📄 মূসা (আ)-এর মাদয়ান ত্যাগ ও নবুওয়াতের সূচনা
অঙ্গীকার মত হযরত মূসা (আ) মাদয়ানে তাঁহার শ্বশুরের নিকট দশ বৎসর কাটাইয়া স্বীয় স্ত্রীকে লইয়া বিদায় হওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করিলেন। বিদায়ের প্রাক্কালে তিনি স্ত্রীকে পিতার নিকট তাহার বকরীর পাল হইতে কিছু বকরী চাহিতে বলিলেন, যাহা তাহাদের জীবন ধারণের জন্য সহায়ক হইবে। অতঃপর পিতা তাহাকে সেই বৎসর মা হইতে ভিন্ন রংয়ের যেসব বকরী জন্মগ্রহণ করিয়াছিল তাহাই প্রদান করিলেন। সেইগুলি ছিল খুবই উৎকৃষ্ট জাতের বকরী। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, তোমরা শাম ভ্রমণ করিলে এখনও সেই জাতের বকরী দেখিতে পাইবে। তাহা ছিল সাদা ও কালোর মধ্যবর্তী গৌর বর্ণের।
মুফাসসিরগণের বর্ণনামতে এই সময় মূসা (আ) মিসরে স্বীয় পরিবারবর্গের সহিত দেখা করিবার জন্য উদগ্রীব ছিলেন। তাই তিনি গোপনে তাহাদের সহিত দেখা করিবার সংকল্প করিলেন। অতঃপর তিনি স্বীয় স্ত্রীকে লইয়া বাহির হইয়া পড়িলেন। সঙ্গে ছিল তাহাদের দুই পুত্র ও কিছু বকরী; তাঁহার স্ত্রী ছিলেন গর্ভবতী। ঘটনাক্রমে উহা ছিল ঘন অন্ধকারময় শীতের রজনী। বৃষ্টি বর্ষিত হইতেছিল, সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ চমকাইতেছিল এবং বজ্রপাতও হইতেছিল। তাঁহারা আশ্রয় লইবার মত সুবিধাজনক কোন গুহা পাইলেন না। অপরদিকে তিনি পথও ভুল করিয়া ফেলিয়াছিলেন, যাহার ইঙ্গিত কুরআন কারীমে পাওয়া যায়। ইরশাদ হইয়াছে:
إِذْ رَا نَارًا فَقَالَ لِأَهْلِهِ اسْكُنُوا إِنِّي أَنَسْتُ نَارًا لَعَلَى آتِيْكُمْ مِنْهَا بِقَبَسٍ أَوْ أَجِدُ عَلَى النَّارِ هُدًى . "সে যখন আগুন দেখিল তখন তাহার পরিবারবর্গকে বলিল, তোমরা এখানে থাক, আমি আগুন দেখিয়াছি। সম্ভবত আমি তোমাদের জন্য উহা হইতে জ্বলন্ত অঙ্গার আনিতে পারিব অথবা আমি উহার নিকটে কোন পথপ্রদর্শক পাইব” (২০:১০)।
তাহারা কোন দিকে চলিয়াছেন তাহাও বুঝিতে পারিতেছিলেন না। রাত্রটা কোনমতে কাটাইয়া দেওয়ার জন্য তিনি কাষ্ঠ দ্বারা অগ্নি প্রজ্জ্বলিত করিতে চাহিলেন, কিন্তু উহা প্রজ্জ্বলিত হইল না। শীত ও অন্ধকার উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাইতেছিল। এমতাবস্থায় তিনি তাঁহার ডান দিকে পশ্চিমে অবস্থিত ভূর পর্বতের দিকে প্রজ্জ্বলিত অগ্নি দেখিতে পাইলেন। অতঃপর পরিজনবর্গকে বলিলেন, "তোমরা অপেক্ষা কর, আমি আগুন দেখিয়াছি, সম্ভবত আমি সেখান হইতে তোমাদের জন্য খবর আনিতে পারি অথবা এক খণ্ড কাষ্ঠ আনিতে পারি যাহাতে তোমরা আগুন পোহাইতে পার" (২৮: ২৯)। এই অগ্নি সম্ভবত তিনি একাই দেখিয়াছিলেন, সঙ্গীরা কেহ দেখিতে পায় নাই। কারণ প্রকৃতপক্ষে ইহা অগ্নি ছিল না, ইহা ছিল আল্লাহ্ নূর যাহা সকলের পক্ষে দেখা সম্ভবপর নহে।
অতঃপর মূসা (আ) সেখানে পৌঁছিয়া দেখিতে পাইলেন আওসাজ নামক একটি সবুজ গাছের শাখা-প্রশাখা হইতে দাউ দাউ করিয়া অগ্নি বাহির হইতেছে। অগ্নির মাত্রা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাইতেছে এবং সঙ্গে সঙ্গে বৃক্ষের সবুজ শ্যামলিমাও বৃদ্ধি পাইতেছে। ইহা দেখিয়া তিনি থমকিয়া দাঁড়াইলেন এবং ভীত-সন্ত্রস্ত হইয়া ফিরিয়া যাইতে ইচ্ছা করিলেন। তখন তিনি একটি অভয় শুনিতে পাইলেন। কিরণচ্ছটা আকাশ পর্যন্ত বিস্তৃত হইয়াছিল। বৃক্ষটি ছিল পশ্চিম দিকের পাহাড়ের পাদদেশে, মূসা (আ)-এর ডাইন দিকে। কুরআন কারীমে ইরশাদ হইয়াছে:
وَمَا كُنْتَ بِجَانِبِ الْغَرْبِيِّ إِذْ قَضَيْنَا إِلَى مُوسَى الْأَمْرَ وَمَا كُنْتَ مِنَ الشَّاهِدِينَ . "মূসাকে যখন আমি বিধান দিয়াছলাম তখন তুমি পশ্চিম প্রান্তে উপস্থিত ছিলে না এবং তুমি প্রত্যক্ষদর্শীও ছিলে না" (২৮ঃ৪৪)।
মূসা (আ) যে উপত্যকায় ছিলেন তাহার নাম ছিল 'তুওয়া'। তিনি কিবলা তথা বায়তুল মাকদিসমুখী ছিলেন। উক্ত বৃক্ষ ছিল তাঁহার ডাইনে, পশ্চিম দিকে। আগুনের এই অভিনবত্ব ও বৃক্ষের সবুজ-সতেজতা দেখিয়া বিস্ময়ে হতবাক ও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া পড়িয়াছিলেন। তাওরাতের বর্ণনামতে, অগ্নির কিরণচ্ছটায় চক্ষু অন্ধ হইয়া যাওয়ার ভয়ে তিনি আপন হস্তদ্বয় দ্বারা মুখ ঢাকিয়া রাখিয়াছিলেন। এমতাবস্থায় আল্লাহ তাআলা তাঁহাকে পবিত্র উপত্যকা 'তুওয়া' হইতে আহবান করিলেন। উক্ত পবিত্র ও মুবারক ভূমির প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শনার্থে প্রথমত তাঁহাকে পায়ের জুতা খুলিতে বলিলেন। কুরআন কারীমে ইরশাদ হইয়াছে:
فَلَمَّا أَنَتَهَا نُودِيَ يَمُوسى . إِنِّي أَنَا رَبُّكَ فَاخْلَعْ نَعْلَيْكَ إِنَّكَ بِالْوَادِ الْمُقَدَّسِ طُوًى .
"অতঃপর যখন সে আগুনের নিকট আসিল তখন আহবান করিয়া বলা হইল, হে মূসা! আমিই তোমার প্রতিপালক! অতএব তোমার পাদুকা খুলিয়া ফেল। কারণ তুমি পবিত্র 'তুওয়া' উপত্যকায় রহিয়াছ” (২০: ১১-১২)।
এই ব্যাপারে মুফাসসিরগণ দুইটি বিষয়ের প্রতি আলোকপাত করিয়াছেন: (১) মূসা (আ) যে আলোকচ্ছটাকে অগ্নি মনে করিয়াছিলেন তাহা প্রকৃতপক্ষে অগ্নি ছিল না, বরং তাহা ছিল আল্লাহ্ নূরের তাজাল্লী। কিন্তু উক্ত আলোকচ্ছটার অন্তরাল হইতে তিনি যে আওয়ায শুনিয়াছিলেন তাহা কি সরাসরি আল্লাহর আহবান ছিল, না ফেরেশতার মাধ্যমে তিনি আল্লাহর আহবান শুনিয়াছিলেন? কোন কোন মুফাসসিরের মতে ইহা ছিল ফেরেশতার কণ্ঠ। ইহারই মাধ্যমে মূসা (আ) আল্লাহর সহিত কথোপকথনের মর্যাদা লাভ করেন। ইহা সরাসরি আল্লাহর আহবান ছিল না। কিন্তু মুহাক্কিক ও গবেষক আলিমগণের মতে ইহা ছিল সরাসরি আল্লাহ্র আহবান। মূসা (আ) কোন মাধ্যম ছাড়াই সরাসরি উহা শ্রবণ করেন।
(২) পবিত্র ভূমি 'তুওয়া' উপত্যকায় মূসা (আ)-কে জুতা খোলার নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে। অথচ সহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত যে, রাসূলুল্লাহ (স) ও সাহাবায়ে কিরাম জুতা পায়ে মসজিদের মধ্যে সালাত আদায় করিতেন। আর উম্মাতে মুহাম্মাদীর জন্য এখনও ইসলামী বিধান হইল জুতায় নাপাকী না থাকিলে উহা পায়ে দিয়া মসজিদের অভ্যন্তরে সালাত আদায় করা বৈধ। তাহা হইলে মূসা (আ)-কে এই নির্দেশ কেন দেওয়া হইল যে, ইহা পবিত্র ভূমি, সুতরাং তোমার জুতা খোল? ইহার উত্তর সহীহ হাদীছে উল্লিখিত হইয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স) নিজেই ইহার কারণ বিবৃত করিয়াছেন যে, মূসা (আ)-এর জুতাদ্বয় ছিল মৃত গর্দভের চামড়া দ্বারা তৈরী। ফলে উক্ত পবিত্র ভূমির সহিত তাঁহার পদদ্বয় স্পর্শ করিয়া পবিত্র হইবার জন্য উক্ত নির্দেশ দেওয়া হয়।
টিকাঃ
আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ২৪৫-২৪৬
আল-কামিল, ১খ, ১৩১
য়াকৃত আল-হামাবী, মু'জামুল বুলদান, ৫খ, ৭৭-৮৮; ড. সালাহ আল-খালিদী, আল-কাসাসুল কুরআনী, ২খ, ১১, ৩২৪-৩২৫
আল-বিদায়া, ১খ, ২৪৬
ইব্ন কাছীর, প্রাগুক্ত
আল-কামিল, ২খ, ১৩৬
আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ২৪৭
ইব্ন কাছীর, প্রাগুক্ত
ইব্ন কাছীর, তাফসীর, ৩খ, ১৪৩; কাসাসুল কুরআন, ১খ, ৩৯৩
আল-কামিল, ১খ, ১৩৭
📄 নবুওয়াত প্রাপ্তি
হযরত মূসা (আ)-কে প্রকৃতপক্ষে এই সময়েই আল্লাহ তাআলা সর্বোচ্চ সম্মানজনক পদ নবুওয়াত ও রিসালাত দান করেন। মহান আল্লাহ তাআলা স্বীয় একত্ববাদের ঘোষণা দিয়া তাঁহারই ইবাদতের নির্দেশ দেন এবং কিয়ামত দিবসের কথা অবহিত করেন। তাই তাওহীদ, রিসালাত ও কিয়ামত সম্পর্কে তাঁহাকে ধারণা দান করেন। এই সময়ের কথা বিভিন্ন সূরায় বিভিন্নভাবে উল্লেখ করা হইয়াছে।
ফَلَمَّا أَتَهَا نُودِيَ لِمُوسَى إِنِّي أَنَا رَبُّكَ فَاخْلَعْ نَعْلَيْكَ إِنَّكَ بِالْوَادِ الْمُقَدَّسِ طُوى، وَأَنَا اخْتَرْتُكَ فَاسْتَمِعْ لِمَا يُوحَى ، انَّنِي أَنَا اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنا فاعبدني وأقم الصلوة لذكرى أنَّ السَّاعَةَ أَتِيَةً أَكَادُ أُخْفِيْهَا لِتُجْزَى كُلُّ نَفْسٍ بِمَا تَسْعَى فَلا يَصُدِّنَّكَ عَنْهَا مَنْ لا يُؤْمِنُ بِهَا وَاتَّبَعَ هَوَاهُ فَتَرْدَى .
"অতঃপর যখন সে আগুনের নিকট আসিল তখন আহবান করিয়া বলা হইল, হে মূসা! আমিই তোমার প্রতিপালক! অতএব তোমার পাদুকা খুলিয়া ফেল। কারণ তুমি পবিত্র 'তুওয়া' উপত্যকায় রহিয়াছ। এবং আমি তোমাকে মনোনীত করিয়াছি। অতএব যাহা ওহী প্রেরণ করা হয় তাহা মনোযোগের সহিত শ্রবণ কর। আমিই আল্লাহ, আমা ব্যতীত কোন ইলাহ নাই। অতএব আমার স্মরণার্থে সালাত কায়েম কর। কিয়ামত অবশ্যম্ভাবী, আমি ইহা গোপন রাখিতে চাহি যাহাতে প্রত্যেকেই নিজ কর্মানুযায়ী ফল লাভ করিতে পারে। সুতরাং যে ব্যক্তি কিয়ামতে বিশ্বাস করে না এবং নিজ প্রবৃত্তির অনুসরণ করে সে যেন তোমাকে উহাতে বিশ্বাস স্থাপনে নিবৃত্ত না করে, নিবৃত্ত হইলে তুমি ধ্বংস হইয়া যাইবে" (২০: ১১-১৬)।
ফَلَمَّا جَاءَ هَا نُودِيَ أَنْ يُوْرِكَ مَنْ فِي النَّارِ وَمَنْ حَوْلَهَا وَسُبْحْنَ اللَّهِ رَبِّ الْعُلَمِينَ يَمُوسَى أَنَّهُ أَنَا اللَّهُ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ .
"অতঃপর সে যখন উহার (অগ্নির) নিকট আসিল তখন ঘোষিত হইল: ধন্য সে ব্যক্তি যে আছে এই অগ্নির মধ্যে এবং যাহারা আছে উহার চতুষ্পার্শ্বে। জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহ পবিত্র ও মহিমান্বিত! হে মূসা! আমি তো আল্লাহ, পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়” (২৭ঃ ৮-৯)।
فَلَمَّا أَتَهَا نُودِيَ مِنْ شَاطِئِ الْوَادِ الْأَيْمَنِ فِي البُقْعَةِ الْمُبَارَكَةِ مِنَ الشَّجَرَةِ أَنْ تُمُوسَى إِنِّي أَنَا اللَّهُ رَبُّ الْعَالَمِين.
"যখন মূসা আগুনের নিকট পৌছিল তখন উপত্যকার দক্ষিণ পার্শ্বে পবিত্র ভূমিস্থিত এক বৃক্ষের দিক হইতে তাহাকে আহ্হ্বান করিয়া বলা হইল : হে মূসা! আমিই আল্লাহ, জগতসমূহের প্রতিপালক" (২৮:৩০)।
এক বর্ণনামতে আল্লাহ তাআলা প্রথম যখন অদৃশ্য হইতে বলেন, "আমিই আল্লাহ জগতসমূহের প্রতিপালক", তখন ইহা শ্রবণ করিয়া ভয়ে মূসা (আ)-এর অন্তর কম্পিত হইল, জিহ্বা আড়ষ্ট হইয়া উঠিল এবং শক্তি নিঃশেষ হইয়া গেল। তিনি জীবনস্মৃতের ন্যায় হইয়া পড়িলেন। তখন তাঁহার মনোবল বৃদ্ধি করিবার জন্য আল্লাহ তাআলা একজন ফেরেশতা পাঠাইলেন। অতঃপর তিনি কিছুটা স্বাভাবিক হইলে আল্লাহ তাআলা তাঁহাকে পরবর্তী কথা ও অন্যান্য নিদের্শনা বাতলাইয়া দিলেন।
টিকাঃ
আল-কামিল, ১খ, ১৩৭
📄 আল্লাহর নিদর্শন তথা মুজিযা প্রদান
অতঃপর আল্লাহ তাহাকে জানাইলেন যে, তিনি সকল কর্মের বিধায়ক, সকল কিছুর উপর তাঁহার কর্তৃত্ব। কোন জিনিসকে 'হও' বলিলেই তাহা হইয়া যায়। ইহার জ্বলন্ত প্রমাণস্বরূপ তাঁহাকে স্বচক্ষে দেখাইয়া দেওয়ার জন্য প্রথম মুজিযা দান করেন। আল্লাহ বলিলেন, "হে মূসা! তোমার দক্ষিণ হস্তে উহা কি? সে বলিল, উহা আমার লাঠি; আমি ইহাতে ভর দেই এবং ইহা দ্বারা আঘাত করিয়া আমি আমার মেষপালের জন্য বৃক্ষপত্র ফেলিয়া থাকি এবং ইহা আমার অন্যান্য কাজেও লাগে। আল্লাহ বলিলেন, হে মূসা! তুমি ইহা নিক্ষেপ কর। অতঃপর সে উহা নিক্ষেপ করিল, সংগে সংগে উহা সাপ হইয়া ছুটিতে লাগিল। তিনি বলিলেন : তুমি ইহাকে ধর, ভয় করিও না; আমি ইহাকে ইহার পূর্ব রূপে ফিরাইয়া দিব" (২০:১৭-২১)।
বাইবেলের বর্ণনামতে তিনি আল্লাহর নিকট একটি প্রমাণ চাহিয়াছিলেন যে, মিসরবাসী যদি তাহাকে মিথ্যাবাদী বলে তবে যেন প্রমাণস্বরূপ উহা পেশ করিতে পারেন। তখন আল্লাহ তাহাকে উপরিউক্ত কথা বলিলেন।
অন্য আয়াতে বলা হইয়াছে:
وَأَلْقِ عَصَاكَ فَلَمَّا رَآهَا تَهْتَزُّ كَأَنَّهَا جَانٌّ وَلَّى مُدْبِرًا وَلَمْ يُعَقِّبْ يَمُوسَى لَا تَخَفْ إِنِّي لَا يَخَافُ لَدَى الْمُرْسَلُون.
"তুমি তোমার লাঠি নিক্ষেপ কর। অতঃপর যখন সে উহাকে সর্পের ন্যায় ছুটাছুটি করিতে দেখিল তখন সে পিছনের দিকে ছুটিতে লাগিল এবং ফিরিয়াও তাকাইল না। বলা হইল, হে মূসা! ভীত হইও না। নিশ্চয়ই আমি এমন যে, আমার সান্নিধ্যে রাসূলগণ ভয় পায় না" (২৭:১০)।
অর্থাৎ লাঠিটি মাটিতে ফেলিবার পর তিনি দেখিতে পাইলেন বিরাট এক অজগর সাপ ফণা ধরিয়া বিশাল জিহ্বা বাহির করিয়া গর্জন করিতেছে যাহা খুব দ্রুত গতিসম্পন্নও বটে। ইহা দেখিয়া মূসা (আ) ভয় পাইয়া উহার সম্মুখ হইতে দ্রুত পলায়ন করিতেছিলেন, পিছনে ফিরিয়াও তাঁকাইতে ছিলেন না। অতঃপর তাঁহার প্রতিপালক তাঁহাকে ডাকিয়া বলিলেন, হে মূসা! সম্মুখে আস, ভয় করিও না; তুমি তো নিরাপদ (২৮: ৩১)। তিনি আরো বলিলেন: আমি এমন যে, আমার সান্নিধ্যে রাসূলগণ ভয় পায় না (২৭: ১০)। এই আশ্বাসবাণী শুনিয়া তিনি ফিরিয়া আসিলেন। এইবার আল্লাহ তাঁহাকে হাত দিয়া উহা ধরিবার নির্দেশ দিয়া বলিলেন, তুমি ইহাকে ধর, ভয় করিও না! আমি ইহাকে ইহার পূর্বরূপে ফিরাইয়া দিব (২০: ২১)। কথিত আছে যে, তিনি ভয়ে তাঁহার পরিহিত পশমের জামার আস্তিনের মধ্যে হাত দিয়া উহা দ্বারা সর্পটির মুখের মধ্যভাগ ধরেন। এক বর্ণনামতে, আল্লাহ তাআলা উহা সরাইয়া খালি হাতে ধরিবার নির্দেশ দেন। অতঃপর তিনি খালি হাতেই উহার মুখের মধ্যভাগে ধরেন। বাইবেলের বর্ণনামতে তিনি লেজে ধরেন। অতঃপর ইহা তাহার পূর্বেকার সেই দুই শাখাবিশিষ্ট লাঠিতে পরিণত হইল।
টিকাঃ
আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ২৪৮
📄 দ্বিতীয় নিদর্শন
অতঃপর আল্লাহ তাআলা তাঁহাকে আরও একটি নিদর্শন প্রদান করিলেন। তাহা হইল, হাত বগলে রাখিলে উহা জ্যোতির্ময় হইয়া বাহির হইত। শ্বেতী বা অন্য কোনরূপ রোগবশত নহে। অতঃপর উহা আবার পূর্বের ন্যায় হইয়া যাইত। এই সম্পর্কে কুরআন কারীমে ইরশাদ হইয়াছে, আল্লাহ তাহাকে বলিলেন:
وَاضْمُمْ يَدَكَ إِلَى جَنَاحِكَ تَخْرُجُ بَيْضَاءَ مِنْ غَيْرِسُوْءٍ أَيَةً أُخْرَى . "এবং তোমার হাত তোমার বগলে রাখ, ইহা বাহির হইয়া আসিবে নির্মল উজ্জ্বল হইয়া অপর এক নিদর্শনস্বরূপ” (২০ঃ২২)।
وَادْخِلْ يَدَكَ فِي جَيْبِكَ تَخْرُجْ بَيْضَاءَ مِنْ غَيْرِ سُوءٍ فِي تِسْعِ أيتِ إِلَى فِرْعَوْنَ وَقَوْمِهِ إِنَّهُمْ كَانُوا قَوْمًا فسقين . "এবং তোমার হাত তোমার বক্ষ পার্শ্বে বস্ত্রের মধ্যে প্রবেশ করাও। ইহা বাহির হইয়া আসিবে শুভ্র নির্মল অবস্থায়। ইহা ফিরআওন ও তাহার সম্প্রদায়ের নিকট আনীত নয়টি নিদর্শনের অন্তর্গত। উহারা তো সত্যত্যাগী সম্প্রদায়” (২৭ঃ ১২)।
উপরিউক্ত দুইটি নিদর্শন ছাড়া আরো সাতটিসহ মোট নয়টি নিদর্শন মূসা (আ)-কে প্রদান করা হয়, যাহা উপরিউক্ত আয়াতে في تسع آیات "নয়টি নিদর্শনের অন্তর্গত"-এ ব্যক্ত হইয়াছে। অন্যান্য নিদর্শনের কথা সূরা আ'রাফে (দ্র. ১৩০-১৩৩ নং আয়াত) বর্ণিত হইয়াছে। সেইগুলির বিবরণ পরে আসিতেছে। তবে এই নয়টি নিদর্শন আল্লাহ প্রদত্ত দশটি কলেমা হইতে ভিন্ন। কারণ সেই দশটি কলেমা হইল শরঈ বিধান (যথা শিরক না করা, দূরি না করা, ব্যভিচার না করা, অন্যায়ভাবে, নরহত্যা না করা, যাদু বা গণনা না করা, মিথ্যা অপবাদ না দেওয়া প্রভৃতি)। আর এই নয়টি নিদর্শন হইল আল্লাহ্ কুদরতী বিষয়, মু'জিযা। অনেকেই ইহা একাকার করিয়া ফেলে, যাহা মারাত্মক ভ্রম।
মূসা (আ)-কে নবুওয়াত প্রদানের সময় এবং উভয়ের কথোপকথনের সময় আল্লাহ মূসা (আ)-কে আরো বহু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলিয়াছিলেন এবং নসীহত করিয়াছিলেন। ইবনুল জাওযী ও ইয়া'কূবী প্রমুখ আলিম তাঁহাদের স্ব স্ব গ্রন্থে তাহা উল্লেখ করিয়াছেন, যাহার কিছু অংশ এখানে উদ্ধৃত করা হইল:
আল্লাহ তাআলা মূসা (আ)-কে বলিলেন, নিকটবর্তী হও। অতঃপর মূসা (আ) নিকটবর্তী হইয়া উক্ত বৃক্ষের কাণ্ডের সহিত স্বীয় পিঠ ঠেক দিয়া দাঁড়াইলেন। ইহাতে তাঁহার ভয় একেবারেই দূরীভূত হইল। হাত লাঠির উপর রাখিয়া অবনত মস্তকে দাঁড়াইলেন। অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলিলেন, আমি আজ তোমাকে এমন এক মর্যাদা দান করিলাম যে, তোমার পর আর কোন মানুষ এই মর্যাদায় তোমার স্থলাভিষিক্ত হইতে পারিবে না। আমি তোমাকে নিকটতর করিয়াছি। ফলে তুমি আমার কথা শুনিতে পাইয়াছ। আর তুমি আমার সর্বনিকটতম স্থানে। তাই আমার রিসালাতের জামা পরিধান করাইলাম, ইহা দ্বারা তুমি আমার নিয়ন্ত্রণের মধ্যে শক্তিতে বলীয়ান হইবে। তুমি আমার সেনাবাহিনীর এক মহান সৈন্য। আমি তোমাকে আমার সৃষ্টির মধ্যে এক দুর্বল সৃষ্টির প্রতি প্রেরণ করিতেছি, যে আমার নি'মাতসমূহ অস্বীকার করিয়াছে। সে আমার কৌশলকে ভয় পায় না। দুনিয়া তাহাকে ধোঁকা দিয়া আমা হইতে ফিরাইয়া রাখিয়াছে। এমনি করিয়া সে আমার হক অস্বীকার করিয়াছে, আমার রবৃবিয়াত অস্বীকার করিয়াছে, আমি ছাড়া অন্যের উপাসনা করিয়াছে। ন্যায়বিচার ও দলীল-প্রমাণ যদি না হইত, যাহা আমি আমার সৃষ্টির মধ্যে স্থাপন করিয়াছি, তবে অবশ্যই আমি তাহাকে প্রবল প্রতাপশালীর শক্ত হাতে পাকড়াও করিতাম। আমার এই ক্রোধের ফলে আসমান-যমীন, পর্বত-সমুদ্র ক্রোধান্বিত হয়। আমি যদি আকাশকে নির্দেশ দেই তবে সে তাহাকে কঙ্কর নিক্ষেপে ধ্বংস করিবে। যদি যমীনকে নির্দেশ দেই তবে সে উহাকে গিলিয়া ফেলিবে। যদি পর্বতকে নির্দেশ দেই তবে সে উহাকে ধ্বংস করিয়া দিবে, আর যদি সমুদ্রকে নির্দেশ দেই তবে উহা তাহাকে ডুবাইয়া দিবে। কিন্তু আমি তাহার প্রতি অনুগ্রহপূর্ণ আচরণ করিতেছি। সে আমার দৃষ্টি হইতে সরিয়া গিয়াছে। আমি তো অমুখাপেক্ষী; আমি ছাড়া আর কেহ অমুখাপেক্ষী নহে। অতঃপর তাহার নিকট আমার রিসালাত পৌঁছাইয়া দাও। আমার ইবাদাত ও একত্ববাদের প্রতি তাহাকে দাওয়াত দাও। তাহাকে আমার নিদর্শন স্মরণ করাইয়া দাও। তাহাকে আমার প্রতিশোধের ভয় দেখাও। তাহাকে জানাইয়া দাও যে, ক্রোধ ও প্রতিশোধের চাইতে আমি ক্ষমার প্রতি দ্রুত ধাবিত হই। তাহাকে দুনিয়ার যে ক্ষমতার পোশাক পরিধান করানো হইয়াছে তাহা যেন তোমাকে ভীত না করে। কারণ তাহার মাথার অগ্রভাগ আমার হাতের মুঠায়। সে আমার অনুমতি ছাড়া কোথায়ও যাইতে, কিছু বলিতে কিংবা শ্বাস-প্রশ্বাস লইতে পারিবে না। তুমি তাহাকে বল, তোমার প্রতিপালকের আহবানে সাড়া দাও। কারণ তিনি প্রশস্ত ক্ষমার অধিকারী। তিনি তোমাকে চারি শত বৎসর অবকাশ দিয়াছেন আর প্রতি মুহূর্তেই তুমি তাঁহার বিরোধিতা করিয়াছ; তাহার পথে হইতে তাঁহার বান্দাদিগকে তুমি ফিরাইয়া রাখিয়াছ। তিনি তোমার উপর আকাশ হইতে বৃষ্টি বর্ষণ করেন, যমীন হইতে ফসল উৎপাদন করেন, তুমি রোগাক্রান্ত হও না, দরিদ্র হও না, পরাস্ত হও না। তিনি চাহিলে ইহার সবগুলিই তোমাকে দিতে পারেন এবং চাহিলে ইহা তোমা হইতে দূর করিয়া দিতে পারেন। কিন্তু তিনি বড়ই ধৈর্যশীল।
তাহার সহিত তুমি নিজেও তোমার ভ্রাতাকে লইয়া জিহাদ কর। তোমরা জিহাদের দায়িত্বপ্রাপ্ত। কারণ আমি চাহিলে তাহার নিকট এমন সৈন্য প্রেরণ করিতে পারি যাহা প্রতিহত করিবার সাধ্য তাহার নাই। কিন্তু এই দুর্বল বান্দা, যাহাকে আত্মপ্রসাদে বিভোর করিয়া রাখিয়াছে, তাহার নিজের আত্মা তাহার দলবল। সে যেন জানিতে পারে যে, আমার অনুমতিতে ক্ষুদ্র দল বৃহৎ দলের উপর বিজয় লাভ করিতে পারে। তাহার সাজসজ্জা ও আড়ম্বর যেন তোমাদিগকে অভিভূত না করে। উহার প্রতি তোমরা দৃষ্টিপাত করিবে না। কারণ উহা পার্থিব জগতের চাকচিক্য, যাহা ভোগ-বিলাসীদের সৌন্দর্য। আমি চাহিলে তোমাদিগকে দুনিয়ার এমন জাঁকজমক দিতে পারি যে, ফিরআওন তাহা দেখিলে বুঝিতে পারিবে যে, তোমাদিগকে যে সৌন্দর্য ও চাকচিক্য দেওয়া হইয়াছে, সে তাহা সঞ্চয় করিতে অক্ষম। কিন্তু আমি তোমাদের প্রতি উহা প্রদানে আগ্রহী নহি; বরং তোমাদের হইতে আমি উহা ফিরাইয়া রাখিব। পূর্ব হইতেই আমি আমার প্রিয়পাত্র ও নৈকট্য লাভকারীদের সহিত এইরূপই আচরণ করিয়া থাকি। তাহাদিগকে উহা বিলম্বে তথা আখিরাতে প্রদান করিব। কারণ আমি তাহাদিগকে দুনিয়ার ভোগবিলাস ও চাকচিক্য হইতে দূরে সরাইয়া রাখি, যেমনিভাবে দয়ার্দ্র রাখাল তাহার বকরীদিগকে ধ্বংসের ঘাটি হইতে দূরে সরাইয়া রাখে।
জানিয়া রাখো, মানুষ দুনিয়াতে যুহদ (বিরাগ) অপেক্ষা অন্য কিছু দ্বারা এত সজ্জিত হইতে পারে না। কারণ উহা মুত্তাকীদের সৌন্দর্য। উহাই তাহাদের পোশাক। জানিয়া রাখ, যে আমার প্রিয়পাত্র ও বন্ধুকে অপদস্থ করিল সে আমার সহিত প্রকাশ্যে যুদ্ধ ঘোষণা করিল এবং নিজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলিয়া দিল। আমি আমার প্রিয়পাত্র ও বন্ধুদের সাহায্য করিয়া থাকি। যে আমার সহিত যুদ্ধ ঘোষণা করিল সে কি ধারণা করে যে, সে আমার সম্মুখে টিকিতে পারিবে? যে আমার সহিত শত্রুতা পোষণ করে সে কি ধারণা করে যে, আমাকে অক্ষম করিয়া দিতে পারিবে? দুনিয়া ও আখিরাতে আমি তাহাদের প্রতি প্রতিশোধ গ্রহণকারী।
টিকাঃ
ইব্ন কাছীর, তাফসীর, উপরিউক্ত আয়াতের তাফসীর, ৩খ, ৬৬
আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ২৬৬
ইবনুল জাওযী, আল-মুনতাজাম ফিত-তারীখ, ১খ, ৩৩৯-৩৪১; তু. আল-ইয়া'কূবী, তারীখ, ১খ, ৩৪