📄 হযরত উযায়র (আ)-এর পবিত্র জীবন
হযরত উযায়র (আ)-এর পবিত্র জীবন সম্বন্ধে বিস্তারিত বিবরণ জীবনী ও ইতিহাস গ্রন্থসমূহে পাওয়া যায় না। তাওরাতের ইয়া পুস্তকেও তাঁহার পবিত্র জীবনের উপর বিস্তারিত আলোকপাত করা হয় নাই এবং উহার বেশীর ভাগই বনী ইসরাঈলের ব্যাবিলনের বন্দীদশা এবং সেই সম্বন্ধীয় অন্যান্য আলোচনায় পূর্ণ। অবশ্য তাওরাত, ওয়াহব ইব্ন মুনাব্বিহ এবং কা'ব আহবার হইতে বর্ণিত বিবরণ হইতে কেবল এতটুকু সন্ধান পাওয়া যায় যে, তিনি বুখত নাসের কর্তৃক বায়তুল মাকদিস আক্রান্ত হওয়ার সময় অল্পবয়স্ক ছিলেন এবং চল্লিশ বৎসর বয়সে বনী ইসরাঈলের ফাকীহ পদে অধিষ্ঠিত হন এবং নবুওয়াত লাভ করেন। তিনি বনী ইসরাঈলদের হিদায়াতের কাজ সম্পন্ন করিতেন। আর আর্দশেরের যমানায় বনী ইসরাঈলদের বায়তুল মাকদিস পুননির্মাণ সম্বন্ধীয় বাধা ও সমস্যার সমাধানের জন্য পারস্যের শাহী দরবারে নিজের প্রভাব-প্রতিপত্তি দ্বারা কার্যোদ্ধার করিতেন। প্রসিদ্ধ মতানুযায়ী যে সমস্ত বিজ্ঞজন সূরা বাকারায় বর্ণিত ঘটনাটির সম্পর্ক হযরত উযায়র (আ)-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত করিয়াছেন তাহারা এ সম্বন্ধে আরও কিছু বিস্তারিত বিবরণ হযরত আবদুল্লাহ ইব্ন সালাম ও কা'ব আহ্হ্বার প্রমুখ হইতে বর্ণনা করিয়াছেন। যাহারা মনে করেন যে, আল-কুরআনের আয়াতে উল্লিখিত ব্যক্তি ছিলেন উযায়র (আ) তাহাদের মতে তিনি নবী ছিলেন না, বরং ছিলেন একজন সৎ ও বিজ্ঞ ব্যক্তি। তবে অধিকাংশ আলিমের মতে তিনি নবী ছিলেন এবং কুরআন কারীমও যেভাবে তাঁহার উল্লেখ ও আলোচনা করিয়াছে, তাহাতেও বুঝা যায় যে, তিনি আল্লাহর নবী ছিলেন। আর পথভ্রষ্ট ইয়াহুদীগণ তাঁহাকে আল্লাহর পুত্র বলিয়া বিশ্বাস করিয়াছে, যেরূপ পথভ্রষ্ট খৃস্টানগণ হযরত ঈসা (আ)-কে আল্লাহর পুত্র বলিয়া বিশ্বাস করে। তাওরাতও হযরত উযায়র (আ)-কে নবীরূপে উল্লেখ করিয়াছে। যাহারা মনে করেন যে, সূরা বাকারার আলোচ্য আয়াতসমূহের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ছিলেন হযরত উযায়র (আ), অথচ তাঁহাকে তাহারা তাঁহার নবুওয়াত ও নবী হওয়া স্বীকার করেন না তাহাদের জন্য এই কথাটি প্রণিধানযোগ্য যে, সূরা বাকারায় আল্লাহ তা'আলা সরাসরি তাঁহাকে সম্বোধন করিয়াছেন এবং তাঁহার সহিত কথা বলিয়াছেন। ইহা তাঁহার নবুওয়াতের সুস্পষ্ট প্রমাণ। তবে তাঁহার নবী হওয়া সম্পর্কে মতপার্থক্য থাকিলেও অধিকাংশ আলিমের মতে তিনি আল্লাহ্ নবী ছিলেন।
টিকাঃ
আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ, ৪০
ইব্রা পুস্তক; কাসাসুল-কুরআন, ২খ, ২৪৬
ইন্ন কাছীর, বিদায়া, ২খ., ৪৩
📄 হযরত উযায়র (আ)-এর অগ্নিপরীক্ষা
বুখতনাসার ছিল অত্যাচারী অমুসলিম শাসক। সে স্বর্ণের একটি প্রতিমা বানাইল যাহা দৈর্ঘ্যে ছিল ষাট হাত এবং প্রস্থে ছয় হাত। বুখতনাসার সেটি ব্যাবিলনে (বাবিল) স্থাপন করিল এবং ঘোষণা করিল যে, যখন পূজার বাদ্যযন্ত্রসমূহ বাজানো হইবে, তখন প্রত্যেক ব্যক্তিকেই ঐ প্রতিমাকে সিজদা করিতে হইবে। অমান্যকারীদের জ্বলন্ত আগুনে পোড়াইয়া মারা হইবে। কিন্তু অবেদনগো, শদ্রক ও মৈশক ঐ প্রতিমাকে সিজদা করিতে অস্বীকার করেন। জামীল আহমদ আম্বিয়া-ই কুরআনের ৩খ., ২৩২ পৃষ্ঠায় আবেদনগো উযায়র (আ) ছিলেন বলিয়া অভিমত ব্যক্ত করেন। বুখতনাসার ভীষণ ক্রুদ্ধ হইল এবং ঐদিন তিনজনকে ডাকাইয়া অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করার নির্দেশ দিল। তাহার অগ্নিকুণ্ডটি এতই উত্তপ্ত ছিল যে, যাহারা তাহাকে অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করিল তাহারা আগুনের খরতাপে দগ্ধ হইয়া মারা গেল। কিন্তু আল্লাহ্র অপার কৃপায় হযরত উযায়র (আ) এবং তাঁহার অপর দুইজন সঙ্গী সম্পূর্ণ অক্ষত রহিলেন। বুখতনাসার দূর হইতে উঁকি মারিয়া দেখিল, উযায়র (আ) আগুনের মধ্যে হাঁটাচলা করিতেছেন। বুখতনাসার এই দৃশ্য দেখিয়া বলিল, শদ্রক, মৈশক ও অবেদনগোর (উযায়রের) খোদা মুবারক হোক। তিনি তাঁহার ফেরেশতা পাঠাইয়া তাঁহার বান্দাদিগকে রক্ষা করিয়াছেন। তাঁহারা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাহারও ইবাদত-বন্দেগী করিবে না বলিয়া প্রতিজ্ঞা করিয়াছেন। তাই আমি এই নির্দেশ জারী করিতেছি যে, যে জাতি শদ্রক, মৈশক ও আবেদনগো-এর খোদাকে গালমন্দ কারিবে, তাহাদিগকে আমি খণ্ড-বিখণ্ড করিয়া ফেলিব। তাহাদের গৃহ আবর্জনার স্তূপে পরিণত করা হইবে। কেননা এমন অন্য কোন দেবতা নাই, যে এইভাবে স্বীয় উপাসককে রক্ষা করিতে পারে। অতঃপর বুখতনাসার শদ্রক, মৈশক ও আবেদনগো-কে ব্যাবিলন প্রদেশে উচ্চপদে নিযুক্ত করিলেন। আর্দশেরের রাজত্বের সপ্তম বৎসর হযরত উযায়র (আ) বায়তুল মাকদিস আগমন করেন। তাওরাতে হযরত উযায়র (আ)-এর মধ্যবর্তী সময়কালের কথা বর্ণিত হয় নাই। সম্ভবত এই সময়কালেই কুরআনের বর্ণনা অনুসারে তিনি এক শত বৎসরের জন্য মৃত অবস্থায় ছিলেন।
টিকাঃ
দানিয়েল, তৃতীয় অধ্যায়: ১
দানিয়েল, তৃতীয় অধ্যায়: ২৮-৩০
ইয়া, সপ্তম অধ্যায়ঃ ৮
📄 ইনতিকাল
ইব্ন কাছীর ওয়াহ্হ্ ইব্ন মুনাব্বিহ, কা'ব আহবার ও হযরত আবদুল্লাহ ইব্ন সালাম (রা) হইতে উযায়র (আ) সম্বন্ধে যে বর্ণনাটি উদ্ধৃত করিয়াছেন, উহাতে উল্লেখ আছে যে, হযরত উযায়র (আ) ইরাকে অবস্থানকালে দায়েরে হিযকীলে বসিয়া বনী ইসরাঈলদের জন্য তাওরাতের নূতন সংস্করণ লিখিয়া দিয়াছিলেন এবং এই অঞ্চলেই সায়বাবাদ নামক একটি জনপদে তিনি ইনতিকাল করেন।
টিকাঃ
আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ, ৪২ এবং অন্যত্র বলেন, কোন কোন সাহাবা কিরাম ও তাবিঈনের বর্ণনায় আছে যে, তাঁহার কবর দামিশকে অবস্থিত (আল্-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ, পৃ. ৪৩)
📄 সন্তান-সন্তুতি
ইতোপূর্বে ‘পরিবার-পরিজনের সহিত সাক্ষাত’ উপ-শিরোনামে বলা হইয়াছে যে, হযরত উযায়র (আ) এক শত বৎসর মৃত থাকার পর পুনর্জীবন লাভ করিয়া স্বগৃহে প্রত্যাবর্তন করেন এবং তাঁহার জীবিত থাকা এক শত আঠার বৎসর বয়সের এক পুত্র তাঁহার দুই কাঁধের মধ্যস্থলের তিল দেখিয়া তাঁহাকে চিনিতে পারিয়াছিলেন। ইহা হইতে বুঝা যায় যে, তিনি বিবাহিত ছিলেন এবং তাঁহার একাধিক পুত্র ও পৌত্রাদি ছিল। বিদায়া ওয়ান-নিহায়ায় (পৃ. ৪২) উল্লিখিত হইয়াছে, হযরত উযায়র (আ) তাঁহার বৃদ্ধ পুত্র ও পৌত্রদের সহিত যুবক অবস্থায় বসবাস করিতেন। কেননা তিনি যখন চল্লিশ বৎসর বয়সের ছিলেন, তখন আল্লাহ তাঁহাকে মৃত্যু দান করিয়াছিলেন এবং সেই অবস্থায়ই তাঁহাকে পুনর্জীবিত করিয়াছিলেন।