📄 বাইবেলে হযরত মূসা (আ)
বাইবেলের বিরাট একটি অংশে মূসা (আ) সম্পর্কে আলোচনা করা হইয়াছে। বিশেষত ইহার পুরাতন নিয়ম (Old Testament)-এর অন্তর্ভুক্ত পঞ্চ পুস্তক যথা আদিপুস্তক, যাত্রাপুস্তক, লেবীয় পুস্তক, গণনাপুস্তক এবং দ্বিতীয় বিবরণ। শেষোক্ত চারটির পুরাটাই জুড়িয়া রহিয়াছে মূসা (আ) সম্পর্কিত বিবরণ।
বহু শতাব্দী যাবত ইয়াহুদী ও খৃস্টানগণ তো বিশ্বাসই করিয়া আসিতেছিল যে, তাওরাতের লেখক হইতেছেন স্বয়ং হযরত মূসা (আ)। তিনি যে তাওরাতের এই পাঁচটি খণ্ড রচনা করিয়াছিলেন, খৃষ্টপূর্ব ১ম শতাব্দীর পূর্ব পর্যন্ত সেই ধারণা সঠিক বলিয়া প্রমাণ করিবার প্রয়াস অব্যাহত ছিল। ফ্লাভিয়াস জোসেফাস ও আলেকজান্দ্রিয়ার ফিলো ছিলেন এই ধারণার সমর্থক। তবে বর্তমান কালে এই ধারণা সম্পূর্ণরূপে পরিত্যক্ত হইয়াছে এবং তাওরাত যে মূসা (আ)-এর রচনা নহে সেই বিষয়ে এখন আর কাহারও দ্বিমত নাই। এখানে পঞ্চ পুস্তকের চারিটি হইতে সংক্ষেপে কিছু আলোচনা করা হইল।
টিকাঃ
বাইবেল কোরআন ও বিজ্ঞান, মূল ড.মরিস বুকাইলি, অনু. আপ্তার-উল্-আলম, পৃ. ২৪
📄 যাত্রা পুস্তক
ইহার শুরুতে তথা প্রথম অধ্যায়ে ইসরাঈলীদের বৃদ্ধি ও দৌরাত্ম্য ভোগের আলোচনা করা হইয়াছে। দ্বিতীয় অধ্যায় হইতে মূসা (আ)-এর বিবরণ শুরু হইয়াছে। প্রথমে মূসা (আ)-এর জন্ম ও তাঁহাকে সংরক্ষণের বিষয়টি বর্ণিত হইয়াছে যাহা কুরআন কারীমের বর্ণনার সহিত কিছুটা সঙ্গতিপূর্ণ। বলা হইয়াছে: "আর সেই স্ত্রী গর্ভধারণ করিয়া পুত্র প্রসব করিলেন ও শিশুটিকে সুশ্রী দেখিয়া তিন মাস গোপনে রাখিলেন। পরে আর গোপন করিতে না পারাতে তিনি এক নলের পেটরা লইয়া মেটিয়া তৈল ও আলকাতরা লেপন করিয়া তাহার মধ্যে বালকটিকে রাখিলেন ও নদী তীরস্থ নলবনে তাহা স্থাপন করিলেন। আর তাহার কি দশা ঘটে তাহা দেখিবার জন্য তাহার ভগ্নি দূরে দাঁড়াইয়া রহিল। পরে ফরৌনের কন্যা স্নানার্থে নদীতে আসিলেন এবং তাহার সহচরীগণ নদীর তীরে বেড়াইতেছিল। আর তিনি নলবনের মধ্যে ঐ পেটরা দেখিয়া আপন দাসীকে তাহা আনিতে পাঠাইলেন। পরে পেটরা খুলিয়া শিশুটিকে দেখিলেন; তখন ছেলেটি কাঁদিতেছে"।
'অতঃপর তাহাকে আনিয়া তাহার নামকরণ করা হইল মোশি অর্থাৎ টানিয়া তোলা। কেননা তিনি কহিলেন, আমি তাহাকে জল হইতে টানিয়া তুলিয়াছি'। অতঃপর তাঁহার মাদ্য়ান উপস্থিতি, সেখানে যিগ্রো নামক মাদয়ানের যাজকের কন্যাকে বিবাহ ও পুত্র সন্তান লাভ, স্বীয় শ্বশুরের মেষপাল চরানো এবং একদিন মেষপালন লইয়া গিয়া হোরেবে ঈশ্বরের পর্বতে উপস্থিতি, সেখানে সদাপ্রভুর দূতের দর্শন দান ও নবৃওয়াত প্রদানের কথা উল্লিখিত হইয়াছে। ভ্রাতা হারুন (আ)-কেও তাঁহার সঙ্গী হিসাবে নবৃওয়াত প্রদানের ঘোষণা দিয়া বলা হইয়াছে, "আর তোমার ভ্রাতা হারোন তোমার ভাববাদী হইবে"। অতঃপর ফিরআওন তাহাদের দাওয়াতে সাড়া না দেওয়ায় একে একে রক্ত, ভেক, পিত্ত, দংশক, পশুর মহামারী, মানুষ ও পশুর শরীরে ক্ষত, ভারী শিলাবৃষ্টি, পঙ্গপাল, গাঢ় অন্ধকার প্রভৃতি নিদর্শন প্রেরণ এবং বনী ইসরাঈলের মিসর ত্যাগ-এর সবিস্তার বর্ণনা দেওয়া হইয়াছে। অতঃপর মূসা (আ)-কে দশ আজ্ঞা ও নানাবিধ আজ্ঞা প্রদানের কথা উল্লিখিত হইয়াছে।
টিকাঃ
যাত্রাপুস্তক ২:২-৬
প্রাগুক্ত, ২:১০
প্রাগুক্ত, ৭: ১
📄 লেবীয় পুস্তক
এই পুস্তকে বিভিন্ন ধরনের বলি ও উহার নিয়ম উল্লেখ করা হইয়াছে। যেমন 'হোম বলির নিয়ম' সম্পর্কে বলা হইয়াছে, "পরে সদাপ্রভু মোশিকে ডাকিয়া সমাগম তাম্বু হইতে এই কথা কহিলেন, তুমি ইসরায়েল সন্তানগণকে কহ, তোমাদের কেহ যদি সদাপ্রভুর উদ্দেশ্যে উপহার উৎসর্গ করে তবে সে পশুপাল হইতে অর্থাৎ গোরু কিংবা মেষপাল হইতে আপন উপহার লইয়া উৎসর্গ করুক। সে যদি গোপাল হইতে হোমবলির উপহার দেয় তবে নির্দোষ এক পুংপশু আনিবে; সদাপ্রভুর সম্মুখে গ্রাহ্য হইবার জন্য সমাগম তাম্বুর দ্বার সমীপে আনয়ন করিবে। পরে হোমবলির মস্তকে হস্তার্পণ করিবে। আর তাহা তাহার প্রায়শ্চিত্তরূপে তাহার পক্ষে গ্রাহ্য হইবে। পরে সে সদাপ্রভুর সম্মুখে সেই গোবৎস হনন করিবে ও হারোনের পুত্র যাজকগণ তাহার রক্ত নিকটে আনিবে এবং সমাগম তাম্বুর দ্বার সমীপে স্থিত বেদির উপরে সেই রক্ত চারিদিকে প্রক্ষেপ করিবে। অতপর ভক্ষ্য নৈবেদ্যের নিয়ম, মঙ্গলার্থক বলিদানের নিয়ম, পাপার্থক ও দোষার্থক বলিদানের নিয়ম, বিবিধ বলি বিষয়ক নিয়ম প্রভৃতি। আর ইহার প্রত্যেকটিই সদাপ্রভু মোশিকে বলিয়াছেন ও শিক্ষা দিয়াছেন বলিয়া উল্লিখিত হইয়াছে। অতঃপর মূসা (আ)-এর উপর অবতীর্ণ বিভিন্ন বিধি-বিধানের কথা উল্লিখিত হইয়াছে।
টিকাঃ
লেবীয় পুস্তক, ১: ১১-৫
📄 গণনা পুস্তক
মূসা (আ) মিসর হইতে বনী ইসরাঈলগণকে লইয়া লোহিত সাগর পার হইয়া সীনাই উপত্যকায় পৌছিবার পর আল্লাহ তাঁহাকে দ্বিতীয় বৎসরের দ্বিতীয় মাসের প্রথম দিবসে বনী ইসরাঈলের গোষ্ঠী অনুসারে, পিতৃকুলানুসারে নাম, সংখ্যানুসারে প্রত্যেক পুরুষের মস্তকের সংখ্যা গ্রহণ করিবার নির্দেশ দেন। এই পুস্তক শুরু হইয়াছে উক্ত নির্দেশের মাধ্যমে। এই পুস্তকে বর্ণিত হইয়াছে যে, মূসা (আ) কৃশীয় এক মহিলাকে বিবাহ করেন। আল্লাহর নির্দেশে মূসা (আ) বনী ইসরাঈলের সংখ্যা দ্বিতীয়বার গণনা করেন তাহাও এই পুস্তকে রহিয়াছে। আল্লাহ তা'আলা অঙ্গীকার করিয়াছিলেন যে, কনান দেশ বনী ইসরাঈলকে দিবেন। মিসর হইতে চলিয়া আসিবার পর আল্লাহ তাআলা মূসা (আ)-কে কনান দেশ নিরীক্ষণ করিবার জন্য কয়েক ব্যক্তিকে প্রেরণ করিতে নির্দেশ দেন। তাহাদের স্ব-স্ব পিতৃকুল সম্পর্কীয় এক এক বংশের মধ্যে এক একজন অধ্যক্ষকে প্রেরণ করিতে নির্দেশ দেন। তাহাতে সদাপ্রভুর আজ্ঞানুসারে মোশি পারণ প্রান্তর হইতে তাহাদিগকে প্রেরণ করিলেন। তাহারা সকলেই ইসরায়েল সন্তানগণের অধ্যক্ষ ছিলেন। তাহাদের নাম, পিতার নাম ও বংশপরিচয় এই পুস্তকে উল্লেখ করা হইয়াছে।
টিকাঃ
গণনা পুস্তক, ১২: ১
দ্র. অধ্যায় ২২
দ্র. গণনা পুস্তক, ১৩: ১-১৬