📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ফিরআওন-এর পরিচয়

📄 ফিরআওন-এর পরিচয়


ফিরআওন ছিল মিসরের শাসকবর্গের উপাধি। যেমন পূর্ব তুর্কিস্তানের বাদশাহর উপাধি খাকান, য়ামান-এর বাদশাহর উপাধি তুব্বা, হাবশার বাদশাহর উপাধি নাজাশী, রোম সম্রাটের উপাধি কায়সার এবং পারস্য সম্রাটের উপাধি কিসরা। খৃ. পৃ. ৩৫০০ সাল হইতে আলেকজান্ডার পর্যন্ত মিসরের শাসকগণকে মতান্তরে ৩১টি খানদানে বিভক্ত করা হইয়াছে। সর্বশেষ বংশ ছিল পারস্যের বাদশাহদের, যাহা খৃ. পূ. ৩৩২ সালে বাদশাহ আলেকজান্ডারের হস্তে পরাজিত হয়।

টিকাঃ
দাইরাই মা'আরিফ-ই ইসলামিয়া, ১৫খ, ২৭৩, ২৭৫, ফিরআওন শিরো.
হিফজুর রাহman, কাসাসুল কুরআন, ১খ, ৩৬১

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মূসা (আ)-এর সমসাময়িক ফিরআওনের নাম ও পরিচয়

📄 মূসা (আ)-এর সমসাময়িক ফিরআওনের নাম ও পরিচয়


মূসা (আ)-এর সময়কার ফিরআওন-এর নাম কি ছিল সে সম্পর্কে মতভেদ রহিয়াছে। আহলে কিতাবদের বর্ণনামতে তাহার নাম ছিল কাবুস। আরবের অধিকাংশ ঐতিহাসিক ও মুফাসসির-এর বর্ণনামতে সে ছিল 'আমালেকা' গোত্রের। এক বর্ণনামতে তাহার নাম ছিল ওয়ালীদ ইব্‌ন মুসআব ইবন রায়‍্যান। ইবনুল জাওযী তাহার পূর্ণ নাম ও বংশলতিকা এইভাবে প্রদান করিয়াছেন: ওয়ালীদ ইব্‌ন মুসআব ইব্‌ন মু'আবিয়া ইব্‌ন আবী নুমায়র ইবনিল হালওয়াশ ইব্‌ন লায়ছ ইবন হারান ইব্‌ন আসর ইব্‌ন আমলাক। কাহারও মতে মুসআব ইবন রায়্যান। অনেকের মতে তাহার নাম রায়‍্যান অথবা রায়‍্যান আবা ছিল। ইব্‌ন কাছীরের বর্ণনামতে তাহার উপনাম ছিল আবু মুররা। ইহাই প্রাচীন ইতিহাসবিদদের মতামত। কিন্তু আধুনিক কালে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা ও শিলালিপি হইতে জানা যায় যে, তিনি ছিলেন দ্বিতীয় রামেসিস-এর পুত্র মেনেফতাহ, যাহার শাসনকাল খৃ. পৃ. ১২৯২ হইতে শুরু করিয়া খৃ. পৃ. ১২২৫ সাল-এ সমাপ্ত হয়। এক বর্ণনামতে যেই ফিরআওনের প্রাসাদে মূসা (আ) লালিত-পালিত হন সে ছিল দ্বিতীয় রামেসিস। আর যে ফিরআওন-এর সহিত তাঁহার বিরোধ বাধিয়াছিল সে ছিল দ্বিতীয় রামেসিসের পুত্র মেনেস্তাহ। এই মেনেফতাহ-এর সময়কালের একটি শিলালিপিতে 'ইসরাঈল' শব্দটি প্রথমবারের মত লিখিত পাওয়া গিয়াছে। সে ১৯তম খানদানের চতুর্থ বাদশাহ এবং পিতার ১৩তম পুত্র ছিল। সে প্রাপ্ত বয়সেই সিংহাসনে অধিষ্টিত হয়। তাহার শাসনকাল ছিল ২৫ বৎসর।
বাইবেলের বর্ণিত বিভিন্ন সময়কাল বিশেষত হয়াহুদীদের মিসরে আগমন ও প্রত্যাবর্তন এবং মূসা (আ) ও ফিরআওন সম্পর্কিত সন তারিখ-পরস্পর বিরোধী বলিয়া ড. মরিস বুকাইলী উল্লেখ করিয়াছেন। তাহার রচিত বইয়ের অনুবাদ গ্রন্থ হইতে এই সম্পর্কিত কিছু বিবরণ নিম্নে উল্লেখ করা হইল:
বাইবেলে বলা হইয়াছে (রাজাবলি: ১, ৬, ১) ইয়াহুদীদের মিসর ত্যাগের ঘটনা ঘটিয়াছিল হারকাল-ই সুলায়মান (খৃ. পৃ. ৯৭১ সালের দিকে) নির্মাণের ৪৮০ বৎসর পূর্বে। এই হিসাব হইতে পাওয়া যায়, ইয়াহুদীদের মিসর ত্যাগের ঘটনা ঘটিয়াছিল মোটামুটিভাবে খৃ. পৃ. ১৪৫০ অব্দে। হিসাব অনুসারের ইয়াহুদীদের মিসরে বসবাস শুরু করার সময় দাঁড়াইতেছে খৃ. পৃ. ১৮৮০ হইতে ১৮৫০ অব্দের দিকে। পক্ষান্তরে ধারণা করিয়া আসা হইতেছে যে, এই সময়ে হযরত ইবরাহীম (আ) জীবিত ছিলেন। বাইবেলের অন্য বর্ণনা হইতে অবশ্য জানা যায় যে, হযরত ইউসুফ (আ) হইতে হযরত ইবরাহীম (আ)-এর সময়ের ব্যবধান ছিল ২৫০ বৎসর। এই পরবর্তী হিসাব যদি সত্য হয় তাহা হইলে সময়ানুক্রমের বিচারে বাইবেলেরই রাজাবলী-১ অধ্যায় বর্ণিত হিসাব অগ্রহণযোগ্য হইয়া পড়িতেছে।
আমরা আরো দেখিতে পাইতেছি যে, রাজাবলী-১ এর তথ্য কিভাবে বাইবেলের অন্য স্থানের বর্ণিত তথ্যকে নাকচ করিয়া দিতেছে। সুতরাং দেখা যাইতেছে আমাদের আলোচনার উদ্দেশ্য বাস্তবে বাধাগ্রস্ত করিতেছে অন্য কিছু নহে, বরং বাইবেলে বর্ণিত এই ধরনের এলোমেলো ও অসঠিক সময় গণনার হিসাব।
জানা যায়, দ্বিতীয় রামেসিস ৬৭ বৎসর রাজত্ব করিয়াছিলেন (ড্রাইওটন ও ভ্যান্ডিয়ারের ক্রনোলজি অনুসারে খৃ. পৃ. ১৩০১-১২৩৫ এবং রাওটনের অভিমত অনুসারে খৃ. পূ. ১২৯০-১২২৪)। তাহার উত্তরাধিকারী মারনেপতাহ কতদিন রাজত্ব করিয়াছিলেন সে বিষয়ে মিসর তত্ত্ববিদগণ নির্দিষ্ট কোন হিসাব দিতে পারেন নাই। তবে তাহার রাজত্ব যে কমপক্ষে দশ বৎসরকাল স্থায়ী হইয়াছিল তাহা নিশ্চয় করিয়া বলা চলে। কেননা, ফাদার ডি. ভক্স তাহার গবেষণায় যে দলীলের উদ্ধৃতি দিয়াছেন সেখানে তাহার রাজত্বের দশম বৎসরের কথা উল্লেখ রহিয়াছে। মারনেপ্তাহর রাজত্বকাল সম্পর্কে ড্রাইওটন ও ভ্যান্ডিয়ার দুইটি সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করিয়াছেন : হয় তাহার রাজত্বকাল ছিল দশ বৎসর (খৃ. পৃ. ১২৩৪-১২২৪) নতুবা বিশ বৎসর (খৃ. পূ. ১২২৪-১২০৪)। মারনেপতাহ কিভাবে মৃত্যুবরণ করেন সে বিষয়েও মিসর তত্ত্ববিদগণ সুনির্দিষ্টভাবে কিছুই বলেন নাই। তাহারা শুধুমাত্র জানাইয়াছেন যে, তাহার মৃত্যুর পর গোটা মিসরে অভ্যন্তরীণ তীব্র গোলযোগ দেখা দেয়; এবং তাহা প্রায় ২৫ বৎসরকাল স্থায়ী হয়।
মারনেপতাহর রাজত্বকাল সম্পর্কে দিনপঞ্জির ওই হিসাব কতদূর সঠিক, তাহা বলা মুশকিল। তবে বাইবেলের বর্ণনা মতে প্রাপ্ত এই সময়টিতে অর্থাৎ উক্ত আশি বৎসরের মুদ্দতে (দ্বিতীয় রামেসিস ও মারনেপতাহ ছাড়া) তৃতীয় নূতন কোন রাজার সন্ধান পাওয়া যায় না। এই হিসাবমতে ইয়াহুদীদের মিসর ত্যাগকালে মূসা (আ)-এর বয়স কত হইয়াছিল তাহা জানিতে হইলে পূর্বেই জানা দরকার দ্বিতীয় রামেসীস ও মারনেপতাহ মোট কত বৎসর ধরিয়া রাজত্ব করিয়াছিলেন। এইসব দলীল প্রমাণ হইতে যাহা বাহির হইয়া আসে তাহা হইল, দ্বিতীয় রামেসীসের রাজত্বের গোড়ার দিকে হযরত মূসা (আ) জন্মগ্রহণ করেন। ইহার পর তিনি চলিয়া যান মাদয়ানে। সেইখানে তাঁহার অবস্থানকালেই মিসরে ৬৭ বৎসর রাজত্ব করার পর দ্বিতীয় রামেসিস প্রাণত্যাগ করেন। পরবর্তীকালে তাহার পুত্র ও উত্তরাধিকারী মারনেপতাহর রাজত্বকালে মূসা (আ) মিসরে ফিরিয়া আসেন এবং ইয়াহুদীদের মিসর ত্যাগের ব্যাপারে প্রধান ভূমিকা পালন করেন। ঘটনাটি ঘটা সম্ভব মারনেপতহার রাজত্বের দ্বিতীয়ার্ধে, যদি ধরিয়া লওয়া হয় তিনি বিশ অথবা প্রায় বিশ বৎসর রাজত্ব করিয়াছিলেন। রাওটনের মতে এই অনুমান সঠিক হওয়ার সম্ভাবনা সমধিক। দ্বিতীয় রামেসিস যখন মৃত্যুবরণ করেন তখন তিনি ছিলেন অতি বৃদ্ধ। বলা হয় এই সময় তাহার বয়স হইয়াছিল নব্বুই হইতে একশত বৎসর। এই থিওরী অনুসারে দ্বিতীয় রামেসিস যখন রাজত্ব শুরু করেন তখন তাহার বয়স ছিল তেইশ কিংবা তেত্রিশ বৎসর। আর তিনি রাজত্ব করিয়াছিলেন ৬৭ বৎসর।
রোমেসিস দ্বিতীয় ও মেনেফাতাহ উভয় বাদশাহর মমি কায়রোর যাদুঘরে সংরক্ষিত রহিয়াছে, যাহা উকসুর-এ ২য় আমেন হোটেপ-এর সমাধিতে অন্যান্য মমির সহিত পাওয়া গিয়াছে; তবে সকলের দর্শনের জন্য উহা উন্মুক্ত নহে। বিশেষ অনুমতিক্রমে বিশিষ্ট ব্যক্তিদিগকে উহা দেখানো হয়। সরকারের অনুমতিক্রমে আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদেশী ছাত্র ও বিশিষ্ট মেহমানদিগকে বিশেষ ব্যবস্থাপনায় উহা দেখানো হয়। একটি মমিই কেবল দেখানো হয় এবং বলিয়া দেওয়া হয় যে, "ইহা রামেসিস-এর মমি, যে ছিল মূসা (আ)-এর সময়কার ফিরআওন"। অত্র নিবন্ধকারও উহা স্বচক্ষে দেখিয়াছেন।
ইবনুল জাওযী আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারাক সূত্রে একটি উপাখ্যান উল্লেখ করেন যে, মূসা (আ)-এর সময়ের ফিরআওন ছিল আতর বিক্রেতা। তাহার নিবাস ছিল ইসফাহানে। অতঃপর ব্যবসায়ে লোকসান হওয়াতে এক সময় সে দরিদ্র হইয়া পড়ে এবং ঋণে জর্জরিত হয়। ফলে ঋণ পরিশোধের জন্য সে বাহির হইয়া পড়ে। এমনিভাবে এই দেশ সেই দেশ ঘুরিয়া সে মিসরে গিয়া উপস্থিত হয়। শহরের দরজায় সে এক ঝুড়ি তরমুজ বা শসা দেখিতে পায় যাহা এক দিরহামে বিক্রয় করা হইবে। অথচ শহরে উহার একটির দাম এক দিরহাম। ফিরআওন মনে মনে বলিল, আমি এমন এক স্থানে আসিয়াছি যে, হয়তোবা আমার ঋণ পরিশোধ করিতে এবং ধনী হইতে পারিব। অতঃপর সে এক দিরহামের বিনিময়ে উক্ত এক ঝুড়ি শসা ক্রয় করিল এবং শহরের দিকে রওয়ানা হইল। কিন্তু লোকজন আসিয়া প্রত্যেকে একটি করিয়া শসা উঠাইয়া নিল। আর একটি মাত্র শসা অবশিষ্ট রহিল। উহাই সে শহরে এক দিরহামে বিক্রয় করিল। ইহার ফলে সে বিরক্ত ও মনক্ষুণ্ণ হইল। তাহারা বলিল, ইহাই আমাদের রীতি। সে বলিল, এখানে কি এমন কোন লোক নাই, যে সুবিচার করিবে? এখানে কি কোনও সাহায্যকারী নাই? তাহারা বলিল, "না, এখানে এক বাদশাহ আছেন যিনি নিজের আরাম-আয়েশে বিভোর থাকেন। তিনি স্বীয় মন্ত্রীকে লোকজনের বিষয়াদি তদারকি করিবার জন্য নিয়োগ করিয়াছেন। নিজে কোন কিছুই দেখেন না"।
অতঃপর সে কবরের উপর চাদর বিছাইয়া পয়সা আদায় করিতে লাগিল এবং লাশপ্রতি চার দিরহাম লইতে লাগিল। এমনিভাবে তাহার বেশ কিছু দিন অতিবাহিত হইল। অতঃপর একদিন বাদশাহ্ কন্যা মারা গেল। লোকজন উক্ত লাশ কবর দিতে আসিলে সে চার দিরহাম দাবি করিল। লোকজন বলিল, ইহা বাদশাহ্ কন্যা। তখন সে বলিল, তবে আট দিরহাম দাও। এইভাবে যতই তাহারা বিবাদ করিতে লাগিল ততই সে তাহার দাবিকৃত টাকার অংক দ্বিগুণ করিতে লাগিল। তাহারা ফিরিয়া গিয়া বাদশাহকে বলিল, মৃতদের দেখাশুনাকারী কর্মচারী আমাদের সহিত এইরূপ আচরণ করিয়াছে। বাদশাহ জিজ্ঞাসা করিলেন, সে কর্মচারী কে? তাহারা উহার বিবরণ দিল। অতঃপর মন্ত্রীকে ডাকিয়া বাদশাহ জিজ্ঞাসা করিল, তুমি কি উহাকে এই কর্মে নিয়োগ করিয়াছ? মন্ত্রী বলিল, না। অতঃপর বাদশাহ তাহাকে ডাকাইয়া জিজ্ঞাসা করিল, তোমাকে কে নিয়োগ করিয়াছে? তখন সে তাহার ঘটনা বর্ণনা করিল এবং তরমুজ বা শসার ব্যাপারটি উল্লেখ করিয়া বলিল, লোকজন তাহাকে বলিয়াছে যে, এখানে ন্যায়বিচার করিবার মত কেহ নাই, ইহা দেখিয়া আমি এইরূপ করিয়াছি, যাহা আপনি দেখিতেছেন, যাহাতে বিষয়টি আপনার নিকট পৌঁছে এবং আপনি আপনার রাষ্ট্রের ব্যাপারে অবহিত হইতে পারেন। বাদশাহ জিজ্ঞাসা করিলেন, কত দিন ধরিয়া তুমি এই অবস্থায় আছ? সে বলিল, অনেক বৎসর। এমনি করিয়া আমি বেশ সম্পদের মালিক হইয়াছি। অতঃপর বাদশাহর নিদের্শে মন্ত্রীকে হত্যা করা হইল এবং তাহাকে মন্ত্রী নিযুক্ত করা হইল। মন্ত্রী হওয়ার পর সে খুব উত্তম আচরণ করিল এবং মিসরবাসীর জন্য পূর্বের তুলনায় অনেক সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের ব‍্যবস্থা করিল। সে ন্যায়বিচার করিতে লাগিল, যদিও ইহা ছিল তাহার ব্যক্তিস্বার্থের জন্য। অতঃপর বাদশাহ মৃত্যুবরণ করিল? তখন প্রজাবৃন্দ নূতন বাদশাহ নিযুক্ত করিবার জন্য একত্র হইল এবং এই ব্যাপারে তাহারা ঐক্যমতে পৌঁছিল যে, তাহারা এই ব্যক্তিকে ছাড়া আর কাহাকেও বাদশাহ নিযুক্ত করিবে না, যে তাহাদের জন্য সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও আরাম-আয়েশের ব্যবস্থা করিয়াছে। অতঃপর তাহারা নিজেদের পক্ষ হইতে উহাকেই বাদশাহ নিযুক্ত করিল। এমনিভাবে তাহার রাজত্বকাল দীর্ঘ হইতে দীর্ঘতর হইল, এমনকি শেষে সে ইলাহ দাবি করিয়া বসিল।

টিকাঃ
ইবনুল-জাওযী, আল-মুনতাজাম, ১খ, ৩৩২২
কাসাসুল-কুরআন, ১খ, ৩৬১
ড. মরিস বুকাইলি, বাইবেল কোরআন ও বিজ্ঞান (অনু.) শিরো সময়ের বিশ্লেষণ : ১, পৃ. ৩০০-৩০৪
প্রাগুক্ত, শিরো-দ্বিতীয় রামেসিস ও মারনেপতাহঃ ৩, পৃ. ৩১৩-৩১৪
আবdul ওয়াহহাব নাজজার, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ২০৩
ইবনুল জাওযী, আল-মুনতাজাম ফী তারীখিল উমাম, ১খ, ৩৩২-৩৩৩

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বানু ইসরাঈলের উপর অত্যাচার

📄 বানু ইসরাঈলের উপর অত্যাচার


তাহার পূর্বেকার সব ফিরআওনই বানু ইসরাঈলের উপর অত্যাচার করিত, কিন্তু মূসা (আ)-এর সময়কার এই ফিরআওনের অত্যাচারই ছিল সবচাইতে কঠোর ও দীর্ঘমেয়াদী। সে দেখিল যে, বানু ইসরাঈলের সংখ্যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাইতেছে। ইহাতে তাহার আশংকা হয় যে, পাছে তাহারা মিসরের শত্রুদের সাহায্যকারী হইয়া যায়। অতঃপর সে তাহাদিগকে নানাভাবে অত্যাচার করিতে থাকে। তাহাদিগকে. দাস-দাসী বানাইয়া রাখে এবং কঠিনতর কার্যে নিয়োগ করে। এক শ্রেণীকে গৃহ নির্মাণ কর্মে, এক শ্রেণীকে কৃষি কর্মে, এক শ্রেণীকে উৎপাদন কর্মে লাগাইয়া রাখে। আর যে তাহার কোন কর্মে নিয়োজিত ছিল না তাহাকে রাজস্ব কর দিতে হইত। সে তাহাদিগকে বিভিন্ন দল ও গোত্রে বিভক্ত করার পরিকল্পনা করে।
এই ফিরআওন হযরত ইউসুফ (আ)-এর মর্যাদা ও মিসরের প্রতি তাঁহার অবদান সম্পর্কে ছিল অনবহিত। তাই সে বিভিন্নভাবে বানু ইসরাঈলকে শ্রম দিতে বাধ্য করে। সে তাহাদের দ্বারা রামসিস ও ফায়জুস নামক দুইটি শহর নির্মাণ করায় এবং তাহাদিগকে কঠোর পরিশ্রমে বাধ্য করে। প্রত্নতাত্ত্বিক খননের দ্বারা উক্ত শহর দুইটির পরিচয় পাওয়া যায়। একটির শিলালিপি হইতে জানা যায় যে, উহার নাম "বার-ভূম" অথবা "ফায়ছুম" যাহার অর্থ "ভূম দেবতার ঘর"। অপরটির নাম "বার রামসিস" যাহার অর্থ “রামসিস প্রাসাদ"।
সে এই অত্যাচার এই জন্য করিত যে, বনী ইসরাঈলের মধ্যে প্রচলিত একটি সুসংবাদ তাহাকে প্রভাবিত করিয়াছিল। তাহা এই যে, ইবরাহীম (আ)-এর স্ত্রী সারার সহিত মিসর অধিপতি কুকর্ম করিতে চাহিয়াছিল যাহা আল্লাহর রহমতে বাস্তবায়িত হয় নাই। উহারই প্রতিদানস্বরূপ ইবরাহীম (আ)-এর বংশে অতিসত্ত্বর এমন এক সন্তান জন্মিবে যাহার হাতে মিসরের বাদশাহের পতন হইবে। এই সুসংবাদ বনী ইসরাঈলের মধ্যে প্রসিদ্ধ ছিল। অতঃপর কিবতীগণও ইহা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করিতে থাকে, যাহা মন্ত্রীবর্গের মাধ্যমে ফিরআওনের নিকট পৌঁছে। তাই সে এই শিশুর আবির্ভাবের ভয়ে বনী ইসরাঈলের পুত্র সন্তানদিগকে হত্যা করিবার নির্দেশ দেয়।

টিকাঃ
আফীফ আবদুল ফাত্তাহ তাব্বারা, মাআল-আম্বিয়া ফিল-কুরআনিল কারীম, পৃ. ২১৭-২১৮
হিফজুর রহমান সিউহারবী, কাসাসুল-কুরআন, ১খ., ৩৬১-৩৬২
বিস্তারিত দ্র. ইবরাহীম আ. নিবন্ধ
আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ২৩৭-২৩৮

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ফিরআওনের স্বপ্ন ও মূসা (আ)-এর জন্ম

📄 ফিরআওনের স্বপ্ন ও মূসা (আ)-এর জন্ম


সুদ্দী ইব্‌ন আব্বাস (রা), ইবন মাসউদ (রা) ও অন্যান্য সাহাবী হইতে বর্ণনা করেন যে, ফিরআওন একদিন স্বপ্ন দেখিল, একটি আগুন বায়তুল মাকদিস-এর দিক হইতে অগ্রসর হইয়া আসিল। অতঃপর উহা মিসরের সকল ঘরবাড়ি ও কিবতীদিগকে পোড়াইয়া দিল, কিন্তু বাণু ইসরাঈলের কোন ক্ষতি করিল না। ঘুম হইতে জাগরিত হইয়া সে ঘাবড়াইয়া গেল এবং উক্ত স্বপ্নে বিচলিত ও শঙ্কিত হইয়া পড়িল। সে জ্যোতিষী, গণক ও 'যাদুকরদের একত্র করিল এবং তাহাদের নিকট ইহার ব্যাখ্যা জানিতে চাহিল। তাহারা বলিল, বনী ইসরাঈলের মধ্যে একটি পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করিবে। সে মিসরবাসীদের ধ্বংসের কারণ হইবে। এইজন্যই ফিরআওন তখন বনী ইসরাঈলের পুত্র সন্তানদিগকে হত্যা করিয়া কন্যা সন্তানদিগকে জীবিত রাখিবার নির্দেশ দিল।
অপর এক বর্ণনামতে, মূসা (আ)-এর আগমনের সময় নিকটবর্তী হইলে ফিরআওনের জ্যোতিষী ও গণকবৃন্দ তাহার নিকট আসিয়া বলিল, আমরা আমাদের গণনায় দেখিতে পাইতেছি যে, আপনার সময়েই বনী ইসরাঈলের মধ্যে এক পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করিবে, সে আপনার রাজত্ব ছিনাইয়া লইবে, আপনাকে আপনার দেশ হইবে বিতাড়িত করিবে এবং আপনার দীন পরিবর্তন করিয়া ফেলিবে। তখন ফিরআওন বনী ইসরাঈলের পুত্র সন্তান হত্যা করিতে নির্দেশ দিল। অতঃপর তাহার দেশের সকল কিবতী মহিলাকে একত্র করিয়া বলিল, তোমাদের সম্মুখে বনী ইসরাঈলের কোন মহিলাকে পুত্র সন্তান প্রসব করিতে দেখিলেই তাঁহাকে হত্যা করিবে। অতঃপর তাহারা তাহাই করিত, এমনকি গর্ভবতী মহিলাকেও তাহারা শাস্তি দিত। মুজাহিদ সূত্রে বর্ণিত যে, ফিরআওনের নির্দেশে বাঁশ ফাড়া হইত, অতঃপর উহা বড় ছুরির ন্যায় বানাইয়া উহার উপর গর্ভবতী মহিলাদিগকে দাঁড় করানো হইত। ফলে উক্ত মহিলা তাহার দুই পায়ের মধ্যখানে সন্তান প্রসব করিয়া দিত এবং নিজে বাঁচিবার জন্য সন্তানকে ধারালো বাঁশের উপর ফেলিয়া দিত।
এক বর্ণনামতে, সে মিসরের দুইজন ধাত্রী নিযুক্ত করে যাহাদের একজনের নাম ছিল 'শুফরা' আর অপর জনের নাম 'ফাওআ' এবং তাহাদিগকে নির্দেশ দেয় যে, কোন ইসরাঈলী মহিলা পুত্র সন্তান প্রসব করিলে তাহাকে হত্যা করিবে। আর কন্যা সন্তান প্রসব করিলে তাহা জীবিত রাখিবে। কিন্তু তাহারা এই নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করিতে পারিল না। ইহার কারণ জিজ্ঞাসা করা হইলে তাহারা বলিল যে, ইসরাঈলী মহিলাগণ খুবই শক্তিশালী। তাই ধাত্রী আসিবার পূর্বেই তাহারা সন্তান প্রসব করে। বাদশাহ ক্ষিপ্ত হইয়া ইসরাঈলীদিগকে অপদস্থ করিবার নির্দেশ দেয় এবং তাহাদিগকে ইট প্রস্তুত করা, নির্মাণ কর্ম প্রভৃতি কঠোর কাজে ব্যাপৃত রাখিবার নির্দেশ দেয় এবং তাহাদের পিছনে লোকও লাগাইয়া রাখে যাহাতে তাহারা আরাম করিতে না পারে, এই আশা করিয়া যাহাতে তাহাদের বংশবিস্তার হ্রাস পায়। কিন্তু ইহাতে কোন কাজ হইল না। ইসরাঈলী মহিলাগণ বেশী বেশী সন্তান জন্ম দিত। অতঃপর ফিরআওন তাহার সৈন্যদিগকে তাহাদের প্রত্যেক পুত্র সন্তানকে নদীতে নিক্ষেপের নির্দেশ দেয় যাহাতে সেখানে উহারা মৃত্যুবরণ করে।
এমনিভাবে বনী ইসরাঈলের সংখ্যা বিনাশ হইতে লাগিল। অতঃপর কিবতী সরদারগণ ফিরআওনের নিকট গিয়া বলিল, আপনি বনি ইসরাঈলের পুত্র সন্তানগণকে হত্যা করিতেছেন এবং বয়ঃবৃদ্ধগণ তো এমনিই মৃত্যু বরণ করিতেছে। এইভাবে এক সময় তাহাদের বংশই বিলুপ্ত হইয়া যাইবে। তাহারা তো আমাদের দাস ও শ্রমিক। তাহারা বিলুপ্ত হইয়া গেলে আমাদের কাজকে করিবে? অতঃপর ফিরআওন এক বৎসর পুত্র সন্তানদিগকে হত্যা করিতে এবং এক বৎসর হত্যা না করিতে নির্দেশ দিল। অতঃপর যে বৎসর হত্যা না করিবার নির্দেশ ছিল সেই বৎসর হারুন (আ) জন্ম গ্রহণ করেন এবং পরবর্তী যে বৎসর হত্যা করিবার নির্দেশ ছিল সেই বৎসর মূসা (আ) জন্মগ্রহণ করেন। ফিরআওন যথাসাধ্য চেষ্টা করিল যাহাতে উক্ত শিশু ভূমিষ্ঠ হইতে না পারে। এমনকি সে কিছু পুরুষ ও মহিলাকে নিযুক্ত করে যাহারা গর্ভবতী মহিলাদের নিকট যাতায়াত করিত এবং তাহাদের সন্তান কোন দিন জন্মগ্রহণ করিবে, খোঁজ-খবর লইয়া তাহা নিরূপণ করিত। তাই কোনও মহিলা পুত্র সন্তান প্রসব করার সঙ্গে সঙ্গেই তাহারা উহাকে হত্যা করিত।
তবে মূসা (আ) গর্ভে আসার পর কেহই তাহা টের পাইল না একমাত্র তাহার ভগ্নী মরিয়াম ব্যতীত। ফলে সকলের অগোচরেই মূসা (আ) ভূমিষ্ঠ হইলেন। তিনি ভূমিষ্ট হইবার পর তাঁহার মাতা খুবই চিন্তিত ও বিচলিত হইয়া পড়িলেন। তখন আল্লাহ তাআলা প্রত্যাদেশ নাযিল করিলেন:
وَأَوْحَيْنَا إِلَى أُمِّ مُوسَى أَنْ أَرْضِعِيهِ فَإِذَا خِفْتِ عَلَيْهِ فَالْقِيْهِ فِي الْيَمِّ وَلَا تَخَافِي وَلَا تَحْزَنِي إِنَّا رَادُّوهُ اليكِ وَجَاعِلُوهُ مِنَ الْمُرْسَلِينَ (۷ : ۲۸)
"মূসার জননীর কাছে আমি ইঙ্গিতে নির্দেশ করিলাম, শিশুটিকে স্তন্যদান করিতে থাক। যখন তুমি তাহার সম্পর্কে কোন আশঙ্কা করিবে তখন ইহাকে দরিয়ায় নিক্ষেপ করিও এবং ভয় করিও না, দুঃখ করিও না। আমি ইহাকে তোমার নিকট ফিরাইয়া দিব এবং ইহাকে রাসূলদের একজন করিব" (২৮:৭)।
আল্লাহ তাআলা তাহাকে একটি বাক্স বানাইয়া উহাতে করিয়া শিশু মূসাকে নদীতে ভাসাইয়া দিতে নির্দেশ দিলেন। কুরআন কারীমে ইরশাদ হইয়াছে:
إِذْ أَوْحَيْنَا إِلَى أُمِّكَ مَا يُوحَى . أَنِ اقْدَفِيهِ فِي التَّابُوتِ فَاقَدْ فِيهِ فِي الْيَمَ فَلْيُلْقِهِ الْيَمُّ بِالسَّاحِلِ يَأْخُذُهُ عَدُوٌّ لِي وَعَدُوٌّ لَهُ وَالْقَيْتُ عَلَيْكِ مَحَبَّةٌ مِنِّي وَلِتُصْنَعَ عَلَى عَيْنِي.
"যখন আমি তোমার মাতার অন্তরে ইঙ্গিত দ্বারা নির্দেশ দিয়াছিলাম যাহা ছিল নির্দেশ করিবার, এই মর্মে যে, তুমি তাহাকে সিন্দুকের মধ্যে রাখ, অতঃপর উহা দরিয়ায় ভাসাইয়া দাও যাহাতে দরিয়া উহাকে তীরে ঠেলিয়া দেয়, উহাকে আমার শত্রু ও উহার শত্রু লইয়া যাইবে" (২০ : ৩০-৪০)। অতঃপর মাতা তাহাকে দুধ পান করাইলেন এবং একজন কাঠমিস্ত্রী ডাকাইয়া একটি বাক্স তৈরি করাইলেন, যাহাতে চাবি ছিল অভ্যন্তরভাগে।

টিকাঃ
আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ২৩৮; আত-তাবারী, তারীখ, ১খ, ৩৮৮; আল-কামিল, ১খ, ১৩১
আত-তাবারী, তারীখ, ১খ, ৩৮৭; আল-কামিল, ১খ, ১৩১
আবদুল ওয়াহহাব আন-নাজ্জার, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ১৫৫-১৫৬
আল-মুনতাজাম, ১খ, ৩৩৩
আত-তাবারী, তারীখ, ১খ, ৩৮৯; আল-কামিল, ১খ, ১৩২

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00