📄 গণনা পুস্তক
মূসা (আ) মিসর হইতে বনী ইসরাঈলগণকে লইয়া লোহিত সাগর পার হইয়া সীনাই উপত্যকায় পৌছিবার পর আল্লাহ তাঁহাকে দ্বিতীয় বৎসরের দ্বিতীয় মাসের প্রথম দিবসে বনী ইসরাঈলের গোষ্ঠী অনুসারে, পিতৃকুলানুসারে নাম, সংখ্যানুসারে প্রত্যেক পুরুষের মস্তকের সংখ্যা গ্রহণ করিবার নির্দেশ দেন। এই পুস্তক শুরু হইয়াছে উক্ত নির্দেশের মাধ্যমে। এই পুস্তকে বর্ণিত হইয়াছে যে, মূসা (আ) কৃশীয় এক মহিলাকে বিবাহ করেন। আল্লাহর নির্দেশে মূসা (আ) বনী ইসরাঈলের সংখ্যা দ্বিতীয়বার গণনা করেন তাহাও এই পুস্তকে রহিয়াছে। আল্লাহ তা'আলা অঙ্গীকার করিয়াছিলেন যে, কনান দেশ বনী ইসরাঈলকে দিবেন। মিসর হইতে চলিয়া আসিবার পর আল্লাহ তাআলা মূসা (আ)-কে কনান দেশ নিরীক্ষণ করিবার জন্য কয়েক ব্যক্তিকে প্রেরণ করিতে নির্দেশ দেন। তাহাদের স্ব-স্ব পিতৃকুল সম্পর্কীয় এক এক বংশের মধ্যে এক একজন অধ্যক্ষকে প্রেরণ করিতে নির্দেশ দেন। তাহাতে সদাপ্রভুর আজ্ঞানুসারে মোশি পারণ প্রান্তর হইতে তাহাদিগকে প্রেরণ করিলেন। তাহারা সকলেই ইসরায়েল সন্তানগণের অধ্যক্ষ ছিলেন। তাহাদের নাম, পিতার নাম ও বংশপরিচয় এই পুস্তকে উল্লেখ করা হইয়াছে।
টিকাঃ
গণনা পুস্তক, ১২: ১
দ্র. অধ্যায় ২২
দ্র. গণনা পুস্তক, ১৩: ১-১৬
📄 দ্বিতীয় বিবরণ
ইহাতে মূসা (আ)-এর চারিটি বক্তৃতা স্থান পাইয়াছে। প্রথম বক্তৃতায় ইসরায়েলীদের মিসর ত্যাগ করত সীনয় উপত্যকায় আগমন, পবিত্র ভূমি অধিকারের নির্দেশ এবং উহা পর্যবেক্ষণ করার জন্য লোক প্রেরণ প্রভৃতির বিবরণ রহিয়াছে। দ্বিতীয় বক্তৃতায় বনী ইসরায়েল প্রদত্ত দশ আজ্ঞার পুনরুক্তি রহিয়াছে। এখানে মূসা (আ)-কে দুইখানি প্রস্তর ফলক লইয়া পর্বতে যাইতে নির্দেশ দেন। অতঃপর সদাপ্রভু ভাঙ্গিয়া যাওয়া প্রস্তর ফলকদ্বয়ের কথা মূসা (আ) কর্তৃক আনীত প্রস্তর ফলকদ্বয়ে লিখিয়া দেন। অতঃপর মূসা (আ) তাহা কাষ্ঠের এক সিন্দুক নির্মাণ করিয়া তাহাতে রাখিয়া দেন। তৃতীয় বক্তৃতায় কনান দেশে ব্যবস্থা ঘোষণা করিবার আদেশ, ঈশ্বরীয় আশীর্বাদ ও অভিশাপ বর্ণিত হইয়াছে। ইহাতে বলা হইয়াছে, ঈশ্বরের আদেশ যত্নপূর্ব্বক পালন করিলে ঈশ্বরের সকল আশীর্বাদ তাহার উপর বর্তিবে। তিনি নগরে আশীর্বাদ যুক্ত হইবেন, ক্ষেত্রে আশীর্ব্বাদ যুক্ত হইবেন, তাঁহার শরীরের ফল ভূমির ফল পশুর ফল গোরুদের বৎস ও মেষীদের শাবক আশীর্ব্বাদযুক্ত হইবে। কিন্তু ঈশ্বরের বরে কর্ণপাত না করিলে তাঁহার প্রতি প্রদত্ত আজ্ঞা ও বিধি আদেশ যত্নপূর্ব্বক পালন না করিলে এই সকল অভিশাপ তাহার প্রতি বর্তিবে ও তাহাকে আশ্রয় করিবে। তিনি নগরে শাপগ্রস্ত হইবেন ও ক্ষেত্রে শাপগ্রস্ত হইবেন। তাহার শরীরের ফল, ভূমির ফল এবং তাহার গোরুর বৎস ও মেষীদের শাবক শাপগ্রস্ত হইবে। আর চতুর্থ বক্তৃতায় ইস্রায়েলীদের ঈশ্বরীয় নিয়ম গ্রহণ, মূসা (আ)-এর গীত ইস্রায়েলীদের প্রতি মূসা (আ)-এর আশীর্ব্বাদ বর্ণিত ইহয়াছে এবং সবশেষে মূসা (আ)-এর মৃত্যু সম্পর্কিত বিবরণ উক্ত হইয়াছে।
টিকাঃ
দ্বিতীয় বিবরণ, ১০: ১-৫
২৮: ১-৫
২৮: ১৫-১৮
২য় বিবরণ, ২৯-৩৪
📄 কিবতী হত্যা
মূসা (আ) ফিরআওনের রাজপ্রাসাদে অতি আদরের সহিত বড় হন। তিনি ফিরআওনের বাহনে চড়িতেন তাহার মত পোশাক পরিধান করিতেন। তাই তাহাকে মূসা ইব্ন ফিরআওন (ফিরআওনের পুত্র মূসা) বলা হইত। একদিন ফিরআওন তাহার বাহনে চড়িয়া বাহিরে গেল। মূসা (আ) তখন তাহার নিকট ছিলেন না। অতঃপর মূসা (আ) আসিলে তাঁহাকে বলা হইল, ফিরআওন একটু পূর্বে সওয়ার হইয়া বাহির হইয়াছেন। তখন মূসাও তাহার অনুসরণে সওয়ার হইয়া বাহির হইলেন। অতঃপর "মান্য” নামক এক স্থানে পৌঁছিলেন। ইহা পুরাতন মিসরের একটি জায়গা যেখানে নবী ইউসুফ (আ)-এর বসবাস ছিল। 'ফুসতাত' হইতে উহার দূরত্ব ৬ ফারসাখ। সেখানে পৌঁছিয়া তিনি কিছুটা বিবাদ শুনিতে পাইলেন। অতঃপর মধ্যাহ্নের সময় তিনি সেখানে প্রবেশ করিলেন। তখন বাজার বন্ধ হইয়া গিয়াছিল, রাস্তায় লোকজন ছিল না। তিনি সেখানে গিয়া দেখিলেন, দুইটি লোক মারামারি করিতেছে। একজন তাহার দলের তথা বানু ইসরাঈলের— এক বর্ণনামতে সে ছিল সামিরী। আর অপরজন কিবতী বা মিসরী। কোন কোন মুফাসসির-এর বর্ণনামতে এই কিবতী ছিল ফিরআওনের বাবুর্চি। সে ইসরাঈলী লোকটিকে বিনা পারিশ্রমিকে কাজে খাটাইবার জন্য বল প্রয়োগ করিতেছিল। তখন বানু ইসরাঈলের লোকটি মূসার নিকট শত্রুর বিরুদ্ধে সাহায্য প্রার্থনা করিল। তাহার নিকট এইজন্য সাহায্য চাহিয়াছিল যে, সে ফিরআওনের পালক পুত্র। তাহারই গৃহে লালিত-পালিত হওয়ার কারণে সমগ্র মিসরে মূসা (আ)-এর প্রভাব ও প্রতিপত্তি ছিল। তদুপরি বানু ইসরাঈলেরও বিশেষ মর্যাদা ছিল এবং তাহাদেরও মাথা উঁচু হইয়াছিল এই কারণে যে, তাহারা ফিরআওনের পালক পুত্র মূসাকে দুধ পান করাইয়াছিল। তাই তাহারা ছিল মূসা (আ)-এর দুধ মায়ের বংশধর। অতঃপর মূসা (আ) ক্ষিপ্ত হইয়া কিবতীকে এক ঘুষি মারিলেন (কাতাদার বর্ণনামতে তাঁহার সঙ্গের লাঠি দিয়া আঘাত করিলেন)। কাফির ও মুশরিক কিবতী এক আঘাতেই নিহত হইল। কুরআন কারীমে ইহার বিস্তারিত বিবরণ এইভাবে দেওয়া হইয়াছে:
"সে নগরীতে প্রবেশ করিল, যখন ইহার অধিবাসীরা ছিল অসতর্ক। সেথায় সে দুইটি লোককে সংঘর্ষে লিপ্ত দেখিল, একজন তাহার নিজ দলের এবং অপরজন তাহার শত্রু দলের। মূসার দলের লোকটি উহার শত্রুর বিরুদ্ধে তাহার সাহায্য প্রার্থনা করিল। তখন মূসা উহাকে ঘুষি মারিল; এইভাবে সে তাহাকে হত্যা করিয়া বসিল। মূসা বলিল, 'ইহা তো শয়তানের কাণ্ড। সে তো প্রকাশ্য শত্রু ও বিভ্রান্তকারী" (২৮: ১৫)।
প্রকৃতপক্ষে মূসা (আ) তাহাকে হত্যা করিতে চাহেন নাই, বরং তাহাকে ধমক দিতে ও শাসন করিতে চাহিয়াছিলেন। কিন্তু যেহেতু ইহা ছিল আল্লাহর মনোনীত ও বিশিষ্ট এক নবীর ঘুষি, তাই সে ইহার চোট সহ্য করিতে না পারিয়া নিহত হয়। হত্যার ইচ্ছা না থাকিলেও লোকটি মারা যাওয়ায় মূসা (আ) লজ্জিত ও অনুতপ্ত হইলেন এবং আল্লাহ্র নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করিলেন এবং আল্লাহও তাঁহাকে ক্ষমা করিলেন। কুরআন কারীমে ইরশাদ হইয়াছে:
قَالَ رَبِّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي فَاغْفِرْ لِي فَغَفَرَ لَهُ إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ . قَالَ رَبِّ بِمَا أَنْعَمْتَ عَلَى فَلَنْ اكُونَ ظَهِيرًا لِّلْمُجْرِمِينَ.
"সে বলিল, হে আমার প্রতিপালক! আমি তো আমার নিজের প্রতি জুলুম করিয়াছি; সুতরাং আমাকে ক্ষমা কর। অতপর তিনি তাহাকে ক্ষমা করিলেন। তিনি তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। সে আরো বলিল, হে আমার প্রতিপালক! তুমি যেহেতু আমার প্রতি অনুগ্রহ করিয়াছ, তাই আমি কখনো অপরাধীদের সাহায্যকারী হইব না" (২৮: ১৬-১৭)।
অতঃপর মূসা (আ) ফিরআওন ও তাহার দলবলের ভয়ে রাত্রি যাপন করিলেন। তাহার ভয় ছিল যে, তাহারা যদি জানিতে পারে যে, বনু ইসরাঈলের এক লোককে সাহায্য করণার্থে এই নিহত লোকটিকে মূসাই হত্যা করিয়াছে, তাহা হইলে তাহাদের এই ধারণা মজবুত হইবে যে, মূসা (আ) ইসরাঈল বংশীয় লোক। গোত্রীয় ফিতনার আশঙ্কা ছিল। অতঃপর ভীত-সন্ত্রস্তভাবে পরদিন সকাল বেলা তিনি শহরে ঘোরাফিরা করিতেছিলেন। এমতাবস্থায় গতকল্যকার সেই ইসরাঈলী ব্যক্তিটি যাহাকে মূসা (আ) সাহায্য করিয়াছিলেন— চীৎকার করিয়া মূসার নিকট অন্য একজনের বিরুদ্ধে সাহায্য চাহিল, যাহার সহিত সে ঐ দিন মারামারি করিতেছিল। মূসা (আ) তাহার ঝগড়া ও মারামারি করার প্রবণতা দেখিয়া তাহাকে ভর্ৎসনা করিয়া বলিলেন, إِنَّكَ لَغَوِىٌّ مُّبِينٌ "তুমি তো স্পষ্টই এক বিভ্রান্ত ব্যক্তি"। অতঃপর তিনি সেই কিবতী লোকটিকে ধরিতে উদ্যোগ নিলেন, কেননা সে ছিল মূসারও শত্রু এবং সেই বানু ইসরাঈলী ব্যক্তিটিরও শত্রু এবং তাহার হাত হইতে বনু ইসراঈলী ব্যক্তিটিকে মুক্ত করিতে ইচ্ছা করিলেন। এই মানসে যখন তিনি কিবতীটির দিকে অগ্রসর হইলেন তখন ইসরাঈলী লোকটি মনে করিল, মূসা বুঝি তাহাকে পাকড়াও করিতে অগ্রসর হইতেছেন। কারণ একটু পূর্বেই তিনি তাহাকে ভর্ৎসনা করিয়াছেন। তাই সে বলিয়া উঠিল :
فَلَمَّا أَنْ أَرَادَ أَنْ يَبْطِشَ بِالَّذِي هُوَ عَدُوٌّ لَهُمَا قَالَ يُمُوسى أَتُرِيدُ أَنْ تَقْتُلَنِي كَمَا قَتَلْتَ نَفْسًا بِالْأَمْسِ إِنْ تُرِيدُ إِلَّا أَنْ تَكُونَ جَبَّارًا فِي الْأَرْضِ وَمَا تُرِيدُ أَنْ تَكُونَ مِنَ الْمُصْلِحِينَ .
"হে মূসা! গতকল্য তুমি যেমন এক ব্যক্তিকে হত্যা করিয়াছ সেভাবে আমাকেও কি হত্যা করিতে চাহিতেছ? তুমি তো পৃথিবীতে স্বেচ্ছাচারী হইতে চাহিতেছ, শান্তি স্থাপনকারী হইতে চাহ না" (২৮: ১৯)! তাহার এই কথার ফলে গতকল্য যে হত্যার ঘটনা ঘটিয়াছে তাহা এবং কে তাহা ঘটাইয়াছে সব কিছুই প্রকাশিত হইয়া পড়িল এবং কিবতী লোকটি ইহা শুনিয়া চলিয়া গেল। সে ফিরআওনের নিকট গিয়া মূসার বিরুদ্ধে নালিশ করিল এবং আদ্যোপান্ত সব ঘটনা বলিল। এক বর্ণনামতে উক্ত কথাগুলি মূসাকে কিবতী লোকটি বলিয়াছিল। কারণ ইসরাঈলী ব্যক্তিটিকে সাহায্য করার জোরদার ভূমিকা লইয়া অগ্রসর হইতে দেখিয়া অনুমান ও দূরদৃষ্টি দ্বারা সে উহা বলিয়াছিল। অতঃপর ফিরআওন যখন জানিতে পারিল যে, গতকল্যকার নিহত ব্যক্তিটিকে মূসা হত্যা করিয়াছে, তখন তাহাকে ধরিবার জন্য লোক পাঠাইল। ফিরআওনের লোকজন মূসার তালাশে সদর রাস্তা দিয়া বাহির হইল। তাহারা এই আশঙ্কাও করে নাই যে, মূসা নাগালের বাহিরে চলিয়া যাইবে। মূসা (আ)-এর পক্ষের একজন হিতাকাঙ্খী ও সুহৃদ শহরের প্রান্ত হইতে সংক্ষিপ্ত রাস্তা দিয়া ছুটিয়া আসিল। ফিরআওনের লোকজনের পূর্বেই সে মূসা (আ)-এর নিকট পৌছিয়া স্নেহভরে বলিল, পারিষদবর্গ তোমার সম্পর্কে পরামর্শ করিতেছে তোমাকে হত্যা করিবার জন্য। তাই তুমি এই শহর ছাড়িয়া দূরে কোথায়ও চলিয়া যাও। আমি অবশ্যই তোমার হিতাকাঙ্খী। কাহারও মতে এই কথা হযরত হিযকীল (আ) তাঁহাকে বলিয়াছিলেন। তিনি ইবরাহীম (আ)-এর দীনের উপর অটল ছিলেন এবং তিনিই সর্বপ্রথম মূসা (আ)-এর উপর ঈমান আনিয়াছিলেন।
টিকাঃ
আল-কামিল, ১খ, ১৩৩, টীকা দ্র.
আল-কামিল, ১খ, ১৩৩
আম্বিয়া-ই কুরআন, ২খ, ১২২
আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ২৪১; আল-কামিল, ১খ, ১৩৩-১৩৪
২৮: ১৫
২৮: ১৬-১৭
আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ২৪২
২৮: ১৯
আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ২৪২
আল-কামিল, ১খ, ১৩৪
📄 মূসা (আ)-এর মিসর ত্যাগ ও মাদয়ান উপস্থিতি
অতঃপর মূসা (আ) ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় মিসর শহর হইতে দ্রুত বাহির হইয়া পড়িলেন। ফিরআওনের লোকজনের ভয়ে তিনি শুধু এদিক-ওদিক তাঁকাইতেছিলেন। পথ-ঘাট ছিল সম্পূর্ণই অপরিচিত। কোথায় চলিয়াছেন তিনি আর কোথায়ই বা তাঁহার গন্তব্য ইহার কিছুই তিনি জানিতেন না। কারণ ইতোপূর্বে কখনো তিনি মিসর হইতে বাহির হন নাই। এমতাবস্থায় তিনি একমাত্র ভরসাস্থল আল্লাহর নিকট দু'আ করিলেন:
رَبِّ نَجِّنِي مِنَ الْقَوْمِ الظَّلِمِينَ. "হে আমার প্রতিপালক! তুমি জালিম সম্প্রদায় হইতে আমাকে রক্ষা কর" (২৮: ২১)।
অতঃপর মাদ্য়ান-এর দিকে মুখ করিয়া রওয়ানা হইলেন এবং সম্পূর্ণরূপে আল্লাহ্র উপর ভরসা করিয়া বলিলেন:
عسى رَبِّي أَنْ يَهْدِيَنِي سَوَاءَ السَّبَيْلِ . "আশা করি আমার প্রতিপালক আমাকে সরল পথ প্রদর্শন করিবেন" (২৮: ২২)।
মাদয়ান মিসর হইতে পূর্বদিকে অবস্থিত। ইহা ছিল লুত সম্প্রদায়ের আবাসস্থলের নিকটেই। লুত সম্প্রদায় বাস করিত মৃত সাগরের কাছেই। আর মাদয়ান ইহার নিকটেই দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অবস্থিত। খ্যাতনামা ভূগোলবিদ ইয়াকূব আল-হামাবী বলেন, আবূ যায়দের বর্ণনামতে মাদয়ান বাহর-ই কুলযুম তথা লোহিত সাগরের তীরে অবস্থিত। ইহা তাবূক হইতে সমান্তরালে ২য় মনযিল দূরে অবস্থিত। ইহা তাহা হইতে আয়তনে বড়। এখানেই সেই কূপ রহিয়াছে যাহা হইতে মূসা (আ) পানি উত্তোলন করিয়াছিলেন। ইহা সেই ভূখণ্ডকে বলা হয় যাহা আকাবা উপসাগর (خليج العقبة)-এর উত্তর-পূর্বে অবস্থিত এবং আরাবা উপত্যকা হইয়া পূর্ব ও দক্ষিণ পূর্ব দিকে তাবুক পর্যন্ত বিস্তৃত। এক বর্ণনামতে পথিমধ্যে অশ্বারোহী এক ফেরেশতা আগমন করিলেন যাহার হস্তে ছোট একটি বর্শা ছিল। সেই ফেরেশতাই তাঁহাকে পথ দেখাইয়া মাদ্য়ান পৌঁছাইয়া দিলেন। সাঈদ ইব্ন জুবায়র (র) সূত্রে বর্ণিত যে, মূসা (আ) মিসর হইতে বাহির হইয়া মাদ্য়ান-এর দিকে রওয়ানা হন। উভয় স্থানের মধ্যে দূরত্ব আট রাত্রির পথ। বলা হইয়াছে, ইহার দূরত্ব কৃষ্ণা হইতে বসরা পর্যন্ত দূরত্বের সমান। এই দীর্ঘপথে গাছের পাতা ছাড়া তাঁহার আর কোন খাবার ছিল না।
অতঃপর তিনি মাদয়ান-এর একটি পানির কূপের নিকট পৌছিয়া পানি উঠাইতে চাহিলেন, যেখানে বহু লোক পানি উঠাইতেছিল। এই মাদয়ান শহরেই শুআয়ব (আ)-এর কওম বাস করিত। সেখানে অন্যান্য লোকের সহিত দুইজন মহিলাকেও দেখিলেন যাহারা নিজদের বকরীগুলিকে অন্যের বকরী হইতে পৃথক করিয়া রাখিয়াছিল। মূসা (আ) তাহাদের নিকট গিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, "তোমাদের কী ব্যাপার?" উহারা বলিল, 'আমরা' আমাদের পশুগুলিকে পানি পান করাইতে পারি না, যতক্ষণ রাখালেরা উহাদের পশুগুলিকে সরাইয়া না নেয়। আমাদের পিতা অতি বৃদ্ধ। মুফাসসিরগণ বলেন, লোকজন যখন তাহাদের পানি তোলা সম্পন্ন করিত তখন কূপের মুখে বিশাল এক পাথরের ঢাকনা দিয়া রাখিত। অতঃপর মহিলাদ্বয় আসিয়া তাহাদের বকরীগুলিকে অন্যের বকরী পান করিয়া যে পানি অবশিষ্ট থাকিত তাহাই পান করাইত। মূসা (আ) তাহাদের প্রতি দয়াপরবশ হইয়া কূপের নিকট গেলেন এবং একাই উক্ত পাথর সরাইয়া ফেলিলেন। অতঃপর বিরাট এক বালতি পানি তুলিলেন এবং পাথরটিকে পুনরায় কূপের মুখে রাখিলেন। আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার (রা) বলেন, কূপের মুখে স্থাপিত উক্ত পাথরের ঢাকনাটি দশ ব্যক্তির কমে উঠাইতে পারিত না। মহিলাদ্বয় নিজেরা পানি পান করিল এবং বকরীগুলিকেও পান করাইল। অতঃপর মূসা (আ) একটি বৃক্ষের ছায়ায় আসিলেন। মুফাসসিরগণের বর্ণনামতে উহা ছিল একাসিরা (1) বৃক্ষ। ইবন মাসউদ (রা) বলেন, তিনি উহাকে সবুজ-শ্যামল দেখিতে পাইয়া উহার ছায়ায় আসিলেন। বৃক্ষের ছায়ায় আশ্রয় লইয়া তিনি বলিলেন:
فَسَقَى لَهُمَا ثُمَّ تَوَلَّى إِلَى الظِّلِّ فَقَالَ رَبِّ إِنِّي لِمَا أَنْزَلْتَ إِلَيَّ مِنْ خَيْرٍ فَقِيرٌ . "হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমার প্রতি যে অনুগ্রহ করিবে আমি তাহার কাঙাল" (২৮ঃ ২৪)।
ইব্ন আব্বাস (রা) বলেন, মূসা (আ) মিসর হইতে মাদয়ান পর্যন্ত গমনকালে কেবল লতা-পাতা ছাড়া আর কোন খাবার তিনি পান নাই। তিনি মিসর ত্যাগের সময় জুতা পরিহিত ছিলেন। কিন্তু অনাহারে কৃশ হইয়া যাওয়ায় উক্ত জুতা খুলিয়া পড়িয়া যায়। গাছের ছায়ায় যখন তিনি উপবেশন করেন তখন তাঁহার পেট পিঠের সঙ্গে লাগিয়া গিয়াছিল। লতা-পাতার সবুজ আভা যেন তাঁহার পেটের মধ্যে দেখা যাইতেছিল। তিনি এক টুকরা খেজুরের মুখাপেক্ষী ছিলেন। অথচ ইতোপূর্বে তিনি রাজপ্রাসাদে অফুরন্ত বিত্ত-বৈভব ও ভোগ-বিলাসের মধ্যে লালিত-পালিত হইয়াছিলেন। এইভাবেই পরীক্ষার মাধ্যমে আল্লাহ তাহার সৃষ্টিকে নিজের জন্য বাঁছাই করিয়া লন।
ওদিকে মহিলাদ্বয় অন্যান্য দিনের তুলনায় খুব তাড়াতাড়ি বাড়িতে পৌছিলে তাহাদের বৃদ্ধ পিতা ইহার কারণ জিজ্ঞাসা করিলেন। এক বর্ণনামতে মূসা (আ) গাছের ছায়ায় বসিয়া যখন বলিয়াছিলেন, 'হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমার প্রতি যে অনুগ্রহ করিবে আমি তাহার কাঙাল, তখন মহিলাদ্বয় উহা শুনিয়া ফেলিয়াছিল। তাহারা বাড়িতে ফিরিয়া গিয়া পিতাকে মূসা (আ)-এর বৃত্তান্ত বর্ণনা করিল। বৃদ্ধ তাহাদের একজনকে মূসা (আ)-কে ডাকিয়া আনিবার জন্য পাঠান। সে লজ্জাবনতভাবে আসিয়া বলিল, আমাদের পশুগুলিকে পানি পান করাইবার পারিশ্রমিক দেওয়ার জন্য আমার পিতা আপনাকে ডাকিতেছেন। সে সুস্পষ্টভাবে ইহা এইজন্য বলিয়াছিল যাহাতে আগন্তুকের মনে কোনরূপ সন্দেহের উদ্রেক না হয়। অতঃপর মূসা (আ) তাহার সহিত রওয়ানা হইলেন। মহিলা তাঁহার আগে আগে পথ দেখাইয়া লইয়া যাইতেছিল। বাতাসে তাহার কাপড় উড়িতেছিল। মূসা (আ) বলিলেন, আমার পিছনে পিছনে চল। আমি ভুল পথে গেলে আমাকে রাস্তা দেখাইয়া দিবে। এক বর্ণনামতে তিনি আরও বলিয়াছিলেন, আমরা এমন পরিবারের লোক যাহারা মহিলাদের পিছনের দিকে তাকায় না। অতঃপর মূসা (আ) শুআয়ব (আ)-এর নিকট পৌঁছিলেন এবং সমস্ত ঘটনা খুলিয়া বলিলেন। মিসর হইতে ফিরআওনের ভয়ে পালাইয়া আসার কারণও বিবৃত করিলেন। বৃদ্ধ শুআয়ব (আ) বলিলেন, ভয় করিও না! তুমি জালিম সম্প্রদায়ের কবল হইতে বাঁচিয়া গিয়াছ এবং তাহাদের ক্ষমতার বলয় হইতে বাহির হইয়া আসিয়াছ। ইহা তাহাদের রাজ্য নহে।
টিকাঃ
২৮: ২১
২৮: ২২
য়াকৃত আল-হামাবী, মু'জামুল বুলদান, ৫খ, ৭৭-৮৮; ড. সালাহ আল-খালিদী, আল-কাসাসুল কুরআনী, ২খ, ১১, ৩২৪-৩২৫
ড. সালাহ আল-খালিদী, প্রাগুক্ত
আল-কামিল, ১খ, ১৩৪
আত-তাবারী, তারীখ, ১খ, ৩৯৭
আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ২৪২-২৪৩
ইবনুল-জাওযী, আল-মুনতাজাম, ১খ, ৩৩৬; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ২৪৩
২৮ঃ ২৪
আত-তাবারী, তারীখ, ১খ, ১৯৭-৩৯৮
আত-তাবারী, তারীখ, ১খ, ৩৯৮; ইবনুল-জাওযী, আল-মুনতাজাম, ১খ, ৩৩৫; আল-কামিল, ১খ, ১৩৫