📄 অন্যান্য ধর্মগ্রন্থে হযরত উযায়র (আ)
কুরআন মজীদ কিংবা বিশুদ্ধ হাদীছে উযায়র (আ) সম্বন্ধে বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায় না বিধায় এখন এই ব্যাপারে বাইবেলের বিবরণের উপর নির্ভর করিতে হয়। বাইবেল ইতিহাস গ্রন্থটি হইতে জানা যায় যে, যখন বনী ইসরাঈলের অবাধ্যাচরণ ও অপকর্ম সীমা অতিক্রম করিয়া গিয়াছে এবং অত্যাচার ও উৎপীড়নের অবস্থা চরমে উঠিয়াছে, আল্লাহ তা'আলার তরফ হইতে তৎকালের পয়গাম্বর ইয়ারমিয়া (যিরমিয়) (আ)-এর উপর ওয়াহী আসিল যে, বনী ইসরাঈলের মধ্যে ঘোষণা করিয়া দাও, তাহারা যেন এ সমস্ত অসৎকার্য হইতে বিরত থাকে। অন্যথায় অন্যান্য জাতির ন্যায় তাহাদেরকে ধ্বংস করিয়া দেওয়া হইবে। ইয়ারমিয়া (আ) যখন আল্লাহ্ এই পয়গাম বনী ইসরাঈলের নিকট পৌছাইলেন, তখন তাহারা ইহার প্রতি কর্ণপাত করিল না, বরং অত্যাচার-অপকর্ম আরও বাড়াইয়া দিল, ইয়ারমিয়ার সহিত ঠাট্টা-বিদ্রূপ করিতে লাগিল, এমনকি তাঁহাকে গৃহবন্দী করিয়া রাখিল। এই অবস্থায়ও তিনি তাহাদেরকে বলিলেন, তাহারা ব্যাবিলনের বাদশাহ্ হাতে ধ্বংসপ্রাপ্ত হইবে। সে তাহাদেরকে বন্দী করিয়া ব্যাবিলনে লইয়া যাইবে আর যেরুসালেমকে বিলীন করিয়া ফেলিবে।
খৃ.পূ. সপ্তম শতাব্দীর প্রায় মধ্যভাগে নেবুকাদ নাযারের (বুখ্ নাসার-এর) আবির্ভাব হইল। সে তাহার প্রবল ক্ষমতাবলে আশেপাশের রাজ্যসমূহকে অধীন করিয়া লইল। স্বল্পকাল মধ্যে সে উপর্যুপরি তিনবার ফিলিস্তীন আক্রমণ করিয়া বনী ইসরাঈলকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করিল। যেরুসালেম ও ফিলিস্তীনের সমগ্র অঞ্চলটিকে ধ্বংস করিয়া ফেলিল। সমস্ত বনী ইসরাঈলকে বন্দী করিয়া ভেড়া ও বকরীর পালের ন্যায় হাঁকাইয়া ব্যাবিলনের দিকে লাইয়া গেল। তাওরাতের সমস্ত কপি পোড়াইয়া ফেলিল। একটি কপিও বনী ইসরাঈলের হাতে অবিশিষ্ট রহিল না। যে সময় 'বুখত্নাসার ইসরাঈলী পরিবারগুলিকে বন্দী করিয়া দাসে পরিণত করিতেছিল তখন এক ব্যক্তি তাহাকে বলিল, এখানে ইয়ারমিয়া নামের এক ব্যক্তি বন্দীখানায় আবদ্ধ রহিয়াছেন। তিনি তোমার এই আক্রমণের পূর্বেই সম্যক অবস্থা সম্বন্ধে বনী ইসরাঈলকে ভবিষ্যদ্বাণীর মাধ্যমে সতর্ক করিয়াছিলেন কিন্তু তাঁহার কওম তাঁহার কথায় কর্ণপাত না করিয়া তাঁহাকে কারাগারে আবদ্ধ রাখিয়াছে। বুখতনাসার একথা শুনিয়া ইয়ারমিয়া (আ)-কে কারাগার হইতে বাহিরে আনিয়া তাঁহার সহিত কথাবার্তা বলিল। ইয়ারমিয়া (আ)-এর জ্ঞান ও যুক্তিপূর্ণ কথাবার্তা শুনিয়া সেও আগ্রহ প্রকাশ করিল যে, তিনিও যেন তাহার সঙ্গে ব্যাবিলনে গমন করেন। সেখানে সে তাঁহাকে সম্মানের সহিত রাখিবে। কিন্তু হযরত ইয়ারমিয়া (আ) এই বলিয়া তাহার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করিলেন যখন আমার কওম অপমান ও লাঞ্ছনার সহিত ব্যাবিলনে যাইতেছে, তখন আমি আমার এই সম্মানের তুলনায় আমার বর্তমান অবস্থাকে উত্তম মনে করিতেছি। অতঃপর তিনি যেরুসালেম হইতে দূরে কোন এক জঙ্গলে বসবাস করিতে লাগিলেন। ইয়ারমিয়া নবীর সহীফায় ইহাও আছে যে, তিনি সেখানে থাকিয়াই ব্যাবিলনে ইসরাঈলীদেরকে এই মর্মে ভবিষ্যদ্বাণী লিখিয়া পাঠাইয়াছিলেন যে, বনী ইসরাঈল সত্তর বৎসর পর্যন্ত ব্যাবিলনে অপমান ও লাঞ্ছনার সহিত থাকিবে। অতঃপর তাহারা আবার নিজেদের দেশে আসিয়া বসবাস করিবে।
অতঃপর বুখত্নাসারের মৃত্যুর পর খৃ. পৃ. প্রায় ৫৩৯ সালে পারস্য-রাজ সাইরাস (কায়খসরু) ব্যাবিলনের রাজা বেলশাহারকে পরাস্ত করিয়া পারস্য রাজ্যকে তাহার অত্যাচার হইতে মুক্ত করিলেন। সেই সময়ই তিনি ইসরাঈলকেও মুক্ত করিলেন এবং যেরুসালেম ও সেখানকার উপাসনালয় নির্মাণ করার জন্য তাহাদেরকে অনুমতি প্রদান করিলেন। পারস্য-রাজ কায়খসরূ ব্যাবিলন জয় করার পর আরও প্রায় দশ বৎসর জীবিত ছিলেন। সেই সময় বনী ইসরাঈল মুক্ত হইয়া বায়তুল মাকদিস নির্মাণকার্যে নিয়োজিত হইল। কিন্তু বাইবেলে ইয়া পুস্তক হইতে বুঝা যায় যে, এই নির্মাণ কার্য কায়খসরূর জীবিতকালে সমাপ্ত হয় নাই। মধ্যস্থলে কোন কোন নেতার হস্তক্ষেপের কারণে দুইবার বনী ইসরাঈলকে বায়তুল-মাকদিসের নির্মাণকার্য কিছু কালের জন্য বন্ধ রাখিতে হইয়াছিল। অনন্তর কায়খসরূর পরে দারা এবং দারার পরে আর্দেশেরের যুগে তাহারা উহার পুননির্মাণ সমাপ্ত করিতে সক্ষম হয় এবং যেরুসালেম আরেক বার পূর্বাপেক্ষা অধিক সুশোভিত শহররূপে দৃষ্ট হইতে লাগিল। এসব বিবরণের সারমর্ম এই যে, বুখত নাসার কর্তৃত যেরুসালেম ধ্বংস হওয়ার পর কায়খসরু হইতে আর্দশেরের যুগ পর্যন্ত ইহা পুনরায় পুরাপুরি আবাদ হওয়ার মধ্যবর্তী সময়ে ইয়ারমিয়া (প্রসিদ্ধ মত অনুযায়ী উযায়র) (আ)-এর সেই ঘটনাটি ঘটিয়া ছিল যাহা সূরা বাকারায় বর্ণিত হইয়াছে।
হযরত উযায়র (আ)-এর পবিত্র জীবন সম্বন্ধে যে সমস্ত বিবরণ বাইবেলে বর্ণিত হইয়াছে, উহা হইতে বুঝা যায় যে, বনী ইসরাঈল ব্যাবিলনীয়দের হাতে বন্দী হওয়ার সময় হযরত উযায়র (আ) অল্পবয়স্ক ছিলেন এবং ইসরাঈলীদের সঙ্গে ব্যাবিলনেই ছিলেন। চল্লিশ বৎসর বয়সে ব্যাবিলনেই তিনি নবুওয়াত লাভ করেন আর যেরুসালেমের নির্মাণকার্য বাধা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে দারা ও আর্দেশেরের দরবারের যেই প্রতিনিধিদল অভিযোগ করিয়াছিল, তাহাতেও উযায়র (আ)-ই পুরোভাগে ছিলেন। আর বুস্ত নাসার কর্তৃক তাওরাত ধ্বংস হওয়ার পর যেরুসালেমে নূতন করিয়া তাওরাতের পুণর্লিখন ও পুনরুদ্ধার তাঁহারই নবুওয়াতের ফলে হইয়াছিল। খৃ.পৃ. ৪৫৮ সালে হযরত উযায়র (আ) ইয়াহুদিয়ায় পৌছেন। পারস্য-রাজ আর্দশের এক ফরমানবলে তাঁহাকে ক্ষমতা দান করেন। এই ফরমানবলে হযরত উযায়র (আ) মূসা (আ)-এর দীনের পুনরুজ্জীবনে বিরাট দায়িত্ব সম্পাদন করেন। তিনি বিভিন্ন এলাকা হইতে ইয়াহুদী জাতির সকল সৎ ও ন্যায়নিষ্ঠ লোককে একত্র করিয়া একটি শক্তিশালী শাসনব্যবস্থা গড়িয়া তোলেন। ইয়াহুদীদের দীনী শিক্ষার ব্যবস্থা করেন। অন্য জাতির প্রভাবে বনী ইসরাঈলের মধ্যে যেসব আকীদাগত ও চারিত্রিক অনাচারের অনুপ্রবেশ ঘটিয়াছিল শরীআতের আইন জারী করিয়া তিনি সেগুলি দূর করেন। ইয়াহুদীরা যেসব মুশরিক মেয়েকে বিবাহ করিয়া ঘর-সংসার করিত, তাহাদেরকে তালাক দিবার ব্যবস্থা করেন। বনী ইসরাঈল-এর নিকট হইতে আবার নূতন করিয়া আল্লাহ্ বন্দেগী করার এবং তাঁহার আইন মানিয়া চলার অঙ্গীকার নেন।
টিকাঃ
পবিত্র বাইবেলের যিরমিয়া পুস্তক, কাসাসুল্-কুরআন, ২খ, পৃ. ২৩৯
কাসাসুল কুরআন, ২খ, ২৪০; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ, ৩৭-৩৮; তারীখ-ই ইব্ন খালদুন, এনসাইক্লোপেডিয়া অফ ইসলাম
কাসাসুল কুরআন, ২খ, ২৪০
কাসাসুল কুরআন, ২খ, ২৪১
তাফহীমুল কুরআন উর্দু, ২খ. ১৮৯
দ্র. ইয়া পুস্তক ৭: ২৫-২৬
তাফহীমুল কুরআন ২খ, ৫৯৯, টীকা, ৮
📄 হযরত উযায়র (আ)-কে আল্লাহ তা'আলার পুত্র বলার ভ্রান্ত বিশ্বাস
ইতোপূর্বে বর্ণিত হইয়াছে, বুখতনাসার যখন বায়তুল মাকদিসকে বিধ্বস্ত করিয়া ইসরাঈলদিগকে বন্দী করিয়া লইয়া গেল, তাওরাতের সমস্ত কপি পোড়াইয়া ফেলিল, ফলে বনী ইসরাঈলের নিকট একটি কপিও অবশিষ্ট রহিল না। তাহাদের মধ্যে তাওরাত কাহারও মুখস্থ ছিল না। ফলে বন্দী থাকাকালে পূর্ণ সময়টিতে তাহারা তাওরাত হইতে সম্পূর্ণ বঞ্চিত ছিল। কিন্তু দীর্ঘকাল পরে যখন তাহারা ব্যাবিলনের বন্দীদশা হইতে মুক্তিলাভ করিল এবং তাহারা পুনরায় বায়তুল মাকদিসে (যেরুসালেমে) আসিয়া বসতি স্থাপন করিল, তখন তাহাদের চিন্তা হইল যে, আল্লাহ্ তা'আলার কিতাব তাওরাতকে কিভাবে লাভ করা যায়? তখন হযরত উযায়র (আ) বনী ইসরাঈলদিগকে সমবেত করিয়া তাহাদের সম্মুখে তাওরাত প্রথম হইতে শেষ পর্যন্ত মুখস্ত পাঠ করিয়া শুনাইলেন এবং লিখাইয়া দিলেন।
কোন কোন ইসরাঈলী বর্ণনায় আছে, যখন তিনি ইসরাঈলদিগকে একত্র করিলেন, তখন সকলের সম্মুখে আসমান হইতে দুইটি উজ্জ্বল নক্ষত্র নামিয়া আসিয়া হযরত উযায়রের বক্ষের ভিতরে প্রবেশ করিল। তখন হযরত উযায়র (আ) বনী ইসরাঈলকে তাওরাত পুনরায় প্রথম হইতে শেষ পর্যন্ত ক্রমিক অনুযায়ী সাজাইয়া দিলেন। হযরত উযায়র (আ) যখন এই বিরাট গুরুত্বপূর্ণ কাজ হইতে অবসর লাভ করিলেন, তখন বনী ইসরাঈল অশেষ আনন্দ প্রকাশ করিল এবং তাহাদের অন্তরে হযরত উযায়রের মূল্য ও মর্যাদা শত গুণ বৃদ্ধি পাইল। ক্রমে এই মহব্বতের আতিশয্য গোমরাহীর রূপ ধারণ করিল। তাহারা হযরত উযায়র (আ)-কে আল্লাহ তা'আলার পুত্র সাব্যস্ত করিল, যেরূপ নাসারাগণ হযরত ঈসা (আ)-কে আল্লাহ্র পুত্র বলিয়া বিশ্বাস করে। আর বনী ইসরাঈলের একটি দল নিজেদের এই আকীদার 'পক্ষে এই প্রমাণ আনয়ন করিয়াছে যে, মূসা যখন আমাদেরকে তাওরাত আনিয়া দিয়াছিলেন, তখন তাহা তক্তাসমূহে (কাষ্ঠফলকে) লিখিত ছিল। আর উযায়র (আ) তো কোন তক্তা কিংবা কাগজে লিখিত অবস্থায় আনয়নের পরিবর্তে অক্ষরে অক্ষরে নিজের স্মৃতিপট হইতে উহা আমাদের সামনে নকল করিয়া দিলেন। অতএব উযায়র (আ) আল্লাহ্ পুত্র বলিয়াই এইরূপ ক্ষমতার অধিকারী হইয়াছেন (নাউযুবিল্লাহ)। তবে কুরআনের বক্তব্য ইহা নহে যে, সমস্ত ইহুদীই উযায়র (আ)-কে 'আল্লাহ্ পুত্র' বানাইয়া নিয়াছিল। কুরআনের বক্তব্য হইল যে, আল্লাহ সম্পর্কে ইহুদীদের আকীদা অত্যন্ত খারাপ হইয়া গিয়াছিল বরং এই খারাবি এতদূর তীব্র হইয়া পড়িয়াছিল যে, উযায়রকে আল্লাহ বলার মত লোকও তাহাদের মধ্যে সৃষ্টি হইয়াছিল।
মুহাম্মাদ জামীল আহমাদ তাঁহার আম্বিয়া-ই কুরআন (৩য় খণ্ড, পৃ. ২৩৭-২৩৮) গ্রন্থে বলেন, যেহেতু হযরত উযায়র (আ) নূতনভাবে তাওরাত সংকলন করেন, শারীআতকে পুনরায় সুবিন্যস্ত করেন এবং বন্দী জীবন হইতে মুক্তির পর বনী ইসরাঈলের ইতিহাসের এক নূতন যুগের প্রতিষ্ঠা করেন, সুতরাং ইয়াহুদীদের মধ্যে তাঁহার ব্যক্তিত্ব অত্যন্ত পবিত্র বলিয়া গণ্য হয়, এমনকি ইয়াহুদীদের একটি শ্রেণী তাঁহাকে ইবনুল্লাহ বা আল্লাহ্ পুত্র বলিয়া বিশ্বাস করিতে শুরু করে। ফিলিস্তীনের আশেপাশে আজও ইয়াহূদীদের একটি শ্রেণী দেখিতে পাওয়া যায়, যাহারা উযায়র (আ)-কে 'আল্লাহ্র পুত্র' বলিয়া বিশ্বাস করে এবং রোমান ক্যাথলিক খৃস্টানদের ন্যায় তাঁহার প্রতিকৃতি নির্মাণ করিয়া উহার পূজা করে।
সূরা তাওবার এ সংক্রান্ত আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে সায়্যিদ সুলায়মান নদভী লিখিয়াছেন, "ইসলাম বিরোধীরা বলে যে, ইয়াহুদীদের মধ্যে হযরত উযায়র (আ)-কে আল্লাহর পুত্র' বলিয়া বিশ্বাস করিবার মত কোন দল বা-শ্রেণী নাই। সুতরাং কুরআনের এই দাবিটি সম্পূর্ণ অবাস্তব ও অবান্তর। এ প্রশ্নের জোরালো জবাব দিয়াছেন ইমাম বায়যাবী (র)। তিনি বলিয়াছেন, মদীনার ইয়াহুদীদের সম্মুখে কুরআন মজীদ এই ঘোষণা দিয়াছিল। তখন ইয়াহুদীগণ উহার কোন প্রতিবাদ করে নাই। ইহাতেই বুঝা যাইতেছে যে, ইয়াহুদীদের মধ্যে এরূপ বিশ্বাসী লোক বর্তমান ছিল। ইন্ন জারীর তাবারীও হযরত ইব্ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণনা করিয়াছেন যে, মদীনায় এইরূপ বিশ্বাস পোষণকারী কিছু লোক বর্তমান ছিল। ইব্ন হাযম 'মিলাল ওয়ান-নিহাল' গ্রন্থে লিখিয়াছেন, ইয়ামনের অধিবাসী ইয়াহুদীদের সাদৃকী দলটি এই বিশ্বাস পোষণ করিত।"
-আমার মতে মূলত ইয়াহুদীদের মধ্যে (আল্লাহ্) পুত্রত্বের ধারণা অতি প্রাচীন। আদিপুস্তকের ষষ্ঠ অধ্যায়ে আছে, তখন ঈশ্বরের পুত্রের মনুষ্যদের কন্যাগণকে দেখিয়া যাহার যাহাকে ইচ্ছা সে তাহাকে বিবাহ করিতে লাগিল।
হিব্রু ভাষায় আল্লাহ্র পুত্র বলিতে আল্লাহর প্রিয়ভাজন বুঝানো হয়। আর একারণেই মুসলমানদের মুকাবিলায় আরবের ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের দাবি ছিল: وَقَالَتِ الْيَهُودُ وَالنَّصْرِى نَحْنُ أَبْنَاءُ اللهِ وَأَحبَّاؤُهُ : "এমতাবস্থায় আরবের ইয়াহুদীগণ যদি খৃস্টানদের মুকাবিলায় তাহাদের দর্পচূর্ণ করার জন্য হযরত উযায়র (আ)-কে হযরত ঈসা (আ)-এর সমকক্ষ সাব্যস্ত করেন, তাহাতে আশ্চর্য হইবার কি আছে। ..... প্রকৃতপক্ষে সমুদয় মুশরিক ও মূর্তি পূজারিগণই এরূপ মতবাদ পোষণ করিয়া থাকে কিন্তু বিশেষভাবে খৃস্টানগণ যে জাতি হইতে এই মতবাদ ও বিশ্বাস লাভ করিয়াছে, তাহারা ছিল মিসরের অধিবাসী। আর ইয়াহুদী সম্প্রদায় খৃস্টানদের দেখাদেখি এই বাক্য উচ্চারণ করিয়াছে। অতএব পবিত্র কুরআনে সঙ্গত কারণেই তাহাদের এই ভ্রান্ত আকীদাকে খণ্ডন করা হইয়াছে।
টিকাঃ
আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ, ৪২
তাফহীমুল কুরআন, সূরা তাওবা, টীকা ২৯; বায়ানুল কুরআন, ৪খ, ১০৭; আম্বিয়া-ই কুরআন, ৩খ, পৃ. ২৩৭-৩৮
আম্বিয়া-ই কুরআন, ৩খ, ২৩৭-২৩৮
আম্বিয়া-ই কুরআন, ৩খ, ২৩৭-৮
📄 হযরত উযায়র (আ)-এর পবিত্র জীবন
হযরত উযায়র (আ)-এর পবিত্র জীবন সম্বন্ধে বিস্তারিত বিবরণ জীবনী ও ইতিহাস গ্রন্থসমূহে পাওয়া যায় না। তাওরাতের ইয়া পুস্তকেও তাঁহার পবিত্র জীবনের উপর বিস্তারিত আলোকপাত করা হয় নাই এবং উহার বেশীর ভাগই বনী ইসরাঈলের ব্যাবিলনের বন্দীদশা এবং সেই সম্বন্ধীয় অন্যান্য আলোচনায় পূর্ণ। অবশ্য তাওরাত, ওয়াহব ইব্ন মুনাব্বিহ এবং কা'ব আহবার হইতে বর্ণিত বিবরণ হইতে কেবল এতটুকু সন্ধান পাওয়া যায় যে, তিনি বুখত নাসের কর্তৃক বায়তুল মাকদিস আক্রান্ত হওয়ার সময় অল্পবয়স্ক ছিলেন এবং চল্লিশ বৎসর বয়সে বনী ইসরাঈলের ফাকীহ পদে অধিষ্ঠিত হন এবং নবুওয়াত লাভ করেন। তিনি বনী ইসরাঈলদের হিদায়াতের কাজ সম্পন্ন করিতেন। আর আর্দশেরের যমানায় বনী ইসরাঈলদের বায়তুল মাকদিস পুননির্মাণ সম্বন্ধীয় বাধা ও সমস্যার সমাধানের জন্য পারস্যের শাহী দরবারে নিজের প্রভাব-প্রতিপত্তি দ্বারা কার্যোদ্ধার করিতেন। প্রসিদ্ধ মতানুযায়ী যে সমস্ত বিজ্ঞজন সূরা বাকারায় বর্ণিত ঘটনাটির সম্পর্ক হযরত উযায়র (আ)-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত করিয়াছেন তাহারা এ সম্বন্ধে আরও কিছু বিস্তারিত বিবরণ হযরত আবদুল্লাহ ইব্ন সালাম ও কা'ব আহ্হ্বার প্রমুখ হইতে বর্ণনা করিয়াছেন। যাহারা মনে করেন যে, আল-কুরআনের আয়াতে উল্লিখিত ব্যক্তি ছিলেন উযায়র (আ) তাহাদের মতে তিনি নবী ছিলেন না, বরং ছিলেন একজন সৎ ও বিজ্ঞ ব্যক্তি। তবে অধিকাংশ আলিমের মতে তিনি নবী ছিলেন এবং কুরআন কারীমও যেভাবে তাঁহার উল্লেখ ও আলোচনা করিয়াছে, তাহাতেও বুঝা যায় যে, তিনি আল্লাহর নবী ছিলেন। আর পথভ্রষ্ট ইয়াহুদীগণ তাঁহাকে আল্লাহর পুত্র বলিয়া বিশ্বাস করিয়াছে, যেরূপ পথভ্রষ্ট খৃস্টানগণ হযরত ঈসা (আ)-কে আল্লাহর পুত্র বলিয়া বিশ্বাস করে। তাওরাতও হযরত উযায়র (আ)-কে নবীরূপে উল্লেখ করিয়াছে। যাহারা মনে করেন যে, সূরা বাকারার আলোচ্য আয়াতসমূহের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ছিলেন হযরত উযায়র (আ), অথচ তাঁহাকে তাহারা তাঁহার নবুওয়াত ও নবী হওয়া স্বীকার করেন না তাহাদের জন্য এই কথাটি প্রণিধানযোগ্য যে, সূরা বাকারায় আল্লাহ তা'আলা সরাসরি তাঁহাকে সম্বোধন করিয়াছেন এবং তাঁহার সহিত কথা বলিয়াছেন। ইহা তাঁহার নবুওয়াতের সুস্পষ্ট প্রমাণ। তবে তাঁহার নবী হওয়া সম্পর্কে মতপার্থক্য থাকিলেও অধিকাংশ আলিমের মতে তিনি আল্লাহ্ নবী ছিলেন।
টিকাঃ
আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ, ৪০
ইব্রা পুস্তক; কাসাসুল-কুরআন, ২খ, ২৪৬
ইন্ন কাছীর, বিদায়া, ২খ., ৪৩
📄 হযরত উযায়র (আ)-এর অগ্নিপরীক্ষা
বুখতনাসার ছিল অত্যাচারী অমুসলিম শাসক। সে স্বর্ণের একটি প্রতিমা বানাইল যাহা দৈর্ঘ্যে ছিল ষাট হাত এবং প্রস্থে ছয় হাত। বুখতনাসার সেটি ব্যাবিলনে (বাবিল) স্থাপন করিল এবং ঘোষণা করিল যে, যখন পূজার বাদ্যযন্ত্রসমূহ বাজানো হইবে, তখন প্রত্যেক ব্যক্তিকেই ঐ প্রতিমাকে সিজদা করিতে হইবে। অমান্যকারীদের জ্বলন্ত আগুনে পোড়াইয়া মারা হইবে। কিন্তু অবেদনগো, শদ্রক ও মৈশক ঐ প্রতিমাকে সিজদা করিতে অস্বীকার করেন। জামীল আহমদ আম্বিয়া-ই কুরআনের ৩খ., ২৩২ পৃষ্ঠায় আবেদনগো উযায়র (আ) ছিলেন বলিয়া অভিমত ব্যক্ত করেন। বুখতনাসার ভীষণ ক্রুদ্ধ হইল এবং ঐদিন তিনজনকে ডাকাইয়া অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করার নির্দেশ দিল। তাহার অগ্নিকুণ্ডটি এতই উত্তপ্ত ছিল যে, যাহারা তাহাকে অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করিল তাহারা আগুনের খরতাপে দগ্ধ হইয়া মারা গেল। কিন্তু আল্লাহ্র অপার কৃপায় হযরত উযায়র (আ) এবং তাঁহার অপর দুইজন সঙ্গী সম্পূর্ণ অক্ষত রহিলেন। বুখতনাসার দূর হইতে উঁকি মারিয়া দেখিল, উযায়র (আ) আগুনের মধ্যে হাঁটাচলা করিতেছেন। বুখতনাসার এই দৃশ্য দেখিয়া বলিল, শদ্রক, মৈশক ও অবেদনগোর (উযায়রের) খোদা মুবারক হোক। তিনি তাঁহার ফেরেশতা পাঠাইয়া তাঁহার বান্দাদিগকে রক্ষা করিয়াছেন। তাঁহারা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাহারও ইবাদত-বন্দেগী করিবে না বলিয়া প্রতিজ্ঞা করিয়াছেন। তাই আমি এই নির্দেশ জারী করিতেছি যে, যে জাতি শদ্রক, মৈশক ও আবেদনগো-এর খোদাকে গালমন্দ কারিবে, তাহাদিগকে আমি খণ্ড-বিখণ্ড করিয়া ফেলিব। তাহাদের গৃহ আবর্জনার স্তূপে পরিণত করা হইবে। কেননা এমন অন্য কোন দেবতা নাই, যে এইভাবে স্বীয় উপাসককে রক্ষা করিতে পারে। অতঃপর বুখতনাসার শদ্রক, মৈশক ও আবেদনগো-কে ব্যাবিলন প্রদেশে উচ্চপদে নিযুক্ত করিলেন। আর্দশেরের রাজত্বের সপ্তম বৎসর হযরত উযায়র (আ) বায়তুল মাকদিস আগমন করেন। তাওরাতে হযরত উযায়র (আ)-এর মধ্যবর্তী সময়কালের কথা বর্ণিত হয় নাই। সম্ভবত এই সময়কালেই কুরআনের বর্ণনা অনুসারে তিনি এক শত বৎসরের জন্য মৃত অবস্থায় ছিলেন।
টিকাঃ
দানিয়েল, তৃতীয় অধ্যায়: ১
দানিয়েল, তৃতীয় অধ্যায়: ২৮-৩০
ইয়া, সপ্তম অধ্যায়ঃ ৮