📄 নবুওয়াত প্রাপ্তি
হযরত মূসা (আ)-কে প্রকৃতপক্ষে এই সময়েই আল্লাহ তাআলা সর্বোচ্চ সম্মানজনক পদ নবুওয়াত ও রিসালাত দান করেন। মহান আল্লাহ তাআলা স্বীয় একত্ববাদের ঘোষণা দিয়া তাঁহারই ইবাদতের নির্দেশ দেন এবং কিয়ামত দিবসের কথা অবহিত করেন। তাই তাওহীদ, রিসালাত ও কিয়ামত সম্পর্কে তাঁহাকে ধারণা দান করেন। এই সময়ের কথা বিভিন্ন সূরায় বিভিন্নভাবে উল্লেখ করা হইয়াছে।
ফَلَمَّا أَتَهَا نُودِيَ لِمُوسَى إِنِّي أَنَا رَبُّكَ فَاخْلَعْ نَعْلَيْكَ إِنَّكَ بِالْوَادِ الْمُقَدَّسِ طُوى، وَأَنَا اخْتَرْتُكَ فَاسْتَمِعْ لِمَا يُوحَى ، انَّنِي أَنَا اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنا فاعبدني وأقم الصلوة لذكرى أنَّ السَّاعَةَ أَتِيَةً أَكَادُ أُخْفِيْهَا لِتُجْزَى كُلُّ نَفْسٍ بِمَا تَسْعَى فَلا يَصُدِّنَّكَ عَنْهَا مَنْ لا يُؤْمِنُ بِهَا وَاتَّبَعَ هَوَاهُ فَتَرْدَى .
"অতঃপর যখন সে আগুনের নিকট আসিল তখন আহবান করিয়া বলা হইল, হে মূসা! আমিই তোমার প্রতিপালক! অতএব তোমার পাদুকা খুলিয়া ফেল। কারণ তুমি পবিত্র 'তুওয়া' উপত্যকায় রহিয়াছ। এবং আমি তোমাকে মনোনীত করিয়াছি। অতএব যাহা ওহী প্রেরণ করা হয় তাহা মনোযোগের সহিত শ্রবণ কর। আমিই আল্লাহ, আমা ব্যতীত কোন ইলাহ নাই। অতএব আমার স্মরণার্থে সালাত কায়েম কর। কিয়ামত অবশ্যম্ভাবী, আমি ইহা গোপন রাখিতে চাহি যাহাতে প্রত্যেকেই নিজ কর্মানুযায়ী ফল লাভ করিতে পারে। সুতরাং যে ব্যক্তি কিয়ামতে বিশ্বাস করে না এবং নিজ প্রবৃত্তির অনুসরণ করে সে যেন তোমাকে উহাতে বিশ্বাস স্থাপনে নিবৃত্ত না করে, নিবৃত্ত হইলে তুমি ধ্বংস হইয়া যাইবে" (২০: ১১-১৬)।
ফَلَمَّا جَاءَ هَا نُودِيَ أَنْ يُوْرِكَ مَنْ فِي النَّارِ وَمَنْ حَوْلَهَا وَسُبْحْنَ اللَّهِ رَبِّ الْعُلَمِينَ يَمُوسَى أَنَّهُ أَنَا اللَّهُ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ .
"অতঃপর সে যখন উহার (অগ্নির) নিকট আসিল তখন ঘোষিত হইল: ধন্য সে ব্যক্তি যে আছে এই অগ্নির মধ্যে এবং যাহারা আছে উহার চতুষ্পার্শ্বে। জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহ পবিত্র ও মহিমান্বিত! হে মূসা! আমি তো আল্লাহ, পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়” (২৭ঃ ৮-৯)।
فَلَمَّا أَتَهَا نُودِيَ مِنْ شَاطِئِ الْوَادِ الْأَيْمَنِ فِي البُقْعَةِ الْمُبَارَكَةِ مِنَ الشَّجَرَةِ أَنْ تُمُوسَى إِنِّي أَنَا اللَّهُ رَبُّ الْعَالَمِين.
"যখন মূসা আগুনের নিকট পৌছিল তখন উপত্যকার দক্ষিণ পার্শ্বে পবিত্র ভূমিস্থিত এক বৃক্ষের দিক হইতে তাহাকে আহ্হ্বান করিয়া বলা হইল : হে মূসা! আমিই আল্লাহ, জগতসমূহের প্রতিপালক" (২৮:৩০)।
এক বর্ণনামতে আল্লাহ তাআলা প্রথম যখন অদৃশ্য হইতে বলেন, "আমিই আল্লাহ জগতসমূহের প্রতিপালক", তখন ইহা শ্রবণ করিয়া ভয়ে মূসা (আ)-এর অন্তর কম্পিত হইল, জিহ্বা আড়ষ্ট হইয়া উঠিল এবং শক্তি নিঃশেষ হইয়া গেল। তিনি জীবনস্মৃতের ন্যায় হইয়া পড়িলেন। তখন তাঁহার মনোবল বৃদ্ধি করিবার জন্য আল্লাহ তাআলা একজন ফেরেশতা পাঠাইলেন। অতঃপর তিনি কিছুটা স্বাভাবিক হইলে আল্লাহ তাআলা তাঁহাকে পরবর্তী কথা ও অন্যান্য নিদের্শনা বাতলাইয়া দিলেন।
টিকাঃ
আল-কামিল, ১খ, ১৩৭
📄 আল্লাহর নিদর্শন তথা মুজিযা প্রদান
অতঃপর আল্লাহ তাহাকে জানাইলেন যে, তিনি সকল কর্মের বিধায়ক, সকল কিছুর উপর তাঁহার কর্তৃত্ব। কোন জিনিসকে 'হও' বলিলেই তাহা হইয়া যায়। ইহার জ্বলন্ত প্রমাণস্বরূপ তাঁহাকে স্বচক্ষে দেখাইয়া দেওয়ার জন্য প্রথম মুজিযা দান করেন। আল্লাহ বলিলেন, "হে মূসা! তোমার দক্ষিণ হস্তে উহা কি? সে বলিল, উহা আমার লাঠি; আমি ইহাতে ভর দেই এবং ইহা দ্বারা আঘাত করিয়া আমি আমার মেষপালের জন্য বৃক্ষপত্র ফেলিয়া থাকি এবং ইহা আমার অন্যান্য কাজেও লাগে। আল্লাহ বলিলেন, হে মূসা! তুমি ইহা নিক্ষেপ কর। অতঃপর সে উহা নিক্ষেপ করিল, সংগে সংগে উহা সাপ হইয়া ছুটিতে লাগিল। তিনি বলিলেন : তুমি ইহাকে ধর, ভয় করিও না; আমি ইহাকে ইহার পূর্ব রূপে ফিরাইয়া দিব" (২০:১৭-২১)।
বাইবেলের বর্ণনামতে তিনি আল্লাহর নিকট একটি প্রমাণ চাহিয়াছিলেন যে, মিসরবাসী যদি তাহাকে মিথ্যাবাদী বলে তবে যেন প্রমাণস্বরূপ উহা পেশ করিতে পারেন। তখন আল্লাহ তাহাকে উপরিউক্ত কথা বলিলেন।
অন্য আয়াতে বলা হইয়াছে:
وَأَلْقِ عَصَاكَ فَلَمَّا رَآهَا تَهْتَزُّ كَأَنَّهَا جَانٌّ وَلَّى مُدْبِرًا وَلَمْ يُعَقِّبْ يَمُوسَى لَا تَخَفْ إِنِّي لَا يَخَافُ لَدَى الْمُرْسَلُون.
"তুমি তোমার লাঠি নিক্ষেপ কর। অতঃপর যখন সে উহাকে সর্পের ন্যায় ছুটাছুটি করিতে দেখিল তখন সে পিছনের দিকে ছুটিতে লাগিল এবং ফিরিয়াও তাকাইল না। বলা হইল, হে মূসা! ভীত হইও না। নিশ্চয়ই আমি এমন যে, আমার সান্নিধ্যে রাসূলগণ ভয় পায় না" (২৭:১০)।
অর্থাৎ লাঠিটি মাটিতে ফেলিবার পর তিনি দেখিতে পাইলেন বিরাট এক অজগর সাপ ফণা ধরিয়া বিশাল জিহ্বা বাহির করিয়া গর্জন করিতেছে যাহা খুব দ্রুত গতিসম্পন্নও বটে। ইহা দেখিয়া মূসা (আ) ভয় পাইয়া উহার সম্মুখ হইতে দ্রুত পলায়ন করিতেছিলেন, পিছনে ফিরিয়াও তাঁকাইতে ছিলেন না। অতঃপর তাঁহার প্রতিপালক তাঁহাকে ডাকিয়া বলিলেন, হে মূসা! সম্মুখে আস, ভয় করিও না; তুমি তো নিরাপদ (২৮: ৩১)। তিনি আরো বলিলেন: আমি এমন যে, আমার সান্নিধ্যে রাসূলগণ ভয় পায় না (২৭: ১০)। এই আশ্বাসবাণী শুনিয়া তিনি ফিরিয়া আসিলেন। এইবার আল্লাহ তাঁহাকে হাত দিয়া উহা ধরিবার নির্দেশ দিয়া বলিলেন, তুমি ইহাকে ধর, ভয় করিও না! আমি ইহাকে ইহার পূর্বরূপে ফিরাইয়া দিব (২০: ২১)। কথিত আছে যে, তিনি ভয়ে তাঁহার পরিহিত পশমের জামার আস্তিনের মধ্যে হাত দিয়া উহা দ্বারা সর্পটির মুখের মধ্যভাগ ধরেন। এক বর্ণনামতে, আল্লাহ তাআলা উহা সরাইয়া খালি হাতে ধরিবার নির্দেশ দেন। অতঃপর তিনি খালি হাতেই উহার মুখের মধ্যভাগে ধরেন। বাইবেলের বর্ণনামতে তিনি লেজে ধরেন। অতঃপর ইহা তাহার পূর্বেকার সেই দুই শাখাবিশিষ্ট লাঠিতে পরিণত হইল।
টিকাঃ
আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ২৪৮
📄 দ্বিতীয় নিদর্শন
অতঃপর আল্লাহ তাআলা তাঁহাকে আরও একটি নিদর্শন প্রদান করিলেন। তাহা হইল, হাত বগলে রাখিলে উহা জ্যোতির্ময় হইয়া বাহির হইত। শ্বেতী বা অন্য কোনরূপ রোগবশত নহে। অতঃপর উহা আবার পূর্বের ন্যায় হইয়া যাইত। এই সম্পর্কে কুরআন কারীমে ইরশাদ হইয়াছে, আল্লাহ তাহাকে বলিলেন:
وَاضْمُمْ يَدَكَ إِلَى جَنَاحِكَ تَخْرُجُ بَيْضَاءَ مِنْ غَيْرِسُوْءٍ أَيَةً أُخْرَى . "এবং তোমার হাত তোমার বগলে রাখ, ইহা বাহির হইয়া আসিবে নির্মল উজ্জ্বল হইয়া অপর এক নিদর্শনস্বরূপ” (২০ঃ২২)।
وَادْخِلْ يَدَكَ فِي جَيْبِكَ تَخْرُجْ بَيْضَاءَ مِنْ غَيْرِ سُوءٍ فِي تِسْعِ أيتِ إِلَى فِرْعَوْنَ وَقَوْمِهِ إِنَّهُمْ كَانُوا قَوْمًا فسقين . "এবং তোমার হাত তোমার বক্ষ পার্শ্বে বস্ত্রের মধ্যে প্রবেশ করাও। ইহা বাহির হইয়া আসিবে শুভ্র নির্মল অবস্থায়। ইহা ফিরআওন ও তাহার সম্প্রদায়ের নিকট আনীত নয়টি নিদর্শনের অন্তর্গত। উহারা তো সত্যত্যাগী সম্প্রদায়” (২৭ঃ ১২)।
উপরিউক্ত দুইটি নিদর্শন ছাড়া আরো সাতটিসহ মোট নয়টি নিদর্শন মূসা (আ)-কে প্রদান করা হয়, যাহা উপরিউক্ত আয়াতে في تسع آیات "নয়টি নিদর্শনের অন্তর্গত"-এ ব্যক্ত হইয়াছে। অন্যান্য নিদর্শনের কথা সূরা আ'রাফে (দ্র. ১৩০-১৩৩ নং আয়াত) বর্ণিত হইয়াছে। সেইগুলির বিবরণ পরে আসিতেছে। তবে এই নয়টি নিদর্শন আল্লাহ প্রদত্ত দশটি কলেমা হইতে ভিন্ন। কারণ সেই দশটি কলেমা হইল শরঈ বিধান (যথা শিরক না করা, দূরি না করা, ব্যভিচার না করা, অন্যায়ভাবে, নরহত্যা না করা, যাদু বা গণনা না করা, মিথ্যা অপবাদ না দেওয়া প্রভৃতি)। আর এই নয়টি নিদর্শন হইল আল্লাহ্ কুদরতী বিষয়, মু'জিযা। অনেকেই ইহা একাকার করিয়া ফেলে, যাহা মারাত্মক ভ্রম।
মূসা (আ)-কে নবুওয়াত প্রদানের সময় এবং উভয়ের কথোপকথনের সময় আল্লাহ মূসা (আ)-কে আরো বহু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলিয়াছিলেন এবং নসীহত করিয়াছিলেন। ইবনুল জাওযী ও ইয়া'কূবী প্রমুখ আলিম তাঁহাদের স্ব স্ব গ্রন্থে তাহা উল্লেখ করিয়াছেন, যাহার কিছু অংশ এখানে উদ্ধৃত করা হইল:
আল্লাহ তাআলা মূসা (আ)-কে বলিলেন, নিকটবর্তী হও। অতঃপর মূসা (আ) নিকটবর্তী হইয়া উক্ত বৃক্ষের কাণ্ডের সহিত স্বীয় পিঠ ঠেক দিয়া দাঁড়াইলেন। ইহাতে তাঁহার ভয় একেবারেই দূরীভূত হইল। হাত লাঠির উপর রাখিয়া অবনত মস্তকে দাঁড়াইলেন। অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলিলেন, আমি আজ তোমাকে এমন এক মর্যাদা দান করিলাম যে, তোমার পর আর কোন মানুষ এই মর্যাদায় তোমার স্থলাভিষিক্ত হইতে পারিবে না। আমি তোমাকে নিকটতর করিয়াছি। ফলে তুমি আমার কথা শুনিতে পাইয়াছ। আর তুমি আমার সর্বনিকটতম স্থানে। তাই আমার রিসালাতের জামা পরিধান করাইলাম, ইহা দ্বারা তুমি আমার নিয়ন্ত্রণের মধ্যে শক্তিতে বলীয়ান হইবে। তুমি আমার সেনাবাহিনীর এক মহান সৈন্য। আমি তোমাকে আমার সৃষ্টির মধ্যে এক দুর্বল সৃষ্টির প্রতি প্রেরণ করিতেছি, যে আমার নি'মাতসমূহ অস্বীকার করিয়াছে। সে আমার কৌশলকে ভয় পায় না। দুনিয়া তাহাকে ধোঁকা দিয়া আমা হইতে ফিরাইয়া রাখিয়াছে। এমনি করিয়া সে আমার হক অস্বীকার করিয়াছে, আমার রবৃবিয়াত অস্বীকার করিয়াছে, আমি ছাড়া অন্যের উপাসনা করিয়াছে। ন্যায়বিচার ও দলীল-প্রমাণ যদি না হইত, যাহা আমি আমার সৃষ্টির মধ্যে স্থাপন করিয়াছি, তবে অবশ্যই আমি তাহাকে প্রবল প্রতাপশালীর শক্ত হাতে পাকড়াও করিতাম। আমার এই ক্রোধের ফলে আসমান-যমীন, পর্বত-সমুদ্র ক্রোধান্বিত হয়। আমি যদি আকাশকে নির্দেশ দেই তবে সে তাহাকে কঙ্কর নিক্ষেপে ধ্বংস করিবে। যদি যমীনকে নির্দেশ দেই তবে সে উহাকে গিলিয়া ফেলিবে। যদি পর্বতকে নির্দেশ দেই তবে সে উহাকে ধ্বংস করিয়া দিবে, আর যদি সমুদ্রকে নির্দেশ দেই তবে উহা তাহাকে ডুবাইয়া দিবে। কিন্তু আমি তাহার প্রতি অনুগ্রহপূর্ণ আচরণ করিতেছি। সে আমার দৃষ্টি হইতে সরিয়া গিয়াছে। আমি তো অমুখাপেক্ষী; আমি ছাড়া আর কেহ অমুখাপেক্ষী নহে। অতঃপর তাহার নিকট আমার রিসালাত পৌঁছাইয়া দাও। আমার ইবাদাত ও একত্ববাদের প্রতি তাহাকে দাওয়াত দাও। তাহাকে আমার নিদর্শন স্মরণ করাইয়া দাও। তাহাকে আমার প্রতিশোধের ভয় দেখাও। তাহাকে জানাইয়া দাও যে, ক্রোধ ও প্রতিশোধের চাইতে আমি ক্ষমার প্রতি দ্রুত ধাবিত হই। তাহাকে দুনিয়ার যে ক্ষমতার পোশাক পরিধান করানো হইয়াছে তাহা যেন তোমাকে ভীত না করে। কারণ তাহার মাথার অগ্রভাগ আমার হাতের মুঠায়। সে আমার অনুমতি ছাড়া কোথায়ও যাইতে, কিছু বলিতে কিংবা শ্বাস-প্রশ্বাস লইতে পারিবে না। তুমি তাহাকে বল, তোমার প্রতিপালকের আহবানে সাড়া দাও। কারণ তিনি প্রশস্ত ক্ষমার অধিকারী। তিনি তোমাকে চারি শত বৎসর অবকাশ দিয়াছেন আর প্রতি মুহূর্তেই তুমি তাঁহার বিরোধিতা করিয়াছ; তাহার পথে হইতে তাঁহার বান্দাদিগকে তুমি ফিরাইয়া রাখিয়াছ। তিনি তোমার উপর আকাশ হইতে বৃষ্টি বর্ষণ করেন, যমীন হইতে ফসল উৎপাদন করেন, তুমি রোগাক্রান্ত হও না, দরিদ্র হও না, পরাস্ত হও না। তিনি চাহিলে ইহার সবগুলিই তোমাকে দিতে পারেন এবং চাহিলে ইহা তোমা হইতে দূর করিয়া দিতে পারেন। কিন্তু তিনি বড়ই ধৈর্যশীল।
তাহার সহিত তুমি নিজেও তোমার ভ্রাতাকে লইয়া জিহাদ কর। তোমরা জিহাদের দায়িত্বপ্রাপ্ত। কারণ আমি চাহিলে তাহার নিকট এমন সৈন্য প্রেরণ করিতে পারি যাহা প্রতিহত করিবার সাধ্য তাহার নাই। কিন্তু এই দুর্বল বান্দা, যাহাকে আত্মপ্রসাদে বিভোর করিয়া রাখিয়াছে, তাহার নিজের আত্মা তাহার দলবল। সে যেন জানিতে পারে যে, আমার অনুমতিতে ক্ষুদ্র দল বৃহৎ দলের উপর বিজয় লাভ করিতে পারে। তাহার সাজসজ্জা ও আড়ম্বর যেন তোমাদিগকে অভিভূত না করে। উহার প্রতি তোমরা দৃষ্টিপাত করিবে না। কারণ উহা পার্থিব জগতের চাকচিক্য, যাহা ভোগ-বিলাসীদের সৌন্দর্য। আমি চাহিলে তোমাদিগকে দুনিয়ার এমন জাঁকজমক দিতে পারি যে, ফিরআওন তাহা দেখিলে বুঝিতে পারিবে যে, তোমাদিগকে যে সৌন্দর্য ও চাকচিক্য দেওয়া হইয়াছে, সে তাহা সঞ্চয় করিতে অক্ষম। কিন্তু আমি তোমাদের প্রতি উহা প্রদানে আগ্রহী নহি; বরং তোমাদের হইতে আমি উহা ফিরাইয়া রাখিব। পূর্ব হইতেই আমি আমার প্রিয়পাত্র ও নৈকট্য লাভকারীদের সহিত এইরূপই আচরণ করিয়া থাকি। তাহাদিগকে উহা বিলম্বে তথা আখিরাতে প্রদান করিব। কারণ আমি তাহাদিগকে দুনিয়ার ভোগবিলাস ও চাকচিক্য হইতে দূরে সরাইয়া রাখি, যেমনিভাবে দয়ার্দ্র রাখাল তাহার বকরীদিগকে ধ্বংসের ঘাটি হইতে দূরে সরাইয়া রাখে।
জানিয়া রাখো, মানুষ দুনিয়াতে যুহদ (বিরাগ) অপেক্ষা অন্য কিছু দ্বারা এত সজ্জিত হইতে পারে না। কারণ উহা মুত্তাকীদের সৌন্দর্য। উহাই তাহাদের পোশাক। জানিয়া রাখ, যে আমার প্রিয়পাত্র ও বন্ধুকে অপদস্থ করিল সে আমার সহিত প্রকাশ্যে যুদ্ধ ঘোষণা করিল এবং নিজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলিয়া দিল। আমি আমার প্রিয়পাত্র ও বন্ধুদের সাহায্য করিয়া থাকি। যে আমার সহিত যুদ্ধ ঘোষণা করিল সে কি ধারণা করে যে, সে আমার সম্মুখে টিকিতে পারিবে? যে আমার সহিত শত্রুতা পোষণ করে সে কি ধারণা করে যে, আমাকে অক্ষম করিয়া দিতে পারিবে? দুনিয়া ও আখিরাতে আমি তাহাদের প্রতি প্রতিশোধ গ্রহণকারী।
টিকাঃ
ইব্ন কাছীর, তাফসীর, উপরিউক্ত আয়াতের তাফসীর, ৩খ, ৬৬
আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ২৬৬
ইবনুল জাওযী, আল-মুনতাজাম ফিত-তারীখ, ১খ, ৩৩৯-৩৪১; তু. আল-ইয়া'কূবী, তারীখ, ১খ, ৩৪
📄 দাওয়াতী কার্যক্রমের নির্দেশ
অতঃপর আল্লাহ তাআলা মূসা (আ)-কে উক্ত মু'জিযা ও নিদর্শন প্রদান করত ফিরআওন ও তাহার সম্প্রদায়ের নিকট গিয়া তাহাদিগকে দাওয়াত দিতে নির্দেশ দিলেন। কুরআন কারীমে ইরশাদ হইয়াছে:
فَذَلِكَ بُرْهَانَنِ مِنْ رَبِّكَ إِلَى فِرْعَوْنَ وَمَلَا نِهِ إِنَّهُمْ كَانُوا قَوْمًا فَسِقِينَ.
"এই দুইটি তোমার প্রতিপালক প্রদত্ত প্রমাণ ফিরআওন ও তাহার পারিষদবর্গের জন্য। উহারা তো 'সত্যত্যাগী সম্প্রদায়" (২৮: ৩২)।।
তখন মূসা (আ) বলিলেন: رَبِّ إِنِّي قَتَلْتُ مِنْهُمْ نَفْسًا فَأَخَافُ أَنْ يُقْتُلُونِ . وَأَخِي هَرُونُ هُوَ أَفْصَحُ مِنِّي لِسَانًا فَأَرْسِلْهُ مَعِيَ رِدْءًا يُصَدِّ قُنِي إِنِّي أَخَافُ أَنْ يُكَذِّبُونِ .
"হে আমার প্রতিপালক! আমি তো উহাদের একজনকে হত্যা করিয়াছি। ফলে আমি আশঙ্কা করিতেছি উহারা আমাকে হত্যা করিবে। আমার ভ্রাতা হারুন আমা অপেক্ষা বাগ্মী; অতএব তাহাকে আমার সাহায্যকারীরূপে প্রেরণ কর, সে আমাকে সমর্থন করিবে। আমি আশঙ্কা করি উহারা আমাকে মিথ্যাবাদী বলিবে" (২৮: ৩৩-৩৪)।
আল্লাহ তাঁহার এই আবেদন মঞ্জুর করিয়া এবং তাঁহাকে অভয় বাণী দিয়া বলিলেন:
سَنَشُدُّ عَضُدَكَ بِأَخِيكَ وَنَجْعَلُ لَكُمَا سُلْطنًا فَلا يَصِلُوْنَ إِلَيْكُمَا بِايْتِنَا أَنْتُمَا وَمَنِ اتَّبَعَكُمَا الْغُلِبُونَ .
"আমি তোমার ভ্রাতার দ্বারা তোমার বাহু শক্তিশালী করিব এবং তোমাদের উভয়কে প্রাধান্য দান করিব। উহারা তোমাদের নিকট পৌঁছিতে পারিবে না। তোমরা এবং তোমাদের অনুসারীরা আমার নিদর্শনবলে উহাদের উপর প্রবল হইবে" (২৮: ৩৫)।
সূরা তাহায় এইভাবে বর্ণিত হইয়াছে যে, আল্লাহ তাঁহাকে ফিরআওনের নিকট দাওয়াত পৌছাইবার নির্দেশ দিয়া বলিলেন। اذْهَبْ إِلى فِرْعَوْنَ إِنَّهُ طَغَى .
"তুমি ফিরআওনের নিকট যাও, সে তো সীমালংঘন করিয়াছে" (২০: ২৪)।
তখন মূসা (আ) বলিলেন: رَبِّ اشْرَحْ لِي صَدْرِي وَيَسِّرْ لِي أَمْرِي وَاحْلُلْ عُقْدَةً مِنْ لِسَانِي يَفْقَهُوا قَوْلِي، وَاجْعَلْ لِي وَزِيراً مِنْ أَهْلِي هُرُوْنَ أَخِي . اشْدُدْ بِهِ أَزْرِى وَأَشْرِكْهُ فِي أَمْرِي كَى نُسَبِّحَكَ كَثِيرًا ، وَنَذْكُرَكَ كَثِيرًا ، إِنَّكَ كُنْتَ بنَا بَصِيراً .
“হে আমার প্রতিপালক! আমার বক্ষ প্রশস্ত করিয়া দাও এবং আমার কর্ম সহজ কুরিয়া দাও। আমার জিহ্বার জড়তা দূর করিয়া দাও— যাহাতে উহারা আমার কথা বুঝিতে পারে। আমার জন্য করিয়া দাও একজন সাহায্যকারী আমার স্বজনবর্গের মধ্য হইতে; আমার ভ্রাতা হারুনকে; তাহা দ্বারা আমার শক্তি সুদৃঢ় কর ও তাহাকে আমার কর্মে অংশী কর। যাহাতে আমরা তোমার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করিতে পারি প্রচুর এবং তোমাকে স্মরণ করিতে পারি অধিক। তুমি তো আমাদের সম্যক দ্রষ্টা” (২০: ২৫-৩৫)।
আল্লাহ তাআলা তাঁহার এই আবেদন মঞ্জুর করিয়া বলিলেন:
قَدْ أُوتِيتَ سُؤلُكَ يموسى .
"হে মূসা! তুমি যাহা চাহিয়াছ তাহা তোমাকে দেওয়া হইল" (২০:৩৬)।
এক বর্ণনামতে মূসা (আ) শৈশবে যখন ফিরআওনের দাড়ি ধরিয়া জোরে টান মারিয়াছিলেন তখন সে ক্ষিপ্ত হইয়া তাঁহাকে হত্যা করিবার উদ্যোগ লইয়াছিল। অতঃপর স্ত্রী আসিয়ার পরামর্শে তাঁহার বুদ্ধি পরীক্ষার জন্য তাঁহার সম্মুখে যখন জ্বলন্ত অঙ্গার ও খেজুর, মতান্তরে স্বর্ণ খণ্ড রাখা হইল তখন শিশু মূসা অঙ্গারটি ধরিয়াই মুখে পুরিয়া দিয়াছিলেন। ফলে জিহ্বা পুড়িয়া যাওয়ায় তিনি কিছুট তোতলা হইয়া গিয়াছিলেন। উক্ত তোতলামী ও জড়তা এতটুকু পরিমাণে দূর করিয়া দেওয়ার জন্য তিনি প্রার্থনা করিয়াছিলেন যাহাতে তাহারা তাঁহার কথা বুঝিতে পারে। সম্পূর্ণরূপে দূর করিয়া দেওয়ার প্রার্থনা তিনি করেন নাই। হাসান বসরী (র) বলেন, মূসা (আ) প্রয়োজনমত উহা দূর করিবার প্রার্থনা করিয়াছিলেন, যাহার কারণে তোতলামী কিছুটা অবশিষ্ট ছিল। এইজন্য ফিরআওন তাঁহাকে ইহার কথা বলিয়া হেয় প্রতিপন্ন করিয়াছিল। কুরআনে ইরশাদ হইয়াছে, সে তাহার সম্প্রদায়ের নিকট নিজের শ্রেষ্ঠত্ব ও মূসা (আ)-এর দোষ তুলিয়া ধলিয়া বলিলঃ
أَمْ أَنَا خَيْرٌ مِّنْ هَذَا الَّذِي هُوَ مَهِينٌ وَلَا يَكَادُ يُبِينُ. "আমি তো শ্রেষ্ঠ এই ব্যক্তি হইতে, যে হীন এবং স্পষ্ট কথা বলিতেও অক্ষম" (৪৩ঃ ৫২)।
ফিরআওনের এই উক্তি ছিল ইচ্ছাকৃত একটি অপবাদ যাহা দ্বারা সে তাঁহাকে হেয় প্রতিপন্ন করিতে চাহিয়াছিল। শত্রুতা ও কুফরী বশত সে এইরূপ বলিয়াছিল। সে মূসা (আ) কে অবিশ্বাসীর দৃষ্টিতে দেখিত। অথচ মূসা (আ) সম্মান ও মাহাত্ম্যে এমন এক পর্যায়ে ছিলেন যে, তাহাকে দেখিলে বুদ্ধিমানদের চক্ষু জুড়াইয়া যাইত। প্রকৃতপক্ষে ফির'আওনই ছিল স্বভাবগতভাবে, চরিত্র ও দীন-এর দিক দিয়া অপদস্থ ও হেয়। লোকজন মূসা (আ)-এর কথা ঠিকই বুঝিতে পারিত। কারণ যদিও অঙ্গার পুরিয়া দেওয়ার ফলে জিহবায় কিছুটা জড়তা আসিয়াছিল। কিন্তু মূসা (আ)-এর দু'আর ফলে আল্লাহ তাহা দূর করিয়া দেন। হাসান বাসরীর বর্ণনা মতে সামান্য জড়তা থাকিয়া গেলেও যাহা দূর করিবার জন্য তিনি দু'আ করেন নাই তিনি দু'আ করিয়াছিলেন ততটুকু দূর করিতে যাহা দ্বারা দীন প্রচার ও জনগণকে বুঝাইবার কাজ চলে- ইহা হইল সৃষ্টিগত বিষয় যদ্বারা বান্দাকে দোষারোপ করা যায় না। ফির'আওন যদিও বিষয়টি বুঝিত তবুও তাহার প্রজাগণের মধ্যে ইহা ছড়াইয়া দেওয়ার জন্য এইরূপ বলিয়াছিল। কারণ তাহারা ছিল অশিক্ষিত ও মূর্খ।
স্বীয় ভ্রাতা হারূনের জন্য আল্লাহর নিকট নবৃওয়াত প্রার্থনা করা ছিল মূসা (আ)-এর তাঁহার প্রতি সর্বাধিক বড় অনুগ্রহ। উন্মুল মুমিনীন হযরত আইশা (রা) একদা হজ্জের সফরে যাওয়ার সময় শুনিতে পাইলেন, এক লোক, তাহার সঙ্গিদিগকে বলিতেছে, কোন ভ্রাতা স্বীয় ভ্রাতার প্রতি সর্বাধিক ইহসান করিয়াছে? তখন লোকজন সকলে চুপ হইয়া গেল, কেহই ইহার উত্তর দিতে পারিল না। আইশা (রা) তাঁহার শিবিকার পার্শ্ববর্তী লোকজনকে বলিলেন, তিনি হইলেন মূসা ইব্ন ইমরান, যিনি স্বীয় ভ্রাতার জন্য সুপারিশ করায় আল্লাহ তাঁহাকেও নবীরূপে ঘোষাণা করেন এবং ওহী প্রেরণ করেন। কুরআন কারীমে ইরশাদ হইয়াছে:
وَوَهَبْنَا لَهُ مِنْ رَحْمَتِنَا أَخَاهُ هُرُونَ نَبِيًّا (۲۲ : ۱۹) "আমি নিজ অনুগ্রহে তাহাকে (মূসা আ কে) দিলাম তাহার ভ্রাতা হারুনকে নবীরূপে" (১৯:৫৩)।
বাইবেলে এই ক্ষেত্রে নিজেদের বানানো ও মনগড়া বর্ণনা উপস্থাপন করিয়া মূসা (আ)-এর প্রতি অপবাদ দেওয়া হইয়াছে এবং তাঁহাকে দোষারোপ করা হইয়াছে। উহাতে বর্ণনা করা হইয়াছে যে, মূসা (আ) রিসালাতের যিম্মাদারী হইতে বাঁচিবার জন্য চেষ্টা করেন এবং নিজের তোতলামীর ওযর পেশ করিয়া বলেন, "হে আমার প্রভু! বিনয় করি, যাহার হাতে পাঠাইতে চাও, পাঠাও। তখন মোশির প্রতি সদাপ্রভুর ক্রোধ প্রজ্জ্বলিত হইল..." অতঃপর হারূন অন্যকে তাহার সাহায্যকারী নিযুক্ত করিলেন। কিন্তু ইহা বাইবেলের ভ্রান্ত বর্ণনা। মূসা (আ) রিসালাতের দায়িত্ব হইতে মুক্ত হওয়ার আগ্রহ কখনও প্রকাশ করেন নাই। তিনি হারুন (আ)-এর নবুওয়াত ও তাঁহার পরামর্শদাতা বানাইবার জন্য দুআ করেন এবং আল্লাহও তাহা কবুল করেন, যাহার বিস্তারিত ও সুস্পষ্ট বিবরণ কুরআন কারীমে উল্লিখিত হইয়াছে।
টিকাঃ
আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ২৪৯
ইব্ন কাছীর, তাফসীর, উক্ত আয়াতের তাফসীর দ্র. ৪খ, ১৩০
আম্বিয়া-কুরআন, ২খ, ১৩৯-১৪০