📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 দ্বিতীয় নিদর্শন

📄 দ্বিতীয় নিদর্শন


অতঃপর আল্লাহ তাআলা তাঁহাকে আরও একটি নিদর্শন প্রদান করিলেন। তাহা হইল, হাত বগলে রাখিলে উহা জ্যোতির্ময় হইয়া বাহির হইত। শ্বেতী বা অন্য কোনরূপ রোগবশত নহে। অতঃপর উহা আবার পূর্বের ন্যায় হইয়া যাইত। এই সম্পর্কে কুরআন কারীমে ইরশাদ হইয়াছে, আল্লাহ তাহাকে বলিলেন:
وَاضْمُمْ يَدَكَ إِلَى جَنَاحِكَ تَخْرُجُ بَيْضَاءَ مِنْ غَيْرِسُوْءٍ أَيَةً أُخْرَى . "এবং তোমার হাত তোমার বগলে রাখ, ইহা বাহির হইয়া আসিবে নির্মল উজ্জ্বল হইয়া অপর এক নিদর্শনস্বরূপ” (২০ঃ২২)।
وَادْخِلْ يَدَكَ فِي جَيْبِكَ تَخْرُجْ بَيْضَاءَ مِنْ غَيْرِ سُوءٍ فِي تِسْعِ أيتِ إِلَى فِرْعَوْنَ وَقَوْمِهِ إِنَّهُمْ كَانُوا قَوْمًا فسقين . "এবং তোমার হাত তোমার বক্ষ পার্শ্বে বস্ত্রের মধ্যে প্রবেশ করাও। ইহা বাহির হইয়া আসিবে শুভ্র নির্মল অবস্থায়। ইহা ফিরআওন ও তাহার সম্প্রদায়ের নিকট আনীত নয়টি নিদর্শনের অন্তর্গত। উহারা তো সত্যত্যাগী সম্প্রদায়” (২৭ঃ ১২)।
উপরিউক্ত দুইটি নিদর্শন ছাড়া আরো সাতটিসহ মোট নয়টি নিদর্শন মূসা (আ)-কে প্রদান করা হয়, যাহা উপরিউক্ত আয়াতে في تسع آیات "নয়টি নিদর্শনের অন্তর্গত"-এ ব্যক্ত হইয়াছে। অন্যান্য নিদর্শনের কথা সূরা আ'রাফে (দ্র. ১৩০-১৩৩ নং আয়াত) বর্ণিত হইয়াছে। সেইগুলির বিবরণ পরে আসিতেছে। তবে এই নয়টি নিদর্শন আল্লাহ প্রদত্ত দশটি কলেমা হইতে ভিন্ন। কারণ সেই দশটি কলেমা হইল শরঈ বিধান (যথা শিরক না করা, দূরি না করা, ব্যভিচার না করা, অন্যায়ভাবে, নরহত্যা না করা, যাদু বা গণনা না করা, মিথ্যা অপবাদ না দেওয়া প্রভৃতি)। আর এই নয়টি নিদর্শন হইল আল্লাহ্ কুদরতী বিষয়, মু'জিযা। অনেকেই ইহা একাকার করিয়া ফেলে, যাহা মারাত্মক ভ্রম।
মূসা (আ)-কে নবুওয়াত প্রদানের সময় এবং উভয়ের কথোপকথনের সময় আল্লাহ মূসা (আ)-কে আরো বহু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলিয়াছিলেন এবং নসীহত করিয়াছিলেন। ইবনুল জাওযী ও ইয়া'কূবী প্রমুখ আলিম তাঁহাদের স্ব স্ব গ্রন্থে তাহা উল্লেখ করিয়াছেন, যাহার কিছু অংশ এখানে উদ্ধৃত করা হইল:
আল্লাহ তাআলা মূসা (আ)-কে বলিলেন, নিকটবর্তী হও। অতঃপর মূসা (আ) নিকটবর্তী হইয়া উক্ত বৃক্ষের কাণ্ডের সহিত স্বীয় পিঠ ঠেক দিয়া দাঁড়াইলেন। ইহাতে তাঁহার ভয় একেবারেই দূরীভূত হইল। হাত লাঠির উপর রাখিয়া অবনত মস্তকে দাঁড়াইলেন। অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলিলেন, আমি আজ তোমাকে এমন এক মর্যাদা দান করিলাম যে, তোমার পর আর কোন মানুষ এই মর্যাদায় তোমার স্থলাভিষিক্ত হইতে পারিবে না। আমি তোমাকে নিকটতর করিয়াছি। ফলে তুমি আমার কথা শুনিতে পাইয়াছ। আর তুমি আমার সর্বনিকটতম স্থানে। তাই আমার রিসালাতের জামা পরিধান করাইলাম, ইহা দ্বারা তুমি আমার নিয়ন্ত্রণের মধ্যে শক্তিতে বলীয়ান হইবে। তুমি আমার সেনাবাহিনীর এক মহান সৈন্য। আমি তোমাকে আমার সৃষ্টির মধ্যে এক দুর্বল সৃষ্টির প্রতি প্রেরণ করিতেছি, যে আমার নি'মাতসমূহ অস্বীকার করিয়াছে। সে আমার কৌশলকে ভয় পায় না। দুনিয়া তাহাকে ধোঁকা দিয়া আমা হইতে ফিরাইয়া রাখিয়াছে। এমনি করিয়া সে আমার হক অস্বীকার করিয়াছে, আমার রবৃবিয়াত অস্বীকার করিয়াছে, আমি ছাড়া অন্যের উপাসনা করিয়াছে। ন্যায়বিচার ও দলীল-প্রমাণ যদি না হইত, যাহা আমি আমার সৃষ্টির মধ্যে স্থাপন করিয়াছি, তবে অবশ্যই আমি তাহাকে প্রবল প্রতাপশালীর শক্ত হাতে পাকড়াও করিতাম। আমার এই ক্রোধের ফলে আসমান-যমীন, পর্বত-সমুদ্র ক্রোধান্বিত হয়। আমি যদি আকাশকে নির্দেশ দেই তবে সে তাহাকে কঙ্কর নিক্ষেপে ধ্বংস করিবে। যদি যমীনকে নির্দেশ দেই তবে সে উহাকে গিলিয়া ফেলিবে। যদি পর্বতকে নির্দেশ দেই তবে সে উহাকে ধ্বংস করিয়া দিবে, আর যদি সমুদ্রকে নির্দেশ দেই তবে উহা তাহাকে ডুবাইয়া দিবে। কিন্তু আমি তাহার প্রতি অনুগ্রহপূর্ণ আচরণ করিতেছি। সে আমার দৃষ্টি হইতে সরিয়া গিয়াছে। আমি তো অমুখাপেক্ষী; আমি ছাড়া আর কেহ অমুখাপেক্ষী নহে। অতঃপর তাহার নিকট আমার রিসালাত পৌঁছাইয়া দাও। আমার ইবাদাত ও একত্ববাদের প্রতি তাহাকে দাওয়াত দাও। তাহাকে আমার নিদর্শন স্মরণ করাইয়া দাও। তাহাকে আমার প্রতিশোধের ভয় দেখাও। তাহাকে জানাইয়া দাও যে, ক্রোধ ও প্রতিশোধের চাইতে আমি ক্ষমার প্রতি দ্রুত ধাবিত হই। তাহাকে দুনিয়ার যে ক্ষমতার পোশাক পরিধান করানো হইয়াছে তাহা যেন তোমাকে ভীত না করে। কারণ তাহার মাথার অগ্রভাগ আমার হাতের মুঠায়। সে আমার অনুমতি ছাড়া কোথায়ও যাইতে, কিছু বলিতে কিংবা শ্বাস-প্রশ্বাস লইতে পারিবে না। তুমি তাহাকে বল, তোমার প্রতিপালকের আহবানে সাড়া দাও। কারণ তিনি প্রশস্ত ক্ষমার অধিকারী। তিনি তোমাকে চারি শত বৎসর অবকাশ দিয়াছেন আর প্রতি মুহূর্তেই তুমি তাঁহার বিরোধিতা করিয়াছ; তাহার পথে হইতে তাঁহার বান্দাদিগকে তুমি ফিরাইয়া রাখিয়াছ। তিনি তোমার উপর আকাশ হইতে বৃষ্টি বর্ষণ করেন, যমীন হইতে ফসল উৎপাদন করেন, তুমি রোগাক্রান্ত হও না, দরিদ্র হও না, পরাস্ত হও না। তিনি চাহিলে ইহার সবগুলিই তোমাকে দিতে পারেন এবং চাহিলে ইহা তোমা হইতে দূর করিয়া দিতে পারেন। কিন্তু তিনি বড়ই ধৈর্যশীল।
তাহার সহিত তুমি নিজেও তোমার ভ্রাতাকে লইয়া জিহাদ কর। তোমরা জিহাদের দায়িত্বপ্রাপ্ত। কারণ আমি চাহিলে তাহার নিকট এমন সৈন্য প্রেরণ করিতে পারি যাহা প্রতিহত করিবার সাধ্য তাহার নাই। কিন্তু এই দুর্বল বান্দা, যাহাকে আত্মপ্রসাদে বিভোর করিয়া রাখিয়াছে, তাহার নিজের আত্মা তাহার দলবল। সে যেন জানিতে পারে যে, আমার অনুমতিতে ক্ষুদ্র দল বৃহৎ দলের উপর বিজয় লাভ করিতে পারে। তাহার সাজসজ্জা ও আড়ম্বর যেন তোমাদিগকে অভিভূত না করে। উহার প্রতি তোমরা দৃষ্টিপাত করিবে না। কারণ উহা পার্থিব জগতের চাকচিক্য, যাহা ভোগ-বিলাসীদের সৌন্দর্য। আমি চাহিলে তোমাদিগকে দুনিয়ার এমন জাঁকজমক দিতে পারি যে, ফিরআওন তাহা দেখিলে বুঝিতে পারিবে যে, তোমাদিগকে যে সৌন্দর্য ও চাকচিক্য দেওয়া হইয়াছে, সে তাহা সঞ্চয় করিতে অক্ষম। কিন্তু আমি তোমাদের প্রতি উহা প্রদানে আগ্রহী নহি; বরং তোমাদের হইতে আমি উহা ফিরাইয়া রাখিব। পূর্ব হইতেই আমি আমার প্রিয়পাত্র ও নৈকট্য লাভকারীদের সহিত এইরূপই আচরণ করিয়া থাকি। তাহাদিগকে উহা বিলম্বে তথা আখিরাতে প্রদান করিব। কারণ আমি তাহাদিগকে দুনিয়ার ভোগবিলাস ও চাকচিক্য হইতে দূরে সরাইয়া রাখি, যেমনিভাবে দয়ার্দ্র রাখাল তাহার বকরীদিগকে ধ্বংসের ঘাটি হইতে দূরে সরাইয়া রাখে।
জানিয়া রাখো, মানুষ দুনিয়াতে যুহদ (বিরাগ) অপেক্ষা অন্য কিছু দ্বারা এত সজ্জিত হইতে পারে না। কারণ উহা মুত্তাকীদের সৌন্দর্য। উহাই তাহাদের পোশাক। জানিয়া রাখ, যে আমার প্রিয়পাত্র ও বন্ধুকে অপদস্থ করিল সে আমার সহিত প্রকাশ্যে যুদ্ধ ঘোষণা করিল এবং নিজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলিয়া দিল। আমি আমার প্রিয়পাত্র ও বন্ধুদের সাহায্য করিয়া থাকি। যে আমার সহিত যুদ্ধ ঘোষণা করিল সে কি ধারণা করে যে, সে আমার সম্মুখে টিকিতে পারিবে? যে আমার সহিত শত্রুতা পোষণ করে সে কি ধারণা করে যে, আমাকে অক্ষম করিয়া দিতে পারিবে? দুনিয়া ও আখিরাতে আমি তাহাদের প্রতি প্রতিশোধ গ্রহণকারী।

টিকাঃ
ইব্‌ন কাছীর, তাফসীর, উপরিউক্ত আয়াতের তাফসীর, ৩খ, ৬৬
আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ২৬৬
ইবনুল জাওযী, আল-মুনতাজাম ফিত-তারীখ, ১খ, ৩৩৯-৩৪১; তু. আল-ইয়া'কূবী, তারীখ, ১খ, ৩৪

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 দাওয়াতী কার্যক্রমের নির্দেশ

📄 দাওয়াতী কার্যক্রমের নির্দেশ


অতঃপর আল্লাহ তাআলা মূসা (আ)-কে উক্ত মু'জিযা ও নিদর্শন প্রদান করত ফিরআওন ও তাহার সম্প্রদায়ের নিকট গিয়া তাহাদিগকে দাওয়াত দিতে নির্দেশ দিলেন। কুরআন কারীমে ইরশাদ হইয়াছে:
فَذَلِكَ بُرْهَانَنِ مِنْ رَبِّكَ إِلَى فِرْعَوْنَ وَمَلَا نِهِ إِنَّهُمْ كَانُوا قَوْمًا فَسِقِينَ.
"এই দুইটি তোমার প্রতিপালক প্রদত্ত প্রমাণ ফিরআওন ও তাহার পারিষদবর্গের জন্য। উহারা তো 'সত্যত্যাগী সম্প্রদায়" (২৮: ৩২)।।
তখন মূসা (আ) বলিলেন: رَبِّ إِنِّي قَتَلْتُ مِنْهُمْ نَفْسًا فَأَخَافُ أَنْ يُقْتُلُونِ . وَأَخِي هَرُونُ هُوَ أَفْصَحُ مِنِّي لِسَانًا فَأَرْسِلْهُ مَعِيَ رِدْءًا يُصَدِّ قُنِي إِنِّي أَخَافُ أَنْ يُكَذِّبُونِ .
"হে আমার প্রতিপালক! আমি তো উহাদের একজনকে হত্যা করিয়াছি। ফলে আমি আশঙ্কা করিতেছি উহারা আমাকে হত্যা করিবে। আমার ভ্রাতা হারুন আমা অপেক্ষা বাগ্মী; অতএব তাহাকে আমার সাহায্যকারীরূপে প্রেরণ কর, সে আমাকে সমর্থন করিবে। আমি আশঙ্কা করি উহারা আমাকে মিথ্যাবাদী বলিবে" (২৮: ৩৩-৩৪)।
আল্লাহ তাঁহার এই আবেদন মঞ্জুর করিয়া এবং তাঁহাকে অভয় বাণী দিয়া বলিলেন:
سَنَشُدُّ عَضُدَكَ بِأَخِيكَ وَنَجْعَلُ لَكُمَا سُلْطنًا فَلا يَصِلُوْنَ إِلَيْكُمَا بِايْتِنَا أَنْتُمَا وَمَنِ اتَّبَعَكُمَا الْغُلِبُونَ .
"আমি তোমার ভ্রাতার দ্বারা তোমার বাহু শক্তিশালী করিব এবং তোমাদের উভয়কে প্রাধান্য দান করিব। উহারা তোমাদের নিকট পৌঁছিতে পারিবে না। তোমরা এবং তোমাদের অনুসারীরা আমার নিদর্শনবলে উহাদের উপর প্রবল হইবে" (২৮: ৩৫)।
সূরা তাহায় এইভাবে বর্ণিত হইয়াছে যে, আল্লাহ তাঁহাকে ফিরআওনের নিকট দাওয়াত পৌছাইবার নির্দেশ দিয়া বলিলেন। اذْهَبْ إِلى فِرْعَوْنَ إِنَّهُ طَغَى .
"তুমি ফিরআওনের নিকট যাও, সে তো সীমালংঘন করিয়াছে" (২০: ২৪)।
তখন মূসা (আ) বলিলেন: رَبِّ اشْرَحْ لِي صَدْرِي وَيَسِّرْ لِي أَمْرِي وَاحْلُلْ عُقْدَةً مِنْ لِسَانِي يَفْقَهُوا قَوْلِي، وَاجْعَلْ لِي وَزِيراً مِنْ أَهْلِي هُرُوْنَ أَخِي . اشْدُدْ بِهِ أَزْرِى وَأَشْرِكْهُ فِي أَمْرِي كَى نُسَبِّحَكَ كَثِيرًا ، وَنَذْكُرَكَ كَثِيرًا ، إِنَّكَ كُنْتَ بنَا بَصِيراً .
“হে আমার প্রতিপালক! আমার বক্ষ প্রশস্ত করিয়া দাও এবং আমার কর্ম সহজ কুরিয়া দাও। আমার জিহ্বার জড়তা দূর করিয়া দাও— যাহাতে উহারা আমার কথা বুঝিতে পারে। আমার জন্য করিয়া দাও একজন সাহায্যকারী আমার স্বজনবর্গের মধ্য হইতে; আমার ভ্রাতা হারুনকে; তাহা দ্বারা আমার শক্তি সুদৃঢ় কর ও তাহাকে আমার কর্মে অংশী কর। যাহাতে আমরা তোমার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করিতে পারি প্রচুর এবং তোমাকে স্মরণ করিতে পারি অধিক। তুমি তো আমাদের সম্যক দ্রষ্টা” (২০: ২৫-৩৫)।
আল্লাহ তাআলা তাঁহার এই আবেদন মঞ্জুর করিয়া বলিলেন:
قَدْ أُوتِيتَ سُؤلُكَ يموسى .
"হে মূসা! তুমি যাহা চাহিয়াছ তাহা তোমাকে দেওয়া হইল" (২০:৩৬)।
এক বর্ণনামতে মূসা (আ) শৈশবে যখন ফিরআওনের দাড়ি ধরিয়া জোরে টান মারিয়াছিলেন তখন সে ক্ষিপ্ত হইয়া তাঁহাকে হত্যা করিবার উদ্যোগ লইয়াছিল। অতঃপর স্ত্রী আসিয়ার পরামর্শে তাঁহার বুদ্ধি পরীক্ষার জন্য তাঁহার সম্মুখে যখন জ্বলন্ত অঙ্গার ও খেজুর, মতান্তরে স্বর্ণ খণ্ড রাখা হইল তখন শিশু মূসা অঙ্গারটি ধরিয়াই মুখে পুরিয়া দিয়াছিলেন। ফলে জিহ্বা পুড়িয়া যাওয়ায় তিনি কিছুট তোতলা হইয়া গিয়াছিলেন। উক্ত তোতলামী ও জড়তা এতটুকু পরিমাণে দূর করিয়া দেওয়ার জন্য তিনি প্রার্থনা করিয়াছিলেন যাহাতে তাহারা তাঁহার কথা বুঝিতে পারে। সম্পূর্ণরূপে দূর করিয়া দেওয়ার প্রার্থনা তিনি করেন নাই। হাসান বসরী (র) বলেন, মূসা (আ) প্রয়োজনমত উহা দূর করিবার প্রার্থনা করিয়াছিলেন, যাহার কারণে তোতলামী কিছুটা অবশিষ্ট ছিল। এইজন্য ফিরআওন তাঁহাকে ইহার কথা বলিয়া হেয় প্রতিপন্ন করিয়াছিল। কুরআনে ইরশাদ হইয়াছে, সে তাহার সম্প্রদায়ের নিকট নিজের শ্রেষ্ঠত্ব ও মূসা (আ)-এর দোষ তুলিয়া ধলিয়া বলিলঃ
أَمْ أَنَا خَيْرٌ مِّنْ هَذَا الَّذِي هُوَ مَهِينٌ وَلَا يَكَادُ يُبِينُ. "আমি তো শ্রেষ্ঠ এই ব্যক্তি হইতে, যে হীন এবং স্পষ্ট কথা বলিতেও অক্ষম" (৪৩ঃ ৫২)।
ফিরআওনের এই উক্তি ছিল ইচ্ছাকৃত একটি অপবাদ যাহা দ্বারা সে তাঁহাকে হেয় প্রতিপন্ন করিতে চাহিয়াছিল। শত্রুতা ও কুফরী বশত সে এইরূপ বলিয়াছিল। সে মূসা (আ) কে অবিশ্বাসীর দৃষ্টিতে দেখিত। অথচ মূসা (আ) সম্মান ও মাহাত্ম্যে এমন এক পর্যায়ে ছিলেন যে, তাহাকে দেখিলে বুদ্ধিমানদের চক্ষু জুড়াইয়া যাইত। প্রকৃতপক্ষে ফির'আওনই ছিল স্বভাবগতভাবে, চরিত্র ও দীন-এর দিক দিয়া অপদস্থ ও হেয়। লোকজন মূসা (আ)-এর কথা ঠিকই বুঝিতে পারিত। কারণ যদিও অঙ্গার পুরিয়া দেওয়ার ফলে জিহবায় কিছুটা জড়তা আসিয়াছিল। কিন্তু মূসা (আ)-এর দু'আর ফলে আল্লাহ তাহা দূর করিয়া দেন। হাসান বাসরীর বর্ণনা মতে সামান্য জড়তা থাকিয়া গেলেও যাহা দূর করিবার জন্য তিনি দু'আ করেন নাই তিনি দু'আ করিয়াছিলেন ততটুকু দূর করিতে যাহা দ্বারা দীন প্রচার ও জনগণকে বুঝাইবার কাজ চলে- ইহা হইল সৃষ্টিগত বিষয় যদ্বারা বান্দাকে দোষারোপ করা যায় না। ফির'আওন যদিও বিষয়টি বুঝিত তবুও তাহার প্রজাগণের মধ্যে ইহা ছড়াইয়া দেওয়ার জন্য এইরূপ বলিয়াছিল। কারণ তাহারা ছিল অশিক্ষিত ও মূর্খ।
স্বীয় ভ্রাতা হারূনের জন্য আল্লাহর নিকট নবৃওয়াত প্রার্থনা করা ছিল মূসা (আ)-এর তাঁহার প্রতি সর্বাধিক বড় অনুগ্রহ। উন্মুল মুমিনীন হযরত আইশা (রা) একদা হজ্জের সফরে যাওয়ার সময় শুনিতে পাইলেন, এক লোক, তাহার সঙ্গিদিগকে বলিতেছে, কোন ভ্রাতা স্বীয় ভ্রাতার প্রতি সর্বাধিক ইহসান করিয়াছে? তখন লোকজন সকলে চুপ হইয়া গেল, কেহই ইহার উত্তর দিতে পারিল না। আইশা (রা) তাঁহার শিবিকার পার্শ্ববর্তী লোকজনকে বলিলেন, তিনি হইলেন মূসা ইব্‌ন ইমরান, যিনি স্বীয় ভ্রাতার জন্য সুপারিশ করায় আল্লাহ তাঁহাকেও নবীরূপে ঘোষাণা করেন এবং ওহী প্রেরণ করেন। কুরআন কারীমে ইরশাদ হইয়াছে:
وَوَهَبْنَا لَهُ مِنْ رَحْمَتِنَا أَخَاهُ هُرُونَ نَبِيًّا (۲۲ : ۱۹) "আমি নিজ অনুগ্রহে তাহাকে (মূসা আ কে) দিলাম তাহার ভ্রাতা হারুনকে নবীরূপে" (১৯:৫৩)।
বাইবেলে এই ক্ষেত্রে নিজেদের বানানো ও মনগড়া বর্ণনা উপস্থাপন করিয়া মূসা (আ)-এর প্রতি অপবাদ দেওয়া হইয়াছে এবং তাঁহাকে দোষারোপ করা হইয়াছে। উহাতে বর্ণনা করা হইয়াছে যে, মূসা (আ) রিসালাতের যিম্মাদারী হইতে বাঁচিবার জন্য চেষ্টা করেন এবং নিজের তোতলামীর ওযর পেশ করিয়া বলেন, "হে আমার প্রভু! বিনয় করি, যাহার হাতে পাঠাইতে চাও, পাঠাও। তখন মোশির প্রতি সদাপ্রভুর ক্রোধ প্রজ্জ্বলিত হইল..." অতঃপর হারূন অন্যকে তাহার সাহায্যকারী নিযুক্ত করিলেন। কিন্তু ইহা বাইবেলের ভ্রান্ত বর্ণনা। মূসা (আ) রিসালাতের দায়িত্ব হইতে মুক্ত হওয়ার আগ্রহ কখনও প্রকাশ করেন নাই। তিনি হারুন (আ)-এর নবুওয়াত ও তাঁহার পরামর্শদাতা বানাইবার জন্য দুআ করেন এবং আল্লাহও তাহা কবুল করেন, যাহার বিস্তারিত ও সুস্পষ্ট বিবরণ কুরআন কারীমে উল্লিখিত হইয়াছে।

টিকাঃ
আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ২৪৯
ইব্‌ন কাছীর, তাফসীর, উক্ত আয়াতের তাফসীর দ্র. ৪খ, ১৩০
আম্বিয়া-কুরআন, ২খ, ১৩৯-১৪০

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মিসরে প্রবেশ এবং মাতী ও ভ্রাতার সাক্ষাত লাভ

📄 মিসরে প্রবেশ এবং মাতী ও ভ্রাতার সাক্ষাত লাভ


মূসা (আ) আল্লাহ্র নিকট হইতে এই ওহী লইয়া তাঁহার পরিবারের নিকট ফিরিয়া আসিলেন, যাহারা উপত্যকার সম্মুখে জঙ্গলের নিকট তাঁহার জন্য অপেক্ষা করিতেছিলেন। তাহাদিগকে লইয়া তিনি আল্লাহ্র নির্দেশ পালনার্থে মিসরের পথে রওয়ানা হইলেন। অতঃপর দূর-দরাজ পথ অতিক্রম করিয়া মিসরে পৌঁছিলেন। তখন রাত্র হইয়া গিয়াছিল। গোপনে তিনি মিসরে প্রবেশ করিলেন' এবং মুসাফিরের বেশে স্বীয় মাতার নিকট গেলেন। বনূ ইসরাঈলের এই পরিবারটি মেহমানদারিতে প্রসিদ্ধ ছিল। এক বর্ণনামতে মূসা (আ) তাহাদিগকে চিনিতে পারেন নাই এবং তাহারাও তাঁহাকে চিনিতে পারে নাই। তাহারা সেই রাত্রে 'তাদায়শাল' বা তফশীল নামক এক প্রকার ঝাল জাতীয় তরকারী খাইতেছিলেন। মূসা (আ) দরজার এক প্রান্তে বসিয়াছিলেন। অতঃপর হারূন (আ) সেখানে আগমন করিলেন এবং মেহমান দেখিয়া মাতার নিকট তাহার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিলেন। মাতা তাঁহাকে জানাইলেন যে, তিনি একজন মেহমান। হারুন (আ) তাঁহাকে ডাকিলেন এবং তাঁহার সহিত একত্রে বসিয়া আহার করিলেন। অতঃপর উভয়ে আলাপে প্রবৃত্ত হইলেন। হারুন (আ) তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি কে? তিনি বলিলেন, আমি মূসা। অতঃপর উভয়ে দাঁড়াইয়া কোলাকুলি করিলেন। এক বর্ণনামতে হারুন (আ) গৃহে আগমনের পূর্বেই আল্লাহ্র পক্ষ হইতে নবুওয়াত ও রিসালাতের দায়িত্ব তাঁহার উপর অর্পণ করা হয়। তাই ওহীর মাধ্যমে মূসা (আ)-এর পূর্ণ ঘটনা তাহাকে জানাইয়া দেওয়া হইয়াছিল। তিনি আসিয়া ভ্রাতার সহিত কোলাকুলি করিলেন। অতঃপর তাহার পরিবার-পরিজনকে ঘরে লইয়া গেলেন এবং মাতাকে সকল বিষয় অবহিত করিলেন। সকলে একত্র হইয়া অতীত জীবনের স্মৃতিচারণ করিলেন এবং ভাইয়ে ভাইয়ে পরিচিত হইলেন। বাইবেলে বর্ণিত হইয়াছে যে, "আর সদাপ্রভু হারোনকে বলিলেন, তুমি মোশির সহিত সাক্ষাৎ করিতে প্রান্তরে যাও। তাহাতে! তিনি গিয়া সদাপ্রভুর পর্ব্বতে তাঁহার দেখা পাইলেন ও তাহাকে চুম্বন করিলেন। তখন মোশি প্রেরণকর্তা সদাপ্রভুর সমস্ত বাক্য ও তাহাদের আজ্ঞাপিত সমস্ত চিহ্নের বিষয় হারোনকে জ্ঞাত করিলেন"।
উভয় ভ্রাতার পরিচয় হওয়ার পর মূসা (আ) হারুন (আ)-কে বলিলেন, হারুন! আমার সহিত ফিরআওনের নিকট চলুন, আল্লাহ আমাদিগকে তাহার নিকট প্রেরণ করিয়াছেন। হারুন (আ) বলিলেন, শুনিলাম এবং মানিয়া লইলাম। তাহাদের মাতা দাঁড়াইয়া চীৎকার করিয়া বলিলেন, তোমাদিগকে আল্লাহর কসম দিয়া বলিতেছি, তোমারা ফিরআওনের নিকট যাইও না; সে তোমাদিগকে হত্যা করিবে। তাঁহারা মাতার এই অনুরোধ মান্য করিতে অঙ্কীকার করিলেন এবং রাত্রেই ফিরআওনের নিকট গমন করিলেন।
এক বর্ণনামতে আল্লাহ তাআলা মূসা (আ)-কে তূর পর্বতের নিকট সাতদিন ব্যস্ত রাখেন, অতঃপর তাঁহাকে বলেন, তোমার প্রতিপালক যে বিষয়ে তোমার সহিত আলোচনা করিয়াছেন সেই মত কাজ কর। তখন তিনি বলিলেন:
রَبِّ اشْرَحْ لِي صَدْرِي وَيَسْرْ لِي أَمْرِي وَاحْلُلْ عُقْدَةً مِّنْ لِسَانِي يَفْقَهُوا قَوْلِي وَاجْعَلْ لِي وَزِيْرًا مِنْ أَهْلِي هُرُونَ أَخِي اشْدُدْ بِهِ أَزْرِى وَأَشْرِكْهُ فِي أَمْرِي كَى نُسَبِّحَكَ كَثِيرًا وَنَذْكُرَكَ كَثِيرًا إِنَّكَ كُنْتَ بِنَا بَصِيرًا .
"হে আমার প্রতিপালক! আমার বক্ষ প্রশস্ত করিয়া দাও এবং আমার কর্ম সহজ করিয়া দাও, আমার জিহ্বার জড়তা দূর করিয়া দাও যাহাতে উহারা আমার কথা বুঝিতে পারে। আমার জন্য করিয়া দাও একজন সাহায্যকারী আমার স্বজনবর্গের মধ্য হইতে; আমার ভ্রাতা হারুনকে; তাহা দ্বারা আমার শক্তিকে সুদৃঢ় কর ও তাহাকে আমার কর্মে অংশী কর। যাহাতে আমরা তোমার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করিতে পারি প্রচুর এবং তোমাকে স্মরণ করিতে পারি অধিক। তুমি তো আমাদের সম্যক দ্রষ্টা” (২০ঃ ২৫-৩৫)।
আল্লাহ তাঁহার এই দুআ কবুল করিয়া ফিরআওনের নিকট গমন করার নির্দেশ দেন। এদিকে তাঁহার পরিবারবর্গ তাহাদিগকে যে স্থানে তিনি রাখিয়া গিয়াছিলেন সেখানেই অবস্থান করিতেছিল। তাহারা জানিতে পারে নাই যে, মূসা (আ)-এর কি অবস্থা বা তিনি কি করিতেছেন। এমতাবস্থায় মাদয়ানের এক রাখাল তাহাদের নিকট দিয়া যাইতেছিল। সে তাহাদিগকে চিনিতে পারিল এবং সঙ্গে করিয়া মাদয়ান লইয়া আসিল। অতঃপর তাহারা শুআয়ব-এর নিকটই অবস্থান করিতে থাকেন। এমনিভাবে তাহাদের দিন অতিবাহিত হইতে লাগিল। মূসা (আ)-এর সমুদ্র পার হইয়া যাওয়ার সংবাদ তাহাদের নিকট পৌছিলে তাহারা মূসা (আ)-এর নিকট চলিয়া যান। তবে এই বর্ণনাটি বিরল এবং গ্রহণযোগ্য নহে।
বাইবেলের বর্ণনামতে নবুওয়াত প্রাপ্তির পর মূসা (আ) শ্বশুরের নিকট গিয়া ঘটনা জানাইলেন। শ্বশুর নিরাপদে যাত্রা করিবার জন্য দুআ করিলেন। অতঃপর তিনি পরিজনসহ মিসর রওয়ানা হইলেন।
অতঃপর উভয় ভ্রাতা ফিরআওনের দরজায় আসিয়া করাঘাত করিলেন। ইহাতে ফিরআওন বলিল, এই অসময়ে কে আমার দরজায় করাঘাত করিতেছে! দ্বাররক্ষী দরজা হইতে তাহাদিগকে দেখিল এবং তাহাদের সহিত আলাপ করিল। মূসা (আ) বলিলেন, “আমি তো জগতসমূহের প্রতিপালকের প্রেরিত” (২৬: ১৮)। দ্বাররক্ষী ইহাতে ভীত হইয়া ফিরআওনের নিকট আসিয়া তাহাকে সংবাদ জানাইয়া বলিল, দরজায় এক পাগল আসিয়াছে। সে ধারণা করে যেঁ, সে জগতসমূহের প্রতিপালকের প্রেরিত! ফিরআওন বলিল, তাহাকে প্রবেশ করিতে দাও। মূসা ও হারুন উভয়ে প্রবেশ করিলেন। মূসা (আ) ফিরআওনকে লক্ষ্য করিয়া আল্লাহ যাহা শিখাইয়া দিয়াছিলেন তাহাই বলিলেন:
إِنَّا رَسُولاً رَبِّكَ فَأَرْسِلْ مَعَنَا بَنِي إِسْرَائِيلَ وَلَا تُعَذِّبْهُمْ قَدْ جِئْنَاكَ بِآيَةٍ مِنْ رَبِّكَ وَالسَّلَامُ عَلَى مَنِ اتَّبَعَ الْهُدَى إِنَّا قَدْ أُوحِيَ إِلَيْنَا أَنَّ الْعَذَابَ عَلَى مَنْ كَذَّبَ وَتَوَلَّى (২০: ৪৭-৪৮)
“আমরা তোমার প্রতিপালকের রাসূল, সুতরাং আমাদের সহিত বানু ইসরাঈলকে যাইতে দাও এবং তাহাদিগকে কষ্ট দিও না। আমরা তো তোমার নিকট আনিয়াছি তোমার প্রতিপালকের নিকট হইতে নিদর্শন এবং শান্তি তাহাদের প্রতি যাহারা অনুসরণ করে সৎপথ। আমাদের প্রতি ওহী প্রেরণ করা হইয়াছে যে, শান্তি তাহার জন্য যে মিথ্যা আরোপ করে ও মুখ ফিরাইয়া লয়” (২০: ৪৭-৪৮)।
তিনি আরো বলিলেন: هَلْ لَكَ إِلَى أَنْ تَزَكَّى وَأَهْدِيَكَ إِلَى رَبِّكَ فَتَخْشَى "তোমার কি আগ্রহ আছে যে, তুমি পবিত্র হও। আর আমি তোমাকে তোমার প্রতিপালকের পথে পরিচালিত করি যাহাতে তুমি ভয় কর" (৭৯: ১৮-১৯)?
ফিরআওন তাঁহাকে চিনিতে পারিয়া বলিল:
الَمْ نُرَبِّكَ فِينَا وَلِيْدًا وَلَبِثْتَ فِينَا مِنْ عُمُرِكَ سِنِينَ. وَفَعَلْتَ فَعْلَتَكَ الَّتِي فَعَلْتَهَا وَأَنْتَ مِنَ الْكَافِرِينَ .
“আমরা কি তোমাদের শৈশবে আমাদের মধ্যে লালন-পালন করি নাই? তুমি তো তোমার জীবনের বহু বৎসর আমাদের মধ্যে কাটাইয়াছ। তুমি তো তোমার কর্ম যাহা করিবার তাহা করিয়াছ তুমি অকৃতজ্ঞ” (২৬: ১৮-১৯)।
মূসা (আ) বলিলেন:
قَالَ فَعَلْتُهَا إِذا وَأَنَا مِنَ الضَّالِّينَ. فَفَرَرْتُ مِنْكُمْ لَمَّا خِفْتُكُمْ فَوَهَبَ لِي رَبِّى حُكْمًا وَجَعَلَنِي مِنَ الْمُرْسَلِينَ. وَتِلْكَ نِعْمَةً تَمُنُّهَا عَلَى أَنْ عَبْدْتُ بَنِي إِسْرَائِيلَ (٢٦ : ٢٠ - ٢٢ ).
"আমি তো ইহা করিয়াছিলাম তখন যখন আমি ছিলাম অজ্ঞ। অতঃপর আমি তোমাদের ভয়ে ভীত হইলাম, তখন আমি তোমাদের নিকট হইতে পলাইয়া গিয়াছিলাম। তৎপর আমার প্রতিপালক আমাকে জ্ঞান দান করিয়াছেন এবং আমাকে রাসূল করিয়াছেন। আমার প্রতি তোমার যে অনুগ্রহের কথা উল্লেখ করিতেছ তাহা তো এই যে, তুমি বানু ইসরাঈলকে দাসে পরিণত করিয়াছ" (২৬: ২০-২২)।
ফিরআওন সৃষ্টিকর্তাকে অস্বীকার করিয়াছিল এবং সে ধারণা ও দাবি করিত যে, সে-ই ইলাহ ও রব। কুরআন কারীমে ইরশাদ হইয়াছে: فَحَشَرَ فَنَادَى فَقَالَ أَنَا رَبُّكُمُ الْأَعْلَى (٢٤-٢٣ : ٧٩) "সে সকলকে সমবেত করিল এবং উচ্চস্বরে ঘোষণা করিল আর বলিল, আমিই তোমাদের শ্রেষ্ঠ প্রতিপালক" (৭৯: ২৩-২৪)
وَقَالَ فِرْعَوْنُ يَا أَيُّهَا الْمَلَا مَا عَلِمْتُ لَكُمْ مِنْ اللَّهِ غَيْرِي . "ফিরআওন বলিল, হে পারিষদবর্গ! আমি ব্যতীত তোমাদের অন্য কোন ইলাহ আছে বলিয়া জানি না" (২৮: ৩৮)।
প্রকৃতপক্ষে সে শত্রুতা ও অহংকারবশে এইরূপ বলিয়াছিল। সে জানিত যে, সে একজন দাস, যাহাকে প্রতিপালন করা হয়। আর আল্লাহই হইলেন প্রকৃত সৃষ্টিকর্তা। এই সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছেঃ وَجَحَدُوا بِهَا وَاسْتَيْقَنَتْهَا أَنْفُسُهُم ظُلْمًا وَعُلُوا ، فَانْظُرْ كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُفْسِدِينَ. (١٤ : ٢٧) "উহারা (ফিরআওন ও তাহার সম্প্রদায়) অন্যায় ও উদ্ধতভাবে নিদর্শনগুলি প্রত্যাখ্যান করিল, যদিও উহাদের অন্তর এইগুলিকে সত্য বলিয়া গ্রহণ করিয়াছিল। দেখ, বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের পরিণাম কী হইয়াছিল" (২৭: ১৪)! এইজন্যই মূসা ও হারুন (আ) যখন তাহাকে দাওয়াত দিয়া বলিয়াছিলেন إِنَّا رَسُولُ رَبِّ الْعَالَمِينَ "আমরা জগতসমূহের প্রতিপালকের রাসূল" তখন সে শত্রুতা ও ঔদ্ধত্যভরে তাহাদের রিসালাতকে অস্বীকার করিয়া বলিয়াছিল: "জগৎসমূহের প্রতিপালক আবার কি" (২৬: ২৩)? অন্যত্র বর্ণিত হইয়াছে, ফিরআওন বলিয়াছিল, (٢٦ : ٢٣) فَمَنْ رَبُّكُمَا يَا مُوْسُى “হে মুসা! কে তোমাদের প্রতিপালক” (২০:৪৯)? তখন মূসা (আ) দৃঢ়ভাবে জওয়াব দিলেন: رَبُّ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَا إِنْ كُنْتُمْ مُوقِنِينَ. (٢٤ : ٢٦) "তিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী এবং উহাদের মধ্যবর্তী সকল কিছুর প্রতিপালক, যদি তোমরা নিশ্চিত বিশ্বাসী হও” (২৬ঃ ২৪)। অর্থাৎ এই জগতসমূহের পালনকর্তা তিনি যিনি এই দৃশ্যমান আসমান ও যমীন এবং উহার মধ্যবর্তী সকল কিছু মেঘ, বৃষ্টি, বায়ু, শস্যাদি, প্রাণীকুল তথা যাবতীয় জিনিস সৃষ্টি করিয়াছেন। জ্ঞানী মাত্রই জানেন যে, এই সকল জিনিস আপনা আপনি সৃষ্টি হয় নাই। নিশ্চয় ইহার একজন সৃষ্টিকর্তা রহিয়াছেন। তিনিই হইলেন আল্লাহ্, জগতসমূহের পালনকর্তা; তিনি ব্যতীত আর কোন উপাস্য (ইলাহ) নাই। ফিরআওন তখন তাহার পার্শ্বস্থ পারিষদবর্গকে লক্ষ্য করিয়া বিদ্রূপভরে বলিল, "তোমরা শুনিতেছ তো!" মূসা (আ) বলিলেন, "তিনি তোমাদের প্রতিপালক এবং তোমাদের পূর্বপুরুষগণেরও প্রতিপালক"। অর্থাৎ যিনি তোমাদিগকে এবং তোমাদের বাপদাদা পূর্বপুরুষদিগকে সৃষ্টি করিয়াছেন এবং তাহাদের হইতে তোমাদিগকে সৃষ্টি করিয়াছেন, তিনিই ইলাহ। কারণ প্রত্যেকেই জানে যে, সে নিজে নিজে সৃষ্টি হয় নাই, তাহার মাতাপিতাও নিজে নিজে সৃষ্টি হয় নাই। সকলেরই অবশ্যই একজন সৃষ্টিকর্তা রহিয়াছেন। এত কিছু যুক্তি-প্রমাণ সত্ত্বেও ফিরআওন তাহার গোমরাহী হইতে বিন্দু পরিমাণও টলিল না; বরং তাহার পারিষদবর্গকে বলিল :
إِنَّ رَسُولَكُمُ الَّذِي أُرْسِلَ إِلَيْكُمْ لَمَجْنُونٌ . (٢٧ : ٢٦) "তোমাদের প্রতি প্রেরিত তোমাদের রাসূলটি তো পাগল" (২৬: ২৭)।
কারণ সে আমাকে ছাড়া অন্য একজনকে তোমাদের ইলাহ বলিয়া দাবি করিতেছে। তখন মূসা (আ) বলিলেন: رَبُّ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ وَمَا بَيْنَهُمَا إِنْ كُنْتُمْ تَعْقِلُونَ . "তিনি পূর্ব ও পশ্চিমের এবং উহাদের মধ্যবর্তী সমস্ত কিছুর প্রতিপালক, যদি তোমরা বুঝিতে" (২৬: ২৮)। অর্থাৎ তিনিই এই উজ্জ্বল নক্ষত্র যাহা আকাশে পরিভ্রমণ করে, চন্দ্র, সূর্য প্রভৃতি সৃষ্টি করিয়াছেন। তিনিই রাত্রিতে উহার অন্ধকারসহ এবং দিবসকে উহার জ্যোতিসহ সৃষ্টি করিয়াছেন। তিনিই যমীন-আসমান, পূর্ববর্তী পরবর্তী সকল কিছুর সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা ও রক্ষাকর্তা। সকল কিছুই তাঁহার ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণাধীন।
ফিরআওন যখন যুক্তি-তর্কে আঁটিয়া উঠিতে পারিল না, তাহার সন্দেহ পোষণ করিবার দ্বার রুদ্ধ হইয়া গেল তখন নিজের ক্ষমতা প্রয়োগে প্রবৃত্ত হইল। ইহা ছাড়া তাহার আর কোন পথও ছিল না। তাই সে ক্ষমতার দাপট দেখাইয়া বলিল, لَئِن اتَّخَذْتَ إِلَهَا غَيْرِى لَأَجْعَلَنَّكَ مِنَ الْمَسْجُونِين “তুমি যদি আমার পরিবর্তে অন্যকে ইলাহরূপে গ্রহণ কর, আমি তোমাকে অবশ্যই কারারুদ্ধ করিব" (২৬: ২৯)।
তখন মূসা (আ) বলিলেন أَوَلَوْ جِئْتُكَ بِشَيْئ مُّبِينٍ "আমি যদি তোমার নিকট কোন স্পষ্ট নিদর্শন আনয়ন করি তবুও”? ফিরআওন বলিল, فَانْت به انْ كُنْتَ من الصادقين "তুমি যদি সত্যবাদী হও তবে উহা উপস্থিত কর।" অতঃপর মূসা (আ) তাহার লাঠি নিক্ষেপ করিলে তৎক্ষণাৎ উহা এক সাক্ষাত অজগর হইল এবং সে (মূসা) তাহার হাত বাহির করিল আর তৎক্ষণাৎ উহা দর্শকের দৃষ্টিতে শুভ্র উজ্জ্বল প্রতিভাত হইল" (২৬:১৭-৩৩)।
এক বর্ণনামতে অজগরটি এক ভয়ানক রূপ ধারণ করে। উহা এত বিরাট হা করিয়াছিল যে, উহার নিচের চোয়াল ছিল যমীনে, আর উপরেরটি ছিল ফিরআওনের প্রাসাদের উপরে। আর সর্পটি ফিরআওনের দিকে দ্রুত অগ্রসর হইতে লাগিল। ফিরআওন ইহাতে ভীত হইয়া সিংহাসন হইতে লাফাইয়া পড়িল। লোকজনও ভয়ে ছুটিয়া পলায়ন করিতে লাগিল। কথিত আছে, ভয়ে ফিরআওনের ঐদিন চল্লিশ বার পায়খানা হয়। অথচ ইহার পূর্বে চল্লিশ দিনে তাহার একবার মাত্র পায়খানা হইত। ফিরআওনের অনুরোধে মূসা (আ) উহা হাতে ধরিতেই পূর্বের ন্যায় আবার লাঠি হইয়া গেল। অনুরূপভাবে তিনি বগলে হাত রাখিয়া বাহিরে আনিতেই উহা পূর্ণিমার পূর্ণ চন্দ্রের ন্যায় এমনভাবে আলোকিত হইয়া উঠিল যে, উহার কিরণচ্ছটায় চোখ ধাঁধাইয়া গেল। পার্শ্ববর্তী সকল কিছুই আলোয় ঝলমল করিয়া উঠিল। আলোর তীব্রতায় ফিরআওন উহার দিকে তাঁকাইতে পারিল না। মূসা (আ) হাত পুনরায় বগলে রাখিতেই উহা পূর্বের ন্যায় স্বভাবিক হইয়া গেল। এত কিছু দেখার পরও ফিরআওন ইহা দ্বারা সামান্যতম শিক্ষা লাভ করিতে পারিল না বরং পূর্বের তুলনায় তাহার শত্রুতা ও ঔদ্ধত্য আরো বাড়িয়া গেল। সে বলিল, ইহা সবই যাদু। কুরআন কারীমে ইরশাদ হইয়াছে:
قَالَ لِلْمَلَا حَوْلَهُ إِنَّ هَذَا لَسَاحِرٌ عَلِيمٌ . يُرِيدُ أَنْ يُخْرِجَكُمْ مِنْ أَرْضِكُمْ بِسِحْرِهِ فَمَاذَا تَأْمُرُونَ .
"ফিরআওন তাহার পারিষদবর্গকে বলিল, এতো এক সুদক্ষ যাদুকর! এ তোমাদিগকে তোমাদের দেশ হইতে তাহার যাদুবলে বহিষ্কৃত করিতে চাহে! এখন তোমরা কি করিতে বল" (২৬: ৩৪-৩৫)?
এক বর্ণনামতে মূসা ও হারুন (আ) মুজিযা ও নিদর্শন দেখাইবার পর ফিরআওনের দরবার হইতে চলিয়া আসেন। অতঃপর ফিরআওন তাহার রাজ্যে যত যাদুকর আছে সবাইকে একত্র করিবার নির্দেশ দেয়। তখনকার সময়ে মিসরে বহু খ্যাতিমান যাদুকর ছিল। প্রতিটি শহর-নগর হইতে যাদুকর জড়ো করা হইল। ফলে যাদুকরদের বিশাল এক দল জড়ো হইয়া গেল। মুহাম্মাদ ইব্‌ন কা'ব-এর বর্ণনামতে তাহাদের সংখ্যা ছিল আট হাজার, কাসিম ইব্‌ন আবী বুরদার বর্ণনামতে সত্তর হাজার, সুদ্দীর বর্ণনামতে ত্রিশ হাজারের কিছু বেশি, আবু উমামার বর্ণনামতে উনিশ হাজার, মুহাম্মাদ ইবন ইসহাকের বর্ণনামতে পনের হাজার, কা'ব আল-আহবারের বর্ণনামতে বারো হাজার, ইব্‌ন আব্বাস (রা)-এর বর্ণনামতে সত্তরজন।
এইভাবে সকল যাদুকরকে জড়ো করা হইল। তাহারা জড়ো হইলে ফিরআওন তাহাদিগকে বলিল, আমাদের নিকট এক যাদুকর আসিয়াছে। আমরা তাহার মত যাদুকর আর কখনো দেখি নাই। তোমরা যদি তাহাকে পরাস্ত করিতে পার তবে আমি তোমাদিগকে সম্মানিত করিব এবং আমার প্রজাদের মধ্যে তোমাদিগকেই নিকটতর করিব। তাহারা বলিল, আমরা জয়ী হইলে আমাদের জন্য কি কোন পুরস্কার থাকিবে? ফিরআওন বলিল, হাঁ, অবশ্যই। তোমরা আমার নিকটতম জনদের অন্তর্ভুক্ত হইবে। তাহারা বলিল, তাহা হইলে একটি দিন নির্ধারণ করুন, যেদিন আমরা তাহার সহিত একত্র হইব। উক্ত যাদুকরদের সরদার ছিল চারজন : সাতুর, 'আদূর, হাতহাত ও মুসাফফা। ফিরআওন মূসা (আ)-এর নিকট লোক পাঠাইল একটি দিন নির্ধারণ করিবার জন্য। কুরআন কারীমে ইরশাদ হইয়াছে:
فَاجْعَلْ بَيْنَنَا وَبَيْنَكَ مَوْعِدًا لَا نُخْلِفُهُ نَحْنُ وَلَا أَنْتَ مَكَانًا سُوى . قَالَ مَوْعِدُكُمْ يَوْمُ الزِّينَةِ وَأَنْ يُحْشَرَ النَّاسُ ضُحى (٥٩-٥٨ : ٢٠)
"(ফিরআওন বলিল,) সুতরাং আমাদের ও তোমার মধ্যে নির্ধারণ কর এক নির্দিষ্ট সময় ও এক মধ্যবর্তী স্থান, যাহার ব্যতিক্রম আমরাও করিব না এবং তুমিও করিবে না। মূসা বলিল, তোমাদের নির্ধারিত সময় উৎসবের দিন এবং সেই দিন পূর্বাহ্নে জনগণকে সমবেত করা হইবে" (২০:৫৮-৫৯)।
উহা ছিল ঈদের দিন, যেদিন ফিরআওন প্রজাদের নিকট বাহির হইত। ফিরআওন বিশাল এক সমাবেশের আয়োজন করিল। সে ও তাহার পারিষদবর্গ এবং সর্বস্তরের জনগণ উক্ত সমাবেশে হাজির হইল। তাহারা এই কথা বলিতে বলিতে বাহির হইয়াছিল:
لَعَلَّنَا نَتَّبِعُ السَّحَرَةَ إِنْ كَانُوا هُمُ الْغُلِبِينَ (٤٠ : ٢٦) "(সমবেত হইতেছি) যেন আমরা যাদুকরদের অনুসরণ করিতে পারি, যদি উহারা বিজয়ী হয়" (২৬:৪০)।
যাদুকরগণ সারিবদ্ধ হইয়া দাঁড়াইয়া গেল। প্রত্যেকের সঙ্গে ছিল তাহাদের রশি ও লাঠি। অতপর মূসা ও হারুন (আ) সমাবেশ স্থলে হাজির হইলেন। মূসা (আ) যাদুকরদিগকে উপদেশ দিলেন এবং বাতিল ও মিথ্যা যাদুর অনুসরণ করিবার জন্য তাহাদিগকে ভর্ৎসনা ও তিরস্কার করিলেন। বলিলেন:
وَيْلَكُمْ لَا تَفْتَرُوا عَلَى اللهِ كَذِبًا فَيُسْحِتَكُمْ بِعَذَابٍ وَقَدْ خَابَ مَنِ افْتَرَى (٦١ : ٢٠) . "দুর্ভোগ তোমাদের! তোমরা আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করিও না। করিলে তিনি তোমাদিগকে শাস্তি দ্বারা সমূলে ধ্বংস করিবেন। যে মিথ্যা উদ্ভাবন করিয়াছে সেই ধ্বংস হইয়াছে" (২০: ৬১)।
এক বর্ণনামতে মূসা (আ)-এর এই কথা শুনিয়া তাহারা মতবিরোধ করিতে লাগিল। কেহ বলিতেছিল, ইহা নবীর কথা, যাদুকরের কথা নহে। আবার কেহ বলিতেছিল, সে যাদুকর। অতঃপর তাহারা গোপনে পরামর্শ করিল এবং বলিতে লাগিল, এই দুইজন অবশ্যই যাদুকর। তাহারা তাহাদের যাদু দ্বারা তোমাদিগকে তোমাদের দেশ হইতে বহিষ্কার করিতে এবং তোমাদের উৎকৃষ্ট জীবন ব্যবস্থার অস্তিত্ব নাশ করিতে চাহে। অতএব তোমরা তোমাদের যাদুকর্ম সংহত কর, অতঃপর সারিবদ্ধ হইয়া উপস্থিত হও এবং যে আজ জয়ী হইবে সেই সফল হইবে (২০ : ৬২-৬৪)।
যাদুকরগণ যখন সারিবদ্ধ হইয়া দণ্ডায়মান হইল এবং মূসা ও ফিরআওন তাহাদের সম্মুখে দণ্ডায়মান হইলেন তখন তাহারা মূসা (আ)-কে বলিল, হে মূসা! হয় তুমি নিক্ষেপ কর অথবা প্রথমে আমরাই নিক্ষেপ করি। মূসা (আ) বলিলেন, বরং তোমরাই নিক্ষেপ কর। যাদুকরগণ তাহাদের রশি ও লাঠিসমূহ ছাড়িয়া দিল। তাহাদের যাদুর কারণে মনে হইতেছিল যে, উহা চলিতেছে। প্রকৃতপক্ষে তাহারা মানুষের চোখে যাদু করিয়াছিল। কুরআন কারীমে ইরশাদ হইয়াছে :
فَلَمَّا أَتَوا سَحَرُوا أَعْيُنَ النَّاسِ وَاسْتَرْهَبُوهُمْ وَجَامُوْ بِسِحْرٍ عَظِيمٍ (١١٦ : ٧) "যখন তাহারা নিক্ষেপ করিল তখন তাহারা লোকের চোখে যাদু করিল, তাহাদিগকে আতঙ্কিত করিল এবং তাহারা এক বড় রকমের যাদু দেখাইল" (৭ : ১১৬)
তাহারা যাদু দেখাইবার পূর্বে বলিয়াছিল : بعزة فرعون انا لنحن الغالبون "ফিরআওনের ইয্যতের শপথ! আমরাই বিজয়ী হইব" (২৬ : ৪৪)।
তাহাদের রশি ও লাঠিসমূহ বিরাটকায় পাহাড়ের মত সর্পরূপে দেখা গেল যাহাতে গোটা উপত্যকা পূর্ণ হইয়াছিল। একটির উপর দিয়া আর একটি যাইতেছিল। ইহা দেখিয়া মূসা (আ) মনে মনে এই ভাবিয়া ভীত হইয়া পড়িলেন যে, তিনি কিছু দেখাইবার পূর্বেই লোকজন তাহাদের যাদু দেখিয়া ফিতনায় পতিত হইতে পারে। তবে আল্লাহর নির্দেশ না হওয়া পর্যন্ত তিনি কিছুই করিতে পারেন না। তাই আল্লাহ তাআলা ওহী পাঠাইলেন :
لا تَخَفْ إِنَّكَ أَنْتَ الْأَعْلَى ، وَالْقِ مَا فِي يَمِينِكَ تَلْقَفْ مَا صَنَعُوا إِنَّمَا صَنَعُوا كَيْدُ سَاحِرٍ وَلَا يُفْلِحُ الساحر حيث أتى (٢٠ : ٦٨-٦٩)
"ভয় করিও না, তুমিই প্রবল, তোমার দক্ষিণ হস্তে যাহা আছে তাহা নিক্ষেপ কর। ইহা উহারা যাহা করিয়াছে তাহা গ্রাস করিয়া ফেলিবে। উহারা যাহা করিয়াছে তাহা তো কেবল যাদুকরদের কৌশল। যাদুকর যেথায়ই আসুক সফল হইবে না" (২০ : ৬৮-৬৯)।
মূসা (আ) তখন বলিলেন :
مَا جِئْتُمْ بِهِ السِّحْرَ إِنَّ اللَّهَ سَيُبْطِلُهُ إِنَّ اللَّهَ لَا يُصْلِحُ عَمَلَ المُفْسِدِينَ. وَيُحِقُّ اللَّهُ الْحَقِّ بِكَلِمَاتِهِ وَلَوْ كرة المُجْرِمُونَ (١٠ : ٨١-٨٢) “তোমরা যাহা আনিয়াছ তাহা যাদু, নিশ্চয়ই আল্লাহ উহাকে অসার করিয়া দিবেন। আল্লাহ অবশ্যই অশান্তি সৃষ্টিকারীদের কর্ম সার্থক করেন না। অপরাধী অপ্রীতিকর মনে করিলেও আল্লাহ তাহার বাণী অনুযায়ী সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করিবেন” (১০ : ৮১-৮২)।
এই বলিয়া তিনি স্বীয় লাঠি ছাড়িয়া দিলেন। তখন উহা বিরাটকায় পাহাড়ের মত হস্তপদ বিশিষ্ট এক সর্পের আকৃতি ধারণ করিল যাহার গর্দান ছিল বিরাট। উহা একটি একটি করিয়া যাদুকরদের সকল সর্প ধরিয়া গিলিয়া ফেলিল, একটিও আর অবশিষ্ট রহিল না। উহার এই ভয়ংকর রণমূর্তি দেখিয়া লোকজন ভয়ে দ্রুত পলায়ন করিতে লাগিল। সবগুলি গিলিয়া ফেলার পর মূসা (আ) উহাকে হাত দ্বারা ধরিতেই পূর্বের ন্যায় উহা লাঠিতে পরিণত হইল। যাদুকরগুণ ইহা দেখিয়া বিস্ময়ে হতবাক হইয়া গেল। তাহারা তাহাদের আয়ত্তকৃত জ্ঞানের দ্বারা বুঝিতে পারিল যে, ইহা কোন যাদুর আওতায় পড়ে না, কোনরূপ ভেল্কিবাজিও নহে, ইহা তাহাদের জ্ঞান বহির্ভূত বিষয়। তাহারা বুঝিতে পারিল যে, ইহা সত্য, মহা ক্ষমতাধর আল্লাহর নিকট হইতে প্রেরিত। কারণ যাদু হইলে তাহারা কখনো পরাস্ত হইত না। তাই তাহারা সেই সর্বশক্তিমানের উদ্দেশ্যে সিজদায় লুটাইয়া পড়িল এবং ঈমান আনয়ন করিল। তাহারা বলিল:
أَمَنَّا بِرَبِّ الْعَلَمِينَ . رَبِّ مُوسَى وَهُرُونَ . "আমরা ঈমান আনয়ন করিলাম জগতসমূহের প্রতিপালকের প্রতি, যিনি মূসা ও হারূনেরও প্রতিপালক" (২৬:৪৭-৪৮)।
এক বর্ণনামতে যাদুকরগণের সরদার ছিল অন্ধ। তাহার সঙ্গীবৃন্দ তাহাকে বলিল, মূসার লাঠি বিশাল অজগরের আকার ধারণ করিয়াছে এবং আমাদের রশি ও লাঠিসমূহ দ্বারা সৃষ্টি সর্পগুলিকে গিলিয়া ফেলিতেছে। সে তাহাদিগকে বলিল, উক্ত রশি ও লাঠিসমূহকে কোন চিহ্নও নাই? উহা কি পূর্বাবস্থায় ফিরিয়া আসিতেছে না? তাহারা বলিল, না। সরদার বলিল, তবে ইহা যাদু নহে। ইহা বলিয়া সে সিজদায় লুটাইয়া পড়িল। অন্যান্য সকল যাদুকরও তাহার অনুসরণ করিয়া সিজদায় পড়িয়া গেল এবং সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়ন করিল।
সাঈদ ইব্‌ন জুবায়র, ইকরিমা, কাসিম ইব্‌ন আবী বুরদা ও আওযাঈ প্রমুখের বর্ণনামতে যাদুকরগণ যখন সিজদায় লুটাইয়া পড়িল তখন জান্নাতে তাহাদের আবাসস্থল প্রাসাদ ও অট্টালিকাসমূহ দেখিতে পাইল। তাহাদের আগমনের জন্য সেইগুলিকে সুসজ্জিত করা হইয়াছিল। এইজন্যই তাহারা পরবর্তীতে প্রদত্ত ফিরআওনের হুমকি-ধমকিতে কর্ণপাত করে নাই এবং তাহার শাস্তির প্রতি ভ্রুক্ষেপ করে নাই। ফিরআউন যাদুকরগণের এই অবস্থা দেখিয়া বিচলিত হইয়া পড়িল। কারণ ইহাতে জনগণের মধ্যে মূসা ও হারুন (আ)-এর ইতিবাচক প্রভাব পড়িবে-সন্দেহ নাই। ফলে সে ক্রোধে অন্ধ হইয়া গেল। তাহার জ্ঞানচক্ষুর দৃষ্টিশক্তি লোপ পাইল। সে জনগণকে আল্লাহ্র রাস্তা হইতে ফিরাইবার জন্য ষড়যন্ত্র ও কূট-কৌশলের আশ্রয় গ্রহণ করিল। সে জনগণের সম্মুখে যাদুকরগণকে সম্বোধন করিয়া বলিল:
أَمَنْتُمْ لَهُ قَبْلَ أَنْ آذَنَ لَكُمْ إِنَّهُ لَكَبِيرُكُمُ الَّذِي عَلَّمَكُمُ السِّحْرَ فَلَا قَطِعَنَّ أَيْدِيَكُمْ وَأَرْجُلَكُمْ مِّنْ خِلافٍ وَلَا صَلِّبَنَّكُمْ فِي جُزُوعِ النَّخْلِ وَلَتَعْلَمُنَّ أَيُّنَا أَشَدُّ عَذَابًا وَأَبْقَى (۷۱ : ۲۰) “কী, আমি তোমাদিগকে অনুমতি দেওয়ার পূর্বেই তোমরা মূসাতে বিশ্বাস স্থাপন করিলে? দেখিতেছি, সে তো তোমাদের প্রধান, সে তোমাদিগকে যাদু শিক্ষা দিয়াছে। সুতরাং আমি তো তোমাদের হস্ত-পদ বিপরীত দিক হইতে কর্তন করিবই; আমি তোমাদিগকে খর্জুর বৃক্ষের কাণ্ডে শূলবিদ্ধ করিবই এবং তোমরা অবশ্যই জানিতে পারিবে আমাদের মধ্যে কাহার শাস্তি কঠোরতর ও অধিক স্থায়ী” (২০: ৭১)।
অন্য আয়াতে বর্ণিত হইয়াছে যে, ফিরআওন ইহাকে একটি চক্রান্ত হিসাবে অভিহিত করিয়া বলে: أَمَنْتُمْ بِهِ قَبْلَ أَنْ اذَنَ لَكُمْ إِنَّ هَذَا لَمَكْرُ مُكِرْتُمُوهُ فِي الْمَدِينَةِ لِتُخْرِجُوا مِنْهَا أَهْلَهَا فَسَوْفَ تَعْلَمُونَ “কি, আমি তোমাদিগকে অনুমতি দেওয়ার পূর্বেই তোমরা উহাতে বিশ্বাস করিলে? ইহা তো এক চক্রান্ত, তোমরা এই চক্রান্ত করিয়াছ নগরবাসীদিগকে উহা হইতে বহিষ্কারের জন্য। আচ্ছা, তোমরা শীঘ্রই ইহার পরিণাম জানিবে” (৭: ১২৩)।
অতঃপর পূর্বে বর্ণিত আয়াতের ন্যায় শূলবিদ্ধ করার কথা বলে। তাহার এই উক্তি যে কত বড় অপবাদ ও নির্জলা মিথ্যা, সত্যের কত বড় অপলাপ তাহা বুদ্ধিমান ব্যক্তি তো বটেই, শিশুদের নিকটও স্পষ্ট। কারণ উক্ত রাজ্যের সকলেই জানিত যে, যাদুকরগণ মূসা (আ)-কে ইতোপূর্বে কোন দিন দেখেই নাই। তাই কিভাবে তিনি তাহাদের যাদু বিদ্যার শিক্ষাগুরু হইবেন? তিনি তাহাদিগকে একত্র করেন নাই এবং তাহাদের একত্র হওয়ার কথা জানেনও না। ফিরআওন তাহাদিগকে রাজ্যের দূর-দূরান্ত হইতে বিভিন্ন শহর-নগর হইতে খবর দিয়া আনিয়াছে। ফিরআওনের মর্মন্তুদ শাস্তি প্রদানের হুমকি শুনিয়া তাহারা বলিল:
لَنْ نُؤْثِرَكَ عَلَى مَا جَاءَنَا مِنَ الْبَيِّنَاتِ وَالَّذِي فَطَرَنَا فَاقْضِ مَا أَنْتَ قَاضٍ إِنَّمَا تَقْضِي هَذِهِ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا إِنَّا أَمَنَّا بِرَبِّنَا لِيَغْفِرَ لَنَا خَطَايَانَا وَمَا أَكْرَهْتَنَا عَلَيْهِ مِنَ السِّحْرِ وَاللَّهُ خَيْرٌ وَأَبْقَى (২০: ৭২-৭৩)।
“আমাদের নিকট যে স্পষ্ট নিদর্শন আসিয়াছে তাহার উপর এবং যিনি আমাদিগকে সৃষ্টি করিয়াছেন তাঁহার উপর তোমাকে আমরা কিছুতেই প্রাধান্য দিব না। সুতরাং তুমি কর যাহা করিতে চাহ। তুমি তো কেবল এই পার্থিব জীবনের উপর কর্তৃত্ব করিতে পার। আমরা নিশ্চয়ই আমাদের প্রতিপালকের প্রতি ঈমান আনিয়াছি, যাহাতে তিনি ক্ষমা করেন আমাদের অপরাধ এবং তুমি আমাদিগকে যেই যাদু করিতে বাধ্য করিয়াছ তাহা। আর আল্লাহ শ্রেষ্ঠ ও স্থায়ী” (২০: ৭২-৭৩)।
অন্যত্র বর্ণিত হইয়াছে যে, তাহারা বলিল:
إِنَّا إِلَى رَبِّنَا مُنْقَلِبُونَ وَمَا تَنْقِمُ مِنَّا إِلَّا أَنْ أَمَنَّا بِآيَاتِ رَبِّنَا لَمَّا جَاءَتْنَا رَبَّنَا أَفْرِغْ عَلَيْنَا صَبْرًا وَتَوَفَّنَا مُسْلِمِينَ (৭: ১২৫-১২৬)।
"আমরা নিশ্চয় আমাদের প্রতিপালকের নিকট প্রত্যাবর্তন করিব। তুমি তো আমাদিগকে শাস্তি দান করিতেছ এইজন্য যে, আমরা আমাদের প্রতিপালকের নিদর্শনে বিশ্বাস করিয়াছি যখন উহা আমাদের নিকট আসিয়াছে। হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদিগকে ধৈর্য দান কর এবং আত্মসমর্পণকারীরূপে আমাদের মৃত্যু ঘটাও” (৭: ১২৫-১২৬)।
ফিরআওন এইসবের প্রতি কর্ণপাত করিল না। সে তাহার গোমরাহী ও কুফরীর প্রতি অটল রহিল এবং তাহার বর্ণিত পন্থায় শাস্তি দিয়া উহাদিগকে শহীদ করিয়া দিল। তাই আবদুল্লাহ ইব্‌ আব্বাস ও উবায়দ ইবন উমায়র বলেন, তাহারা দিবসের প্রথমভাগে ছিল যাদুকর কাফির এবং শেষভাগে হইল নেক্কার ও সৌভাগ্যবান শহীদ।
পরাজিত হইয়া যাদুকরদের ঈমান আনয়নের পরও ফিরআওন তাহার কুফরীতে অটল রহিল। তাহার পারিষদবর্গও তাহাকে কুপরামর্শ দিতে লাগিল এবং বিপথে চলিবার জন্য প্ররোচিত করিতে লাগিল। তাহারা মূসা (আ) ও তাঁহার সম্প্রদায়কে শান্তি দেওয়ার পরামর্শ দিতে লাগিল। কুরআন কারীমে তাহার সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছে: وَقَالَ الْمَلَاءُ مِنْ قَوْمِ فِرْعَوْنَ أَتَذَرُ مُوسَى وَقَوْمَهُ لِيُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ وَيَذَرَكَ وَأَلِهَتَكَ . "ফিরআওন সম্প্রদায়ের প্রধানগণ বলিল, আপনি কি মূসাকে ও তাহার সম্প্রদায়কে রাজ্যে বিপর্যয় সৃষ্টি করিতে এবং আপনাকে ও আপনার দেবতাগণকে বর্জন করিতে দেবেন"? ফিরআওন ইহার উত্তরে বলিল: سَنُقَتِلُ أَبْنَانَهُمْ وَنَسْتَحْيِي نِسَاءَهُمْ وَإِنَّا فَوْقَهُمْ قَاهِرُونَ (۱۲۷ (۷)
“আমরা তাহাদের পুত্রদিগকে হত্যা করিব এবং তাহাদের নারীদিগকে জীবিত রাখিব, আর আমরা তো তাহাদের উপর প্রবল” (৭: ১২৭)।
এই সিদ্ধান্ত ছিল মূসা (আ)-এর নবুওয়াতের পর যেমনভাবে সিদ্ধান্ত লওয়া হইয়াছিল তাঁহার জন্মের পূর্বে। বনূ ইসরাঈলদিগকে অপদস্ত করিবার জন্য এবং তাহারা যাহাতে সংখ্যায় বাড়িয়া গিয়া বিপদের কারণ না হয় এইজন্য নবুওয়াতের পরও এই সিদ্ধান্ত লওয়া হয়। ইহাতে মূসা (আ)-এর সম্প্রদায় তাহার নিকট অভিযোগ করিয়া বলিয়াছিল: أوذِيْنَا مِنْ قَبْلِ أَنْ تَأْتِيَنَا وَمِنْ بَعْدِ مَا جِئْتَنَا "আমাদের নিকট তোমার আসিবার পূর্বেও আমরা নির্যাতিত হইয়াছি এবং তোমার আসিবার পরেও” (৭: ১২৯)।
মূসা (আ) তাহাদিগকে সান্ত্বনা ও উপদেশ দিয়া বলিলেনঃ عَسَى رَبُّكُمْ أَنْ يُهْلِكَ عَدُوكُمْ وَيَسْتَخْلِفَكُمْ فِي الْأَرْضِ فَيَنْظُرَ كَيْفَ تَعْمَلُوْنَ. (۱۲۹ : ۷) "শীঘ্রই তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের শত্রুকে ধ্বংস করিবেন এবং তিনি তোমাদিগকে যমীনে তাহাদের স্থলাভিষিক্ত করিবেন, অতঃপর তোমরা কী কর তাহা তিনি লক্ষ্য করিবেন" (৭:১২৯)।

টিকাঃ
কাসাসুল কুরআন, ১খ, ৩৯৫
পবিত্র বাইবেল, যাত্রাপুস্তক ৪৪৪ ২৭-৩১
আল-কামিল, ১খ, ১৩৮
আল-বিদায়া, ১খ, ২৫১; আত-তাবারী, তারীখ, ১খ, ৪০৬; আল-কামিল, ১খ, ১৩৯
আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ২৫১; আত-তাবারী, তারীখ, ১খ, ৪০৬; আল-কামিল, ১খ, ১৩৯
আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ২৫৫; আত-তাবারী, তারীখ, ১খ, ৪০৮
আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ২৫৬-২৫৭
আল-কামিল, ১খ, ১৪০
আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ২৫৬
আল-কামিল, ১খ, ১৪১
আল-কামিল, ১খ, ১৪১
আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ২৫৮; আল-কামিল, ১খ, ১৪১

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ফিরআওন পরিবারের এক মু'মিন ব্যক্তির উপদেশ

📄 ফিরআওন পরিবারের এক মু'মিন ব্যক্তির উপদেশ


ফিরআওনের সম্প্রদায় ও তাহার দরবারের এক ব্যক্তি মূসা (আ)-এর উপর তাঁহার দাওয়াত ও তাবলীগে প্রভাবান্বিত হইয়া এবং তাঁহার মুজিয়া দেখিয়া ঈমাম আনিয়াছিল, কিন্তু ফিরআওনের ভয়ে তাহা গোপন রাখিয়াছিল। ইব্‌ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত যে, ফিরআওন সম্প্রদায়ের তিন ব্যক্তি মূসা (আ)-এর উপর ঈমান আনয়ন করিয়াছিল : (১) এই ঈমানদার ব্যক্তি, যাহার কথা একটু পরই আলোচনা করা হইতেছে; (২) আর একজন হইলেন ফিরআওনের স্ত্রী আসিয়া এবং (৩) অপরজন হইলেন সেই ব্যক্তি যে, মূসা (আ) কর্তৃক কিবতী হত্যার পর শহরের প্রান্ত হইতে দ্রুত আসিয়া মূসা (আ) কে জানাইয়াছিলেন যে, ফিরআওন ও তাহার পারিষদবর্গ তাঁহাকে হত্যার পরামর্শ করিতেছে। সুতরাং তিনি যেন অতি দ্রুত শহর হইতে বাহির হইয়া যান। ফিরআওন মূসা (আ)-কে হত্যার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে। তখন ফিরআওন পরিবারের উক্ত ঈমানদার লোকটি মূসা (আ)-এর প্রতি দয়াপরবশ হইয়া পরামর্শস্বরূপ ফিরআওন ও তাহার পারিষদবর্গের নিকট সত্য কথা তুলিয়া ধরিলেন। এই প্রসঙ্গে কুরআন কারীমে ইরশাদ হইয়াছে:
وَقَالَ رَجُلٌ مُّؤْمِنٌ مِّنْ آلِ فِرْعَوْنَ يَكْتُمُ إِيْمَانَهُ أَتَقْتُلُونَ رَجُلاً أَنْ يَقُولَ رَبِّيَ اللَّهُ وَقَدْ جَاءَكُمْ بِالْبَيِّنَاتِ مِنْ رَبِّكُمْ وَإِنْ يَكُ كَاذِبًا فَعَلَيْهِ كَذِبُهُ وَإِنْ يَكُ صَادِقًا يُصِبْكُمْ بَعْضُ الَّذِي يَعِدُكُمْ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي مَنْ هُوَ مُسْرِفٌ كَذَّابٌ . يَا قَوْمِ لَكُمُ الْمُلْكُ الْيَوْمَ ظَاهِرِينَ فِي الْأَرْضِ فَمَنْ يَنْصُرُنَا مِنْ بَأْسِ اللَّهِ إِنْ جَاءَنَا .(٤٠ : ۲۸-۲۹)
"ফিরআওন বংশের এক ব্যক্তি, যে মুমিন ছিল এবং নিজ ঈমান গোপন রাখিত, বলিল, 'তোমরা কি এক ব্যক্তিকে এইজন্য হত্যা করিবে যে, সে বলে, আমার প্রতিপালক আল্লাহ্! অথচ সে তোমাদের প্রতিপালকের নিকট হইতে সুস্পষ্ট প্রমাণসহ তোমাদের নিকট আসিয়াছে। সে মিথ্যাবাদী হইলে তাহার মিথ্যাবাদিতার জন্য সে দায়ী হইবে। আর যদি সে সত্যবাদী হয়, তবে সে তোমাদিগকে যে শাস্তির কথা বলে তাহার কিছু তো তোমাদের উপর আপতিত হইবেই। আল্লাহ সীমালংঘনকারী ও মিথ্যাবাদীকে সৎপথে পরিচালিত করেন না। হে আমার সম্প্রদায়! আজ কর্তৃত্বে তোমাদের দেশে তোমরাই প্রবল; কিন্তু আমাদের উপর আল্লাহর শাস্তি আসিয়া পড়িলে কে আমাদিগকে সাহায্য করিবে" (৪০ : ২৮-২৯)?
লোকটির সঠিক পরিচয় সম্পর্কে কিছুটা মতভেদ পরিলক্ষিত হয়। এক বর্ণনামতে লোকটি ছিল ফিরআওনের চাচাতো ভাই। এক বর্ণনাতে তাহার নাম ছিল হিযকীল। মতান্তরে হিযরাক। কাহারও কাহারও ধারণামতে তিনি ইসরাঈল বংশীয় ছিলেন, কিন্তু ইহা অযৌক্তিক এবং কুরআন কারীমের বর্ণনার সহিতও অসংগতিপূর্ণ। দারা কুতনীর বর্ণনামতে তাহার নাম ছিল শামআন। তারীখুত তাবারানীতে তাঁহার নাম খায়র বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে। ফিরআওন নিশ্চিত জানিত যে, মূসা (আ) আল্লাহর পক্ষ হইতে যাহা আনয়ন করিয়াছেন তাহাই সঠিক। কিন্তু শত্রুতা, অবাধ্যতা ও কুফরীবশত সে উহার বিরোধিতা করিত যাহা পূর্বেই উল্লেখ করা হইয়াছে। তাই গোয়ার্তুমি বশত মিথ্যা কথাই সে বলিল :
مَا أُرِيكُمْ إِلا مَا أَرَى وَمَا أَهْدِيكُمْ إِلَّا سَبِيلَ الرِّشَادِ (٢٩ : ٤٠) "আমি যাহা বুঝি, আমি তোমাদিগকে তাহাই বলিতেছি। তোমাদিগকে কেবল সৎপথই দেখাইয়া থাকি" (৪০ : ২৯)।
ইহা ছিল তাহার সম্পূর্ণ মিথ্যাচার। কারণ সে নিজেই সঠিক পথে ছিল না; বরং সে গোমরাহীতে ডুবিয়াছিল এবং তাহার সম্প্রদায়কে পথভ্রষ্ট করিয়াছিল। তাই তাহারা তাহার আনুগত্য করিত, তাহার উপাসনা করিত এবং সে যে তাহাদের প্রতিপালক বলিয়া দাবি করিয়াছিল উহা সত্য বলিয়া বিশ্বাস করিত। ফিরআওন তাহার সম্প্রদায়কে তাহার প্রতিপালক হওয়ার কথা বিশ্বাস করাইবার জন্য বিভিন্ন অলীক যুক্তি প্রদর্শন করে এবং তাহার সম্প্রদায়ও উহা মানিয়া লইয়া তাহার আনুগত্য করে। ইহাই আল্লাহ তাআলা কুরআন কারীমে ইরশাদ করেন:
وَنَادَى فِرْعَوْنُ فِي قَوْمِهِ قَالَ يَا قَوْمِ أَلَيْسَ لِى مُلْكُ مِصْرَ وَهَذِهِ الْأَنْهَارُ تَجْرِى مِنْ تَحْتِي أَفَلَا تُبْصِرُونَ . أَمْ أَنَا خَيْرٌ مِّنْ هَذَا الَّذِي هُوَ مَهِينٌ وَلا يَكَادُ يُبِينُ. فَلَوْلَا أُلْقِيَ عَلَيْهِ أَسْوِرَةٌ مِنْ ذَهَبٍ أَوْ جَاءَ مَعَهُ الْمَلَائِكَةُ مُقْتَرِنِينَ . فَاسْتَخَفْ قَوْمَهُ فَأَطَاعُوهُ إِنَّهُمْ كَانُوا قَوْمًا فَاسِقِينَ. (٥٤-٥١ : ٤٣)
"ফিরআওন তাহার সম্প্রদায়ের মধ্যে এই বলিয়া ঘোষণা করিল, হে আমার সম্প্রদায়! মিসর রাজ্য কি আমার নহে? আর এই নদীগুলি আমার পাদদেশে প্রবাহিত; তোমরা ইহা দেখ না? আমি তো শ্রেষ্ঠ এই ব্যক্তি হইতে যে হীন এবং স্পষ্টভাবে কথা বলিতেও অক্ষম! মূসাকে কেন দেওয়া হইল না স্বর্ণ-বলয় অথবা তাহার সঙ্গে কেন আসিল না ফেরেশতাগণ দলবদ্ধভাবে? এইভাবে সে তাহার সম্প্রদায়কে হতবুদ্ধি করিয়া দিল, ফলে উহারা তাহার কথা মানিয়া লইল। উহারা তো ছিল এক সত্যত্যাগী সম্প্রদায়" (৪৩ : ৫১-৫৪)।
মুমিন ব্যক্তিটি ফিরআওনের দাবি ও কীর্তিকলাপ দেখিয়া বলিল:
يَا قَوْمِ إِنِّي أَخَافُ عَلَيْكُمْ مِثْلَ يَوْمِ الْأَحْزَابِ . مِثْلَ دَابِ قَوْمٍ نُوحٍ وَعَادٍ وَثَمُودَ وَالَّذِينَ مِنْ بَعْدِهِمْ وَمَا اللَّهُ يُرِيدُ ظُلْمًا لِلْعِبَادِ، وَيَا قَوْمِ إِنِّي أَخَافُ عَلَيْكُمْ يَوْمَ التَّنَادِ . يَوْمَ تُوَلُّوْنَ مُدْبِرِيْنَ مَا لَكُمْ مِنَ اللَّهِ مِنْ عَاصِمٍ وَمَنْ يُضْلِلِ اللَّهُ فَمَا لَهُ مِنْ هَادٍ : وَلَقَدْ جَاءَكُمْ يُوسُفُ مِنْ قَبْلُ بِالبَيِّنَاتِ فَمَا زِلْتُمْ فِي شَكٍّ مِّمَّا جَاءَكُمْ بِهِ حَتَّى إِذَا هَلَكَ قُلْتُمْ لَنْ يُبْعَثَ اللَّهُ مِنْ بَعْدِهِ رَسُولاً كَذَلِكَ يُضِلُّ اللهُ مَنْ هُوَ مُسْرِفٌ مُرْتَابُ الَّذِينَ يُجَادِلُونَ فِي آيَاتِ اللَّهِ بِغَيْرِ سُلْطَانٍ آتَاهُمْ كَبُرَ مَقْتًا عِنْدَ اللَّهِ وَعِنْدَ الَّذِينَ آمَنُوا كَذَلِكَ يَطْبَعُ اللَّهُ عَلَى كُلِّ قَلْبِ مُتَكَبِّرٍ جَبَّارٍ . ( ٣٥ - ٣٠ : ٤٠ )
"হে আমার সম্প্রদায়! আমি তোমাদের জন্য পূর্ববর্তী সম্প্রদায়সমূহের শাস্তির দিনের অনুরূপ দুর্দিনের আশংকা করি, যেমন ঘটিয়াছিল নূহ, আদ, ছামূদ এবং তাহাদের পরবর্তীদের ক্ষেত্রে। আল্লাহতো বান্দাদের প্রতি কোন জুলুম করিতে চাহেন না। হে আমার সম্প্রদায়! আমি তোমাদের জন্য আশংকা করি কিয়ামত দিবসের যেদিন তোমরা পশ্চাত ফিরিয়া পলায়ন করিতে চাহিবে, আল্লাহর শাস্তি হইতে তোমাদিগকে রক্ষা করিবার কেহ থাকিবে না। আল্লাহ যাহাকে পথভ্রষ্ট করেন তাহার জন্য কোন পথপ্রদর্শক নাই। পূর্বেও তোমাদের নিকট ইউসুফ আসিয়াছিল স্পষ্ট নিদর্শনসহ, কিন্তু সে যাহা লইয়া আসিয়াছিল তোমরা তাহাতে বারবার সন্দেহ পোষণ করিতে। পরিশেষে যখন ইউসুফের মুত্যু হইল তখন তোমরা বলিয়াছিলে, তাহার পরে আল্লাহ আর কাহাকেও রাসূল করিয়া প্রেরণ করিবেন না। এইভাবে আল্লাহ বিভ্রান্ত করেন সীমালংঘনকারী ও সংশয়বাদীদিগকে—যাহারা নিজদের নিকট কোন দলীল-প্রমাণ না থাকিলেও আল্লাহর নিদর্শন সম্পর্কে বিতণ্ডায় লিপ্ত হয়। তাহাদের এই কর্ম আল্লাহ ও মুমিনদের দৃষ্টিতে অতিশয় ঘৃণার্হ। এইভাবে আল্লাহ প্রত্যেক উদ্ধত ও স্বৈরাচারী ব্যক্তির হৃদয়কে মোহর করিয়া দেন" (৪০: ৩০-৩৫)।
ফিরআওন বারবার আল্লাহ্ আলোচনা শুনিয়া হিদায়াত কবুল তো করিলই না, বরং একের পর এক বিরোধিতা ও যড়যন্ত্র করিতে লাগিল। সে তাহার পারিষদবর্গকে লক্ষ্য করিয়া বলিল, "হে আমার পারিষদবর্গ! আমি ব্যতীত তোমাদের অন্য কোন ইলাহ আছে বলিয়া জানি না" (২৮: ৩৮)। অবশ্য মূসা তাহার ইলাহের যে সকল উচ্চ মানের বিশেষণের কথা বলিতেছে উহাতে মনে হয় তিনি আকাশে আছেন। সে মন্ত্রী হামানকে নির্দেশ দিল সুউচ্চ একটি প্রাসাদ নির্মাণ করিতে যাহাতে উহাতে চড়িয়া সে মূসার ইলাহকে দেখিতে পারে, যদি বাস্তবে সে থাকে মূসার দাবি অনুযায়ী। তবে আমি মনে করি সে মিথ্যবাদী।
ফিরআওন একটু পূর্বে বলিয়াছিল, 'আমি তোমাদিগকে কেবল সৎপথই দেখাইয়া থাকি। মুমিন ব্যক্তিটি তাহার বক্তব্যে এই দিকে ইঙ্গিত করিলেন যে, سَبِيلَ الرشاد অর্থাৎ সৎপথ ও কল্যাণের পথ উহা নহে যাহা ফিরআওন বলিয়াছে, বরং আমি যাহা বলিতেছি তাহাই। সুতরাং তোমরা যদি নাজাত ও কল্যাণের প্রত্যাশী হও তাহা হইলে এই পথ অবলম্বন কর।
ফিরআওনের সম্প্রদায় তাহাদেরই এক সম্মানিত ব্যক্তির মুখে এই জাতীয় কথা শুনিয়া অবাক হইয়া গেল। তাহারা প্রচেষ্টা চালাইতে লাগিল তাহাকে বাপ-দাদার পথে ফিরাইয়া আনার জন্য। এই কারণেই মুমিন ব্যক্তিটির বক্তব্যে এই দিকেও ইঙ্গিত করিলেন এবং বলিলেন যে, কী অদ্ভূত কথা! আমি তোমাদের শুভাকাঙ্খী, তোমাদিগকে হিদায়াত ও নাজাতের রাস্তা দেখাইতেছি। আর তোমরা চাহিতেছ আমি ভ্রান্ত পথে চলিয়া জাহান্নামে প্রবেশ করি। মুমিন ব্যক্তি আরো বলিলেন:
يَا قَوْمِ إِنِّي أَخَافُ عَلَيْكُمْ مِثْلَ يَوْمِ الْأَحْزَابِ . مِثْلَ دَابِ قَوْمٍ نُوحٍ وَعَادٍ وَثَمُودَ وَالَّذِينَ مِنْ بَعْدِهِمْ وَمَا اللَّهُ يُرِيدُ ظُلْمًا لِلْعِبَادِ، وَيَا قَوْمِ إِنِّي أَخَافُ عَلَيْكُمْ يَوْمَ التَّنَادِ . يَوْمَ تُوَلُّوْنَ مُدْبِرِيْنَ مَا لَكُمْ مِنَ اللَّهِ مِنْ عَاصِمٍ وَمَنْ يُضْلِلِ اللَّهُ فَمَا لَهُ مِنْ هَادٍ : وَلَقَدْ جَاءَكُمْ يُوسُفُ مِنْ قَبْلُ بِالبَيِّنَاتِ فَمَا زِلْتُمْ فِي شَكٍّ مِمَّا جَاءَكُمْ بِهِ حَتَّى إِذَا هَلَكَ قُلْتُمْ لَنْ يُبْعَثَ اللَّهُ مِنْ بَعْدِهِ رَسُولاً كَذَلِكَ يُضِلُّ اللهُ مَنْ هُوَ مُسْرِفٌ مُرْتَابُ الَّذِينَ يُجَادِلُونَ فِي آيَاتِ اللَّهِ بِغَيْرِ سُلْطَانٍ آتَاهُمْ كَبُرَ مَقْتًا عِنْدَ اللَّهِ وَعِنْدَ الَّذِينَ آمَنُوا كَذَلِكَ يَطْبَعُ اللَّهُ عَلَى كُلِّ قَلْبِ مُتَكَبِّرٍ جَبَّارٍ . ( ٣٥ - ٣٠ : ٤٠ )
"হে আমার সম্প্রদায়! আমি তোমাদের জন্য পূর্ববর্তী সম্প্রদায়সমূহের শাস্তির দিনের অনুরূপ দুর্দিনের আশংকা করি, যেমন ঘটিয়াছিল নূহ, আদ, ছামূদ এবং তাহাদের পরবর্তীদের ক্ষেত্রে। আল্লাহতো বান্দাদের প্রতি কোন জুলুম করিতে চাহেন না। হে আমার সম্প্রদায়! আমি তোমাদের জন্য আশংকা করি কিয়ামত দিবসের যেদিন তোমরা পশ্চাত ফিরিয়া পলায়ন করিতে চাহিবে, আল্লাহর শাস্তি হইতে তোমাদিগকে রক্ষা করিবার কেহ থাকিবে না। আল্লাহ যাহাকে পথভ্রষ্ট করেন তাহার জন্য কোন পথপ্রদর্শক নাই। পূর্বেও তোমাদের নিকট ইউসুফ আসিয়াছিল স্পষ্ট নিদর্শনসহ, কিন্তু সে যাহা লইয়া আসিয়াছিল তোমরা তাহাতে বারবার সন্দেহ পোষণ করিতে। পরিশেষে যখন ইউসুফের মুত্যু হইল তখন তোমরা বলিয়াছিলে, তাহার পরে আল্লাহ আর কাহাকেও রাসূল করিয়া প্রেরণ করিবেন না। এইভাবে আল্লাহ বিভ্রান্ত করেন সীমালংঘনকারী ও সংশয়বাদীদিগকে—যাহারা নিজদের নিকট কোন দলীল-প্রমাণ না থাকিলেও আল্লাহর নিদর্শন সম্পর্কে বিতণ্ডায় লিপ্ত হয়। তাহাদের এই কর্ম আল্লাহ ও মুমিনদের দৃষ্টিতে অতিশয় ঘৃণার্হ। এইভাবে আল্লাহ প্রত্যেক উদ্ধত ও স্বৈরাচারী ব্যক্তির হৃদয়কে মোহর করিয়া দেন" (৪০: ৩০-৩৫)।
একজন সাচ্চা ঈমানদার হিসাবে তিনি তাহার ঈমানী দায়িত্ব পূর্ণরূপে আদায় করার চেষ্টা করেন। জুলুম-নিপীড়নের প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করিয়া সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর উপর ভরসা করিয়া দীনের দাওয়াত পেশ করেন।
এই মুমিন ব্যক্তিটির কিছু পরিচয় পূর্বে উল্লিখিত হইয়াছে। এক বর্ণনামতে তিনি হইলেন সেই কাঠমিস্ত্রী যিনি মূসার জন্মের পর নীল নদে ভাসাইয়া দেওয়ার জন্য বাক্স প্রস্তুত করিয়া দিয়াছিলেন। তিনি মূসা (আ)-কে যাদুকরদের উপর বিজয়ী হইতে দেখিয়া তাহার ঈমানের কথা প্রকাশ করেন। কাহারও মতে তিনি ইহার পূর্বেই তাহার ঈমানের কথা প্রকাশ করিয়াছিলেন। অতঃপর ফিরআওন মূসা (আ)-কে হত্যার সংকল্প করিলে তিনি তাহাকে উক্ত নসীহত করেন। অতঃপর তিনি স্বীয় ঈমানের কথা প্রকাশ করিয়া দিলে ফিরআওন তাহাকে যাদুকরদের সঙ্গেই শূলে বিদ্ধ করিয়া হত্যা করে। ফলে তিনি শহীদের মর্যাদা লাভ করিয়া জান্নাতবাসী হন।
এক বর্ণনামতে ফিরআওনও তাহার সম্প্রদায়ের উৎপীড়ন ও নিপীড়ন হইতে আল্লাহ তাহাকে বিশেষ ব্যবস্থায় হিফাযত করেন। অবশেষে মূসা (আ) ও বানু ইসরাঈলদের সঙ্গে তিনিও নিরাপদে ও নির্বিঘ্নে মিসর ত্যাগ করেন। তবে এই মতটি দুর্বল। কারণ মূসা (আ)-এর নেতৃত্বে বানু ইসরাঈলের লোক ব্যতীত অন্য কেহ মিসর ত্যাগ করিয়াছিল বলিয়া কোন বর্ণনা পাওয়া যায় না।
এক বর্ণনামতে উক্ত মুমিন ব্যক্তিটির স্ত্রীও ঈমান আনয়ন করিয়াছিলেন এবং স্ত্রী ও ঈমান গোপন রাখিয়াছিল। তিনি ছিলেন ফিরআওন কন্যার কেশ বিন্যাসকারিণী। একদিন চুল আচড়াইবার সময় তাহার হাত হইতে চিরুনী পড়িয়া গেল। তিনি বিসমিল্লাহ বলিয়া উহা তুলিয়া লইলেন। ফিরআওন কন্যা তখন বলিল, আমার পিতার নামে? মহিলাটি বলিলেন না, বরং যিনি আমার প্রতিপালক, তোমার প্রতিপালক এবং তোমার পিতার প্রতিপালক তাহার নামে। কন্যাটি তাহার পিতা ফিরআওনকে এই ঘটনা বলিয়া দিল। ফিরআওন মহিলাটিকে ও তাহার সন্তানদিগকে ডাকাইল এবং তাহাকে জিজ্ঞাসা করিল, তোমার প্রতিপালক কে? তিনি বলিলেন, আমার ও আপনার প্রতিপালক আল্লাহ। তখন ফিরআওন একটি চুল্লিতে অগ্নি প্রজ্জ্বলিত করিয়া তাহাকে ও তাহার সন্তানগণকে দগ্ধীভূত করিবার নির্দেশ দিল। মহিলাটি ফিরআওনকে বলিল, আপনার নিকট আমার একটি আবেদন রহিয়াছে। ফিরআওন বলিল, তাহা কি? মহিলাটি বলিল, আমার ও আমার সন্তানগণের হাড় একত্র করিয়া দাফন করিবেন। ফিরআওন তাহার এ আবেদন মঞ্জুর করিল। প্রথমে ফিরআওন তাহার সন্তানদিগকে তাহার সম্মুখে অগ্নিতে ফেলিবার নির্দেশ দিল। অতঃপর একজন একজন করিয়া তাহাদিগকে চুল্লিতে নিক্ষেপ করা হইল। তাহার শেষ সন্তানটি ছিল ছোট্ট শিশু। সে বলিয়া উঠিল:
اصبري يا أماه فأنك على الحق .
"হে আম্মাজান! আপনি ধৈর্যধারণ করুন। নিঃসন্দেহে আপনি সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত"। তারপর এই ছোট্ট দুধের শিশুটিসহ তাহাকে চুল্লিতে নিক্ষেপ করা হইল। রাবী বলেন, যাহারা মায়ের কোলে কথা বলিয়াছিলেন তাহাদের সম্বন্ধে ইবন আব্বাস (রা) কে জিজ্ঞাসা করা হইয়াছিল। ইবন আব্বাস (রা) উত্তর করিলেন, "মায়ের কোলে থাকাকালীন চারজন শিশু কথা বলিয়াছিল, ঈসা ইবন মারয়াম, ইউসুফ (আ)-এর পক্ষে সাক্ষ্যদানকারী শিশুটি, জুরায়জ-এর সঙ্গী শিশুটি এবং এই শিশুটি।

টিকাঃ
আম্বিয়া-ই কুরআন, ২খ, ১৭২; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ২৬০
আল-কামিল, ১খ, ১৪০
আত-তাবারী, তারীখ, ১খ, ৪০৭
ইব্‌ন কাছীর, প্রাগুক্ত
ইব্‌ন কাছীর, প্রাগুক্ত
আত-তাবারী, তারীখ, ১খ, ৪১১-৪০২; আল- মুনতাজাম, ১খ, ৩৪৫
আম্বিয়া-ই কুরআন, ২খ, ১৭৫-১৭৬
আম্বিয়া-ই কুরআন, ২খ, ১৭৫-১৭৬
আল-কামিল, ১খ, ১৪১
আম্বিয়া-ই কুরআন, ২খ, ১৭৭
আল-কামিল, ১খ, ১৪১; আল-মুনতাজাম ফী তারীখিল উমাম, ১খ, ৩৪৬-৩৪৭

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00