📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মূসা (আ)-এর বিবাহ

📄 মূসা (আ)-এর বিবাহ


অতঃপর বৃদ্ধ তাঁহার এক কন্যাকে, যে মূসা (আ)-কে ডাকিতে গিয়াছিল, তাঁহার সহিত পূর্বে বর্ণিত শর্তে বিবাহ দিলেন। এক বর্ণনামতে সে ছিল উভয়ের মধ্যে কনিষ্ঠ। তাহার নাম ছিল সাফুরা, আর অন্যজনের নাম ছিল লায়্যা।
বিবাহ হইবার পর বৃদ্ধ স্বীয় জামাতা মূসা (আ)-কে একটি লাঠি আনিয়া দেওয়ার জন্য কন্যাকে নির্দেশ দিলেন। তাহার কন্যা সেই লাঠিটিই লইয়া আসিল, যাহা ফেরেশতা মানুষের বেশে আসিয়া শুআয়ব (আ)-এর নিকট আমানত রাখিয়াছিলেন। লাঠিটি ছিল 'আওসাজ' নামক বৃক্ষের কাঠ দ্বারা তৈরী। উহার অগ্রভাগ তোতা পাখীর ঠোঁটের ন্যায় বাঁকানো ছিল। এক বর্ণনামতে ইহা ছিল জান্নাতের লাঠি। আদম (আ) জান্নাত হইতে বাহির হইবার সময় উহা সঙ্গে করিয়া লইয়া আসিয়াছিলেন। অবশ্য এইসব ব্যাপারে প্রামাণ্য কোনও বর্ণনা পাওয়া যায় না। এই লাঠি দ্বারাই মূসা (আ) দশ বৎসর শু'আয়ব (আ)-এর বকরী চরান।
উতবা ইবনুন-নুদ্দার আস-সুলামী (রা) হইতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ্ (স) বলেনঃ মূসা (আ) অন্ন-বস্ত্রের ব্যবস্থা করার জন্য মযদুরীর কাজ করেন। সাঈদ ইব্‌ন জুবায়র বলেন, হীরানিবাসী এক ইয়াহুদী কুফায় আমাকে প্রশ্ন করিয়াছিল যে, মূসা (আ) কোন মেয়াদটি পূর্ণ করিয়াছিলেন? আমি বলিলাম, আমি জানি না, তবে আমি আরবের শ্রেষ্ঠ আলিম (ইব্‌ন আব্বাস)-এর নিকট যাইব এবং এই সম্পর্কে তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিব। অতঃপর হজ্জের জন্য আমি মক্কায় গমন করিলাম এবং ইব্‌ন আব্বাস (রা)-কে এই সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিলাম। তিনি বলিলেন, মূসা বেশী ও উত্তম মেয়াদটি পূরণ করিয়াছিলেন। আল্লাহ্ রাসূল যখন কোনও কথা বলেন তখন তাহা কার্যে পরিণত করেন। এক বর্ণনামতে রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, আমি জিবরাঈল (আ)-কে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম যে, মূসা (আ) কোন সময় সীমাটি পূর্ণ করিয়াছিলেন? তিনি বলিলেন, শেষ ও পরিপূর্ণ মেয়াদটি। আবু যার গিফারী (রা) হইতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ্ (স) বলেনঃ তোমাদের যখন জিজ্ঞাসা করা হইবে যে, মূসা (আ) কোন মেয়াদটি পূর্ণ করিয়াছিলেন, তখন বলিও, 'উভয়টির মধ্যে যেটি ভাল, পরিপূর্ণ ও সততাপূর্ণ। আর যখন প্রশ্ন করা হইবে, বৃদ্ধের কন্যাদ্বয়ের মধ্যে কোনটি তিনি বিবাহ করেন? তখন বলিও, কনিষ্ঠটি, যেইটি তাহাকে ডাকিতে গিয়াছিল এবং পিতাকে বলিয়াছিল : হে পিতা! তুমি তাহাকে মজুর নিয়োগ কর। কারণ তোমার মজুর হিসাবে উত্তম হইবে সেই ব্যক্তি যে শক্তিশালীও বিশ্বস্ত। বৃদ্ধ লোকটি বলিল, তুমি তাহার শক্তির কি দেখিয়াছ? সে বলিল, তিনি কূপের মুখ হইতে একটি ভারী পাথর উচু করিয়া দূরে সরাইয়া রাখিয়াছিলেন। বৃদ্ধ বলিল, তুমি তাহার বিশ্বস্ততার কি দেখিয়াছ? সে বলিল, তিনি আমাকে বলিয়াছেন, আমার পিছনে চল, সম্মুখে চলিও না।

টিকাঃ
আল-বিদায়া, ১খ, ২৪৫
আল-মুনতাজাম, ১খ, ৩৩৬
আল-কামিল ১খ, ১৩১
আল-বিদায়া, ১খ, ২৪৫
আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ২৪৫; আত-তাবারী, তারীখ, ১খ, ৩৯৯
ড. সালাহ আল-খালিদী, আল-কাসাসুল কুরআনী, ২খ, ৩৩৫

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মূসা (আ)-এর মাদয়ান ত্যাগ ও নবুওয়াতের সূচনা

📄 মূসা (আ)-এর মাদয়ান ত্যাগ ও নবুওয়াতের সূচনা


অঙ্গীকার মত হযরত মূসা (আ) মাদয়ানে তাঁহার শ্বশুরের নিকট দশ বৎসর কাটাইয়া স্বীয় স্ত্রীকে লইয়া বিদায় হওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করিলেন। বিদায়ের প্রাক্কালে তিনি স্ত্রীকে পিতার নিকট তাহার বকরীর পাল হইতে কিছু বকরী চাহিতে বলিলেন, যাহা তাহাদের জীবন ধারণের জন্য সহায়ক হইবে। অতঃপর পিতা তাহাকে সেই বৎসর মা হইতে ভিন্ন রংয়ের যেসব বকরী জন্মগ্রহণ করিয়াছিল তাহাই প্রদান করিলেন। সেইগুলি ছিল খুবই উৎকৃষ্ট জাতের বকরী। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, তোমরা শাম ভ্রমণ করিলে এখনও সেই জাতের বকরী দেখিতে পাইবে। তাহা ছিল সাদা ও কালোর মধ্যবর্তী গৌর বর্ণের।
মুফাসসিরগণের বর্ণনামতে এই সময় মূসা (আ) মিসরে স্বীয় পরিবারবর্গের সহিত দেখা করিবার জন্য উদগ্রীব ছিলেন। তাই তিনি গোপনে তাহাদের সহিত দেখা করিবার সংকল্প করিলেন। অতঃপর তিনি স্বীয় স্ত্রীকে লইয়া বাহির হইয়া পড়িলেন। সঙ্গে ছিল তাহাদের দুই পুত্র ও কিছু বকরী; তাঁহার স্ত্রী ছিলেন গর্ভবতী। ঘটনাক্রমে উহা ছিল ঘন অন্ধকারময় শীতের রজনী। বৃষ্টি বর্ষিত হইতেছিল, সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ চমকাইতেছিল এবং বজ্রপাতও হইতেছিল। তাঁহারা আশ্রয় লইবার মত সুবিধাজনক কোন গুহা পাইলেন না। অপরদিকে তিনি পথও ভুল করিয়া ফেলিয়াছিলেন, যাহার ইঙ্গিত কুরআন কারীমে পাওয়া যায়। ইরশাদ হইয়াছে:
إِذْ رَا نَارًا فَقَالَ لِأَهْلِهِ اسْكُنُوا إِنِّي أَنَسْتُ نَارًا لَعَلَى آتِيْكُمْ مِنْهَا بِقَبَسٍ أَوْ أَجِدُ عَلَى النَّارِ هُدًى . "সে যখন আগুন দেখিল তখন তাহার পরিবারবর্গকে বলিল, তোমরা এখানে থাক, আমি আগুন দেখিয়াছি। সম্ভবত আমি তোমাদের জন্য উহা হইতে জ্বলন্ত অঙ্গার আনিতে পারিব অথবা আমি উহার নিকটে কোন পথপ্রদর্শক পাইব” (২০:১০)।
তাহারা কোন দিকে চলিয়াছেন তাহাও বুঝিতে পারিতেছিলেন না। রাত্রটা কোনমতে কাটাইয়া দেওয়ার জন্য তিনি কাষ্ঠ দ্বারা অগ্নি প্রজ্জ্বলিত করিতে চাহিলেন, কিন্তু উহা প্রজ্জ্বলিত হইল না। শীত ও অন্ধকার উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাইতেছিল। এমতাবস্থায় তিনি তাঁহার ডান দিকে পশ্চিমে অবস্থিত ভূর পর্বতের দিকে প্রজ্জ্বলিত অগ্নি দেখিতে পাইলেন। অতঃপর পরিজনবর্গকে বলিলেন, "তোমরা অপেক্ষা কর, আমি আগুন দেখিয়াছি, সম্ভবত আমি সেখান হইতে তোমাদের জন্য খবর আনিতে পারি অথবা এক খণ্ড কাষ্ঠ আনিতে পারি যাহাতে তোমরা আগুন পোহাইতে পার" (২৮: ২৯)। এই অগ্নি সম্ভবত তিনি একাই দেখিয়াছিলেন, সঙ্গীরা কেহ দেখিতে পায় নাই। কারণ প্রকৃতপক্ষে ইহা অগ্নি ছিল না, ইহা ছিল আল্লাহ্ নূর যাহা সকলের পক্ষে দেখা সম্ভবপর নহে।
অতঃপর মূসা (আ) সেখানে পৌঁছিয়া দেখিতে পাইলেন আওসাজ নামক একটি সবুজ গাছের শাখা-প্রশাখা হইতে দাউ দাউ করিয়া অগ্নি বাহির হইতেছে। অগ্নির মাত্রা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাইতেছে এবং সঙ্গে সঙ্গে বৃক্ষের সবুজ শ্যামলিমাও বৃদ্ধি পাইতেছে। ইহা দেখিয়া তিনি থমকিয়া দাঁড়াইলেন এবং ভীত-সন্ত্রস্ত হইয়া ফিরিয়া যাইতে ইচ্ছা করিলেন। তখন তিনি একটি অভয় শুনিতে পাইলেন। কিরণচ্ছটা আকাশ পর্যন্ত বিস্তৃত হইয়াছিল। বৃক্ষটি ছিল পশ্চিম দিকের পাহাড়ের পাদদেশে, মূসা (আ)-এর ডাইন দিকে। কুরআন কারীমে ইরশাদ হইয়াছে:
وَمَا كُنْتَ بِجَانِبِ الْغَرْبِيِّ إِذْ قَضَيْنَا إِلَى مُوسَى الْأَمْرَ وَمَا كُنْتَ مِنَ الشَّاهِدِينَ . "মূসাকে যখন আমি বিধান দিয়াছলাম তখন তুমি পশ্চিম প্রান্তে উপস্থিত ছিলে না এবং তুমি প্রত্যক্ষদর্শীও ছিলে না" (২৮ঃ৪৪)।
মূসা (আ) যে উপত্যকায় ছিলেন তাহার নাম ছিল 'তুওয়া'। তিনি কিবলা তথা বায়তুল মাকদিসমুখী ছিলেন। উক্ত বৃক্ষ ছিল তাঁহার ডাইনে, পশ্চিম দিকে। আগুনের এই অভিনবত্ব ও বৃক্ষের সবুজ-সতেজতা দেখিয়া বিস্ময়ে হতবাক ও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া পড়িয়াছিলেন। তাওরাতের বর্ণনামতে, অগ্নির কিরণচ্ছটায় চক্ষু অন্ধ হইয়া যাওয়ার ভয়ে তিনি আপন হস্তদ্বয় দ্বারা মুখ ঢাকিয়া রাখিয়াছিলেন। এমতাবস্থায় আল্লাহ তাআলা তাঁহাকে পবিত্র উপত্যকা 'তুওয়া' হইতে আহবান করিলেন। উক্ত পবিত্র ও মুবারক ভূমির প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শনার্থে প্রথমত তাঁহাকে পায়ের জুতা খুলিতে বলিলেন। কুরআন কারীমে ইরশাদ হইয়াছে:
فَلَمَّا أَنَتَهَا نُودِيَ يَمُوسى . إِنِّي أَنَا رَبُّكَ فَاخْلَعْ نَعْلَيْكَ إِنَّكَ بِالْوَادِ الْمُقَدَّسِ طُوًى .
"অতঃপর যখন সে আগুনের নিকট আসিল তখন আহবান করিয়া বলা হইল, হে মূসা! আমিই তোমার প্রতিপালক! অতএব তোমার পাদুকা খুলিয়া ফেল। কারণ তুমি পবিত্র 'তুওয়া' উপত্যকায় রহিয়াছ” (২০: ১১-১২)।
এই ব্যাপারে মুফাসসিরগণ দুইটি বিষয়ের প্রতি আলোকপাত করিয়াছেন: (১) মূসা (আ) যে আলোকচ্ছটাকে অগ্নি মনে করিয়াছিলেন তাহা প্রকৃতপক্ষে অগ্নি ছিল না, বরং তাহা ছিল আল্লাহ্ নূরের তাজাল্লী। কিন্তু উক্ত আলোকচ্ছটার অন্তরাল হইতে তিনি যে আওয়ায শুনিয়াছিলেন তাহা কি সরাসরি আল্লাহর আহবান ছিল, না ফেরেশতার মাধ্যমে তিনি আল্লাহর আহবান শুনিয়াছিলেন? কোন কোন মুফাসসিরের মতে ইহা ছিল ফেরেশতার কণ্ঠ। ইহারই মাধ্যমে মূসা (আ) আল্লাহর সহিত কথোপকথনের মর্যাদা লাভ করেন। ইহা সরাসরি আল্লাহর আহবান ছিল না। কিন্তু মুহাক্কিক ও গবেষক আলিমগণের মতে ইহা ছিল সরাসরি আল্লাহ্র আহবান। মূসা (আ) কোন মাধ্যম ছাড়াই সরাসরি উহা শ্রবণ করেন।
(২) পবিত্র ভূমি 'তুওয়া' উপত্যকায় মূসা (আ)-কে জুতা খোলার নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে। অথচ সহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত যে, রাসূলুল্লাহ (স) ও সাহাবায়ে কিরাম জুতা পায়ে মসজিদের মধ্যে সালাত আদায় করিতেন। আর উম্মাতে মুহাম্মাদীর জন্য এখনও ইসলামী বিধান হইল জুতায় নাপাকী না থাকিলে উহা পায়ে দিয়া মসজিদের অভ্যন্তরে সালাত আদায় করা বৈধ। তাহা হইলে মূসা (আ)-কে এই নির্দেশ কেন দেওয়া হইল যে, ইহা পবিত্র ভূমি, সুতরাং তোমার জুতা খোল? ইহার উত্তর সহীহ হাদীছে উল্লিখিত হইয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স) নিজেই ইহার কারণ বিবৃত করিয়াছেন যে, মূসা (আ)-এর জুতাদ্বয় ছিল মৃত গর্দভের চামড়া দ্বারা তৈরী। ফলে উক্ত পবিত্র ভূমির সহিত তাঁহার পদদ্বয় স্পর্শ করিয়া পবিত্র হইবার জন্য উক্ত নির্দেশ দেওয়া হয়।

টিকাঃ
আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ২৪৫-২৪৬
আল-কামিল, ১খ, ১৩১
য়াকৃত আল-হামাবী, মু'জামুল বুলদান, ৫খ, ৭৭-৮৮; ড. সালাহ আল-খালিদী, আল-কাসাসুল কুরআনী, ২খ, ১১, ৩২৪-৩২৫
আল-বিদায়া, ১খ, ২৪৬
ইব্‌ন কাছীর, প্রাগুক্ত
আল-কামিল, ২খ, ১৩৬
আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ২৪৭
ইব্‌ন কাছীর, প্রাগুক্ত
ইব্‌ন কাছীর, তাফসীর, ৩খ, ১৪৩; কাসাসুল কুরআন, ১খ, ৩৯৩
আল-কামিল, ১খ, ১৩৭

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 নবুওয়াত প্রাপ্তি

📄 নবুওয়াত প্রাপ্তি


হযরত মূসা (আ)-কে প্রকৃতপক্ষে এই সময়েই আল্লাহ তাআলা সর্বোচ্চ সম্মানজনক পদ নবুওয়াত ও রিসালাত দান করেন। মহান আল্লাহ তাআলা স্বীয় একত্ববাদের ঘোষণা দিয়া তাঁহারই ইবাদতের নির্দেশ দেন এবং কিয়ামত দিবসের কথা অবহিত করেন। তাই তাওহীদ, রিসালাত ও কিয়ামত সম্পর্কে তাঁহাকে ধারণা দান করেন। এই সময়ের কথা বিভিন্ন সূরায় বিভিন্নভাবে উল্লেখ করা হইয়াছে।
ফَلَمَّا أَتَهَا نُودِيَ لِمُوسَى إِنِّي أَنَا رَبُّكَ فَاخْلَعْ نَعْلَيْكَ إِنَّكَ بِالْوَادِ الْمُقَدَّسِ طُوى، وَأَنَا اخْتَرْتُكَ فَاسْتَمِعْ لِمَا يُوحَى ، انَّنِي أَنَا اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنا فاعبدني وأقم الصلوة لذكرى أنَّ السَّاعَةَ أَتِيَةً أَكَادُ أُخْفِيْهَا لِتُجْزَى كُلُّ نَفْسٍ بِمَا تَسْعَى فَلا يَصُدِّنَّكَ عَنْهَا مَنْ لا يُؤْمِنُ بِهَا وَاتَّبَعَ هَوَاهُ فَتَرْدَى .
"অতঃপর যখন সে আগুনের নিকট আসিল তখন আহবান করিয়া বলা হইল, হে মূসা! আমিই তোমার প্রতিপালক! অতএব তোমার পাদুকা খুলিয়া ফেল। কারণ তুমি পবিত্র 'তুওয়া' উপত্যকায় রহিয়াছ। এবং আমি তোমাকে মনোনীত করিয়াছি। অতএব যাহা ওহী প্রেরণ করা হয় তাহা মনোযোগের সহিত শ্রবণ কর। আমিই আল্লাহ, আমা ব্যতীত কোন ইলাহ নাই। অতএব আমার স্মরণার্থে সালাত কায়েম কর। কিয়ামত অবশ্যম্ভাবী, আমি ইহা গোপন রাখিতে চাহি যাহাতে প্রত্যেকেই নিজ কর্মানুযায়ী ফল লাভ করিতে পারে। সুতরাং যে ব্যক্তি কিয়ামতে বিশ্বাস করে না এবং নিজ প্রবৃত্তির অনুসরণ করে সে যেন তোমাকে উহাতে বিশ্বাস স্থাপনে নিবৃত্ত না করে, নিবৃত্ত হইলে তুমি ধ্বংস হইয়া যাইবে" (২০: ১১-১৬)।
ফَلَمَّا جَاءَ هَا نُودِيَ أَنْ يُوْرِكَ مَنْ فِي النَّارِ وَمَنْ حَوْلَهَا وَسُبْحْنَ اللَّهِ رَبِّ الْعُلَمِينَ يَمُوسَى أَنَّهُ أَنَا اللَّهُ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ .
"অতঃপর সে যখন উহার (অগ্নির) নিকট আসিল তখন ঘোষিত হইল: ধন্য সে ব্যক্তি যে আছে এই অগ্নির মধ্যে এবং যাহারা আছে উহার চতুষ্পার্শ্বে। জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহ পবিত্র ও মহিমান্বিত! হে মূসা! আমি তো আল্লাহ, পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়” (২৭ঃ ৮-৯)।
فَلَمَّا أَتَهَا نُودِيَ مِنْ شَاطِئِ الْوَادِ الْأَيْمَنِ فِي البُقْعَةِ الْمُبَارَكَةِ مِنَ الشَّجَرَةِ أَنْ تُمُوسَى إِنِّي أَنَا اللَّهُ رَبُّ الْعَالَمِين.
"যখন মূসা আগুনের নিকট পৌছিল তখন উপত্যকার দক্ষিণ পার্শ্বে পবিত্র ভূমিস্থিত এক বৃক্ষের দিক হইতে তাহাকে আহ্হ্বান করিয়া বলা হইল : হে মূসা! আমিই আল্লাহ, জগতসমূহের প্রতিপালক" (২৮:৩০)।
এক বর্ণনামতে আল্লাহ তাআলা প্রথম যখন অদৃশ্য হইতে বলেন, "আমিই আল্লাহ জগতসমূহের প্রতিপালক", তখন ইহা শ্রবণ করিয়া ভয়ে মূসা (আ)-এর অন্তর কম্পিত হইল, জিহ্বা আড়ষ্ট হইয়া উঠিল এবং শক্তি নিঃশেষ হইয়া গেল। তিনি জীবনস্মৃতের ন্যায় হইয়া পড়িলেন। তখন তাঁহার মনোবল বৃদ্ধি করিবার জন্য আল্লাহ তাআলা একজন ফেরেশতা পাঠাইলেন। অতঃপর তিনি কিছুটা স্বাভাবিক হইলে আল্লাহ তাআলা তাঁহাকে পরবর্তী কথা ও অন্যান্য নিদের্শনা বাতলাইয়া দিলেন।

টিকাঃ
আল-কামিল, ১খ, ১৩৭

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আল্লাহর নিদর্শন তথা মুজিযা প্রদান

📄 আল্লাহর নিদর্শন তথা মুজিযা প্রদান


অতঃপর আল্লাহ তাহাকে জানাইলেন যে, তিনি সকল কর্মের বিধায়ক, সকল কিছুর উপর তাঁহার কর্তৃত্ব। কোন জিনিসকে 'হও' বলিলেই তাহা হইয়া যায়। ইহার জ্বলন্ত প্রমাণস্বরূপ তাঁহাকে স্বচক্ষে দেখাইয়া দেওয়ার জন্য প্রথম মুজিযা দান করেন। আল্লাহ বলিলেন, "হে মূসা! তোমার দক্ষিণ হস্তে উহা কি? সে বলিল, উহা আমার লাঠি; আমি ইহাতে ভর দেই এবং ইহা দ্বারা আঘাত করিয়া আমি আমার মেষপালের জন্য বৃক্ষপত্র ফেলিয়া থাকি এবং ইহা আমার অন্যান্য কাজেও লাগে। আল্লাহ বলিলেন, হে মূসা! তুমি ইহা নিক্ষেপ কর। অতঃপর সে উহা নিক্ষেপ করিল, সংগে সংগে উহা সাপ হইয়া ছুটিতে লাগিল। তিনি বলিলেন : তুমি ইহাকে ধর, ভয় করিও না; আমি ইহাকে ইহার পূর্ব রূপে ফিরাইয়া দিব" (২০:১৭-২১)।
বাইবেলের বর্ণনামতে তিনি আল্লাহর নিকট একটি প্রমাণ চাহিয়াছিলেন যে, মিসরবাসী যদি তাহাকে মিথ্যাবাদী বলে তবে যেন প্রমাণস্বরূপ উহা পেশ করিতে পারেন। তখন আল্লাহ তাহাকে উপরিউক্ত কথা বলিলেন।
অন্য আয়াতে বলা হইয়াছে:
وَأَلْقِ عَصَاكَ فَلَمَّا رَآهَا تَهْتَزُّ كَأَنَّهَا جَانٌّ وَلَّى مُدْبِرًا وَلَمْ يُعَقِّبْ يَمُوسَى لَا تَخَفْ إِنِّي لَا يَخَافُ لَدَى الْمُرْسَلُون.
"তুমি তোমার লাঠি নিক্ষেপ কর। অতঃপর যখন সে উহাকে সর্পের ন্যায় ছুটাছুটি করিতে দেখিল তখন সে পিছনের দিকে ছুটিতে লাগিল এবং ফিরিয়াও তাকাইল না। বলা হইল, হে মূসা! ভীত হইও না। নিশ্চয়ই আমি এমন যে, আমার সান্নিধ্যে রাসূলগণ ভয় পায় না" (২৭:১০)।
অর্থাৎ লাঠিটি মাটিতে ফেলিবার পর তিনি দেখিতে পাইলেন বিরাট এক অজগর সাপ ফণা ধরিয়া বিশাল জিহ্বা বাহির করিয়া গর্জন করিতেছে যাহা খুব দ্রুত গতিসম্পন্নও বটে। ইহা দেখিয়া মূসা (আ) ভয় পাইয়া উহার সম্মুখ হইতে দ্রুত পলায়ন করিতেছিলেন, পিছনে ফিরিয়াও তাঁকাইতে ছিলেন না। অতঃপর তাঁহার প্রতিপালক তাঁহাকে ডাকিয়া বলিলেন, হে মূসা! সম্মুখে আস, ভয় করিও না; তুমি তো নিরাপদ (২৮: ৩১)। তিনি আরো বলিলেন: আমি এমন যে, আমার সান্নিধ্যে রাসূলগণ ভয় পায় না (২৭: ১০)। এই আশ্বাসবাণী শুনিয়া তিনি ফিরিয়া আসিলেন। এইবার আল্লাহ তাঁহাকে হাত দিয়া উহা ধরিবার নির্দেশ দিয়া বলিলেন, তুমি ইহাকে ধর, ভয় করিও না! আমি ইহাকে ইহার পূর্বরূপে ফিরাইয়া দিব (২০: ২১)। কথিত আছে যে, তিনি ভয়ে তাঁহার পরিহিত পশমের জামার আস্তিনের মধ্যে হাত দিয়া উহা দ্বারা সর্পটির মুখের মধ্যভাগ ধরেন। এক বর্ণনামতে, আল্লাহ তাআলা উহা সরাইয়া খালি হাতে ধরিবার নির্দেশ দেন। অতঃপর তিনি খালি হাতেই উহার মুখের মধ্যভাগে ধরেন। বাইবেলের বর্ণনামতে তিনি লেজে ধরেন। অতঃপর ইহা তাহার পূর্বেকার সেই দুই শাখাবিশিষ্ট লাঠিতে পরিণত হইল।

টিকাঃ
আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ২৪৮

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00