📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বানু ইসরাঈলের উপর অত্যাচার

📄 বানু ইসরাঈলের উপর অত্যাচার


তাহার পূর্বেকার সব ফিরআওনই বানু ইসরাঈলের উপর অত্যাচার করিত, কিন্তু মূসা (আ)-এর সময়কার এই ফিরআওনের অত্যাচারই ছিল সবচাইতে কঠোর ও দীর্ঘমেয়াদী। সে দেখিল যে, বানু ইসরাঈলের সংখ্যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাইতেছে। ইহাতে তাহার আশংকা হয় যে, পাছে তাহারা মিসরের শত্রুদের সাহায্যকারী হইয়া যায়। অতঃপর সে তাহাদিগকে নানাভাবে অত্যাচার করিতে থাকে। তাহাদিগকে. দাস-দাসী বানাইয়া রাখে এবং কঠিনতর কার্যে নিয়োগ করে। এক শ্রেণীকে গৃহ নির্মাণ কর্মে, এক শ্রেণীকে কৃষি কর্মে, এক শ্রেণীকে উৎপাদন কর্মে লাগাইয়া রাখে। আর যে তাহার কোন কর্মে নিয়োজিত ছিল না তাহাকে রাজস্ব কর দিতে হইত। সে তাহাদিগকে বিভিন্ন দল ও গোত্রে বিভক্ত করার পরিকল্পনা করে।
এই ফিরআওন হযরত ইউসুফ (আ)-এর মর্যাদা ও মিসরের প্রতি তাঁহার অবদান সম্পর্কে ছিল অনবহিত। তাই সে বিভিন্নভাবে বানু ইসরাঈলকে শ্রম দিতে বাধ্য করে। সে তাহাদের দ্বারা রামসিস ও ফায়জুস নামক দুইটি শহর নির্মাণ করায় এবং তাহাদিগকে কঠোর পরিশ্রমে বাধ্য করে। প্রত্নতাত্ত্বিক খননের দ্বারা উক্ত শহর দুইটির পরিচয় পাওয়া যায়। একটির শিলালিপি হইতে জানা যায় যে, উহার নাম "বার-ভূম" অথবা "ফায়ছুম" যাহার অর্থ "ভূম দেবতার ঘর"। অপরটির নাম "বার রামসিস" যাহার অর্থ “রামসিস প্রাসাদ"।
সে এই অত্যাচার এই জন্য করিত যে, বনী ইসরাঈলের মধ্যে প্রচলিত একটি সুসংবাদ তাহাকে প্রভাবিত করিয়াছিল। তাহা এই যে, ইবরাহীম (আ)-এর স্ত্রী সারার সহিত মিসর অধিপতি কুকর্ম করিতে চাহিয়াছিল যাহা আল্লাহর রহমতে বাস্তবায়িত হয় নাই। উহারই প্রতিদানস্বরূপ ইবরাহীম (আ)-এর বংশে অতিসত্ত্বর এমন এক সন্তান জন্মিবে যাহার হাতে মিসরের বাদশাহের পতন হইবে। এই সুসংবাদ বনী ইসরাঈলের মধ্যে প্রসিদ্ধ ছিল। অতঃপর কিবতীগণও ইহা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করিতে থাকে, যাহা মন্ত্রীবর্গের মাধ্যমে ফিরআওনের নিকট পৌঁছে। তাই সে এই শিশুর আবির্ভাবের ভয়ে বনী ইসরাঈলের পুত্র সন্তানদিগকে হত্যা করিবার নির্দেশ দেয়।

টিকাঃ
আফীফ আবদুল ফাত্তাহ তাব্বারা, মাআল-আম্বিয়া ফিল-কুরআনিল কারীম, পৃ. ২১৭-২১৮
হিফজুর রহমান সিউহারবী, কাসাসুল-কুরআন, ১খ., ৩৬১-৩৬২
বিস্তারিত দ্র. ইবরাহীম আ. নিবন্ধ
আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ২৩৭-২৩৮

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ফিরআওনের স্বপ্ন ও মূসা (আ)-এর জন্ম

📄 ফিরআওনের স্বপ্ন ও মূসা (আ)-এর জন্ম


সুদ্দী ইব্‌ন আব্বাস (রা), ইবন মাসউদ (রা) ও অন্যান্য সাহাবী হইতে বর্ণনা করেন যে, ফিরআওন একদিন স্বপ্ন দেখিল, একটি আগুন বায়তুল মাকদিস-এর দিক হইতে অগ্রসর হইয়া আসিল। অতঃপর উহা মিসরের সকল ঘরবাড়ি ও কিবতীদিগকে পোড়াইয়া দিল, কিন্তু বাণু ইসরাঈলের কোন ক্ষতি করিল না। ঘুম হইতে জাগরিত হইয়া সে ঘাবড়াইয়া গেল এবং উক্ত স্বপ্নে বিচলিত ও শঙ্কিত হইয়া পড়িল। সে জ্যোতিষী, গণক ও 'যাদুকরদের একত্র করিল এবং তাহাদের নিকট ইহার ব্যাখ্যা জানিতে চাহিল। তাহারা বলিল, বনী ইসরাঈলের মধ্যে একটি পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করিবে। সে মিসরবাসীদের ধ্বংসের কারণ হইবে। এইজন্যই ফিরআওন তখন বনী ইসরাঈলের পুত্র সন্তানদিগকে হত্যা করিয়া কন্যা সন্তানদিগকে জীবিত রাখিবার নির্দেশ দিল।
অপর এক বর্ণনামতে, মূসা (আ)-এর আগমনের সময় নিকটবর্তী হইলে ফিরআওনের জ্যোতিষী ও গণকবৃন্দ তাহার নিকট আসিয়া বলিল, আমরা আমাদের গণনায় দেখিতে পাইতেছি যে, আপনার সময়েই বনী ইসরাঈলের মধ্যে এক পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করিবে, সে আপনার রাজত্ব ছিনাইয়া লইবে, আপনাকে আপনার দেশ হইবে বিতাড়িত করিবে এবং আপনার দীন পরিবর্তন করিয়া ফেলিবে। তখন ফিরআওন বনী ইসরাঈলের পুত্র সন্তান হত্যা করিতে নির্দেশ দিল। অতঃপর তাহার দেশের সকল কিবতী মহিলাকে একত্র করিয়া বলিল, তোমাদের সম্মুখে বনী ইসরাঈলের কোন মহিলাকে পুত্র সন্তান প্রসব করিতে দেখিলেই তাঁহাকে হত্যা করিবে। অতঃপর তাহারা তাহাই করিত, এমনকি গর্ভবতী মহিলাকেও তাহারা শাস্তি দিত। মুজাহিদ সূত্রে বর্ণিত যে, ফিরআওনের নির্দেশে বাঁশ ফাড়া হইত, অতঃপর উহা বড় ছুরির ন্যায় বানাইয়া উহার উপর গর্ভবতী মহিলাদিগকে দাঁড় করানো হইত। ফলে উক্ত মহিলা তাহার দুই পায়ের মধ্যখানে সন্তান প্রসব করিয়া দিত এবং নিজে বাঁচিবার জন্য সন্তানকে ধারালো বাঁশের উপর ফেলিয়া দিত।
এক বর্ণনামতে, সে মিসরের দুইজন ধাত্রী নিযুক্ত করে যাহাদের একজনের নাম ছিল 'শুফরা' আর অপর জনের নাম 'ফাওআ' এবং তাহাদিগকে নির্দেশ দেয় যে, কোন ইসরাঈলী মহিলা পুত্র সন্তান প্রসব করিলে তাহাকে হত্যা করিবে। আর কন্যা সন্তান প্রসব করিলে তাহা জীবিত রাখিবে। কিন্তু তাহারা এই নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করিতে পারিল না। ইহার কারণ জিজ্ঞাসা করা হইলে তাহারা বলিল যে, ইসরাঈলী মহিলাগণ খুবই শক্তিশালী। তাই ধাত্রী আসিবার পূর্বেই তাহারা সন্তান প্রসব করে। বাদশাহ ক্ষিপ্ত হইয়া ইসরাঈলীদিগকে অপদস্থ করিবার নির্দেশ দেয় এবং তাহাদিগকে ইট প্রস্তুত করা, নির্মাণ কর্ম প্রভৃতি কঠোর কাজে ব্যাপৃত রাখিবার নির্দেশ দেয় এবং তাহাদের পিছনে লোকও লাগাইয়া রাখে যাহাতে তাহারা আরাম করিতে না পারে, এই আশা করিয়া যাহাতে তাহাদের বংশবিস্তার হ্রাস পায়। কিন্তু ইহাতে কোন কাজ হইল না। ইসরাঈলী মহিলাগণ বেশী বেশী সন্তান জন্ম দিত। অতঃপর ফিরআওন তাহার সৈন্যদিগকে তাহাদের প্রত্যেক পুত্র সন্তানকে নদীতে নিক্ষেপের নির্দেশ দেয় যাহাতে সেখানে উহারা মৃত্যুবরণ করে।
এমনিভাবে বনী ইসরাঈলের সংখ্যা বিনাশ হইতে লাগিল। অতঃপর কিবতী সরদারগণ ফিরআওনের নিকট গিয়া বলিল, আপনি বনি ইসরাঈলের পুত্র সন্তানগণকে হত্যা করিতেছেন এবং বয়ঃবৃদ্ধগণ তো এমনিই মৃত্যু বরণ করিতেছে। এইভাবে এক সময় তাহাদের বংশই বিলুপ্ত হইয়া যাইবে। তাহারা তো আমাদের দাস ও শ্রমিক। তাহারা বিলুপ্ত হইয়া গেলে আমাদের কাজকে করিবে? অতঃপর ফিরআওন এক বৎসর পুত্র সন্তানদিগকে হত্যা করিতে এবং এক বৎসর হত্যা না করিতে নির্দেশ দিল। অতঃপর যে বৎসর হত্যা না করিবার নির্দেশ ছিল সেই বৎসর হারুন (আ) জন্ম গ্রহণ করেন এবং পরবর্তী যে বৎসর হত্যা করিবার নির্দেশ ছিল সেই বৎসর মূসা (আ) জন্মগ্রহণ করেন। ফিরআওন যথাসাধ্য চেষ্টা করিল যাহাতে উক্ত শিশু ভূমিষ্ঠ হইতে না পারে। এমনকি সে কিছু পুরুষ ও মহিলাকে নিযুক্ত করে যাহারা গর্ভবতী মহিলাদের নিকট যাতায়াত করিত এবং তাহাদের সন্তান কোন দিন জন্মগ্রহণ করিবে, খোঁজ-খবর লইয়া তাহা নিরূপণ করিত। তাই কোনও মহিলা পুত্র সন্তান প্রসব করার সঙ্গে সঙ্গেই তাহারা উহাকে হত্যা করিত।
তবে মূসা (আ) গর্ভে আসার পর কেহই তাহা টের পাইল না একমাত্র তাহার ভগ্নী মরিয়াম ব্যতীত। ফলে সকলের অগোচরেই মূসা (আ) ভূমিষ্ঠ হইলেন। তিনি ভূমিষ্ট হইবার পর তাঁহার মাতা খুবই চিন্তিত ও বিচলিত হইয়া পড়িলেন। তখন আল্লাহ তাআলা প্রত্যাদেশ নাযিল করিলেন:
وَأَوْحَيْنَا إِلَى أُمِّ مُوسَى أَنْ أَرْضِعِيهِ فَإِذَا خِفْتِ عَلَيْهِ فَالْقِيْهِ فِي الْيَمِّ وَلَا تَخَافِي وَلَا تَحْزَنِي إِنَّا رَادُّوهُ اليكِ وَجَاعِلُوهُ مِنَ الْمُرْسَلِينَ (۷ : ۲۸)
"মূসার জননীর কাছে আমি ইঙ্গিতে নির্দেশ করিলাম, শিশুটিকে স্তন্যদান করিতে থাক। যখন তুমি তাহার সম্পর্কে কোন আশঙ্কা করিবে তখন ইহাকে দরিয়ায় নিক্ষেপ করিও এবং ভয় করিও না, দুঃখ করিও না। আমি ইহাকে তোমার নিকট ফিরাইয়া দিব এবং ইহাকে রাসূলদের একজন করিব" (২৮:৭)।
আল্লাহ তাআলা তাহাকে একটি বাক্স বানাইয়া উহাতে করিয়া শিশু মূসাকে নদীতে ভাসাইয়া দিতে নির্দেশ দিলেন। কুরআন কারীমে ইরশাদ হইয়াছে:
إِذْ أَوْحَيْنَا إِلَى أُمِّكَ مَا يُوحَى . أَنِ اقْدَفِيهِ فِي التَّابُوتِ فَاقَدْ فِيهِ فِي الْيَمَ فَلْيُلْقِهِ الْيَمُّ بِالسَّاحِلِ يَأْخُذُهُ عَدُوٌّ لِي وَعَدُوٌّ لَهُ وَالْقَيْتُ عَلَيْكِ مَحَبَّةٌ مِنِّي وَلِتُصْنَعَ عَلَى عَيْنِي.
"যখন আমি তোমার মাতার অন্তরে ইঙ্গিত দ্বারা নির্দেশ দিয়াছিলাম যাহা ছিল নির্দেশ করিবার, এই মর্মে যে, তুমি তাহাকে সিন্দুকের মধ্যে রাখ, অতঃপর উহা দরিয়ায় ভাসাইয়া দাও যাহাতে দরিয়া উহাকে তীরে ঠেলিয়া দেয়, উহাকে আমার শত্রু ও উহার শত্রু লইয়া যাইবে" (২০ : ৩০-৪০)। অতঃপর মাতা তাহাকে দুধ পান করাইলেন এবং একজন কাঠমিস্ত্রী ডাকাইয়া একটি বাক্স তৈরি করাইলেন, যাহাতে চাবি ছিল অভ্যন্তরভাগে।

টিকাঃ
আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ২৩৮; আত-তাবারী, তারীখ, ১খ, ৩৮৮; আল-কামিল, ১খ, ১৩১
আত-তাবারী, তারীখ, ১খ, ৩৮৭; আল-কামিল, ১খ, ১৩১
আবদুল ওয়াহহাব আন-নাজ্জার, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ১৫৫-১৫৬
আল-মুনতাজাম, ১খ, ৩৩৩
আত-তাবারী, তারীখ, ১খ, ৩৮৯; আল-কামিল, ১খ, ১৩২

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ফিরআওন গৃহে মূসা (আ)

📄 ফিরআওন গৃহে মূসা (আ)


এমনিভাবে একদিন তিনি উক্ত রশির প্রান্ত নিজের নিকট বাঁধিয়া রাখিতে ভুলিয়া গেলেন। তখন মূসা (আ)-সহ বাক্স নীল নদে ভাসিয়া গেল। এক বর্ণনামতে বাক্সটি যখন তাহার দৃষ্টি সীমার বাহিরে চলিয়া গেল তখন ইবলীস আসিয়া তাহাকে ধোঁকা দিতে লাগিল। অতঃপর তিনি মনে মনে বলিলেন, আহা! আমি নিজ হাতে কি কাজ করিলাম। আমার সম্মুখে যদি তাহাকে হত্যাও করা হইত এবং আমি তাঁহাকে কাফন পরাইয়া কবর দিতাম তাহাই তো ভাল হইত। এখন তো নিজ হাতে সমুদ্রের মাছ ও হাঙ্গর কুমিরের নিকট সোপর্দ করিয়া দিলাম। অতঃপর তিনি নিজ কন্যা ও মূসা (আ)-এর ভগ্নি মারয়ামকে উহার অনুসরণে গমন করিবার নির্দেশ দিলেন। কুরআন কারীমে ইরশাদ হইয়াছে:
وَقَالَتْ لِأُخْتِهِ قُصِيْهِ فَبَصُرَتْ بِهِ عَنْ جُنْب وَهُمْ لَا يَشْعُرُونَ (۲۸ : ۱۱) মূসার ভগ্নীকে সে বলিল, "ইহার পেছনে পেছনে যাও। সে উহাদের অজ্ঞাতসারে দূর হইতে তাহাকে দেখিতেছিল" (২৮:১১)।
অতঃপর সমুদ্রের ঢেউ তাহাকে একবার উপরে তুলিতেছিল, একবার নীচে নামাইতেছিল। এমনি করিয়া মূসা (আ)-কে বহনকারী বাক্সটি ফিরআওনের বাড়ির নিকট গাছপালা ও ঝোপ-ঝাড়ের মধ্যে গিয়া পৌছিল। ফিরআওনের দাসীরা গোসল করিতে গিয়া উহা দেখিতে পাইয়া উঠাইয়া লইয়া আসিল, কিন্তু উহার বদ্ধ মুখ তাহারা খুলিতে পারিল না। অতঃপর উহা ফিরআওনের স্ত্রী আসিয়া বিন্ত মুষাহিম-এর নিকট লইয়া গেল। তাহারা মনে করিয়াছিল, উহাতে বুঝি ধনরত্ন রহিয়াছে। কুরআন কারীমে তাহার এই ঘটনার কথা এইভাবে উল্লিখিত হইয়াছে: فَالْتَقَطَهُ أَلُ فِرْعَوْنَ لِيَكُونَ لَهُمْ عَدُوا وَحَزَنًا (۲۸ : ۸) "অতঃপর ফিরআওনের লোকজন তাহাকে উঠাইয়া লইল। ইহার পরিণাম তো এই ছিল যে, সে উহাদের শত্রু ও দুঃখের কারণ হইবে" (২৮:৮)।
অতঃপর বাক্স খুলিয়া দেখা গেল অপরূপ সুন্দর ফুটফুটে চাঁদের মত এক শিশু, প্রকৃতপক্ষে নবুওয়াতের নূরে তাঁহার চেহারা ঝলমল করিতেছিল। তাহাকে দেখিবামাত্র আসিয়ার অন্তরে শিশুটির প্রতি গভীর স্নেহ ও মমতার উদ্রেক হইল। অতঃপর ফিরআওন আসিয়া বলিল, ইহা কি? সে শিশুটিকে হত্যার নির্দেশ দিল। কিন্তু আসিয়া শিশুটির পক্ষ হইয়া ইহার বিরোধিতা করিলেন, যাহা কুরআন কারীমে এইভাবে বর্ণিত হইয়াছে: وَقَالَتِ امْرَأَتُ فِرْعَوْنَ قُرَّةٌ عَيْنٍ لِي وَلَكَ لا تَقْتُلُوهُ عَسَى أَنْ يُنْفَعَنَا أَوْ نَتَّخِذَهُ وَلَدًا وَهُمْ لَا يَشْعُرُونَ (۲۸:۹) "ফিরআওনের স্ত্রী বলিল : এই শিশু আমার ও তোমার নয়ন-প্রীতিকর। ইহাকে হত্যা করিও না, সে আমাদের উপকারে আসিতে পারে, আমরা সন্তান হিসাবেও তাহাকে গ্রহণ করিতে পারি" (২৮:৯)।
ফিরআওন বলিল, আমি আশঙ্কা করিতেছি যে, ইহা বনী ইসরাঈলের শিশু এবং হয়তো বা ইহার হাতেই আমার ধ্বংশ হইবে। বর্ণিত আছে যে, আসিয়া যখন বলিল, "এই শিশু আমার ও তোমার চোখের মণি হইবে" তখন ফিরআওন বলিয়াছিল, "তোমার ব্যাপারে ঠিক আছে কিন্তু আমার ব্যাপারে নহে” অর্থাৎ তাহাকে দিয়া আমার কোন প্রয়োজন নাই এবং সে আমার চোখের মণি হইবে না। বলা হইয়া থাকে الْبَلاءُ مُؤَكَّلٌ بِالْقَوْلِ অর্থাৎ বিপদাপদ আপন কথার দ্বারাই আসে। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, যাঁহার নামে কসম করা হয় তাঁহার কসম! ফিরআওন যদি সেই দিন তাঁহাকে চোখের মণি বলিয়া স্বীকার করিত, আসিয়া যেমন করিয়াছিলেন তাহা হইলে আল্লাহ অবশ্যই তাহাকে হিদায়াত দান করিতেন, যেমন হিদায়াত দান করিয়াছিলেন আসিয়াকে। আসিয়া যে বলিয়াছিলেন عَسَى أَنْ يُنْفَعَنَا "হয়ত সে আমাদের উপকারে আসিবে", তিনি যে উপকারের আশা করিয়াছিলেন আল্লাহ তাঁহাকে তাহা 'দান করিয়াছিলেন। দুনিয়াতে এইভাবে যে, তাঁহার দ্বারা আল্লাহ তাঁহাকে হিদায়াত দান করিয়াছিলেন, আর আখিরাতে এইভাবে যে, তাঁহার কারণেই তাঁহাকে জীন্নাত দান করিবেন, (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ., ২৪০)। তাহাদের কোন পুত্র সন্তান ছিল না, তাই শিশুটিকে তাহীরা পালক পুত্ররূপে গ্রহণ করিল। ইহার প্রতিই কুরআন কারীমে ইঙ্গিত করা হইয়াছে: وَلَدُ )خ "অথবা আমরা উহাকে পুত্ররূপে গ্রহণ করিব"।
এদিকে মূসা (আ)-এর মাতার মনে শুধু একটিই চিন্তা ছিল যে, তাহার শিশু পুত্রের না জানি কি হইল! আল্লাহ তাহাকে সবরের ক্ষমতা দান করিলেন এবং তাহার পুত্রকে তাহার নিকটু ফিরাইয়া দেওয়ার ব্যবস্থা করিলেন। শিশু পুত্রকে দুধ পান করানোর জন্য ধাত্রী মহিলাদিগকে ডাকা হইল। তাঁহারা তাহাকে দুধ পান করাইতে পারিলে ফিরআউনের প্রাসাদে স্থান পাওয়া এবং মোটা অংকের বখশিশ পাওয়ার আশায় সকলেই আগ্রহভরে আগমন করিল। প্রত্যেকেই তাঁহাকে দুধ পান করানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করিল কিন্তু শিশু পুত্র কাহারও দুধ পান করিল না। কারণ আল্লাহ যে তাঁহাকে স্বীয় মাতৃক্রোড়ে ফিরাইয়া দিবেন বলিয়া অঙ্গীকার করিয়াছিলেন, তাই আল্লাহ' অন্য মহিলার দুধ পান করা তাঁহার জন্য হারাম করিয়া দিয়াছিলেন। কুরআন কারীমে ইরশাদ হইয়াছে: وَحَرَّمْنَا عَلَيْهِ المَرَاضِعَ مِنْ قَبْلُ (۱۲ : ۲۸) "পূর্ব হইতেই আমি ধাত্রী স্তন্য পানে তাহাকে বিরত রাখিয়াছিলাম” (২৮: ১২) ইহাতে আসিয়া ও অন্যান্য সকলে খুবই বিচলিত হইয়া পড়িল এবং বিভিন্নভাবে তাঁহাকে দুধ পান করাইরার চেষ্টা করিল, কিন্তু কৃতকার্য হইল-না। শিশু মূসা (আ) অন্য কাহারও দুধ বা কিছুই গ্রহণ করিলেন না। অতঃপর তাঁহাকে মহিলাদেরসহ বাজারে পাঠাইয়া দেওয়া হইল ইহা দেখিবার জন্য যে, সেখানে কোনও মহিলার দুধ পান করে কি না। এদিকে তাঁহার ভগ্নী মরিয়াম মায়ের নির্দেশ মত বাক্সটিকে অনুসরণ করিয়া লোকজনের সহিত সেখানে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছিলেন। তিনি তাহাদের এই অবস্থা দেখিয়া নিজের পরিচয় গোপন রাখিয়া তাহাদিগকে বলিলেন: هَلْ أَدُلُّكُمْ عَلَى أَهْلِ بَيْتِ يَكْفُلُونَهُ لَكُمْ وَهُمْ لَهُ نَاصِحُونَ (۲۸:۱۲) -"তোমাদিগকে কি আমি এমন এক পরিবারের সন্ধান দিব যাহারা তোমাদের হইয়া ইহাকে লালন-পালন করিবে, এবং ইহার মঙ্গলকামী হইবে" (২৮:১২)।
ইবন আব্বাস (রা) বলেন, তিনি এই কথা বলার পর তাহারা বলিল, 'উহারা তাহার মঙ্গল কামনা করিবে এবং তাহাকে স্নেহ করিবে' এই কথা দ্বারা কি বুঝাইতে চাহিতেছ। তাহারা কি ইহাকে চিনে? তাহারা এই ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করিতেছিল। এক বর্ণনামতে তাহারা তাহাকে পাকড়াও করিল এবং উক্ত কথাগুলি বলিল। তিনি ইহার উত্তরে বলিলেন, বাদশাহর সহিত সম্পর্ক সৃষ্টি হওয়ার এবং তাহার নিকট হইতে উপকার লাভের আশায় উহারা তাহার মঙ্গলকামী হইবে এবং তাহাকে স্নেহ করিবে। অতঃপর তাহারা মরিয়াম-এর সহিত তাহাদের বাড়িতে গেল। শিশুটিকে তাহার মাতা কোলে লইয়া দুধ দিল। অমনি সে উহা চোষণ করিতে লাগিল এবং দুধপান করিতে লাগিল। ইহাতে তাহারা খুবই সন্তুষ্ট হইল। তাহাদের মধ্য হইতে একজন তাড়াতাড়ি আসিয়া আসিয়াকে এই সুসংবাদ দিল। অতঃপর আসিয়া তাহাকে রাজ-প্রাসাদে ডাকাইয়া আনিলেন এবং তাহার নিকট সেখানে থাকিয়া বাচ্চাকে দুধ পান করাইবার প্রস্তাব দিলেন। কিন্তু তিনি তাহাতে অপারগতা প্রকাশ করিয়া বলিলেন, আমার স্বামী-সন্তান রহিয়াছে। কাজেই আমি উহা পারিব না। তবে আপনি যদি বাচ্চাকে আমার সহিত পাঠাইয়া দেন তবে বাড়ীতে বসিয়া দুধ পান করানো আমার দ্বারা সম্ভব হইতে পারে। অতঃপর আসিয়া বাচ্চাকে তাহার সহিত পাঠাইয়া দিলেন এবং তাহার জন্য ভাতা নির্ধারণ করিলেন, তাহার ভরণ-পোষণ, কাপড়-চোপড়ের ভার লইলেন এবং উপঢৌকনও প্রদান করিলেন। অতঃপর তিনি কোলের বাচ্চা কোলে লইয়া স্বগৃহে ফিরিয়া আসিলেন, (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ২৪০)। এক বর্ণনামতে মরিয়াম আসিয়া তাহার মাতাকে খবর দিলে তিনি প্রাসাদে পৌঁছিয়া বাচ্চাকে স্তন্য দান করেন। তখন সে দুধ পান করিতে লাগিল এবং দুধ পান করিতে করিতে ঘুমাইয়া পড়িল। তখন তাহার মুখ দিয়া প্রায় বাহির হইয়া যাইতেছিল, ‘এ আমার পুত্র’। তখন আল্লাহই তাহাকে ইহা বলা হইতে রক্ষা করেন। ইহার প্রতিই কুরআন কারীমে ইঙ্গিত করা হইয়াছে:
إِنْ كَادَتْ لَتُبْدِي بِهِ لَوْلا أَنْ رَبَطْنَا عَلَى قَلْبِهَا لِتَكُونَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ (۲۸:۱۰)
"যাহাতে সে আস্থাশীল হয় তজ্জন্য আমি তাহার হৃদয়কে দৃঢ় করিয়া না দিলে সে তাহার পরিচয় তো প্রকাশ করিয়াই দিত" (২৮: ১০)। ইহার পর আসিয়া উক্ত প্রস্তাব দেন।

টিকাঃ
আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ২৩৯
আল-কামিল, ১খ, ১৩২
আত-তাবারী, তারীখ, ১খ., ৩৮৯
আল-কামিল, ১খ, ১৩২; তাবারী, তারীখ, ১খ., ৩৮৯
আল-কামিল, ১খ, ১৩২
আল-বিদায়া, প্রাগুক্ত
আল-কামিল, ১খ, ১৩২
আল-কামিল, ১খ., ১৩২-১৩৩; আত-তাবারী, তারীখ, ১খ, ৩৭৮-৮০

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ফিরআওন পত্নী পরিচয়

📄 ফিরআওন পত্নী পরিচয়


ফিরআওন পত্নীর নাম ছিল আসিয়া। তাহার বংশলতিকা হইলঃ আসিয়া বিন্ত মুযাহিম ইবন উবায়দ ইবনুর রায়‍্যান ইবনুল-ওয়ালীদ। এই ওয়ালীদ ছিলেন হযরত ইউসুফ (আ)-এর সময়কার ফিরআওন। কাহারও কাহারও মতে আসিয়া ছিলেন বানু ইসরাঈল বংশীয়া। সুহায়লীর বর্ণনামতে তিনি ছিলেন মূসা (আ)-এর ফুফু। তবে ইহা যুক্তিসম্মত নহে। কেননা ফিরআওন ছিল চরম বনী ইসরাঈল বিদ্বেষী। অতএব সে তাহাদের কোন মহিলাকে বিবাহ করিতে পারে না।
হযরত মূসা (আ)-এর প্রতি অতিশয় স্নেহবৎসল হওয়ার কারণে আল্লাহ তাহাকে হিদায়াতের নি'মত দান করিয়াছিলেন এবং তাহার দুআ কবুল করিয়া জান্নাতে তাহার জন্য প্রাসাদ নির্মাণ করিয়াছেন (এই বিষয়ে বিস্তারিত বিবরণ পরে আসিতেছে)। এক বর্ণনামতে মূসা (আ) যেদিন যাদুকরদের উপর বিজয় লাভ করেন সেই দিন আসিয়া তাঁহার প্রতি ঈমান আনয়ন করেন।

টিকাঃ
আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ. ২৩৯
আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ২৩৯
ছানাউল্লাহ পানীপতী, আত-তাফসীরুল মাজহারী, ১খ, ৩৪৭

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00