📄 মূসা (আ)-এর মিসর ত্যাগ ও মাদয়ান উপস্থিতি
অতঃপর মূসা (আ) ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় মিসর শহর হইতে দ্রুত বাহির হইয়া পড়িলেন। ফিরআওনের লোকজনের ভয়ে তিনি শুধু এদিক-ওদিক তাঁকাইতেছিলেন। পথ-ঘাট ছিল সম্পূর্ণই অপরিচিত। কোথায় চলিয়াছেন তিনি আর কোথায়ই বা তাঁহার গন্তব্য ইহার কিছুই তিনি জানিতেন না। কারণ ইতোপূর্বে কখনো তিনি মিসর হইতে বাহির হন নাই। এমতাবস্থায় তিনি একমাত্র ভরসাস্থল আল্লাহর নিকট দু'আ করিলেন:
رَبِّ نَجِّنِي مِنَ الْقَوْمِ الظَّلِمِينَ. "হে আমার প্রতিপালক! তুমি জালিম সম্প্রদায় হইতে আমাকে রক্ষা কর" (২৮: ২১)।
অতঃপর মাদ্য়ান-এর দিকে মুখ করিয়া রওয়ানা হইলেন এবং সম্পূর্ণরূপে আল্লাহ্র উপর ভরসা করিয়া বলিলেন:
عسى رَبِّي أَنْ يَهْدِيَنِي سَوَاءَ السَّبَيْلِ . "আশা করি আমার প্রতিপালক আমাকে সরল পথ প্রদর্শন করিবেন" (২৮: ২২)।
মাদয়ান মিসর হইতে পূর্বদিকে অবস্থিত। ইহা ছিল লুত সম্প্রদায়ের আবাসস্থলের নিকটেই। লুত সম্প্রদায় বাস করিত মৃত সাগরের কাছেই। আর মাদয়ান ইহার নিকটেই দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অবস্থিত। খ্যাতনামা ভূগোলবিদ ইয়াকূব আল-হামাবী বলেন, আবূ যায়দের বর্ণনামতে মাদয়ান বাহর-ই কুলযুম তথা লোহিত সাগরের তীরে অবস্থিত। ইহা তাবূক হইতে সমান্তরালে ২য় মনযিল দূরে অবস্থিত। ইহা তাহা হইতে আয়তনে বড়। এখানেই সেই কূপ রহিয়াছে যাহা হইতে মূসা (আ) পানি উত্তোলন করিয়াছিলেন। ইহা সেই ভূখণ্ডকে বলা হয় যাহা আকাবা উপসাগর (خليج العقبة)-এর উত্তর-পূর্বে অবস্থিত এবং আরাবা উপত্যকা হইয়া পূর্ব ও দক্ষিণ পূর্ব দিকে তাবুক পর্যন্ত বিস্তৃত। এক বর্ণনামতে পথিমধ্যে অশ্বারোহী এক ফেরেশতা আগমন করিলেন যাহার হস্তে ছোট একটি বর্শা ছিল। সেই ফেরেশতাই তাঁহাকে পথ দেখাইয়া মাদ্য়ান পৌঁছাইয়া দিলেন। সাঈদ ইব্ন জুবায়র (র) সূত্রে বর্ণিত যে, মূসা (আ) মিসর হইতে বাহির হইয়া মাদ্য়ান-এর দিকে রওয়ানা হন। উভয় স্থানের মধ্যে দূরত্ব আট রাত্রির পথ। বলা হইয়াছে, ইহার দূরত্ব কৃষ্ণা হইতে বসরা পর্যন্ত দূরত্বের সমান। এই দীর্ঘপথে গাছের পাতা ছাড়া তাঁহার আর কোন খাবার ছিল না।
অতঃপর তিনি মাদয়ান-এর একটি পানির কূপের নিকট পৌছিয়া পানি উঠাইতে চাহিলেন, যেখানে বহু লোক পানি উঠাইতেছিল। এই মাদয়ান শহরেই শুআয়ব (আ)-এর কওম বাস করিত। সেখানে অন্যান্য লোকের সহিত দুইজন মহিলাকেও দেখিলেন যাহারা নিজদের বকরীগুলিকে অন্যের বকরী হইতে পৃথক করিয়া রাখিয়াছিল। মূসা (আ) তাহাদের নিকট গিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, "তোমাদের কী ব্যাপার?" উহারা বলিল, 'আমরা' আমাদের পশুগুলিকে পানি পান করাইতে পারি না, যতক্ষণ রাখালেরা উহাদের পশুগুলিকে সরাইয়া না নেয়। আমাদের পিতা অতি বৃদ্ধ। মুফাসসিরগণ বলেন, লোকজন যখন তাহাদের পানি তোলা সম্পন্ন করিত তখন কূপের মুখে বিশাল এক পাথরের ঢাকনা দিয়া রাখিত। অতঃপর মহিলাদ্বয় আসিয়া তাহাদের বকরীগুলিকে অন্যের বকরী পান করিয়া যে পানি অবশিষ্ট থাকিত তাহাই পান করাইত। মূসা (আ) তাহাদের প্রতি দয়াপরবশ হইয়া কূপের নিকট গেলেন এবং একাই উক্ত পাথর সরাইয়া ফেলিলেন। অতঃপর বিরাট এক বালতি পানি তুলিলেন এবং পাথরটিকে পুনরায় কূপের মুখে রাখিলেন। আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার (রা) বলেন, কূপের মুখে স্থাপিত উক্ত পাথরের ঢাকনাটি দশ ব্যক্তির কমে উঠাইতে পারিত না। মহিলাদ্বয় নিজেরা পানি পান করিল এবং বকরীগুলিকেও পান করাইল। অতঃপর মূসা (আ) একটি বৃক্ষের ছায়ায় আসিলেন। মুফাসসিরগণের বর্ণনামতে উহা ছিল একাসিরা (1) বৃক্ষ। ইবন মাসউদ (রা) বলেন, তিনি উহাকে সবুজ-শ্যামল দেখিতে পাইয়া উহার ছায়ায় আসিলেন। বৃক্ষের ছায়ায় আশ্রয় লইয়া তিনি বলিলেন:
فَسَقَى لَهُمَا ثُمَّ تَوَلَّى إِلَى الظِّلِّ فَقَالَ رَبِّ إِنِّي لِمَا أَنْزَلْتَ إِلَيَّ مِنْ خَيْرٍ فَقِيرٌ . "হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমার প্রতি যে অনুগ্রহ করিবে আমি তাহার কাঙাল" (২৮ঃ ২৪)।
ইব্ন আব্বাস (রা) বলেন, মূসা (আ) মিসর হইতে মাদয়ান পর্যন্ত গমনকালে কেবল লতা-পাতা ছাড়া আর কোন খাবার তিনি পান নাই। তিনি মিসর ত্যাগের সময় জুতা পরিহিত ছিলেন। কিন্তু অনাহারে কৃশ হইয়া যাওয়ায় উক্ত জুতা খুলিয়া পড়িয়া যায়। গাছের ছায়ায় যখন তিনি উপবেশন করেন তখন তাঁহার পেট পিঠের সঙ্গে লাগিয়া গিয়াছিল। লতা-পাতার সবুজ আভা যেন তাঁহার পেটের মধ্যে দেখা যাইতেছিল। তিনি এক টুকরা খেজুরের মুখাপেক্ষী ছিলেন। অথচ ইতোপূর্বে তিনি রাজপ্রাসাদে অফুরন্ত বিত্ত-বৈভব ও ভোগ-বিলাসের মধ্যে লালিত-পালিত হইয়াছিলেন। এইভাবেই পরীক্ষার মাধ্যমে আল্লাহ তাহার সৃষ্টিকে নিজের জন্য বাঁছাই করিয়া লন।
ওদিকে মহিলাদ্বয় অন্যান্য দিনের তুলনায় খুব তাড়াতাড়ি বাড়িতে পৌছিলে তাহাদের বৃদ্ধ পিতা ইহার কারণ জিজ্ঞাসা করিলেন। এক বর্ণনামতে মূসা (আ) গাছের ছায়ায় বসিয়া যখন বলিয়াছিলেন, 'হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমার প্রতি যে অনুগ্রহ করিবে আমি তাহার কাঙাল, তখন মহিলাদ্বয় উহা শুনিয়া ফেলিয়াছিল। তাহারা বাড়িতে ফিরিয়া গিয়া পিতাকে মূসা (আ)-এর বৃত্তান্ত বর্ণনা করিল। বৃদ্ধ তাহাদের একজনকে মূসা (আ)-কে ডাকিয়া আনিবার জন্য পাঠান। সে লজ্জাবনতভাবে আসিয়া বলিল, আমাদের পশুগুলিকে পানি পান করাইবার পারিশ্রমিক দেওয়ার জন্য আমার পিতা আপনাকে ডাকিতেছেন। সে সুস্পষ্টভাবে ইহা এইজন্য বলিয়াছিল যাহাতে আগন্তুকের মনে কোনরূপ সন্দেহের উদ্রেক না হয়। অতঃপর মূসা (আ) তাহার সহিত রওয়ানা হইলেন। মহিলা তাঁহার আগে আগে পথ দেখাইয়া লইয়া যাইতেছিল। বাতাসে তাহার কাপড় উড়িতেছিল। মূসা (আ) বলিলেন, আমার পিছনে পিছনে চল। আমি ভুল পথে গেলে আমাকে রাস্তা দেখাইয়া দিবে। এক বর্ণনামতে তিনি আরও বলিয়াছিলেন, আমরা এমন পরিবারের লোক যাহারা মহিলাদের পিছনের দিকে তাকায় না। অতঃপর মূসা (আ) শুআয়ব (আ)-এর নিকট পৌঁছিলেন এবং সমস্ত ঘটনা খুলিয়া বলিলেন। মিসর হইতে ফিরআওনের ভয়ে পালাইয়া আসার কারণও বিবৃত করিলেন। বৃদ্ধ শুআয়ব (আ) বলিলেন, ভয় করিও না! তুমি জালিম সম্প্রদায়ের কবল হইতে বাঁচিয়া গিয়াছ এবং তাহাদের ক্ষমতার বলয় হইতে বাহির হইয়া আসিয়াছ। ইহা তাহাদের রাজ্য নহে।
টিকাঃ
২৮: ২১
২৮: ২২
য়াকৃত আল-হামাবী, মু'জামুল বুলদান, ৫খ, ৭৭-৮৮; ড. সালাহ আল-খালিদী, আল-কাসাসুল কুরআনী, ২খ, ১১, ৩২৪-৩২৫
ড. সালাহ আল-খালিদী, প্রাগুক্ত
আল-কামিল, ১খ, ১৩৪
আত-তাবারী, তারীখ, ১খ, ৩৯৭
আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ২৪২-২৪৩
ইবনুল-জাওযী, আল-মুনতাজাম, ১খ, ৩৩৬; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ২৪৩
২৮ঃ ২৪
আত-তাবারী, তারীখ, ১খ, ১৯৭-৩৯৮
আত-তাবারী, তারীখ, ১খ, ৩৯৮; ইবনুল-জাওযী, আল-মুনতাজাম, ১খ, ৩৩৫; আল-কামিল, ১খ, ১৩৫
📄 মাদয়ান-এর শায়খের পরিচয়
এই বৃদ্ধ লোকটি কে ছিলেন সে সম্পর্কে মতভেদ রহিয়াছে। তবে প্রসিদ্ধ মত হইল তিনি আল্লাহ্র নবী হযরত শুআয়ব (আ)। হাসান বসরী, মালিক ইব্ন আনাস প্রমুখ এই মত উল্লেখ করিয়াছেন। একটি হাদীছেও ইহা বর্ণিত হইয়াছে, তবে উহার সনদ সন্দেহমুক্ত নহে। অনেকেই উল্লেখ করিয়াছেন যে, শুআয়ব (আ) তাঁহার কওম ধ্বংস হইবার পরও দীর্ঘকাল জীবিত ছিলেন এবং মূসা (আ)-কে পাইয়া তাঁহার এক কন্যাকে তাঁহার সহিত বিবাহ দিয়াছিলেন। ইব্ন আবী হাতিম প্রমুখ হাসান বসরী হইতে বর্ণনা করেন যে, মূসা (আ) এইখানে যে ব্যক্তির সাক্ষাত পাইয়াছিলেন তাঁহার নাম শুআয়ব। তিনি ছিলেন পানির মালিক, কিন্তু মাদয়ান-এর নবী ছিলেন না। কাহারও মতে তিনি শুআয়ব (আ)-এর ভ্রাতুষ্পুত্র ঈমানদার এক ব্যক্তি, আবার কাহারও মতে চাচাতো ভাই ছিলেন। কাহারও মতে তিনি শুআয়ব (আ)-এর কওমের এক মুমিন ব্যক্তি ছিলেন। কাহারও মতে তাঁহার এই ব্যক্তির নাম ছিল ইয়াছরূন (বিশরুন)। তাওরাতে তাহাকে ইয়াছরূন বলা হইয়াছে, যিনি মাদয়ান-এর যাজক ও প্রধান আলিম ছিলেন। ইবন আব্বাস (রা) ও আবু উবায়দা ইব্ন আবদিল্লাহর বর্ণনামতে তাঁহার নাম ছিল ইয়াছরূন। আবু উবায়দা বলেন, তিনি শুআয়ব (আ)-এর ভ্রাতুষ্পুত্র ছিলেন। আর ইব্ন আব্বাস (রা) ইহার সহিত আরো একটু যোগ করিয়া বলেন, তিনি মাদয়ান অধিপতি ছিলেন।
তাবারীর অভিমত এই যে, উক্ত শায়খের নাম সঠিকভাবে জানা যায় না। কুরআন কারীমে তাঁহার নামোল্লেখ করা হয় নাই। আর এই ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ্ (স) হইতে কোন বিশুদ্ধ হাদীছ বর্ণিত নাই। এই বৃদ্ধ ব্যক্তি শুআয়ব (আ) ছিলেন না বলিয়া যাহারা মত পোষণ করেন, তাহাদের যুক্তি এই যে, শুআয়ব (আ)-এর যুগ আতিবাহিত হইয়াছিল মূসা (আ) হইতে বহু পূর্বে। কুরআন কারীমে হযরত লূত ও শুআয়ব (আ)-এর ঘটনা প্রসঙ্গে বর্ণিত হইয়াছে যে, লূত (আ)-এর সম্প্রদায় ও মাদয়ান সম্প্রদায় স্থান ও কাল উভয় দিক হইতেই নিকটতর ছিল। লূত (আ)-এর সম্প্রদায় ধ্বংস হইয়াছিল মাদয়ান সম্প্রদায় ধ্বংস হইবার অব্যবহিত পূর্বে। তাই শুআয়ব (আ) তাঁহার সম্প্রদায়কে ইতোপূর্বে সংঘটিত লূত সম্প্রদায়ের ধ্বংসের কথা স্মরণ করাইয়া দিয়াছেন, যাহা তাহাদের স্মৃতিতে তখন জাগরিত ছিল। তাঁহার সেই কথা কুরআন কারীমে উক্ত হইয়াছে। তিনি বলেন:
وَمَا قَوْمُ لُوطٍ مِنْكُمْ بِبَعِيدٍ . "আর দূতের সম্প্রদায় তো তোমাদের হইতে দূরে নহে" (১১:৮৯)।
আর লূত (আ)-এর সম্প্রদায় ধ্বংস হইয়াছিল হযরত ইবরাহীম (আ)-এর সময়ে (দ্র. ইবরাহীম ও লূত নিবন্ধদ্বয়)। আর ইবরাহীম (আ) ও মূসা (আ)-এর মধ্যে কয়েক শতাব্দীর ব্যবধান। উহাদের মধ্যে অতিবাহিত হইয়াছেন হযরত ইসহাক, ইয়াকূব ও ইউসুফ (আ)। আর ইউসূফ (আ) ও মূসা (আ)-এর মধ্যকার ব্যবধানও অনেক। কোন কোন ঐতিহাসিকের মতে হযরত ইবরাহীম ও মূসা (আ)-এর মধ্যে চার শত বৎসরের ব্যবধান। ইহার অর্থ হইল, হযরত শুআয়ব (আ)-ও মূসা (আ) হইতে প্রায় চারি শত বৎসর পূর্বে ইনতিকাল করেন।
আধুনিক তাফসীরকার সায়্যিদ কুতুবও এই মতকে প্রধান্য দিয়া বলেন, আমি পূর্বে বলিয়াছিলাম যে, এই বৃদ্ধ ব্যক্তিটি শুআয়ব (আ)। কিন্তু এখন আমার নিকট প্রতিভাত হইয়াছে যে, তিনি আল্লাহ্র নবী হযরত শুআয়ব (আ) নহেন; বরং তিনি মাদ্য়ান-এর অন্য এক বৃদ্ধ (শাইখ)। এই প্রাধন্য দেওয়ার একটি যুক্তি এই যে, শুআয়ব (আ) তাঁহার সম্প্রদায়ের মিথ্যা সাব্যস্তকারীদের ধ্বংস প্রত্যক্ষ করিয়াছিলেন। তাঁহার সহিত মুমিন ব্যক্তি ব্যতীত আর কেহ অবশিষ্ট ছিল না। যদি তিনি আল্লাহ্র নবী শুআয়ব (আ) হইতেন এবং তাঁহার সম্প্রদায় সেই মুক্তিপ্রাপ্ত অবশিষ্ট মুমিন ব্যক্তিবর্গ হইত তবে কখনও তাহারা তাহাদের বৃদ্ধ নবীর কন্যাদের পূর্বে নিজেদের পশুগুলিকে পানি পান করাইত না। কারণ ইহা নবী ও তাঁহার কন্যাদের সহিত পূর্বেকার মুমিনদের আচরণ নহে। উপরন্তু কুরআন কারীমে স্বীয় জামাতা মূসা (আ)-এর প্রতি তাঁহার কোনও উপদেশ বাণী দেখা যায় না। অথচ মূসা (আ) দীর্ঘ দশটি বৎসর তাঁহার সান্নিধ্যে অতিবাহিত করেন। তিনি যদি আল্লাহ্র নবী শুআয়ব (আ) হইতেন তবে অবশ্যই নবী সুলভ কোনও নসীহত তাঁহার নিকট হইতে শুনা যাইত।
হিফজুর রাহমান সিউহারবী এই সকল মতামত উল্লেখপূর্ব্বক একটি গ্রহণযোগ্য বিষয় বর্ণনা করিয়াছেন যে, এই ব্যাপারে আমাদের নিকট সঠিক ও প্রাধান্যযোগ্য মত হইল তাহাই, যাহা ইব্ জারীর ও ইব্ন কাছীর-এর ন্যায় খ্যাতিমান মুহাদ্দিছ ও মুফাস্সির গ্রহণ করিয়াছেন। তাহা হইল, সুনির্দিষ্ট নাম সম্পর্কিত কোন বিশুদ্ধ রিওয়ায়াত আমাদের কাছে পৌঁছায় নাই। সেই সম্পর্কিত যে সকল রিওয়ায়াত বর্ণনা করা হইয়াছে তাহা দলীল হইবার যোগ্য নহে। কুরআন কারীমেও এ সম্পর্কে আল্লাহ্র কোন সুনির্দিষ্ট নামের উল্লেখ করা হয় নাই। এ সম্পর্কে আল্লাহই অধিক জ্ঞাত।
বৃদ্ধ লোকটি হযরত মূসা (আ)-এর মেহমানদারী করিলেন এবং তাঁহার যথাযথ মর্যাদা দিলেন। আর মূসা (আ)-ও তাঁহার বৃত্তান্ত খুলিয়া বলিলেন। তখন বৃদ্ধ তাঁহাকে সুসংবাদ দিলেন যে, তিনি জালিম সম্প্রদায় হইতে পরিত্রাণ পাইয়াছেন। তখন সেই দুই মহিলার একজন বলিল, "হে পিতা! তুমি ইহাকে মজুর নিযুক্ত কর, কারণ তোমার মজুর হিসাবে উত্তম হইবে সেই ব্যক্তি যে শক্তিশালী, বিশ্বস্ত” (২৮: ২৬)। মুফাসসিরগণের বর্ণনামতে, যে তাহাকে ডাকিতে গিয়াছিল সেই এই কথা বলিয়াছিল। প্রথমে সে তাঁহার কর্মের বিনিময় দিতে বলে, তারপর তাঁহার প্রশংসা করে যে, তিনি শক্তিশালী ও বিশ্বস্ত। উমার (রা), ইব্ন আব্বাস (রা), কাযী শুরায়হ, আবূ মালিক, কাতাদা ও মুহাম্মাদ ইব্ন্ন ইসহাক প্রমুখের বর্ণনামতে কন্যাটি এই কথা বলিবার পর তাহার পিতা তাহাকে বলিলেন, তুমি ইহা কিভাবে জানিলে? সে উত্তর করিল, তিনি পাথর উত্তোলন করিয়াছেন যাহা দশজন লোক ছাড়া উত্তোলন করিতে পারে না। আমার সঙ্গে কথা বলিবার সময় তিনি তাঁহার দৃষ্টি আনত রাখিয়াছিলেন। আর আমি যখন তাঁহার সঙ্গে আসিতেছিলাম তখন আমি তাঁহার সম্মুখে চলিতেছিলাম। তিনি বলিলেন, আমার পিছনে আস, যখন কয়েকটি পথ সম্মুখে পড়িবে তখন আমাকে ইঙ্গিতে সঠিক পথ দেখাইয়া দিবে। ইবন মাসউদ (রা) বলেন, তিন ব্যক্তি সবচাইতে দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়াছেঃ (১) ইউসুফ (আ)-এর সঙ্গী আযীয মিসরী, যখন সে ইউসুফ (আ)-কে সঙ্গে লইয়া গিয়া স্বীয় স্ত্রীকে বলিয়াছিল: اکرمی مثوه عسى أن ينفعنا أو نتخذه ولدا . "সম্মানজনকভাবে ইহার থাকিবার ব্যবস্থা কর। সম্ভবত সে আমাদের উপকারে আসিবে অথবা আমরা ইহাকে পুত্ররূপেও গ্রহণ করিতে পারি" (১২: ২১)। (২) মূসা (আ)-এর সঙ্গিনী শুআয়ব কন্যা, যখন সে বলিয়াছিলঃ يابَتِ اسْتَأْجِرْهُ إِنَّ خَيْرَ مَنِ اسْتَأْجَرْتَ الْقَوِيُّ الْأَمِينُ. "হে পিতা। তুমি ইহাকে মজুর নিযুক্ত কর, কারণ তোমার মজুর হিসাবে উত্তম হইবে সেই ব্যক্তি যে শক্তিশালী, বিশ্বস্ত” (১৮ঃ ২৬)। (৩) আবূ বাক্স (রা) যখন উমর (রা)-কে তাঁহার খলীফা নিযুক্ত করিয়াছিলেন।
টিকাঃ
আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ২৪৪
হিফজুর রহমান, কাসাস, ৩৮৮-৯
ফী জিলালিল কুরআন, ৫খ, ২৬৮৭; ড. সালাহ আল-খালিদী, আল-কাসাসুল-কুরআনী, ২খ, ৩৩৭-৩৩৯
সিউহারবী, কাসাসুল-কুরআন, ১খ, ৩৮৮
আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ২৪৪
প্রাগুক্ত
📄 মূসা (আ)-এর বিবাহ
অতঃপর বৃদ্ধ তাঁহার এক কন্যাকে, যে মূসা (আ)-কে ডাকিতে গিয়াছিল, তাঁহার সহিত পূর্বে বর্ণিত শর্তে বিবাহ দিলেন। এক বর্ণনামতে সে ছিল উভয়ের মধ্যে কনিষ্ঠ। তাহার নাম ছিল সাফুরা, আর অন্যজনের নাম ছিল লায়্যা।
বিবাহ হইবার পর বৃদ্ধ স্বীয় জামাতা মূসা (আ)-কে একটি লাঠি আনিয়া দেওয়ার জন্য কন্যাকে নির্দেশ দিলেন। তাহার কন্যা সেই লাঠিটিই লইয়া আসিল, যাহা ফেরেশতা মানুষের বেশে আসিয়া শুআয়ব (আ)-এর নিকট আমানত রাখিয়াছিলেন। লাঠিটি ছিল 'আওসাজ' নামক বৃক্ষের কাঠ দ্বারা তৈরী। উহার অগ্রভাগ তোতা পাখীর ঠোঁটের ন্যায় বাঁকানো ছিল। এক বর্ণনামতে ইহা ছিল জান্নাতের লাঠি। আদম (আ) জান্নাত হইতে বাহির হইবার সময় উহা সঙ্গে করিয়া লইয়া আসিয়াছিলেন। অবশ্য এইসব ব্যাপারে প্রামাণ্য কোনও বর্ণনা পাওয়া যায় না। এই লাঠি দ্বারাই মূসা (আ) দশ বৎসর শু'আয়ব (আ)-এর বকরী চরান।
উতবা ইবনুন-নুদ্দার আস-সুলামী (রা) হইতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ্ (স) বলেনঃ মূসা (আ) অন্ন-বস্ত্রের ব্যবস্থা করার জন্য মযদুরীর কাজ করেন। সাঈদ ইব্ন জুবায়র বলেন, হীরানিবাসী এক ইয়াহুদী কুফায় আমাকে প্রশ্ন করিয়াছিল যে, মূসা (আ) কোন মেয়াদটি পূর্ণ করিয়াছিলেন? আমি বলিলাম, আমি জানি না, তবে আমি আরবের শ্রেষ্ঠ আলিম (ইব্ন আব্বাস)-এর নিকট যাইব এবং এই সম্পর্কে তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিব। অতঃপর হজ্জের জন্য আমি মক্কায় গমন করিলাম এবং ইব্ন আব্বাস (রা)-কে এই সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিলাম। তিনি বলিলেন, মূসা বেশী ও উত্তম মেয়াদটি পূরণ করিয়াছিলেন। আল্লাহ্ রাসূল যখন কোনও কথা বলেন তখন তাহা কার্যে পরিণত করেন। এক বর্ণনামতে রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, আমি জিবরাঈল (আ)-কে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম যে, মূসা (আ) কোন সময় সীমাটি পূর্ণ করিয়াছিলেন? তিনি বলিলেন, শেষ ও পরিপূর্ণ মেয়াদটি। আবু যার গিফারী (রা) হইতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ্ (স) বলেনঃ তোমাদের যখন জিজ্ঞাসা করা হইবে যে, মূসা (আ) কোন মেয়াদটি পূর্ণ করিয়াছিলেন, তখন বলিও, 'উভয়টির মধ্যে যেটি ভাল, পরিপূর্ণ ও সততাপূর্ণ। আর যখন প্রশ্ন করা হইবে, বৃদ্ধের কন্যাদ্বয়ের মধ্যে কোনটি তিনি বিবাহ করেন? তখন বলিও, কনিষ্ঠটি, যেইটি তাহাকে ডাকিতে গিয়াছিল এবং পিতাকে বলিয়াছিল : হে পিতা! তুমি তাহাকে মজুর নিয়োগ কর। কারণ তোমার মজুর হিসাবে উত্তম হইবে সেই ব্যক্তি যে শক্তিশালীও বিশ্বস্ত। বৃদ্ধ লোকটি বলিল, তুমি তাহার শক্তির কি দেখিয়াছ? সে বলিল, তিনি কূপের মুখ হইতে একটি ভারী পাথর উচু করিয়া দূরে সরাইয়া রাখিয়াছিলেন। বৃদ্ধ বলিল, তুমি তাহার বিশ্বস্ততার কি দেখিয়াছ? সে বলিল, তিনি আমাকে বলিয়াছেন, আমার পিছনে চল, সম্মুখে চলিও না।
টিকাঃ
আল-বিদায়া, ১খ, ২৪৫
আল-মুনতাজাম, ১খ, ৩৩৬
আল-কামিল ১খ, ১৩১
আল-বিদায়া, ১খ, ২৪৫
আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ২৪৫; আত-তাবারী, তারীখ, ১খ, ৩৯৯
ড. সালাহ আল-খালিদী, আল-কাসাসুল কুরআনী, ২খ, ৩৩৫
📄 মূসা (আ)-এর মাদয়ান ত্যাগ ও নবুওয়াতের সূচনা
অঙ্গীকার মত হযরত মূসা (আ) মাদয়ানে তাঁহার শ্বশুরের নিকট দশ বৎসর কাটাইয়া স্বীয় স্ত্রীকে লইয়া বিদায় হওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করিলেন। বিদায়ের প্রাক্কালে তিনি স্ত্রীকে পিতার নিকট তাহার বকরীর পাল হইতে কিছু বকরী চাহিতে বলিলেন, যাহা তাহাদের জীবন ধারণের জন্য সহায়ক হইবে। অতঃপর পিতা তাহাকে সেই বৎসর মা হইতে ভিন্ন রংয়ের যেসব বকরী জন্মগ্রহণ করিয়াছিল তাহাই প্রদান করিলেন। সেইগুলি ছিল খুবই উৎকৃষ্ট জাতের বকরী। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, তোমরা শাম ভ্রমণ করিলে এখনও সেই জাতের বকরী দেখিতে পাইবে। তাহা ছিল সাদা ও কালোর মধ্যবর্তী গৌর বর্ণের।
মুফাসসিরগণের বর্ণনামতে এই সময় মূসা (আ) মিসরে স্বীয় পরিবারবর্গের সহিত দেখা করিবার জন্য উদগ্রীব ছিলেন। তাই তিনি গোপনে তাহাদের সহিত দেখা করিবার সংকল্প করিলেন। অতঃপর তিনি স্বীয় স্ত্রীকে লইয়া বাহির হইয়া পড়িলেন। সঙ্গে ছিল তাহাদের দুই পুত্র ও কিছু বকরী; তাঁহার স্ত্রী ছিলেন গর্ভবতী। ঘটনাক্রমে উহা ছিল ঘন অন্ধকারময় শীতের রজনী। বৃষ্টি বর্ষিত হইতেছিল, সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ চমকাইতেছিল এবং বজ্রপাতও হইতেছিল। তাঁহারা আশ্রয় লইবার মত সুবিধাজনক কোন গুহা পাইলেন না। অপরদিকে তিনি পথও ভুল করিয়া ফেলিয়াছিলেন, যাহার ইঙ্গিত কুরআন কারীমে পাওয়া যায়। ইরশাদ হইয়াছে:
إِذْ رَا نَارًا فَقَالَ لِأَهْلِهِ اسْكُنُوا إِنِّي أَنَسْتُ نَارًا لَعَلَى آتِيْكُمْ مِنْهَا بِقَبَسٍ أَوْ أَجِدُ عَلَى النَّارِ هُدًى . "সে যখন আগুন দেখিল তখন তাহার পরিবারবর্গকে বলিল, তোমরা এখানে থাক, আমি আগুন দেখিয়াছি। সম্ভবত আমি তোমাদের জন্য উহা হইতে জ্বলন্ত অঙ্গার আনিতে পারিব অথবা আমি উহার নিকটে কোন পথপ্রদর্শক পাইব” (২০:১০)।
তাহারা কোন দিকে চলিয়াছেন তাহাও বুঝিতে পারিতেছিলেন না। রাত্রটা কোনমতে কাটাইয়া দেওয়ার জন্য তিনি কাষ্ঠ দ্বারা অগ্নি প্রজ্জ্বলিত করিতে চাহিলেন, কিন্তু উহা প্রজ্জ্বলিত হইল না। শীত ও অন্ধকার উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাইতেছিল। এমতাবস্থায় তিনি তাঁহার ডান দিকে পশ্চিমে অবস্থিত ভূর পর্বতের দিকে প্রজ্জ্বলিত অগ্নি দেখিতে পাইলেন। অতঃপর পরিজনবর্গকে বলিলেন, "তোমরা অপেক্ষা কর, আমি আগুন দেখিয়াছি, সম্ভবত আমি সেখান হইতে তোমাদের জন্য খবর আনিতে পারি অথবা এক খণ্ড কাষ্ঠ আনিতে পারি যাহাতে তোমরা আগুন পোহাইতে পার" (২৮: ২৯)। এই অগ্নি সম্ভবত তিনি একাই দেখিয়াছিলেন, সঙ্গীরা কেহ দেখিতে পায় নাই। কারণ প্রকৃতপক্ষে ইহা অগ্নি ছিল না, ইহা ছিল আল্লাহ্ নূর যাহা সকলের পক্ষে দেখা সম্ভবপর নহে।
অতঃপর মূসা (আ) সেখানে পৌঁছিয়া দেখিতে পাইলেন আওসাজ নামক একটি সবুজ গাছের শাখা-প্রশাখা হইতে দাউ দাউ করিয়া অগ্নি বাহির হইতেছে। অগ্নির মাত্রা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাইতেছে এবং সঙ্গে সঙ্গে বৃক্ষের সবুজ শ্যামলিমাও বৃদ্ধি পাইতেছে। ইহা দেখিয়া তিনি থমকিয়া দাঁড়াইলেন এবং ভীত-সন্ত্রস্ত হইয়া ফিরিয়া যাইতে ইচ্ছা করিলেন। তখন তিনি একটি অভয় শুনিতে পাইলেন। কিরণচ্ছটা আকাশ পর্যন্ত বিস্তৃত হইয়াছিল। বৃক্ষটি ছিল পশ্চিম দিকের পাহাড়ের পাদদেশে, মূসা (আ)-এর ডাইন দিকে। কুরআন কারীমে ইরশাদ হইয়াছে:
وَمَا كُنْتَ بِجَانِبِ الْغَرْبِيِّ إِذْ قَضَيْنَا إِلَى مُوسَى الْأَمْرَ وَمَا كُنْتَ مِنَ الشَّاهِدِينَ . "মূসাকে যখন আমি বিধান দিয়াছলাম তখন তুমি পশ্চিম প্রান্তে উপস্থিত ছিলে না এবং তুমি প্রত্যক্ষদর্শীও ছিলে না" (২৮ঃ৪৪)।
মূসা (আ) যে উপত্যকায় ছিলেন তাহার নাম ছিল 'তুওয়া'। তিনি কিবলা তথা বায়তুল মাকদিসমুখী ছিলেন। উক্ত বৃক্ষ ছিল তাঁহার ডাইনে, পশ্চিম দিকে। আগুনের এই অভিনবত্ব ও বৃক্ষের সবুজ-সতেজতা দেখিয়া বিস্ময়ে হতবাক ও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া পড়িয়াছিলেন। তাওরাতের বর্ণনামতে, অগ্নির কিরণচ্ছটায় চক্ষু অন্ধ হইয়া যাওয়ার ভয়ে তিনি আপন হস্তদ্বয় দ্বারা মুখ ঢাকিয়া রাখিয়াছিলেন। এমতাবস্থায় আল্লাহ তাআলা তাঁহাকে পবিত্র উপত্যকা 'তুওয়া' হইতে আহবান করিলেন। উক্ত পবিত্র ও মুবারক ভূমির প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শনার্থে প্রথমত তাঁহাকে পায়ের জুতা খুলিতে বলিলেন। কুরআন কারীমে ইরশাদ হইয়াছে:
فَلَمَّا أَنَتَهَا نُودِيَ يَمُوسى . إِنِّي أَنَا رَبُّكَ فَاخْلَعْ نَعْلَيْكَ إِنَّكَ بِالْوَادِ الْمُقَدَّسِ طُوًى .
"অতঃপর যখন সে আগুনের নিকট আসিল তখন আহবান করিয়া বলা হইল, হে মূসা! আমিই তোমার প্রতিপালক! অতএব তোমার পাদুকা খুলিয়া ফেল। কারণ তুমি পবিত্র 'তুওয়া' উপত্যকায় রহিয়াছ” (২০: ১১-১২)।
এই ব্যাপারে মুফাসসিরগণ দুইটি বিষয়ের প্রতি আলোকপাত করিয়াছেন: (১) মূসা (আ) যে আলোকচ্ছটাকে অগ্নি মনে করিয়াছিলেন তাহা প্রকৃতপক্ষে অগ্নি ছিল না, বরং তাহা ছিল আল্লাহ্ নূরের তাজাল্লী। কিন্তু উক্ত আলোকচ্ছটার অন্তরাল হইতে তিনি যে আওয়ায শুনিয়াছিলেন তাহা কি সরাসরি আল্লাহর আহবান ছিল, না ফেরেশতার মাধ্যমে তিনি আল্লাহর আহবান শুনিয়াছিলেন? কোন কোন মুফাসসিরের মতে ইহা ছিল ফেরেশতার কণ্ঠ। ইহারই মাধ্যমে মূসা (আ) আল্লাহর সহিত কথোপকথনের মর্যাদা লাভ করেন। ইহা সরাসরি আল্লাহর আহবান ছিল না। কিন্তু মুহাক্কিক ও গবেষক আলিমগণের মতে ইহা ছিল সরাসরি আল্লাহ্র আহবান। মূসা (আ) কোন মাধ্যম ছাড়াই সরাসরি উহা শ্রবণ করেন।
(২) পবিত্র ভূমি 'তুওয়া' উপত্যকায় মূসা (আ)-কে জুতা খোলার নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে। অথচ সহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত যে, রাসূলুল্লাহ (স) ও সাহাবায়ে কিরাম জুতা পায়ে মসজিদের মধ্যে সালাত আদায় করিতেন। আর উম্মাতে মুহাম্মাদীর জন্য এখনও ইসলামী বিধান হইল জুতায় নাপাকী না থাকিলে উহা পায়ে দিয়া মসজিদের অভ্যন্তরে সালাত আদায় করা বৈধ। তাহা হইলে মূসা (আ)-কে এই নির্দেশ কেন দেওয়া হইল যে, ইহা পবিত্র ভূমি, সুতরাং তোমার জুতা খোল? ইহার উত্তর সহীহ হাদীছে উল্লিখিত হইয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স) নিজেই ইহার কারণ বিবৃত করিয়াছেন যে, মূসা (আ)-এর জুতাদ্বয় ছিল মৃত গর্দভের চামড়া দ্বারা তৈরী। ফলে উক্ত পবিত্র ভূমির সহিত তাঁহার পদদ্বয় স্পর্শ করিয়া পবিত্র হইবার জন্য উক্ত নির্দেশ দেওয়া হয়।
টিকাঃ
আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ২৪৫-২৪৬
আল-কামিল, ১খ, ১৩১
য়াকৃত আল-হামাবী, মু'জামুল বুলদান, ৫খ, ৭৭-৮৮; ড. সালাহ আল-খালিদী, আল-কাসাসুল কুরআনী, ২খ, ১১, ৩২৪-৩২৫
আল-বিদায়া, ১খ, ২৪৬
ইব্ন কাছীর, প্রাগুক্ত
আল-কামিল, ২খ, ১৩৬
আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ২৪৭
ইব্ন কাছীর, প্রাগুক্ত
ইব্ন কাছীর, তাফসীর, ৩খ, ১৪৩; কাসাসুল কুরআন, ১খ, ৩৯৩
আল-কামিল, ১খ, ১৩৭