছেন তাহাই সঠিক। কিন্তু শত্রুতা, অবাধ্যতা ও কুফরীবশত সে উহার বিরোধিতা করিত যাহা পূর্বেই উল্লেখ করা হইয়াছে। তাই গোয়ার্তুমি বশত মিথ্যা কথাই সে বলিল :
مَا أُرِيكُمْ إِلا مَا أَرَى وَمَا أَهْدِيكُمْ إِلَّا سَبِيلَ الرِّشَادِ (٢٩ : ٤٠) "আমি যাহা বুঝি, আমি তোমাদিগকে তাহাই বলিতেছি। তোমাদিগকে কেবল সৎপথই দেখাইয়া থাকি" (৪০ : ২৯)।
ইহা ছিল তাহার সম্পূর্ণ মিথ্যাচার। কারণ সে নিজেই সঠিক পথে ছিল না; বরং সে গোমরাহীতে ডুবিয়াছিল এবং তাহার সম্প্রদায়কে পথভ্রষ্ট করিয়াছিল। তাই তাহারা তাহার আনুগত্য করিত, তাহার উপাসনা করিত এবং সে যে তাহাদের প্রতিপালক বলিয়া দাবি করিয়াছিল উহা সত্য বলিয়া বিশ্বাস করিত। ফিরআওন তাহার সম্প্রদায়কে তাহার প্রতিপালক হওয়ার কথা বিশ্বাস করাইবার জন্য বিভিন্ন অলীক যুক্তি প্রদর্শন করে এবং তাহার সম্প্রদায়ও উহা মানিয়া লইয়া তাহার আনুগত্য করে। ইহাই আল্লাহ তাআলা কুরআন কারীমে ইরশাদ করেন:
وَنَادَى فِرْعَوْنُ فِي قَوْمِهِ قَالَ يَا قَوْمِ أَلَيْسَ لِى مُلْكُ مِصْرَ وَهَذِهِ الْأَنْهَارُ تَجْرِى مِنْ تَحْتِي أَفَلَا تُبْصِرُونَ . أَمْ أَنَا خَيْرٌ مِّنْ هَذَا الَّذِي هُوَ مَهِينٌ وَلا يَكَادُ يُبِينُ. فَلَوْلَا أُلْقِيَ عَلَيْهِ أَسْوِرَةٌ مِنْ ذَهَبٍ أَوْ جَاءَ مَعَهُ الْمَلَائِكَةُ مُقْتَرِنِينَ . فَاسْتَخَفْ قَوْمَهُ فَأَطَاعُوهُ إِنَّهُمْ كَانُوا قَوْمًا فَاسِقِينَ. (٥٤-٥١ : ٤٣)
"ফিরআওন তাহার সম্প্রদায়ের মধ্যে এই বলিয়া ঘোষণা করিল, হে আমার সম্প্রদায়! মিসর রাজ্য কি আমার নহে? আর এই নদীগুলি আমার পাদদেশে প্রবাহিত; তোমরা ইহা দেখ না? আমি তো শ্রেষ্ঠ এই ব্যক্তি হইতে যে হীন এবং স্পষ্টভাবে কথা বলিতেও অক্ষম! মূসাকে কেন দেওয়া হইল না স্বর্ণ-বলয় অথবা তাহার সঙ্গে কেন আসিল না ফেরেশতাগণ দলবদ্ধভাবে? এইভাবে সে তাহার সম্প্রদায়কে হতবুদ্ধি করিয়া দিল, ফলে উহারা তাহার কথা মানিয়া লইল। উহারা তো ছিল এক সত্যত্যাগী সম্প্রদায়" (৪৩ : ৫১-৫৪)।
মুমিন ব্যক্তিটি ফিরআওনের দাবি ও কীর্তিকলাপ দেখিয়া বলিল:
يَا قَوْمِ إِنِّي أَخَافُ عَلَيْكُمْ مِثْلَ يَوْمِ الْأَحْزَابِ . مِثْلَ دَابِ قَوْمٍ نُوحٍ وَعَادٍ وَثَمُودَ وَالَّذِينَ مِنْ بَعْدِهِمْ وَمَا اللَّهُ يُرِيدُ ظُلْمًا لِلْعِبَادِ، وَيَا قَوْمِ إِنِّي أَخَافُ عَلَيْكُمْ يَوْمَ التَّنَادِ . يَوْمَ تُوَلُّوْنَ مُدْبِرِيْنَ مَا لَكُمْ مِنَ اللَّهِ مِنْ عَاصِمٍ وَمَنْ يُضْلِلِ اللَّهُ فَمَا لَهُ مِنْ هَادٍ : وَلَقَدْ جَاءَكُمْ يُوسُفُ مِنْ قَبْلُ بِالبَيِّنَاتِ فَمَا زِلْتُمْ فِي شَكٍّ مِّمَّا جَاءَكُمْ بِهِ حَتَّى إِذَا هَلَكَ قُلْتُمْ لَنْ يُبْعَثَ اللَّهُ مِنْ بَعْدِهِ رَسُولاً كَذَلِكَ يُضِلُّ اللهُ مَنْ هُوَ مُسْرِفٌ مُرْتَابُ الَّذِينَ يُجَادِلُونَ فِي آيَاتِ اللَّهِ بِغَيْرِ سُلْطَانٍ آتَاهُمْ كَبُرَ مَقْتًا عِنْدَ اللَّهِ وَعِنْدَ الَّذِينَ آمَنُوا كَذَلِكَ يَطْبَعُ اللَّهُ عَلَى كُلِّ قَلْبِ مُتَكَبِّرٍ جَبَّارٍ . ( ٣٥ - ٣٠ : ٤٠ )
"হে আমার সম্প্রদায়! আমি তোমাদের জন্য পূর্ববর্তী সম্প্রদায়সমূহের শাস্তির দিনের অনুরূপ দুর্দিনের আশংকা করি, যেমন ঘটিয়াছিল নূহ, আদ, ছামূদ এবং তাহাদের পরবর্তীদের ক্ষেত্রে। আল্লাহতো বান্দাদের প্রতি কোন জুলুম করিতে চাহেন না। হে আমার সম্প্রদায়! আমি তোমাদের জন্য আশংকা করি কিয়ামত দিবসের যেদিন তোমরা পশ্চাত ফিরিয়া পলায়ন করিতে চাহিবে, আল্লাহর শাস্তি হইতে তোমাদিগকে রক্ষা করিবার কেহ থাকিবে না। আল্লাহ যাহাকে পথভ্রষ্ট করেন তাহার জন্য কোন পথপ্রদর্শক নাই। পূর্বেও তোমাদের নিকট ইউসুফ আসিয়াছিল স্পষ্ট নিদর্শনসহ, কিন্তু সে যাহা লইয়া আসিয়াছিল তোমরা তাহাতে বারবার সন্দেহ পোষণ করিতে। পরিশেষে যখন ইউসুফের মুত্যু হইল তখন তোমরা বলিয়াছিলে, তাহার পরে আল্লাহ আর কাহাকেও রাসূল করিয়া প্রেরণ করিবেন না। এইভাবে আল্লাহ বিভ্রান্ত করেন সীমালংঘনকারী ও সংশয়বাদীদিগকে—যাহারা নিজদের নিকট কোন দলীল-প্রমাণ না থাকিলেও আল্লাহর নিদর্শন সম্পর্কে বিতণ্ডায় লিপ্ত হয়। তাহাদের এই কর্ম আল্লাহ ও মুমিনদের দৃষ্টিতে অতিশয় ঘৃণার্হ। এইভাবে আল্লাহ প্রত্যেক উদ্ধত ও স্বৈরাচারী ব্যক্তির হৃদয়কে মোহর করিয়া দেন" (৪০: ৩০-৩৫)।
ফিরআওন বারবার আল্লাহ্ আলোচনা শুনিয়া হিদায়াত কবুল তো করিলই না, বরং একের পর এক বিরোধিতা ও যড়যন্ত্র করিতে লাগিল। সে তাহার পারিষদবর্গকে লক্ষ্য করিয়া বলিল, "হে আমার পারিষদবর্গ! আমি ব্যতীত তোমাদের অন্য কোন ইলাহ আছে বলিয়া জানি না" (২৮: ৩৮)। অবশ্য মূসা তাহার ইলাহের যে সকল উচ্চ মানের বিশেষণের কথা বলিতেছে উহাতে মনে হয় তিনি আকাশে আছেন। সে মন্ত্রী হামানকে নির্দেশ দিল সুউচ্চ একটি প্রাসাদ নির্মাণ করিতে যাহাতে উহাতে চড়িয়া সে মূসার ইলাহকে দেখিতে পারে, যদি বাস্তবে সে থাকে মূসার দাবি অনুযায়ী। তবে আমি মনে করি সে মিথ্যবাদী।
ফিরআওন একটু পূর্বে বলিয়াছিল, 'আমি তোমাদিগকে কেবল সৎপথই দেখাইয়া থাকি। মুমিন ব্যক্তিটি তাহার বক্তব্যে এই দিকে ইঙ্গিত করিলেন যে, سَبِيلَ الرشاد অর্থাৎ সৎপথ ও কল্যাণের পথ উহা নহে যাহা ফিরআওন বলিয়াছে, বরং আমি যাহা বলিতেছি তাহাই। সুতরাং তোমরা যদি নাজাত ও কল্যাণের প্রত্যাশী হও তাহা হইলে এই পথ অবলম্বন কর।
ফিরআওনের সম্প্রদায় তাহাদেরই এক সম্মানিত ব্যক্তির মুখে এই জাতীয় কথা শুনিয়া অবাক হইয়া গেল। তাহারা প্রচেষ্টা চালাইতে লাগিল তাহাকে বাপ-দাদার পথে ফিরাইয়া আনার জন্য। এই কারণেই মুমিন ব্যক্তিটির বক্তব্যে এই দিকেও ইঙ্গিত করিলেন এবং বলিলেন যে, কী অদ্ভূত কথা! আমি তোমাদের শুভাকাঙ্খী, তোমাদিগকে হিদায়াত ও নাজাতের রাস্তা দেখাইতেছি। আর তোমরা চাহিতেছ আমি ভ্রান্ত পথে চলিয়া জাহান্নামে প্রবেশ করি। মুমিন ব্যক্তি আরো বলিলেন:
يَا قَوْمِ إِنِّي أَخَافُ عَلَيْكُمْ مِثْلَ يَوْمِ الْأَحْزَابِ . مِثْلَ دَابِ قَوْمٍ نُوحٍ وَعَادٍ وَثَمُودَ وَالَّذِينَ مِنْ بَعْدِهِمْ وَمَا اللَّهُ يُرِيدُ ظُلْمًا لِلْعِبَادِ، وَيَا قَوْمِ إِنِّي أَخَافُ عَلَيْكُمْ يَوْمَ التَّنَادِ . يَوْمَ تُوَلُّوْنَ مُدْبِرِيْنَ مَا لَكُمْ مِنَ اللَّهِ مِنْ عَاصِمٍ وَمَنْ يُضْلِلِ اللَّهُ فَمَا لَهُ مِنْ هَادٍ : وَلَقَدْ جَاءَكُمْ يُوسُفُ مِنْ قَبْلُ بِالبَيِّنَاتِ فَمَا زِلْتُمْ فِي شَكٍّ مِمَّا جَاءَكُمْ بِهِ حَتَّى إِذَا هَلَكَ قُلْتُمْ لَنْ يُبْعَثَ اللَّهُ مِنْ بَعْدِهِ رَسُولاً كَذَلِكَ يُضِلُّ اللهُ مَنْ هُوَ مُسْرِفٌ مُرْتَابُ الَّذِينَ يُجَادِلُونَ فِي آيَاتِ اللَّهِ بِغَيْرِ سُلْطَانٍ آتَاهُمْ كَبُرَ مَقْتًا عِنْدَ اللَّهِ وَعِنْدَ الَّذِينَ آمَنُوا كَذَلِكَ يَطْبَعُ اللَّهُ عَلَى كُلِّ قَلْبِ مُتَكَبِّرٍ جَبَّارٍ . ( ٣٥ - ٣٠ : ٤٠ )
"হে আমার সম্প্রদায়! আমি তোমাদের জন্য পূর্ববর্তী সম্প্রদায়সমূহের শাস্তির দিনের অনুরূপ দুর্দিনের আশংকা করি, যেমন ঘটিয়াছিল নূহ, আদ, ছামূদ এবং তাহাদের পরবর্তীদের ক্ষেত্রে। আল্লাহতো বান্দাদের প্রতি কোন জুলুম করিতে চাহেন না। হে আমার সম্প্রদায়! আমি তোমাদের জন্য আশংকা করি কিয়ামত দিবসের যেদিন তোমরা পশ্চাত ফিরিয়া পলায়ন করিতে চাহিবে, আল্লাহর শাস্তি হইতে তোমাদিগকে রক্ষা করিবার কেহ থাকিবে না। আল্লাহ যাহাকে পথভ্রষ্ট করেন তাহার জন্য কোন পথপ্রদর্শক নাই। পূর্বেও তোমাদের নিকট ইউসুফ আসিয়াছিল স্পষ্ট নিদর্শনসহ, কিন্তু সে যাহা লইয়া আসিয়াছিল তোমরা তাহাতে বারবার সন্দেহ পোষণ করিতে। পরিশেষে যখন ইউসুফের মুত্যু হইল তখন তোমরা বলিয়াছিলে, তাহার পরে আল্লাহ আর কাহাকেও রাসূল করিয়া প্রেরণ করিবেন না। এইভাবে আল্লাহ বিভ্রান্ত করেন সীমালংঘনকারী ও সংশয়বাদীদিগকে—যাহারা নিজদের নিকট কোন দলীল-প্রমাণ না থাকিলেও আল্লাহর নিদর্শন সম্পর্কে বিতণ্ডায় লিপ্ত হয়। তাহাদের এই কর্ম আল্লাহ ও মুমিনদের দৃষ্টিতে অতিশয় ঘৃণার্হ। এইভাবে আল্লাহ প্রত্যেক উদ্ধত ও স্বৈরাচারী ব্যক্তির হৃদয়কে মোহর করিয়া দেন" (৪০: ৩০-৩৫)।
একজন সাচ্চা ঈমানদার হিসাবে তিনি তাহার ঈমানী দায়িত্ব পূর্ণরূপে আদায় করার চেষ্টা করেন। জুলুম-নিপীড়নের প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করিয়া সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর উপর ভরসা করিয়া দীনের দাওয়াত পেশ করেন।
এই মুমিন ব্যক্তিটির কিছু পরিচয় পূর্বে উল্লিখিত হইয়াছে। এক বর্ণনামতে তিনি হইলেন সেই কাঠমিস্ত্রী যিনি মূসার জন্মের পর নীল নদে ভাসাইয়া দেওয়ার জন্য বাক্স প্রস্তুত করিয়া দিয়াছিলেন। তিনি মূসা (আ)-কে যাদুকরদের উপর বিজয়ী হইতে দেখিয়া তাহার ঈমানের কথা প্রকাশ করেন। কাহারও মতে তিনি ইহার পূর্বেই তাহার ঈমানের কথা প্রকাশ করিয়াছিলেন। অতঃপর ফিরআওন মূসা (আ)-কে হত্যার সংকল্প করিলে তিনি তাহাকে উক্ত নসীহত করেন। অতঃপর তিনি স্বীয় ঈমানের কথা প্রকাশ করিয়া দিলে ফিরআওন তাহাকে যাদুকরদের সঙ্গেই শূলে বিদ্ধ করিয়া হত্যা করে। ফলে তিনি শহীদের মর্যাদা লাভ করিয়া জান্নাতবাসী হন।
এক বর্ণনামতে ফিরআওনও তাহার সম্প্রদায়ের উৎপীড়ন ও নিপীড়ন হইতে আল্লাহ তাহাকে বিশেষ ব্যবস্থায় হিফাযত করেন। অবশেষে মূসা (আ) ও বানু ইসরাঈলদের সঙ্গে তিনিও নিরাপদে ও নির্বিঘ্নে মিসর ত্যাগ করেন। তবে এই মতটি দুর্বল। কারণ মূসা (আ)-এর নেতৃত্বে বানু ইসরাঈলের লোক ব্যতীত অন্য কেহ মিসর ত্যাগ করিয়াছিল বলিয়া কোন বর্ণনা পাওয়া যায় না।
এক বর্ণনামতে উক্ত মুমিন ব্যক্তিটির স্ত্রীও ঈমান আনয়ন করিয়াছিলেন এবং স্ত্রী ও ঈমান গোপন রাখিয়াছিল। তিনি ছিলেন ফিরআওন কন্যার কেশ বিন্যাসকারিণী। একদিন চুল আচড়াইবার সময় তাহার হাত হইতে চিরুনী পড়িয়া গেল। তিনি বিসমিল্লাহ বলিয়া উহা তুলিয়া লইলেন। ফিরআওন কন্যা তখন বলিল, আমার পিতার নামে? মহিলাটি বলিলেন না, বরং যিনি আমার প্রতিপালক, তোমার প্রতিপালক এবং তোমার পিতার প্রতিপালক তাহার নামে। কন্যাটি তাহার পিতা ফিরআওনকে এই ঘটনা বলিয়া দিল। ফিরআওন মহিলাটিকে ও তাহার সন্তানদিগকে ডাকাইল এবং তাহাকে জিজ্ঞাসা করিল, তোমার প্রতিপালক কে? তিনি বলিলেন, আমার ও আপনার প্রতিপালক আল্লাহ। তখন ফিরআওন একটি চুল্লিতে অগ্নি প্রজ্জ্বলিত করিয়া তাহাকে ও তাহার সন্তানগণকে দগ্ধীভূত করিবার নির্দেশ দিল। মহিলাটি ফিরআওনকে বলিল, আপনার নিকট আমার একটি আবেদন রহিয়াছে। ফিরআওন বলিল, তাহা কি? মহিলাটি বলিল, আমার ও আমার সন্তানগণের হাড় একত্র করিয়া দাফন করিবেন। ফিরআওন তাহার এ আবেদন মঞ্জুর করিল। প্রথমে ফিরআওন তাহার সন্তানদিগকে তাহার সম্মুখে অগ্নিতে ফেলিবার নির্দেশ দিল। অতঃপর একজন একজন করিয়া তাহাদিগকে চুল্লিতে নিক্ষেপ করা হইল। তাহার শেষ সন্তানটি ছিল ছোট্ট শিশু। সে বলিয়া উঠিল:
اصبري يا أماه فأنك على الحق .
"হে আম্মাজান! আপনি ধৈর্যধারণ করুন। নিঃসন্দেহে আপনি সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত"। তারপর এই ছোট্ট দুধের শিশুটিসহ তাহাকে চুল্লিতে নিক্ষেপ করা হইল। রাবী বলেন, যাহারা মায়ের কোলে কথা বলিয়াছিলেন তাহাদের সম্বন্ধে ইবন আব্বাস (রা) কে জিজ্ঞাসা করা হইয়াছিল। ইবন আব্বাস (রা) উত্তর করিলেন, "মায়ের কোলে থাকাকালীন চারজন শিশু কথা বলিয়াছিল, ঈসা ইবন মারয়াম, ইউসুফ (আ)-এর পক্ষে সাক্ষ্যদানকারী শিশুটি, জুরায়জ-এর সঙ্গী শিশুটি এবং এই শিশুটি।

টিকাঃ
আম্বিয়া-ই কুরআন, ২খ, ১৭২; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ২৬০
আল-কামিল, ১খ, ১৪০
আত-তাবারী, তারীখ, ১খ, ৪০৭
ইব্‌ন কাছীর, প্রাগুক্ত
ইব্‌ন কাছীর, প্রাগুক্ত
আত-তাবারী, তারীখ, ১খ, ৪১১-৪০২; আল- মুনতাজাম, ১খ, ৩৪৫
আম্বিয়া-ই কুরআন, ২খ, ১৭৫-১৭৬
আম্বিয়া-ই কুরআন, ২খ, ১৭৫-১৭৬
আল-কামিল, ১খ, ১৪১
আম্বিয়া-ই কুরআন, ২খ, ১৭৭
আল-কামিল, ১খ, ১৪১; আল-মুনতাজাম ফী তারীখিল উমাম, ১খ, ৩৪৬-৩৪৭

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ফিরআওন পত্নী আসিয়ার ঈমান আনয়ন ও শাস্তি

📄 ফিরআওন পত্নী আসিয়ার ঈমান আনয়ন ও শাস্তি


ফিরআওনের পত্নী আসিয়াও গোপনে ঈমান আনয়ন করিয়াছিলেন। মহিলাটিকে যখন আগুনে নিক্ষেপ করিয়া হত্যা করা হইল তখন তিনি দেখিতে পাইলেন যে, ফেরেশতাগণ তাহার রূহ লইয়া আকাশে চলিয়া যাইতেছে। আল্লাহ তাঁহার অন্তর্চক্ষু উম্মীলিত করিয়া দিলেন। মহিলাটিকে আযাব দেওয়ার সময় তিনি উহা দেখিতেছিলেন। অতঃপর ফেরেশতাকে দেখিয়া তাহার ঈমানী শক্তি আরও মজবুত হইল এবং মূসা (আ)-এর সত্যতার প্রতি বিশ্বাস আরো দৃঢ় হইল। এমনি অবস্থায় ফিরআওন তাহার নিকট আসিয়া মহিলাটির সংবাদ দিল। 'আসিয়া' তাহাকে বলিলেন, তোমার ধ্বংস হউক! কেন তুমি আল্লাহর সঙ্গে এই ধৃষ্টতা প্রদর্শন করিলে? ফিরআওন তাহাকে বলিল, সম্ভবত যে পাগলামী মহিলাটির উপর ভর করিয়াছিল সেই পাগলামী তোমার উপরও ভর করিয়াছে। 'আসিয়া' বলিলেন, আমার উপর কোন পাগলামী ভর করে নাই; বরং আমি আল্লাহ তাআলার উপর ঈমান আনয়ন করিয়াছি, যিনি আমার, তোমার এবং জগতসমূহের প্রতিপালক। অতঃপর ফিরআওন তাহার মাতাকে ডাকাইয়া আনিয়া বলিল, তাহাকেও কেশ বিন্যাসকারিনী মহিলার মত পাগলামিতে পাইয়া বসিয়াছে। আমি কসম করিয়া বলিতেছি, হয়তো সে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করিবে অথবা মূসার ইলাহকে অস্বীকার করিবে। মাতা তাহাকে লইয়া নির্জনে গেলেন এবং তাহাকে ফিরআওনের অনুগত করিবার চেষ্টা করিলেন। কিন্তু আসিয়া তাহা অস্বীকার করিয়া বলিলেন, জানিয়া রাখ, আল্লাহ্র কসম! আমি কখনও কুফরী করিব না। অতঃপর ফিরআওনের নির্দেশে তাঁহার দুই হাত প্রসারিত করিয়া উহাতে চারিটি পেরেক মারা হইল এবং মৃত্যুবরণ না করা পর্যন্ত তাহাকে রৌদ্রে ফেলিয়া রাখিয়া শাস্তি দেওয়া হইল। ফিরআউন তাহার লোকজনকে নির্দেশ দিল বিরাট একটি পাথর আনিতে এবং বলিল, সে যদি তাহার কথার উপর অটল থাকে তাহাকে তবে পাথরচাপা দিবে। আর যদি উক্ত কথা হইতে ফিরিয়া আসে তবে সে আমার স্ত্রী থাকিবে। 'আসিয়া' তাহার ঈমানের উপর অটল ও অবিচল রহিলেন, অতঃপর মৃত্যু প্রত্যক্ষ করিয়া তিনি আল্লাহ্র নিকট দুআ করিলেন:
রَبِّ ابْنِ لِي عِنْدَكَ بَيْتًا فِي الْجَنَّةِ وَنَجِّنِي مِنْ فِرْعَوْنَ وَعَمَلِهِ وَنَجِّنِي مِنَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ (١١ : ٦٦)
"হে আমার প্রতিপালক! তোমার সন্নিধানে জান্নাতে আমার জন্য একটি গৃহ নির্মাণ করিও এবং আমাকে উদ্ধার কর ফিরআওন ও তাহার দুষ্কৃতি হইতে এবং আমাকে উদ্ধার কর জালিম সম্প্রদায় হইতে" (৬৬: ১১)।
আল্লাহ তাআলা তাহার এই দুআ কবুল করেন। অতঃপর আল্লাহ তাহার সম্মুখ হইতে পর্দা উঠাইয়া লইলেন। তখন তিনি ফেরেশতাগণকে এবং তাহার সম্মানে জান্নাতে যাহা প্রস্তুত করিয়া রাখা হইয়াছে তাহা দেখিতে পাইলেন। তাহা দেখিয়া তিনি মৃদু হাসিলেন। তখন ফিরআওন বলিল, দেখ, তাহাকে কেমন পাগলে পাইয়াছে। তাহাকে শান্তি দেওয়া হইতেছে অথচ সে হাসিতেছে। অতঃপর তিনি মারা যান।

টিকাঃ
আল-কামিল, ১খ, ১৪১-১৪২; ইব্‌ন কাছীর, তাফসীরুল কুরআনিল আজীম, ৩খ, ৩৯৩, ৩৯৪; আত-তাফসীরুল মাজহারী, ৯খ, ৩৪৭; উপরিউক্ত আয়াতের তাফসীর দ্র.

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ফিরআওন কর্তৃক উচ্চ প্রাসাদ নির্মাণ

📄 ফিরআওন কর্তৃক উচ্চ প্রাসাদ নির্মাণ


মূসা (আ) যখন আল্লাহকে আসমান ও যমীনের রব বলিয়া ফিরআওনের কাছে ব্যক্ত করিলেন তখন সে মনে করিল আকাশে উঠিয়া তাঁহার প্রতিপালককে দেখিবে। অতঃপর তাঁহার পরামর্শদাতা ও বিশ্বাসী সহচর হামানকে একটি বিশাল ও সুউচ্চ প্রাসাদ নির্মাণের নির্দেশ দিল। কুরআন কারীমে ইরশাদ হইয়াছে:
وَقَالَ فِرْعَوْنُ يَا أَيُّهَا الْمَلَأُ مَا عَلِمْتُ لَكُمْ مِنْ اللَّهِ غَيْرِي فَأَوْقِدْ لِي يَا هَامَانُ عَلَى الطَّيْنِ فَاجْعَلْ لِي صَرْحًا لَعَلَى اطلع إلى الله مُوسَى وَإِنِّي لَأَظُنُّهُ مِنَ الْكَاذِبِينَ (۳۸ : ۲۸)
"ফিরআওন বলিল, হে পারিষদবর্গ। আমি ব্যতীত তোমাদের অন্য কোন ইলাহ আছে বলিয়া জানি না। হে হামান! তুমি আমার জন্য ইট পোড়াও এবং একটি সুউচ্চ প্রাসাদ তৈয়ার কর; হয়ত আমি ইহাতে উঠিয়া মূসার ইলাহকে দেখিতে পারি। তবে আমি অবশ্যই মনে করি সে মিথ্যাবাদী" (২৮: ৩৮)।
এই প্রসঙ্গটি সূরা মু'মিন-এ এইভাবে বর্ণিত হইয়াছে:
وَقَالَ فِرْعَوْنُ يَا هَامَانُ ابْنُ لِي صَرْحًا لَعَلَى أَبْلُغُ الْأَسْبَابَ. أَسْبَابَ السَّمَوَاتِ فَاطَّلِعُ إِلَى الهُ مُوسَى وَإِنِّي لاظنه كاذبًا . (٣٧-٣٦ : ٤٠)
“ফিরআওন বলিল, হে হামান! আমার জন্য তুমি নির্মাণ কর এক সুউচ্চ প্রাসাদ যাহাতে আমি পাই অবলম্বন, অবলম্বন আসমানে আরোহণের, যেন দেখিতে পাই মূসার ইলাহকে। তবে আমি তো উহাকে মিথ্যাবাদীই মনে করি” (৪০ : ৩৬-৩৭)।
মুফাসসিরগণের বর্ণনামতে ফিরআউনের নির্দেশমত তাহার মন্ত্রী হামান এই সুউচ্চ প্রাসাদ তৈরি করিয়াছিল। আহলে কিতাবদের বর্ণনামতে ইট তৈরীর কাজে বানু ইসরাঈলদেরকেই নিয়োজিত করা হয়। এইজন্য তাহাদিগকে প্রচণ্ড খাটানো হয়। তাহারাই পানি ও মাটি সংগ্রহ করিয়া ইট তৈরি করে। তাহাদিগকে প্রতিদিন একটি পরিমাণ নির্ধারণ করিয়া দেওয়া হইত। সেই পরিমাণ কাজ করিতে না পারিলে তাহাদের উপর অমানুষিক অত্যাচার করা হইত (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ২৩৬)।
এক বর্ণনামতে বড় বড় কারীগর আনাইয়া সাত বৎসর ধরিয়া উহা নির্মাণ করা হয়। তখনকার যুগে উহার ন্যায় উঁচু আর কোন প্রাসাদ ছিল না। প্রাসাদ তৈরী হইলে মূসা (আ)-এর নিকট বিষয়টি খুবই গুরুতর মনে হইল। আল্লাহ তা'আলা ওহী পাঠাইয়া তাহাকে সান্ত্বনা দিলেন যে, তাহাকে যাহা ইচ্ছা করিতে দাও, আমি নিমেষেই উহা ধ্বংস করিব। অতঃপর প্রাসাদের নির্মাণ সমাপ্ত হইলে আল্লাহ্র নির্দেশে জিবরীল (আ) উহা ভাঙ্গিয়া ফেলিলেন এবং যত লোক উহার নির্মাণ কাজে অংশগ্রহণ করিয়াছিল সকলকেই ধ্বংস করিয়া দিলেন (ইবনুল-আছীর, আল-কামিল, ১খ, ১৪২)।
উক্ত প্রাসাদ আদৌ তৈরি করা হইয়াছিল কিনা, হইয়া থাকিলে ফিরআওন উহাতে আরোহণ করিয়া কি করিয়াছিল? এই ব্যাপারে বিশুদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য বর্ণনা পাওয়া যায় না। তবে কথিত আছে, ফিরআওন তীর-ধনুক লইয়া উহাতে আরোহণ করে এবং আকাশের দিকে তীর নিক্ষেপ করে। আল্লাহর কুদরতে তীরটি রক্তে রঞ্জিত হইয়া ফেরত আসে। ফিরআওন ইহা দেখিয়া গর্ব ও অহঙ্কার ভরে মিসরবাসীকে বলিল, দেখ, আমি মূসার ইলাহকে নিপাত করিয়া দিলাম (কাসাসুল কুরআন, ১খ, ১৪৮)। ইহার অনুরূপ একটি ঘটনা নমরূদ সম্পর্কেও বর্ণিত আছে (দ্র. ইবরাহীম (আ) নিবন্ধ)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সালাত ও কুরবানীর নির্দেশ

📄 সালাত ও কুরবানীর নির্দেশ


বানু ইসরাঈলের প্রতি হুকুম নাযিল করা হইল যে, তাহারা যেন মিসরীয়গণ হইতে পৃথক জায়গায় বসতি স্থাপন করে যাহাতে কোনরূপ শাস্তি আসিলে তাহারা নিরাপদ থাকিতে পারে। কুরআন কারীমে ইরশাদ হইয়াছে :
وَأَوْحَيْنَا إِلَى مُوسَى وَأَخِيهِ أَنْ تَبَوَّأُ لِقَوْمِكُمَا بِمصْرَ بُيُوتًا . (۱۰ : ۸۷)
"আমি মূসা ও তাহার ভ্রাতাকে প্রত্যাদেশ করিলাম, মিসরে তোমাদের সম্প্রদায়ের জন্য গৃহ স্থাপন কর" (১০; ৮৭)।
হযরত শাহ আবদুল কাদের মুহাদ্দিছ দিহলাবী তাহার মূদিহুল কুরআন শীর্ষক তাফসীর গ্রন্থে লিখিয়াছেন যে, ফিরআওনের ধ্বংসের সময় যখন ঘনাইয়া আসিল, তখন মূসা (আ)-এর প্রতি নির্দেশ হইল যে, তোমার সম্প্রদায়কে ইহাদের সহিত মিলিত অবস্থায় রাখিও না; অন্যত্র তোমাদের বসবাস স্থাপন কর। যাহাতে ইহাদের উপর বিপদাপদ আসিলে তাহা তোমার সম্প্রদায়কে স্পর্শ করিতে না পারে। বাইবেলের বর্ণনা হইতে জানা যায় যে, বানু ইসরাঈল পূর্ব হইতেই গুশন অঞ্চলে বসবাস করিত। সম্ভবত এই সময়ে কিছু লোক এদিক-ওদিক ছড়াইয়া পড়িয়াছিল। সেইজন্য এই নির্দেশ দেওয়া হয়।
ফিরআওন বানু ইসরাঈলের সকল উপাসনালয় ধ্বংস করিয়া দিয়াছিল, যাহাতে তাহারা সেখানে আসিয়া আল্লাহ্ ইবাদত করিতে না পারে। এই সময় সালাত তাহাদের স্ব স্ব গৃহেই কায়েম করিবার নির্দেশ দেওয়া হইল। গৃহের কোন একটি অংশ সালাতের জন্য নির্দিষ্ট করিয়া লইতে বলা হইল, যাহাতে তাহারা সালাত পরিত্যাগ না করে (আম্বিয়া-ই কুরআন, ২খ, ১৭৭-১৭৮)। এই ব্যাপারে কুরআন কারীমে ইরশাদ হইয়াছে:
وَاجْعَلُوا بُيُوتَكُمْ قِبْلَةً وَأَقِيمُوا الصَّلوةَ وَبَشِّرِ الْمُؤْمِنِينَ (۸۷ : ۱۰) "তোমাদের গৃহগুলিকে ইবাদতগৃহ কর, সালাত কায়েম কর এবং মুমিনদিগকে সুসংবাদ দাও" (১০:৮৭)। সালাত ও কুরবানী নির্দেশ বানু ইসরাঈলকে মিসরে থাকা অবস্থায়ই দেয়া হয়। বাইবেলে সালাত সম্পর্কিত এই হুকুমের উল্লেখ নাই। তবে কুরবানীর উল্লেখ আছে, যাহা তাহাদের মিসর ত্যাগের কিছু পূর্বে নাযিল হয়। উহার বিস্তারিত বিবরণ যাত্রাপুস্তক, ১২: ১-২৭-এ উল্লিখিত হইয়াছে (জামীল আহমাদ, প্রাগুক্ত)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00