📄 সময়কাল
কাল গবেষণায় প্রতীয়মান হয় যে, হযরত ইবরাহীম (আ)-এর জন্ম হয় খৃ.পূ.২১৬০ সালে। ১৫ শত বৎসর বয়সে ইসহাক (আ) জন্মগ্রহণ করেন। তাই ইসহাক (আ)-এর জন্ম খৃ. পূ. সালে। ইসহাক (আ)-এর ৬০ বৎসর বয়সে ইয়াকূব (আ) জন্মগ্রহণ করেন। তাই ইয়াকুব (আ)-এর জন্ম খৃ. পৃ. ২০০০ সালে। ইয়াকূব (আ)-এর ৭৩ বৎসর বয়সে ইউসুফ (আ) জন্মগ্রহণ করেন। তাই ইউসুফ (আ)-এর জন্ম খৃ. পৃ. ১৯২৭ সালে। হযরত ইউসুফ (আ) ১৭ বৎসর বয়সে মিসর আগমন করেন। তাই তাঁহার মিসরে আগমন ঘটে খৃ. পৃ. ১৯১০ সালে। ইহার ৪০ বৎসর পর ইয়াকুব (আ) স্ত্রী ও পরিবারবর্গসহ মিসরে হিজরত করেন। তাই মিসরে বানু ইসরাঈলের আগমন ঘটে খৃ. পৃ. ১৮৭০ সালে।
বাইবেলের বর্ণনামতে হযরত মূসা (আ) বনী ইসরাঈলকে লইয়া যখন মিসর ত্যাগ করেন তখন বনী ইসরাঈলের মিসরে বসবাসের সময়কাল হইয়াছিল ৪৩০ বৎসর। উক্ত হিসাবমতে তাহারা খৃ. পৃ. ১৪৪০ সালে মিসর ত্যাগ করেন। বাইবেলের বর্ণনামতে এই সময় মূসা (আ)-এর বয়স ছিল ৮০ বৎসর। ইহাতে প্রতীয়মান হয় যে, মূসা (আ) খৃ পৃ. ১৫২০ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১২০ বৎসর বাঁচিয়াছিলেন। সুতরাং উক্ত হিসাবমতে বলা যায়, মূসা (আ) খৃ. পৃ. ১৪০০ সালে ইনতিকাল করেন। অপর এক বর্ণনামতে মূসা (আ)-এর জন্ম খৃ. পূ. ১৫৭১ সালে এবং মৃত্যু খৃ. পৃ. ১৪৫১ সালে।
কিন্তু অপর এক বর্ণনায় এই হিসাবের সহিত প্রায় তিন শত বৎসরের তারতম্য পরিলক্ষিত হয়। এক বর্ণনামতে হযরত ইয়াকূব (আ) ও মূসা (আ)-এর মধ্যে ব্যবধান প্রায় ৪০০ বৎসরের। দাইরা-ই মাআরিফ-ই ইসলামিয়া-এর বর্ণনায়ও ইহারই সমর্থন পাওয়া যায়।
টিকাঃ
Exodus, 12:40-41
Exodus, 7:7
Deteronomy, 37:7
জামীল আহমাদ, আম্বিয়া-ই কুরআন, ২খ, ৯৬-৯৮
ইসলামী ইনসাইক্লোপিডিয়া, সম্পা, সায়্যিদ কাসিম মাহমূদ, পৃ. ১৩৮৭
কারী যায়নুল আবিদীন, কাসাসুল কুরআন, পৃ. ২৫১
📄 মূসা (আ)-এর আগমনের পূর্বে মিসরে বনী ইসরাঈলের অবস্থা
হযরত ইয়াকূব (আ), যিনি ইসরাঈল উপাধিতে খ্যাত, স্বীয় পুত্র ইউসুফ-এর সহিত সাক্ষাত করিতে মিসরে আগমনের পর হইতে ইনতিকাল পর্যন্ত মিসরেই থাকিয়া যান। ইনতিকালের পর তাঁহাকে তাঁহার ওসিয়াত অনুযায়ী ফিলিস্তীনে আনিয়া দাফন করা হয়। ইউসুফসহ ইয়াকূব (আ)-এর অন্যান্য পুত্রও মিসরে থাকিয়া যান এবং সেখানে বিবাহ-শাদী করেন। অতঃপর তাহাদের বংশধর বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইতে থাকে। ইহারাই বনূ ইসরাঈল নামে খ্যাত। ইউসুফ (আ)-এর জীবদ্দশায় তাহারা মিসরে মুক্ত ও স্বাধীনভাবে সুখে-শান্তিতে বসবাস করিতে থাকে। ইউসুফ (আ)-এর কারণে মিসরীয়গণ তাহাদিগকে সম্মানের চক্ষে দেখিত। বাইবেলের বর্ণনামতে হযরত ইউসুফ (আ) ইয়াকুব (আ)-এর বংশধরকে মিসরীয়দের হইতে পৃথকভাবে জুশন বা গুশন (Goshen) অঞ্চলে বসবাস করিবার ব্যবস্থা করেন। কারণ সভ্য মিসরীয়গণ হিব্রুগণকে রাখাল যাযাবর বলিয়া ঘৃণা করিত। তাহারা ইহাদের সহিত একত্রে বসিয়া আহার করিত না। "ইব্রীয়দের সহিত মিস্ত্রীয়েরা আহার ব্যবহার করে না। কারণ তাহা মিস্ত্রীয়দের ঘৃণিত কর্ম"।
"আর ইসরায়েল মিসর দেশে, গোশন অঞ্চলে বাস করিল, তাহারা তথায় অধিকার পাইয়া ফলবন্ত ও অতিবহুবংশ হইয়া উঠিল"। এতদসত্ত্বেও তাহারা আর্থিক দিক হইতে সচ্ছল ছিল।
হযরত ইউসুফ (আ) তাঁহার শাসনামলে মিসরে ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। হযরত আদম (আ) হইতে শুরু করিয়া শেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ (স) পর্যন্ত সকল নবীর দীনই ছিল ইসলাম। ইউসুফ (আ)-এর ইনতিকালের পর কিছু লোক তাহাদের পূর্বপুরুষ ইউসুফ (আ) ও ইয়াকূব (আ)-এর দীনের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে। অবশিষ্ট মিসরবাসী ধীরে ধীরে দীন ইসলাম ও তাওহীদ পরিত্যাগ করত পুনরায় একাধিক উপাস্যের দিকে প্রত্যাবর্তন করে। মূর্তিপূজা, সূর্য দেবতার পূজা প্রভৃতিতে তাহারা লিপ্ত হইয়া পড়ে। বানু ইসরাঈলের কিছু লোকও তাহাদের অনুসরণ করে। তাহাদের এই পদস্খলন শাসক শ্রেণীর ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের কারণেই হইয়াছিল। এমনিভাবে ধীরে ধীরে শাসকদের মধ্যে অত্যাচারী ফিরআওনদের আবির্ভাব ঘটে, যাহারা নিজদিগকে ইলাহ বা ইলাহ -এর সদৃশ মনে করিত।
টিকাঃ
আম্বিয়া-ই কুরআন, ২খ., ৯৮
আদিপুস্তক, ৪৩: ৩২
আদিপুস্তক ৪৭: ২৭
প্রাগুক্ত
📄 ফিরআওন-এর পরিচয়
ফিরআওন ছিল মিসরের শাসকবর্গের উপাধি। যেমন পূর্ব তুর্কিস্তানের বাদশাহর উপাধি খাকান, য়ামান-এর বাদশাহর উপাধি তুব্বা, হাবশার বাদশাহর উপাধি নাজাশী, রোম সম্রাটের উপাধি কায়সার এবং পারস্য সম্রাটের উপাধি কিসরা। খৃ. পৃ. ৩৫০০ সাল হইতে আলেকজান্ডার পর্যন্ত মিসরের শাসকগণকে মতান্তরে ৩১টি খানদানে বিভক্ত করা হইয়াছে। সর্বশেষ বংশ ছিল পারস্যের বাদশাহদের, যাহা খৃ. পূ. ৩৩২ সালে বাদশাহ আলেকজান্ডারের হস্তে পরাজিত হয়।
টিকাঃ
দাইরাই মা'আরিফ-ই ইসলামিয়া, ১৫খ, ২৭৩, ২৭৫, ফিরআওন শিরো.
হিফজুর রাহman, কাসাসুল কুরআন, ১খ, ৩৬১
📄 মূসা (আ)-এর সমসাময়িক ফিরআওনের নাম ও পরিচয়
মূসা (আ)-এর সময়কার ফিরআওন-এর নাম কি ছিল সে সম্পর্কে মতভেদ রহিয়াছে। আহলে কিতাবদের বর্ণনামতে তাহার নাম ছিল কাবুস। আরবের অধিকাংশ ঐতিহাসিক ও মুফাসসির-এর বর্ণনামতে সে ছিল 'আমালেকা' গোত্রের। এক বর্ণনামতে তাহার নাম ছিল ওয়ালীদ ইব্ন মুসআব ইবন রায়্যান। ইবনুল জাওযী তাহার পূর্ণ নাম ও বংশলতিকা এইভাবে প্রদান করিয়াছেন: ওয়ালীদ ইব্ন মুসআব ইব্ন মু'আবিয়া ইব্ন আবী নুমায়র ইবনিল হালওয়াশ ইব্ন লায়ছ ইবন হারান ইব্ন আসর ইব্ন আমলাক। কাহারও মতে মুসআব ইবন রায়্যান। অনেকের মতে তাহার নাম রায়্যান অথবা রায়্যান আবা ছিল। ইব্ন কাছীরের বর্ণনামতে তাহার উপনাম ছিল আবু মুররা। ইহাই প্রাচীন ইতিহাসবিদদের মতামত। কিন্তু আধুনিক কালে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা ও শিলালিপি হইতে জানা যায় যে, তিনি ছিলেন দ্বিতীয় রামেসিস-এর পুত্র মেনেফতাহ, যাহার শাসনকাল খৃ. পৃ. ১২৯২ হইতে শুরু করিয়া খৃ. পৃ. ১২২৫ সাল-এ সমাপ্ত হয়। এক বর্ণনামতে যেই ফিরআওনের প্রাসাদে মূসা (আ) লালিত-পালিত হন সে ছিল দ্বিতীয় রামেসিস। আর যে ফিরআওন-এর সহিত তাঁহার বিরোধ বাধিয়াছিল সে ছিল দ্বিতীয় রামেসিসের পুত্র মেনেস্তাহ। এই মেনেফতাহ-এর সময়কালের একটি শিলালিপিতে 'ইসরাঈল' শব্দটি প্রথমবারের মত লিখিত পাওয়া গিয়াছে। সে ১৯তম খানদানের চতুর্থ বাদশাহ এবং পিতার ১৩তম পুত্র ছিল। সে প্রাপ্ত বয়সেই সিংহাসনে অধিষ্টিত হয়। তাহার শাসনকাল ছিল ২৫ বৎসর।
বাইবেলের বর্ণিত বিভিন্ন সময়কাল বিশেষত হয়াহুদীদের মিসরে আগমন ও প্রত্যাবর্তন এবং মূসা (আ) ও ফিরআওন সম্পর্কিত সন তারিখ-পরস্পর বিরোধী বলিয়া ড. মরিস বুকাইলী উল্লেখ করিয়াছেন। তাহার রচিত বইয়ের অনুবাদ গ্রন্থ হইতে এই সম্পর্কিত কিছু বিবরণ নিম্নে উল্লেখ করা হইল:
বাইবেলে বলা হইয়াছে (রাজাবলি: ১, ৬, ১) ইয়াহুদীদের মিসর ত্যাগের ঘটনা ঘটিয়াছিল হারকাল-ই সুলায়মান (খৃ. পৃ. ৯৭১ সালের দিকে) নির্মাণের ৪৮০ বৎসর পূর্বে। এই হিসাব হইতে পাওয়া যায়, ইয়াহুদীদের মিসর ত্যাগের ঘটনা ঘটিয়াছিল মোটামুটিভাবে খৃ. পৃ. ১৪৫০ অব্দে। হিসাব অনুসারের ইয়াহুদীদের মিসরে বসবাস শুরু করার সময় দাঁড়াইতেছে খৃ. পৃ. ১৮৮০ হইতে ১৮৫০ অব্দের দিকে। পক্ষান্তরে ধারণা করিয়া আসা হইতেছে যে, এই সময়ে হযরত ইবরাহীম (আ) জীবিত ছিলেন। বাইবেলের অন্য বর্ণনা হইতে অবশ্য জানা যায় যে, হযরত ইউসুফ (আ) হইতে হযরত ইবরাহীম (আ)-এর সময়ের ব্যবধান ছিল ২৫০ বৎসর। এই পরবর্তী হিসাব যদি সত্য হয় তাহা হইলে সময়ানুক্রমের বিচারে বাইবেলেরই রাজাবলী-১ অধ্যায় বর্ণিত হিসাব অগ্রহণযোগ্য হইয়া পড়িতেছে।
আমরা আরো দেখিতে পাইতেছি যে, রাজাবলী-১ এর তথ্য কিভাবে বাইবেলের অন্য স্থানের বর্ণিত তথ্যকে নাকচ করিয়া দিতেছে। সুতরাং দেখা যাইতেছে আমাদের আলোচনার উদ্দেশ্য বাস্তবে বাধাগ্রস্ত করিতেছে অন্য কিছু নহে, বরং বাইবেলে বর্ণিত এই ধরনের এলোমেলো ও অসঠিক সময় গণনার হিসাব।
জানা যায়, দ্বিতীয় রামেসিস ৬৭ বৎসর রাজত্ব করিয়াছিলেন (ড্রাইওটন ও ভ্যান্ডিয়ারের ক্রনোলজি অনুসারে খৃ. পৃ. ১৩০১-১২৩৫ এবং রাওটনের অভিমত অনুসারে খৃ. পূ. ১২৯০-১২২৪)। তাহার উত্তরাধিকারী মারনেপতাহ কতদিন রাজত্ব করিয়াছিলেন সে বিষয়ে মিসর তত্ত্ববিদগণ নির্দিষ্ট কোন হিসাব দিতে পারেন নাই। তবে তাহার রাজত্ব যে কমপক্ষে দশ বৎসরকাল স্থায়ী হইয়াছিল তাহা নিশ্চয় করিয়া বলা চলে। কেননা, ফাদার ডি. ভক্স তাহার গবেষণায় যে দলীলের উদ্ধৃতি দিয়াছেন সেখানে তাহার রাজত্বের দশম বৎসরের কথা উল্লেখ রহিয়াছে। মারনেপ্তাহর রাজত্বকাল সম্পর্কে ড্রাইওটন ও ভ্যান্ডিয়ার দুইটি সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করিয়াছেন : হয় তাহার রাজত্বকাল ছিল দশ বৎসর (খৃ. পৃ. ১২৩৪-১২২৪) নতুবা বিশ বৎসর (খৃ. পূ. ১২২৪-১২০৪)। মারনেপতাহ কিভাবে মৃত্যুবরণ করেন সে বিষয়েও মিসর তত্ত্ববিদগণ সুনির্দিষ্টভাবে কিছুই বলেন নাই। তাহারা শুধুমাত্র জানাইয়াছেন যে, তাহার মৃত্যুর পর গোটা মিসরে অভ্যন্তরীণ তীব্র গোলযোগ দেখা দেয়; এবং তাহা প্রায় ২৫ বৎসরকাল স্থায়ী হয়।
মারনেপতাহর রাজত্বকাল সম্পর্কে দিনপঞ্জির ওই হিসাব কতদূর সঠিক, তাহা বলা মুশকিল। তবে বাইবেলের বর্ণনা মতে প্রাপ্ত এই সময়টিতে অর্থাৎ উক্ত আশি বৎসরের মুদ্দতে (দ্বিতীয় রামেসিস ও মারনেপতাহ ছাড়া) তৃতীয় নূতন কোন রাজার সন্ধান পাওয়া যায় না। এই হিসাবমতে ইয়াহুদীদের মিসর ত্যাগকালে মূসা (আ)-এর বয়স কত হইয়াছিল তাহা জানিতে হইলে পূর্বেই জানা দরকার দ্বিতীয় রামেসীস ও মারনেপতাহ মোট কত বৎসর ধরিয়া রাজত্ব করিয়াছিলেন। এইসব দলীল প্রমাণ হইতে যাহা বাহির হইয়া আসে তাহা হইল, দ্বিতীয় রামেসীসের রাজত্বের গোড়ার দিকে হযরত মূসা (আ) জন্মগ্রহণ করেন। ইহার পর তিনি চলিয়া যান মাদয়ানে। সেইখানে তাঁহার অবস্থানকালেই মিসরে ৬৭ বৎসর রাজত্ব করার পর দ্বিতীয় রামেসিস প্রাণত্যাগ করেন। পরবর্তীকালে তাহার পুত্র ও উত্তরাধিকারী মারনেপতাহর রাজত্বকালে মূসা (আ) মিসরে ফিরিয়া আসেন এবং ইয়াহুদীদের মিসর ত্যাগের ব্যাপারে প্রধান ভূমিকা পালন করেন। ঘটনাটি ঘটা সম্ভব মারনেপতহার রাজত্বের দ্বিতীয়ার্ধে, যদি ধরিয়া লওয়া হয় তিনি বিশ অথবা প্রায় বিশ বৎসর রাজত্ব করিয়াছিলেন। রাওটনের মতে এই অনুমান সঠিক হওয়ার সম্ভাবনা সমধিক। দ্বিতীয় রামেসিস যখন মৃত্যুবরণ করেন তখন তিনি ছিলেন অতি বৃদ্ধ। বলা হয় এই সময় তাহার বয়স হইয়াছিল নব্বুই হইতে একশত বৎসর। এই থিওরী অনুসারে দ্বিতীয় রামেসিস যখন রাজত্ব শুরু করেন তখন তাহার বয়স ছিল তেইশ কিংবা তেত্রিশ বৎসর। আর তিনি রাজত্ব করিয়াছিলেন ৬৭ বৎসর।
রোমেসিস দ্বিতীয় ও মেনেফাতাহ উভয় বাদশাহর মমি কায়রোর যাদুঘরে সংরক্ষিত রহিয়াছে, যাহা উকসুর-এ ২য় আমেন হোটেপ-এর সমাধিতে অন্যান্য মমির সহিত পাওয়া গিয়াছে; তবে সকলের দর্শনের জন্য উহা উন্মুক্ত নহে। বিশেষ অনুমতিক্রমে বিশিষ্ট ব্যক্তিদিগকে উহা দেখানো হয়। সরকারের অনুমতিক্রমে আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদেশী ছাত্র ও বিশিষ্ট মেহমানদিগকে বিশেষ ব্যবস্থাপনায় উহা দেখানো হয়। একটি মমিই কেবল দেখানো হয় এবং বলিয়া দেওয়া হয় যে, "ইহা রামেসিস-এর মমি, যে ছিল মূসা (আ)-এর সময়কার ফিরআওন"। অত্র নিবন্ধকারও উহা স্বচক্ষে দেখিয়াছেন।
ইবনুল জাওযী আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারাক সূত্রে একটি উপাখ্যান উল্লেখ করেন যে, মূসা (আ)-এর সময়ের ফিরআওন ছিল আতর বিক্রেতা। তাহার নিবাস ছিল ইসফাহানে। অতঃপর ব্যবসায়ে লোকসান হওয়াতে এক সময় সে দরিদ্র হইয়া পড়ে এবং ঋণে জর্জরিত হয়। ফলে ঋণ পরিশোধের জন্য সে বাহির হইয়া পড়ে। এমনিভাবে এই দেশ সেই দেশ ঘুরিয়া সে মিসরে গিয়া উপস্থিত হয়। শহরের দরজায় সে এক ঝুড়ি তরমুজ বা শসা দেখিতে পায় যাহা এক দিরহামে বিক্রয় করা হইবে। অথচ শহরে উহার একটির দাম এক দিরহাম। ফিরআওন মনে মনে বলিল, আমি এমন এক স্থানে আসিয়াছি যে, হয়তোবা আমার ঋণ পরিশোধ করিতে এবং ধনী হইতে পারিব। অতঃপর সে এক দিরহামের বিনিময়ে উক্ত এক ঝুড়ি শসা ক্রয় করিল এবং শহরের দিকে রওয়ানা হইল। কিন্তু লোকজন আসিয়া প্রত্যেকে একটি করিয়া শসা উঠাইয়া নিল। আর একটি মাত্র শসা অবশিষ্ট রহিল। উহাই সে শহরে এক দিরহামে বিক্রয় করিল। ইহার ফলে সে বিরক্ত ও মনক্ষুণ্ণ হইল। তাহারা বলিল, ইহাই আমাদের রীতি। সে বলিল, এখানে কি এমন কোন লোক নাই, যে সুবিচার করিবে? এখানে কি কোনও সাহায্যকারী নাই? তাহারা বলিল, "না, এখানে এক বাদশাহ আছেন যিনি নিজের আরাম-আয়েশে বিভোর থাকেন। তিনি স্বীয় মন্ত্রীকে লোকজনের বিষয়াদি তদারকি করিবার জন্য নিয়োগ করিয়াছেন। নিজে কোন কিছুই দেখেন না"।
অতঃপর সে কবরের উপর চাদর বিছাইয়া পয়সা আদায় করিতে লাগিল এবং লাশপ্রতি চার দিরহাম লইতে লাগিল। এমনিভাবে তাহার বেশ কিছু দিন অতিবাহিত হইল। অতঃপর একদিন বাদশাহ্ কন্যা মারা গেল। লোকজন উক্ত লাশ কবর দিতে আসিলে সে চার দিরহাম দাবি করিল। লোকজন বলিল, ইহা বাদশাহ্ কন্যা। তখন সে বলিল, তবে আট দিরহাম দাও। এইভাবে যতই তাহারা বিবাদ করিতে লাগিল ততই সে তাহার দাবিকৃত টাকার অংক দ্বিগুণ করিতে লাগিল। তাহারা ফিরিয়া গিয়া বাদশাহকে বলিল, মৃতদের দেখাশুনাকারী কর্মচারী আমাদের সহিত এইরূপ আচরণ করিয়াছে। বাদশাহ জিজ্ঞাসা করিলেন, সে কর্মচারী কে? তাহারা উহার বিবরণ দিল। অতঃপর মন্ত্রীকে ডাকিয়া বাদশাহ জিজ্ঞাসা করিল, তুমি কি উহাকে এই কর্মে নিয়োগ করিয়াছ? মন্ত্রী বলিল, না। অতঃপর বাদশাহ তাহাকে ডাকাইয়া জিজ্ঞাসা করিল, তোমাকে কে নিয়োগ করিয়াছে? তখন সে তাহার ঘটনা বর্ণনা করিল এবং তরমুজ বা শসার ব্যাপারটি উল্লেখ করিয়া বলিল, লোকজন তাহাকে বলিয়াছে যে, এখানে ন্যায়বিচার করিবার মত কেহ নাই, ইহা দেখিয়া আমি এইরূপ করিয়াছি, যাহা আপনি দেখিতেছেন, যাহাতে বিষয়টি আপনার নিকট পৌঁছে এবং আপনি আপনার রাষ্ট্রের ব্যাপারে অবহিত হইতে পারেন। বাদশাহ জিজ্ঞাসা করিলেন, কত দিন ধরিয়া তুমি এই অবস্থায় আছ? সে বলিল, অনেক বৎসর। এমনি করিয়া আমি বেশ সম্পদের মালিক হইয়াছি। অতঃপর বাদশাহর নিদের্শে মন্ত্রীকে হত্যা করা হইল এবং তাহাকে মন্ত্রী নিযুক্ত করা হইল। মন্ত্রী হওয়ার পর সে খুব উত্তম আচরণ করিল এবং মিসরবাসীর জন্য পূর্বের তুলনায় অনেক সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের ব্যবস্থা করিল। সে ন্যায়বিচার করিতে লাগিল, যদিও ইহা ছিল তাহার ব্যক্তিস্বার্থের জন্য। অতঃপর বাদশাহ মৃত্যুবরণ করিল? তখন প্রজাবৃন্দ নূতন বাদশাহ নিযুক্ত করিবার জন্য একত্র হইল এবং এই ব্যাপারে তাহারা ঐক্যমতে পৌঁছিল যে, তাহারা এই ব্যক্তিকে ছাড়া আর কাহাকেও বাদশাহ নিযুক্ত করিবে না, যে তাহাদের জন্য সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও আরাম-আয়েশের ব্যবস্থা করিয়াছে। অতঃপর তাহারা নিজেদের পক্ষ হইতে উহাকেই বাদশাহ নিযুক্ত করিল। এমনিভাবে তাহার রাজত্বকাল দীর্ঘ হইতে দীর্ঘতর হইল, এমনকি শেষে সে ইলাহ দাবি করিয়া বসিল।
টিকাঃ
ইবনুল-জাওযী, আল-মুনতাজাম, ১খ, ৩৩২২
কাসাসুল-কুরআন, ১খ, ৩৬১
ড. মরিস বুকাইলি, বাইবেল কোরআন ও বিজ্ঞান (অনু.) শিরো সময়ের বিশ্লেষণ : ১, পৃ. ৩০০-৩০৪
প্রাগুক্ত, শিরো-দ্বিতীয় রামেসিস ও মারনেপতাহঃ ৩, পৃ. ৩১৩-৩১৪
আবdul ওয়াহহাব নাজজার, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ২০৩
ইবনুল জাওযী, আল-মুনতাজাম ফী তারীখিল উমাম, ১খ, ৩৩২-৩৩৩